এডিটর’স মাইন্ড

নতুন রাষ্ট্রপতি: যে পাঁচটি বিষয় শেখ হাসিনার বিবেচনায়

প্রকাশ: ০৫:০০ পিএম, ১০ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩


Thumbnail

যেকোনো সময় নতুন রাষ্ট্রপতি নাম ঘোষিত হতে পারে। নতুন রাষ্ট্রপতির নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা না হলেও মনোনয়নপত্র কেনা, মনোনয়নপত্র তৈরি করাসহ নানা কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে আজকালের মধ্যেই নতুন রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন তা পরিষ্কার হয়ে যাবে বলে একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে। 

আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী বিভিন্ন নেতারা বলেছেন, নতুন রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন তা প্রধানমন্ত্রী চূড়ান্ত করে ফেলেছেন এবং আজকালের মধ্যেই এ ব্যাপারে তিনি আনুষ্ঠানিক সংকেত দিবেন। এই সংকেত দেওয়ার পরপরই আওয়ামী লীগ মনোনীত রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী বা তার পক্ষের কেউ নির্বাচন কমিশন থেকে মনোনয়ন ফরম পূরণ করবেন। মনোনয়ন ফরম পূরণের পর সেখানে সমর্থকদের (ভোটারদের) স্বাক্ষরসহ নানা আনুষ্ঠানিকতা রয়েছে। এ কারণে আজকালের মধ্যেই নতুন রাষ্ট্রপতির বিষয়টি জনগণের কাছে জানাজানি হবে বলেই মনে করছেন আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতারা। নতুন রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন এটিও আওয়ামী লীগ সভাপতি চূড়ান্ত করেছেন বলে জানা গেছে। আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, পাঁচটি বিষয়ে নতুন রাষ্ট্রপতি চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিবেচনা করছে।  

১. আগামী নির্বাচন: নতুন রাষ্ট্রপতি এমন একজন ব্যক্তিকে শেখ হাসিনা করতে যাচ্ছেন যিনি আগামী নির্বাচনের আগে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য হবেন। তাকে নিয়ে কোন বিতর্ক হবে না। তিনি আদর্শিকভাবে আওয়ামী ঘরানার থাকলেও তার একটি  জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা থাকবে। এরকম সকলের কাছে গ্রহণযোগ্যতা এবং জাতির অভিভাবক হওয়ার সক্ষমতা  ব্যক্তিকেই নির্বাচনের আগে তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিবেচনা করেছেন বলে একাধিক সূত্র মনে করছেন।

২. আদর্শিক অবস্থান: রাষ্ট্রপতি হিসেবে আওয়ামী লীগ সভাপতি এমন একজন ব্যক্তিকে বিবেচনা করবেন যার আদর্শিক অবস্থান নিয়ে কোন প্রশ্ন নেই। যার কোন সময় কোন আদর্শ বিচ্যুতি নেই। আওয়ামী লীগ অতীতে অনেকগুলো ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে। এ সমস্ত সংকটকালে তার ভূমিকা বিবেচনা করেই তাকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী বিবেচনা করবেন।

৩. আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা: এমন একজন রাষ্ট্রপতি এবার নির্বাচিত করছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি যার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা থাকবে। কারণ এই রাষ্ট্রপতিকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে একটি নির্বাচনের নেতৃত্ব দিতে হবে এবং এবারের নির্বাচনের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের নানারকম আগ্রহ ও উৎসাহ রয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মহল রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বার্তা বলবে। কাজেই তার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টি অবশ্যই বিবেচনায় নেওয়া হবে।

৪. দলের আস্থা: নতুন রাষ্ট্রপতি যেন দলের নেতাকর্মীদের আস্থাভাজন, শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি হন সেটি নিশ্চিত করেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি। এমন একজন ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি চূড়ান্ত করেছেন যাকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা শ্রদ্ধার চোখে দেখে এবং যার প্রতি সকলে সমর্থন করে।

৫. সাধারণ মানুষের আস্থা: রাষ্ট্রপতি হিসেবে এমন একজন ব্যক্তিকে প্রধানমন্ত্রী মনোনীত করবেন যার ব্যাপারে সাধারণ মানুষের গ্রহণযোগ্যতা আছে, সাধারণ মানুষ যাকে আস্থায় নেয় এবং সাধারণ মানুষের কাছে যিনি বিতর্কহীন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। 

এই পাঁচটি বিষয়ে থেকেই একজন রাষ্ট্রপতি মনোনয়ন চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে এবং চূড়ান্ত হওয়ার রাষ্ট্রপতি মনোনয়ন সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে তার নামটি প্রকাশিত হবে খুব শিগগিরই।

নতুন রাষ্ট্রপতি   বঙ্গভবন   শেখ হাসিনা   আওয়ামী লীগ   জনগণ  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

জামায়াত যেভাবে বেঁচে আছে

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ০৮ এপ্রিল, ২০২৪


Thumbnail

স্বাধীনতার মাসে জামায়াতে ইসলামী ঢাকার এক পাঁচতারকা হোটেলে জমকালো ইফতার পার্টির আয়োজন করে। ৮ বছর পর গত ৩০ মার্চ ঢাকার প্যানপ্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে এই আয়োজন করেছিল জামায়াত। এই ইফতার পার্টিতে স্থায়ী কমিটির দুই সদস্যসহ ১৮ জন বিএনপি নেতা যোগ দেন। এই ইফতার পার্টির মধ্য দিয়ে স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক দলটি তাদের অস্তিত্ব নতুন করে জানান দিল। সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতের দৃশ্যমান তৎপরতা কারও নজর এড়ায়নি। নির্বাচনের আগে থেকেই জামায়াত গুহা থেকে বের হতে শুরু করে। গত বছর জামায়াত দীর্ঘদিন পর প্রকাশ্য সমাবেশ করে। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে কর্মিসভার আদলে এই সমাবেশের মাধ্যমে জামায়াত রাজনীতিতে নতুন করে আত্মপ্রকাশের চেষ্টা করে। নিবন্ধনহীন রাজনৈতিক দল জামায়াত দীর্ঘদিন পর মূলধারার রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন শুরু করে। ইদানীং জামায়াত বিভিন্ন বিষয়ে বক্তৃতা-বিবৃতিও দিচ্ছে।

