এডিটর’স মাইন্ড

বিএনপির জন্য ‘লাল কার্ড’

প্রকাশ: ১১:০০ পিএম, ০৩ নভেম্বর, ২০২৩


Thumbnail

২৪ আগস্ট ১৯৫৪। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৩৪ তম প্রেসিডেন্ট আইসেন হাওয়ার একটি ব্যতিক্রমী আইনে স্বাক্ষর করেন। ‘দ্য কমিউনিস্ট পার্টি কন্ট্রোল এ্যাক্ট’ শিরোনামে এই আইনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। মুক্ত মত প্রকাশের দেশে একটি রাজনৈতিক দলকে রাষ্ট্রীয় ভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা যায় কিনা, তা নিয়ে তীব্র বিতর্ক হয় সেসময়। কিন্তু আইনটির পক্ষে যুক্তি হিসেবে বলা হয়েছিল ‘গণতন্ত্র এবং সন্ত্রাস এক সাথে চলতে পারে না। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে নির্বাচন ছাড়া সরকার পরিবর্তনের আর কোন পথ নেই।’ ১৯৫৪ সালের এই আইনটির অনেকগুলো ধারা বাতিল হয়েছে। অনেক রাজ্যই এই আইনকে বাতিল করেছে। কিন্তু এখনও আইনটি বহাল আছে। আইন অনুযায়ী বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ মুক্ত গণতান্ত্রিক দেশটিতে কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্র একা নয়। বিশ্বের বহুদেশে সন্ত্রাসবাদকে লালন, সংবিধান লঙ্ঘন এবং রাষ্ট্রের জন্য বিপদজ্জনক হওয়ায় বহু রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ হয়েছে এবং হচ্ছে। অনেক দেশেই একটি রাজনৈতিক দল প্রচন্ড জনপ্রিয় হবার পরও সন্ত্রাসবাদকে লালন করার অপরাধে সংগঠন করার অধিকার হারায়। 

যুক্তরাষ্ট্রের পাশের দেশ কানাডা। ১৯৪০ সালে সে দেশে উগ্র ডানপন্থী রাজনৈতিক দল ‘ন্যাশনাল ইউনিটি পার্টিকে’ নিষিদ্ধ করা হয়। কারণ একই, উগ্রবাদ এবং সন্ত্রাসবাদকে লালন। বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভারতে ৪০টিরও বেশী সংগঠন নিষিদ্ধ। এই নিষিদ্ধ সংগঠন গুলোর সবগুলোই সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে জড়িত। মাওইস্ট কমিউনিস্ট সেন্টার অব ইন্ডিয়া, ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট অব বোরোল্যান্ড, পিপলস লিবারেশন আর্মি, পপুলার ফ্রন্ট অব ইন্ডিয়া, ন্যাশনাল সোসালিস্ট কাউন্সিল অব নাগাল্যান্ডের মতো সংগঠন গুলো ভারতের অখন্ডতা এবং সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ করে। এজন্য এসব সংগগঠনকে নিষিদ্ধ করা হয়। 

ভুটান শান্তির দেশ। কিন্তু ৮০’র দশকে দেশটিতে রাজনৈতিক সন্ত্রাস ও সহিংসতা ছড়িয়ে পরে। এসময় জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল ভুটান পিপলস পার্টি। জনপ্রিয় থাকার পরও দলটিকে নিষিদ্ধ করা হয়। এখনও ভুটানে পিপলস পার্টি নিষিদ্ধ। ২০০৩ সালে ভুটানে নিষিদ্ধ করা হয় কমিউনিস্ট পার্টিকেও। ঐ সংগঠনের বিরুদ্ধেও সন্ত্রাসী তৎপরতার অভিযোগ রয়েছে। কম্বোডিয়ায় ২০১৭ সালে সরকার উৎখাতে সহিংস রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু করে ‘কম্বোডিয়া ন্যাশনাল রেসকিউ পার্টি।’ রাজনীতিতে সন্ত্রাসবাদকে প্রশ্রয় দেয়ার অভিযোগ সহ নানা অভিযোগে রেসকিউ পার্টিকে নিষিদ্ধ করা হয়। রাষ্ট্রের সংবিধান বিরোধী তৎপরতা এবং সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে মিশরে ২০১৪ সালে দুটি রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা হয়। এর মধ্যে একটি ‘এ্যন্টি ক্যু এলায়েন্স’ অন্যটি ‘ইনডিপেনডেন্ট পার্টি।’ মিশরে বিভিন্ন সময়ে এক ডজন রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই জার্মানীতে নাৎসী মতাদর্শের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা হয়। এখনও নাৎসীবাদের প্রতি নূন্যতম সহানুভূতির প্রমাণ পেলে, একটি রাজনৈতিক দলকে সাথে সাথে নিষিদ্ধ করা হয়। ১৯৯২ সালে এরকম তিনটি রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। দলগুলো হলো, জার্মান অলটারনেটিভ ন্যাশনাল অফনেসিভ, ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট। একই অভিযোগে ১৯৯৫ সালে ট্রি জার্মান ওয়ার্কাস পার্টিকেও নিষিদ্ধ করা হয়।

সন্ত্রাসী তৎপরতার অভিযোগে ২০১৮ সালে হংকং ন্যাশনাল পার্টি নিষিদ্ধ করা হয়। উগ্র ডান প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির কারণে নেদারল্যান্ডে ১৯৯৮ সালে সেন্টি পার্টিকে নিষিদ্ধ করা হয়। এরকম বহু উদাহরণ আছে।

এবার বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আসা যাক। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি নিঃসন্দেহে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় একটি রাজনৈতিক সংগঠন। কিন্তু প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এই রাজনৈতিক সংগঠনটির কার্যক্রম দেশের সংবিধান, গণতন্ত্র এবং আইন বিরোধী। বিএনপির প্রতিষ্ঠা প্রক্রিয়াটিই অবৈধ, অসাংবিধানিক এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মৌলিক চেতনার পরিপন্থী। ক্যান্টনমেন্টে এই দলের সৃষ্টি। এই দলের প্রতিষ্ঠাতা সংবিধান লঙ্ঘনকারী। অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী। দেশে গণতান্ত্রিক শাসন পুনরায় চালু হবার সাথে সাথেই দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা উচিত ছিলো। কিন্তু হয়নি। ১৯৯১ এবং ২০০১ সালের দুবার এই দলটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়। তবে, ক্ষমতায় থেকেও বিএনপি সংবিধান লঙ্ঘন করেছে। সন্ত্রাসবাদকে লালন করেছে। ২০০১ সালের অক্টোবরে নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রতিপক্ষকে নির্মূল করতে সহিংসতার নৃশংস পথ বেছে নেয়। নাৎসী কায়দায় চালায় সংখ্যালঘু এবং নিরীহ জনগণের ওপর পৈশাচিক তাণ্ডব। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার সঙ্গে বিএনপি সাংগঠনিক ভাবে জড়িত। আদালতে এটি প্রমাণিত। শুধু এই অপরাধেই দলটিকে নিষিদ্ধ করা উচিত ছিলো। অবশ্য রাষ্ট্র বিএনপিকে লাল কার্ড না দেখালেও ২০০৮ এর নির্বাচনে দেশের জনগণ ঠিকই বিএনপিকে হলুদ কার্ড দেখায়। কিন্তু এখান থেকেও বিএনপি শিক্ষা নেয়নি। ২০১৩ সালের নির্বাচনের আগে আবার বিএনপি সারাদেশে জ্বালাও পোড়াও এবং অগ্নি সন্ত্রাসের পথ বেছে নেয়। যে কারণে ১৯৫৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র আইন করে কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ  করেছিল। যে অপরাধে ১৯৯০ সালে ভুটানে নিষিদ্ধ হয়েছিল ভুটান পিপলস পার্টি। মিশরে ২০১৪ সালে যে অপকর্মের দায়ে ইনডিপেনডেন্ট পার্টি নিষিদ্ধ করা হয়-বিএনপিও সেই একই অপরাধ করেছিল ২০১৩ এবং ২০১৪ সালে। কিন্তু তখন বিএনপির বিরুদ্ধে রাষ্ট্র সাংবিধানিক ব্যবস্থা নিতে পারেনি। এটা সরকারের ব্যর্থতা। 

