এডিটর’স মাইন্ড

নির্বাচনকালীন সরকার: আওয়ামী লীগ-বিএনপি কে কতটা ছাড় দিবে

প্রকাশ: ০৮:০০ পিএম, ১৯ এপ্রিল, ২০২৩


Thumbnail

নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার নয় বরং একটি নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে আওয়ামী লীগ এবং বিরোধী দলের মধ্যে দরকষাকষি চলছে। পশ্চিমা কয়েকটি দূতাবাসের উদ্যোগে এই নির্বাচনকালীন সরকার কাঠামো নিয়ে আলাপ-আলোচনা চলছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। এই আলাপ-আলোচনায় নেতৃত্ব দিচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মূলত মার্কিন মধ্যস্থতায় প্রধান দুটি দল নির্বাচনকালীন সময়ে সমঝোতায় আসার চেষ্টা করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কিন্তু এই নির্বাচনকালীন সরকারের যে আলাপ আলোচনা বা সমঝোতার চেষ্টা সেটি আদৌ সফল হবে কি না তা নিয়েও অনেকের মধ্যে সংশয় রয়েছে। 

নির্বাচনকালীন সরকার কেমন হবে এই নিয়ে দু পক্ষের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন চিন্তা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে যে বিএনপি নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিও নয় আবার বর্তমান সরকার বহাল রেখে নির্বাচন সেটিও নয় মাঝামাঝি একটি অবস্থানে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে এবং সেখানে মূলত কয়েকটি বিষয় দেখা হচ্ছে। 

প্রথমত, নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান বৈশিষ্ট্য হবে প্রধানমন্ত্রী যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন তাহলে তার ক্ষমতা হ্রাস করা। বিশেষ করে তিনি যেন রুটিন কাজের বাইরে কোন নীতি নির্ধারণী কাজ করতে না পারেন সেটি নিশ্চিত করা এবং তাঁর নির্বাচনী এলাকার বাইরে অন্য কোথাও যেন তিনি সরকারি প্রটোকল এবং সুযোগ সুবিধা ব্যবহার করে প্রচারণায় অংশগ্রহণ করতে না পারেন সেটি নিশ্চিত করা। 

দ্বিতীয়ত, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে যে সরকার থাকবে সে সরকার অংশগ্রহণমূলক হতে হবে। প্রয়োজনে সকল দলের অংশগ্রহণে একটি নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হতে পারে। যে রকম সরকার গঠনের প্রস্তাব ২০১৪ নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী দিয়েছিলেন। তবে এখানে একটি সমস্যা রয়েছে তা হলো বিএনপির সংসদ সদস্যরা ইতোমধ্যে সংসদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। কাজেই চাইলেও তাদেরকে নির্বাচনকালীন সরকারে অন্তর্গত করা যাবে না। তবে সমঝোতার পক্ষে কেউ কেউ বলছেন যে ১০ জনের মন্ত্রিসভা হলেও একজনকে টেকনোক্র্যাট কোঠায় মন্ত্রী রাখা যায়। সে ক্ষেত্রে বিএনপির প্রতিনিধি রাখা কোন কঠিন ব্যাপার নয়। এটি অন্তত সহজেই করা যেতে পারে। 

তৃতীয়ত, নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং যেকোনো সময় ভোট বাতিলের যে প্রস্তাব নির্বাচন কমিশন করেছে সেই প্রস্তাব গ্রহণ করা। ইতোমধ্যেই নির্বাচন আইন সংস্কারের প্রস্তাব নীতিগতভাবে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে এটি আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন কর্তৃক প্রেরিত এই প্রস্তাবনায় নির্বাচনকালীন সময়ে অনিয়মের অভিযোগ হলে নির্বাচন কমিশনকে ভোট বাতিল করে দেয়া এখতিয়ার দেয়া হয়েছিল। এ নিয়ে সরকারের কারো কারোও আপত্তি রয়েছে। আর এই বিষয়টির ব্যাপারে পশ্চিমাদের আগ্রহ রয়েছে। এছাড়া নির্বাচনকালীন সরকারের ব্যাপারে আরেকটি ভাবনা হলো নির্বাচনের সময় প্রশাসনকে পুরোপুরি ভাবে নির্বাচন কমিশন এর আওতায় নিয়ে আসা এবং প্রশাসনের যে কাউকে চাইলে রদবদল করতে পারে এবং প্রশাসনের যেকোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে এমন একটি ব্যবস্থা গ্রহণ করা। তবে যেটিই হোক না কেন নির্বাচনকালীন সরকার হবে সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে, এটি নিশ্চিত হয়েছে। বিএনপি যে দাবি করেছিল সংবিধান সংশোধন করে একটি নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা সেটি হচ্ছে না। তবে দেখার বিষয় যে আওয়ামী লীগ নির্বাচনকালীন সরকারের ব্যাপারে কতটুকু ছাড় দেয়। 

আওয়ামী লীগের নেতারা অবশ্য বলছেন যে ২০১৪’র নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যে পরিমাণ ছাড় দিয়েছিল সেটি আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ ছাড়। তার বাইরে আওয়ামী লীগের আর বেশী ছাড় দিতে পারবে না। তবে বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর প্রধান লক্ষ্য প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা সংকুচিত করা, প্রধানমন্ত্রীকে নিষ্ক্রিয় রাখা, কর্তৃত্বহীন রাখা। এই দরকষাকষিতে শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সমঝোতা হয় কিনা সেটাই দেখার বিষয়। 

রাজনীতির খবর   নির্বাচনকালীন সরকার   আওয়ামী লীগ   বিএনপি  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

আনার, আজিজ, বেনজীর: কীসের ইঙ্গিত

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ২৭ মে, ২০২৪


Thumbnail

এক.

তিনজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে নিয়ে সপ্তাহজুড়ে তোলপাড় দেশ। একজন জনপ্রতিনিধি। একজন সাবেক সেনাপ্রধান। তৃতীয় ব্যক্তি সাবেক পুলিশপ্রধান। ভিন্ন ভিন্ন কারণে এবং ঘটনায় তারা আলোচনায়। তিন ঘটনার প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ আলাদা। কিন্তু তিন ঘটনায় এক অদ্ভুত মিল খুঁজে পাওয়া যায়। গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি ও অনিয়ম। একজন জীবন দিয়ে তার অন্ধকার জগতের দরজা খুলে দিয়েছেন। একজন ক্ষমতার অপব্যবহারের জন্য মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েছেন। তৃতীয়জনের স্থাবর সম্পত্তি জব্দ করা হয়েছে দুর্নীতির অভিযোগে। এ তিনটি ঘটনার পর একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—জনগণের সেবার দায়িত্ব কারা পাচ্ছেন? দুর্নীতিবাজরা, চোরাকারবারি, ক্ষমতা অপব্যবহারকারীরা কীভাবে জনপ্রতিনিধি হচ্ছেন, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাচ্ছেন? এ ধরনের ব্যক্তিদের হাতে জনগণ কতটা নিরাপদ?

দুই.

