ইনসাইড থট

চাটুকারদের বক্তৃতায় থাকে নেতার বন্দনা, ফলে নেতৃত্ব হয় দিকভ্রান্ত


Thumbnail

ভীরুরা অধিকতর ক্ষমতালিপ্সু এবং এরা আনুগত্যপ্রবণ হয়। এসব চাটুকারদের বক্তৃতায় থাকে নেতার বন্দনা। ফলে নেতৃত্বই দিকভ্রান্ত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় দল। এসব চাটুকাররা ছদ্মাবরণে সমমনার মধ্যে ঐক্যবোধ সৃষ্টি করে। প্রকারান্তরে এদের বলয়ে গড়ে ওঠে একটি কাপুরুষের দল। সহানুভূতি অর্জনের উদ্দেশ্যে অনুষ্ঠিত স্বতঃস্ফূর্ত জনসভায় এদের বক্তৃতা-ভাষণে আন্তরিকতার উল্লাস মিশ্রিত থাকে। যদি নেতার একচ্ছত্র ক্ষমতা আধিপত্য থাকে। এসব ভীরুরা ধর্মকেও হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। যা প্রকৃতপক্ষে ভীরু চাটুকারদের অবৈধ ক্ষমতাকে বৈধকরণের একটি লোক দেখানো প্রক্রিয়া। ক্ষমতাসীন দলে এই ভীরুদের পৃষ্ঠপোষকতা দেয় সরকারি আমলারা।

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর দৃশ্যমান হয়ে ওঠে যে, যারা বঙ্গবন্ধুর প্রতি অতিভক্তি বা অতিশয় আনুগত্যপ্রবণ ছিলেন, তারাই সূর্য অস্তমিত হওয়ার আগেই বঙ্গভবনের দরবার হলে গিয়ে মন্ত্রিত্বের শপথ গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রপতি মোশতাকের মন্ত্রিসভায় যোগদানকারীরা পতনের পর আত্মপক্ষ সমর্থন করতে গিয়ে বলেছেন, প্রাণভয়ে কিংবা জান বাঁচাতেই তারা বঙ্গবন্ধুর লাশ ফেলে রেখে শপথ নেন। তার অর্থ এই দাঁড়ায় যে তাদের ভীরুদের মধ্যে গড়ে ওঠা একটি ‘কাপুরুষের দল’ বঙ্গবন্ধুর লালন-পালনে বেড়ে উঠছিলেন।

মোশতাকের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়া ‘মুজিবপ্রেমিক’ খ্যাত বিচারপতি আবু সাইদ চৌধুরী সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েই বলেছিলেন, ‘প্রাণ বাঁচাতেই মোশতাকের মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করেন।’ মানুষের অহংবোধ যখন অতিমাত্রায় বেড়ে যায় তখন বিজয়ানুভূতি ব্যতীত অন্যসব অনুভূতি, আবেগ অপসৃত হয়ে যায়। স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে এমন চিত্রটি দেখা যায়। নেতার জন্য প্রয়োজনীয় আত্মবিশ্বাস নানারূপে সৃষ্টি হতে পারে। ঐতিহাসিকভাবে সাধারণত একটি নিদান হলো নেতৃত্বের বংশগত অবস্থান। যদিও বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা সরকার প্রধান হিসেবে নিজেকে এবং নিজের মাধ্যমে জাতিকে নিশ্চয়তা দিয়ে তার মহিলা-সত্ত্বাকে অতিক্রম করে যাচ্ছেন। তিনি জানেন কী করা কর্তব্য- যা কোনো সাধারণ নাগরিক আশাই করেনি। তার ক্ষেত্রে জাতির ও শাসনকর্তার স্বার্থে ঐকতানিক; এ কারণেই তিনি ‘Good Administrator Bess’। তিনি ঘৃণা ক্রোধ জাগ্রত না করেই তার পিতার পাশাপাশি দেশবরেণ্য প্রয়াত নেতৃবর্গের প্রশংসা করতে পারেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আদেশদানের অভ্যাস দায়িত্ব গ্রহণ ও দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে সহজ করে দিয়েছে। ক্ষমতার উপহার যেমন বিলাস-ব্যসন যা তার জাগতিক উদ্দেশ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়, সেসব বিসর্জন দিয়েছেন। এটা বিশ্বাসের সঙ্গে ব্যাপক যোগ্যতার সন্নিবেশ যা তার অনুসারীদের নেতৃত্বের প্রতি আস্থাভাজন হতে উদ্দীপিত করতে সক্ষম হয়েছে। মনস্তত্ত্ব নয়, কখনো কখনো তার চাতুর্যই তাকে প্রতিপক্ষ যেখানে ব্যর্থ হতো সেখানে সক্ষম হবার ক্ষমতা দিয়েছে। স্বর্গীয় ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণের মধ্যে একটি চরম নিরাপত্তাবোধ রয়েছে, এ বোধ কোনো নিতান্ত পার্থিব সত্তার কাছে আত্মসমর্পণ করাতে পারেনি।

মানুষ ততক্ষণ ক্ষমতা পছন্দ করে যতক্ষণ তারা বিশ্বাস করে যে রাষ্ট্র পরিচালনা করবার যোগ্যতা আছে। মানুষই তাই অনুসরণ করাই শ্রেয়োবোধ করছে। সাধারণত শান্ত নাগরিকরা প্রধানত ভীতি-আক্রান্ত হয়ে নেতার অধীন হয়। যখন একবার কোনো নেতার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় তখন তিনি দলের সম্ভাব্য বিদ্রোহীদের মধ্যে ভীতি জাগিয়ে তুলতে পারেন। কিন্তু যতক্ষণ অবধি তিনি নেতা না হন এবং জনগণ কর্তৃক সে-স্বীকৃতি না পান ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি ভীতি জাগিয়ে তুলবার অবস্থায় থাকেন না। নেতার অবস্থান অর্জনের জন্য তাকে অবশ্যই কর্তৃত্বের জন্য প্রয়োজনীয় গুণাবলী অর্জন করতে হয়। আত্মবিশ্বাস, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সঠিক মাত্রায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের যোগ্যতা হলো এই গুণাবলী। নেতৃত্ব সাপেক্ষ বিষয়। সিজার তাকে মান্য করবার জন্য ক্যান্টনিকে বাধ্য করতে পারতেন। কিন্তু অন্য কেউ তা পারতো না।

রাজনীতি একটি জটিল বিষয়, আর অনুসারীরা মনে করেন নেতার অনুসারী হওয়ায়ই বরং ভালো, কুকুর তার প্রভুর প্রতি যেমন মনোভাব পোষণ করে অনুসারীরাও তেমনই মনোভাব স্বতঃপ্রবৃত্ত ও অবচেতনভাবে পোষণ করে। যদি তা না হতো তবে সামষ্টিক রাজনৈতিক কার্যাবলী প্রায় অসম্ভব ছিল। প্রেষণাগত ক্ষমতা-প্রেম ভীরুতা দ্বারা সীমিত, যা আত্মপরিচালনের ক্ষেত্রকেও সীমিত করে। ক্ষমতা যেহেতু অন্যান্য সম্ভাব্যতার চাইতে অধিক পরিমাণে মানুষের ইচ্ছাকে অনুধাবন করতে সক্ষম করে এবং যেহেতু অন্যান্যের চাইতে মানুষের পার্থক্য সম্পর্কে নিশ্চিত করে, তাই যদি ভীরুতা বাধাগ্রস্ত না করে তবে ক্ষমতার জন্য আকাঙ্ক্ষা পোষণ করা স্বাভাবিক। ভীরুতা দায়িত্ববোধের অভ্যাসের প্রভাবে কমে যায়, আর তাই দায়িত্বশীলতা ক্রমে ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষাকে বাড়িয়ে দেয়। নিষ্ঠুরতার অভিজ্ঞতা ও বন্ধুত্বহীনতা যেকোনো একদিকে ধাবিত করতে পারে। যারা সহজেই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে তাদের মধ্যে পর্যবেক্ষণ থেকে পলায়নের ইচ্ছা তৈরি হয়। অন্যদিকে সাহসিক মনোবৃত্তি এমন স্থান খুঁজে নিতে উদ্দীপিত করে যেখানে নিষ্ঠুরতা সহ্য করার বদলে তা বাধাগ্রস্ত করা যায়।

নৈরাজ্য পরবর্তী স্বাভাবিক প্রথম পদক্ষেপ হলো স্বৈরতন্ত্র, কারণ এটি স্বতঃপ্রবৃত্তভাবে আধিপত্য ও আনুগত্যের প্রক্রিয়ার দ্বারা সহজতর হয়। সম-সহযোগিতা স্বৈরতন্ত্রের চেয়ে যথেষ্ট কঠিন আর তা প্রবৃত্তির প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে কম সাযুজ্যপূর্ণ। যখন সম-সহযোগিতা হবে, তখন প্রত্যেকেই মাতব্বরি করতে চাইবে। এটাই স্বাভাবিক। কারণ আনুগত্যপ্রবণ মনোভাব তখন সক্রিয় থাকে না।