কদিন আগে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম জিয়ার মুক্তি এবং বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে দলটি এক বিবৃতি দিয়েছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবিরের সংগঠিত হওয়ার খবর আসছে। বুয়েটে শিবির এখন বেশ শক্তিশালী—এমন দাবি করছেন অনেকেই। শিবির ও হিজবুত তাহরীর প্ররোচণাতেই বুয়েটে ছাত্র রাজনীতির বিরুদ্ধে সাধারণ শিক্ষার্থীদের অবস্থান বলে অনেকে মনে করেন। উপজেলা নির্বাচনেও জামায়াত প্রার্থী দিচ্ছে বলেও জানা গেছে। প্রশাসনের ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা জামায়াতপন্থিরা নতুন করে সংগঠিত হচ্ছে। জেলায় জেলায় জামায়াতের সংগঠিত হওয়ার খবর এখন আর গোপন বিষয় নয়। বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের ভুল বোঝাবুঝির অবসান হয়েছে বলে দাবি করেছেন বিএনপির অনেক নেতাই। রাজনীতির মাঠে এখন আলোচনার বিষয় ‘জামায়াত-বিএনপির কাছে আসার গল্প’। সব কিছু মিলিয়ে স্বাধীনতাবিরোধী এই রাজনৈতিক সংগঠনটির পুনর্জন্ম হয়েছে। ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে ’৭১-এর পরাজিত রাজনৈতিক দল জামায়াত। কিন্তু এমনটি হওয়ার কথা ছিল না। রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতের টিকে থাকারই কথা ছিল না। ’৭১-এর অপকর্মের জন্য এ দলটির ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু যতবার অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে, ততবারই নানা কৌশলে দলটি ঘুরে দাঁড়িয়েছে, এবারও তাই। এবারের চিত্রটা বেশ আতঙ্কের। বাংলাদেশে একদিকে ধর্মান্ধ, মৌলবাদী, সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর নীরব উত্থান ঘটেছে। অন্যদিকে জামায়াত নতুন করে সংগঠিত হচ্ছে। আমি মনে করি, দুটি ঘটনা এক সূত্রে গাঁথা। এটি বাংলাদেশের জন্য আগামীর সংকটের বার্তা দেয়। কিন্তু এটা কেন ঘটছে?

২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ তার নির্বাচনী ইশতেহারে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। সে সময় এটি ছিল প্রায় অবিশ্বাস্য এবং সাহসী একটি সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশে তরুণ প্রজন্ম ছাড়া খুব কম মানুষই বিশ্বাস করেছিল এই ঘোষণা। এই অবিশ্বাসের যৌক্তিক কারণ ছিল। ৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করে স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি। এখান থেকে শুরু হয় বাংলাদেশের উল্টো চলা। শুরু হয় বাংলাদেশকে পাকিস্তান বানানো মিশন। জিয়া ক্ষমতায় এসে স্বাধীনতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের পুনর্বাসন শুরু করেন। তিনি দালাল আইন বাতিল করেন। রাজাকার, আলবদরদের জেল থেকে মুক্তি দেন। লন্ডনে বসে ‘পাকিস্তান মুক্তি আন্দোলনে’ নেতৃত্ব দেওয়া যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমকে দেশে ফিরিয়ে আনেন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার এক বড় স্বপ্ন ছিল অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণ। এ কারণেই ১৯৭২ সালের সংবিধানে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু জিয়া সামরিক ফরমান বলে সংবিধানের এই বিধান বাতিল করেন। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় বসে সামরিক গোয়েন্দাদের পৃষ্ঠপোষকতায় নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন। বিএনপিতে তিনি রাজাকার-যুদ্ধাপরাধীদের পুনর্বাসিত করেন।

বহুল আলোচিত রাজাকার, মুসলিম লীগ নেতা শাহ আজিজকে জিয়া প্রধানমন্ত্রী বানান। এখান থেকে শুরু। এই ধারা অব্যাহত থাকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত। দীর্ঘ ২১ বছরে রাজাকার, আলবদর, আলশামস এবং যুদ্ধাপরাধীরা ফুলেফেঁপে উঠেছিল। ক্ষমতা কেন্দ্রে তাদের শক্তিশালী অবস্থান তৈরি হয়েছিল। প্রশাসনে, বিচার বিভাগে, সশস্ত্র বাহিনীতে স্বাধীনতাবিরোধীদের শক্ত অবস্থান তৈরি হয়। সব জায়গায় তাদের প্রাধান্য দেওয়া শুরু হয়। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে একাত্তরের পরে জামায়াত আবার মূলধারার রাজনীতিতে প্রবেশ করে। যুগপৎ আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘হালাল’ হয় জামায়াত। ’৯১-এর নির্বাচনে বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। জামায়াত সরকার গঠনে বিএনপিকে সমর্থন দেয়। স্বাধীনতার মাত্র কুড়ি বছরের মধ্যে গণহত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত জামায়াত সরকারের হিস্যা হয়। এ সময় জামায়াত তার মুখোশ খুলে আসল চেহারা বের করে। যুদ্ধাপরাধের শিরোমণি পাকিস্তানি নাগরিক গোলাম আযমকে তারা দলের ‘আমির’ ঘোষণা করে। জামায়াতের এই ধৃষ্টতাকে চ্যালেঞ্জ জানায় মুক্ত বুদ্ধির সচেতন নাগরিকবৃন্দ। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে উত্তাল হয় গোটা দেশ। তীব্র গণআন্দোলনের মুখে বিএনপি গোলাম আযমকে গ্রেপ্তারে বাধ্য হয়। ‘গণআদালতে’ বিচার হয় চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের। লাখো মানুষ এই বিচারে সংহতি জানায়। সরকার গণআদালতের রায়কে সম্মান জানিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু না করে আয়োজকদের বিরুদ্ধেই রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করে। বীর মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ জননী এবং বরেণ্য বুদ্ধিজীবী হলেন দেশদ্রোহী! আর আইনি মারপ্যাঁচে গোলাম আযম পেল নাগরিকত্ব। শহীদ জননী যে চেতনার মশাল জ্বালিয়েছিলেন, তা তরুণ প্রজন্মকে আলোকিত করে। এখান থেকেই যুদ্ধাপরাধী বিরোধী একটি জনমত তৈরি হয়।

এদেশের তরুণরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে অবস্থান নেয়। তারুণ্যের এই জাগরণের কান্ডারি শহীদ জননী জাহানারা ইমাম। ৯১ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে একটি জনমত সৃষ্টি হয়। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট নিরঙ্কুশ বিজয় পায়। দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি আসন পেয়ে এই জোট সরকার গঠন করে। দুই যুদ্ধাপরাধীদের গাড়িতে উড়ে শহীদের রক্তে রঞ্জিত পবিত্র জাতীয় পতাকা। এ ঘটনা তরুণ প্রজন্মকে আরও বিক্ষুব্ধ করে। ক্রমশ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি তরুণ প্রজন্মের প্রাণের দাবিতে পরিণত হয়। আওয়ামী লীগ তরুণদের হৃদয়ের কথা অনুভব করতে পেরেছিল। তবে, অনেকেই সে সময় বলেছিল, তরুণদের আকৃষ্ট করতেই আওয়ামী লীগ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি নির্বাচনী ইশতেহারে দিয়েছে। আদৌতে বিচার করবে না। এদের বিচার করা অসম্ভব—এমন কথা বলার লোকের অভাব ছিল না। কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যাপারে শেখ হাসিনা অসীম সাহস এবং দৃঢ়তার পরিচয় দেন। এই একটি সিদ্ধান্তই তাকে অমরত্ব দিয়েছে। একে একে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হয় এবং রায়ও কার্যকর হতে থাকে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি এক অভাবনীয় ঘটনা। যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযম, মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুজাহিদ, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, আব্দুল কাদের মোল্লা, কামারুজ্জামানের মতো ঘৃণ্য নরঘাতকদের শাস্তি দিয়ে বাংলাদেশ ইতিহাসের ঋণ শোধ করে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পর ধারণা করা হয়েছিল রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতের মৃত্যু সময়ের ব্যাপার মাত্র। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার যখন চলছিল, তখনই নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করে দেয়। স্বাধীনতাবিরোধী দলটি তার নির্বাচনী প্রতীক ‘দাঁড়িপাল্লা’ হারায়। সবকিছু মিলিয়ে এক ভয়ংকর দুর্যোগের মধ্যে পতিত হয় ধর্মান্ধ মৌলবাদী এই রাজনৈতিক দলটি। স্বাধীন বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের পর জামায়াতের যে অবস্থা হয়েছিল, ২০১৪ সাল থেকে তাদের একই অবস্থা সৃষ্টি হয়। প্রথম সারির সব নেতা যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার হলে জামায়াত নেতৃত্বশূন্য হয়। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এক সুবর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করে। এর ফলে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির অবসান ঘটবে, প্রগতিশীল উদার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলো বিকশিত হবে বলে আমরা আশা করেছিলাম। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল উল্টো চিত্র। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পর বাংলাদেশে উদার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলো ক্রমশ সংকুচিত এবং বিলীন প্রায়।