প্রথমেই জনপ্রতিনিধি প্রসঙ্গে খানিকটা আলোকপাত করা যাক। ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম আনারকে কলকাতায় নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। গত বুধবার এ খবরটি নিশ্চিত করে কলকাতা পুলিশ। গত ১২ মে তিনি চিকিৎসার জন্য ভারতে যান। ১৮ মে থেকে তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। আনার হত্যাকাণ্ডের পর গণমাধ্যমে এখন পর্যন্ত যেসব খবর প্রকাশিত হয়েছে, তা লোমহর্ষক। হিন্দি সিনেমার মতো। এ হত্যাকাণ্ডের পর চোরাচালানের ‘আন্ডারওয়ার্ল্ডে’র চাঞ্চল্যকর সব খবর প্রকাশিত হচ্ছে। ২৪ মে ‘কালবেলা’র খবরে বলা হয়েছে, ‘চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে রয়েছে স্বর্ণ চোরাচালানের ২০০ কোটি টাকা নিয়ে দ্বন্দ্ব। এ ছাড়া সীমান্তকেন্দ্রিক চোরাচালানের রুট নিয়ন্ত্রণও খুনের আরেক কারণ হিসেবে কাজ করেছে...।’ আনার হত্যাকাণ্ড নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন সংস্থা তদন্ত করছে। বাংলাদেশে ও ভারতে সন্দেহজনক ব্যক্তিরা আটক হয়েছেন। নিশ্চয়ই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উন্মোচিত হবে শিগগির। তিনবারের সংসদ সদস্য আনারের মৃত্যুর পর তার জীবনের অন্ধকার অধ্যায় সামনে এসেছে। সন্দেহ নেই, প্রয়াত এ সংসদ সদস্য অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন। তার মৃত্যুর পর এলাকার জনগণের মধ্যে যে আবেগ এবং শোক দেখা গেছে, তা অভূতপূর্ব। কিন্তু মৃত্যুর পর জানা গেল তিনি চোরাচালান চক্রের একজন ‘গডফাদার’ ছিলেন। ওই এলাকার চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ করতেন এই সংসদ সদস্য। এটি যে কোনো গোপন বিষয়, তা নয়। ওপেন সিক্রেট। সবাই জানতেন। আওয়ামী লীগেও নিশ্চয়ই বিষয়টি অজানা নয়। সবকিছু জেনেশুনে একজন চোরাকারবারিকে কীভাবে তিন-তিনবার জনপ্রতিনিধি হিসেবে আওয়ামী লীগ মনোনয়ন দিল? ২০০৯ সাল থেকে টানা ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ এর মধ্যে ২০১৪ এবং এ বছরের ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি অংশগ্রহণই করেনি। তাই এমনটি বলার কোনো সুযোগ নেই যে, জেতার জন্য ‘বিতর্কিত’ ব্যক্তিকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। কৌশলগত কারণে আপস করতে হয়েছে। এসব নির্বাচনে সৎ, পরিচ্ছন্ন মানুষকে সামনে আনার সুযোগ পেয়েছে আওয়ামী লীগ। দলের ত্যাগী, পরীক্ষিতদের মনোনয়ন দিয়ে রাজনীতিকে শুদ্ধ করার সুযোগ পেয়েছে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দলটি। বিভিন্ন স্থানে এরকম করাও হয়েছে। তাহলে কেন সর্বহারা রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত একজন চোরাকারবারিকে বারবার মনোনয়ন দেওয়া হলো? কার স্বার্থে এ ধরনের বিতর্কিত, অন্ধকার জগতের লোকজনকে জনপ্রতিনিধি বানানো হয়? আনারের দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যুর পর একটি বিষয় সামনে এসেছে, আমাদের জনপ্রতিনিধি কারা হচ্ছেন? কারা আমাদের ‘ভাগ্যবিধাতা’ হয়ে সংসদে যাচ্ছেন। এর আগেও একজন আদম ব্যবসায়ীকে সংসদে আনা হয়েছিল। বিদেশে তিনি গ্রেপ্তার হন। পরে জানা যায়, আওয়ামী লীগের প্রয়াত এক নেতাকে বিপুল অর্থ দিয়ে তিনি ‘স্বতন্ত্র’ভাবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। স্ত্রীকেও টাকার দাপটে সংসদ সদস্য বানিয়েছিলেন। আমরা প্রায়ই বলি, জাতীয় সংসদ ব্যবসায়ীদের দখলে। রাজনীতিবিদদের হাতে রাজনীতি নেই। কিন্তু রাজনীতি এখন কি ক্রমশ কালো টাকার মালিক, অন্ধকার জগতের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে? ভবিষ্যতের রাজনীতি কি মাফিয়ারা নিয়ন্ত্রণ করবে?

তিন.

জেনারেল আজিজ আহমেদ সাবেক সেনাপ্রধান। তিন বছর সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ পদে দায়িত্ব পালনের পর ২০২১ সালের জুনে তিনি অবসরে যান। ২০ মে সোমবার মধ্যরাতের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার এবং তার পরিবারের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ক্ষমতার অপব্যবহার, তিন ভাইয়ের অপরাধ ধামাচাপা দিতে প্রভাব খাটানো এবং ভাইদের সেনা কেনাকাটায় অবৈধ সুযোগ দেওয়ার অভিযোগে জেনারেল আজিজ ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সাবেক সেনাপ্রধানের বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো উত্থাপন করেছে, তা নতুন নয়। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কাতারভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল আলজাজিরায় এ নিয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। ‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টারস মেন’ শিরোনামে ওই প্রতিবেদনের প্রতিবাদ করেছিল বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। প্রতিবেদনের ভেতর ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ আবিষ্কার করা হয়েছিল। এ কথা সত্য, আজিজ আহমেদ এবং তার ভাইদের বিরুদ্ধে বহুল আলোচিত ওই প্রামাণ্যচিত্রে অযৌক্তিক এবং অন্যায়ভাবে প্রধানমন্ত্রীকে জড়ানোর একটি কুৎসিত চেষ্টা ছিল। এ কারণেই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটির উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কিন্তু ওই প্রতিবেদনে সেনাপ্রধান এবং তার ভাইদের বিভিন্ন অপকর্মগুলোর নিরপেক্ষ ও নির্মোহ তদন্ত করা ছিল সরকারের দায়িত্ব। সরকার অভিযোগগুলো আমলেই নেয়নি। বিশেষ করে নাম, ঠিকানা, পিতৃপরিচয় পরিবর্তন করে জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট নেওয়ার মতো বিষয়গুলো প্রমাণিত। এসব জালিয়াতি ও প্রতারণার বিরুদ্ধে সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। আজিজ আহমেদ এবং তার ভাইদের অপরাধ তাদের ব্যক্তিগত। রাষ্ট্র বা সরকার কেন তার দায় নেবে? চাকরি জীবনে জেনারেল আজিজ দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। সেনাপ্রধান হওয়ার আগে তিনি বিজিবির মহাপরিচালক ছিলেন। দুই জায়গাতেই তার ব্যাপারে নানা মুখরোচক আলোচনা শোনা যায়। সরকারের ঘনিষ্ঠ এরকম একটি ধারণা দিয়ে তিনি দাপট দেখিয়েছেন, ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন বলে বিস্তর অভিযোগ আছে। কিন্তু এসব অভিযোগ তদন্ত তো দূরের কথা, আমলেই নেওয়া হয়নি। মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে আমাদের গৌরবের সশস্ত্র বাহিনী। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আমাদের অহংকার, দেশের গর্ব। এখনো এ প্রতিষ্ঠানটির ব্যাপারে জনগণের আস্থা আশাতীত। হত্যা ও রাজনীতির উচ্চাভিলাষ থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী একটি চৌকস, পেশাদার বাহিনী হিসেবে বিশ্বে বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে। ২০০৯ সাল থেকে সেনাবাহিনী আন্তর্জাতিক মানের একটি সুশৃঙ্খল বাহিনী হিসেবে গড়ে উঠেছে। সেনাপ্রধানরা অবসরের পর নিভৃত জীবনযাপন করেন। দায়িত্ব পালন করে তাদের পেশাদারিত্ব, সততা ও নিষ্ঠা তরুণদের জন্য অনুকরণীয় হয়। কিন্তু জেনারেল আজিজদের সময়ে ব্যাপারটি তেমন ছিল না। বিজিবির প্রধান বা সেনাপ্রধান হিসেবে তার অনেক কর্মকাণ্ডেই পেশাদার অফিসাররা অস্বস্তিতে পড়েছেন। বিব্রত হয়েছেন। সেনাপ্রধানের চেয়ে সরকারের ঘনিষ্ঠ—এ পরিচয়টি তার ক্ষেত্রে মুখ্য হয়ে উঠেছিল। আজিজ আহমেদ সেনাপ্রধান হওয়ার যোগ্য ছিলেন কি না, সেটা ভিন্ন বিতর্ক। আমি সে বিতর্কে যাব না। তবে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তির জন্য স্বচ্ছতা, জবাবদিহি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই পদের সঙ্গে সেনাবাহিনী তথা সশস্ত্র বাহিনীর মর্যাদা ও সম্মান জড়িত। আজিজ আহমেদের কর্মকাণ্ড অনেক আগেই জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত ছিল। তার বিরুদ্ধে কথিত অভিযোগগুলোকে অবজ্ঞা করার কোনো সুযোগ নেই। আমার প্রশ্ন, শীর্ষ পদে যাওয়ার পর একজন ব্যক্তি কেন বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। ক্ষমতার দাপটে নিজেদের আইনের ঊর্ধ্বে মনে করেন? কেন তার লাগাম টেনে ধরা হয় না? এ ধরনের স্পর্শকাতর পদে দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকার কি যথেষ্ট সতর্ক? কেবল রাজনৈতিক বিবেচনায় এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া উচিত কি না, আজিজ আহমেদের ঘটনার পর সেই বিতর্ক সামনে এসেছে।

চার.

