ঢাকা, রোববার, ০৬ ডিসেম্বর ২০২০, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার ও জননেত্রীর মুক্তির ক্ষেত্রে ব্যারিস্টার রফিকুল হকের অবদান স্মরণীয়

ড۔ সেলিম মাহমুদ 
প্রকাশিত: ২৪ অক্টোবর ২০২০ শনিবার, ০৬:০০ পিএম
বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার ও জননেত্রীর মুক্তির ক্ষেত্রে ব্যারিস্টার রফিকুল হকের অবদান স্মরণীয়

আশির দশকের শেষ দিকে আমরা যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র, ব্যারিস্টার রফিকুল হক তখন বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল l সেভাবেই আমরা তাঁকে  চিনতাম, জানতাম l পরবর্তীতে নব্বইয়ের গণঅভ্ভুত্থানের পর আমিনুল হক অ্যাটর্নি জেনারেল হলেন l তিনি আমার এক বন্ধুর বাবা ছিলেন l সেই সুবাদে তাঁর সাথে আলাপচারিতা ছিল l অ্যাটর্নি জেনারেল থাকা অবস্থায়ই তিনি মারা গিয়েছিলেন l তারপর ৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রথমে ব্যারিস্টার কেএস নবী (৯৪ সালে আইনজীবী সনদ প্রাপ্তির সময় যিনি আমার অফিসিয়াল সিনিয়র ছিলেন) এবং পরে অ্যাডভোকেট মাহমুদুল ইসলাম অ্যাটর্নি জেনারেল ছিলেন l

১৯৯৬ সালে ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স বাতিল ও বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের ক্ষেত্রে যে কয়েকজন সিনিয়র আইনজীবী গুরুত্বপূর্ণ আইনি পরামর্শ দিয়ে বিশেষ অবদান রেখেছিলেন, ব্যারিস্টার রফিকুল হক তাদের অন্যতম l তিনিই প্রথম খুনিদের স্বপক্ষে সার্টিফিকেট ইস্যু করার প্রসংগটি নিয়ে তার মতামত দিয়েছিলেন l তিনি বলেছিলেন, সংসদে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স বাতিল করতে কোন আইনগত বাধা নেই l সংসদ সব সময়ই সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে যেকোনো অর্ডিন্যান্স বাতিল করতে পারে l তাছাড়া, ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স বহাল থাকলেও সপরিবারে জাতির পিতার হত্যার বিচার করতে কোন আইনগত বাধা নেই l কারণ কোন খুনির স্বপক্ষেই তাদের রক্ষাকারী তথাকথিত কোন সার্টিফিকেট ইস্যু করা হয়নি l ব্যারিস্টার রফিকুল হকের এই মতামতটি ঐ সময়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল l ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স বাতিল ও বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার নিয়ে ঐ সময়ে সুপ্রিম কোর্টের কিছু বিচারক সহ আইন অঙ্গনের কিছু আইনজীবীর রহস্যজনক বিতর্কিত ভূমিকা থাকলেও ব্যারিস্টার রফিকুল হকের ভূমিকা অত্যন্ত ইতিবাচক ও সাহসিকতাপূর্ণ ছিল l

পরবর্তীতে এক এগারোর সময় ২০০৭ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনাকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে মিথ্যা মামলায় বন্দি করার পর ব্যারিস্টার রফিকুল হক তাঁকে কারাগার থেকে মুক্ত করতে আইনি লড়াইয়ে এগিয়ে আসেন। 

তিনি অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে এই উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন l সুপ্রিম কোর্টের অনেক আইনজীবী সেদিন পর্দার অন্তরালে চলে গিয়েছিলো l ব্যারিস্টার রফিকুল হকের এই অবদানের কথা জাতি সব সময় স্মরণ করবে l 

বাংলাদেশে কর্পোরেট জাস্টিস প্রতিষ্ঠায়ও ব্যারিস্টার রফিকুল হকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে l বাংলদেশে দেশি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আইনি স্বার্থ সংরক্ষণে তাঁর বিশেষ অবদান রয়েছে l ইন্টারন্যাশনাল বেস্ট প্রাকটিস অনুযায়ী এদেশের আইন অঙ্গনে বেসরকারি বিনিয়োগকারীগণ যাতে অনুকূল পরিবেশ পায় সেজন্য তিনি দেশের সর্বোচ্চ আদালতে বিশেষ ভূমিকা রাখেন l যদিও কেও কেও বেসরকারি কোম্পানীসমুহের আইনি স্বার্থ রক্ষার জন্য তাঁর সমালোচনা করেন l তবে বাস্তবতা হলো, মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে না পারলে অর্থনীতি গতিশীল হতো না l তাছাড়া, এই বিষয় গুলো ফিনান্সিয়াল টার্মসে না দেখে ইকোনমিক টার্মসে দেখা বাঞ্চনীয় l তাই আইন অঙ্গনে বেসরকারি কোম্পানিগুলোর স্বার্থ রক্ষার জন্য তাঁর যে ভুমিকা সেটি আমাদের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক ছিল l