অনেকেই ধারণা করেছিল ২০১৫’র তথাকথিত আন্দোলনের পর বিএনপির বোধদয় হবে। তারা অনুভব করবে যে, এদেশের জনগণ জ্বালাও পোড়াও এর সহিংস রাজনীতি পছন্দ করে না। ২০১৮’র নির্বাচনের পর বিএনপি শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের পথ বেছে নেয়। ২০২২ থেকে দলটি শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশ এবং নানা কর্মসূচীর মাধ্যমে সরকার বিরোধী আন্দোলন করতে থাকে। কিন্তু ২৮ অক্টোবর বিএনপি প্রমাণ করে, তারা আসলে একটি সন্ত্রাসী দল। অতীত থেকে বিএনপি শিক্ষা নেয়নি। এতটুকু বদলায় নি।  ব্যালটের মাধ্যমে নয় বরং সন্ত্রাস ও অগ্নি সংযোগের মাধ্যমে তারা একটি নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চায়। পুলিশ বাহিনীর একজন সদস্যকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যার ভিডিও এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘুরছে। যারা পেটাচ্ছে তাদের পরিচয়ও আর গোপন নেই। এরা সবাই বিএনপির স্থানীয় পর্যায়ের নেতা। এদের নাম ঠিকানাও সবাই এখন জানে। মানুষ কত অমানবিক, পৈশাচিক হলে এভাবে সাপের মতো মানুষেকে পেটাতে পারে। এই ভিডিও দেখলে যে কারো বুক কেঁপে উঠবে। দুঃস্বপ্ন তাড়িত হবে যেকোন মানুষ। বিভৎস কায়দায় মানুষ মারার দৃশ্যের পর যদি নিহত মানুষটির অবুঝ শিশুর কান্নার দৃশ্যটি দেখেন, তাহলে আপনি আবেগ আটকে রাখতে পারবেন না। কান্নার বাঁধ ভাঙ্গা প্লাবনে আপনি সিক্ত হবেনই। কোন মানুষ এই অপরাধ সহ্য করতে পারে না। বিএনপি নেতা কর্মীরা যেভাবে রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতাল আক্রমণ করেছে, তা বিস্ময়কর। কদিন আগে ইসরায়েল গাজায় এভাবেই একটি হাসপাতাল আক্রমণ করেছিল। ঐ হামলাকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। বিশ্ব বিবেক স্তব্ধ হয়েছিল ইসরায়েলের বর্ববতায়। ঠিক একই বর্বরতা বিএনপি করেছে হাসপাতাল আক্রমণ করে। এটি জঘন্য অপরাধ। এই হামলার মাধ্যমে বিএনপি তার রাজনৈতিক অধিকার হারিয়েছে। প্রধান বিচারপতি দেশের সংবিধানের সংরক্ষক, বিচার বিভাগের প্রধান। একটি প্রতিষ্ঠান। তার বাসভবনে হামলা আসলে সংবিধানের ওপর আঘাত। সংবিধানের ওপর কোন রাজনৈতিক দল যদি আঘাত করে তাহলে সেই রাজনৈতিক দল সংবিধান লঙ্ঘনকারী, রাষ্ট্রদ্রোহী। একটি রাষ্ট্রদ্রোহী সংগঠন কোন স্বাধীন দেশে থাকতে পারে না। 

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বহুমত থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বিভিন্ন মতবাদকে ধারণ করবে, লালন করবে। তাদের চিন্তা, চেতনা এবং আদর্শের পক্ষে জনমত তৈরী করবে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাদের বক্তব্য নিয়ে জনগণের কাছে যাবে। বেশীর ভাগ জনগণ যে রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি পছন্দ করবে, নির্বাচনে তাদের ভোট দেবে। জনগণের ভোটে যারা জয়ী হবে তারা সরকার গঠন করবে। যারা সরকার গঠন করতে পারবে না, তারা সরকারের মন্দ কাজের সমালোচনা করবে। ভুল ত্রুটি ধরিয়ে দেবে। নতুন করে জনমত তৈরী করবে। এটাই গণতান্ত্রিক পদ্ধতি। যেখানে পুলিশকে সাপের মতো পিটিয়ে মারা, হাসপাতালে আগুন কিংবা নিরীহ মানুষকে কষ্ট দেয়া কোন রাজনীতি? এটা কোন রাজনীতি হবে পারে না, এটা সন্ত্রাসী তৎপরতা। এধরনের তৎপরতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া না হলে এরা থামবে না। সন্ত্রাস আর গণতান্ত্রিক রাজনীতি পাশাপাশি চলতে পারে না। গণতন্ত্রের প্রধান শত্রু সন্ত্রাসবাদ। 

২৮ অক্টোবর বিএনপি প্রমাণ করেছে, তারা একটি সন্ত্রাসী সংগঠন। খেলার যেমন নিয়ম আছে। নিয়ম না মানলে লাল কার্ড দেখানো হয়। রাজনীতিরও তেমনি নিয়ম আছে। আইন ও নিয়ম না মানলে একটি রাজনৈতিক দলকেও শাস্তি পেতে হয়। বিএনপি ২০০৮ সালে হলুদ কার্ড পেয়েছে। ২৮ অক্টোবরে বিএনপির অপরাধ ভয়ংকর। এখন তাদের আর শুধু সতর্ক করার (হলুদকার্ড) সুযোগ নেই। একটি লালকার্ড তাদের অবশ্যই প্রাপ্য। 

সৈয়দ বোরহান কবীর, নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত
ই-মেইল: poriprekkhit@yahoo.com


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

মৃত্যু বাংলাদেশে, সমাধি পাকিস্তানে

প্রকাশ: ১১:০০ পিএম, ২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪


Thumbnail

৮ ফেব্রুয়ারি ঘটনা বহুল নির্বাচনের পর পাকিস্তানের ‘দ্যা ন্যাশন’ পত্রিকার সম্পাদকীয় শিরোনাম ছিলো ‘ডেথ অফ কেয়ার টেকার গর্ভরমেন্ট সিস্টেম’ (তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার মৃত্যু)। সম্পাদকীয় শিরোনাম দেখে চমকিত হলাম। পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচন নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে দেশে-বিদেশে। এই বিতর্কিত নির্বাচন নিয়ে আরও কিছু দিন চর্চা হবে, নির্বাচনে নজির বিহীন কারচুপির পরও ইমরান খানের দল ভোট বিপ্লব ঘটিয়েছে। নওয়াজ আর বিলওয়ালের ঐক্য পাকিস্তানের জনগণ কতটা গ্রহণ করেছে? এই প্রথম সেনাবাহিনী নির্বাচনী পরিকল্পনায় হোঁচট খেয়েছে। পাকিস্তানে ভেস্তে গেছে মার্কিন পরিকল্পনা-ইত্যাদি নানা বিষয় নিয়ে বিভিন্ন জনের মত উঠে আসছে বিশ্বের গণমাধ্যমে। কিন্তু আমার চোখ আটকে আছে পাকিস্তানে কেয়ার টেকার সরকার ব্যবস্থার মৃত্যুর খবরে। তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার জন্ম হয়েছিল পাকিস্তানে। জামায়াতের তত্বাবধানে পাকিস্তান থেকে এই মডেল আমদানি করা হয়েছিল বাংলাদেশে। এক যুগ আগেই বাংলাদেশ তত্বাবধায়ক সরকারকে বিদায় দিয়েছে। পাকিস্তানি এই ‘গণতন্ত্রের মডেল’ অবশ্য বাংলাদেশে পাকিস্তান পন্থীরা এখনও আঁকড়ে ধরে আছে। এবার পাকিস্তানের নির্বাচনের পর বাংলাদেশে তত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষের উকিলরা কি বলবেন?  

বিশ্বে কেয়ার টেকার বা তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রবর্তক হলেন সামরিক একনায়ক জিয়াউল হক। ১৯৮৮ সালে মোহাম্মদ জুনেজুকে অপসারণ করেন। তার অনুগতদের মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দিয়ে যে নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করেন তার নাম দেন ‘কেয়ার টেকার সরকার’। সামরিক এক নায়কের আবিস্কৃত এই তত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি দেশটিতে স্থায়ী রূপ পায় ১৯৯০ সালের ৬ আগস্ট। পাকিস্তানে গোলাম মোস্তফা জাতুই প্রথম তত্বাবধায়ক সরকার প্রধান। তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের বাহ্যিক লক্ষ্য হিসেবে বলা হয়েছিল অবাধ, সুষ্ঠু এবং প্রভাবমুক্ত নির্বাচন আয়োজন নিশ্চিত করা। কিন্তু এর অর্ন্তনিহিত তাৎপর্য ছিলো নির্বাচনের পুরো নিয়ন্ত্রণ সেনাবাহিনীর কাছে রাখা। তত্বাবধায়ক সরকারের নামে একটি পুতুল সরকারকে নির্বাচনকালীন সময়ে ক্ষমতায় বসানো হয়। যার রিমোট কন্ট্রোল থাকে সেনাবাহিনীর সাথে। সেনাবাহিনী যাকে নির্বাচনে জেতাতে চায়-তত্বাবধায়ক সরকার এবং নির্বাচন কমিশন তাদের হয়ে কাজ করে এবং জিতিয়ে আনে। তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতার চিরস্থায়ী মালিকানা নেয় পাকিস্তানের সেনাবাহিনী। 

এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে ফ্যাসিষ্ট জামায়াত রাজনৈতিক দল হিসেবে মূলধারার রাজনীতিতে ফিরে এসেছিল। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের এক পর্যায়ে জামায়াত কৌশলে কেয়ার টেকার সরকারের পাকিস্তানি মডেল রাজনীতির মাঠে ছেড়ে দেয়। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির তখন প্রধান লক্ষ্য ছিলো এরশাদকে ক্ষমতা থেকে হটানো। জামায়াতের কেয়ার টেকার সরকারের অস্পষ্ট ধারণাকে পূর্ণতা দেয় আওয়ামী লীগ। পান্থপথের জনসভায় আওয়ামী লীগ সভাপতি তত্বাবধায়ক সরকারের এক পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা ঘোষণা করেন। ৭৫ এর পর বাংলাদেশের রাজনীতিও পাকিস্তানি ধারায় চলতে শুরু করে। ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নেয় সেনাবাহিনী। বার বার সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে পাঠানো হয় নির্বাসনে। রাজনীতিবিদ, আমলাদের চেয়ে সেনাবাহিনী হয়ে ওঠে অনেক বেশী ক্ষমতাবান। ঐ বাস্তবতায় গণতন্ত্রে উত্তরণে ‘তত্বাবধায়ক’ সরকার ছিলো একটি সাময়িক সমাধান। ৯১ এর নির্বাচনে বাংলাদেশে প্রথম তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু হয়। পাকিস্তানের কেয়ার টেকার সরকার ব্যবস্থার কয়েক মাস পর। কিন্তু শুরুতেই তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা গণতন্ত্রের মৌলিক চেতনাকে আঘাত করে। সংবিধান লঙ্ঘন করে। একজন প্রধান বিচারপতিকে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব দেয়া হয়। বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হয়ে প্রধান বিচারপতির পদ ছাড়েননি। উপরন্ত নির্বাচনের পর তাকে প্রধান বিচারপতি পদে ফেরাতে রাজনৈতিক দলগুলো সংবিধান সংশোধন পর্যন্ত করে। এটি নজির বিহীন অন্যায়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে সুশীল সমাজের সুপ্ত ক্ষমতার লোভ জাগ্রত হয়। তারা অনুভব করে, রাজনৈতিক দলগুলো এই তত্বাবধায়ক সরকারের মাধ্যমে একান্ত অনুগত রাখা যায়। 

৯১, ৯৬ এবং ২০০১ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের রাজনীতিতে সুশীল সমাজের প্রভাব বাড়ে। তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা আসলে এমন এক ব্যবস্থা যেখানে ৯০ দিনের জন্য বসা ক্ষমতাবানরা পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য জাতির ভাগ্য নির্ধারণ করে। এই ব্যবস্থায় নির্বাচন বাইরে থেকে সুন্দর পরিপাটি, ভেতরে পরিকল্পিত কারচুপি। তত্বাবধায়ক সরকার কাকে নির্বাচিত করতে চায়, তার একটি বার্তা তারা আগে থেকেই পায়। সুশীল এবং বিদেশী প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলো যার ব্যাপারে সবুজ সংকেত দেয়, নির্বাচনে তারই জয় হয়। বাংলাদেশে তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় বিরাজনীতিকরণ বাস্তবায়নে নতুন কৌশল নেয়া হয়। একটি রাজনৈতিক দল যেন পরপর দুবার ক্ষমতায় না আসে, সেটি নিশ্চিত করা হয় এই ব্যবস্থায়। বিএনপির পর আওয়ামী লীগ আবার বিএনপি। ৫ বছর পরপর ক্ষমতার পট পরিবর্তনের রীতি চালু হয়। একটি রাজনৈতিক দল, একটি সুনির্দিষ্ট কর্মসূচী এবং পরিকল্পনা নিয়ে ভোটে যায়। জয়ী হবার পর মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে সেই কর্মসূচী সম্পন্ন করা কিংবা তার ইতিবাচক ফলাফল জনগণের সামনে তুলে ধরা অসম্ভব। আবার বাংলাদেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের অবস্থান দুই মেরুতে। একটি দল সরকার গঠন করে যে সব উদ্যোগ গ্রহণ করে, অন্যদল পাঁচ বছর পর এসে সব বাতিল করে দেয়। ফলে কোন রাজনৈতিক দলের কর্মসূচীর ধারাবাহিকতা থাকে না। সুফল পায় না। কমিউনিটি ক্লিনিক কার্যক্রমের কথাই ধরা যাক। আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৭ সালে কমিউনিটি ক্লিনিক কার্যক্রম শুরু করে। প্রান্তিক জনগণ এর সুফল পেতে শুরু করার আগেই বিএনপি-জামায়াত জোট ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে কমিউনিটি ক্লিনিক বন্ধ করে দেয়। এরকম অনেক উদাহরণ দেয়া যায়। সে বিতর্কে আমি এখন যেতে চাই না। একটি সরকারের ধারাবাহিকতা না থাকলে, বাংলাদেশের মতো দেশ গুলোতে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকে না। এর ফলে গণতন্ত্র এবং রাজনৈতিক সরকারের ওপর জনগণের অনীহা তৈরী হয়। রাজনৈতিক সরকার গুলো দেশ পরিচালনায় দক্ষ নয়, এমন একটি মনোভাব সৃষ্টি হয়। এই পরিস্থিতির সুযোগ নেয়, অনির্বাচিত গোষ্ঠী। 

পাকিস্তানে কেয়ার টেকার পদ্ধতির মাধ্যমে যেমন রাষ্ট্র ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নেয় সেদেশের সেনাবাহিনী। ঠিক তেমনি বাংলাদেশে তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নেয় বিদেশী প্রভু এবং তাদের অনুগত সুশীল সমাজ। বাংলাদেশে তত্বাবধায়ক সরকারের কাঠামো করা হয় এমন ভাবে যে, তা আসলে সুশীলদের অনির্বাচিত সরকার। সংবিধান তাদের রুটিন কাজের দায়িত্ব দিলেও অপছন্দের দলকে হারাতে এরা সব কিছু করে। জনগণের ভোট নয়, তত্বাবধায়ক সরকারে কারা থাকছে তার ওপর নির্ভর করে নির্বাচনের ফলাফল। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এসে ক্ষমতায় থাকার এই সূত্রটি প্রথম আবিস্কার করে। তত্বাবধায়ক সরকার প্রধান হিসেবে বিচারপতি কে.এম. হাসানকে অভিষিক্ত করতে ক্ষমতাসীন জোট সংবিধান সংশোধন করে। তিন স্তরে দলীয় ক্যাডার দিয়ে প্রশাসন সাজায়। একটি প্রহসনের নির্বাচন কমিশন গঠন করে। দেড় কোটি ভুয়া ভোটার সৃষ্টি করা হয়। সার্বিক ভাবে এমন একটি আবরণ তৈরী করা হয় যে, নির্বাচন যেভাবেই হোক বিএনপি আবার ক্ষমতায় আসবে। বাংলাদেশে তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার মৃত্যু হয় তখনই। বিএনপি-জামায়াত জোট পুতুল রাষ্ট্রপতি ড. ইয়াজউদ্দিন আহমেদকে তত্বাবধায়ক সরকার প্রধান করে, এই ব্যবস্থার কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয়। রাজনৈতিক দলগুলোর অনঢ় অবস্থান, ক্ষমতায় টিকে থাকার উদগ্র বাসনা সুশীলদের জন্য অভাবনীয় সুযোগ সৃষ্টি করে। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনা সমর্থনে বাংলাদেশে একটি সুশীল কু সংগঠিত হয়। দুই বছর জগদ্দল পাথরের মতো চেপে থাকে অক্ষম, অযোগ্য একটি সুশীল সরকার। এসময় বাংলাদেশে তত্বাবধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে একটি জাতীয় ঐক্যমত তৈরী হয়। আওয়ামী লীগ-বিএনপি সবাই তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে কাঠগড়ায় দাড় করায়। সীমাহীন নানা সংকটের মুখে সুশীল সরকার একটি নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়। এসময় বাংলাদেশ সুপ্রীম কোট এক ঐতিহাসিক রায়ে তত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতিকে বাতিল ঘোষণা করে।