বৃহস্পতিবার (২৩ মে) ঢাকার একটি বিশেষ আদালত সাবেক পুলিশপ্রধান বেনজীর আহমেদ এবং তার স্ত্রী, কন্যার সব স্থাবর সম্পদ এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করার নির্দেশ দেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালতের এই আদেশ। গত কিছুদিন ধরেই সাবেক এই পুলিশপ্রধানের বিপুল অবৈধ সম্পদ নিয়ে তোলপাড় চলছিল। একটি জাতীয় দৈনিকে তার দুর্নীতির ফিরিস্তি প্রকাশিত হয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি হাইকোর্টের দৃষ্টিতে আনেন একজন আলোচিত সংসদ সদস্য। হাইকোর্টে বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দেয় দুর্নীতি দমন কমিশনকে। দুই মাসের মধ্যে এ বিষয়ে তদন্ত নির্দেশ দেয় দুর্নীতি দমন কমিশনকে। তদন্তের স্বার্থেই দুদক বেনজীর এবং তার পরিবারের সদস্যদের সম্পদ ক্রোক করার আবেদন করে। বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে সংবাদপত্রের যখন ধারাবাহিকভাবে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল, তখন আমি আশা করেছিলাম তিনি এর কড়া প্রতিবাদ জানাবেন। কিন্তু তা না করে সাবেক এই পুলিশপ্রধান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ এক বক্তৃতা দেন, যা ছিল অনেকটাই আত্মরক্ষামূলক। তার ওই বক্তব্যে তার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর জুতসই জবাবও ছিল না। তাই এখন দেখার বিষয়, দুদক তদন্ত করে কী পায়। বেনজীর আহমেদ দুর্নীতি করেছেন কি না, তা সময়ই বলে দেবে। কিন্তু মেধাবী এই পুলিশ কর্মকর্তার বেপরোয়া হয়ে ওঠার নানা কেচ্ছা-কাহিনি অলিগলিতে আলোচনা হয়। পুলিশের প্রায় কর্মকর্তাই তার পরিবর্তনের বিস্মিত। এক সময় চৌকস, দক্ষ এই পুলিশ কর্মকর্তার বদলে যাওয়া নিয়ে রীতিমতো সিনেমা হতে পারে। হলি আর্টিসানের ঘটনায় তিনি যে বীরত্ব দেখিয়েছিলেন, তা সত্যি অতুলনীয়। কিন্তু তার ঘনিষ্ঠ সহকর্মীরাই হতাশার সুরে বলেন, পুলিশপ্রধান হওয়ার পর তিনি বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। নানা রকম বিতর্ক এবং অনিয়মের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। প্রচণ্ড ক্ষমতার দাপটে তিনি যা খুশি তা-ই করেছেন বলেও অনেক মন্তব্য করেন। পুলিশপ্রধান থাকা অবস্থায় তার লাগামহীন দুর্নীতি সরকারের বিভিন্ন মহলে আলোচিত হয়েছিল। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষপদে থাকা একজন ব্যক্তির এসব কাণ্ড সরকারের জন্যও বিব্রতকর। এখন দেখার বিষয়, বেনজীর আহমেদের পরিণতি কী হয়।

পাঁচ.

আওয়ামী লীগ সরকার টানা ১৫ বছরের বেশি ক্ষমতায়। এ সময় দেশ পরিচালনায় সরকার অনেক শীর্ষ পদে বহুজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকেই দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। অনেকের সততা ও নিষ্ঠা এখনো অনুকরণীয় উদহারণ। আবার কেউ কেউ শীর্ষ পদে গিয়ে এমনসব কাণ্ড করেছেন যে, সরকারই তাদের কাজে বিব্রত হয়েছেন। দুর্নীতিবাজ, অযোগ্য এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় যারা বিভিন্ন শীর্ষ পদে গেছেন তারাই বিতর্কিত ভূমিকার জন্য সমালোচিত হয়েছেন। এর ফলে সরকারও ইমেজ সংকটে পড়েছে।

এই তিনটি ঘটনার একটি সহজ সমীকরণ আমার কাছে স্পষ্ট। পক্ষপাত করে, রাজনৈতিক বিবেচনায় বা প্রভাবিত হয়ে যোগ্যতার বাইরে কাউকে কোনো দায়িত্ব দেওয়া উচিত নয়। হোক না তা জনপ্রতিনিধি কিংবা পুলিশপ্রধান। ইদানীং অর্থের বিনিময়ে মনোনয়ন পাওয়ার কথা বেশ চালু হয়েছে। অযোগ্যরা তদবির করে, চাটুকারিতার মাধ্যমে অথবা সরকারকে নানাভাবে প্রভাবিত করে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসেছেন। এরাই বিতর্কিত হচ্ছেন, সরকারকেও করছেন বিব্রত। এদের লোভ, দুর্নীতি, অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা এবং অনৈতিক কর্মকাণ্ডের ফলে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। সৃষ্টি হচ্ছে আস্থার সংকট। এই তিন ঘটনা আমাদের একটি সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করাই তা হলো গুরুত্বপূর্ণ পদে বা দায়িত্বে লোক বাছাই করতে হবে নির্মোহভাবে, শুধু যোগ্যতার ভিত্তিতে। না হলে ক্ষতি হবে সরকারের, দেশের।

লেখক: নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত

ইমেইল: poriprekkhit@yahoo.com


আনার   আজিজ   বেনজির   দুর্নীতি   নিষেধাজ্ঞা   হত্যা  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

চীন থেকে ফিরেই ভারতের সমালোচনায় মেনন

প্রকাশ: ০৬:০০ পিএম, ২৬ মে, ২০২৪


Thumbnail

চীন থেকেই ফিরে ভারতের সমালোচনায় মুখর হলেন ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা রাশেদ খান মেনন। সাম্প্রতিক সময়ে ১৪ দলের শরিকদের নিয়ে একটি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব দিয়ে তিনি চীন নিয়ে যান। এ সফরের উদ্দেশ্য কি ছিল বা কেনই বা চীন তাদেরকে জামাই আদর দিয়ে নিয়ে গেছিল সে সম্পর্কে বিস্তারিত কিছুই জানায়নি ইদানিং সুবিধাভোগী নেতারা। তবে চীন থেকে ফিরে আসার পর যেন রাশেদ খান মেননের মগজ ধোলাই হয়েছে তা দিব্যি বোঝা গেল। চীন থেকে ফেরার পরেই তিনি এখন ভারত বিরোধী ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন। 

গতকাল ঢাকা রিপোটার্স ইউনিটিতে ওয়ার্কার্স পার্টি আয়োজিত অভিন্ন পানি বন্টণ: প্রেক্ষিত পদ্মা ও তিস্তা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি গঙ্গার পানি চুক্তি ও তিস্তার পানি চুক্তি নিয়ে ভারতের তীব্র সমালোচনা করেন। এই অনুষ্ঠানে ভারতের পক্ষ থেকে যে তিস্তা মহা পরিকল্পনার জন্য যে অর্থায়নের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে তাকে জুতা মেরে গরু দান বলে অভিহিত করেন। এছাড়াও তিনি গঙ্গার পানি চুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এখন মাওলানা ভাসানীর মতো ফারাক্কা মিছিল করার মতোও গুরুত্ব আরোপ করেন। শুধু তাই নয়, ভারতের সঙ্গে যে অভিন্ন নদীগুলো নিয়ে তার উদ্বেগ উৎকণ্ঠা তীব্র হিসেবে ধরা পরে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, হঠাৎ করে রাশেদ খান মেনন গঙ্গা এবং তিস্তার পানি চুক্তি নিয়ে এতো মরিয়া হলেন কেন? 

