এডিটর’স মাইন্ড

রেডিমেড প্রার্থী, শর্টকাটে এমপি

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ২৮ জানুয়ারী, ২০২৩


Thumbnail

ডিসেম্বর, ১৯৯০। সবে এরশাদ সরকারের পতন ঘটেছে। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়েছে। নির্বাচনী হাওয়া বইছে দেশজুড়ে। সঙ্গে তিন জোটের রূপরেখা বাস্তবায়নের তাগিদ।স্বৈরাচারের দালালদের প্রতিহত করার ডাক দিয়েছে সম্মিলিত ছাত্রঐক্য। এর মধ্যেই এক বিকালে দুই সচিব ৩২ নম্বরেবঙ্গবন্ধু ভবনেহাজির হলেন। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তারা দেখা করতে চান। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী নির্বাচন, তিন জোটের কার্যক্রম ইত্যাদি নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। তিনি আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ এক নেতাকে দায়িত্ব দিলেন ওই দুই আমলার কথা শুনতে। আমলা মহলে জনপ্রিয় এবং প্রভাবশালী ওই নেতা কেরামত আলী এবং এম কে আনোয়ারের সঙ্গে কথা বললেন। দুই আমলা জানালেন তারা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চান। এলাকায় তাদের বিপুল জনপ্রিয়তা রয়েছে। এখন দরকার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন। আওয়ামী লীগের ওই দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা এই দুই আমলার বক্তব্য দলীয় প্রধানকে জানালেন। কিন্তু শেখ হাসিনা তাদের প্রস্তাব নাকচ করে দিলেন। দুটি কারণে শেখ হাসিনা এম কে আনোয়ার এবং কেরামত আলীকে ফিরিয়ে দিলেন। প্রথমত, এই দুজনই এরশাদের দোসর হিসেবে কালো তালিকাভুক্ত। তিন জোটের রূপরেখায় সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, এরশাদের সহযোগী কাউকে তিন জোটের কোনো দল আশ্রয় দেবে না। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী তিন জোটের রূপরেখার প্রতি সম্মান দেখালেন। দ্বিতীয়ত, আওয়ামী লীগ একটি রাজনৈতিক সংগঠন। রাজনৈতিক সংগঠনে দলীয় মনোনয়ন প্রাপ্তি দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ব্যাপার। রাজনীতিতে মনোনয়ন প্রাপ্তির কোনো শর্টকাট পথ নেই। হুট করে এসে কেউ মনোনয়ন পান না। দুই আমলার জন্য আওয়ামী লীগের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। কিন্তু ঘটনাচক্রে সে সময় বিএনপির একজন প্রভাবশালী নেতা এসেছিলেন ধানমন্ডি ৩২ নম্বরেবঙ্গবন্ধু ভবনে তিন জোটের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠকে যোগ দিতে। বৈঠক শেষে পেলেন ওই দুই আমলাকে। তাদের আগ্রহের কথা শুনে তাদের নিয়ে গেলেন বিএনপি কার্যালয়ে। বেগম জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করালেন। তারা পরদিন সরকারি চাকরি থেকে পদত্যাগ করলেন। আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দিলেন। নির্বাচনের জন্য বিএনপির মনোনয়ন পেতেও কষ্ট হলো না এম কে আনোয়ার এবং কেরামত আলীর। বিএনপির রেডিমেড প্রার্থী হিসেবে তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেন এবং বিজয়ী হলেন।৯১-এর ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি সবাইকে চমকে দিয়ে জাতীয় সংসদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল। জামায়াতের সহযোগিতায় সরকার গঠন করল বিএনপি। এম কে আনোয়ার এবং কেরামত আলী দুজনই বিএনপি সরকারের মন্ত্রীও হলেন। তাদের মধ্যে এম কে আনোয়ার মৃত্যু পর্যন্ত বিএনপির প্রভাবশালী নেতা ছিলেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শর্টকাটে এমপি এবং মন্ত্রী হওয়ার এটি একটি ক্ল্যাসিক উদাহরণ। আদর্শ চর্চা নেই। রাজনৈতিক চর্চা নেই। দলের প্রতি আনুগত্য নেই। দলের লক্ষ্য এবং আদর্শ সম্পর্কে জানাশোনা নেই। আলাদীনের চেরাগের মতো এক লহমায় এমপি, মন্ত্রী হয়ে গেলেন। এরশাদ জামানায় প্রতাপশালী দুই আমলা রাষ্ট্রের অর্থ খরচ করে এলাকায় উন্নতি করেছিলেন। রেডিমেড প্রার্থীও হয়েছিলেন।৯১ সালের নির্বাচনে এম কে আনোয়ার এবং কেরামত আলীর কেরামতি রাজনীতিরশর্টকাটপথ উন্মোচন করে দেয়। অবশ্য৭৫-এর পর থেকে রাজনীতিতে শর্টকাটে এমপি হওয়ার হিড়িক শুরু হয়। জিয়া বিএনপি গঠন করেন বিভিন্ন দল থেকে ভাড়াটে লোক দিয়ে। এখন এই প্রবণতা সর্বব্যাপী। শর্টকাটে এমপি হওয়ার প্রবণতা যেমন ব্যক্তিদের মধ্যে বাড়ছে তেমনি রাজনৈতিক দলগুলোরও দলের দীর্ঘদিনের ত্যাগী, পরীক্ষিতদের বাদ দিয়েরেডিমেডপ্রার্থী খোঁজা এখন স্বাভাবিক ব্যাপার।রেডিমেডপ্রার্থী অনেকটাই রেডিমেড জামাকাপড়ের মতো। আপনি দোকানে গেলেন গায়ে চরিয়ে বেরুলেন। আপনি দলে ভেড়ালেন, তিনি টাকার জোরে এমপি হয়ে গেলেন।৯১-এর ফলাফল বিপর্যয়ের পর আওয়ামী লীগ তার প্রার্থী মনোনয়নের রক্ষণশীল অবস্থা থেকে সরে আসে।৯৬-এর নির্বাচন ছিল আওয়ামী লীগের অস্তিত্বের চ্যালেঞ্জ। চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আওয়ামী লীগও রেডিমেড এমপি প্রার্থীর খোঁজ শুরু করে। বিএনপি আগে থেকেই রেডিমেড প্রার্থীনির্ভর দল। প্রধান দুটি দল যখন রেডিমেড প্রার্থীর দিকে ঝুঁকতে থাকে, তখন শর্টকাটে এমপি হওয়াটা স্বাভাবিক রাজনৈতিক চর্চা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ব্যবসায়ী, সাবেক আমলা, অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা এমনকি আদম ব্যবসায়ী শর্টকাটে এমপি হওয়ার দৌড়ে শরিক হন। শর্টকাটে মনোনয়ন ইচ্ছুকদের জায়গা দিতে গিয়ে আওয়ামী লীগ৯৬ সালের নির্বাচনে প্রয়াত অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন, মোজাফফর হোসেন পল্টুুসহ বহু মাঠের রাজনীতিবিদকে মনোনয়নবঞ্চিত করে। শর্টকাটে এমপি হওয়ার ফর্মুলা কী? আপনি বিপুল বিত্তের মালিক হলেন (বৈধ বা অবৈধ পথে) এলাকায় গিয়ে মসজিদ, মাদরাসা বানালেন। মানুষের বিয়েতে, অসুখে দান-খয়রাত করলেন। কোরবানির ঈদে এলাকায় ১০০ গরু কোরবানি দিয়ে সবাইকে চমকে দিলেন। ব্যস, কিছু মানুষ আপনার হয়ে যাবে। আওয়ামী লীগ, বিএনপির কিছু লোকজন প্রকাশ্যে গোপনে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করবে। তাদের আপনি কচকচে নতুন ঘ্রাণযুক্ত টাকা দেবেন। শর্টকাটে এমপি হওয়ার এটাই একমাত্র পথ নয়। আপনি সরকারি কর্মকর্তা। হঠাৎ দেখলেন, এলাকার লোকজন আপনার কাছে আসেন। এলাকায় রাস্তা নেই, ব্রিজ নেই। স্কুল এমপিওভুক্ত করতে হবে। মসজিদের ছাদ ঢালাই করতে হবে। আর এলাকার বেকারদের চাকরির ব্যবস্থা করে দিলে তো আপনাকে নিয়ে ধন্য ধন্য পড়ে যাবে। একজন আমলা যখন সচিব হন, তখন তার বিস্তর ক্ষমতা। আমলে তো সচিবদের ক্ষমতা আকাশ স্পর্শ করেছে। ২০২০ সালে করোনার প্রকোপ শুরু হলে জেলার দায়িত্ব দেওয়া হয় সচিবদের। জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে জেলার সর্বময় ক্ষমতার মালিক হন সচিবরা। এমপি, মন্ত্রীদের পাত্তা নেই। আমলারাই জেলার সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এলাকায় তাদের কদর বাড়ছে। সুবিধাবাদী চাটুকাররা ভিড় জমাচ্ছে। তারা পরামর্শ দিচ্ছেন, আপনি তো সংসদ সদস্যের চেয়ে জ্ঞানী, বিচক্ষণ। আপনি এলাকার এমপি হলে তো এই এলাকাই পাল্টে যেত। জনগণ আপনাকেই চায়। চারপাশে চাটুকার পরিবেষ্টিত আমলারাও খুশিতে গদগদ। ভাবলেন তাই তো। এমপি এলাকায় কী করছেন। রাস্তা বানিয়ে দিলাম আমি। কাবিখার তালিকা তৈরি করছি আমি। আশ্রয়ণের ঘর কারা পাবে তার সিদ্ধান্ত আমার ওপর ন্যস্ত। তিনি হয়ে গেলেন আওয়ামী লীগের চেয়ে বড় আওয়ামী লীগার। শর্টকাটে এমপি হওয়ার খায়েশ তাকে পেয়ে বসল। আগে শর্টকাটে এমপি হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে গেছেন ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীদের সংখ্যা এখন জাতীয় সংসদে ৫০ ভাগের বেশি। এদের বেশির ভাগেরই রাজনীতির অতীত অভিজ্ঞতা নেই। ব্যবসা করছেন। ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়ে নানা ফাঁকফোকর দিয়ে পরিশোধ করছেন না। আবার ঋণখেলাপিও হচ্ছেন না। তারা এলাকায় নিজস্ব ভাড়াটে বাহিনী তৈরি করেছেন।মাই ম্যানদের দিয়ে আওয়ামী লীগের মধ্যেই আরেক আওয়ামী লীগ বানিয়েছেন। ব্যবসায়ীদের মধ্যে যারা শর্টকাটে এমপি হয়েছেন বা হওয়ার মিছিলে আছেন, তাদের এক ধরনের ব্যবসায়িকমতলবআছে। এমপি বা মন্ত্রী হলে তার ব্যবসা বাগাতে সুবিধা হবে। সচিবালয়ে দেনদরবার সহজ হবে। ঘাটে ঘাটে ঘুষ দিতে হবে না। টেন্ডার পেতে সুবিধা হবে। কাজেই ব্যবসায়ীদের জন্য নির্বাচন ভালো বিনিয়োগ।৭৫-এর পর থেকে ব্যবসায়ীরা তাই রাজনৈতিক খাতে বিনিয়োগে ব্যাপক উৎসাহী। তাদের টাকার জোয়ারে জাতীয় সংসদে রাজনীতিবিদরা রীতিমতো কোণঠাসা। প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীদের শর্টকাটে এমপি হওয়ার কারিশমায় মুগ্ধ অনেক উঠতি রাজনীতিবিদও প্রলুব্ধ হয়েছেন। তারা সততা, আদর্শবাদিতা, ত্যাগ ইত্যাদি সেলফে উঠিয়ে রেখেছেন। মনোনয়ন পেতে হলে টাকা লাগবে। নির্বাচন করতে টাকা লাগবে। টাকা বানানোর উপায় কী? টেন্ডার বাণিজ্য, নিয়োগ বাণিজ্য ইত্যাদি। রাজনীতিবিদ পরিচয়ের আড়ালে তারা লুটপাটের মিশনে নামছেন কোমর কষে। টাকা ছাড়া এমপি হওয়া যাবে না। তাই শর্টকাটে এমপি হওয়ার জন্য তারা শর্টকাটে বড়লোক হওয়ার দৌড়ে। এদের সংখ্যাও জাতীয় সংসদে কম না। সে তুলনায় জাতীয় সংসদে আমলাদের উপস্থিতি নগণ্য। নিয়ে আমলা মহলে কারও কারও অন্তহীন দুঃখ। চাকরিতে থাকতে প্রচণ্ড ক্ষমতাবান। চাকরির মেয়াদ শেষ হলেই আমলাদের ছোটাছুটি শুরু হয়। কেউ চেষ্টা করেন বয়স শেষ হওয়ার পর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেতে। কেউ চান কোনো কমিশন বা সংস্থার অবসরোত্তর চাকরি। কারও প্রত্যাশা নিদেনপক্ষে কোনো ব্যাংকের চেয়ারম্যান হওয়া। এভাবে আমলারা প্রায় সব প্রতিষ্ঠান এবং পদ দখল করে ফেলেছেন। জাতীয় সংসদ এখনো তাদের নিয়ন্ত্রণে আসেনি। এর প্রধান কারণ অবশ্য আমলাদের ব্যর্থতা নয়। এখন যেভাবে বর্ষার বিলের মাছের মতো ক্ষমতার চারপাশে আমলারা কিলবিল করেন, তাতে সংসদ ভবনে প্রবেশ তাদের মোটেও কঠিন কোনো কাজ নয়। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ভালো প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারেন আমাদের করিৎকর্মা আমলারা। কিন্তু বাধা হয়ে আছে একটি আইনে। গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ ১৯৭২। এই আইনের ১২() () ধারায় বলা হয়েছে, ‘তবে শর্ত থাকে যে কোনো ব্যক্তি সদস্য হিসেবে (সংসদ সদস্য) নির্বাচিত হওয়ার বা থাকার যোগ্য হবেন না, যদি-