এক প্রকার লোকেরা দলে যুক্ত হন না বা খাপ খান না। কোনো না কোনোভাবে এমন আশ্রয়ের অন্বেষণ করেন যেখানে তারা নির্জন স্বাধীনতা ভোগ করেন। সময়ে সময়ে এই মনোভাবাপন্ন লোকদের ঐতিহাসিক গুরুত্ব থাকে। তাদের আগ্রহ নির্দোষ শখ চর্চার মধ্যে নিহিত এবং নিজেদের গূঢ় ও গুরুত্বহীন জ্ঞান চর্চায় ব্যস্ত রাখেন। তারা সভ্যতারও সীমান্ত অন্বেষণ করেন। এ ধরনের লোকদের ‘আমাজনের প্রকৃতিবাদী’ বলা হয়। আর ভীরুদের মধ্যে কেবল নেতার প্রতি আনুগত্যের দ্বারাই নয়, বরং সমমনা লোকদের মধ্যে নিশ্চিত ঐক্যবোধ জাগ্রত করার মাধ্যমে কাপুরুষদের দল গড়ে ওঠে। সহানুভূতি অর্জনের উদ্দেশ্যে অনুষ্ঠিত স্বতঃস্ফূর্ত জনসভায় এক আন্তরিকতার উল্লাস মিশ্রিত থাকে। মানুষের অহংবোধ যখন অতিমাত্রায় বৃদ্ধি পায় তখন বিজয়ানুভূতি ব্যতীত অন্য সব অনুভূতিই আবেগের তীব্রতা বৃদ্ধির সঙ্গে অপসৃত হয়। সমবেত উত্তেজনা আনন্দদায়ক কিন্তু নিয়ন্ত্রণহীন। ফলে সহজাত মানবিকতা ও আত্মরক্ষা সহজেই বিঘ্নিত হয়। তবে সহিংসতা ও শহীদের বীরত্বপূর্ণ মৃত্যু সমভাবে সম্ভব। নৃশংস বেপরোয়া হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়া ও বীরত্বব্যঞ্জকভাবে শহীদ হওয়া সমভাবে সম্ভব। এটাও এক প্রকার মাদকতাও যখন একবার এর আনন্দ উপভোগ করা হয় তখন প্রতিরোধ করা কঠিন। বরং পরিণামে তা অনীহা ও ক্লান্তির দিকে ধাবিত করে এবং পূর্বোক্ত উৎসাহ পুনরুজ্জীবিত করতে হলে তা তীব্র থেকে তীব্রতর উদ্দীপককে প্রয়োজনীয় করে তোলে। নেতার ক্ষমতার একটি গুরুত্ববহ উপাদান হচ্ছে সামষ্টিক উত্তেজনার আনন্দ। নেতা অনুসারীদের মধ্যে যে আবেগ সৃষ্টি করেন তাকে তার ভাগী হতে হয় এমন আবশ্যকতা নেই। কিন্তু নেতার পক্ষে তার অনুসারীদের উপর তার ক্ষমতাকে উপভোগ না করে সফল হওয়া প্রায় অসম্ভব। যখন একজন দক্ষ বাগ্মী যুদ্ধপ্রবণ অনুভূতি জাগিয়ে তুলতে চান, তিনি শ্রোতাদের মধ্যে দুই স্তরের বিশ্বাস উৎপন্ন করেন। তিনি শত্রুর ক্ষমতা সম্পর্কে এমন উচ্চ ধারণা দেন যাতে প্রয়োজনীয় দীপ্ত সাহস জাগ্রত হয়, গভীরতর স্তরে তিনি বিজয় সম্পর্কে নিশ্চিত বিশ্বাস প্রদান করেন।


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

‘আন্দোলন সহিংসতায় রূপ নিয়েছে সবার অব্যবস্থাপনার জন্য’

প্রকাশ: ০৫:২২ পিএম, ১৭ জুলাই, ২০২৪


Thumbnail

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক রায়হান শরীফ বলেছেন, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রতি সবার যে আচরণ (এখানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, পুলিশ, রাষ্ট্র সবাইকে বুঝাচ্ছি) সেখানে কোন একটা জায়গায় আমাদের ভুল হচ্ছে বলে আমার মনে হয়। শিক্ষার্থীরা একটি দাবি নিয়ে এসেছে, এর জন্য তাদের সাথে কথা বলা দরকার। তারা কি বলতে চায় সেটা শোনা দরকার। কিন্তু সেটা করা হয়নি। এর ফলে এখানে একটা গ্যাপ বা মিস কমিউনিকেশন (ভুল যোগাযোগ) তৈরি হয়ে গিয়েছে। শিক্ষার্থীরা আসলে কথাই বলতে চেয়েছে। কিন্তু কথা কে বলবে? অবশ্যই প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলা উচিত ছিল। তারা কি বলতে চায় সেটা শোনা উচিত ছিল। 

চলমান কোটা সংস্কার আন্দোলনে সহিংসতা নিয়ে বাংলা ইনসাইডারের সঙ্গে আলাপচারিতায় এ সব কথা বলেন অধ্যাপক রায়হান শরীফ।

অধ্যাপক রায়হান শরীফ বলেন, সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর যেভাবে হামলা হয়েছে, তা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক ছিল। সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর বহিরাগত সন্ত্রাসীদের হামলা কোনভাবেই কাম্য ছিল না। আমাদের সাধারণ শিক্ষার্থীরা রাত ২/৩টায় যখন ফোন করে বলে স্যার আমাদের বাঁচান, আমরা তখন বিচলিত হয়ে পড়ি। এগুলো কোন সুস্থ সংস্কৃতির লক্ষণ না। আন্দোলন এক পর্যায়ে যে সহিংসতায় রূপ নিল। এটিকে কারা সহিংসতার রূপ দিয়েছে সেটা একটা ভাবনার বিষয়। আমি মনে করি আন্দোলন সহিংসতায় রূপ নিয়েছে সবার অব্যবস্থাপনার জন্য। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার্থীদের বলতে পারতো তোমরা শান্তিপূর্ণ ভাবে আন্দোলন কর কিন্তু সেটা না হয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর প্রশাসন চড়াও হল। এর দায়ভার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এড়িয়ে যেতে পারেনা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অন্য কোন দেশের নয়, তারা আমাদেরেই সন্তান। তাদের সাথে আমাদের আচরণটা ভালোবাসার হওয়ার উচিত, মমতার হওয়া উচিত।


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

আমাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়

প্রকাশ: ১২:০০ পিএম, ১৬ জুলাই, ২০২৪


Thumbnail

আমাদের দূরদর্শী প্রধানমন্ত্রী ডাঃ সামন্ত লাল সেনকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। কৃতিত্বের প্রমাণিত রেকর্ড সহ তিনি একজন সবচেয়ে সৎ এবং কর্মমুখী ব্যক্তি। প্রথম দিন থেকেই তিনি মন্ত্রণালয়কে একটি সৎ, ফলাফলভিত্তিক, জবাবদিহিমূলক, জনমুখী প্রতিষ্ঠান হিসেবে রূপান্তরিত করতে শুরু করেছেন। আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং পরিবর্তিত মন্ত্রণালয়ের জন্য আমরা অবশ্যই গর্বিত। তার সামনে এখনও অনেক বিশাল চ্যালেঞ্জ রয়েছে, রূপান্তরমূলক পরিবর্তন আনতে আমাদের অবশ্যই কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে হবে, উত্তর খুঁজতে হবে এবং এগিয়ে যাওয়ার জন্য জনস্বাস্থ্য কৌশল তৈরি করতে হবে। আর তা হল: ১) অতীতে আমরা কী অর্জন করেছি; ২) আমাদের প্রধানমন্ত্রীর জনগণের স্বাস্থ্য উন্নতির দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করতে আমাদের কী শূন্যতা রয়েছে; এবং ৩) আগামী কয়েক দশকে স্বাস্থ্য ও উন্নয়ন বজায় রাখা এবং সেই দৃষ্টি ও লক্ষ্য অর্জনের জন্য আমাদের আলাদাভাবে কী করতে হবে তা নিয়ে শুধু চিন্তাই নয়, একটি কার্যকরী লক্ষ্য অর্জনের কৌশল এবং কৌশল বাস্তবায়নের পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে।

গত দশকের আমাদের অর্জন: ১৯৭৮ সালে জনগণের গড় আয়ু (একটি দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য এবং উন্নয়নের একটি সূচক) ছিল ৫১.৬ বছর, আজ এটি ৭৩.৮ বছর - একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন। ১৯৭৮ সালে মোট টিএফআর ( Total Fertility Rate) ছিল ৬.৬ এবং এখন তা নিচে নেমে হয়েছে ১.৯ (জনসংখ্যা প্রতিস্থাপনের নীচে), আমরা পরোক্ষ ভাবে বলতে পারি এটা সম্ভব হয়েছে নারীর ক্ষমতায়ন, নারী শিক্ষার উন্নতি এবং তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতায়নের কারণে। শিশুমৃত্যুর হার ২৫/১০০০ জীবিত জন্মে নেমে এসেছে, মাতৃমৃত্যু এখন ১২৩/১০০,০০০ জীবিত জন্মে। এটি সম্ভব হয়েছে সফল টিকাদান কর্মসূচি এবং স্বাস্থ্যসেবা পরিষেবাগুলিতে সহজ অ্যাক্সেসের জন্য। ১৯৯১ সালে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের স্টান্টিং (দীর্ঘস্থায়ী পুষ্টি সমস্যা) এর প্রবণতা ছিল ৭৩.৬% যা আজ ২৩% এ নেমে এসেছে। অন্যান্য অনেক সূচকের মধ্যে, আমি এখানে শুধুমাত্র কয়েকটি হাইলাইট করেছি। জনগণের আস্থা ও অংশগ্রহণের পাশাপাশি দূরদৃষ্টি, নেতৃত্ব, নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং কর্মক্ষেত্রে এগুলি উল্লেখযোগ্য অর্জন। আমাদের অর্জনের জন্য আমাদের গর্বিত হওয়া উচিত কিন্তু আত্মতুষ্ট হওয়া উচিত নয় কারণ আমাদের একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে এবং একটি স্থিতিস্থাপক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রস্তুত থাকতে হবে।