বাংলা ইনসাইডারের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, চীন দীর্ঘদিন ধরেই কুড়িগ্রাম অঞ্চলে তিস্তা নদীর চারপাশে জলাধার নির্মাণের প্রস্তাব দিচ্ছিলো। ১০০ কোটি ডলারের এই প্রস্তাবের মূল বিষয়টি ছিল বর্ষা মৌসুমে তিস্তার পানি থেকে এই জলাধারগুলোকে ভরানো হবে এবং শুষ্ক মৌসুমে এই পানিগুলো দিয়ে শুষ্কতা কাটানো হবে। তবে ভারত এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধীতা করছিল। এবার ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের ঢাকা সফরের সময় ভারত একটি ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’র এক বিকল্প প্রস্তাব দেয় এবং সেখানে ভারত অর্থায়ন করার জন্য প্রস্তাব দেয়। এই প্রস্তাবের মাধ্যমে পানি বণ্টনের একটা সমাধান হবে বলে অনেকে মনে করেন। ভারতের পক্ষ থেকে এটাও বলা হয়েছে যে, নির্বাচনের পর তারা বাংলাদেশের সঙ্গে পানি চুক্তির বিষয়টি চূড়ান্ত ফয়সালা করবে। 

সাম্প্রতিক সময়ে, বিশেষ করে ৭ জানুয়ারির নির্বাচনের পর চীন বাংলাদেশের ব্যাপারে অনেক আগ্রাসী হয়ে গেছে। বিভিন্ন লোভনীয় বিনিয়োগ প্রস্তাব নিয়ে চীন আসছে। যদিও বাংলাদেশ এখন চীনের সাথে বিনিয়োগের ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করছে। নতুন করে বিনিয়োগের ব্যাপারে বাংলাদেশ একটু রক্ষণশীল ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। আর এ কারণেই চীন এখন বাংলাদেশে তাদের রাজনৈতিক মিত্রের সন্ধান করছে। যারা বাংলাদেশে ভারত বিরোধীতা উষ্কে দিবে এবং ভারতের সমালোচনার মাধ্যমে চীনকে সামনে আনবে। চীন ক্ষমতাসীন দলের মধ্যেই এখন প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করছে এবং ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে যেন চীন পন্থীদের প্রভাব বাড়ে সে চেষ্টা করছে। ১৪ দলের নেতাদের চীন সফরের পর এই সংবাদ সম্মেলন তারই ইঙ্গিত বহন করে। 

এখন ৫০ সদস্যের একটি আওয়ামী লীগ প্রতিনিধি দল চীনে অবস্থান করছেন। এবং তারা ফিরে আসার পর পরই কাজী জাফর উল্লাহর নেতৃত্বে আরেকটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল চীন সফর করবে। সবকিছু মিলিয়ে রাজনীতিতে চীন প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করছে যেন রাজনীতিবিদরা ভারত বিরোধীতায় নামেন এবং চীনের প্রকল্পের স্বার্থগুলো বাস্তবায়িত হয়। আর এই কারণেই রাশেদ খান মেনন এখন নতুন করে আবার চীন পন্থী হিসেবে নিজেকে যালাই করে নিলেন। চীনে রাজনীতিবিদদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কি মগজ ধোলাই করার জন্য- এ প্রশ্নটি এখন সামনে এসেছে। 


ওয়ার্কার্স পার্টি   রাশেদ খান মেনন   চীন   ভারত  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

দুর্নীতিবাজরা প্রধানমন্ত্রীর লোক হতে পারে না

প্রকাশ: ১০:৩০ পিএম, ২৪ মে, ২০২৪


Thumbnail

সাবেক সেনাপ্রধান এবং সাবেক পুলিশ প্রধানকে নিয়ে এখন সারা দেশ জুড়ে তোলপাড় চলছে। সাবেক পুলিশ প্রধান বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে বৃহস্পতিবার ঢাকার একটি আদালত ক্রোক পরোয়ানা জারি করেছে। বেনজীর আহমেদ, তার স্ত্রী এবং কন্যার নামে থাকা ৮৩ টি বিভিন্ন স্থাবর সম্পত্তি দলিল জব্দ করার নির্দেশ দিয়েছে আদালত। এছাড়া তাদের ব্যাংক একাউন্টও জব্দ করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বেনজীর আহমেদ অত্যন্ত দাপুটে পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন এবং পুলিশ প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন রকম অভিযোগ চাউর হয়েছিল। এখন বেনজীরের বিরুদ্ধে অভিযোগ গুলো দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্ত করছে। 

সোমবার (২০ মে) মধরাতের পর মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বাংলাদেশের সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আজিজ আহমেদ ও তার পরিবারের সদস্যরা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।’ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলারের দেয়া বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘উল্লেখযোগ্য পরিমাণ দুর্নীতিতে সম্পৃক্ততার কারণে বাংলাদেশের সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদকে ‘ফরেন অপারেশন অ্যান্ড রিলেটেড প্রোগামস অ্যাপ্রোপ্রিয়েশনস অ্যাক্টের ৭০৩১ (সি) ধারার অন্তর্ভুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছে পররাষ্ট্র দপ্তর। এর ফলে আজিজ আহমেদ ও তার পরিবারের সদস্যরা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।’ নিষেধাজ্ঞা আরোপের ক্ষেত্রে যে অভিযোগ গুলো উত্থাপন করা হয়েছে সে অভিযোগগুলো বহুল প্রচারিত এবং পুরোনো। অভিযোগগুলো প্রথম উত্থাপিত হয়েছিল ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি। ঐ দিন আল জাজিরা ‘অল প্রাইম মিনিস্টারস মেন’ শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী প্রামাণ্য চিত্র প্রচার করেছিল। ঐ প্রামাণ্য চিত্রটি নির্মাণ করেন ডেভিড বাগম্যান, তাসনিম খলিল এবং জুলকার নাইন। এরা তিনজনজনই বিতর্কিত, মতলববাজ এবং একটি বিশেষ গোষ্ঠীর হয়ে সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের জন্য পরিচিত। আল-জাজিরার প্রতিবেদনে জোর করে যুক্তিহীন ভাবে প্রধানমন্ত্রীকে টেনে আনার করার চেষ্টা হয়েছিল। আজিজ আহমেদ এবং তার তিন ভাইকে প্রধানমন্ত্রীর লোক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল এ প্রতিবেদনে। ঐ সময় ঐ প্রতিবেদন নিয়ে দেশে বিদেশে হৈ চৈ হয়। 

মার্কিন ঘোষণার পর সাবেক সেনাপ্রধান তার মতো করে আত্মপক্ষ সমর্থনের চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেছেন, বিজিবির মহাপরিচালক এবং সেনাবাহিনীর প্রধান থাকা অবস্থায় কোন রকম দুর্নীতির আশ্রয় গ্রহণ করেননি। গণমাধ্যমে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এটিও বলেছেন যে, এ ঘটনা সরকারকেও হেয় করে। 