অন্যদিকে দক্ষিণপন্থি উগ্র মৌলবাদী রাজনৈতিক দলগুলো নতুন করে হচ্ছে শক্তিশালী। বাংলাদেশে এখন গণতান্ত্রিক দলগুলোই অস্তিত্বের সংকটে। অন্যদিকে ধর্মান্ধ, রাজনৈতিক দলগুলো মাথা চাড়া দিচ্ছে। জামায়াত ছাড়াও হেফাজতে ইসলামী, খেলাফাত আন্দোলন, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের মতো দলগুলো এখন জাসদ, বাসদ, কমিউনিস্ট পার্টির চেয়ে শক্তিশালী। এমনকি সংসদে তথাকথিত বিরোধী দল জাতীয় পার্টির চেয়েও ইসলামী দলগুলোর শক্তি ও সমর্থক বেশি। প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল যে জামায়াত বিলীন হচ্ছে জন্যই ইসলাম পছন্দ অন্য রাজনৈতিক দলগুলো বিকশিত হচ্ছে। ইসলাম পছন্দ জামায়াত অনুসারীরা এসব দলে ভিড় করছে বলে ধারণা করা হয়েছিল। দেশে গত এক দশকে দক্ষিণপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর শক্তি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। আবার জামায়াতও বেঁচে আছে। নতুন করে সংগঠিত হচ্ছে। নতুন কর্মীও এই দলে যুক্ত হচ্ছে। এর কারণ কি? এর কারণ বহুমাত্রিক। তবে প্রধান কারণ, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ জামায়াতকে আদর্শিকভাবে পরাজিত করতে পারেনি বা হারানোর চেষ্টা করেনি। পেশি শক্তি দিয়ে জামায়াতকে নিঃশেষ করার চেষ্টা সফল হয়নি। এই চেষ্টা কখনো সফলও হয়নি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার পর্বে যে আদর্শিক চেতনার উন্মেষ ঘটা প্রয়োজন ছিল, তা হয়নি। ‘গণজাগরণ মঞ্চ’ এরকম একটি আদর্শিক লড়াইয়ের প্ল্যাটফর্ম হতে পারত। কিন্তু নানা চক্রান্তে এবং স্বার্থের দ্বন্দ্বে ‘গণজাগরণ মঞ্চ’ নিজেই মুখ থুবড়ে পড়ে।

আওয়ামী লীগের বাইরে বাম ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলোও ধর্মান্ধ ও মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক জাগরণ সৃষ্টি করতে পারেনি। ’৭৫-পরবর্তী সময়ে জামায়াত কাজ করেছে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে। সমাজে রন্ধ্রে রন্ধ্রে ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। প্রশাসনে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে, শিক্ষাঙ্গনে জামায়তী বীজ রোপণ করা হয়েছিল। এরা গোপনে জামায়াতের স্বার্থে কাজ করে যাচ্ছে। ঘাপটি মেরে থাকা এসব সাম্প্রদায়িক অপশক্তি বাইরে আওয়ামী লীগ ভেতরে তারা জামায়াতের জন্য কাজ করছে। প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি। আওয়ামী লীগ এদের মূল উৎপাটন করতে পারেনি। এদের চিহ্নিত করতে পারেনি। এরা আওয়ামী লীগ সেজে জামায়াতের পক্ষে কাজ করছে। এরকম অনেক উদহারণ দেওয়া যায়। শেষ ঘটনার উদাহরণটাই দেখা যাক, ৩০ মার্চ সোনারগাঁও হোটেলে জামায়াত ইফতার পার্টি করল। সোনারগাঁও রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন পাঁচতারকা হোটেল। বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব পদাধিকার বলে এর পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যান। পরিচালনা বোর্ডে আছেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, অর্থ সচিব, পররাষ্ট্র সচিবের মতো আমলারা। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন হোটেলে অনিবন্ধিত একটি রাজনৈতিক দল (তাও আবার জামায়াত) ইফতার পার্টি করে কীভাবে? এভাবেই সরকারের ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা জামায়াতপন্থিরা, ধর্মান্ধ মৌলবাদীরা জামায়াতকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

৭৫ এর পর স্বাধীনতাবিরোধীরা ব্যবসা-বিত্তে ফুলেফেঁপে উঠেছিল। জামায়াতের নিয়ন্ত্রণে গড়ে ওঠে বেশ কিছু ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হলেও তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হয়নি। যুদ্ধাপরাধী মীর কাশেমের ব্যবসা-বাণিজ্য বহাল আছে। বহাল আছে যুদ্ধাপরাধী সা.কা. চৌধুরীর ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য। অর্থবিত্তে ভালো অবস্থান থাকায় জামায়াতের পক্ষে পুনঃসংগঠিত হওয়া কঠিন হয়নি।

জামায়াত রাজনীতিতে সবসময়ই পেয়েছে বিশ্বস্ত মিত্র বিএনপিকে। বিএনপির এক গুরুত্বপূর্ণ নেতা জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ককে ‘ভাই-ভাই সম্পর্ক’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। বাস্তবেও তাই, জামায়াত এবং বিএনপির সম্পর্ক যেন ফেভিকলের মতো। কিছুতেই তাদের আলাদা করা যায় না। কিছুদিন নানা পারিপার্শ্বিকতায় দুই ভাইয়ের সম্পর্কে দৃশ্যমান দূরত্ব হলেও এখন তারা আবার ঘনিষ্ঠ হবে। দুই দল একে অন্যের পাশে দাঁড়ায়। এটাও জামায়াতের বেঁচে থাকার একটি বড় কারণ।

তবে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মাধ্যমে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণের যে সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছিল, তা নষ্ট হয়ে গেছে। জামায়াত বেঁচে আছে। ধর্মান্ধ মৌলবাদী গোষ্ঠীর নীরব উত্থান হচ্ছে। একলা আওয়ামী লীগকে সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ জানাবে সম্মিলিত প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী। সেই লড়াই হবে অস্তিত্ব রক্ষার। আওয়ামী লীগ যদি সে যুদ্ধে পরাজিত হয়, তাহলে বাংলাদেশ হবে আরেকটি আফগানিস্তান।