() তিনি প্রজাতন্ত্রের বা সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষের বা প্রতিরক্ষা কর্ম বিভাগে কোনো চাকরি থেকে পদত্যাগ করেছেন বা অবসরে গেছেন এবং তার পদত্যাগ এবং অবসরে যাওয়ার পর তিন বছর অতিবাহিত না হয়।বাসি ফুলের যেমন কদর থাকে না, তেমনি অবসরের তিন বছর অতিবাহিত হলে আমলাদেরকৃত্রিম ক্ষমতানিঃশেষ হয়ে যায়। তিন বছর অতিবাহিত হওয়ার পর রাজনীতির মাঠে যারা টিকে থাকেন, তারা নিজস্ব শক্তিতে অস্তিত্ব বজায় রাখেন। সময় তাদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এতে হঠাৎ গজিয়ে ওঠা আমলা থেকে নেতারা ঝরে পড়েন। এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আমলারাই (সামরিক এবং বেসামরিক) ধারাটিকে চ্যালেঞ্জ করতে চাচ্ছেন। গত ১৯ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার এই ধারাকে চ্যালেঞ্জ করে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাই কোর্ট বিভাগে একটি রিট পিটিশন করা হয়েছে। রিট পিটিশনের পরিপ্রেক্ষিতে, সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের তিন বছর পর সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিধান কেন সংবিধান পরিপন্থী নয়, হাই কোর্ট তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন। বিচারপতি জাফর আহমেদ বিচারপতি মো. বশির উল্লার সমন্বয়ে গঠিত হাই কোর্ট বেঞ্চ এই রুল জারি করেন। গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশের ১২ () () চ্যালেঞ্জ করে রিট আবেদন করেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শামীম কামাল। কিছু দিন ধরেই আমলাদের পক্ষ থেকে ধারাটি বাতিলের চাপ ছিল। প্রথমে কিছু আমলা ধারাটি বাতিল করার জন্য সরকারকে প্ররোচিত করতে চেষ্টা করে। কিন্তু সরকার এখন পর্যন্ত স্বপ্রণোদিত হয়ে আইন পরিবর্তনের কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এর আগেও কয়েকজন আমলা আইনটি বাতিলের জন্য আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। কিন্তু আদালতে রিট আবেদন করতে হলে আবেদনকারী সংক্ষুব্ধ হতে হবে- এই যুক্তিতে আবেদন আমলে নেয়নি হাই কোর্ট। এখন রিট আবেদনটি আদালতের বিচারাধীন বিষয়। বিচারকগণ স্বীয় বুদ্ধি এবং আইনগত দিক বিচার-বিশ্লেষণ করে সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। তবে এই আইনটির পক্ষে-বিপক্ষে দুই ধরনের যুক্তি আছে। একজন আমলা অবসরে যাওয়ার পর প্রথম এক বছর থাকেন অবসরোত্তর ছুটিতে। সময় তিনি কাজ করেন না বটে কিন্তু বেতন-ভাতাদি ভোগ করেন। পরবর্তী দুই বছরও তার গায়ে ক্ষমতার উত্তাপ লেগে থাকে। নির্বাচনী মাঠে তিনি বাড়তি সুবিধা পেতে পারেন, এরকম বিবেচনা থেকে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য তিন বছর নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। যারা এর পক্ষে তারা মনে করেন, এই বিধান না থাকলে নির্বাচনের মাঠে আমলা প্রার্থীরা বাড়তি সুবিধা পাবেন। রাজনৈতিক দল প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বিবেচনা করে নির্বাচনে কারা বেশি দাপট দেখাতে পারবেন। সদ্য অবসরে যাওয়া একজন আমলা নির্বাচন পরিচালনায় মাঠ প্রশাসনের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারবেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তার প্রতি পক্ষপাত দেখাবে। ফলে রাজনৈতিক দলগুলো আমলাদের মনোনয়ন দেওয়ার ব্যাপারে উৎসাহী হবে। তারাই হবে সবচেয়ে চাহিদাসম্পন্ন রেডিমেড প্রার্থী, যারা শর্টকাটে এমপি হতে পারবে।

আবার এর বিপক্ষের যুক্তিও উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। সংবিধান অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের জন্য আইন সমান। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।অবসরের পর একজন সরকারি কর্মকর্তা এবং কর্মচারী আর ১০ জন সাধারণ নাগরিকের মতোই। কাজেই তাকে নির্বাচনে অংশগ্রহণে বাধা দেওয়া সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন।

পক্ষে-বিপক্ষে এরকম আরও যুক্তি আছে। কিন্তু আমি মনে করি, আমলা, ব্যবসায়ী, লুটেরা, কালো টাকার মালিকদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা না করার সিদ্ধান্তটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অঙ্গীকার। ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ।৭৫-এর পর জিয়া ক্ষমতা দখল করে বলেছিলেন, তিনি রাজনীতিডিফিকাল্টকরে দেবেন। সত্যি সত্যি দেশে রাজনীতি, রাজনীতিবিদদের জন্য কঠিন হয়ে গেছে। সংসদ সদস্য হওয়ার মিছিলে ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছেন সত্যিকারের রাজনীতিবিদরা। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো যে কোনো ধরনের নির্বাচনে জয়ী হতে চায়। আর জয়ী হওয়ার জন্য তারা রেডিমেড প্রার্থী খোঁজে। আবার বিপুল অবৈধ বিত্তকে আরও স্ফীত করতে এবং তাকে নিরাপদ রাখতে শর্টকাটে এমপি হওয়ার মিছিলও বড় হচ্ছে। লক্ষ্মীপুর- আসনের সাবেক এমপি মোহাম্মদ শহিদ ইসলাম পাপুলের কথা মনে আছে? টাকার জোরে উড়ে এসে এমপি হয়ে গিয়েছিলেন। স্ত্রীকেও টাকা দিয়ে মহিলা কোটায় সংসদ সদস্য বানিয়ে ছিলেন। অনেক পাপুলই এখন নির্বাচন করে দায়মুক্তি অর্জন করতে চায়। পরিস্থিতির মধ্যে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তারাও যদি এমপি হওয়ার প্রতিযোগিতায় নামেন তাহলে সত্যিকারের রাজনীতিবিদদের জন্য রাজনীতি আরও কঠিন হয়ে যাবে। দেশের জন্য অবদান রাখার অনেক উপায় আছে। যে যেখানে যে অবস্থানে আছেন সেখান থেকেই দেশের উন্নয়নে অবদান রাখা যায়। একজন ব্যবসায়ী দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখবেন। এটাই তার পবিত্র কাজ। কেন তাকে এমপি হতে হবে? একজন সরকারি কর্মকর্তা সততা, নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেই দেশকে এগিয়ে নিতে পারেন। জন্য তার এমপি হওয়ার দরকার নেই। সমাজে প্রত্যেক পেশার নাগরিকের আলাদা আলাদা অবস্থান, ভূমিকা এবং দায়িত্ব আছে। ব্যবসায়ী কিংবা আমলাদের যেমন রাজনীতির মাঠ দখল শুভ লক্ষণ নয়, তেমনি রাজনীতিবিদদেরও ব্যবসায়ী হওয়াটা উচিত নয়। দেশের সবাই যদি এমপি-মন্ত্রী হতে চান, তাহলে ভারসাম্য নষ্ট হবে। যে ভারসাম্যহীতা এখনই লক্ষ্য করা যাচ্ছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী রাজনীতিবিদদের কাছে রাজনীতি ফিরিয়ে আনার কিছু উদ্যোগ নিয়েছেন। একাধিক উপনির্বাচনে তিনি দলের ত্যাগী পরীক্ষিত রাজনীতিবিদদের মনোনয়ন দিয়ে একটি বার্তা দিয়েছেন। সংসদীয় দলের সভাতেও আগামী নির্বাচনে দলের পরীক্ষিতদের সামনে আনার প্রত্যয় ঘোষণা করেছেন। কিন্তু ঝুঁকিবিহীন, গুরুত্বহীন উপনির্বাচনে তিনি এমনটা করতে পারছেন বটে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিপক্ষ যখন রেডিমেড প্রার্থী খুঁজবে, তখন আওয়ামী লীগ কি শর্টকাটে এমপি হতে ইচ্ছুকদের উপেক্ষা করতে পারবে? ২০১৮ নির্বাচনে বিএনপিতে দেখা গেল রেডিমেড প্রার্থীর হিড়িক। এহছানুল হক মিলনের মতো জাতীয়ভাবে পরিচিত নেতাকে বসিয়ে টাকাওয়ালা রেডিমেড প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়ে বিএনপি তার আসল রাজনীতি প্রকাশ করেছিল। আগামী নির্বাচনে বিএনপিতে যে রেডিমেড প্রার্থীর হিড়িক পড়বে তা সহজেই অনুমান করা যায়। আওয়ামী লীগেও অনেক আসনে পরিবর্তনের তাগিদ আছে। ব্যক্তিরা অগ্রাধিকার পাবেন নাকি শর্টকাটে এমপি বানাতে আওয়ামী লীগও রেডিমেড প্রার্থী খুঁজবে?

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে নানা সংশয়ের কথা বলা হয়। বিএনপি নির্বাচনে আসবে কি না। অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে কি না। কিন্তু আমি মনে করি, আগামী নির্বাচন রাজনীতির জন্য এক অগ্নিপরীক্ষা। শর্টকাটে রেডিমেড এমপিদের হাতে যেন জাতীয় সংসদ জিম্মি না হয়, সেটি এখন এক বড় চ্যালেঞ্জ। রাজনীতি রাজনীতিবিদের হাতে থাকবে কি না, তা আগামী নির্বাচনের এক বড় পরীক্ষা।

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত
poriprekkhit@yahoo.com



মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

আনার, আজিজ, বেনজীর: কীসের ইঙ্গিত

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ২৭ মে, ২০২৪


Thumbnail

এক.

তিনজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে নিয়ে সপ্তাহজুড়ে তোলপাড় দেশ। একজন জনপ্রতিনিধি। একজন সাবেক সেনাপ্রধান। তৃতীয় ব্যক্তি সাবেক পুলিশপ্রধান। ভিন্ন ভিন্ন কারণে এবং ঘটনায় তারা আলোচনায়। তিন ঘটনার প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ আলাদা। কিন্তু তিন ঘটনায় এক অদ্ভুত মিল খুঁজে পাওয়া যায়। গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি ও অনিয়ম। একজন জীবন দিয়ে তার অন্ধকার জগতের দরজা খুলে দিয়েছেন। একজন ক্ষমতার অপব্যবহারের জন্য মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েছেন। তৃতীয়জনের স্থাবর সম্পত্তি জব্দ করা হয়েছে দুর্নীতির অভিযোগে। এ তিনটি ঘটনার পর একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—জনগণের সেবার দায়িত্ব কারা পাচ্ছেন? দুর্নীতিবাজরা, চোরাকারবারি, ক্ষমতা অপব্যবহারকারীরা কীভাবে জনপ্রতিনিধি হচ্ছেন, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাচ্ছেন? এ ধরনের ব্যক্তিদের হাতে জনগণ কতটা নিরাপদ?

দুই.