আজিজ আহমেদের নিষেধাজ্ঞার ঘটনাটি এমন এক সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা করলো যখন দুই দেশ সম্পর্ক এগিয়ে নেয়ার  প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। কদিন আগেই যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু বাংলাদেশ সফর করেছেন। এ সফরে তিনি অতীতের তিক্ততা ভুলে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার বার্তা দিয়েছেন। লু এর সফরের পর সরকারের মধ্যে ছিলো স্বস্তি ভাব। বিএনপির মধ্যে হতাশা। তবে ডোনাল্ড লু তার সফরে সুস্পষ্টভাবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এবং দুর্নীতি প্রতিরোধে বাংলাদেশ সরকারকে সহযোগিতা করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছিলেন। আর তিনি ফিরে যাবার পর পরই যুক্তরাষ্ট্র সাবেক সেনাপ্রধানের উপর এই নিষেধাজ্ঞার বার্তাটি ঘোষণা করলো। বাংলাদেশে সাবেক সেনাপ্রধানের এই নিষেধাজ্ঞার ঘটনাটি নিয়ে নানারকম প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিএনপি এই ঘটনার পর স্ববিরোধী অবস্থান নিয়েছে। দলের মহাসচিব মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেছেন, এতে বিএনপির কিছু যায় আসে না। তার মতে এই নিষেধাজ্ঞা একধরনের বিভ্রান্তি। এটিকে তিনি বলেছেন ‘আই ওয়াশ’। আবার দলটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এটিকে সরকারের দায় হিসেবে প্রচার করছে। আওয়ামী লীগের মধ্যেও নিষেধাজ্ঞা নিয়ে পরস্পর বিরোধী অবস্থান লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দলের সাধারণ সম্পাদক ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য দুরকম।পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিষয়টিকে সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত কোন বিষয় নয় বলেই মন্তব্য করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র আগেই জানিয়েছিল বলে উল্লেখ করে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, এটি ব্যক্তির বিরুদ্ধে, সরকারের বিরুদ্ধে নয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর মন্তব্যও ছিলো একই রকম। কিন্তু বুধবার ওবায়দুল কাদের কথা বললেন উল্টো সুরে। ‘নিশি রাতের স্যাংশন পরোয়া করিনা’ বলে হুংকার দিলেন কাদের। আমি মনে করি এটি ব্যক্তির উপর নিষেধাজ্ঞা। দুই দেশের সম্পর্কের উপর এটি কোন প্রভাব ফেলবে না। ব্যক্তির অপরাধের জন্য যুক্তরাষ্ট্র এরকম নিষেধাজ্ঞা হরহামেশাই দেয়।

তবে এই নিষেধাজ্ঞার বহুমাত্রিক তাৎপর্য রয়েছে। জেনারেল আজিজ আহমেদ বাংলাদেশে একজন আলোচিত বিতর্কিত এবং সমালোচিত ব্যক্তি। ২০২১ সালের জুনে সেনাপ্রধানের পদ থেকে তিনি অবসরের পর নিভৃত জীবন যাপন করছেন বটে, কিন্তু তিনি সেনাপ্রধান এবং বিজিবির মহাপরিচালক থাকা অবস্থায় তার কর্মকান্ড নিয়ে নানামুখী আলাপ আলোচনা এখনও চলমান। তার তিন ভাইকে নিয়ে সত্য-মিথ্যা নানা গল্প বিভিন্ন মহলে আলোচনা হয়। অনেকের ধারণা আজিজ আহমেদের কারণেই তারা বেপোয়ারা হয়ে উঠেছিলেন। 

মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পর কেউ কেউ একটি সরল সমীকরণ আনার চেষ্টা করছেন। তারা বলছে যে, আজিজ আহমেদ এইসব অপকর্ম করেছেন সরকারের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে। বিতর্কিত এবং যুদ্ধ অপরাধীদের পৃষ্ঠপোষক ডেভিড ব্যাগম্যান ও তার সাঙ্গ-পাঙ্গরা আল জাজিরার প্রতিবেদনে আজিজ আহমেদকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছিল। সেই প্রামাণ্য চিত্রকে সামনে এনে অনেকে অপপ্রচারের নতুন এজেন্ডা গ্রহণ করেছে। কিন্তু নির্মোহ ভাবে বিশ্লেষণ করলে আল জাজিরার প্রতিবেদনে এটিই ছিলো সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিবৃতিতে আজিজ আহমেদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সম্পর্কের বিষয় আমলে নেয় নি। নির্মোহভাবে তার অনিয়ম গুলো তুলে ধরা হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো যে, আজিজ আহমেদ কি প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ ছিলেন? প্রধানমন্ত্রীর অনুকম্পায় এবং প্রশ্রয়ে কি তিনি এই কথিত অপরাধগুলো করেছিলেন? এর উত্তর 'না'। প্রধানমন্ত্রী তার দায়িত্ব পালনকালে বেশ কয়েকজন সেনাপ্রধান পদে নিযুক্ত করেছেন। তাদের অনেকে সততা, ন্যায় নিষ্ঠার অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। একটি পদে ভালো বা খারাপ করা ব্যক্তির বিষয়, প্রধানমন্ত্রীর নয়।  

কোন দুর্নীতিবাজ প্রধানমন্ত্রীর লোক হতে পারেন না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দুর্নীতির ব্যাপারে সুস্পষ্ট অবস্থান রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী একাধিকবার বলেছেন, দুর্নীতিবাজ যেই হোক না কেন তিনি কোন রাজনৈতিক দলের না, তাকে প্রশ্রয় দেয়া হবে না। সরকার নানারকম সীমাবদ্ধতা এবং বাস্তবতার কারেণ দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান করতে পারছে না একথা সত্য। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোন দুর্নীতিবাজকে আশ্রয় প্রশ্রয় দিচ্ছেন এমন কথা কেউ যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করতে পারবেন না। দুর্নীতিবাজদের কাউকে কাউকে প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ট বলে প্রচার চালানোর এক নোংরা খেলা ইদানিং প্রকট হয়েছে। এটি পরিকল্পিত মিথ্যাচার। এর উদ্দেশ্যে একটি জনগণের আস্থার জায়গা নষ্ট করা। বিজিবি বা সেনাপ্রধান হিসেবে আজিজ আহমেদ কোন অপরাধ করলে, তার দায় একান্তই তার, অন্য কারো নয়। 

তবে একথা অস্বীকার করার কোন কারণ নেই আজিজ আহমেদের পরিবারের সদস্যরা বাংলাদেশে কঠিন সময়ে বড় ধরনের ঝুঁকি নিয়েছিলেন। বিশেষ করে তার তিন ভাইয়ের যে হত্যা মামলার অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে, সে হত্যা মামলার ইতিহাসটা সম্পূর্ণ অন্যরকম। আজকের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে হারিছ , আনিস ও জোসেফের কর্মকান্ড বিবেচনা করলে সেটি অপরাধ মনে হবে। কিন্তু ৭৫’ পরবর্তী বাংলাদেশের বাস্তবতায় যদি দেখা যায় তাহলে সেটি বীরত্ব, প্রতিরোধ যুদ্ধ। তারা সেই সময় ৭৫ এর ঘৃণ্য আত্ম স্বীকৃত খুনীদের দল ফ্রিডম পার্টিকে প্রতিরোধের জন্য জীবন বাজী রেখেছিলেন । জোসেফ, হারিছ, আনিছের মতো অনেকেই সেদিন ৭৫’ এর ঘাতকদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ঝুঁকি নিয়েছিলেন। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী ৭৫’এর পর প্রতিরোধ যুদ্ধের ডাক দিয়েছিলেন। তাকে এবং তার সহযোদ্ধাদের আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করবেন? রাষ্ট্রদ্রোহী না বীর দেশপ্রেমিক? আওরঙ্গ, লিয়াকত বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনীদের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন। তারা কি সন্ত্রাসী? তাদের কৌশল ভুল হতে পারে, তাদের প্রতিবাদের ভাষা ভুল হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো এটি ছিলো আদর্শিক লড়াই, অস্তিত্বের যুদ্ধ। আনিছ, হারিছ কিংবা জোসেফের মতো কিছু সাহসী তরুণের জন্য বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনীরা কিছুটা হলেও ভয় পেয়েছিল। তারা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের নির্বিচারে হত্যার সাহস পায়নি। আনিছ, হারিছ জোসেফরা সেই সময় যদি ফ্রিডম পার্টির বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে তুলে না নিতেন তাহলে আত্মস্বীকৃত ৭৫’র খুনীরা বাংলাদেশ দখল করে নিতো। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের একটি মানুষও থাকতো না। বাংলাদেশের রাজনীতিতে আরেকটি অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো। যে কথিত হত্যাকান্ড নিয়ে আজিজ আহমেদের তিন ভাইকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল এবং দন্ডিত করা হয়েছিল, সেই হত্যাকান্ডের পুরো বিচার প্রক্রিয়া হয়েছিল বিএনপির আমলে। যারা ফ্রিডম পার্টি এবং ৭৫’ এর খুনীদের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক। ঐ বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিয়েও প্রশ্ন আছে। যে দেশে কর্ণেল তাহেরের মতো বীর মুক্তিযোদ্ধাকে পঙ্গু অবস্থায় ফাঁসির কাষ্ঠে ঝোলানো হয় সেই দেশে ফ্রিডম পার্টির সশস্ত্র ক্যাডারকে প্রতিরোধ করার জন্য কাউকে হত্যা মামলার আসামি করাটা অস্বাভাবিক নয়। যিনি নিহত হয়েছিলেন তিনি ছিলেন ফ্রিডম পার্টির সন্ত্রাসী, বহু মানুষের হত্যা দায়ে অভিযুক্ত। হারিছ, আনিছ, আজিজরা সেই সময় যেটা করেছেন সেটি কতটা রাজনৈতিক, কতটা সন্ত্রাসী তার বিচারের ভার ইতিহাসের। কিন্তু সেই সময় ৭৫’ এর খুনীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোটা ছিলো অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। আর একারণেই ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা গ্রহণ করে মিথ্যা হয়রানি মূলক মামলাগুলো প্রত্যাহার করা এবং এসমস্ত মামলায় যারা দন্ডিত হয়েছেন তাদেরকে ছেড়ে দেয়া নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করেছে। আওয়ামী লীগ সাহসের সাথে এই দায়িত্ব পালন করেছে। ঘাতকদের বুলেট থেকে বাঁচার জন্য যদি কেউ সহিংস হয়ে উঠে তবে সেটি আত্মরক্ষা, অপরাধ নয়। কাজেই হারিছ, আনিস, জোসেফকে মুক্ত করার বিষয়টি কোন ভাবেই দুর্নীতির সাথে যুক্ত করা উচিত না। এটি একটি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত। এটি অস্বীকার করার কোন কারণ নেই তার ভাইদের ত্যাগ এবং ৭৫’ পরবর্তী সময়ে তাদের বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধের কারণেই আজিজ আহমেদ সরকারের দৃষ্টিতে এসেছেন এবং তার পদোন্নতি ঘটেছে। এমনকি একারণেই হয়তো তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পেয়েছেন। এটি শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো বিশ্বের বাস্তবতা। রাজনৈতিক বিশ্বস্ততা এবং আনুগত্য অনেক গুলো স্পর্শকাতর নিয়োগের ক্ষেত্রে বিবেচনা করা হয়।