২০১৩ থেকে ২০১৫  সাল সময়ে আমার সাথে তাঁর একটা নিরবিচ্ছিন্ন এনগেজমেন্ট ছিল l মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা আমাকে জ্বালানি সেক্টরে দুই ধরণের ক্যাপাসিটিতে ১০ বছরের জন্য দায়িত্ব দিয়েছিলেন l সেখানে আমি হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতির পদমর্যাদায় তিন বছর এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন ট্রাইবুনাল চেয়ারম্যান এবং একই পদমর্যাদায় সাত বছর এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলাম l সেই দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে জ্বালানি সেক্টরে আরবিট্রেশনের মাধ্যমে বিরোধ নিস্পত্তির বিষয়টি মূলত আমার উপরই অর্পিত হয়েছিল l ২০১৩ সালের দিকে দেশের সর্ব বৃহৎ সরকারি বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে দেশের বৃহত্তম বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কোম্পানির এক আইনি বিরোধ সৃষ্টি হয় l বিরোধটি প্রথমে হাই কোর্ট বিভাগে উপস্থাপন করা হয়েছিল l পরে হাই কোর্টের নির্দেশে বিরোধটি উপযুক্ত ফোরাম হিসেবে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে নিষ্পত্তির জন্য উপস্থাপন করা হলো l কমিশন তখন আমাকে চেয়ারম্যান করে তিন সদস্যের একটি আরবিট্রেশন ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছিলেন l  আরবিট্রেশন ট্রাইবুনালের অন্য দুইজন সদস্য ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মঞ্জুর আলম খান এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের প্রাক্তন চেয়ারম্যান জনাব খিজির হায়াৎ খান l ব্যারিস্টার রফিকুল হক প্রায় দেড় বছর ধরে আমাদের আরবিট্রেশন ট্রাইবুনালের শুনানিতে অংশ গ্রহণ করেছিলেন l তিনি অত্যন্ত আন্তরিকতা ও দক্ষতার সাথে সেই দায়িত্ব পালন করেছিলেন l তাঁর আইনি ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ ছিল অত্যন্ত মেধাদৃপ্ত ও প্রগতিশীল l শুনানির শেষ দিন তিনি  একটি কথা বলেছিলেন যা আমার সব সময় মনে থাকবে l তিনি বলেছিলেন, এই আরবিট্রেশন ট্রাইবুনালের অ্যাওয়ার্ড কী হবে সেটা আমি জানি না l তবে আমি আপনাদের দক্ষতা দেখে অভিভূত হয়েছি l এখানে না আসলে আমি জানতেই পারতাম না যে, বাংলাদেশে এতো যোগ্য এবং মেধাবী ব্যক্তি রয়েছে l 

আমাদের আরবিট্রেশন অ্যাওয়ার্ডের  বিরুদ্ধে হাইকোর্ট ডিভিশনে রিট করা হয় l হাইকোর্ট আমাদের অ্যাওয়ার্ড সঠিক ও বৈধ বলে ঘোষণা করে l হাইকোর্ট মন্তব্য করেছিল, গুণগত মান বিবেচনায় এই অ্যাওয়ার্ডটি ছিল বিশ্ব মানের l পরবর্তীতে আপীল বিভাগও আমাদের আরবিট্রেশন অ্যাওয়ার্ড সমুন্নত রাখে l 

গত কয়েকদিন ধরে গণমাধ্যমে যখন আমি ব্যারিস্টার রফিকুল হকের শারীরিক অবস্থার অবনতির কথা জানছিলাম, তখন আমার এই কথা গুলোই মনে পড়ছিলো l বার বার মনে পড়ছিলো ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার শুরুর দিকে তাঁর ভূমিকার কথা l এক এগারোর সময় বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার মুক্তির লক্ষে তাঁর আইনি লড়াইয়ের কথা l কৃতজ্ঞ বাঙালি জাতি তাঁর অবদান কখনও ভুলবে না l আমি তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি l

আরও পড়ুন: নীরব দানবীর এজন মানুষ

আরও পড়ুন: ‘স্যার না হলে আমি পার্থ হতাম না’