প্রথমেই জনপ্রতিনিধি প্রসঙ্গে খানিকটা আলোকপাত করা যাক। ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম আনারকে কলকাতায় নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। গত বুধবার এ খবরটি নিশ্চিত করে কলকাতা পুলিশ। গত ১২ মে তিনি চিকিৎসার জন্য ভারতে যান। ১৮ মে থেকে তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। আনার হত্যাকাণ্ডের পর গণমাধ্যমে এখন পর্যন্ত যেসব খবর প্রকাশিত হয়েছে, তা লোমহর্ষক। হিন্দি সিনেমার মতো। এ হত্যাকাণ্ডের পর চোরাচালানের ‘আন্ডারওয়ার্ল্ডে’র চাঞ্চল্যকর সব খবর প্রকাশিত হচ্ছে। ২৪ মে ‘কালবেলা’র খবরে বলা হয়েছে, ‘চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে রয়েছে স্বর্ণ চোরাচালানের ২০০ কোটি টাকা নিয়ে দ্বন্দ্ব। এ ছাড়া সীমান্তকেন্দ্রিক চোরাচালানের রুট নিয়ন্ত্রণও খুনের আরেক কারণ হিসেবে কাজ করেছে...।’ আনার হত্যাকাণ্ড নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন সংস্থা তদন্ত করছে। বাংলাদেশে ও ভারতে সন্দেহজনক ব্যক্তিরা আটক হয়েছেন। নিশ্চয়ই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উন্মোচিত হবে শিগগির। তিনবারের সংসদ সদস্য আনারের মৃত্যুর পর তার জীবনের অন্ধকার অধ্যায় সামনে এসেছে। সন্দেহ নেই, প্রয়াত এ সংসদ সদস্য অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন। তার মৃত্যুর পর এলাকার জনগণের মধ্যে যে আবেগ এবং শোক দেখা গেছে, তা অভূতপূর্ব। কিন্তু মৃত্যুর পর জানা গেল তিনি চোরাচালান চক্রের একজন ‘গডফাদার’ ছিলেন। ওই এলাকার চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ করতেন এই সংসদ সদস্য। এটি যে কোনো গোপন বিষয়, তা নয়। ওপেন সিক্রেট। সবাই জানতেন। আওয়ামী লীগেও নিশ্চয়ই বিষয়টি অজানা নয়। সবকিছু জেনেশুনে একজন চোরাকারবারিকে কীভাবে তিন-তিনবার জনপ্রতিনিধি হিসেবে আওয়ামী লীগ মনোনয়ন দিল? ২০০৯ সাল থেকে টানা ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ এর মধ্যে ২০১৪ এবং এ বছরের ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি অংশগ্রহণই করেনি। তাই এমনটি বলার কোনো সুযোগ নেই যে, জেতার জন্য ‘বিতর্কিত’ ব্যক্তিকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। কৌশলগত কারণে আপস করতে হয়েছে। এসব নির্বাচনে সৎ, পরিচ্ছন্ন মানুষকে সামনে আনার সুযোগ পেয়েছে আওয়ামী লীগ। দলের ত্যাগী, পরীক্ষিতদের মনোনয়ন দিয়ে রাজনীতিকে শুদ্ধ করার সুযোগ পেয়েছে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দলটি। বিভিন্ন স্থানে এরকম করাও হয়েছে। তাহলে কেন সর্বহারা রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত একজন চোরাকারবারিকে বারবার মনোনয়ন দেওয়া হলো? কার স্বার্থে এ ধরনের বিতর্কিত, অন্ধকার জগতের লোকজনকে জনপ্রতিনিধি বানানো হয়? আনারের দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যুর পর একটি বিষয় সামনে এসেছে, আমাদের জনপ্রতিনিধি কারা হচ্ছেন? কারা আমাদের ‘ভাগ্যবিধাতা’ হয়ে সংসদে যাচ্ছেন। এর আগেও একজন আদম ব্যবসায়ীকে সংসদে আনা হয়েছিল। বিদেশে তিনি গ্রেপ্তার হন। পরে জানা যায়, আওয়ামী লীগের প্রয়াত এক নেতাকে বিপুল অর্থ দিয়ে তিনি ‘স্বতন্ত্র’ভাবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। স্ত্রীকেও টাকার দাপটে সংসদ সদস্য বানিয়েছিলেন। আমরা প্রায়ই বলি, জাতীয় সংসদ ব্যবসায়ীদের দখলে। রাজনীতিবিদদের হাতে রাজনীতি নেই। কিন্তু রাজনীতি এখন কি ক্রমশ কালো টাকার মালিক, অন্ধকার জগতের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে? ভবিষ্যতের রাজনীতি কি মাফিয়ারা নিয়ন্ত্রণ করবে?

তিন.

জেনারেল আজিজ আহমেদ সাবেক সেনাপ্রধান। তিন বছর সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ পদে দায়িত্ব পালনের পর ২০২১ সালের জুনে তিনি অবসরে যান। ২০ মে সোমবার মধ্যরাতের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার এবং তার পরিবারের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ক্ষমতার অপব্যবহার, তিন ভাইয়ের অপরাধ ধামাচাপা দিতে প্রভাব খাটানো এবং ভাইদের সেনা কেনাকাটায় অবৈধ সুযোগ দেওয়ার অভিযোগে জেনারেল আজিজ ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সাবেক সেনাপ্রধানের বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো উত্থাপন করেছে, তা নতুন নয়। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কাতারভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল আলজাজিরায় এ নিয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। ‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টারস মেন’ শিরোনামে ওই প্রতিবেদনের প্রতিবাদ করেছিল বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। প্রতিবেদনের ভেতর ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ আবিষ্কার করা হয়েছিল। এ কথা সত্য, আজিজ আহমেদ এবং তার ভাইদের বিরুদ্ধে বহুল আলোচিত ওই প্রামাণ্যচিত্রে অযৌক্তিক এবং অন্যায়ভাবে প্রধানমন্ত্রীকে জড়ানোর একটি কুৎসিত চেষ্টা ছিল। এ কারণেই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটির উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কিন্তু ওই প্রতিবেদনে সেনাপ্রধান এবং তার ভাইদের বিভিন্ন অপকর্মগুলোর নিরপেক্ষ ও নির্মোহ তদন্ত করা ছিল সরকারের দায়িত্ব। সরকার অভিযোগগুলো আমলেই নেয়নি। বিশেষ করে নাম, ঠিকানা, পিতৃপরিচয় পরিবর্তন করে জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট নেওয়ার মতো বিষয়গুলো প্রমাণিত। এসব জালিয়াতি ও প্রতারণার বিরুদ্ধে সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। আজিজ আহমেদ এবং তার ভাইদের অপরাধ তাদের ব্যক্তিগত। রাষ্ট্র বা সরকার কেন তার দায় নেবে? চাকরি জীবনে জেনারেল আজিজ দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। সেনাপ্রধান হওয়ার আগে তিনি বিজিবির মহাপরিচালক ছিলেন। দুই জায়গাতেই তার ব্যাপারে নানা মুখরোচক আলোচনা শোনা যায়। সরকারের ঘনিষ্ঠ এরকম একটি ধারণা দিয়ে তিনি দাপট দেখিয়েছেন, ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন বলে বিস্তর অভিযোগ আছে। কিন্তু এসব অভিযোগ তদন্ত তো দূরের কথা, আমলেই নেওয়া হয়নি। মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে আমাদের গৌরবের সশস্ত্র বাহিনী। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আমাদের অহংকার, দেশের গর্ব। এখনো এ প্রতিষ্ঠানটির ব্যাপারে জনগণের আস্থা আশাতীত। হত্যা ও রাজনীতির উচ্চাভিলাষ থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী একটি চৌকস, পেশাদার বাহিনী হিসেবে বিশ্বে বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে। ২০০৯ সাল থেকে সেনাবাহিনী আন্তর্জাতিক মানের একটি সুশৃঙ্খল বাহিনী হিসেবে গড়ে উঠেছে। সেনাপ্রধানরা অবসরের পর নিভৃত জীবনযাপন করেন। দায়িত্ব পালন করে তাদের পেশাদারিত্ব, সততা ও নিষ্ঠা তরুণদের জন্য অনুকরণীয় হয়। কিন্তু জেনারেল আজিজদের সময়ে ব্যাপারটি তেমন ছিল না। বিজিবির প্রধান বা সেনাপ্রধান হিসেবে তার অনেক কর্মকাণ্ডেই পেশাদার অফিসাররা অস্বস্তিতে পড়েছেন। বিব্রত হয়েছেন। সেনাপ্রধানের চেয়ে সরকারের ঘনিষ্ঠ—এ পরিচয়টি তার ক্ষেত্রে মুখ্য হয়ে উঠেছিল। আজিজ আহমেদ সেনাপ্রধান হওয়ার যোগ্য ছিলেন কি না, সেটা ভিন্ন বিতর্ক। আমি সে বিতর্কে যাব না। তবে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তির জন্য স্বচ্ছতা, জবাবদিহি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই পদের সঙ্গে সেনাবাহিনী তথা সশস্ত্র বাহিনীর মর্যাদা ও সম্মান জড়িত। আজিজ আহমেদের কর্মকাণ্ড অনেক আগেই জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত ছিল। তার বিরুদ্ধে কথিত অভিযোগগুলোকে অবজ্ঞা করার কোনো সুযোগ নেই। আমার প্রশ্ন, শীর্ষ পদে যাওয়ার পর একজন ব্যক্তি কেন বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। ক্ষমতার দাপটে নিজেদের আইনের ঊর্ধ্বে মনে করেন? কেন তার লাগাম টেনে ধরা হয় না? এ ধরনের স্পর্শকাতর পদে দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকার কি যথেষ্ট সতর্ক? কেবল রাজনৈতিক বিবেচনায় এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া উচিত কি না, আজিজ আহমেদের ঘটনার পর সেই বিতর্ক সামনে এসেছে।

চার.

বৃহস্পতিবার (২৩ মে) ঢাকার একটি বিশেষ আদালত সাবেক পুলিশপ্রধান বেনজীর আহমেদ এবং তার স্ত্রী, কন্যার সব স্থাবর সম্পদ এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করার নির্দেশ দেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালতের এই আদেশ। গত কিছুদিন ধরেই সাবেক এই পুলিশপ্রধানের বিপুল অবৈধ সম্পদ নিয়ে তোলপাড় চলছিল। একটি জাতীয় দৈনিকে তার দুর্নীতির ফিরিস্তি প্রকাশিত হয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি হাইকোর্টের দৃষ্টিতে আনেন একজন আলোচিত সংসদ সদস্য। হাইকোর্টে বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দেয় দুর্নীতি দমন কমিশনকে। দুই মাসের মধ্যে এ বিষয়ে তদন্ত নির্দেশ দেয় দুর্নীতি দমন কমিশনকে। তদন্তের স্বার্থেই দুদক বেনজীর এবং তার পরিবারের সদস্যদের সম্পদ ক্রোক করার আবেদন করে। বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে সংবাদপত্রের যখন ধারাবাহিকভাবে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল, তখন আমি আশা করেছিলাম তিনি এর কড়া প্রতিবাদ জানাবেন। কিন্তু তা না করে সাবেক এই পুলিশপ্রধান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ এক বক্তৃতা দেন, যা ছিল অনেকটাই আত্মরক্ষামূলক। তার ওই বক্তব্যে তার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর জুতসই জবাবও ছিল না। তাই এখন দেখার বিষয়, দুদক তদন্ত করে কী পায়। বেনজীর আহমেদ দুর্নীতি করেছেন কি না, তা সময়ই বলে দেবে। কিন্তু মেধাবী এই পুলিশ কর্মকর্তার বেপরোয়া হয়ে ওঠার নানা কেচ্ছা-কাহিনি অলিগলিতে আলোচনা হয়। পুলিশের প্রায় কর্মকর্তাই তার পরিবর্তনের বিস্মিত। এক সময় চৌকস, দক্ষ এই পুলিশ কর্মকর্তার বদলে যাওয়া নিয়ে রীতিমতো সিনেমা হতে পারে। হলি আর্টিসানের ঘটনায় তিনি যে বীরত্ব দেখিয়েছিলেন, তা সত্যি অতুলনীয়। কিন্তু তার ঘনিষ্ঠ সহকর্মীরাই হতাশার সুরে বলেন, পুলিশপ্রধান হওয়ার পর তিনি বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। নানা রকম বিতর্ক এবং অনিয়মের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। প্রচণ্ড ক্ষমতার দাপটে তিনি যা খুশি তা-ই করেছেন বলেও অনেক মন্তব্য করেন। পুলিশপ্রধান থাকা অবস্থায় তার লাগামহীন দুর্নীতি সরকারের বিভিন্ন মহলে আলোচিত হয়েছিল। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষপদে থাকা একজন ব্যক্তির এসব কাণ্ড সরকারের জন্যও বিব্রতকর। এখন দেখার বিষয়, বেনজীর আহমেদের পরিণতি কী হয়।

পাঁচ.