২১ শতকের চ্যালেঞ্জ: প্রথমে আমাদের বুঝতে হবে যে বিশ্বব্যাপী এবং বাংলাদেশে আমরা কিছু স্বাস্থ্য পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। ১) এপিডেমিওলজিকাল ট্রানজিশন, যেখানে রোগের ধরণটি সংক্রামক রোগ থেকে ব্যাপক হারে অসংক্রামক রোগে পরিবর্তিত হচ্ছে। বর্তমানে ৬৫% এরও বেশি মৃত্যুর কারণ অসংক্রামক রোগের জন্য, যেমন উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, নানা ধরনের ক্যান্সার, সড়ক দুর্ঘটনা ইত্যাদি। এই অবস্থার দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়বহুল যত্ন প্রয়োজন। ২) স্থানান্তর জনসংখ্যা: আমাদের বয়স্ক লোক সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, যাদের বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন। এবং একই সাথে আমাদের এখনও বিশাল বয়ঃসন্ধিকালের/তরুণ জনসংখ্যা রয়েছে যাদের সুস্থ এবং সক্রিয় রাখা দেশের সার্বিক জাতি গঠন ও উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন। ৩) স্থানান্তরের স্থানান্তর/অভিবাসন: অভ্যন্তরীণ অভিবাসন যেখানে আমরা ক্রমবর্ধমান নগরায়ণ, বস্তির জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে তাদের সঠিক পানি, স্যানিটেশন, আবাসন এবং স্বাস্থ্যসেবা পরিষেবাগুলিতে অ্যাক্সেসের অভাব মোকাবেলা করছি। এবং ভবিষ্যতের যেকোনো অশান্তি বন্ধ করতে আমাদের এই জনগোষ্ঠীকে স্বাস্থ্যসেবা পরিষেবাগুলিতে অগ্রাধিকার দেয়া প্রয়োজন, যাতে তারা পিছিয়ে না থাকে। আমাদের বিপুল সংখ্যক অভিবাসী এবং অভিবাসী শ্রমশক্তি রয়েছে যারা আমাদের অর্থনীতির জন্য অত্যাবশ্যক। তাদের স্বাস্থ্য এবং মঙ্গল একটি অগ্রাধিকার; ৪) জলবায়ু পরিবর্তন হল আরেকটি পরিবর্তন এবং ক্রমবর্ধমানভাবে খরা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়ের কারণে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তন বিশাল ক্ষতিগ্রস্ত জনসংখ্যার স্বাস্থ্য ও মঙ্গলের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে এবং ফেলবে। স্বাস্থ্যসেবা পরিষেবায় অ্যাক্সেসের অভাব বিশেষ করে নারী, শিশু এবং বয়স্ক জনগোষ্ঠীকে প্রভাবিত করছে এবং করবে। ৫) COVID-19 আমাদের দেখিয়েছে যে এমনকি সবচেয়ে ধনী দেশগুলির স্বাস্থ্য ব্যবস্থা সেই মহামারি মোকাবেলায় প্রস্তুত ছিল না। মহামারি আমাদের জীবন বাঁচাতে দুটি ফ্রন্টে কাজ করতে দেখিয়েছে: রোগের পাশাপাশি জীবিকা থেকেও জীবন বাঁচানো। তাই এই মহামারি মোকাবেলায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ নয় রাজনীতিবিদরা ড্রাইভিং সিটে ছিলেন। আমরা কি পরবর্তী মহামারির মুখোমুখি হওয়ার জন্য এখন প্রস্তুত?; ৬) ডিজিটাল রূপান্তর: আমরা পছন্দ করি বা না করি আজ সাধারণ জনগণ তাদের স্বাস্থ্য এবং মঙ্গল সম্পর্কে অনেক বেশি সচেতন। বাংলাদেশের সকল জনগণের ডিজিটাল সুবিধা রয়েছে। স্বাস্থ্য খাতকে নিজেকে পরিবর্তন করতে হবে এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে একটি সুবিধা এবং সুযোগ হিসাবে ব্যবহার করতে প্রস্তুত হতে হবে হুমকি নয়। ৭) এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বাড়ছে কারণ বাংলাদেশে লোকজন কোনো প্রেসক্রিপশন ছাড়াই এন্টিবায়োটিক কিনছে মানুষ ও পশুর জন্য। আমাদের আরও দেরি হওয়ার আগেই কীভাবে অ্যান্টিবায়োটিকের যৌক্তিক ব্যবহার নীতি ও বাস্তবায়ন শুরু করা যায় তার উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়া দরকার। ৮) মা, নবজাতক এবং শিশুদের স্বাস্থ্য এবং বেঁচে থাকা এখনও একটি অসমাপ্ত এজেন্ডা হয়ে রয়ে গেছে। ৯) নানা কারণে মানসিক স্বাস্থ্য একটি অবহেলিত জনস্বাস্থ্য সমস্যা যার জন্য জরুরি ও সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।

সিস্টেম চ্যালেঞ্জ: স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বাজেটে আরও বেশি বরাদ্দ দাবি করছেন। কিন্তু প্রশ্ন হল, কেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে বরাদ্দকৃত বাজেট সময়মতো ব্যবহার করতে সক্ষম নয়, কেন প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ কোষাগারে ফেরত দিতে হচ্ছে? তাহলে কোন যুক্তিতে অর্থ মন্ত্রণালয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তহবিল আরও বাড়ানোর কথা বিবেচনা করবে? আমরা কি বর্তমান নীতি এবং ব্যবস্থাপনা ক্ষমতা বিশ্লেষণ করেছি যা আমাদের প্রমাণ দিতে পারে কেন আমাদের এই সময়োপযোগী বাস্তবায়ন ক্ষমতার অভাব রয়েছে। আমরা কি আমলাতান্ত্রিক নীতি ও পদ্ধতি বিবেচনা করেছি যা সময়মতো বরাদ্দ এবং কাজ শেষ করতে বাধা দেয়। আমরা কি বিশ্লেষণ করেছি কি ভাবে অপচয় এবং দুর্নীতি বন্ধ করা যায়। আমরা কি পরিচালন ক্ষমতা মূল্যায়ন করেছি বা ফলাফল ভিত্তিক, জবাবদিহিতার কাঠামো প্রতিষ্ঠা করেছি যার সাহায্যে আমরা স্বাস্থ্য সচিব থেকে মহাপরিচালক, প্রোগ্রাম বা হাসপাতাল সহ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার থেকে সিভিল সার্জন পর্যন্ত কর্মকর্তাদের কর্মক্ষমতা মূল্যায়ন করতে পারি?

অন্যান্য চ্যালেঞ্জ: ১৯৭০ দশকে আমাদের যখন বিপুল ভাবে জনসংখ্যা বৃদ্ধি হচ্ছিল তখন জনসংখ্যা বৃদ্ধি রোধে আমাদের জরুরি সময়সীমাবদ্ধ পদক্ষেপের প্রয়োজন ছিল। তাই সময়মতো তা মোকাবেলা করার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দুটি সমান্তরাল স্বাধীন অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করে: স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর। আজ জনসংখ্যা সচেতনতা, নারীর ক্ষমতায়ন, পারিবারিক অর্থনীতি বৃদ্ধি এবং সময় মত সঠিক সেবা পাওয়ার কারণে টিএফআর (total fertility rate) হ্রাস পেয়েছে এবং আরো নিচে যাবে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি এখন হয়ত কোনো বিরাট সমস্যা নয়, আগামী দশকে তা কমতে শুরু করবে। এবং জনসংখ্যা দ্বিগুণ হওয়ার সময় দীর্ঘায়িত হচ্ছে। আমাদের প্রচেষ্টার সময় এসেছে একটি কঠিন নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার- আমাদের কি এখনও দুটি অধিদপ্তর দরকার বা একটি সমন্বিত অধিদপ্তর দরকার? একটি মানসম্পন্ন প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পদ্ধতি ব্যাপকভাবে জনগণকে উভয় পরিষেবা প্রদান করতে পারবে।

আরেকটি বিষয় হল নগর স্বাস্থ্য ব্যবস্থা স্থানীয় সরকারের দায়িত্ব। বিভিন্ন বহিরাগত উত্স থেকে তহবিল দিয়ে এই ব্যবস্থা পরিচালনা করা হয়। বেশিরভাগ বেসরকারি সংস্থাগুলি পরিষেবা প্রদান করে। আমাদের বিশ্লেষণ করতে হবে স্বাস্থ্যের সর্বোত্তম মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকারগুলি কীভাবে জাতীয় স্বাস্থ্য লক্ষ্যগুলি অর্জনের জন্য তাদের কাজগুলিকে সমন্বয় করে। আমাদের অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে যে বহিরাগত তহবিল অনন্তকালের জন্য নাও হতে পারে।