 

লেখক: নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত

ই-মেইল: poriprekkhit@yahoo.com


বিএনপি   জামায়াত ইসলাম   আওয়ামী লীগ  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

আমলাদের দখলমুক্ত হল একটি পদ

প্রকাশ: ০৯:০০ পিএম, ০৭ এপ্রিল, ২০২৪


Thumbnail

অবশেষে সরকারের একটি পদ আমলাদের দখলমুক্ত হল। এই পদটি দীর্ঘদিন প্রকৌশলীদের ছিল। সাম্প্রতিককালে প্রকৌশলীদের হটিয়ে আমলারা এই পদ দখল করেছিলেন। অবশেষে এটি আবার আমলাদের কর্তৃত্ব থেকে কর্তৃত্ব মুক্ত করা হল। 

রাজউকের চেয়ারম্যান পদের কথা বলছি। রাজউকের চেয়ারম্যানের পদটি ঐতিহাসিকভাবে ছিল প্রকৌশলীদের। একজন প্রকৌশলীকে এই পদে পদায়ন করা হত এবং আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষময়তায় আসার পরও প্রকৌশলীরা এই পদের জন্য বিবেচিত ছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করে এই পদ আমলারা দখল করেন। যেমন- করে অন্যান্য বিভিন্ন পদ দখল করেছিলেন। 

প্রকৌশলী নূরুল হুদা রাজউকের চেয়ারম্যান ছিলেন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই। এরপরও প্রকৌশলীদের চেয়ারম্যান করার রেওয়াজ ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই আমলাদের নজর পড়ে এই পদের ওপর এবং শেষ পর্যন্ত আমলারা এটি দখল করে। গত তিন-চার মেয়াদে আমলারা এই পদ দখল করে থাকে এবং প্রকৌশলীদেরকে সাইডলাইনে বসিয়ে রাজউকের মতো একটি প্রতিষ্ঠানের সর্বেসর্বা হয়ে যান আমলারা। 

শুধু তাই নয়, আমলাদের এই পদকে প্রথমে গ্রেড-১, পরবর্তীতে সচিব পদমর্যাদার করা হয়। সর্বশেষ আনিসুর রহমান মিয়া ছিলেন রাজউকের চেয়ারম্যান। ২০২৩ সালে তার চাকরির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পর তাকে এক বছরের জন্য চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। গত ২ এপ্রিল তার চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। এই সময় সরকার আর কোন আমলাকে রাজউকের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেননি। সশস্ত্র বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) সিদ্দিকুর রহমান সরকারকে দুই বছরের জন্য রাজউকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। 

সিদ্দিকুর রহমান সেনাবাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হলেও তিনি প্রকৌশলী এবং আর্মি ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের একজন গর্বিত সদস্য ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করেছেন বলেও জানা গেছে। সিদ্দিকুর রহমানের এই নিয়োগ দেওয়ার ফলে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আমলাদের কর্তৃত্ব মুক্ত হল। যদিও এখনও  রাজউকের অনেকগুলো পদে আমলা দখল করে আছেন। 

আমলাদের কর্তৃত্বে যাওয়ার পর রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ব্যাপক দুর্নীতি গ্রস্থ হয়ে পড়ে এবং সীমাহীন দুর্নীতি অনিয়মের নানা অভিযোগ উঠতে থাকে রাজউকের বিরুদ্ধে। বিশেষ করে একের পর এক দুর্ঘটনার পর দেখা যায় যে, রাজউকের অনুমোদন ছাড়াই নানারকম ফন্দি ফিকিরের মাধ্যমে রাজউকের সাথে নানা রকম অবৈধ লেনদেনের ফলে ভুল নকশা বহির্ভূতভাবে দালানকোঠা, ঘর বাড়ি, হোটেল, রেস্টুরেন্ট গড়ে উঠেছে। 

সর্বশেষ বেইলি রোডের ঘটনার পর রাজউকের ওপর সন্দেহের তির আরও তীব্র হয়। এসময় রাজউকের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। রাজউক কতটুকু আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন, সে নিয়েও কথা ওঠে। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, আমলারা আসলে তাদের খবরদাবি করার জন্য এবং অনেকগুলো সচিবের পদ সংস্থান করার জন্যই রাজউকের পদ দখল করেছে। একজন প্রশাসনের কর্মকর্তা রাজউকের মতো একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দেয়া অবাস্তব এবং অসম্ভব একটি ব্যাপার। কিন্তু সেই অবাস্তবকেই সম্ভব করে তুলেন আমলারা। আমলাদের পক্ষে সবই সম্ভব। তবে অবশেষে সরকারের বোধদয় ঘটেছে। মেজর জেনারেল (অব.) সিদ্দিকুর রহমানকে দুই বছরের জন্য চুক্তিতে নিয়োগ মধ্য দিয়ে রাজউকে আমলাতন্ত্রের সাময়িক অবসান ঘটল। এখন দেখার বিষয় আমলারা তাদের হারানো রাজত্ব পুনরুদ্ধারের জন্য নতুন কি ধরনের চেষ্টা করে।

আমলা   রাজউক চেয়ারম্যান  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

আওয়ামী লীগের ‘কুইনাইন’ সারাবে কে?