বাংলাদেশ সব কিছুতেই পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে। ৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের পর গত ৫২ বছরে বাংলাদেশ নানা ঘাতপ্রতিঘাত পেরিয়ে যতটা এগিয়েছে, পাকিস্তান ঠিক ততোটাই পিছিয়েছে। বিশ্বে বাংলাদেশ যতটা অনুকরণীয় সম্ভাবনাময় রাষ্ট্র, পাকিস্তান ঠিক ততোটাই বর্জনীয় ব্যর্থ রাষ্ট্র। পাকিস্তানিদের কেয়ার টেকার পদ্ধতি ডাষ্টবিনে ফেলে দিয়ে বাংলাদেশ প্রমাণ করেছে, গণতান্ত্রিক চেতনাতেও তারা পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে। কিন্তু বাংলাদেশে পাকিস্তানের প্রেত্মাত্বারা এখনও সজাগ, সক্রিয়। সর্বোচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তের পরও কেউ কেউ তত্বাবধায়ক সরকার পূণ:বহালে দাবী করে আসছে। ২০১৪ সালে এই দাবীতে বিএনপি নির্বাচন বর্জন করে। এর পেছনে ছিলো পাকিস্তানপন্থীদের ভুল রাজনৈতিক হিসেব। ২০২৪ সালে নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি ২০১৪ সালের চেয়েও বড় ভুল করে। সুশীলরা কেন তত্বাবধায়ক সরকার চায়, তা সহজেই বোঝা যায়। এর মাধ্যমে জনরায় ছাড়াই সুশীলরা ক্ষমতার হালুয়া রুটির ভাগ পায়। কিন্তু বিএনপি কেন তত্বাবধায়ক সরকার চায় তা অনুভব করতে হলে দলটির জন্ম ও মনস্তত্ব বুঝতে হবে। বিএনপি মূলত: পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের গর্ভজাত সন্তান। বাংলাদেশে পাকিস্তানের স্বার্থ সংরক্ষণই দলটির প্রধান এজেন্ডা। গভীর মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, পাকিস্তানে যখন সেনাবাহিনী তরতাজা থাকে, তখন বিএনপির মধ্যেও তেজী ভাব লক্ষ্য করা যায়। এখন অর্থনেতিক সংকটে জর্জরিত পাকিস্তান। নিজের দেশেই কোণঠাসা পাকিস্তানের সেনাবাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থা। বিএনপিকে তারা চাঙ্গা করবে কিভাবে। পাকিস্তানে অস্থিরতা মানেই বিএনপি পথ হারা। পাকিস্তান যত দেউলিয়া এবং ব্যর্থ হবে ততোই বিএনপি ক্ষয়িষ্ণুও হবে। এটাই সমীকরণ। পাকিস্তানের বহুল আলোচিত, বিতর্কিত নির্বাচনের পর সেদেশের তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রশ্নের মুখে। সাধারণ গণতন্ত্রকামী মানুষ এই ব্যবস্থাকে সেনাবাহিনীর ‘পুতুল’ বলছে। পাকিস্তানে যদি গণতন্ত্র অব্যাহত রাখতে হয় তাহলে সেখানে কেয়ার টেকার পদ্ধতি বাতিল করতেই হবে। পাকিস্তানে তত্বাবধায়ক সরকার বাতিল হলে, বাংলাদেশের সুশীলরা কি করবে? কি করবে বিএনপি-জামায়াত? তত্বাবধায়ক সরকারের মৃত্যুতে তারা একটি শোক প্রস্তাব নিতেই পারে। যে ব্যবস্থাটি গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর, সেই ব্যবস্থা বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে চায় কারা? নিশ্চয়ই গণতন্ত্রের শত্রুরা।

সৈয়দ বোরহান কবীর, নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত
poriprekkhit@yahoo.com


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে হেভিওয়েট নেতাকে আনা হচ্ছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে?

প্রকাশ: ১০:০০ পিএম, ২০ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪


Thumbnail

সরকারের এখন সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ দ্রব্যমূল্য। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের জন্য একের পর এক পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার। বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে কথা বলছে, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এখন দম ফেলার সময় নেই। তারা বিভিন্ন রকমের উদ্যোগ, কর ছাড়, শুল্ক ছাড় সহ নানামুখী পদক্ষেপ নিচ্ছে। কিন্তু তারপরও এখন পর্যন্ত তারা দ্রব্যমূল্যে লাগাম টেনে ধরতে পারেনি। দ্রব্যমূল্যের লাগাম টেনে ধরাই সরকারের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। 

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও বলেছেন, তার সরকার বসে নেই। দ্রব্যমূল্য মূল্য নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকার চেষ্টা করে যাচ্ছে। রমজান আসতে অল্পদিন বাকি রয়েছে। এর মধ্যে যদি দ্রব্যমূল্যকে সহনীয় না রাখা যায়, অন্তত স্থিতিশীল রাখা না যায় তাহলে পরিস্থিতি সামনের দিকে খারাপ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এরকম বিষয়টি নিয়ে সরকারের নীতি নির্ধারক মহলে আলোচনা হচ্ছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মতো একটা স্পর্শকাতর মন্ত্রণালয়ে একজন তরুণ প্রতিমন্ত্রীকে দেওয়াটা কতটুকু নিরাপদ এবং যুক্তিসঙ্গত সেটি নিয়েও কোন কোন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। 

নতুন প্রতিমন্ত্রী অবশ্য যথেষ্ট পরিশ্রম করছেন এবং আগের পূর্ণমন্ত্রীর চেয়ে এখন পর্যন্ত তিনি সংযত এবং তার দৃশ্যমান চেষ্টা লক্ষণীয়। কিন্তু বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং বাজারে যারা বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী আছে তাদের সঙ্গে দর কষাকষি করে তাদের লাভের লাগাম টেনে ধরার মতো কঠিন কাজটা একজন আওয়ামী লীগের তরুণ নেতার পক্ষে কতটুকু সম্ভব এ নিয়ে কোন কোন মহলে ব্যাপক প্রশ্ন উঠেছে। আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারক মহলেও এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এই কারণেই দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে একজন হেভিওয়েট নেতাকে দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে এমন গুঞ্জন রয়েছে। 

আওয়ামী লীগের মধ্যে আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র বলছে, আওয়ামী লীগের প্রায় সবাই মনে করেন যে, মন্ত্রিসভায় আছেন বা মন্ত্রিসভার বাইরে আছেন এমন একজন ব্যক্তি গুরুত্বপূর্ণ জনপ্রিয় নেতাকে এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কারণ এই মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের সাথে কথাবার্তা বলতে হয়, তাদের সঙ্গে দর কষাকষি করতে হয় এবং একজন রাজনৈতিক নেতার পক্ষে এটাই যতটা সহজ অন্য কারও পক্ষে ততটা সহজ নয়। 

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা তোফায়েল আহমেদের উদাহরণ দিয়েছেন। দুই মেয়াদে তোফায়েল আহমেদ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন এবং এসময় দ্রব্যমূল্যকে নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রে তিনি যথেষ্ট সফল ছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সঙ্গে তার সুসম্পর্ক থাকাটাকে তিনি কাজে লাগিয়েছিলেন। আর অন্যদিকে টিপু মুনশি এবং ২০০৮ এর আংশিক সময়ে ফারুক খান এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হিমশিম খেয়েছেন, রীতিমতো ব্যর্থ হয়েছেন। 

ফারুক খানকে একটা পর্যায়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে দেওয়া হলেও টিপু মুনশি পাঁচ বছর ধরে এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করে সরকারের এবং নিজের বদনাম করেছেন মাত্র। এখন দলের যদি কোন সিনিয়র নেতাকে এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় তাহলে সরকারের পক্ষ থেকে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকার যে কতটা আগ্রহী এবং সর্বাত্মক সেরকম একটি বার্তা দেওয়া সম্ভব হবে। 

বিভিন্ন মহল মনে করেন এখন যারা মন্ত্রিসভায় আছেন তাদের মধ্যে অন্তত তিনজন আছেন যারা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের চেহারা দৃশ্যমান ভাবে পালন করতে পারবেন। আবার অনেকে মনে করেন মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হননি এমন কোন নেতারাও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়ে চালাতে পারবেন। তবে কোন টেকনোক্র্যাট বা আমলা নন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে একজন জনপ্রিয় গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিবিদের আসা উচিত বলে মনে করেন অধিকাংশ সাধারণ মানুষ।

দ্রব্যমূল্য   বাণিজ্য মন্ত্রণালয়  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