আমরা জানি যে বেশিরভাগ মানুষ অসংক্রামক রোগে ভুগছেন যা একটি জীবনধারার রোগ। এর প্রতিরোধ এবং দীর্ঘমেয়াদি যত্ন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। এমনকি উন্নয়নশীল দেশগুলিতে এটি একটি বিশাল আর্থিক এবং পরিষেবার বোঝা হয়ে উঠছে। তথ্য ও পরিষেবার ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে কোন ব্যবস্থা আমাদের গ্রহণ করা উচিত: ব্যয়বহুল হাসপাতাল ভিত্তিক পরিষেবা বা প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ভিত্তিক পরিষেবা যা প্রয়োজনে হাসপাতালের সাথে যুক্ত হয়ে পরিষেবাগুলিকে জন সাধারণদের কাছে নিয়ে আসা এবং সম্প্রদায়কে নিজের গৃহ ভিত্তিক যত্ন পরিষেবাগুলি তৈরি করতে সহায়তা করা? আমাদের প্রধানমন্ত্রী একটি অনন্য কমিউনিটি সেন্টার ভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা তৈরি করেছেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং কমিউনিটি ক্লিনিক ব্যবস্থাপনা কীভাবে তাদের পরিষেবাগুলি সমন্বয় করছে বা করতে পারে তা বিবেচনা করার সময় হয়ত এসেছে। আমাদের বিবেচনা করতে হবে আমাদের কমিউনিটি ক্লিনিক ভিত্তিক পরিষেবাগুলিকে আরও মূল্যায়ন ও প্রসারিত করে একটি সমন্বিত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা যা সংযুক্ত প্রয়োজনীয় হাসপাতালের যত্ন সেবার ব্যবস্থা তৈরি করা যা হবে সবচেয়ে দক্ষ এবং খরচ কার্যকর সিস্টেম।

আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য মানব সম্পদের আমাদের নীতি এবং পরিকল্পনাগুলিকে পুনর্বিবেচনা করতে হবে। আগামী কয়েক দশকে বাংলাদেশের কত চিকিৎসক, নার্স, মিডওয়াইফ, প্যারামেডিক এবং সহযোগী মানব সম্পদ প্রয়োজন তা বিশ্লেষণ করতে হবে। একের পর এক সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল কলেজ নির্মাণ করা হচ্ছে। সেই ডাক্তারদের কি সরকারি, বেসরকারি বা অন্য দেশে পাঠানো যাবে? আমরা কীভাবে নিশ্চিত করব যে আমাদের মেডিকেল কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলি বিদেশি প্রতিষ্ঠান দ্বারা স্বীকৃত এবং স্বীকৃত হচ্ছে যদি আমরা আমাদের ডাক্তারদের অন্য দেশে নিয়োগ করতে চাই? আমাদের কি পর্যাপ্ত নার্স, মিডওয়াইফ এবং প্যারামেডিকস আছে যারা বাংলাদেশের প্রয়োজন বা অন্য দেশগুলির প্রয়োজন মেটাতে পারে। কিভাবে আমরা স্বাস্থ্যের জন্য রপ্তানি মানের মানবসম্পদ বিকাশ করতে পারি। আমি শুনেছি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে বিপুল সংখ্যক পদ এখনও শূন্য রয়েছে - আমাদের এর কারণগুলি খুঁজে বের করে তার প্রতিকারের ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা দরকার।

স্বাস্থ্য উন্নয়নে বেসরকারি খাত উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। আমাদের এখন প্রয়োজন নীতিমালা , এর বাস্তবায়ন এবং পর্যবেক্ষণ কৌশল তৈরি করা বা বিদ্যমান নীতি পরিবর্তন করা যা তাদের পরিষেবা এবং কার্যগুলি উন্নত মানের যত্নের জন্য সহায়ক হয় এবং তাদের একটি সাধারণ জবাবদিহিতার কাঠামোর মধ্যে আনা যায়।

আরেকটি বিষয় হল একটি কার্যকর প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থার জন্য জেলা স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা পরিচালনার দক্ষতা তৈরি করা। প্রতি বছর আমাদের জেলা স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপকদের সাথে বসতে হবে, তাদের অর্জন আর চ্যালেঞ্জগুলি বিশ্লেষণ করতে হবে, এবং সেই অনুযায়ী আগামী বছরের জন্য স্বাস্থ্য জেলা ভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। আমাদের কর্মক্ষমতা সূচক এবং একটি জবাবদিহিতার কাঠামো তৈরি করতে হবে, শাস্তির জন্য নয় বরং কার্যকর হওয়ার জন্য তাদের প্রচেষ্টাকে সমর্থন করার জন্য।

এগিয়ে যাওয়ার পথ: আমি বারবার শুনছি আমার মতো যারা জাতিসংঘের ব্যবস্থায় বা বিদেশে অন্যান্য পদে কাজ করেছেন তারা বাংলাদেশের বিরাজমান পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত নন বা বোঝেন না এবং তাই তাদের কিছু বলার অধিকার নেই। আমি তাদের মতামতকে সম্মান করি, আমি স্বীকার করি যে এখানে বাংলাদেশে যা ঘটছে তার সবকিছু হয়তো আমি কভার করতে পারিনি। তবুও আমি বিবেচনার জন্য এগিয়ে যাওয়ার কয়েকটি উপায় নির্দেশ করার সাহস করেছি। আমি বিশ্বাস করি বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি রয়েছে এবং আমাদের প্রধানমন্ত্রী একটি সুস্থ জাতি গঠনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এটি রূপান্তরমূলক পরিবর্তন এবং মানব উন্নয়নমুখী স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা আনার একটি অভূতপূর্ব সুযোগ। আমাদের অতীতের অর্জনগুলো তাৎপর্যপূর্ণ কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমাদেরকে ফলাফল ও জবাবদিহিতার ভিত্তিতে একটি ব্যবস্থা ও ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে।

বাংলাদেশে এবং বিদেশে অনেক বাংলাদেশি আছে যাদের চমৎকার জনস্বাস্থ্য পটভূমি এবং দক্ষতা রয়েছে এবং তারা আর্থিক লাভ, প্রভাব বা উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছাড়াই সহায়তা প্রদানের জন্য, আমি আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করি, তারা প্রস্তুত। আমাদের মাননীয় মন্ত্রী বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের একটি উপদেষ্টা দল গঠনের চিন্তাভাবনা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এই দলটি বর্তমান অর্জন, চ্যালেঞ্জ, সুযোগ বিশ্লেষণ করবে, তারা আগামী কয়েক দশকের স্বাস্থ্য নীতি, কৌশল, বাস্তবায়ন পরিকল্পনা, এর খরচ এবং একটি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা প্রণয়ন করবে এবং মন্ত্রীকে সম্ভাব্য পথের সুপারিশ করবে এবং লক্ষ্যমাত্রা ও জবাবদিহিতার কাঠামো নির্ধারণ করতে পারবে, তারা পর্যায়ক্রমে বসে পরিবর্তনগুলি পর্যবেক্ষণ করতে পারবে এবং নির্ধারিত লক্ষ্য ও লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য আরও পরিবর্তনের জন্য সুপারিশ প্রদান করবে। ফলাফল ভিত্তিক ব্যবস্থাপনার উপর ভিত্তি করে সংগঠনের প্রতিটি স্তরের জন্য লক্ষ্যগুলি তৈরি করবে এবং একটি জবাবদিহিতা কাঠামো তৈরি করে একটি স্বচ্ছ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা তৈরি করার সুপারিশ করবে। সুপারিশ এবং তার বাস্তবায়নের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার একমাত্র দায়িত্ব হবে মন্ত্রণালয়ের। এই দলটি একটি উপদেষ্টা দল হবে, তত্ত্বাবধানকারী দল নয়। উপদেষ্টা দল গঠন করা সহজ সিদ্ধান্ত নয় কারণ আমি বিশ্বাস করি যে অনেক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা নিরাপত্তাহীনতা বোধ করতে পারেন এবং হুমকি বোধ করতে পারেন। কিন্তু যত সময় যাবে আমি বিশ্বাস করি তারা অনুভব করবে যে উপদেষ্টা গোষ্ঠী কোন হুমকি নয় বরং তাদের কাজ এবং ফলাফল অর্জনের সহায়ক।

হাসপাতাল পরিদর্শন বা এখানে এবং সেখানে কিছু দুর্নীতি বা কিছু শাস্তির ব্যবস্থা যথেষ্ট নাও হতে পারে। মন্ত্রীকে তার টেবিলে বসা হাতিটিকে চিহ্নিত/সম্বোধন করতে হবে। তার ভবিষ্যৎ দৃষ্টি, লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য বিস্তৃত করা প্রয়োজন। তার সময়কালে তিনি তার সক্ষম দলের সাথে কী অর্জন করতে চান এবং কিভাবে তিনি তা অর্জন করবেন এবং বাংলাদেশের মানুষ কেন তাকে মনে রাখবে তা বিস্তৃত করা। আমি বিশ্বাস করি তিনি একজন স্বপ্নদ্রষ্টা, তিনি পরিবর্তন আনতে তার সক্ষমতায় বিশ্বাসী এবং তিনি তার দেশের মানুষের জন্য তার সক্ষমতার সেরাটা দিতে প্রস্তুত এবং আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে তার সঠিক সিদ্ধান্তে গর্বিত করতে প্রস্তুত।

আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রীর শোনার এবং শেখার অনন্য ব্যক্তিত্ব রয়েছে। তার সততা, অতীতের অর্জন এবং ফলাফলের অতীত আমাদের সকলকে আশা দেয়। তার দক্ষ নেতৃত্বে মন্ত্রণালয়ে রূপান্তরমূলক পরিবর্তন সম্ভব এবং এটা একটি বাস্তবতা। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করতে চাই।


মতামত   স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

ফিরে দেখা: ১৬ জুলাই


Thumbnail

২০০৭ সাল। ভোররাতে ধানমন্ডির ‘সুধা সদন’ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘেরাও করল। উদ্দেশ্য, শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার। তিনি তখন বিরোধীদলীয় নেতা। ড. ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নিয়েছে ড. ইয়াজউদ্দিনের ব্যর্থ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছ থেকে।

যেটি আসলে বিএনপি সরকারেরই অন্যরূপ। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই বিরোধী দলের নেতা শেখ হাসিনাকে প্রথমে গ্রেপ্তার করার কারণ কেউ বুঝতে পারেনি। কারণ অতীত অভিজ্ঞতা হলো, নতুন সরকার এসে সদ্য বিদায়ী সরকারের বিরুদ্ধে নানা অভিযান পরিচালনা করে। সে ক্ষেত্রে বিরোধী দলের নেতাকে গ্রেপ্তার বিস্ময়কর! এ থেকেই বোঝা যায়, শেখ হাসিনা গণতন্ত্রের প্রশ্নে আপসহীন ছিলেন। এজন্য তিনিই হন অগণতান্ত্রিক শক্তির প্রধান লক্ষ্য। তারা শেখ হাসিনাকেই সবচেয়ে বেশি ভয় পেয়েছিল।

গ্রেপ্তার হওয়ার আগে ধানমন্ডির ‘সুধা সদনে’ একদিন তিনি তোফায়েল আহমেদকে বললেন, এখনই যদি আমরা এই অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতায় থাকা সরকারকে বাধা না দিই তাহলে পরবর্তীকালে খুবই অসুবিধা হবে। আমার এখনো মনে আছে, তখন তোফায়েল আহমেদ উত্তরে বললেন, ‘তাদের আরও কিছুদিন সময় দেওয়া প্রয়োজন।’ এতে আওয়ামী লীগ সভাপতি খুব অসন্তুষ্ট হলেন। তিনি সিঁড়ি দিয়ে নামছিলেন। নামার পথে তিনি বললেন, ‘না, তাদের কোনো সময় দেওয়া যাবে না।’ তিনি বললেন, এখনই যদি তাদের প্রতিহত না করা যায় এবং তাদের যদি গ্রহণ করা হয় তাহলে তারা ‘সিন্দাবাদের ভূতের’ মতো ঘাড়ে চেপে বসবে।

বঙ্গবন্ধুকন্যা ১৯৮১ সাল থেকে বাংলাদেশের রাজনীতির যে একটি মৌলিক পরিবর্তন করেছেন, যা জনগণের চোখ এড়ায়নি। গণতন্ত্রের জন্য নিরন্তন সংগ্রাম করেছেন। ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তিনিই প্রধান যোদ্ধা। এ লড়াই তাকে দিয়েছে অনন্য অবস্থান। শেখ হাসিনাই একটা ‘ইনস্টিটিউশন’। সুতরাং এখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আর তখনকার শেখ হাসিনার মধ্যে আমি কোনো পার্থক্য দেখি না। তখন তার কথায় লোকে যেমন বিশ্বাস করত, এখনো মানুষ তা করে। এজন্যই তিনি সেনা সমর্থিত সরকারের মাথাব্যথার কারণ হয়েছিলেন।

কয়েক দিন পর শেখ হাসিনা আমাকে ফোনে বললেন, ‘আমি চোখ পরীক্ষার জন্য যাব।’ আর এ সময় তিনি আমাকে বললেন, তিনি কোনো গণমাধ্যমের মুখোমুখি হবেন না। কিন্তু আমি ওই সময় ফোন করে সব মূলধারার গণমাধ্যমকে জানিয়ে দিলাম, আওয়ামী লীগ সভাপতি আসবেন। এরপর শেখ হাসিনা আমার চেম্বার থেকে বের হওয়ার সময় সাংবাদিকরা তাকে ঘিরে ধরেন। তিনি তখন বললেন, ‘আমার ফুপু অসুস্থ অথচ আমার ফুপাতো ভাই শেখ সেলিম জেলে বন্দি।’ এভাবে তার যেসব নেতা কারান্তরীণ, তাদের কথা বললেন এবং অসাংবিধানিক সরকারকে তিনি যে স্বীকার করেন না, তাদের অবিলম্বে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়া উচিত—এ নিয়ে জোর গলায় বললেন। দ্রুততম সময়ের মধ্যে নির্বাচন দাবি করলেন শেখ হাসিনা। এর দুদিন পর তিনি ‘ল্যাবএইড’-এ গেলেন ক্যান্সার আক্রান্ত বিখ্যাত সংগীতশিল্পী সাবিনা ইয়াসমীনকে দেখতে। হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে তিনি সাংবাদিকদের দেশের পরিস্থিতি নিয়ে কথা বললেন। ড. ফখরুদ্দীনের নেতৃত্বাধীন সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কঠোর সমালোচনা করলেন।

সুতরাং এ দুটি ঘটনা থেকেই বোঝা যায়, অসাংবিধানিক সরকার তাকে টার্গেট করবে। এরপরই তার বাড়ি ঘেরাও করা হয়। গ্রেপ্তার হওয়ার পর তিনি কয়েকজনকে ফোন করেন, তাদের মধ্যে একজন প্রয়াত অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন। ফোন পেয়েই তিনি ‘সুধা সদনে’ হাজির হন। এ ছাড়া নেতাকর্মীরাও আসে। আমার ধারণা, যদি নেতাকর্মীরা শেখ হাসিনার গ্রেপ্তারের বিষয়ে আগে থেকে জানত তাহলে শেষ পর্যন্ত তারা রাস্তা ঘেরাও করত এবং শেখ হাসিনাকে কোর্ট পর্যন্ত নিয়ে যেতে দিত না।

শেখ হাসিনাকে নিয়ে পার্লামেন্ট ভবনের একটি স্যাঁতসেঁতে রুমে রাখা হলো। সেখানে তাকে জাতীয় অধ্যাপক শাহলা খাতুন এবং প্রাণ গোপাল দত্ত দেখতে গিয়েছিলেন। পরে তার সহকারী একজন জানালেন, শেখ হাসিনা চান আমি যেন তার সঙ্গে দেখা করি। এরপর আমি একটি আর্টিকেল লিখি এবং ওই আর্টিকেলটি ড্রাফট করার জন্য আমি নাঈমুল ইসলাম খানের কাছে গেলাম। তিনি ঠিক করে দেওয়ার পর আমি সৈয়দ বোরহান কবীরের কাছে গেলাম এবং তিনি আমাকে ড্রাফট ঠিক করে দিলেন, যা আমি পত্রিকায় দিলাম। সেই ড্রাফটির মূল কথাটি ছিল এরকম—‘আমি শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক। কিন্তু তার সঙ্গে আমাকে দেখা করতে দেওয়া হচ্ছে না।’ সেই লেখাটি পরের দিন ‘আমাদের সময়’ এবং ‘মানবজমিন’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এরপর কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়েই জেলখানায় শেখ হাসিনার সঙ্গে আমার দেখা করার ব্যবস্থা করে। আমি শেখ হাসিনার শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে তাকে বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার জন্য সুপারিশ করি। কিন্তু আওয়ামী লীগেরই অনেক নেতা এতে আপত্তি তোলেন। তারা বলেন যে, শেখ হাসিনা যদি চিকিৎসার জন্য বাইরে যান তাহলে তাকে আর দেশে আসতে দেওয়া হবে না। তখনকার আওয়ামী লীগের মূল যেসব নেতা মাঠে ছিলেন যেমন—প্রয়াত সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, ড. হাছান মাহমুদ, সাহারা খাতুন অনেকেই আমাকে বললেন, আপনি ঠিকই বলেছেন। এরপর আমি সংবাদ সম্মেলন করি। সেখানে আমি দাবি করি, শেখ হাসিনা গুরুতর অসুস্থ। উন্নতর চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশ নেওয়া প্রয়োজন। এরপর আওয়ামী লীগের সবাই শেখ হাসিনার চিকিৎসার প্রশ্নে সোচ্চার হন।

সংবাদ সম্মেলনে আমার সঙ্গে ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক এবিএম আব্দুল্লাহ। এ ছাড়া ছিলেন প্রাণ গোপাল দত্ত এবং শাহলা খাতুন। আমরা এই কজন এসংক্রান্ত একটি বিবৃতি তৈরি করি এবং তা পত্রিকায় পাঠাই।

২০০৭ সালের ১৬ জুলাই যখন শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করা হয়, তখন যারা অবদান রেখেছেন তাদের মধ্যে সাহারা আপা এখন আমাদের মধ্যে নেই। অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম তখন শেখ হাসিনার আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ যিনি পরে আইনমন্ত্রী হয়েছেন, তিনিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সেই সময় ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস একটি ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিলেন। এ ছাড়া মোহাম্মদ আলী নামে একজন আয়কর সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে নেত্রীর সঙ্গে জেলে দেখা করেছেন এবং খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