প্রকাশ: ১০:৩০ পিএম, ০৫ এপ্রিল, ২০২৪


Thumbnail

কথা সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলীর একটি অসামান্য গ্রন্থ ‘দেশে-বিদেশে’। বলা হয়ে থাকে বাংলা সাহিত্যে এটি প্রথম সার্থক ভ্রমণ কাহিনী। ‘দেশে-বিদেশে’ গ্রন্থে একটি উক্তি অমরত্ব পেয়েছে। এখনও বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে এই উক্তিটি বহুল চর্চিত। উক্তিটি হলো-‘কুইনাইন জ্বর সারাবে বটে, কিন্তু কুইনাইন সারাবে কে?’ ম্যালেরিয়া জ্বর নিরাময়ে কুইনাইন বেশ কার্যকর দাওয়াই। কিন্তু কুইনাইনের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া শরীরকে দুর্বল করে, মুখের স্বাদ নষ্ট করে দেয়। কুইনাইন খেয়ে জ্বর সারলেও তা নতুন এক অসুস্থতা এবং অস্বস্তি তৈরী করে। এই উক্তিটির সঙ্গে এখন আওয়ামী লীগের মিল খুঁজে পাওয়া যায়। দলকে বিভক্ত করে আওয়ামী লীগ যে নির্বাচনী কৌশল নিয়েছিল, সেটি এখন আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় সমস্যা। নির্বাচন হয়েছে বটে, কিন্তু কোন্দল বেড়েছে। গৃহ বিবাদই আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় মাথা ব্যাথা। এখন আওয়ামী লীগ কোন্দল থামাতেই দিশেহারা। জাতীয় সংসদ নির্বাচন জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ভাবে গ্রহণযোগ্য করতে আওয়ামী লীগ স্বতন্ত্র প্রার্থী কৌশল নিয়েছিল। দলের সবার জন্য নির্বাচন উন্মুক্ত করা হয়েছিল। আওয়ামী লীগ তার সুফলও পেয়েছিল। বিএনপির অংশগ্রহণ ছাড়াই নির্বাচন যে টুক প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়, তা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্যই। স্বতন্ত্ররাই দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন জমিয়ে ফেলে। এই নির্বাচনে যা কিছু আকর্ষণ তা স্বতন্ত্রদের ঘিরেই। বহু আসনে স্বতন্ত্ররা চমক দেখিয়েছে। আবদুস সোবহান গোলাপ, মৃণাল কান্তি দাশ কিংবা অসীম কুমার উকিলের মতো কেন্দ্রীয় নেতারা স্বতন্ত্রদের কাছে ধরাশায়ী হয়েছে। হাসানুল হক ইনু, ফজলে হোসেন বাদশা, আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর মতো জাতীয় নেতারা চুনোপুটি স্থানীয় নাম ঠিকানাহীন স্বতন্ত্র প্রার্থীর কাছে হেরে গেছে। ৭ জানুয়ারীর নির্বাচন যে দেশে এবং আন্তর্জাতিক ভাবে বৈধতা এবং স্বীকৃতি পেয়েছে তা মূলতঃ স্বতন্ত্রদের কারিশমায়। এজন্য প্রধানমন্ত্রী স্বতন্ত্রদের আদর আপ্যায়নও করেছেন বেশ। তাদের গণভবনে ডেকে আদর করে খাইয়েছেন। সংসদে কি করতে হবে, সে পরামর্শও দিয়েছেন। স্বতন্ত্ররা আওয়ামী লীগের উৎকণ্ঠার জ্বর সারিয়েছে, একথা সবাই স্বীকার করবেন। নির্বাচন না হলে আওয়ামী লীগের সর্বনাশ হতো। ২০১৪ সালের মতো বিনা ভোটের নির্বাচনও গ্রহণযোগ্যতা পেতনা। তাই নির্বাচনের ‘স্বতন্ত্র কৌশল’ আওয়ামী লীগকে নিঃসন্দেহে বাঁচিয়েছে। স্বতন্ত্ররা আওয়ামী লীগকে নির্বাচনী বৈতড়নী পেরুতে সাহায্য করলেও এখন তারাই যেন আওয়ামী লীগের গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে। স্বতন্ত্র কৌশল সারাদেশে আওয়ামী লীগকে বিভক্ত করেছে। নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের মধ্যে যে কোন্দল শুরু হয়েছিল, উপজেলা নির্বাচনের তা চরম আকার ধারণ করেছে। 

আওয়ামী লীগ বিরোধ যেন ‘কুইনাইন’ এর মতো। এই কুইনাইন আওয়ামী লীগকে ‘সুষ্ঠু নির্বাচন’ অসুখ থেকে মুক্তি দিয়েছে বটে। তাতে সৃষ্টি হয়েছে নতুন অসুখ। এখন এই অসুখের কোন চিকিৎসা যেন আওয়ামী লীগের কাছে নেই। যে ঔষধে আওয়ামী লীগ নির্বাচন পার করেছে, তাতেই এখন আওয়ামী লীগ ক্ষত-বিক্ষত। এই রমজানে আওয়ামী লীগ ইফতার পার্টির আয়োজন করেনি। কিন্তু তাই বলে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং অন্য নেতারা ইবাদত বন্দেগীতে সময় কাটাতে পারেননি। তাদের পুরো রমজান কাটছে দলের ভেতর দাঙ্গা ফ্যাসাদ মেটাতে। কোন্দল বন্ধ করতে ওবায়দুল কাদের বিভাগ ওয়ারী বৈঠক করেছেন। প্রতিদিনই বক্তৃতা দিচ্ছেন। সামনে উপজেলা নির্বাচন, এই নির্বাচনে মন্ত্রী-এমপিদের জন্য নির্দেশনা জারী করছেন ওবায়দুল কাদের। কিন্তু তার বক্তব্য যেন অসহায় মানুষের আর্তনাদ। তার কথা যেন কোন্দলরত আওয়ামী লীগের মাঠের নেতাদের কাছে মূল্যহীন। আওয়ামী লীগ এখন চলছে  ফ্রী স্টাইলে। কেউ কাউকে মানছে না। কেউ কারো কথা পাত্তা দিচ্ছে না। আওয়ামী লীগ একটি সুতোয় ঐক্যবদ্ধ। এই সুতার নাম শেখ হাসিনা। এই সুতো ছিড়ে গেলে আওয়ামী লীগ যে হুড়মুড় করে ভেঙ্গে পড়বে তা এখন দলের সিনিয়র নেতারাও স্বীকার করছেন। সুতায় গাঁথা মালা যেমন। সুতা ছিড়ে গেলে মালা যেমন তছনছ হয়ে যায়, তেমনি শেখ হাসিনা ছাড়া আওয়ামী লীগের অস্তিত্ব কল্পনা করাও এখন কঠিন। 

৭ জানুয়ারি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র কৌশল সঠিক ছিলো না ভুল তা সময়ই বলে দেবে। লাগামহীন ভাবে স্বতন্ত্রদের নির্বাচনে দাঁড়ানোর অনুমতি দিয়ে আওয়ামী লীগ তার নিজের সর্বনাশ ডেকে আনলো কিনা- এ বিতর্ক চলবে বহুদিন। তবে, আওয়ামী লীগ এই কোন্দল বন্ধের কোন উপায় পাচ্ছে না। এযেন সেই কুইনাইন সারাবে কে?-এর মতোই এই অনিশ্চয়তার ধাঁধা। আওয়ামী লীগ যেন এক গোলক ধাঁধায় আটকে গেছে। 

নির্বাচনের আগেই দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আওয়ামী লীগ স্বতন্ত্রদের বিরোধ প্রকাশ্য রূপ নেয়। বেশ কিছু স্থানে এই বিরোধ ছিলো সহিংস। সেই সময় আওয়ামী লীগ এই বিরোধকে পাত্তা দেয়নি। এটিকে স্বাভাবিক নির্বাচনী বিরোধ হিসেবেই দেখেছে, কোথাও কোথাও বিরোধকে উস্কে দিয়েছেন আওয়ামী লীগের নেতারাই। আওয়ামী লীগ হয়তো মনে করেছিল, দলের নেতা-কর্মীরা ক্যাডার ভিত্তিক। পুতুল নাচের পুতুলের কেন্দ্রীয় নির্দেশ অন্ধ অনুসরণ করবে। ৭ জানুয়ারির নির্বাচনের পর এই বিভক্তি, কোন্দল এবং উত্তেজনা আপনা-আপনিই কমে যাবে। আওয়ামী লীগের মধ্যে এই কোন্দল, সহিংসতার সুদূর প্রসারী প্রভাব নিয়ে মোটেও চিন্তা করা হয়নি। অনেক নেতাই বলেছেন, আগে নির্বাচন পার করি, তারপর দেখা যাবে। কিন্তু নির্বাচন শেষ হলেও কোন্দল কমেনি। দেশের বহু স্থানে নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। এই অঞ্চলে নির্বাচনী বিরোধ যুগ যুগ ধরে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম চলে। আওয়ামী লীগ সম্ভবত ভেবেছিল, যেহেতু স্বতন্ত্র প্রার্থীরা আওয়ামী পরিবারেরই সদস্য, তাই নির্বাচনের পর তারা সব ভুলে কোলাকুলি করবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। নির্বাচনের পরও যখন আওয়ামী লীগ এবং ডামি আওয়ামী লীগের বিরোধ অব্যাহত থাকে, তখন নেতাদের টনক নড়ে। প্রধানমন্ত্রী কোন্দল থামাতে সিরিজ বৈঠক করেন। দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির বর্ধিত সভা ডেকে কোন্দল বন্ধের বার্তা দেয়া হয়। কিন্তু এতেও দলের ভেতর বিভক্তি কমে নি। বরং মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণ এবং মহিলা সংসদ সদস্য মনোনয়নের মাধ্যমে বহুস্থানে কোন্দলকে উস্কে দেয়া হয়। 