চুক্তির ভারে নুয়ে পড়েছে প্রশাসন

প্রকাশ: ০৫:০০ পিএম, ১৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪


Thumbnail

আরও একজন সচিব চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেলেন। রেলওয়ের সচিব ড. মোঃ হুমায়ুন কবীরের চাকরির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি। তার আগেই গত ১৫ ফেব্রুয়ারি তাকে এক বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সচিব হিসেবে ড. মোঃ হুমায়ুন কবীর খুব একটা দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন, এমন কোন প্রমাণ নেই। জনমনে তার কোন কর্মকাণ্ড নিয়ে উচ্ছ্বাস-উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে, এমন কোন দৃষ্টান্তও নেই। ছাত্রজীবনে তার রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তার সহকর্মীরা অনেকেই দাবি করেন যে, তিনি ছাত্রজীবনে বিরুদ্ধ মতের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তারপরও রেলপথ মন্ত্রণালয়ে তিনি আরও এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেলেন। এর ফলে মোট সচিবদের প্রায় অর্ধেকই এখন চুক্তিতে নিয়োগ পেয়েছেন। সচিবালয়ে এ নিয়ে তোলপাড় চলছে। 

একজন সচিব চুক্তিতে নিয়োগ পেলে অন্তত এক ডজন ব্যক্তির পদোন্নতি রুদ্ধ হয়ে যায়। এখন ১৫তম ব্যাচ সচিব হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। প্রশাসন ক্যাডারের অনেকগুলো ব্যাচ রয়েছে যারা এখনও পর্যন্ত পদোন্নতির অপেক্ষায় আছেন। তাছাড়া ১০, ১১ এবং ১৩ ব্যাচের অনেক যোগ্য কর্মকর্তা রয়েছেন যারা সচিব হওয়ার অপেক্ষায়। এই পর্যায়ে নির্বাচনের পর পর নতুন সরকার রেলওয়ের সচিবকে কোন যোগ্যতায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিলেন তা নিয়ে সচিবালয়ে বিস্ময় সৃষ্টি হয়েছে। 

বর্তমানে প্রশাসনের শীর্ষ সব কর্মকর্তাই চুক্তিতে নিয়োগপ্রাপ্ত। আর এই চুক্তির কারণে চিলে চ্যাপটা হয়েছে প্রশাসন। চুক্তির ভারে প্রশাসন যান এখন চলতে ফিরতে পারছে না। 

বর্তমানে যে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা চুক্তিতে আছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোঃ মাহবুব হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মোঃ তোফাজ্জল হোসেন মিয়া, প্রধানমন্ত্রীর এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক মো. আখতার হোসেন, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ বা এনবিআরের চেয়ারম্যান আবু হেনা মোঃ রহমাতুল মুনিম, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মাসুদ বিন মোমেন, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চলের নির্বাহী চেয়ারম্যান সিনিয়র সচিব পদমর্যাদায় শেখ ইউসুফ হারুন, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান লোকমান হোসেন মিয়া, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব তপন কান্তি ঘোষ, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব গোলাম মোঃ হাসিবুল আলম, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব কে এম আব্দুস সালাম, জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব জনাব মোস্তাফিজুর রহমান, রাষ্ট্রপতির সচিব সম্পদ বড়ুয়া, রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে সংযুক্ত ওয়াহিদুল ইসলাম খান, বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারম্যান প্রদীপ রঞ্জন চক্রবর্তী, বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত সচিব জনাব মোকাম্মেল হোসেন, ইরাকে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ফজলুল বারী, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের চেয়ারম্যান এ বি এম আজাদ, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরী, গৃহায়ন পূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিন, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান যিনি সচিব পদমর্যাদায় আছেন জনাব মো. আনিসুর রহমান মিয়া। 

এছাড়াও এডিবির বিকল্প নির্বাহী পরিচালক ফাতেমা ইয়াসমিন এবং বিশ্ব ব্যাংক ওয়াশিংটন থেকে সদ্য পদত্যাগ করা প্রধানমন্ত্রী সাবেক মূখ্য সচিব ড. আহমেদ কায়কাউস এখন চুক্তির তালিকায় রয়েছেন। কারণ, ড. কায়কাউসের পদত্যাগপত্র বিশ্ব ব্যাংকের বোর্ডসভায় এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত অনুমোদিত হয়নি। 

গুরুত্বপূর্ণ সব মন্ত্রণালয়সহ সচিবদের অর্ধেকই এখন চুক্তিতে নিয়োগপ্রাপ্ত। আর এই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের হিড়িকে মেধাবী-দক্ষ কমকর্তারা পিছিয়ে পড়ছেন। নতুন করে হুমায়ুন কবীরের চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া নিয়ে সচিবালয়ে প্রশ্ন উঠেছে, বিতর্ক উঠেছে, বিষয়টি সমালোচিত হচ্ছে।

চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ   প্রশাসন  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

ড. ইউনূসই কি আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ১৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪


Thumbnail

সাড়ে তিন মাস কারাভোগের পর গত ১৫ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পান বিএনপির শীর্ষ দুই নেতা। মির্জা ফখরুল-আমীর খসরুর মুক্তির দিনে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশের প্রধান খবর ছিল ড. ইউনূস। ওইদিন সকালে গ্রামীণ কল্যাণ অফিসে গিয়ে ড. ইউনূস অভিযোগ করেন, তার আটটি প্রতিষ্ঠান জবরদখল হয়েছে। নির্বাচনের পর বিএনপির চেয়ে বেশি আলোচনায় শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস। শ্রম আদালতের একটি মামলায় তিনি ছয় মাসের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন। অর্থ পাচার ইস্যুতে তার বিরুদ্ধে চার্জশিট দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন। আদালতের অনুমতি ছাড়া তার বিদেশযাত্রার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। সর্বশেষ ‘গ্রামীণ কল্যাণ’কে তার আসল মালিক ‘গ্রামীণ ব্যাংকে’র কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এসব আইনি প্রক্রিয়া স্বাভাবিক এবং সহজাত। কিন্তু ড. ইউনূস এবং তার দেশি-বিদেশি বন্ধুরা এটিকে আক্রোশ হিসেবেই মনে করছেন। ড. ইউনূস প্রসঙ্গে উদ্বেগ জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। ড. ইউনূসের প্রথম স্ত্রীর কন্যা সিএনএনকে এক সাক্ষাৎকারে সরকারের সঙ্গে সমঝোতার যে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, সেটিও সরকার আমলে নেয়নি। ড. ইউনূস ক্রমেই আন্তর্জাতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছেন। ৭ জানুয়ারির নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সরকার বিএনপির ব্যাপারে যত উদার ও নমনীয়, ড. ইউনূসের ব্যাপারে ততই কঠোর, কঠিন। আওয়ামী লীগের এ কৌশলের রাজনৈতিক তাৎপর্য অনুধাবন করাটা জরুরি। সরকার বিএনপি বা অন্য বিরোধী দলের চেয়ে ড. ইউনূসের ব্যাপারে বেশি মনোযোগী কেন? নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর থেকে আওয়ামী লীগের পরিবর্তিত এই রাজনৈতিক কৌশল থেকে সরকারের আসল প্রতিপক্ষ কে তার একটা ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কাগজে-কলমে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ জাতীয় পার্টি। সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দলই ক্ষমতাসীনদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু মাত্র ১১ জন সংসদ সদস্য নিয়ে জাতীয় পার্টি নিজেই নিজেদের বিরোধী দল ভাবতে লজ্জা পায়। জাতীয় পার্টির যে অবস্থা তাতে তাদের পক্ষে সরকারকে চ্যালেঞ্জ জানানো অসম্ভব। ছায়া সরকার গঠনের মতো সদস্যও তাদের সংসদে নেই। আওয়ামী লীগের অনুগ্রহ নিয়েই তারা বেঁচে আছে। সংসদের বাইরে আওয়ামী লীগের একমাত্র রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি এবং তার মিত্ররা। নির্বাচন এবং নতুন সরকার গঠনের পরও বিএনপি আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েই চলেছে। লিফলেট বিতরণ, কালো পতাকা কর্মসূচি নিয়ে দলটি হতাশা আর ব্যর্থতার বৃত্ত থেকে বেরোনোর চেষ্টা করছে। ২৮ অক্টোবরের পর বিএনপির বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। অনেকেই ছিলেন পলাতক। নির্বাচনের পর তারা কারাগার এবং আত্মগোপন থেকে বেরিয়ে আসছেন। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও মুক্তি পেয়েছেন। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটি নতুন করে আন্দোলন শুরু করতে চায়। কিন্তু ভুল কৌশল এবং ব্যর্থ নেতৃত্বের কারণে এখন বিএনপি পথহারা। নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা। দলের সাংগঠনিক অবস্থা শোচনীয়। দলের ভেতর থেকেই এখন ব্যর্থ নেতৃত্বের সরে দাঁড়ানোর দাবি উঠেছে। বিদেশি বন্ধুরা আগের মতো বিএনপিকে আশা-ভরসা দিচ্ছে না। সবকিছু মিলিয়ে দলটি এলোমেলো, বিধ্বস্ত, বিপর্যস্ত। এই বিএনপি আওয়ামী লীগকে এখনই চাপে ফেলতে পারে—এমনটি তাদের নেতারাও আশা করেন না। গত বৃহস্পতিবার মির্জা ফখরুল ও আমীর খসরু মাহমুদের মুক্তিতে কর্মীরা কিছুটা হলেও উজ্জীবিত। কিন্তু মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একটি নতুন সরকারের বিরুদ্ধে চটজলদি বড় আন্দোলন গড়ে তুলতে পারবেন না। সামনে রমজান, তারপর ঈদুল আজহা, এরপর বর্ষাকাল। আগামী কিছুদিন আন্দোলনের সময় নয়। আওয়ামী লীগ বুঝেশুনেই বিএনপিকে দল গোছানোর সুযোগ দিয়েছে। বিএনপির নেতাদের মুক্তির ব্যাপারেও সরকার উদার। নির্বাচনী কৌশলে বিএনপিকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেছে আওয়ামী লীগ। এখন বিএনপির প্রতি আওয়ামী লীগের এক ধরনের উপেক্ষা এবং করুণা লক্ষ করা যায়। বিএনপি এখন আওয়ামী লীগের ভয়ংকর শত্রু না। বরং বিএনপি ধুঁকে ধুঁকে বাঁচলে আওয়ামী লীগের লাভ। না হলে দেশ রাজনীতিশূন্য হবে। জঙ্গিবাদ ও উগ্র সন্ত্রাসী শক্তির উত্থান ঘটবে। বিএনপির সঙ্গে কথার বাহাস না করলে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই বেকার হয়ে যাবেন। বিএনপির বলয়ের বাইরে যেসব বাম ও উগ্র ডান কট্টর মৌলবাদী দলগুলো আছে, তাদের শক্তি সম্পর্কে আওয়ামী লীগ ভালোভাবেই অবগত। ইসলামী দলগুলো বশীভূত রাখার কৌশলও আওয়ামী লীগ রপ্ত করেছে বহু আগেই। নির্বাচনের আগে যেমনটি মনে করা হয়েছিল যে আন্তর্জাতিক চাপ আসবে। একতরফা নির্বাচন সরকারকে চাপে ফেলবে, সেটি হয়নি। বাংলাদেশের ব্যাপারে ভারতের বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। নতুন সরকারের সঙ্গে অংশীদারত্বের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বার্তা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। ফ্রান্স, যুক্তরাজ্যের অভিনন্দন আওয়ামী লীগকে করেছে চাপমুক্ত। নিষেধাজ্ঞা, স্যাংশন নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের চেহারায় যে আতঙ্কের চাপ দেখা যেত, সেটাও এখন নেই।