কিন্তু আজকে কেবিনেট মেম্বার অনেকেরই সেই সময় কোনো ভূমিকা ছিল না। অথচ তারাই আজ প্রধানমন্ত্রীর আশপাশে ঘিরে আছে। এমনকি যেসব আমলা সেই সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন, তারা আজ প্রধানমন্ত্রীর কাছে নেই। নতুনদের ভিড়ে পুরোনোরা চাপা পড়ে গেছেন। কিন্তু নতুনদের মধ্যে ছদ্মবেশে যদি হাইব্রিডরা আসে এবং যারা প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষতি করতে পারে তারা যদি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পায় তখন আমি শঙ্কিত হই, ব্যথিত হই।

আজকে এতদিন পর যখন ১৬ জুলাই এলো, তখন এ কথাটি মনে পড়ছে, সেই সময় শেখ হাসিনার পাশে কারা ছিল আর এখন নেত্রীর পাশে কারা আছে। আওয়ামী লীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের তখন জেলে, ড. হাছান মাহমুদ, অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম, সাহারা খাতুনরা সেদিন যা করেছেন, তা প্রশংসনীয়। তা ছাড়া প্রয়াত ব্যারিস্টার রফিক-উল-হক আওয়ামী লীগের লোক না হয়েও শেখ হাসিনার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। অন্যদিকে ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামরা শেখ হাসিনাকে সমুদ্রে ভাসিয়ে দেওয়ার মতো দায়িত্বহীন ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। আজ এতদিন পর এসে আমি বলছি, বর্তমানে বঙ্গবন্ধুর দল এবং তার দলের সরকার নতুনভাবে সাজানো দরকার। যোগ্য, আদর্শবান এবং পরীক্ষিতদের শেখ হাসিনার চারপাশে বড্ড প্রয়োজন।

লেখক: সভাপতি, কমিউনিটি ক্লিনিক

স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্ট


১৬ জুলাই   এক এগারো   শেখ হাসিনা   গ্রেপ্তার  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

বাংলাদেশটা আমাদের, রাজাকারদের নয়!


Thumbnail

১.
গণতান্ত্রিক দেশে একটা ইস্যুভিত্তিক আন্দোলন হতেই পারে। আন্দোলনের দাবিসমূহ গ্রহণ করা হবে কি না সেটাও সরকার বিবেচনা করবেন। কিন্তু দেশে একটা আন্দোলন হলেই যারা সরকার পতনের স্বপ্ন দেখেন, তারা হয় রাজনীতিতে অদক্ষ নতুবা শেখ হাসিনাকে চেনেন না। তাদের উচিত ২০% ছাড়ে ইংরেজিতে আমার লেখা শেখ হাসিনার জীবনীগ্রন্থটি জরুরি ভিত্তিতে পড়া। 

২.
কোটা বিরোধী আন্দোলনটা খুবই সহজ। সরকার তো কোটা বাতিলই করেছিল। হাইকোর্টের রায়ে সেটা ফিরে এসেছে, সরকার যার বিরূদ্ধে আপিল করেছে। হাইকোর্টের পুরো রায় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কোটা সংস্কারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টা একদিকে যেমন আদালতের বিবেচনায় আছে, অন্যদিকে সমাধানের সম্ভাব্য পথগুলোও তুলনামূলকভাবে সহজ। সো, নো টেনশন!

৩.
এরকম একটা আন্দোলনে আড়ালে-আবডালে থেকে দুয়েকটা রাজনৈতিক দল হাওয়া দেবে- বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটা নতুন কিছু নয়। তবে কোন আন্দোলন থেকে কী রিটার্ন আসতে পারে তার একটা ধারণা থাকা সবার জন্য মঙ্গল।

৪.
সকালে ঘুম থেকে উঠে একটা বিষয় মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। যত প্রতিকূল পরিস্থিতিই হোক না কেন, একজন প্রকৃত মুসলমান কি কোন অবস্থায় বলতে পারেন, “আমি ইবলিশ”? একটু আগে খুলনা থেকে বাল্যবন্ধু টিপু ফোন করেছিল। তাকেও প্রশ্নটা করতেই সে তাৎক্ষণিক উত্তর দিয়েছিল, “না”। 

তেমনি মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশে নিজেকে কেউ রাজাকার দাবি করতে পারে না, যদি না সে প্রকৃত বা জেনেটিক্যালি রাজাকার না হয়। 

আমাদের সকল প্রজন্মকে জানতে হবে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে রাজাকারদের ভূমিকা কত নৃশংস ছিল। তারা কীভাবে পাকহানাদার বাহিনী কর্তৃক লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাটে সহযোগিতা করেছে, তা যেন কোন অবস্থায়ই আমরা ভুলে না যাই। 

৫.
গতকাল মধ্যরাতে যারা “তুমি কে আমি কে/ রাজাকার রাজাকার” শ্লোগান দিয়েছে, তারা ভীষণ অন্যায় করেছে। আমি এখনো বিশ্বাস করি, মিছিলে যারা এই ঘৃণিত শ্লোগানটি দিয়েছে, তাদের অধিকাংশই এটি বুঝে করেনি। কারো উপরে অভিমান করা যেতে পারে, কারো কথায় দ্বিমত পোষণ করা যেতে পারে, তাই বলে স্বাধীন বাংলাদেশে নিজেকে রাজাকার ভাবার অবকাশ নাই।

আর যদি কেউ প্রকৃত রাজাকার বা জেনেটিক্যালি রাজাকার হন, তাহলে লড়াইটা খুব স্পষ্ট এবং কাউকেই এ ব্যাপারে ছাড় দেওয়া হবে না।

৬.
এই দেশটা আমাদের, কোন রাজাকারের নয়। এই দেশটা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে, ত্রিশ লক্ষাধিক শহীদ ও চার লক্ষাধিক মা-বোনের আত্মত্যাগের বিনময়ে অর্জিত। এখানে কোন রাজাকারের আস্ফালন মেনে নেওয়া হবে না। 

৭.
আমাদের সৌভাগ্য, আমাদের একজন শেখ হাসিনা আছেন। মায়ের কাছে সন্তানের মত, তাঁর কাছেও দেশের একজন নাগরিক হিসেবে অনেককিছু দাবি করা যায়। তাঁর মুখের ভাষা, শাসন ও সোহাগ, আচরণ সব কিছু বাংলার মাটি থেকে উঠে আসা। যে কারণে তাঁকে আমাদের দূরের কেউ মনে হয় না। কোভিডের সময়ে যখন তিনি বলেন, প্রয়োজনে বিদেশ থেকে ডাক্তার আনবেন তখন কিন্তু আমরা বুঝি, এটা তার মনের কথা নয়। 

তাঁর সাথে অনেকের রাজনৈতিক মতাদর্শের মিল নাও থাকতে পারে, তাঁর অনেক কথার সাথে অনেকে একমত নাও হতে পারেন, গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় এটাই স্বাভাবিক। তারপরও তাঁর সাথে রাজনীতির যৌক্তিক ভাষায় কথা বলা যায়, দাবি আদায়ের জন্য আন্দোলন করা যায়। 

৮.
অচিরেই চলমান কোটা আন্দোলনেরও গ্রহণযোগ্য সমাধান হবে। মাঝখান দিয়ে আমাদের লাভ হলো, আমরা কিছু নতুন মুখোশধারির সন্ধান পেলাম। আবারো প্রমাণিত হলো, ল্যাঞ্জা লুকিয়ে রাখা আসলেই কঠিন।