আওয়ামী লীগ সরকার টানা ১৫ বছরের বেশি ক্ষমতায়। এ সময় দেশ পরিচালনায় সরকার অনেক শীর্ষ পদে বহুজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকেই দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। অনেকের সততা ও নিষ্ঠা এখনো অনুকরণীয় উদহারণ। আবার কেউ কেউ শীর্ষ পদে গিয়ে এমনসব কাণ্ড করেছেন যে, সরকারই তাদের কাজে বিব্রত হয়েছেন। দুর্নীতিবাজ, অযোগ্য এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় যারা বিভিন্ন শীর্ষ পদে গেছেন তারাই বিতর্কিত ভূমিকার জন্য সমালোচিত হয়েছেন। এর ফলে সরকারও ইমেজ সংকটে পড়েছে।

এই তিনটি ঘটনার একটি সহজ সমীকরণ আমার কাছে স্পষ্ট। পক্ষপাত করে, রাজনৈতিক বিবেচনায় বা প্রভাবিত হয়ে যোগ্যতার বাইরে কাউকে কোনো দায়িত্ব দেওয়া উচিত নয়। হোক না তা জনপ্রতিনিধি কিংবা পুলিশপ্রধান। ইদানীং অর্থের বিনিময়ে মনোনয়ন পাওয়ার কথা বেশ চালু হয়েছে। অযোগ্যরা তদবির করে, চাটুকারিতার মাধ্যমে অথবা সরকারকে নানাভাবে প্রভাবিত করে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসেছেন। এরাই বিতর্কিত হচ্ছেন, সরকারকেও করছেন বিব্রত। এদের লোভ, দুর্নীতি, অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা এবং অনৈতিক কর্মকাণ্ডের ফলে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। সৃষ্টি হচ্ছে আস্থার সংকট। এই তিন ঘটনা আমাদের একটি সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করাই তা হলো গুরুত্বপূর্ণ পদে বা দায়িত্বে লোক বাছাই করতে হবে নির্মোহভাবে, শুধু যোগ্যতার ভিত্তিতে। না হলে ক্ষতি হবে সরকারের, দেশের।

লেখক: নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত

ইমেইল: poriprekkhit@yahoo.com


আনার   আজিজ   বেনজির   দুর্নীতি   নিষেধাজ্ঞা   হত্যা  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

দুর্নীতিবাজরা প্রধানমন্ত্রীর লোক হতে পারে না

প্রকাশ: ১০:৩০ পিএম, ২৪ মে, ২০২৪


Thumbnail

সাবেক সেনাপ্রধান এবং সাবেক পুলিশ প্রধানকে নিয়ে এখন সারা দেশ জুড়ে তোলপাড় চলছে। সাবেক পুলিশ প্রধান বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে বৃহস্পতিবার ঢাকার একটি আদালত ক্রোক পরোয়ানা জারি করেছে। বেনজীর আহমেদ, তার স্ত্রী এবং কন্যার নামে থাকা ৮৩ টি বিভিন্ন স্থাবর সম্পত্তি দলিল জব্দ করার নির্দেশ দিয়েছে আদালত। এছাড়া তাদের ব্যাংক একাউন্টও জব্দ করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বেনজীর আহমেদ অত্যন্ত দাপুটে পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন এবং পুলিশ প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন রকম অভিযোগ চাউর হয়েছিল। এখন বেনজীরের বিরুদ্ধে অভিযোগ গুলো দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্ত করছে। 

সোমবার (২০ মে) মধরাতের পর মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বাংলাদেশের সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আজিজ আহমেদ ও তার পরিবারের সদস্যরা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।’ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলারের দেয়া বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘উল্লেখযোগ্য পরিমাণ দুর্নীতিতে সম্পৃক্ততার কারণে বাংলাদেশের সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদকে ‘ফরেন অপারেশন অ্যান্ড রিলেটেড প্রোগামস অ্যাপ্রোপ্রিয়েশনস অ্যাক্টের ৭০৩১ (সি) ধারার অন্তর্ভুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছে পররাষ্ট্র দপ্তর। এর ফলে আজিজ আহমেদ ও তার পরিবারের সদস্যরা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।’ নিষেধাজ্ঞা আরোপের ক্ষেত্রে যে অভিযোগ গুলো উত্থাপন করা হয়েছে সে অভিযোগগুলো বহুল প্রচারিত এবং পুরোনো। অভিযোগগুলো প্রথম উত্থাপিত হয়েছিল ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি। ঐ দিন আল জাজিরা ‘অল প্রাইম মিনিস্টারস মেন’ শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী প্রামাণ্য চিত্র প্রচার করেছিল। ঐ প্রামাণ্য চিত্রটি নির্মাণ করেন ডেভিড বাগম্যান, তাসনিম খলিল এবং জুলকার নাইন। এরা তিনজনজনই বিতর্কিত, মতলববাজ এবং একটি বিশেষ গোষ্ঠীর হয়ে সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের জন্য পরিচিত। আল-জাজিরার প্রতিবেদনে জোর করে যুক্তিহীন ভাবে প্রধানমন্ত্রীকে টেনে আনার করার চেষ্টা হয়েছিল। আজিজ আহমেদ এবং তার তিন ভাইকে প্রধানমন্ত্রীর লোক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল এ প্রতিবেদনে। ঐ সময় ঐ প্রতিবেদন নিয়ে দেশে বিদেশে হৈ চৈ হয়। 

মার্কিন ঘোষণার পর সাবেক সেনাপ্রধান তার মতো করে আত্মপক্ষ সমর্থনের চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেছেন, বিজিবির মহাপরিচালক এবং সেনাবাহিনীর প্রধান থাকা অবস্থায় কোন রকম দুর্নীতির আশ্রয় গ্রহণ করেননি। গণমাধ্যমে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এটিও বলেছেন যে, এ ঘটনা সরকারকেও হেয় করে। 

আজিজ আহমেদের নিষেধাজ্ঞার ঘটনাটি এমন এক সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা করলো যখন দুই দেশ সম্পর্ক এগিয়ে নেয়ার  প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। কদিন আগেই যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু বাংলাদেশ সফর করেছেন। এ সফরে তিনি অতীতের তিক্ততা ভুলে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার বার্তা দিয়েছেন। লু এর সফরের পর সরকারের মধ্যে ছিলো স্বস্তি ভাব। বিএনপির মধ্যে হতাশা। তবে ডোনাল্ড লু তার সফরে সুস্পষ্টভাবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এবং দুর্নীতি প্রতিরোধে বাংলাদেশ সরকারকে সহযোগিতা করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছিলেন। আর তিনি ফিরে যাবার পর পরই যুক্তরাষ্ট্র সাবেক সেনাপ্রধানের উপর এই নিষেধাজ্ঞার বার্তাটি ঘোষণা করলো। বাংলাদেশে সাবেক সেনাপ্রধানের এই নিষেধাজ্ঞার ঘটনাটি নিয়ে নানারকম প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিএনপি এই ঘটনার পর স্ববিরোধী অবস্থান নিয়েছে। দলের মহাসচিব মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেছেন, এতে বিএনপির কিছু যায় আসে না। তার মতে এই নিষেধাজ্ঞা একধরনের বিভ্রান্তি। এটিকে তিনি বলেছেন ‘আই ওয়াশ’। আবার দলটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এটিকে সরকারের দায় হিসেবে প্রচার করছে। আওয়ামী লীগের মধ্যেও নিষেধাজ্ঞা নিয়ে পরস্পর বিরোধী অবস্থান লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দলের সাধারণ সম্পাদক ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য দুরকম।পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিষয়টিকে সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত কোন বিষয় নয় বলেই মন্তব্য করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র আগেই জানিয়েছিল বলে উল্লেখ করে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, এটি ব্যক্তির বিরুদ্ধে, সরকারের বিরুদ্ধে নয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর মন্তব্যও ছিলো একই রকম। কিন্তু বুধবার ওবায়দুল কাদের কথা বললেন উল্টো সুরে। ‘নিশি রাতের স্যাংশন পরোয়া করিনা’ বলে হুংকার দিলেন কাদের। আমি মনে করি এটি ব্যক্তির উপর নিষেধাজ্ঞা। দুই দেশের সম্পর্কের উপর এটি কোন প্রভাব ফেলবে না। ব্যক্তির অপরাধের জন্য যুক্তরাষ্ট্র এরকম নিষেধাজ্ঞা হরহামেশাই দেয়।

তবে এই নিষেধাজ্ঞার বহুমাত্রিক তাৎপর্য রয়েছে। জেনারেল আজিজ আহমেদ বাংলাদেশে একজন আলোচিত বিতর্কিত এবং সমালোচিত ব্যক্তি। ২০২১ সালের জুনে সেনাপ্রধানের পদ থেকে তিনি অবসরের পর নিভৃত জীবন যাপন করছেন বটে, কিন্তু তিনি সেনাপ্রধান এবং বিজিবির মহাপরিচালক থাকা অবস্থায় তার কর্মকান্ড নিয়ে নানামুখী আলাপ আলোচনা এখনও চলমান। তার তিন ভাইকে নিয়ে সত্য-মিথ্যা নানা গল্প বিভিন্ন মহলে আলোচনা হয়। অনেকের ধারণা আজিজ আহমেদের কারণেই তারা বেপোয়ারা হয়ে উঠেছিলেন। 

মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পর কেউ কেউ একটি সরল সমীকরণ আনার চেষ্টা করছেন। তারা বলছে যে, আজিজ আহমেদ এইসব অপকর্ম করেছেন সরকারের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে। বিতর্কিত এবং যুদ্ধ অপরাধীদের পৃষ্ঠপোষক ডেভিড ব্যাগম্যান ও তার সাঙ্গ-পাঙ্গরা আল জাজিরার প্রতিবেদনে আজিজ আহমেদকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছিল। সেই প্রামাণ্য চিত্রকে সামনে এনে অনেকে অপপ্রচারের নতুন এজেন্ডা গ্রহণ করেছে। কিন্তু নির্মোহ ভাবে বিশ্লেষণ করলে আল জাজিরার প্রতিবেদনে এটিই ছিলো সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিবৃতিতে আজিজ আহমেদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সম্পর্কের বিষয় আমলে নেয় নি। নির্মোহভাবে তার অনিয়ম গুলো তুলে ধরা হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো যে, আজিজ আহমেদ কি প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ ছিলেন? প্রধানমন্ত্রীর অনুকম্পায় এবং প্রশ্রয়ে কি তিনি এই কথিত অপরাধগুলো করেছিলেন? এর উত্তর 'না'। প্রধানমন্ত্রী তার দায়িত্ব পালনকালে বেশ কয়েকজন সেনাপ্রধান পদে নিযুক্ত করেছেন। তাদের অনেকে সততা, ন্যায় নিষ্ঠার অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। একটি পদে ভালো বা খারাপ করা ব্যক্তির বিষয়, প্রধানমন্ত্রীর নয়।  

কোন দুর্নীতিবাজ প্রধানমন্ত্রীর লোক হতে পারেন না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দুর্নীতির ব্যাপারে সুস্পষ্ট অবস্থান রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী একাধিকবার বলেছেন, দুর্নীতিবাজ যেই হোক না কেন তিনি কোন রাজনৈতিক দলের না, তাকে প্রশ্রয় দেয়া হবে না। সরকার নানারকম সীমাবদ্ধতা এবং বাস্তবতার কারেণ দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান করতে পারছে না একথা সত্য। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোন দুর্নীতিবাজকে আশ্রয় প্রশ্রয় দিচ্ছেন এমন কথা কেউ যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করতে পারবেন না। দুর্নীতিবাজদের কাউকে কাউকে প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ট বলে প্রচার চালানোর এক নোংরা খেলা ইদানিং প্রকট হয়েছে। এটি পরিকল্পিত মিথ্যাচার। এর উদ্দেশ্যে একটি জনগণের আস্থার জায়গা নষ্ট করা। বিজিবি বা সেনাপ্রধান হিসেবে আজিজ আহমেদ কোন অপরাধ করলে, তার দায় একান্তই তার, অন্য কারো নয়। 