রাজশাহীর কথাই ধরা যাক, সেখানকার মেয়রের বিপক্ষের একজনকে প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছে। এটা ভারসাম্য রক্ষার জন্য করা হলেও মেয়র-প্রতিমন্ত্রীর বিরোধ বিভক্ত করছে রাজশাহী আওয়ামী লীগকে। প্রকাশ্যে একে অন্যকে গালাগালি করছেন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরাসরি ভোটে পরাজিত অনেকেই এবং মনোনয়ন বঞ্চিত কয়েকজনকে সংরক্ষিত কোটায় মনোনয়ন দেয়া হয়। জনগনের কাছে প্রত্যাখ্যাতরা কি নারী সংসদ সদস্য হবার নৈতিক যোগ্যতা রাখেন কিনা সে প্রশ্ন উঠতেই পারে। আওয়ামী লীগে সংরক্ষিত কোটায় নারী সংসদ সদস্য হবার মতো যোগ্য ব্যক্তির অভাব ছিলো না। মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন দেড় হাজারের বেশী। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেই বলা হয়েছে, প্রার্থী বাছাই করতে গিয়ে তারা হিমশীম খেয়েছেন। তাহলে জনগণের পরাজিতদের সংসদে আনা কেন? দলের ভেতরে কোন্দলকে আরো বেগবান করার জন্য? ঢাকায় সানজিদা-আওলাদ বিরোধ, গাজীপুরে মেহের আফরোজ চুমকির সাথে স্বতন্ত্র বিজয়ী আখতারুজ্জামানের বিরোধ নতুন করে শুরু হয়েছে। বরিশাল সংরক্ষিত কোটায় এমপি হয়েই শাম্মী আহমেদ বিএনপির ভাষায় কথা বলেছেন। ভোট না দেয়ার জন্য তিনি জনগণকে ধন্যবাদ দিয়েছেন। নিজেকে জাহির করতে আওয়ামী লীগেরই যে বড় ক্ষতি করলেন শাম্মী, সেটি বোঝার মতো রাজনৈতিক প্রজ্ঞা কি তার আছে? নির্বাচিত এমপি পঙ্কজ দেবনাথকে একহাত দেখে নেয়াই এখন শাম্মীর প্রধান রাজনৈতিক লক্ষ্য। 

খুলনায় মনোনয়ন না পাওয়া মুন্নুজান সুফিয়ানকে সংরক্ষিত কোটায় এমপি বানিয়ে দলের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামালের মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছে। গত মেয়াদে মুন্নুজান সুফিয়ান প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। এবার আবার তিনি প্রতিমন্ত্রী হচ্ছেন এমন আশ্বাসে মন্ত্রী পাড়ার বাড়িও ছাড়েননি। আবার মন্ত্রী হতে না পারলেও কোটায় এমপি হয়ে নির্বাচিত এমপিকে কোণঠাসা করার চেষ্টা বেগবান করেছেন। এমনিতেই আওয়ামী লীগ প্রার্থী এবং স্বতন্ত্র আওয়ামী লীগ প্রার্থীর প্রকাশ্য বিরোধ দেশজুড়ে আওয়ামী লীগে বিশৃংখল, তার মধ্যে নারী সংসদ মনোনয়নেও বিরোধের পরিধি বাড়িয়েছে। আওয়ামী লীগের আরেকটি সিদ্ধান্ত সম্প্রতি অভ্যন্তরীণ গৃহদাহকে চাঙ্গা করেছে। দলের তৃণমূলে কোন্দল এবং বিভক্তি কমাতেই আওয়ামী লীগ সিদ্ধান্ত নেয় যে, উপজেলায় দলীয় ভাবে কাউকে মনোনয়ন দেবে না। দলীয় প্রতীক ব্যবহার না করলে উপজেলা নির্বাচনে মারামারি, হানাহানি হবে না এমন প্রত্যাশা থেকেই আওয়ামী লীগ উপজেলা নির্বাচনে ‘নৌকা’ বরাদ্দ না  দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত বুমেরাং হয়েছে। দলীয় প্রতীক তুলে নেয়ার সাথে সাথে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা দলটিতে প্রার্থীর বাম্পার ফলন হয়েছে। অতীতের সুপ্ত বিভক্তি চাঙ্গা হয়েছে। ২০০৯ সাল থেকেই আওয়ামী লীগে ত্যাগীদের সাথে অনুপ্রবেশকারী হাইব্রীডদের বিরোধ শুরু হয়। নবাগতদের সাথে পুরনোদের বিরোধ আওয়ামী লীগের পুরনো ব্যাধি। দলের হাইকমান্ড এই রোগ সারাতে কোন ব্যবস্থা নেয়নি। বরং বিভক্তি থাকলে দলের নেতাকর্মীরা তৎপর থাকে, কর্মী বাড়ে, সংগঠন শক্তিশালী হয়-এই ভ্রান্ত নীতিতে ছিলো ক্ষমতাসীন দলটি। নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যেই দুই দফায় ৩১২ টি উপজেলার নির্বাচনী তফসীল ঘোষণা করেছে। প্রথম দফায় ৮ মে ১৫২ টি উপজেলায়। দ্বিতীয় দফায় ২১ মে ১৬১ টি উপজেলায় নির্বাচন হবে। এই নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগের তৃণমূলে সৃষ্টি হয়েছে চরম বিশৃঙ্খলা। আওয়ামী লীগের জেলার নেতা, এমপি, মন্ত্রী, স্বতন্ত্র এমপি কিংবা পরাজিত এমপি প্রার্থী সবাই উপজেলা দখল নিতে চায়। মাইম্যানকে বসাতে চায়। যিনি ৭ জানুয়ারি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের টিকেটে এমপি হয়েছেন, তিনি মনে করছেন এলাকায় তার কর্তৃত্ব নিরঙ্কুশ করতে হবে। পরাজিত ডামি প্রার্থী কিংবা মনোনয়ন বঞ্চিতরা যেকোন সময় মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারে। এজন্য উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে নিজস্ব লোক দরকার। তিনি একজন ‘একান্ত আপন ব্যক্তি’কে উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী করছেন। 