দ্বিতীয় বিষয় হলো আজিজ আহমেদ যখন কোন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন সেই দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি কি করেছেন? তিনি কি দুর্নীতি করেছেন? তিনি কেনাকাটার ক্ষেত্রে তার ভাইদেরকে প্রাধান্য দিয়েছেন? তার ভাইদের পরিচয় পাল্টে দিয়ে তাদেরকে বিদেশে পাঠিয়েছেন? তার ভাইয়েরা অনৈতিকভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য করেছেন আজিজ আহমেদের নাম ভাঙ্গিয়ে? এসমস্ত প্রশ্নের উত্তরগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের মতো করে নির্মোহভাবে তদন্ত করেছে। আল জাজিরা অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই বিষয়টি উপস্থাপন করেছে। এই বিষয়ের সাথে সরকারের কোন সম্পৃক্ততা নেই। সরকার এই ব্যক্তির দুর্নীতির দায় কেন নিবে? এ ধরনের পদে থেকে দুর্নীতি করতে বা ক্ষমতার অপব্যবহার করতে অন্য কারো সহযোগিতা লাগেনা। ব্যক্তি আজিজ যখন একটি পদে গেছেন তখন যদি তিনি কোন দুর্নীতি করে থাকেন, তিনি কোন অন্যায় করে থাকেন তার সব দায়-দায়িত্ব একমাত্র তারই। তার দায়িত্ব রাষ্ট্র বা সরকারের নয়। শুধু আজিজ আহমেদ কেন এখন সাম্প্রতিক সময়ে অনেকের দুর্নীতির থলের বিড়াল বেড়িয়ে আসছে। সাবেক পুলিশ প্রধান বেনজীর আহমেদের দুর্নীতির বিশাল ফিরিস্তি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এই দুর্নীতির অভিযোগ হাইকোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছে। হাইকোর্ট বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। দুর্নীতি দমন কমিশন হাইকোর্টের নির্দেশে বেনজির আহমেদের দুর্নীতির অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখছে। ইতোমধ্যে আদালতের মাধ্যমে বেনজীর আহমেদ এবং তার পরিবারের সদস্যদের সব স্থাবর সম্পত্তি জব্দ করার আদেশ পেয়েছে দুদক। এর ফলে দুর্নীতির ব্যাপারে যে সরকার নির্মোহ এবং প্রভাবমুক্ত সেটি আরেকবার প্রমাণিত হয়েছে। বেনজীর আহমেদকে পুলিশ প্রধান করাটা ছিলো সরকারের সিদ্ধান্ত। কিন্তু পুলিশ প্রধান হয়ে তিনি যদি কোন অন্যায় করে থাকেন, যদি কোন দুর্নীতির সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন তবে সেটি তার অপরাধ। এর দায় সরকার নেবে কেন? 

প্রধানমন্ত্রী টানা ১৫ বছর এবং মোট ২০ বছর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ২০ বছরে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে শত শত নিয়োগ দিয়েছেন। দায়িত্ব পেয়ে কেউ ভালো কাজ করেছেন, কেউ খারাপ কাজ করেছেন। কেউ দুর্নীতি করেছে, কেউ সততার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। কেউ যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন, কেউ আবার ছিলেন অযোগ্য। যে যেই কাজ করেছেন তার পুরষ্কার বা তিরস্কার তিনিই পাবেন। আনিছ, হারিছ, জোসেফের দন্ড মওকুফ সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু তাদের নাম পাল্টানো, পরিচয় গোপন করে ভোটার কার্ড বা পাসপোর্ট গ্রহণ ব্যক্তিগত অনিয়ম, অপরাধ। বাংলাদেশে ডা. সাবরিনার মতো অনেকেই এধরনের অপকর্ম করেছে। কয়েক হাজার রোহিঙ্গা জালিয়াতি করে পাসপোর্ট করেছে, সংগ্রহ করেছে জাতীয় পরিচয় পত্র। এটি সরকারি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা। এসব অনিয়ম করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর লোক হওয়ার দরকার নেই। সত্যিকারের প্রধানমন্ত্রীর লোকরা এই সব অনিয়ম করে না। কোন নির্দিষ্ট দায়িত্ব পেয়ে যারা দুর্নীতি করছেন, যারা অনিয়ম করছেন এটি একেবারেই তাদের সিদ্ধান্ত, তাদের লোভ। এর জন্য প্রায়শ্চিত্ত ভোগ করতে হবে তাদেরকেই। আমরা জানি যে, বিভিন্ন জায়গায় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে এমন অনেক ব্যক্তি ছিলেন বা আছেন যারা দুর্নীতিবাজ হিসেবে পরিচিত। অন্তত সাধারণ মানুষ তাই মনে করে। তাদের বিরুদ্ধে সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না বলেও অভিযোগ আছে। এটি সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ব্যর্থতা। এক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশন সহ সংশ্লিষ্টদের সক্রিয় হতে হবে। উদ্যোগী হতে হবে। আজিজ আহমেদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো উত্থাপিত হয়েছে সে অভিযোগগুলো দুর্নীতি দমন কমিশনকে নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখতে হবে। বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন যাতে নিরপেক্ষ তদন্ত করে তা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের আশে পাশে যেসমস্ত লোক ছিলেন বা আছেন এবং তাদের বিরুদ্ধে যেসমস্ত দুর্নীতির অভিযোগ আকাশে বাতাসে ঘুরে বেড়ায় সেই অভিযোগগুলোর নির্মোহ তদন্ত দরকার। কারণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহিষ্ণুতা’ প্রধানমন্ত্রীর অঙ্গীকার। প্রধানমন্ত্রী যে টানা ক্ষমতায় আছেন এবং তিনি যে জনপ্রিয়তার শীর্ষে তার অন্যতম কারণ তিনি দুর্নীতিবাজদের প্রশ্রয় দেন না। তিনি নিজে দুর্নীতির সঙ্গে জড়ান না। তার কট্টর সমালোচকরাও তাকে দুর্নীতিবাজ বলতে পারবে না। আর এই বাস্তবতায় যারা বিভিন্ন দায়িত্ব পেয়ে বা গুরুত্বপূর্ণ পদে বসেই দুর্নীতি করেন তারা প্রধানমন্ত্রীর লোক হতে পারে না, তারা বিশ্বাসঘাতক। প্রধানমন্ত্রীর লোকরা দুর্নীতি করে এই ধরনের অভিযোগ সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এবং অগ্রহণযোগ্য। প্রধানমন্ত্রীর লোক তারাই যারা দায়িত্ববান, সৎ যারা বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়তে চান। প্রধানমন্ত্রীর লোক তারাই যারা তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে, সততার সাথে পালন করেন। প্রধানমন্ত্রীর লোক তারাই যারা বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার আদর্শ অনুসরণ করে। যারা দুর্নীতিবাজ, চাটুকার, লোভী, অর্থ পাচার করে, লুটেরা তারা কখনোই প্রধানমন্ত্রীর লোক না। 