তবে একথা অস্বীকার করার কোন কারণ নেই আজিজ আহমেদের পরিবারের সদস্যরা বাংলাদেশে কঠিন সময়ে বড় ধরনের ঝুঁকি নিয়েছিলেন। বিশেষ করে তার তিন ভাইয়ের যে হত্যা মামলার অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে, সে হত্যা মামলার ইতিহাসটা সম্পূর্ণ অন্যরকম। আজকের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে হারিছ , আনিস ও জোসেফের কর্মকান্ড বিবেচনা করলে সেটি অপরাধ মনে হবে। কিন্তু ৭৫’ পরবর্তী বাংলাদেশের বাস্তবতায় যদি দেখা যায় তাহলে সেটি বীরত্ব, প্রতিরোধ যুদ্ধ। তারা সেই সময় ৭৫ এর ঘৃণ্য আত্ম স্বীকৃত খুনীদের দল ফ্রিডম পার্টিকে প্রতিরোধের জন্য জীবন বাজী রেখেছিলেন । জোসেফ, হারিছ, আনিছের মতো অনেকেই সেদিন ৭৫’ এর ঘাতকদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ঝুঁকি নিয়েছিলেন। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী ৭৫’এর পর প্রতিরোধ যুদ্ধের ডাক দিয়েছিলেন। তাকে এবং তার সহযোদ্ধাদের আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করবেন? রাষ্ট্রদ্রোহী না বীর দেশপ্রেমিক? আওরঙ্গ, লিয়াকত বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনীদের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন। তারা কি সন্ত্রাসী? তাদের কৌশল ভুল হতে পারে, তাদের প্রতিবাদের ভাষা ভুল হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো এটি ছিলো আদর্শিক লড়াই, অস্তিত্বের যুদ্ধ। আনিছ, হারিছ কিংবা জোসেফের মতো কিছু সাহসী তরুণের জন্য বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনীরা কিছুটা হলেও ভয় পেয়েছিল। তারা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের নির্বিচারে হত্যার সাহস পায়নি। আনিছ, হারিছ জোসেফরা সেই সময় যদি ফ্রিডম পার্টির বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে তুলে না নিতেন তাহলে আত্মস্বীকৃত ৭৫’র খুনীরা বাংলাদেশ দখল করে নিতো। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের একটি মানুষও থাকতো না। বাংলাদেশের রাজনীতিতে আরেকটি অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো। যে কথিত হত্যাকান্ড নিয়ে আজিজ আহমেদের তিন ভাইকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল এবং দন্ডিত করা হয়েছিল, সেই হত্যাকান্ডের পুরো বিচার প্রক্রিয়া হয়েছিল বিএনপির আমলে। যারা ফ্রিডম পার্টি এবং ৭৫’ এর খুনীদের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক। ঐ বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিয়েও প্রশ্ন আছে। যে দেশে কর্ণেল তাহেরের মতো বীর মুক্তিযোদ্ধাকে পঙ্গু অবস্থায় ফাঁসির কাষ্ঠে ঝোলানো হয় সেই দেশে ফ্রিডম পার্টির সশস্ত্র ক্যাডারকে প্রতিরোধ করার জন্য কাউকে হত্যা মামলার আসামি করাটা অস্বাভাবিক নয়। যিনি নিহত হয়েছিলেন তিনি ছিলেন ফ্রিডম পার্টির সন্ত্রাসী, বহু মানুষের হত্যা দায়ে অভিযুক্ত। হারিছ, আনিছ, আজিজরা সেই সময় যেটা করেছেন সেটি কতটা রাজনৈতিক, কতটা সন্ত্রাসী তার বিচারের ভার ইতিহাসের। কিন্তু সেই সময় ৭৫’ এর খুনীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোটা ছিলো অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। আর একারণেই ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা গ্রহণ করে মিথ্যা হয়রানি মূলক মামলাগুলো প্রত্যাহার করা এবং এসমস্ত মামলায় যারা দন্ডিত হয়েছেন তাদেরকে ছেড়ে দেয়া নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করেছে। আওয়ামী লীগ সাহসের সাথে এই দায়িত্ব পালন করেছে। ঘাতকদের বুলেট থেকে বাঁচার জন্য যদি কেউ সহিংস হয়ে উঠে তবে সেটি আত্মরক্ষা, অপরাধ নয়। কাজেই হারিছ, আনিস, জোসেফকে মুক্ত করার বিষয়টি কোন ভাবেই দুর্নীতির সাথে যুক্ত করা উচিত না। এটি একটি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত। এটি অস্বীকার করার কোন কারণ নেই তার ভাইদের ত্যাগ এবং ৭৫’ পরবর্তী সময়ে তাদের বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধের কারণেই আজিজ আহমেদ সরকারের দৃষ্টিতে এসেছেন এবং তার পদোন্নতি ঘটেছে। এমনকি একারণেই হয়তো তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পেয়েছেন। এটি শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো বিশ্বের বাস্তবতা। রাজনৈতিক বিশ্বস্ততা এবং আনুগত্য অনেক গুলো স্পর্শকাতর নিয়োগের ক্ষেত্রে বিবেচনা করা হয়।

দ্বিতীয় বিষয় হলো আজিজ আহমেদ যখন কোন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন সেই দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি কি করেছেন? তিনি কি দুর্নীতি করেছেন? তিনি কেনাকাটার ক্ষেত্রে তার ভাইদেরকে প্রাধান্য দিয়েছেন? তার ভাইদের পরিচয় পাল্টে দিয়ে তাদেরকে বিদেশে পাঠিয়েছেন? তার ভাইয়েরা অনৈতিকভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য করেছেন আজিজ আহমেদের নাম ভাঙ্গিয়ে? এসমস্ত প্রশ্নের উত্তরগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের মতো করে নির্মোহভাবে তদন্ত করেছে। আল জাজিরা অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই বিষয়টি উপস্থাপন করেছে। এই বিষয়ের সাথে সরকারের কোন সম্পৃক্ততা নেই। সরকার এই ব্যক্তির দুর্নীতির দায় কেন নিবে? এ ধরনের পদে থেকে দুর্নীতি করতে বা ক্ষমতার অপব্যবহার করতে অন্য কারো সহযোগিতা লাগেনা। ব্যক্তি আজিজ যখন একটি পদে গেছেন তখন যদি তিনি কোন দুর্নীতি করে থাকেন, তিনি কোন অন্যায় করে থাকেন তার সব দায়-দায়িত্ব একমাত্র তারই। তার দায়িত্ব রাষ্ট্র বা সরকারের নয়। শুধু আজিজ আহমেদ কেন এখন সাম্প্রতিক সময়ে অনেকের দুর্নীতির থলের বিড়াল বেড়িয়ে আসছে। সাবেক পুলিশ প্রধান বেনজীর আহমেদের দুর্নীতির বিশাল ফিরিস্তি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এই দুর্নীতির অভিযোগ হাইকোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছে। হাইকোর্ট বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। দুর্নীতি দমন কমিশন হাইকোর্টের নির্দেশে বেনজির আহমেদের দুর্নীতির অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখছে। ইতোমধ্যে আদালতের মাধ্যমে বেনজীর আহমেদ এবং তার পরিবারের সদস্যদের সব স্থাবর সম্পত্তি জব্দ করার আদেশ পেয়েছে দুদক। এর ফলে দুর্নীতির ব্যাপারে যে সরকার নির্মোহ এবং প্রভাবমুক্ত সেটি আরেকবার প্রমাণিত হয়েছে। বেনজীর আহমেদকে পুলিশ প্রধান করাটা ছিলো সরকারের সিদ্ধান্ত। কিন্তু পুলিশ প্রধান হয়ে তিনি যদি কোন অন্যায় করে থাকেন, যদি কোন দুর্নীতির সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন তবে সেটি তার অপরাধ। এর দায় সরকার নেবে কেন? 

প্রধানমন্ত্রী টানা ১৫ বছর এবং মোট ২০ বছর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ২০ বছরে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে শত শত নিয়োগ দিয়েছেন। দায়িত্ব পেয়ে কেউ ভালো কাজ করেছেন, কেউ খারাপ কাজ করেছেন। কেউ দুর্নীতি করেছে, কেউ সততার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। কেউ যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন, কেউ আবার ছিলেন অযোগ্য। যে যেই কাজ করেছেন তার পুরষ্কার বা তিরস্কার তিনিই পাবেন। আনিছ, হারিছ, জোসেফের দন্ড মওকুফ সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু তাদের নাম পাল্টানো, পরিচয় গোপন করে ভোটার কার্ড বা পাসপোর্ট গ্রহণ ব্যক্তিগত অনিয়ম, অপরাধ। বাংলাদেশে ডা. সাবরিনার মতো অনেকেই এধরনের অপকর্ম করেছে। কয়েক হাজার রোহিঙ্গা জালিয়াতি করে পাসপোর্ট করেছে, সংগ্রহ করেছে জাতীয় পরিচয় পত্র। এটি সরকারি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা। এসব অনিয়ম করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর লোক হওয়ার দরকার নেই। সত্যিকারের প্রধানমন্ত্রীর লোকরা এই সব অনিয়ম করে না। কোন নির্দিষ্ট দায়িত্ব পেয়ে যারা দুর্নীতি করছেন, যারা অনিয়ম করছেন এটি একেবারেই তাদের সিদ্ধান্ত, তাদের লোভ। এর জন্য প্রায়শ্চিত্ত ভোগ করতে হবে তাদেরকেই। আমরা জানি যে, বিভিন্ন জায়গায় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে এমন অনেক ব্যক্তি ছিলেন বা আছেন যারা দুর্নীতিবাজ হিসেবে পরিচিত। অন্তত সাধারণ মানুষ তাই মনে করে। তাদের বিরুদ্ধে সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না বলেও অভিযোগ আছে। এটি সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ব্যর্থতা। এক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশন সহ সংশ্লিষ্টদের সক্রিয় হতে হবে। উদ্যোগী হতে হবে। আজিজ আহমেদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো উত্থাপিত হয়েছে সে অভিযোগগুলো দুর্নীতি দমন কমিশনকে নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখতে হবে। বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন যাতে নিরপেক্ষ তদন্ত করে তা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের আশে পাশে যেসমস্ত লোক ছিলেন বা আছেন এবং তাদের বিরুদ্ধে যেসমস্ত দুর্নীতির অভিযোগ আকাশে বাতাসে ঘুরে বেড়ায় সেই অভিযোগগুলোর নির্মোহ তদন্ত দরকার। কারণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহিষ্ণুতা’ প্রধানমন্ত্রীর অঙ্গীকার। প্রধানমন্ত্রী যে টানা ক্ষমতায় আছেন এবং তিনি যে জনপ্রিয়তার শীর্ষে তার অন্যতম কারণ তিনি দুর্নীতিবাজদের প্রশ্রয় দেন না। তিনি নিজে দুর্নীতির সঙ্গে জড়ান না। তার কট্টর সমালোচকরাও তাকে দুর্নীতিবাজ বলতে পারবে না। আর এই বাস্তবতায় যারা বিভিন্ন দায়িত্ব পেয়ে বা গুরুত্বপূর্ণ পদে বসেই দুর্নীতি করেন তারা প্রধানমন্ত্রীর লোক হতে পারে না, তারা বিশ্বাসঘাতক। প্রধানমন্ত্রীর লোকরা দুর্নীতি করে এই ধরনের অভিযোগ সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এবং অগ্রহণযোগ্য। প্রধানমন্ত্রীর লোক তারাই যারা দায়িত্ববান, সৎ যারা বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়তে চান। প্রধানমন্ত্রীর লোক তারাই যারা তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে, সততার সাথে পালন করেন। প্রধানমন্ত্রীর লোক তারাই যারা বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার আদর্শ অনুসরণ করে। যারা দুর্নীতিবাজ, চাটুকার, লোভী, অর্থ পাচার করে, লুটেরা তারা কখনোই প্রধানমন্ত্রীর লোক না। 

সৈয়দ বোরহান কবীর, নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত
ই-মেইল: poriprekkhit@yahoo.com


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

ওবায়দুল কাদেরের হ্যাটট্রিক

প্রকাশ: ০৮:০০ পিএম, ২০ মে, ২০২৪


Thumbnail

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। ইতোমধ্যে তিনি একটি হ্যাটট্রিক করেছেন। টানা তিন তিনবার আওয়ামী লীগের মতো একটি ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন রাজনৈতিক দলের সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই একমাত্র যিনি আওয়ামী লীগের তিনবার বা তার বেশি সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন। এখন ওবায়দুল কাদেরও আওয়ামী লীগের টানা তিনবারের সাধারণ সম্পাদক। এবার তিনি আরেক রকম হ্যাটট্রিক করলেন। 

ওবায়দুল কাদের গত এক মাসে তার তিনটি নীতি নির্ধারণী বক্তব্য ধরে রাখতে পারলেন না। তার এই বক্তব্যগুলোর উল্টো ফল হল। এবং হিতে বিপরীত ফলাফলের দিক থেকে তার বক্তব্যগুলো হ্যাটট্রিক করেছে। ওবায়দুল কাদের উপজেলা নির্বাচনের আগে সংবাদ সম্মেলন করে বলেছিলেন, আওয়ামী লীগের কোনো আত্মীয় স্বজন উপজেলা নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না। উপজেলা নির্বাচনে যদি কেউ প্রার্থী হয় তাহলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ রকম বক্তব্য তিনি তিনবার দিয়েছিলেন। কিন্তু তার বক্তব্যে সাড়া দিয়ে কেউই উপজেলা নির্বাচনে তাদের আত্মীয়স্বজনকে প্রার্থিতা থেকে সরিয়ে দেয়নি। একমাত্র প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক তার শ্যালককে উপজেলা নির্বাচন থেকে তার প্রার্থীতা প্রত্যাহারের সমর্থ হয়েছিলেন। কিন্তু নোয়াখালীর একরামুল করিম চৌধুরী, ড. রাজ্জাক কিংবা শাহজাহান খান কেউই তাদের পুত্রদেরকে নির্বাচন থেকে সরিয়ে আনেননি। 