দ্রব্যমূল্য, অর্থনীতি ছাড়া এ সরকারের সামনে দৃশ্যত কোনো সংকট নেই। আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষরা এখন বাঘ থেকে বিড়ালে পরিণত হয়েছে। দেশে টানা চতুর্থবারের মতো ক্ষমতায় আসা দলটিকে চ্যালেঞ্জ জানানোর কেউ নেই। একজন ছাড়া, তিনি ড. ইউনূস। আওয়ামী লীগ সভাপতি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দূরদর্শী রাজনীতিবিদ। আওয়ামী লীগ যে টানা ক্ষমতায় আছে তার প্রধান কারণ শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা। তার রাজনৈতিক কৌশলেই বেগম খালেদা জিয়া এবং বিএনপি ধরাশায়ী হয়েছে। তিনি দূর ভবিষ্যৎ দেখতে পান। শত্রু-মিত্র চিনতে খুব একটা ভুল করেন না। শেখ হাসিনা জানেন তাকে এবং আওয়ামী লীগকে যদি কেউ চাপে ফেলতে পারে সেটা ড. ইউনূস। বাংলাদেশে রাজনৈতিক আন্দোলন করে সরকার পতনের দিন শেষ হয়ে গেছে বহু আগেই। মানুষ এখন ভীষণ আত্মকেন্দ্রিক। চায়ের আড্ডায় কিংবা টকশো দেখে ড্রইংরুমেই তারা রাজা-উজির মারেন। রাস্তায় গিয়ে আন্দোলন করতে আগ্রহী নন। তরুণ প্রজন্ম রাজনীতিবিমুখ। তাই নব্বইয়ের মতো আন্দোলন বাংলাদেশে এখন অলীক কল্পনা। হত্যা-ক্যু-ষড়যন্ত্র করে সরকার হটানো এখন অসম্ভব। আমাদের সশস্ত্র বাহিনী এখন পেশাদার, আন্তর্জাতিক মানের। তারা পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর মতো সবকিছুতে নাক গলায় না। তা ছাড়া সংবিধানের ‘৭ক’ অনুচ্ছেদের মাধ্যমে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের পথ চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পেছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতা দখল করলে, একদিন তাকে কাঠগড়ায় ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ হিসেবে দাঁড়াতেই হবে। সরকারকে একমাত্র চাপে ফেলতে পারে বিদেশি শক্তি। যুক্তরাষ্ট্র এবং তার পশ্চিমা মিত্ররা যে বাংলাদেশের মতো একটি রাষ্ট্রে কী করতে পারে তা তো আমরা প্রতিনিয়তই দেখছি। গত দুই বছর মার্কিন চাপে আওয়ামী লীগ রীতিমতো আতঙ্কে ছিল। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি নিজেই বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যে কোনো দেশে ক্ষমতার ওলটপালট ঘটাতে পারে।’ তিনি মার্কিন চাপ সম্পর্কে এটাও বলেছিলেন, ‘তারা হয়তো চায় না আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকুক।’ দেশে দেশে মার্কিন স্বার্থরক্ষায় নিজস্ব ব্যক্তি রয়েছেন। এসব ব্যক্তির প্রভাব মার্কিন নীতিনির্ধারকদের মধ্যে প্রবল। এমনই একজন ড. ইউনূস। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ খেতাবপ্রাপ্ত। হিলারি ও বিল ক্লিনটন তাকে নোবেল পাইয়ে দিয়েছেন, এই তথ্য বিল ক্লিনটন তার লেখা বইতেই স্বীকার করেছেন। বয়সের কারণে যখন ড. ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ হারান, তখন হিলারি যেভাবে ড. ইউনূসের পক্ষে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, তাতেই বোঝা যায় ড. ইউনূস তাদের কত আপন। তিনি এবং তার অনুসারীরা সুযোগ পেলেই আওয়ামী লীগকে বেকায়দায় ফেলতে চান—এমন অভিযোগ আওয়ামী লীগ সবসময়ই করে। বাংলাদেশে একটি দীর্ঘমেয়াদি অনির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতায় বসানোর মূল পরিকল্পনা ড. ইউনূস ও তার বন্ধুদের। সুশীল গোষ্ঠী ক্ষমতায় বসলে বঙ্গোপসাগর, সেন্টমার্টিন, তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের ঠিকাদারি সব পাবে যুক্তরাষ্ট্র। তাই কখনো প্রকাশ্যে বা কখনো গোপনে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের নিরন্তর চেষ্টা চালান ড. ইউনূসের নেতৃত্বে সুশীল সমাজ। এর সংঘবদ্ধ রূপ ছিল ২০০৭ সালের এক-এগারো। ২০০৬ সালে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পরপরই ড. ইউনূস বাংলাদেশে মার্কিন এজেন্ডা বাস্তবায়নে মাঠে নেমেছিলেন। প্রথমে রাজনৈতিক দল করে তিনি ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু ড. ইউনূস ঝানু ব্যবসায়ী। সুদ-আসলের হিসাব তিনি ভালো বোঝেন। জনগণের ভোটে জেতা তার পক্ষে অসম্ভব এটা বুঝতে তিনি সময় নেননি। এরপরই আসে এক-এগারো। অনেকেই মনে করেন, এক-এগারোর মাস্টারপ্ল্যান ড. ইউনূসের মস্তিষ্কপ্রসূত। মঈন ইউ আহমেদের আত্মজীবনীমূলক ‘শান্তি স্বপ্নে, সময়ের স্মৃতিচারণ’ গ্রন্থে ড. ইউনূসের উচ্চাভিলাষের একঝলক প্রমাণ পাওয়া যায়। বইটির ৩২৮ ও ৩২৯ পৃষ্ঠায় মঈন ইউ লিখেছেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান হওয়ার অনুরোধ জানিয়ে তিনি (মঈন) ড. ইউনূসকে ফোন করেছিলেন। উত্তরে শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশকে তিনি যেমন দেখতে চান সেরকম বাংলাদেশ গড়তে খণ্ডকালীন সময় যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশকে তিনি আরও দীর্ঘ সময় ধরে সেবা দিতে চান।’ তিনি নিজে অনির্বাচিত সরকারপ্রধান না হয়ে ড. ফখরুদ্দীন আহমদকে এ দায়িত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন। ড. ইউনূসের দীর্ঘমেয়াদে দেশ সেবার মহাপরিকল্পনা এখনো বাতিল হয়নি। ক্লিনটন পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সূত্রে ড. ইউনূস মার্কিন নীতিনির্ধারকদেরও ঘনিষ্ঠ হয়েছেন। জাতিসংঘেও তার প্রভাব রয়েছে। এই ঘনিষ্ঠতা তিনি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে একাধিকবার কাজেও লাগিয়েছেন। বিশেষ করে পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন বন্ধে ড. ইউনূসের ভূমিকার কথা আওয়ামী লীগ প্রকাশ্যেই অভিযোগ করে। যদিও ড. ইউনূস তা অস্বীকার করেন। কিন্তু বাংলাদেশের প্রতি তার একধরনের অবজ্ঞা, উপেক্ষা সবসময়ই দেখা যায়। শান্তিতে নোবেলজয়ী এই ব্যক্তি কখনো শহীদ মিনারে প্রভাতফেরিতে যান না। ৭১-এর বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করতে তাকে দেখিনি। এমনকি বন্যা, খরা দুর্বিপাকে তিনি নীরব। সামান্য সমবেদনা জানানোর সৌজন্যতাও দেখাননি। বাংলাদেশের প্রতি তার তাচ্ছিল্যের প্রকাশ পাওয়া যায় দেশের আইনকানুনকে তোয়াক্কা না করার মধ্য দিয়ে। ড. ইউনূস ছিলেন যুগ্ম সচিব পদমর্যাদায় গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। এ চাকরিতে যখন তিনি যোগ দেন, তখনই জানতেন অবসরের বয়স কত। কিন্তু বয়স অতিক্রান্ত হওয়ার পরও তিনি দায়িত্বে বহাল ছিলেন। গ্রামীণ ব্যাংককে তিনি ব্যবহার করেছেন পারিবারিক প্রতিষ্ঠানের মতো। গ্রামীণ ব্যাংকের মাধ্যমে এবং এই ব্যাংকের টাকাতেই গ্রামীণ কল্যাণ গঠন করা হয়। ১৯৯৬ সালের ২৫ এপ্রিল গ্রামীণ ব্যাংকের বোর্ড সভায় ‘গ্রামীণ কল্যাণ’ গঠনের প্রস্তাব আনা হয়। প্রস্তাবে বলা হয়, গ্রামীণ ব্যাংকের সদস্য ও কর্মীদের কল্যাণে ‘কোম্পানি আইন ১৯৯৪’-এর আওতায় গ্রামীণ কল্যাণ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গঠন করা। গ্রামীণ ব্যাংকের বোর্ড সভা এ প্রস্তাব অনুমোদন করে। এটি গ্রামীণ ব্যাংকেরই অঙ্গ প্রতিষ্ঠান। গ্রামীণ কল্যাণ যে গ্রামীণ ব্যাংকেরই শাখা প্রতিষ্ঠান, তা আরও স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় এর মূলধন গঠন প্রক্রিয়ায়। গ্রামীণ কল্যাণে গ্রামীণ ব্যাংকের সোশ্যাল অ্যাডভান্সমেন্ট ফান্ড (এসএএফ) থেকে ৬৯ কোটি টাকা প্রদান করা হয়। গ্রামীণ কল্যাণের মেমোরেন্ডাম অব আর্টিকেলেও গ্রামীণ ব্যাংকের সঙ্গে এর সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মেলে। মেমোরেন্ডাম অব আর্টিকেল অনুযায়ী গ্রামীণ কল্যাণের ৯ সদস্যের পরিচালনা পরিষদের ২ জন সদস্য গ্রামীণ ব্যাংকের মনোনীত প্রতিনিধি। এ ছাড়া গ্রামীণ কল্যাণের চেয়ারম্যান হবেন গ্রামীণ ব্যাংকের মনোনীত প্রতিনিধি। গ্রামীণ ব্যাংকের মনোনীত প্রতিনিধি হিসেবে ড. ইউনূস গ্রামীণ কল্যাণের চেয়ারম্যান হন। গ্রামীণ কল্যাণের মাধ্যমে তিনি গড়ে তোলেন একাধিক প্রতিষ্ঠান।