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

নব পরিচয়ে বাংলার রঘু ডাকাতরা

প্রকাশ: ০৩:১১ পিএম, ১৪ জুলাই, ২০২৪


Thumbnail

ডাকাতি বাংলা মুল্লুকে এক সময় একটি বড় পেশা ছিল। এনিয়ে লেখক খগেন্দ্রনাথ মিত্র গত শতকের ত্রিশের দশকে ‘বাংলার ডাকাত’ নামের একটি গ্রস্থ রচনা করে বেশ সুনাম কুড়িয়েছিলেন। ডাকাত ছাড়াও এই দেশে এক সময় সিঁদেল চোর, বাটপার, জোচ্চোর, চশমখোর শব্দগুলো বাংলা লৌকিক সাহিত্যে বেশ পরিচিত ছিল। খগেন মিত্রের ডাকাতরা কাঠের উঁচু পা যাকে বলা হতো রণপা লাগিয়ে কয়েক ক্রোশ দূরে গিয়ে ডাকাতি করে নিজ গ্রামে দ্রুত ফিরে আসতো। কোন কোন ডাকাত ডাকাতি করতে বের হওয়ার আগে মন্দিরে কালি পূজা দিতো যাতে সে তার কর্মকাণ্ডের সময় কোন প্রকারের বিপদের সম্মুখীন না হয়। সিঁদেল চোরেরা বাড়ির দাওয়ায় সুড়ঙ্গ (সিঁদ) কেটে ঢুকতো। বাড়ির কর্তা যদি আগে হতে টের পেতো তার ঘরে সিঁদেল চোর ঢুকছে তাহলে সে বাড়িতে রাখা একটি রামদা নিয়ে চোরের জন্য অপেক্ষা করতো। যেই চোর মাথা ঢুকালো এক কোপে মাথা ধর থেকে আলাদা। তখনকার দিনে চোরও কম চালাক ছিল না। তারা মাথা ঢুকানোর আগে একটি কালো পাতিল ঢুকিয়ে দিত। কোন কোন চোর বা ডাকাত সারা গায়ে তেল মেখে উলঙ্গ হয়ে বাড়িতে ঢুকতো যাতে কেউ ঝাপটে ধরলে সে সহজে ছাড়া পেয়ে যেতে পারে। বাংলা সাহিত্যে রঘু ডাকাত নামের এক ডাকাতের বেশ নামডাক ছিল। তাকে নিয়ে গবেষণা পর্যন্ত হয়েছে। গবেষকরা মনে করেন তার জন্ম অষ্টাদশ শতকে। রঘু ডাকাত একটি নৈতিক অবস্থান থেকে ডাকাতি করতো। সে জমিদারদের সোনা দানা লুট করে গরীব মানুষের মাঝে বিলিয়ে দিতো। যে দিন সে ডাকাতি করতে বের হতো তার আগে সে জমিদারকে খবর দিয়ে রাখতো। ইংরেজি সাহিত্যের রবিনহুডের কথা সকলে জানি। সে সাহেব ডাকাত ছিল। ধনীদের টাকা নিয়ে গরিবদের মাঝে বিলিয়ে দিতো। তাও প্রায় তিনশত বছর আগের কথা। আর আছে আরব্য রজনীর ‘আলিবাবা চল্লিশ চোরে’র কথা। ডাকাত আলিবাবা গরীবদের ধন সম্পদ লুট করতো না। সে ধনীর সম্পদ লুট করে গরীবদের মাঝে বিলিয়ে দিয়ে ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে। 

বাংলাদেশে এখন উল্লেখিত ডাকাতদের প্রাদুর্ভাব চলছে। তবে তাদের সাথে তাদের পূর্বসূরিদের তফাৎ হচ্ছে বাংলার নূতন ডাকাতরা জনগণ তথা রাষ্ট্রের ধনসম্পদ টাকা পয়সা ডাকাতি করে নিজেরা জমিদার বনে যায়, কারো কারো অবস্থাতো একটি ছোটখাট রাজ্যের সুলতানের মতো। স্বাধীন বাংলাদেশে নূতন অবয়বে এই ডাকাতদের যাত্রা শুরু হয়েছিল সিঁদেল চোরের মতো কারণ তখন ডাকাতি করার মতো মানুষের কাছে তেমন অর্থকরী বা সোনাদানা ছিল না। দেশ স্বাধীন হওয়ার পূর্ব মুহূর্তে তদানীন্তন পশ্চিম পাকিস্তানের শিল্পপতি আর ব্যবসায়ীরা তাদের অনেক কলকারখানা আর ছোট খাটো ব্যবসা এই দেশে ফেলে চলে গিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু সরকার আইন করে সেই সব প্রতিষ্ঠানকে সরকারের আয়ত্বে নিয়ে এসে সেখানে তত্ত্বাবধায়ক বসিয়েছিলেন। তত্বাবধায়করা  বেশীর ভাগই ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। বঙ্গবন্ধুর একটি বড় গুণ ছিল তিনি যখন দেখতেন তার কোন বিশ্বস্ত মানুষ তার দায়িত্বে অবহেলা করছেন বা অনিয়ম করছেন তাৎক্ষণিক ভাবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দ্বিধাবোধ করতেন না। নানা অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, রিলিফ চুরি ইত্যাদি অপরাধে তিনি ২৩ জন সংসদ সদস্যকে বহিষ্কার করে এক অনন্য নজির সৃষ্টি করেছিলেন। এদের মধ্যে দু’এক মন্ত্রীও ছিলেন । 

স্বাধীন বাংলাদেশের শুরুতে রিলিফের কম্বল, গম, চিনি বা তেল চুরি হতো। কালোবাজারি হতো। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস পত্র গুদামজাত করে বাজার কারসাজি করার চেষ্টা চলতো। ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বর মাসে এই সব চোরদের শায়েস্তা করার জন্য বঙ্গবন্ধু দেশ জরুরী আইন জারি করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে নির্দেশ দেন সকল চোর বাটপারদের গ্রেফতার করার জন্য। কে কোন পার্টি করে তা বিবেচ্য বিষয় ছিল না। স্বাধীনতার পর অনেকে নানা অজুহাতে অন্যের জায়গা জমি সম্পদ দখল করেছিল। বঙ্গবন্ধু যতটুকু সম্ভব তাদের জায়গা জমি উদ্ধার করে তাদের কাছে ফিরিয়ে দেন। পঁচাত্তর পরবর্তী কালে বদলে যাওয়া শুরু করে দেশের সার্বিক চিত্র। চোরের জায়গা দখল করে ডাকাত, সমাজের দুর্বৃত্তরা হয়ে উঠে সমাজপতি আর রাজনীতিবিদ। নূতন শ্লোগানের জন্ম হয়। যে মানুষটি হয় পতিতার দালাল ছিল অথবা পকেটমার তার নামে স্লোগান উঠে ‘অমুক ভাইয়ের চরিত্র ফুলের মতো পবিত্র’। তারপর একদিন সেই ‘পবিত্র’ দূর্বৃত্তটি হয়ে উঠে সবক্ষেত্রে মহা ক্ষমতাধর ব্যক্তি। কালে ক্রমে জন্ম হয় বেনজির আহমেদ, মতিউর রহমান, পিকে হালদার, মোশারফ হোসেন  আর আবিদ আলির মতো নব্য রঘু ডাকাত আর সুলতানদের। তফাৎ এই যুগের রঘু ডাকাতরা গরীব আর রাষ্ট্রের সম্পদ লুঠ করে বিদেশে নিজেদের আস্তানা গাড়েন আর বলে বেড়ান ‘বাংলাদেশে কি থাকা যায়? সন্তানের নিরাপত্তা নাই, লেখা পড়ার সুযোগ নাই, জীবনের নিরাপত্তা নাই আর ঢাকা শহরের যানজটের জন্য নড়াচড়া যায় না। চারিদিকে দূষিত বাতাস।’ 

বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবদ্দশায় যত বক্তৃতা বিবৃতি দিয়েছেন তার প্রায় প্রত্যেকটিতে রাষ্ট্রীয় সম্পদ চুরি আর চোরদের কথা বলেছেন। ১৯৭২ সালের ৭ জুন সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে এক শ্রমিক সমাবেশে বলেন ‘...মজুদদার, চোরাকারবারি আর চোরাচালানকারীরা হুঁশিয়ার হয়ে যাও। ..তাদের অনুরোধ করেছি, আবেদন করেছি, বুঝিয়েছি, অনেক বলেছি, একাজ করো না। আমার বিশ্বাস ছিল যে, তারা আমার কথা শুনবে। কিন্তু দেখছি “চোরা নাহি শুনে ধর্মের কাহিনী”।’ বঙ্গবন্ধুর সেই চোরারা আজ দেশ বিদেশে ইতোমধ্যে যশ আর খ্যাতি কুড়িয়ে বেশ বাহবা পেতে পাচ্ছেন। আর ধর্মের কাহিনী শুনবে কি তারাতো নিজেরাই এখন ধর্মের ফেরিওয়ালা যার উৎকৃষ্ট উদাহরণ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সাবেক গাড়ী চালক কোটিপতি আবিদ আলী। কি একটা নূরানি চেহারা। অকপটে স্বীকার করে বলেছেন চুরির টাকা আল্লাহর রাস্তায় কাজে লাগিয়েছি। সৃষ্টিকর্তা মর্ত্যে ধর্ম নাজিল করেছিলেন বিপথগামী বান্দাকে সুপথে আনার জন্য। সৃষ্টিকর্তা হয়তো এটি ধারণা করতে পারেন নি এই যুগে আবিদ আলীদের জন্ম হবে আর তারা পবিত্র ধর্মকে সাইনবোর্ড হিসেবে দুনিয়ার এমন কোন হারাম কাজ নেই যা তারা করবে না। ইদানীং যে সব নব্য রঘু ডাকাতদের আবির্ভাব হচ্ছে তাদের মধ্যে একটি বিষয়ের মিল আছে। তাদের সকলেরই বেশ লম্বা সুন্নতি দাঁড়ি আছে, কপালে সিজদার দাগ জ্বলজ্বল করছে আর প্রায় সকলেই  আলহাজ। ধর্মের এমন অপব্যবহার এই দেশে কেউ কখনো দেখেনি। বঙ্গবন্ধু একটা কথা প্রায় বলতেন ‘আমার শ্রমিক, খেটে খাওয়া মানুষ দুর্নীতি করে না করেন শিক্ষিত জনেরা’। বঙ্গবন্ধুর এই উক্তি এই যুগের রঘু ডাকাতরা অসত্য প্রমাণ করেছে। এক আবিদ আলীই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন তার পূর্বের কর্মক্ষেত্রে একজন ডেসপ্যাচ রাইডার পর্যন্ত কি ভাবে রঘু ডাকাত হয়ে উঠতে পারে। মালিক হতে পারে কোটি কোটি টাকার সম্পদের। বড়কর্তারাতো আছেনই। এক এগারোর পর অনেকেই ‘বনের রাজা ওসমান গনির’ নাম শুনে থাকবেন। ছিলেন একজন বনরক্ষক। দেশের বনবাদার উজাড় করে টাকাকড়ি যা কামিয়েছিলেন তা নিজের বাড়ীর চালের ড্রাম থেকে শুরু করে শোয়ার বালিশে রেখে নিজের বাড়ীকেই আলিবাবার মতো ধনসম্পদের গুহা বানিয়ে ফেলেছিলেন। যখন সব ধরা পড়লো তার সেই টাকা গোনাগুনতির জন্য ব্যাংক হতে টাকা গোনার মেশিন আনতে হয়েছিল। এখন তার নূতন সংস্করণ বন সংরক্ষক মোর্শারফ হোসেন। পুলিশের সাবেক আইজি বেনজীরের নজীর বিহীন কর্মকাণ্ডের পর এখন নানা স্তরের পুলিশ কর্মকর্তাদেরও নাম প্রকাশিত হচ্ছে। রাস্তায় ট্রাক থামিয়ে যখন একজন ট্রাফিক পুলিশ একশত টাকা সালামি নেয় সেটা হয় পকেট কাটা আর তাদের উদ্বর্তন কর্মকর্তারা যখন লক্ষ কোটি টাকার নীচে কথা বলেন না তখন তা হয় ডাকাতি। সেই পুরানো দিনের রঘু ডাকাতরা তাদের স্ত্রীদের তেমন একটা মর্যাদা দিতেন বলে জানা যায় না। বর্তমানের রঘু ডাকাতরা স্ত্রীদের প্রতি বেশ অনুগত কারণ তাদের সাথে তাদের ডাকাতির অংশ স্ত্রী সহ পরিবারের অন্য সদস্যদের অংশীদার করেন। একজনতো চালাকি করে নিজের নামে ব্যাংকে সাতশত হিসাব খুলেছিলেন। তা কি ভাবে সম্ভব সেই প্রশ্ন এখন অবান্তর কারণ এই দেশে রঘু ডাকাতের বারবাড়ন্ত শুরু হয়েছে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ কোন কোন সদস্যদের দিয়ে। অনেক ব্যাংক পরিচালক গ্রাহকের টাকাকে অনায়াসে নিজের টাকা মনে করে বিদেশে চালান করতে দ্বিধাবোধ করেন না। ডিজিটাল যুগে দেশে এত ব্যাংক কেন দরকার সেই প্রশ্নের মীমাংসা জরুরী হয়েছে ।