এরপর আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আত্মীয় স্বজনদের ব্যাপারে তার ভিন্ন রকম অবস্থা ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, পরিবার বলতে শুধুমাত্র স্ত্রী, পুত্র এবং স্বামী বোঝাবে। তিনি এটাও বলেন যে, যারা দীর্ঘদিন রাজনীতি করেছে, আগে থেকে উপজেলা চেয়ারম্যান আছে, তারা কেন প্রার্থিতা প্রত্যাহার করবে? এর ফলে ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্য আর ধোপে টেকেনি। পরবর্তী পর্যায়ে কেউই ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্য আমলে নেননি। ওবায়দুল কাদেরও আত্মীয় স্বজনদের ব্যাপারে যে রুদ্রমূর্তি অবস্থানে ছিলেন সেখান থেকে সরে আসেন। 

দ্বিতীয় হিতে বিপরীত ঘটনা ঘটে মেট্রোরেলে ভ্যাট না দেওয়ার ঘটনা। মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ যখন এনবিআর-এর কাছে আবারও ভ্যাট প্রত্যাহারের জন্য সুপারিশ করেছিল, তখন এনবিআর তা নাকচ করে দেয় এবং ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপের জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কিন্তু এর বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন ওবায়দুল কাদের। তিনি সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বিষয়টি নিয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলবেন এবং এই ভ্যাট আরোপের সিদ্ধান্তকে তিনি অযৌক্তিক বলে মনে করেন। এর পরপরই আসন্ন অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নে এনবিআর মেট্রোরেলের ওপর ১৫ শতাংশ প্রস্তাবের সুপারিশ করেছে। 

গতকাল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এ ব্যাপারে আবারও একই রকম বক্তব্য রেখেছেন। তিনি ভ্যাট আরোপের বিরোধিতা করে এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করবেন বলে জানিয়েছেন। কিন্তু ওবায়দুল কাদের এক মাস আগে যে বক্তব্য দিয়েছিলেন সেই বক্তব্য এনবিআর আমলে নেয়নি। 

সর্বশেষ ঘটনা ঘটল ঢাকায় অটোরিকশা নিয়ে। ওবায়দুল কাদের আকস্মিকভাবে ঘোষণা করেছিলেন যে, ঢাকায় অটোরিকশা চলবে না। গতকাল থেকে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী অটোরিকশা ঢাকায় চলাচল বন্ধ হয়েছিল। এ নিয়ে অটোরিকশা চালকরা রাজপথে নেমেছিল। গতকাল বিভিন্ন স্থানে তারা বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। কোথাও কোথাও সহিংসতার ঘটনাও ঘটে। আজ মন্ত্রিপরিষদ সভায় অনির্ধারিত ভাবে বিষয়টি আলোচিত হয়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী সরাসরি এর বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেন। তিনি বলেন যে, বিকল্প ব্যবস্থা না করে কেন অটোরিকশা প্রত্যাহার করা হবে। দরিদ্র মানুষেরা তারা কী করে খাবে। এরপর তিনি সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারে নির্দেশনা দেন। মন্ত্রিপরিষদের বৈঠক থেকে বেরিয়ে ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদেরকে জানান, ঢাকায় অটোরিকশা থাকবে, এটি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা। তার কথার হিতে বিপরীতের ঘটনা এটি ঘটল তৃতীয়বার।

ওবায়দুল কাদের   আওয়ামী লীগ   সাধারণ সম্পাদক  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

‘টেকা দেন দুবাই যামু’

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ২০ মে, ২০২৪


Thumbnail

আমাদের ছোটবেলার ঈদে অন্যতম আনন্দের উৎস ছিল আমজাদ হোসেনের নাটক। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম আমজাদ হোসেনের ঈদের নাটক দেখার জন্য। এই নাটকে জব্বর আলীর ভূমিকায় অভিনয় করতেন আমজাদ হোসেন। একেক ঈদে জব্বর আলীর দুর্নীতির একেকটি চিত্র উঠে আসত হাস্যরসের মাধ্যমে। কিন্তু প্রতিটি নাটকে একটি বক্তব্য থাকত; যে বক্তব্যটি সমাজের জন্য, রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং শিক্ষণীয়। আমজাদ হোসেনের ঈদের নাটকগুলোর মধ্যে একটি ছিল আদম ব্যবসা নিয়ে। আদম পাচার এবং আদম ব্যবসায়ের আড়ালে যেভাবে মানুষকে হয়রানি এবং প্রতারণা করা হতো, তার চিত্র ফুটে উঠেছিল। সে নাটকে ফরিদ আলীর একটি উক্তি বহুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। মানুষের মুখে মুখে ছিল ওই সংলাপটি। সংলাপটিতে ফরিদ আলী বলছিলেন, ‘টেকা দেন দুবাই যামু।’ বৃহস্পতিবার দেশের প্রায় সব গণমাধ্যমে দুবাইয়ে ধনকুবেরদের সম্পদের পাহাড় প্রতিবেদনটি দেখে আমজাদ হোসেনের ‘টেকা দেন দুবাই যামু’ কথাটি স্মৃতির পর্দায় ভেসে উঠল। তখন অর্থ উপার্জনের জন্য সর্বস্ব বিক্রি করে মানুষ দুবাই যেতে চাইত। এতে দেশের উপকার হতো। এখন অর্থ পাচারের জন্য দেশকে কেউ কেউ দুবাইয়ে ঠিকানা করছে। আগে দুবাই যেতে জমি বিক্রি করে নিঃস্ব হতো একটি পরিবার। এখনকার ফরিদ আলীরা টাকা নিয়ে ব্যাংক খালি করছে। নিঃস্ব হচ্ছে দেশ। আগে দুবাই ছিল টাকা আনার জায়গা। এখন টাকা রাখার ‘নিরাপদ’ স্থান। এখন শুধু জীবিকার সন্ধানে এ দেশের মানুষ দুবাই যান না। কষ্ট করে শুধু রেমিট্যান্স পাঠান না। লুটেরা, অর্থ পাচারকারীদের ঠিকানা ইদানীং দুবাই। দুবাইয়ে এখন বিনিয়োগ করেছেন বিশ্বের ধনকুবেররা। এই চিত্রটি ফুটে উঠেছে ‘দুবাই আনলকড’ নামে বৈশ্বিক অনুসন্ধানে।

মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটিতে এখন আকাশচুম্বী ঐশ্বর্য, আকাশচুম্বী বিলাসিতা এবং এক রকম প্রাচুর্যে ভরপুর জীবনযাপন। একসময় এটি ছিল ধু-ধু মরুভূমি। সেই অবস্থা থেকে এটি এখন বিশ্বের আধুনিকতম শহর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের আরেকটি বড় সুবিধা হলো, এখানে অবৈধ অর্থের উৎস জানতে চাওয়া হয় না। এ কারণেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের হাজার হাজার মানুষ বিপুল পরিমাণ সম্পদ দুবাইয়ে রাখতে চাইছেন। গোপন সম্পদের আড়ত হয়েছে দুবাই। ব্যাংকের মাধ্যমে কিংবা ব্যক্তিগত বিমানে ভরে অর্থ নিয়ে যাওয়া যায় সংযুক্ত আরব আমিরাতে। এই সুযোগে বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব থেকে শুরু করে বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকা ব্যক্তি, অর্থ পাচারকারী এবং অপরাধীরা সংযুক্ত আরব আমিরাতে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। আর এই অধিকাংশ সম্পদই অবৈধ। জ্ঞাত আয়ের উৎসবহির্ভূত গোপন সম্পদ। ‘দুবাই আনলকড’ নামে এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি ৫৮টি দেশের ৭৪টি সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা ছয় মাস ধরে অনুসন্ধান চালিয়ে প্রস্তুত করেছেন। অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক, ‘অর্গানাইজড ক্রাইম অ্যান্ড করাপশন, রিপোর্টিং,’ (ওসিসিআরপি) ও নরওয়ে সংবাদমাধ্যম ই-২৪-এর নেতৃত্বে অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।

এই প্রতিবেদনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিশ্বব্যাপী লুণ্ঠনের একটি চিত্র ফুটে উঠেছে এ প্রতিবেদনে। বিভিন্ন দেশ থেকে ধনকুবেররা কীভাবে গোপনে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন, তার চিত্র ফুটে উঠেছে ‘দুবাই আনলকড’-এ। দুবাইয়ে সরকারি ভূমি দপ্তরসহ অন্যান্য রিয়েল এস্টেট কোম্পানির ফাঁস হওয়া তথ্য-উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দুবাইয়ে বিদেশিদের মালিকানায় থাকা সম্পদের পরিমাণ ১৬০ বিলিয়ন ডলারের বেশি।

প্রতিবেদনটি বিশ্লেষণ করে দেখানো হয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতে বিদেশিদের সম্পদের মালিকানার তালিকায় শীর্ষে আছে ভারতীয়রা। ২৯ হাজার ৭০০ ভারতীয় নাগরিকের ৩৫ হাজার সম্পদের মালিকানা রয়েছে দুবাইয়ে। ভারতীয়দের এসব সম্পত্তির মোট মূল্য ১৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি। ভারতের পর এই তালিকায় রয়েছে পাকিস্তান। দুবাইয়ে ১৭ হাজার পাকিস্তানি নাগরিকের ২৩ হাজার সম্পদের মালিকানা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাকিস্তানের ইংরেজি ভাষার ‘দৈনিক ডন’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুবাইয়ে ১৭ হাজার পাকিস্তানি সম্পদের মালিক। তবে তথ্য-উপাত্ত ও সূত্র ব্যবহার করে এই সংখ্যা ২২ হাজারের মতো বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট, অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তারা ছাড়াও শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদ, ব্যাংকার এবং আমলারা সংযুক্ত আরব আমিরাতের অভিজাত এলাকায় বিপুল সম্পদের মালিক। পাকিস্তান অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া প্রায় একটি রাষ্ট্র। ভয়াবহ অর্থকষ্টে দেশটির জনগণ দিশেহারা। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণহীন। রিজার্ভ শূন্য। ঋণ নিয়ে কোনোরকমে দেশটি চলছে। বিভিন্ন ঋণের দেনা পরিশোধ করতে গিয়ে যার কাছে পারছে তার কাছেই হাত পাতছে দেশটি। পাকিস্তানের শোচনীয় অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের প্রধান কারণ যে দুর্নীতি এবং অর্থ পাচার, তা সবারই জানা। এই প্রতিবেদন তা আরেকবার প্রমাণ করল। জনগণের সম্পদ লুণ্ঠন করে যারা বিদেশে পাঠিয়েছে, তারাই পাকিস্তানের মসনদে।