৭ জানুয়ারির নির্বাচনে স্বতন্ত্র বা ডামি যিনি পরাজিত হয়েছেন, তিনি মনে করছেন এই তো সুযোগ। ৭ জানুয়ারির নির্বাচনের প্রতিশোধ নেয়ার মঞ্চ যেন তার জন্য প্রস্তুত হয়েছে। তিনিও তার নিজের পছন্দের লোককে উপজেলায় দাঁড় করাচ্ছেন। তার প্রধান লক্ষ্য এমপিকে টাইট দেয়া। ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে যিনি এমপিও হননি, নির্বাচনেও দাঁড়াননি, তার অপেক্ষা ছিলো উপজেলা নির্বাচন। তিনি আশা করেছিলেন, সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন না পেলেও উপজেলায় দল তাকে মূল্যায়ন করবে। উপজেলায় যখন ‘নৌকা’ তুলে রাখা হলো, তখন এই বেচারা কি বসে বসে আঙ্গুল চুষবেন! তিনি নিজের শক্তিতে অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে উপজেলায় প্রার্থী হয়েছেন। স্থানীয় যুবলীগ বা ছাত্রলীগ নেতা গত ১৫ বছরে অর্থ বিত্তে বাড় বড়ন্ত হয়েছেন। উপজেলা নির্বাচন তার অস্তিত্ব জানান দেয়ার উপযুক্ত ক্ষেত্র। ভবিষ্যতে এমপি মন্ত্রী হবার প্রথম পরীক্ষা। এভাবে স্থানীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগের নেতারা ‘যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে’ উপজেলা নির্বাচনে ঝাপিয়ে পরেছে। প্রতিটি উপজেলায় ৮ থেকে ১০ জন আওয়ামী প্রার্থী এখন মাঠে। তাদের সমর্থন দিতে গিয়ে কর্মীরাও বহু ভাগে বিভক্ত। এর মধ্যে উপজেলায় মন্ত্রী এমপিদের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক যে হুশিয়ারি দিচ্ছেন, তা এখন স্রেফ তামাশা। কেউ তার কথা কর্ণপাত করেন না। উপজেলা নির্বাচন আওয়ামী লীগের বিভক্তিকে এক চরম পর্যায়ে নিয়ে যাবে বলেই আমি মনে করি। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমনিতেই খুনোখুনি মারামারি বেশী হয়। এবার উপজেলায় এটি সর্বোচ্চ সীমা অতিক্রম করবে বলে আমার ধারণা। 

আওয়ামী লীগ জাতীয় নির্বাচনে যে ডামি কৌশল নিয়েছিল, তা এখন বিভক্তির ব্যাধিতে রূপান্তরিত হয়েছে। ৭ জানুয়ারির নির্বাচনের পর এই অসুখ সারাতে দলটির নেতাদের চেষ্টার অভাব নেই। কিন্তু কেউই এই ব্যাধি সারাতে পারছে না। কুইনাইন দিয়ে জ্বর (নির্বাচন) সেরেছে আওয়ামী লীগের। তবে কুইনাইন (বিভক্তি) সারার পথ খুঁজে পাচ্ছে না টানা ক্ষমতায় থাকা দলটি। 


সৈয়দ বোরহান কবীর, নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত
ই-মেইল: poriprekkhit@yahoo.com


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

নানা চাপে ড. রাজ্জাক

প্রকাশ: ০৯:০০ পিএম, ০৫ এপ্রিল, ২০২৪


Thumbnail

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. আব্দুর রাজ্জাক গত মেয়াদে তিনি ছিলেন দলের অন্যতম ক্ষমতাবান ব্যক্তি। একদিকে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য অন্যদিকে তিনি কৃষিমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের আগে আগে নানা বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে তিনি মন্ত্রিত্ব হারিয়েছেন। এ বার তিনি মন্ত্রিসভায় জায়গা পাননি। প্রেসিডিয়ামেও তিনি কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছেন। রাজনীতিতেও তিনি নানা রকম চাপের মধ্যে রয়েছেন। সব কিছু মিলিয়ে ড. আব্দুর রাজ্জাক এখন রাজনীতিতে একটি সংকটের সময় কাটাচ্ছেন।

যদিও ড. রাজ্জাকের ঘনিষ্ঠরা বলেন যে, তিনি এখনও ভালো অবস্থানে আছেন। দলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং তাদের দাবি, আওয়ামী লীগ সভাপতির সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে যে, ড. রাজ্জাকের আগের অবস্থা এখন আওয়ামী লীগে নেই। তিনি দলের মধ্যেই এখন কোণঠাসা। 

উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগের এই নেতার উত্থান অনেকটা নাটকীয়ভাবে। ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে আবুল হাসান চৌধুরীর দ্বৈত নাগরিকত্বের সঙ্গে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে অপারগতা প্রকাশ করেন এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন। এই সময় ড. রাজ্জাককে মনোনয়ন দেওয়া হয়। ভাগ্যিস, এসময় হয় গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে সরকারি চাকরি থেকে অবসরের পর তিন বছর নির্বাচন করা যাবে না- এই বিধান ছিল না। এই বিধান যদি থাকত তাহলে হয়ত ড. রাজ্জাক তখন নির্বাচন করতে পারতেন না। যাই হোক, ড. রাজ্জাক ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। কিন্তু তারপর তিনি সরকারি চাকরি গ্রহণ করেন। মতিয়া চৌধুরী যখন কৃষি মন্ত্রী তখন তার সঙ্গে মনোমালিন্য করে তিনি চাকরি ছেড়ে দেন। 

আবুল হাসান চৌধুরী নির্বাচন না করার সিদ্ধান্ত নিলে ড. রাজ্জাকের ভাগ্য খুলে যায় এবং তিনি নির্বাচন করেন। ওই নির্বাচনে তিনি বিজয়ী হন। টাঙ্গাইল এমনিতেই আওয়ামী লীগের জন্য একটি উর্বর ক্ষেত্র। কাজেই নির্বাচনে জয়ী হতে তাকে তেমন বেগ পেতে হয়নি। এরপর আর ড. রাজ্জাককে পিছে ফিরে তাকাতে হয়নি। ২০০৭ সালে এক-এগারো সময়  ড. রাজ্জাকের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অনেকে মনে করেন যে, তিনি সংস্কারপন্থি ছিলেন। কিন্তু তারপরও অন্য সংস্কারপন্থিদের মতো তার পরিণতি হয়নি। এর কারণ হল দুটি। প্রথমত, তিনি আওয়ামী লীগ সভাপতির সঙ্গে দ্রুত সম্পর্ক রক্ষা করতে পেরেছিলেন। দ্বিতীয়ত, তিনি সংস্কারপন্থি যদি থেকেও থাকেন তাহলে তিনি সেটি অত্যন্ত গোপনে ছিলেন। যদিও আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই বলেন যে, ২০০৭ সালের এক-এগারো সময় তার ভূমিকা রহস্যময় ছিল।