তাই ড. ইউনূস গ্রামীণ কল্যাণের মালিক হন কীভাবে? গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠানই তিনি এতদিন অবৈধভাবে দখল করেছিলেন। ড. ইউনূস মনে করেছিলেন, তিনি প্রচণ্ড ক্ষমতাবান, আইনের ঊর্ধ্বে। যুক্তরাষ্ট্র তার পক্ষে। বিশ্বে সব দেশেই তিনি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তাই অবলীলায় রাষ্ট্রীয় সম্পদ দখল করে নিজের পৈতৃক সম্পত্তির মতো ব্যবহার করেছেন। গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ হারিয়ে ড. ইউনূস সারা বিশ্বে তুলকালাম করেছিলেন। এখন শ্রম আদালতের দণ্ড, দুর্নীতির মামলা আর গ্রামীণ কল্যাণের ঘটনায় তিনি নিশ্চয়ই সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবেন। আওয়ামী লীগের আসল প্রতিপক্ষ এখন ড. ইউনূসই।

 

লেখক: নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত

ইমেইল: poriprekkhit@yahoo.com


কারাভোগ   বিএনপি   আন্তর্জাতিক  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ

প্রকাশ: ১১:০০ পিএম, ১৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪


Thumbnail

গ্রামীণ কল্যাণ নিয়ে ড. ইউনূস এবং গ্রামীণ ব্যাংকের মধ্যে এখন কথার বাহাস চলছে। ড. ইউনূস দাবি করেছেন ‘গ্রামীণকল্যাণ’ তার প্রতিষ্ঠান। এটি ‘জবর দখল’ করা হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেছেন। অন্যদিকে ‘গ্রামীণ ব্যাংক’ আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন করে তথ্য প্রমাণ দিয়ে জানিয়েছে গ্রামীণ কল্যাণ তাদের।

ড. ইউনূস যখন আর্তনাদ করেন, তখন তার সাথে তার বন্ধুরাও কোরাস করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হোমড়া চোমড়া ব্যক্তি, জাতিসংঘের মহাসচিব ড. ইউনূস প্রসঙ্গে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সবকিছু দেখে শুনে মনে হতেই পারে, সরকার এবং রাষ্ট্র তার প্রতি অবিচার করছে। ড. ইউনূস সংবাদ সম্মেলনে যেভাবে কথা বলছিলেন, তাতে মনে হচ্ছিল তিনি নির্যাতিত। আসলে কার বক্তব্য সত্য? ‘গ্রামীণ কল্যাণ’ আসলে কার?

১৯৮৩ সালের ৪ সেপ্টেম্বর সরকার গ্রামীণ ব্যাংক অধ্যাদেশ নামে একটি অধ্যাদেশ (অধ্যাদেশ নম্বর-৪৬) জারি করে। সে সময়ে গ্রামীণ ব্যাংক শুরু হয় মাত্র তিন কোটি টাকা মূলধন দিয়ে। এরমধ্যে বেশিরভাগ টাকা অর্থাৎ ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা ছিল সরকারের এবং ১ কোটি ২০ লাখ টাক ছিল ঋণ গ্রহীতাদের।
 
অর্থাৎ গ্রামীণ ব্যাংকে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ব্যক্তিগত কোনো টাকা ছিল না। অথচ গ্রামীণ ব্যাংককে ব্যবহার করেই ড. ইউনূস পেয়েছেন সবকিছু। কাগজে কলমে গ্রামীণ ব্যাংকের মালিক সরকার এবং ঋণ গ্রহীতা জনগণ। কিন্তু ‘অসাধারণ’ মেধায় রাষ্ট্র ও জনগণের অর্থ ড. ইউনূস পুরে ফেলেন তার পকেটে। গ্রামীণ ব্যাংকের টাকায় ড. মুহাম্মদ ইউনূস গড়ে তুলেছেন নিয়ন্ত্রণাধীন ২৮টি প্রতিষ্ঠান এবং গ্রামীণ ব্যাংক তথা সরকারের টাকা আত্মসাৎ করে তিনি এখন হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন।
 
গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দাতা গোষ্ঠী অনুদান এবং ঋণ দেয় গ্রামীণ ব্যাংককে। অনুদানের সব অর্থ যদি রাষ্ট্র এবং জনগণের কাছে যায় তাহলে ড. ইউনূসের লাভ কি? তাই দাতাদের অনুদানের অর্থ দিয়ে গঠন করলেন সোশ্যাল ভেনচার ক্যাপিটাল ফান্ড (এসভিসিএফ)। ১৯৯২ সালের ৭ অক্টোবর ওই ফান্ড দিয়ে আলাদা একটি প্রতিষ্ঠান গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
 
১৯৯৪ সালে ‘গ্রামীণফান্ড’ নামের একটি লিমিটেড কোম্পানি গঠন করা হয়। তাতে ওই ফান্ডের ৪৯ দশমিক ১০ কোটি টাকা স্থানান্তর করা হয়। গ্রামীণ ব্যাংক দেখিয়ে বিদেশ থেকে টাকা এনে তা সরিয়ে ফেলার চেষ্টা ছিল শুরু থেকেই। গ্রামীণ ব্যাংক সরকারি প্রতিষ্ঠান হলেও ড. ইউনূস প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে সব সিদ্ধান্ত একাই নিতেন। পরিচালনা পর্ষদ এমনভাবে গঠন করা হয়েছিল, যাতে কেউ ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে কথা না বলেন। ড. ইউনূস এই সুযোগটিই কাজে লাগান।
  
১৯৯৩ সালের ১৯ ডিসেম্বর গ্রামীণ ব্যাংকের ৩৪তম বোর্ড সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় সিদ্ধান্ত হয় দাতা গোষ্ঠীর অনুদানের অর্থ এবং ঋণ দিয়ে সোশ্যাল এডভান্সমেন্ট ফান্ড (এসএএফ) গঠন করা হবে। কিন্তু দাতারা গ্রামীণব্যাংক থেকে এভাবে অর্থ সরিয়ে ফেলার আপত্তি জানায়। দাতারা সাফ সাজিয়ে দেন, এভাবে অর্থ স্থানান্তর জালিয়াতি। এবার ভিন্ন কৌশল গ্রহণ করেন ড. ইউনূস।
 
২৫ এপ্রিল ১৯৯৬ সালে গ্রামীণ ব্যাংকের বোর্ড সভায় ‘গ্রামীণকল্যাণ’ গঠনের প্রস্তাব আনেন। প্রস্তাবে বলা হয়, গ্রামীণ ব্যাংকের সদস্য ও কর্মীদের কল্যাণে‘ কোম্পানি আইন ১৯৯৪’ এর আওতায় গ্রামীণকল্যাণ নামের একটি প্রতিষ্ঠান গঠন করা হবে। গ্রামীণ ব্যাংকের বোর্ড সভা এই প্রস্তাব অনুমোদন করে। এটি গ্রামীণ ব্যাংকেরই অঙ্গ প্রতিষ্ঠান। গ্রামীণ কল্যাণ যে গ্রামীণ ব্যাংকেরই শাখা প্রতিষ্ঠান, তা আরও স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় এর মূলধন গঠন প্রক্রিয়ায়।
 
গ্রামীণকল্যাণ-এ গ্রামীণ ব্যাংকের সোশ্যাল এডভ্যান্সমেন্ট ফান্ড (এসএএফ) থেকে ৬৯ কোটি টাকা দেয়া হয়। গ্রামীণ কল্যাণের মেমোরেন্ডাম অব আর্টিকেলে ও গ্রামীণ ব্যাংকের সঙ্গে এর সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মেলে। মেমোরেন্ডাম আব আর্টিকেল অনুযায়ী গ্রামীণ কল্যাণের ৯ সদস্যের পরিচালনা পরিষদের ২ জন সদস্য গ্রামীণ ব্যাংকের মনোনীত প্রতিনিধি। এছাড়াও গ্রামীণকল্যাণের চেয়ারম্যান হবেন গ্রামীণ ব্যাংকের মনোনীত প্রতিনিধি।
 
সে অনুযায়ী গ্রামীণ ব্যাংকের মনোনীত প্রতিনিধি হিসেবে ড. ইউনূস গ্রামীণ কল্যাণের চেয়ারম্যান হন। এরপরে গ্রামীণকল্যাণ হয়ে ওঠে ড. ইউনূসের ‘সোনার ডিম পাড়া রাজহাঁস’। গ্রামীণ কল্যাণের মাধ্যমে তিনি গড়ে তোলেন একাধিক প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- ১.গ্রামীণ টেলিকম লিমিটেড ২. গ্রামীণ ডিস্ট্রিবিউশন লিমিটেড ৩. গ্রামীণশিক্ষা ৪. গ্রামীণ নিটওয়্যার লিমিটেড ৫. গ্রামীণব্যবস্থা বিকাশ ৬. গ্রামীণ আইটিপার্ক ৭. গ্রামীণ ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট ৮. গ্রামীণ সলিউশন লিমিটেড ৯. গ্রামীণ ডানোন ফুডস লিমিটেড ১০. গ্রামীণ হেলথ কেয়ার সার্ভিসেস লিমিটেড ১১. গ্রামীণ স্টার এডুকেশন লিমিটেড ১২. গ্রামীণ ফেব্রিক্স অ্যান্ড ফ্যাশন লিমিটেড ১৩. গ্রামীণ কৃষি  ফাউন্ডেশন।
  
অন্যদিকে, গ্রামীণ কল্যাণের আদলে প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ফান্ডের মাধ্যমে গঠন করা হয় আরও কিছু প্রতিষ্ঠান। এগুলো হল- ১.গ্রামীণ ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড ২. গ্রামীণ সল্যুশন লিমিটেড ৩. গ্রামীণ উদ্যোগ ৪. গ্রামীণ আইটেক লিমিটেড ৫. গ্রামীণ সাইবারনেট লিমিটেড ৬. গ্রামীণ নিটওয়্যার লিমিটেড ৭. গ্রামীণ আাইটি পার্ক ৮. টিউলিপ ডেইরি অ্যান্ড প্রোডাক্ট লিমিটেড ৯. গ্লোব কিডস ডিজিটাল লিমিটেড ১০. গ্রামীণ বাইটেক লিমিটেড ১১. গ্রামীণ সাইবার নেট লিমিটেড ১২. গ্রামীণ স্টার এডুকেশন লিমিটেড ১২. রফিক আটোভ্যান মানুফ্যাকটার লিমিটেড ১৩. গ্রামীণ ইনফরমেশন হাইওয়ে লিমিটেড ১৪. গ্রামীণ ব্যবস্থা সেবা লিমিটেড ১৫. গ্রামীণ সামগ্রী।
 
মজার বিষয় হলো গ্রামীণ ব্যাংকের অর্থে এবং বোর্ড সভার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে গ্রামীণ কল্যাণ এবং গ্রামীণ ফান্ড গঠিত হয়। এই দুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যে প্রতিষ্ঠানগুলো গঠিত হয়েছে- তা সবই আইনত গ্রামীণ ব্যাংকের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান। কিন্তু ২০২০ সাল পর্যন্ত গ্রামীণ ফান্ড এবং গ্রামীণ কল্যাণের পরিচালনা পর্ষদে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিনিধি থাকলেও ২০২১ সাল থেকে এই প্রতিষ্ঠান দুটিতে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিনিধি ছিল।
 
গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এ দুটি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হবেন গ্রামীণ ব্যাংকের মনোনীত ব্যক্তি। কিন্তু ড. মুহাম্মদ ইউনূস এখনও গ্রামীণকল্যাণ এবং গ্রামীণ ফান্ডের চেয়ারম্যান পদে বহাল ছিলেন কোন ক্ষমতা বলে।
 
তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতাটির কথা মনে পড়ে। জমিদার তার বাগানের পরিধি বাড়ানোর জন্য গরিবের দুই বিঘা জমি দখল করে। এরপর এই নিঃস্ব ব্যক্তি সাধু বেশে ঘুরে যখন তার ভিটেতে ফিরে আসেন এবং একটি পরে যাওয়া ফল নেন, তখন তাকে চোর বানানো হয়। ড. ইউনূস যেন সেই জমিদার। গ্রামীণ ব্যাংকের গরিব মানুষের সম্পত্তি আত্মসাৎ করে তাদেরই এখন জবর দখলকারী বলছেন। হায়রে ‘তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ, আমি আজ চোর বটে।’
 
লেখক: নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত
ই-মেইল: poriprekkhit@yahoo.com


মন্তব্য করুন


বিজ্ঞাপন