বাংলাদেশিদেরও সম্পদ কম নয় দুবাইয়ে। ওসিসিআরপির তথ্য বলছে, এই শহরে গোপন সম্পদ গড়েছেন অন্তত ৩৯৪ জন বাংলাদেশি। এসব বাংলাদেশির মালিকানায় রয়েছে ৬৪১টি সম্পদ। বাংলাদেশিদের মালিকানায় থাকা এসব সম্পদের মোট মূল্য ২২ কোটি ৫৩ লাখ ডলারেরও বেশি, বাংলাদেশি টাকায় যার পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা। আমার ধারণা, দুবাইয়ে এর চেয়েও দ্বিগুণ পরিমাণ অর্থ বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে। অনেকে বেনামে, কেউ কেউ কানাডা, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র থেকে অর্থ সরিয়ে এখন দুবাইয়ে রাখছেন। শুধু দুবাই কেন? ইউরোপীয় ইউনিয়নের ট্যাক্স অবজারভেটরি গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ‘অ্যাটলাস অব অফশোর ওয়ার্ল্ড’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশিদের প্রায় ৫ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলারের অফশোর সম্পদ আছে। এটি বাংলাদেশের মোট জিডিপির ১ দশমিক ৩ শতাংশ। এর মধ্যে ৫ বিলিয়ন ডলার এশিয়ার কর স্বর্গ দেশগুলোতে, বাকিটা ইউরোপ, আমেরিকায়। ট্যাক্স জাস্টিস নেটওয়ার্কের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা পাচার হচ্ছে কর স্বর্গ বলে পরিণত দ্বীপ রাষ্ট্রগুলোতে। সুইস ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী এখানকার ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের গচ্ছিত অর্থ ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি। তবে বাংলাদেশিদের সম্পদ ও মালিকানার তথ্য সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি এসব কোনো প্রতিবেদনে। তাদের পরিচয় গোপন করা হলেও আমরা তাদের চিনি। কারা ব্যাংকের টাকা লুট করে দুবাইয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করছে, আমাদের অজানা নয়। কোন দুর্নীতিবাজরা বিদেশে দুর্নীতির টাকা গচ্ছিত রেখেছে, সে চর্চা এখন সর্বত্রই হয়। তাদের কারণেই যে অর্থনীতির সংকট, তা কে না জানে? বাংলাদেশের অর্থনীতির অবস্থা এখন আশঙ্কাজনক। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১৩ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে গেছে। অথচ পাচারকৃত অর্থ যোগ করলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থাকত ৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এক ধাপে ডলারের মূল্য ৭ টাকা বাড়িয়ে ১১৭ টাকা করা হয়েছে। ডলার নিয়ে এখন হাহাকার। ডলারের অভাবে আমদানি করা যাচ্ছে না অনেক গুরুত্বপূর্ণ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য। রপ্তানিতেও শুভঙ্করের ফাঁকি। রপ্তানি আয়ের টাকা কাগজে আছে, ব্যাংকে নেই। ব্যাংকগুলোর অবস্থা খুবই নাজুক। দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূত করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সে উদ্যোগও এখন হালে পানি পাচ্ছে না। ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, আর্থিক সংকটে ধুঁকছে ব্যাংকগুলো। ব্যাংকে সুদসীমা উঠিয়ে দেওয়ার পর এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। ব্যবসায়ীরা আতঙ্কে। ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের নেতারা বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। ভুল নীতি এবং ভুল পরিকল্পনার কারণে মুদ্রাস্ফীতি এখন ১০ শতাংশের আশপাশে ঘোরাফেরা করছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে মানুষের জীবনযাত্রায় নাভিশ্বাস উঠেছে। এসব কিছুর প্রধান কারণ হিসেবে আমি মনে করি, ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণ, অর্থ পাচার এবং দুর্নীতি। এই তিনটি বিষয়ে যদি সরকার পদক্ষেপ গ্রহণ না করে, তা হলে সামনের দিনগুলোতে অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে তোলা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ব্যাপার হয়ে যাবে। যেভাবে পাকিস্তানের অর্থনীতি ডুবেছে, সেভাবে কি বাংলাদেশের অর্থনীতির বারোটা বাজানোর ষড়যন্ত্র চলছে? এখন পর্যন্ত দুর্নীতিবাজ, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি এবং অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না। বিপুল বিস্ময়কর উন্নয়নকে ম্লান করে দিয়েছে মুষ্টিমেয় কিছু লুটেরা দুর্বৃত্ত।

গত তিন-চার বছরে অর্থ পাচারের নতুন ঠিকানা হয়েছে দুবাই। আগে যারা বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার করেছেন, তাদের মূল ঠিকানা ছিল যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড। অনেকে এসব দেশের নাগরিকত্ব নিয়েছেন। বাংলাদেশ থেকে লুণ্ঠিত সম্পদ নিয়ে সেই দেশে শীর্ষ ধনীদের তালিকায় নাম লিখিয়েছেন। তারা এখন ধরাছোঁয়ার বাইরে। এখন দুবাইয়ের প্রতি অর্থ পাচারকারীদের আগ্রহ বেড়েছে। এর কারণ হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশ অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে বেশ কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। এ কারণেই সেসব দেশে নতুন করে অর্থ পাচার কঠিন হয়ে পড়ছে। আমরা সুইস ব্যাংকে যেসব অর্থ পাচারকারী অর্থ পাচার করেছে তাদের তথ্য জানি না। এ তথ্যগুলো সংগ্রহের জন্য বাংলাদেশ সরকার কী ধরনের অবস্থান গ্রহণ করেছে, সে সম্পর্কেও আমরা অন্ধকারে রয়েছি। আমরা জানি না যে, ‘ট্যাক্স হেভেন’ বলে পরিচিত দ্বীপরাষ্ট্রগুলোতে যারা কোম্পানি খুলে অর্থ পাচার করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ওসিসিআরপি এ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছিল। কিন্তু সেই তথ্যের তদন্ত হয়নি। আমরা এটাও জানি না যে, বাংলাদেশের যেসব ব্যবসায়ী রপ্তানির নামে ‘ওভার ইনভয়েসিং’-এর মধ্যে বিদেশে অর্থ পাচার করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নিয়েছে। আমরা জানি না কানাডার বেগমপাড়ায় যাদের বাড়িঘর আছে তাদের তালিকা কার কাছে। এই তালিকা প্রকাশের জন্য কয়েক বছর ধরেই হৈচৈ হয়েছে, আলোচনা হয়েছে; কিন্তু তালিকা আলোর মুখ দেখেনি। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়ায় যারা সম্পদের পাহাড় গড়েছেন, তারা কারা?

অর্থ পাচার রোধে সরকারের গ্রহণ করা ব্যবস্থাগুলো কতটুকু বাস্তবে রূপ নিয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সরকার অর্থ পাচার রোধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পেরেছে কি না, তা নিয়েও অনেকের মধ্যে সংশয় ও সন্দেহ রয়েছে। গত বছর অর্থনৈতিক সংকটের মুখে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সংকটের কারণে অর্থ পাচারকারীদের থেকে অর্থ ফেরত নেওয়ার জন্য কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল সরকার। বিদেশ থেকে অর্থ নিয়ে এলে কোনো প্রশ্ন করা হবে না—এমন দায়মুক্তিও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তার পরও অর্থ পাচারকারীদের শুভবুদ্ধির উদয় হয়নি। একটি ডলারও পাচারকারীরা দেশে ফিরিয়ে আনেনি। কানাডা, যুক্তরাজ্য, আমেরিকার কথা বাদই দিলাম; মালয়েশিয়ায় ‘সেকেন্ড হোম’ করা বাঙালির সংখ্যা হাজারের ওপর। সিঙ্গাপুরে অলিগলিতে বাঙালিদের বিভিন্ন সম্পদ পাওয়া যায়। অর্থ পাচার যদি বন্ধ না হয়, তা হলে অর্থনৈতিক সংকট কাটানো যাবে না। দুর্নীতি যদি বন্ধ না করা যায়, তা হলে অর্থনীতি আরও ভয়াবহ রূপ নেবে। আমরা যদি ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে না পারি, তা হলে অর্থনীতির ধ্বংস ঠেকানো অসম্ভব। দুর্নীতি, অর্থ পাচার এবং লুণ্ঠনে পাকিস্তান বাংলাদেশের চেয়ে অনেক এগিয়ে।

পাকিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতায় যারা ছিলেন, তারা যেভাবে দুর্নীতি করে দেশকে ফোকলা বানিয়েছেন, বাংলাদেশ তার থেকে অনেক পেছনে। কিন্তু বাংলাদেশে যেভাবে অর্থ পাচার হচ্ছে, যেভাবে দুর্নীতি হচ্ছে, তা যদি অব্যাহত থাকে, তা হলে বাংলাদেশ পাকিস্তান হতে বাধ্য। আমরা কি বাংলাদেশকে পাকিস্তান বানাতে চাই? যারা বাংলাদেশ চায়নি তারাই অর্থনীতির বারোটা বাজাচ্ছে। আমজাদ হোসেনের ফরিদ আলী ‘টেকা’ নিয়ে বিদেশ যেতে চেয়েছিল। নিজের ভাগ্য গড়তে চেয়েছিল। সেখান থেকে অর্থ উপার্জন করে দেশে পাঠানোর স্বপ্ন ছিল তার। কিন্তু এখনকার নব্য ফরিদ আলীরা ব্যাংক খালি করে, জনগণের সম্পদ লুট করে দুবাই যাচ্ছে। এই ফরিদ আলীদের রুখতে হবে। তাদের হাত থেকে বাঁচাতে হবে অর্থনীতি, বাংলাদেশকে।


লেখক: নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত

ইমেইল: poriprekkhit@yahoo.com



মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

সবকিছু ঠিক আছে?

প্রকাশ: ১০:৩০ পিএম, ১৭ মে, ২০২৪


Thumbnail

১৭ মে প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস পালিত হলো জাঁকজমকপূর্ণ ভাবে। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মধ্যে একধরনের প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করলাম। যে যেভাবে পেরেছে ১৭ মে তে নিজেদেরকে জানান দেয়ার চেষ্টা করেছেন। সংবাদপত্রগুলো ভরে গেছে শেখ হাসিনার স্তুতিতে। শেখ হাসিনাকে নিয়ে বন্দনা কতটা আসল, কতটা চাটুকারিতা তা নিয়ে গবেষণা হতেই পারে। ১৭ মে ১৯৮১ তে যখন তিনি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেছিলেন, তখন সাধারণ মানুষের ভালবাসা আবেগ ছিলো হৃদয় নিংড়ানো, পুরোটাই নিখাঁদ। ৪৩ বছর পর এই উচ্ছ্বাস কি তেমনি অকৃত্রিম? 

১৭ মে নিঃসন্দেহে আওয়ামী লীগের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। ঘুরে দাঁড়াবার দিন। আমি মনে করি শুধু আওয়ামী লীগের জন্য নয়, ১৭ মে বাংলাদেশের জনগণের জন্যও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন। এরপর ৪৩ বছর পেরিয়ে গেছে। ৪৩ বছর বাঙালীর যে সংগ্রাম বা অর্জন তার সবকিছুর মূলে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি তিল তিল করে সংগ্রাম করেছেন এবং বাংলাদেশকে বিনির্মাণ করেছেন। জাতির পিতার স্বপ্ন পূরণের পথে তিনি এখন প্রায় গন্তব্যে পৌঁছে গেছেন। কিন্তু এই ৪৩ বছর পেরিয়ে এখন যখন আমরা আজকে বাংলাদেশের দিকে তাকাবো, তখন একটি প্রশ্ন সামনে আসে। সবকিছু কি ঠিক আছে? দেশের রাজনীতি, অর্থনীতিতে সবকিছু ঠিকঠাক মতো চলছে? অর্থনীতির চেহারা ক্রমশঃ বিবর্ণ, মলিন হচ্ছে। দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতিতে মানুষের হাঁসফাঁস অবস্থা। আওয়ামী লীগের মধ্যে সবকিছু উপেক্ষা এবং অবজ্ঞা করার প্রবণতা বাড়ছে। কোন সমস্যাকেই অনেকে পাত্তা দিতে রাজী নন। কেউ যদি সমস্যা উপলব্ধি না করে তাহলে সমাধান করবে কিভাবে?

১৯৮১ সালের ১৭ মে যখন শেখ হাসিনা বাংলাদেশে এসেছিলেন জাতির পিতার রক্তে ভেজা মাটিতে। সেসময় বাংলাদেশ কেমন ছিল? বাংলাদেশ ছিল ক্ষুধা-দারিদ্রে নিষ্পেষিত গণতন্ত্রহীন একটি দেশ। যেদেশের মানুষের মৌলিক মানবাধিকার ছিলো না, সাংবিধানিক অধিকারকে হরণ করা হয়েছিল, বিচারের নামে হতো প্রহসন, মানবাধিকার ছিলো ভুলুণ্ঠিত। অভাব,দারিদ্র, বিদেশের উপর নির্ভরতা সবকিছুর মিলিয়ে বাংলাদেশ ছিলো যেন এক স্বপ্নহীন রাষ্ট্র। সে ধ্বংস স্তূপেই এসে শেখ হাসিনা গণতন্ত্রের ডাক দিয়েছিলেন। মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের জন্য নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন। ১৯৮১ থেকে ২০২৪, শেখ হাসিনার এই ৪৩ বছরের জীবনকে আমরা দু’ভাগে ভাগ করতে পারি। প্রথম ভাগ, তার সংগ্রামের জীবন। দ্বিতীয় ভাগ, অর্জনের। এই ৪৩ বছরে তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়েছেন, সংগ্রাম করেছেন এবং এক সাহসী নেতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে প্রতিকূল পরিস্থিতিকে জয় করেছেন। শেখ হাসিনা যখন এসেছিলেন তখন ঘরে বাইরে ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছিলেন। একদিকে, সামরিক শাসকরা তাকে বাঁধা দিতে চেয়েছিল, তার রাজনৈতিক অস্তিত্বকে ধ্বংস করতে চেয়েছিল। তিনি যাতে দেশে না আসেন সে চেষ্টা করা হয়েছিল। দেশে আসার পর এমন এক পরিস্থিতি তৈরী করা হয়েছিল যেন তিনি রাজনীতি করতে না পারেন। কিন্তু শেখ হাসিনা সে ভয়ের কাছে নিজেকে আত্মসমর্পণ করেননি। প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে অকুতোভয় সৈনিকের মতো তিনি লড়াই করেছেন। শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সময় দলেও ছিলো এক বৈরী পরিস্থিতি। কোন্দলে বিভক্ত দলটিতে ৭৫ এর খুনীদের দোসরদের পুনর্বাসিত করা হয়েছিলো। ৩৩ বছর বয়সী বঙ্গবন্ধুর কন্যাকে পুতুল বানিয়ে রাখতে চেয়েছিল অনেকে। ঘরে বাইরে লড়াই করতে হয়েছে শেখ হাসিনাকে।