জনপ্রশাসন, অর্থ, ভূমি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা সহ খুব কম মন্ত্রণালয় আছে যেখানে এই সব নব্য রঘু ডাকাতদের বিচরণ নাই। কোন মন্ত্রণালয়ে বেশী দুর্নীতি হয় তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। এই সব মন্ত্রণালয়ের কিছু বিভাগ বা অধিদপ্তরের মধ্যে প্রতিযোগিতা হতে পারে। এর মধ্যে আছে এনবিআর, মাউসি, পুলিশ প্রশাসন, পরিবেশ ও বন অধিদপ্তর, সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত বিভিন্ন কমিটি। 

বর্ণিত নব্য রঘু ডাকাতদের সাথে এখন জন্ম হয়েছে আর এক শ্রেণীর উঠতি ডাকাত। অভিযোগের তীরটা কোন কোন মন্ত্রীর এপিএস’র দিকে। এরা মন্ত্রী নিজের পছন্দের লোক হয়। এপিএস হওয়ার আগে সাধারণত এরা মন্ত্রীর টেণ্ডল অর্থাৎ তাদের বস মন্ত্রী হওয়ার আগে গুরুর ফায় ফরমায়েশ খাটে। গুরু মন্ত্রী হয়ে গেলে তার পদোন্নতি হয়ে সে এপিএস হয়ে যায়। তারপর তার হাতে চলে আসে টাকা বানানোর পরশ পাথর। মন্ত্রীর হাতে ফাইল যাওয়ার আগে তাকে খুশি করতে হয়। বাকিটা সহজে অনুমেয়। একজনের একটি নিয়োগের ফাইল প্রায় তিন বছর আটকে ছিল একটি মন্ত্রণালয়ে। সেই নিয়োগ না হওয়াতে সেই ব্যক্তি এখন দেশ ছাড়ছেন। অনেক এপিএস আছেন যাদের আগে রিক্সায় চড়ার পয়সা ছিল না। এখন তারা ঢাকা শহরেই একাধিক বাড়ী আর গাড়ীর মালিক। এদের দিকে তাকানোর সময় দুর্নীতি দমন কমিশনের তেমন একটা সময় নেই কারণ তারা নব্য রঘু ডাকাতদের নিয়ে ব্যস্ত যদিও মানুষ জানে এই যুগের রঘু ডাকাতদের তেমন কিছু একটা হবে না। হবে কি ভাবে তাদের সম্পদের প্রায় সকলটাইতো এই দেশের ব্যাংকের মাধ্যমেই দেশের বাইরে পাচার করে দিয়েছেন? সাধারণত ব্যাংকে একটি পঞ্চাশ হাজার টাকার চেক দিলে জাতীয় পরিচয় পত্র চায় আবার অস্বাভাবিক লেনদেন হলে বাংলাদেশ ব্যাংকে অবহিত করে। এখন প্রশ্ন বেনজীর কি ভাবে হাজার কোটি টাকা ব্যাংক থেকে তুলে বিদেশে পাচার করে দিয়েছে। তার এই অপকর্মের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকও কি জড়িত ছিল? এই অনুসন্ধান করার দায়িত্ব কার? 

ইদানিং এই সব রঘু ডাকাতদের কর্মকাণ্ড দেখে মনে হতে পারে দেশে বুঝি রঘু ডাকাতরা কিলবিল করছে? না তেমনটি না। এখনো দেশে সৎ মানুষ আছে তবে তাদের কদচিৎ সরকার  কাজে লাগায়। লাগালে তারা কি অসাধ্য সাধন  করতে পারেন পদ্মাসেতু কার জ্বলন্ত প্রমান। বঙ্গবন্ধু সরকার গঠন করার শুরুতেই তার আস্থাভাজন সৎ ও যোগ্য মানুষদের বেছে নিয়েছিলেন যাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে তিনি একটি যুদ্ধবিধ্বস্থ দেশকে শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে হাঁটতে শিখিয়েছিলেন। তাঁর সাথে তিনি পেয়েছিলেন জাতীয় চার নেতাকে। পরিকল্পনা কমিশনকে সাজিয়েছিলেন এমন সব মানুষ দিয়ে যারা একটি যুদ্ধবিধ্বস্থ দেশকে পুনর্গঠন করতে তাঁকে কার্যকর ভাবে সহায়তা করেছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশের শুরুতে বেশীর ভাগ পুলিশের পায়ে কোন প্রকার জুতা ছিল না। এমন একটি চিত্র বিশ্বখ্যাত মাসিক পত্রিকা ‘ন্যাসন্যাল জিওগ্রাফিক্স’ এর প্রচ্ছদে ছাপা হয়েছিল। যে মুহূর্তে বঙ্গবন্ধুর নীতি নির্ধারণী বলয়ে খোন্দকার মোশতাক, তাহের উদ্দিন ঠাকুর আর মাহবুব আলম চাষীরা ঢুকে পড়েছিলেন সেই মুহূর্তে জাতির পিতার দুঃসময় শুরু হয়। দুঃখের বিষয় হচ্ছে পিতার মতো কন্যার ভাগ্যটা তেমন নয়। এখনতো যে দিকেই দৃষ্টি যায় সে দিকেই মোশতাক, চাষী আর ঠাকুরের বংশধররা। কারো নাম বেনজির, কেউ বা মতিউর অথবা আবিদ আলী বা মোশারফ হোসেন। আগে মানুষ বলতো কোর্ট কাচারি আর থানার দেয়ালের ইটও পয়সা খায়। এখন সরকারের কোন অফিস তা খায় না তা গবেষণার বিষয় বটে। শুধু পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সাম্প্রতিক সব নাটকীয় ঘটনা বিচার করলে দেশের অন্যান্য দপ্তরের চেহারা কেমন হতে পারে তা অনুমান করা যায়। এই সব নব্য রঘু ডাকাতরা যখন মিডিয়ার কল্যাণে জনসম্মুখে চলে আসে তখন সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষ তাকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে শুধু বদলি করা হয় কারণ এদের খুটির জোর বেশ শক্ত। এমন ব্যবস্থা কোন শাস্তি হতে পারে না। সম্প্রতি একটি শিক্ষা বোর্ডের একজন শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নানা ধরণের দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত হচ্ছে ঠিক তখন তাকে একই পদমর্যাদায় একই জেলায় অন্য আর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা হয় কারণ তার খুটির জোর বেশ শক্ত । 

সব শেষে দেশের প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের একটি বক্তব্য দিতে চাই। গত ৮ই জুলাই তিনি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইন্সটিউটে এক সেমিনারে বক্তব্য দিতে গিয়ে বলেন ‘উন্নয়নের সুফল দুর্নীতির চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে’। তাঁর এই বক্তব্যেও সাথে দ্বিমত করার  কোন কারণ নেই। তবে এই যুগের রঘু ডাকাতদের কি ভাবে দমন করা যাবে তা নিয় সরকারকেই গভীর ভাবে চিন্তা করতে হবে। 


সময়-অসময়   রঘু ডাকাত   দুর্নীতি  


মন্তব্য করুন


বিজ্ঞাপন