কিন্তু ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ভূমিধ্বস বিজয়ের পর ড. রাজ্জাক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন এবং ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের গঠিত মন্ত্রিসভায় তাকে খাদ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২০১৪ সালে তিনি মন্ত্রিসভায় না থাকলেও দলে অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থানে ছিলেন এবং একজন প্রভাবশালী প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৮ সালে তিনি কৃষিমন্ত্রী হন এবং মতিয়া চৌধুরী মন্ত্রিত্ব থেকে বাদ পড়েন। এ সময় ড. রাজ্জাকের প্রভাব প্রত্তি ইত্যাদি সবই বেড়ে যায়। কিন্তু নির্বাচনের আগ দিয়ে তিনি বিতর্কিত মন্তব্য করে সমালোচিত হয়েছেন। নির্বাচনের পর তিনি মন্ত্রিসভায় আসেননি। তার সৎ বোন হিসেবে পরিচিত শামসুন্নাহার চাঁপাকে প্রতিমন্ত্রী করে দিয়ে ড. রাজ্জাককে একটা বার্তা দেয়া হয়েছে। আবার এলাকাতেও তিনি নানা রকম সমস্যার মধ্যে পড়ছেন। সবকিছু মিলিয়ে দলের রাজনীতির মধ্যে এক ধরনের চাপে রয়েছেন তিনি। অনেকে মনে করেন যেহেতু রাজ্জাক এখন মন্ত্রী নেই তাদের ধারণা নির্বাচনের আগে দলের সভাপতি তার ওপর ক্ষেপা। এজন্য এলাকায় তার বিরুদ্ধে নানা রকম ষড়যন্ত্র চলছে। আর এই ষড়যন্ত্র পাশ কাটিয়ে ড. রাজ্জাক রাজনীতিতে আবার আগের মতো কর্তৃত্ববান হতে পারবেন কিনা সেটাই দেখার বিষয়।

ড. আব্দুর রাজ্জাক  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

বাংলাদেশে কূটনৈতিক কৌশলে ভারতের কাছে হেরে গেল চীন

প্রকাশ: ০৭:০০ পিএম, ০৪ এপ্রিল, ২০২৪


Thumbnail

টানা চতুর্থবারের মতো ক্ষমতা গ্রহণ করেছে আওয়ামী লীগ। চতুর্থবার সরকার গঠন করার পর আওয়ামী লীগের বন্ধুর অভাব নেই। আন্তর্জাতিক মহলেও দলের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রতিযোগিতা চলছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে জাপান, রাশিয়া থেকে শুরু করে ইউক্রেন সকলেই এখন বাংলাদেশের বন্ধু হতে চায়। এর একটি বড় কারণ হলো ভূরাজনৈতিক অবস্থান এবং বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক উন্নতি। 

বাংলাদেশ এখন বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় বাজারে পরিণত হয়েছে। এই বাজারে সকলে হিস্যা নিতে চায়। এ কারণে নির্বাচনে কী হয়েছে, না হয়েছে সে ব্যাপারে কারও মনোযোগ নেই। সবাই নতুন সরকারের সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক ঝালাই করে নিতে চায়। আর এই সম্পর্ক ঝালাইয়ের সবচেয়ে বেশি প্রতিযোগিতা দেখা গেছে ভারত এবং চীনের মধ্যে। দুই দেশই অবশ্য নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের পাশে ছিল। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের নির্বাচনের ব্যাপারে যে ধরনের হস্তক্ষেপ করছিল এবং যে ধরনের মনোভাব দিচ্ছিল সেখান থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মনোভাব পাল্টানোর ক্ষেত্রে ভারত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। আর অন্যদিকে চীন সব সময় বলছিল যে, তারা বাংলাদেশের সরকারের পাশে আছে এবং গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখার জন্য তারা সরকারকে সহযোগিতা করতে চায়। 

নির্বাচনের পর এই দুই দেশের রাষ্ট্রদূতরা বিভিন্ন মন্ত্রী এবং প্রভাবশালীদের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ অব্যাহত রেখেছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রথম দ্বিপাক্ষিক সফরে যান ভারতে। আর সেই বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রীকে চীনে নেওয়ার চেষ্টায় ব্যস্ত ছিল চীন। চীনের পক্ষ থেকে একজন উচ্চ পর্যায়ের কূটনীতিক সফর করছিলেন বাংলাদেশ এবং তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। চীনের রাষ্ট্রদূতও সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যোগাযোগ করেছিলেন এবং প্রধানমন্ত্রী যেন দ্রুত সময়ের মধ্যে চীনে যায় সেজন্য তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। 

চীন আশা করেছিল, যেহেতু ভারতের সামনে নির্বাচন, এই নির্বাচনের ডামাডোলের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর হবে না। কাজেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রথম সফর হবে চীন এবং এটি হবে ভারতের বিরুদ্ধে চীনের একটি বড় ধরনের কূটনৈতিক বিষয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তেমনটি ঘটেনি। বরং প্রধানমন্ত্রীর প্রথম দ্বিপাক্ষিক সফর ভারতেই হবে বলে এখন জানা যাচ্ছে। ভারতে সামনে নির্বাচন। ৭ জুন এই নির্বাচনের ফলাফল জানা যাবে। নির্বাচনের ফলাফলের পর দ্রুততম সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত দ্বিপাক্ষিক সফর চূড়ান্ত করা হবে বলে কূটনৈতিক সূত্রে আভাস দেওয়া হয়েছে। 

বাংলাদেশ নানা কারণেই ভারতের প্রতি কৃতজ্ঞ। বাংলাদেশের কৃতজ্ঞতা সবচেয়ে বড় কারণ হল একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ। এই সময় মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের নেতৃত্ব দিয়েছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ। আর এ কারণেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভারতের একটি আবেগতাড়িত সম্পর্ক রয়েছে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহযোগিতার কথা আওয়ামী লীগ সবসময় স্মরণ করে। এছাড়াও বাংলাদেশের বিভিন্ন সঙ্কটে ভারতই প্রথম পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। ভারত হল বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রতিবেশী। সব কিছু পাল্টানো গেলেও প্রতিবেশী পাল্টানো যায় না। আর এরকম বাস্তবতাতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রথম দ্বিপাক্ষিক সফর করেছিলেন ভারতে এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফরের সূত্র ধরেই ৭ জুনের নির্বাচনের পরপরই প্রধানমন্ত্রীর সফরও ভারতে হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এটি বাংলাদেশে চীনের আরেকটি কূটনৈতিক পরাজয়। বাংলাদেশ যেমন ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চলেছে তেমনি চীনের সঙ্গেও সুসম্পর্ক রেখে চলেছে। বাংলাদেশের যে কূটনৈতিক ভিত্তি তা হলো কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়, সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব। যেটি জাতির পিতা নির্ধারণ করে গেছেন। সেই নীতিতে অটল থাকছে বাংলাদেশ। কিন্তু সবকিছুর মূলে রয়েছে প্রতিবেশী প্রথম। আর সেই প্রতিবেশী প্রথম নীতিতেই ভারতেই প্রধানমন্ত্রী প্রথম সফর করবেন।

বাংলাদেশ   কূটনৈতিক কৌশল   ভারত   চীন  


মন্তব্য করুন


বিজ্ঞাপন