লক্ষণীয় ব্যাপার যে, ১৯৮১ সাল থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত সংগ্রামে যেমন স্বৈরাচার, ধর্মান্ধ মৌলবাদ এবং স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তি তার বিরুদ্ধে ছিল। ঠিক তেমনিভাবে দলের ভেতরে ছিল কুচক্রী মহল, ছিলো ষড়যন্ত্রকারী। সেই ষড়যন্ত্রকারীরা শেখ হাসিনার অভিযাত্রার পথে কাঁটা বিছিয়েছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছিলেন। আবার ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা, মানুষের নির্যাতন, নিপীড়নের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার যে সংগ্রাম সেই সংগ্রামেও দলের ভিতর থেকে তিনি সহযোগিতা পেয়েছেন খুবই কম। দলের ভেতর অনেকেই সেসময় নব্য মোশতাকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল। আওয়ামী লীগ মুসলিম লীগে পরিণত হবে- এমন কথা বলতেন দলটির ডাক সাইট নেতারা। ২০০৭ সাল থেকে ২০০৮ সাল এই দুই বছর শেখ হাসিনাকে মাইনাস করার ষড়যন্ত্রের মধ্যেও আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ নেতাদের দায় চোখ এড়াবে না। তারা শেখ হাসিনাকে মাইনাস করার জন্য যে ঘৃণ্য  খেলায় অংশীদার হয়েছিলেন। ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করেই তাকে দল আগলে রাখতে হয়েছে। এসময় আওয়ামী লীগইে শেখ হাসিনার সমালোচকের অভাব ছিলোনা। সেই সমালোচনার জবাব দিয়েই তিনি স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কেঁটেছেন। এখন তার সমালোচকরাই সবচেয়ে বড় চাটুকার। শেখ হাসিনার সংগ্রামের অধ্যায়ের যোদ্ধারা এখন কোণঠাসা। অর্জনের সময় অতিথি পাখিদের দাপট দৃষ্টিকটু পর্যায়ে পৌঁছেছে। তাদের দাপটে দুঃসময়ের সঙ্গীরা কোণঠাসা। এরাই চারপাশে এমন স্তুতির রঙ্গীন ফানুস সাজিয়েছেন যে বাস্তব অবস্থাই আড়াল হয়ে গেছে। এটাই হলো ভয়ের কারণ। আওয়ামী লীগের মতো রাজনৈতিক দলকে তিনি ৪৩ বছর ধরে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ৭৫ বছর বয়সী উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন দলটি ৭৫’র আগস্টের শোকাবহ ঘটনার পর তাঁর হাতেই পুনর্জন্ম লাভ করে, বিকশিত হয়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ২০ বছর তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন আরও ৫ বছরের জন্য জনগণ তাকে নির্বাচিত করেছে। শেখ হাসিনা তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় ধর্মান্ধ মৌলবাদী শক্তিকে পরাজিত করেছেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনি এখন একমাত্র তারকা হিসেবে উদ্ভাসিত হয়েছেন। রাজনীতিতে তার কোন প্রতিপক্ষ নেই। তিনি দেশ পরিচালনায় একজন প্রাজ্ঞ, বিচক্ষণ এবং একজন বিশ্ব নেতার সমতুল্য, সেটি আজ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। শেখ হাসিনার নেতৃত্বের কোন বিকল্প নেই। কিন্তু তারপরও কোথায় যেন একটা অস্বস্তি, কোথায় যেন একটা আতঙ্ক, কোথায় যেন একটা প্রশ্ন। সবকিছু কি ঠিক আছে? দেশ কি সঠিক পথে?

চতুর্থ মেয়াদে শেখ হাসিনার ক্ষমতায় আসাটা কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। এসময় এক প্রচন্ড প্রতিপক্ষ এবং নানা রকম প্রতিকূলতাকে প্রতিহত করতে হয়েছে শেখ হাসিনাকে। বিএনপি এবং আন্তর্জাতিক মহল এ নির্বাচন বাতিলের এক নীল নকশা রচনা করেছিলো। নির্বাচন হবে কিনা তা নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিলো। বাংলাদেশের গণতন্ত্র থাকবে কিনা তা নিয়ে এক শংকা তৈরী হয়েছিলো। এই অনিশ্চয়তা কাটিয়ে সাহসের সাথে তিনি পরিস্থিতি মোকাবেলা করেন। অনেকে কল্পনাও করতে পারেননি যে, এইভাবে বিরোধী দল ছাড়া একটি নির্বাচন জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হবে এবং নির্বাচনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি স্বস্তির হাওয়া বইবে। ৭ জানুয়ারির নির্বাচন একটি ম্যাজিক।

নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। নতুন সরকার চার মাস সময় পার করেছে। আন্তর্জাতিক চাপ নেই। রাজনীতির প্রতিপক্ষরা সরকারকে চোখ রাঙ্গাতে পারছে না। আওয়ামী লীগ অনেকটাই দুশ্চিন্তা মুক্ত। কিন্তু এক অজানা আশঙ্কা ভর করেছে। অর্থনীতিতে অস্থিরতা। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রতিনিয়ত কমছে, নানামুখী সংকটে অর্থনীতি আজ মুখ থুবড়ে পরার উপক্রম। সাধারণ মানুষ স্বস্তিতে নেই। জিনিস পত্রের দাম উর্ধ্বমুখী, বিদ্যুৎ সংকট বেড়েছে, ডলারের দাম হঠাৎ করেই বেড়ে যাওয়ার ফলে ব্যবসায়ীদের মধ্যে উৎকণ্ঠা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। চারিদিকে ফিসফাঁস। ব্যাংকে টাকা নেই, ঋণ খেলাপির সংখ্যা বাড়ছে। অর্থ পাচারকারীরা বুক চিতিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে সামনের দিনগুলোতে সরকার কিভাবে এগুবে? অর্থনীতির সংকট কিভাবে সরকার কাটিয়ে উঠবে সেটিই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অথচ সরকারের ভেতর কিছু ব্যক্তি সমস্যাকে আমলে নিতে রাজী নন। যুক্তিহীন ভাবে তারা বলছে, শেখ হাসিনা সব ম্যানেজ করবে। অর্থনৈতিক সংকট কেটে যাবে। কিভাবে?-এই প্রশ্নের উত্তর কারো জানা নেই। অর্থনৈতিক সংকট যদি প্রবল হয় তাহলে সরকারের জনপ্রিয়তা প্রশ্নবিদ্ধ হতে বাধ্য। অথচ বাংলাদেশের অর্থনীতির এই দৈন্য চেহারা হবার কথা ছিলো না। সঠিক পরিকল্পনা এবং নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে আমলাদের নির্বোধ নিরীক্ষার কারণে অর্থনীতিতে বর্তমান সংকট সৃষ্টি হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহিষ্ণুতা’ নীতি গ্রহণ করলেও দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেনি। অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ কঠোর হতে পারেনি। ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপীদের বিরুদ্ধেও অসহায় সরকার। কেন পারছে না আওয়ামী লীগ? যারা অর্থ পাচার করছে, যারা দুর্নীতিবাজ, ঋণ খেলাপী তারা ক্ষমতার চারপাশে রয়েছে এমন আলোচনা বিভিন্ন সময় শোনা যায়। আমলাতন্ত্রের উপর অনেকটা নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে সরকার। আমলারা এখন সবকিছুর কর্তা। নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে আমলারা। একের পর এক ভুল সিদ্ধান্তের কারণে অর্থনীতির অবস্থা খারাপের দিকে এমনটি মনে করেন সরকারের অনেকেই। কিন্তু তারপরও অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের আমলাতান্ত্রিক বটিকার বাইরে সরকার কোন সমাধান বের করতে পারেনি। 

সাংগঠনিকভাবেও আওয়ামী লীগের মধ্যে নানারকম অস্থিরতা। দলের ভেতর চেইন অব কমান্ড ভেঙ্গে গেছে। স্থানীয় নেতারা কেন্দ্রের কথা শুনছেন না। উপজেলা নির্বাচন নিয়ে যা হচ্ছে সেটা আওয়ামী লীগের জন্য লজ্জার। সারাদেশে আওয়ামী লীগের সংগঠনের অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। গ্রুপিং, কোন্দল এখন আওয়ামী লীগের স্বাভাবিক চিত্র। অনেকেই বলবেন, আওয়ামী লীগের মতো একটা বড় দল টানা ক্ষমতায় আছে তাই বিভক্তি থাকতেই পারে। এটি নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু এই বিভক্তি যখন দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করতে শেখায়, এই বিভক্তি যখন দলের স্বার্থের পরিপন্থী অবস্থান নেয়ার জন্য প্রলুব্ধ করে, তখন তা উদ্বেগের কারণই বটে। আওয়ামী লীগ এখন সাংগঠনিকভাবে অগোছালো, নানারকম সংকটে জর্জরিত। ক্ষমতায় আছে জন্য এ সংকটগুলো দৃশ্যমান হচ্ছে না। কিন্তু দলের জন্য যারা নিবেদিত প্রাণ, তারা জানেন সংকট কোথায় এবং কতটা গভীর। কোন্দল ঠেকাতে, শৃঙ্খলা ফেরাতে দায়িত্ব প্রাপ্ত নেতারা নিষ্ক্রিয়। তাহলে এতো নেতার কাজ কি? আওয়ামী লীগ এবং সরকারে সবাই তাকিয়ে থাকেন শেখ হাসিনার দিকে। কেউ কোন সিদ্ধান্ত নেন না।

১৭ মে যখন শেখ হাসিনা দেশে ফিরেছিলেন তখন এক প্রবল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে তাকে লড়াই করতে হয়েছে। বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু নিষিদ্ধ ছিলো। এক বিরূপ বাস্তবতার মধ্য দিয়ে তাকে যেতে হয়েছে দীর্ঘ সময়। এখন দেশে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীর অভাব নেই। হাটে, মাঠে, ঘাটে আওয়ামী লীগে সয়লাব। বর্ষার বৃষ্টিতে যেমন খাল-বিলে মাছে টইটুম্বুর থাকে দেশ এখন আওয়ামী লীগ দিয়ে টইটুম্বুর হয়ে গেছে। কে আসল, কে নকল তা বোঝা ভার। আর একারণেই প্রশ্ন উঠেছে, যারা সর্বনাশা খেলায় মেতেছেন, যাদের ভুল পরামর্শে অর্থনীতির বারোটা বাজছে, যাদের কারণে আওয়ামী লীগের ভেতর কোন্দল বেড়ে যাচ্ছে, যাদের কারণে দ্রব্যমূল্যের বাজারে অস্থিরতা। তারা সরকারের চারপাশেই আছেন। তারা কি সরকারের শুভাকাঙ্খী নাকি ষড়যন্ত্রকারী? আওয়ামী লীগ যখন বিপদে পড়বে তখন এদের চেহারাটা কেমন হবে? আর আওয়ামী লীগের জন্য এখন খুবই আয়েশি সময়। আওয়ামী লীগ এক আত্মতুষ্টির আতিশায্যে দিন কাটাচ্ছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে, আলোর পরেই অন্ধকার। তাই চাটুকার, সুবিধাবাদী, এবং সুযোগ সন্ধানীদের কাছ থেকে আওয়ামী লীগকে মুক্ত করতে হবে। দেশের প্রকৃত অবস্থা উপলব্ধির চেষ্টা করতে হবে। জনগণের কাছে যেতে হবে আওয়ামী লীগকে। সরকার যদি জনবান্ধব না হয়, মানুষের জীবনে যদি সরকার স্বস্তি আনতে না পারে তাহলে জনগণও মুখ ফিরিয়ে নেয়। এটাই ইতিহাসের শিক্ষা। ১৭ মে থেকে আওয়ামী লীগকে সেই শিক্ষাই নিতে হবে। জনগণই ১৯৮১ সাল থেকে আওয়ামী লীগ সভাপতিকে সমর্থন দিয়ে তাকে রাজনীতির উচ্চ শিখরে আসীন করেছে। জনগণের ভালোবাসাতেই তিনি প্রতিকূলতাকে জয় করেছেন। জনগণই তার প্রধান শক্তি। কাজেই জনগণের সন্তুষ্টি নিশ্চিত করা আওয়ামী লীগের প্রধান কাজ। সবকিছু ঠিক আছে, বলে বাস্তবতাকে আড়াল করলে ক্ষতি হবে আওয়ামী লীগেরই। 

সৈয়দ বোরহান কবীর, নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত
ই-মেইল: poriprekkhit@yahoo.com


মন্তব্য করুন


বিজ্ঞাপন