সৈয়দ বোরহান কবীর, নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত
ই-মেইল: poriprekkhit@yahoo.com


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

ওবায়দুল কাদেরের হ্যাটট্রিক

প্রকাশ: ০৮:০০ পিএম, ২০ মে, ২০২৪


Thumbnail

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। ইতোমধ্যে তিনি একটি হ্যাটট্রিক করেছেন। টানা তিন তিনবার আওয়ামী লীগের মতো একটি ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন রাজনৈতিক দলের সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই একমাত্র যিনি আওয়ামী লীগের তিনবার বা তার বেশি সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন। এখন ওবায়দুল কাদেরও আওয়ামী লীগের টানা তিনবারের সাধারণ সম্পাদক। এবার তিনি আরেক রকম হ্যাটট্রিক করলেন। 

ওবায়দুল কাদের গত এক মাসে তার তিনটি নীতি নির্ধারণী বক্তব্য ধরে রাখতে পারলেন না। তার এই বক্তব্যগুলোর উল্টো ফল হল। এবং হিতে বিপরীত ফলাফলের দিক থেকে তার বক্তব্যগুলো হ্যাটট্রিক করেছে। ওবায়দুল কাদের উপজেলা নির্বাচনের আগে সংবাদ সম্মেলন করে বলেছিলেন, আওয়ামী লীগের কোনো আত্মীয় স্বজন উপজেলা নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না। উপজেলা নির্বাচনে যদি কেউ প্রার্থী হয় তাহলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ রকম বক্তব্য তিনি তিনবার দিয়েছিলেন। কিন্তু তার বক্তব্যে সাড়া দিয়ে কেউই উপজেলা নির্বাচনে তাদের আত্মীয়স্বজনকে প্রার্থিতা থেকে সরিয়ে দেয়নি। একমাত্র প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক তার শ্যালককে উপজেলা নির্বাচন থেকে তার প্রার্থীতা প্রত্যাহারের সমর্থ হয়েছিলেন। কিন্তু নোয়াখালীর একরামুল করিম চৌধুরী, ড. রাজ্জাক কিংবা শাহজাহান খান কেউই তাদের পুত্রদেরকে নির্বাচন থেকে সরিয়ে আনেননি। 

এরপর আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আত্মীয় স্বজনদের ব্যাপারে তার ভিন্ন রকম অবস্থা ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, পরিবার বলতে শুধুমাত্র স্ত্রী, পুত্র এবং স্বামী বোঝাবে। তিনি এটাও বলেন যে, যারা দীর্ঘদিন রাজনীতি করেছে, আগে থেকে উপজেলা চেয়ারম্যান আছে, তারা কেন প্রার্থিতা প্রত্যাহার করবে? এর ফলে ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্য আর ধোপে টেকেনি। পরবর্তী পর্যায়ে কেউই ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্য আমলে নেননি। ওবায়দুল কাদেরও আত্মীয় স্বজনদের ব্যাপারে যে রুদ্রমূর্তি অবস্থানে ছিলেন সেখান থেকে সরে আসেন। 

দ্বিতীয় হিতে বিপরীত ঘটনা ঘটে মেট্রোরেলে ভ্যাট না দেওয়ার ঘটনা। মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ যখন এনবিআর-এর কাছে আবারও ভ্যাট প্রত্যাহারের জন্য সুপারিশ করেছিল, তখন এনবিআর তা নাকচ করে দেয় এবং ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপের জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কিন্তু এর বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন ওবায়দুল কাদের। তিনি সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বিষয়টি নিয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলবেন এবং এই ভ্যাট আরোপের সিদ্ধান্তকে তিনি অযৌক্তিক বলে মনে করেন। এর পরপরই আসন্ন অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নে এনবিআর মেট্রোরেলের ওপর ১৫ শতাংশ প্রস্তাবের সুপারিশ করেছে। 

গতকাল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এ ব্যাপারে আবারও একই রকম বক্তব্য রেখেছেন। তিনি ভ্যাট আরোপের বিরোধিতা করে এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করবেন বলে জানিয়েছেন। কিন্তু ওবায়দুল কাদের এক মাস আগে যে বক্তব্য দিয়েছিলেন সেই বক্তব্য এনবিআর আমলে নেয়নি। 

সর্বশেষ ঘটনা ঘটল ঢাকায় অটোরিকশা নিয়ে। ওবায়দুল কাদের আকস্মিকভাবে ঘোষণা করেছিলেন যে, ঢাকায় অটোরিকশা চলবে না। গতকাল থেকে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী অটোরিকশা ঢাকায় চলাচল বন্ধ হয়েছিল। এ নিয়ে অটোরিকশা চালকরা রাজপথে নেমেছিল। গতকাল বিভিন্ন স্থানে তারা বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। কোথাও কোথাও সহিংসতার ঘটনাও ঘটে। আজ মন্ত্রিপরিষদ সভায় অনির্ধারিত ভাবে বিষয়টি আলোচিত হয়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী সরাসরি এর বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেন। তিনি বলেন যে, বিকল্প ব্যবস্থা না করে কেন অটোরিকশা প্রত্যাহার করা হবে। দরিদ্র মানুষেরা তারা কী করে খাবে। এরপর তিনি সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারে নির্দেশনা দেন। মন্ত্রিপরিষদের বৈঠক থেকে বেরিয়ে ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদেরকে জানান, ঢাকায় অটোরিকশা থাকবে, এটি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা। তার কথার হিতে বিপরীতের ঘটনা এটি ঘটল তৃতীয়বার।

ওবায়দুল কাদের   আওয়ামী লীগ   সাধারণ সম্পাদক  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

‘টেকা দেন দুবাই যামু’

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ২০ মে, ২০২৪


Thumbnail

আমাদের ছোটবেলার ঈদে অন্যতম আনন্দের উৎস ছিল আমজাদ হোসেনের নাটক। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম আমজাদ হোসেনের ঈদের নাটক দেখার জন্য। এই নাটকে জব্বর আলীর ভূমিকায় অভিনয় করতেন আমজাদ হোসেন। একেক ঈদে জব্বর আলীর দুর্নীতির একেকটি চিত্র উঠে আসত হাস্যরসের মাধ্যমে। কিন্তু প্রতিটি নাটকে একটি বক্তব্য থাকত; যে বক্তব্যটি সমাজের জন্য, রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং শিক্ষণীয়। আমজাদ হোসেনের ঈদের নাটকগুলোর মধ্যে একটি ছিল আদম ব্যবসা নিয়ে। আদম পাচার এবং আদম ব্যবসায়ের আড়ালে যেভাবে মানুষকে হয়রানি এবং প্রতারণা করা হতো, তার চিত্র ফুটে উঠেছিল। সে নাটকে ফরিদ আলীর একটি উক্তি বহুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। মানুষের মুখে মুখে ছিল ওই সংলাপটি। সংলাপটিতে ফরিদ আলী বলছিলেন, ‘টেকা দেন দুবাই যামু।’ বৃহস্পতিবার দেশের প্রায় সব গণমাধ্যমে দুবাইয়ে ধনকুবেরদের সম্পদের পাহাড় প্রতিবেদনটি দেখে আমজাদ হোসেনের ‘টেকা দেন দুবাই যামু’ কথাটি স্মৃতির পর্দায় ভেসে উঠল। তখন অর্থ উপার্জনের জন্য সর্বস্ব বিক্রি করে মানুষ দুবাই যেতে চাইত। এতে দেশের উপকার হতো। এখন অর্থ পাচারের জন্য দেশকে কেউ কেউ দুবাইয়ে ঠিকানা করছে। আগে দুবাই যেতে জমি বিক্রি করে নিঃস্ব হতো একটি পরিবার। এখনকার ফরিদ আলীরা টাকা নিয়ে ব্যাংক খালি করছে। নিঃস্ব হচ্ছে দেশ। আগে দুবাই ছিল টাকা আনার জায়গা। এখন টাকা রাখার ‘নিরাপদ’ স্থান। এখন শুধু জীবিকার সন্ধানে এ দেশের মানুষ দুবাই যান না। কষ্ট করে শুধু রেমিট্যান্স পাঠান না। লুটেরা, অর্থ পাচারকারীদের ঠিকানা ইদানীং দুবাই। দুবাইয়ে এখন বিনিয়োগ করেছেন বিশ্বের ধনকুবেররা। এই চিত্রটি ফুটে উঠেছে ‘দুবাই আনলকড’ নামে বৈশ্বিক অনুসন্ধানে।

মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটিতে এখন আকাশচুম্বী ঐশ্বর্য, আকাশচুম্বী বিলাসিতা এবং এক রকম প্রাচুর্যে ভরপুর জীবনযাপন। একসময় এটি ছিল ধু-ধু মরুভূমি। সেই অবস্থা থেকে এটি এখন বিশ্বের আধুনিকতম শহর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের আরেকটি বড় সুবিধা হলো, এখানে অবৈধ অর্থের উৎস জানতে চাওয়া হয় না। এ কারণেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের হাজার হাজার মানুষ বিপুল পরিমাণ সম্পদ দুবাইয়ে রাখতে চাইছেন। গোপন সম্পদের আড়ত হয়েছে দুবাই। ব্যাংকের মাধ্যমে কিংবা ব্যক্তিগত বিমানে ভরে অর্থ নিয়ে যাওয়া যায় সংযুক্ত আরব আমিরাতে। এই সুযোগে বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব থেকে শুরু করে বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকা ব্যক্তি, অর্থ পাচারকারী এবং অপরাধীরা সংযুক্ত আরব আমিরাতে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। আর এই অধিকাংশ সম্পদই অবৈধ। জ্ঞাত আয়ের উৎসবহির্ভূত গোপন সম্পদ। ‘দুবাই আনলকড’ নামে এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি ৫৮টি দেশের ৭৪টি সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা ছয় মাস ধরে অনুসন্ধান চালিয়ে প্রস্তুত করেছেন। অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক, ‘অর্গানাইজড ক্রাইম অ্যান্ড করাপশন, রিপোর্টিং,’ (ওসিসিআরপি) ও নরওয়ে সংবাদমাধ্যম ই-২৪-এর নেতৃত্বে অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।

এই প্রতিবেদনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিশ্বব্যাপী লুণ্ঠনের একটি চিত্র ফুটে উঠেছে এ প্রতিবেদনে। বিভিন্ন দেশ থেকে ধনকুবেররা কীভাবে গোপনে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন, তার চিত্র ফুটে উঠেছে ‘দুবাই আনলকড’-এ। দুবাইয়ে সরকারি ভূমি দপ্তরসহ অন্যান্য রিয়েল এস্টেট কোম্পানির ফাঁস হওয়া তথ্য-উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দুবাইয়ে বিদেশিদের মালিকানায় থাকা সম্পদের পরিমাণ ১৬০ বিলিয়ন ডলারের বেশি।

প্রতিবেদনটি বিশ্লেষণ করে দেখানো হয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতে বিদেশিদের সম্পদের মালিকানার তালিকায় শীর্ষে আছে ভারতীয়রা। ২৯ হাজার ৭০০ ভারতীয় নাগরিকের ৩৫ হাজার সম্পদের মালিকানা রয়েছে দুবাইয়ে। ভারতীয়দের এসব সম্পত্তির মোট মূল্য ১৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি। ভারতের পর এই তালিকায় রয়েছে পাকিস্তান। দুবাইয়ে ১৭ হাজার পাকিস্তানি নাগরিকের ২৩ হাজার সম্পদের মালিকানা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাকিস্তানের ইংরেজি ভাষার ‘দৈনিক ডন’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুবাইয়ে ১৭ হাজার পাকিস্তানি সম্পদের মালিক। তবে তথ্য-উপাত্ত ও সূত্র ব্যবহার করে এই সংখ্যা ২২ হাজারের মতো বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট, অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তারা ছাড়াও শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদ, ব্যাংকার এবং আমলারা সংযুক্ত আরব আমিরাতের অভিজাত এলাকায় বিপুল সম্পদের মালিক। পাকিস্তান অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া প্রায় একটি রাষ্ট্র। ভয়াবহ অর্থকষ্টে দেশটির জনগণ দিশেহারা। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণহীন। রিজার্ভ শূন্য। ঋণ নিয়ে কোনোরকমে দেশটি চলছে। বিভিন্ন ঋণের দেনা পরিশোধ করতে গিয়ে যার কাছে পারছে তার কাছেই হাত পাতছে দেশটি। পাকিস্তানের শোচনীয় অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের প্রধান কারণ যে দুর্নীতি এবং অর্থ পাচার, তা সবারই জানা। এই প্রতিবেদন তা আরেকবার প্রমাণ করল। জনগণের সম্পদ লুণ্ঠন করে যারা বিদেশে পাঠিয়েছে, তারাই পাকিস্তানের মসনদে।

বাংলাদেশিদেরও সম্পদ কম নয় দুবাইয়ে। ওসিসিআরপির তথ্য বলছে, এই শহরে গোপন সম্পদ গড়েছেন অন্তত ৩৯৪ জন বাংলাদেশি। এসব বাংলাদেশির মালিকানায় রয়েছে ৬৪১টি সম্পদ। বাংলাদেশিদের মালিকানায় থাকা এসব সম্পদের মোট মূল্য ২২ কোটি ৫৩ লাখ ডলারেরও বেশি, বাংলাদেশি টাকায় যার পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা। আমার ধারণা, দুবাইয়ে এর চেয়েও দ্বিগুণ পরিমাণ অর্থ বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে। অনেকে বেনামে, কেউ কেউ কানাডা, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র থেকে অর্থ সরিয়ে এখন দুবাইয়ে রাখছেন। শুধু দুবাই কেন? ইউরোপীয় ইউনিয়নের ট্যাক্স অবজারভেটরি গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ‘অ্যাটলাস অব অফশোর ওয়ার্ল্ড’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশিদের প্রায় ৫ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলারের অফশোর সম্পদ আছে। এটি বাংলাদেশের মোট জিডিপির ১ দশমিক ৩ শতাংশ। এর মধ্যে ৫ বিলিয়ন ডলার এশিয়ার কর স্বর্গ দেশগুলোতে, বাকিটা ইউরোপ, আমেরিকায়। ট্যাক্স জাস্টিস নেটওয়ার্কের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা পাচার হচ্ছে কর স্বর্গ বলে পরিণত দ্বীপ রাষ্ট্রগুলোতে। সুইস ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী এখানকার ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের গচ্ছিত অর্থ ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি। তবে বাংলাদেশিদের সম্পদ ও মালিকানার তথ্য সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি এসব কোনো প্রতিবেদনে। তাদের পরিচয় গোপন করা হলেও আমরা তাদের চিনি। কারা ব্যাংকের টাকা লুট করে দুবাইয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করছে, আমাদের অজানা নয়। কোন দুর্নীতিবাজরা বিদেশে দুর্নীতির টাকা গচ্ছিত রেখেছে, সে চর্চা এখন সর্বত্রই হয়। তাদের কারণেই যে অর্থনীতির সংকট, তা কে না জানে? বাংলাদেশের অর্থনীতির অবস্থা এখন আশঙ্কাজনক। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১৩ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে গেছে। অথচ পাচারকৃত অর্থ যোগ করলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থাকত ৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এক ধাপে ডলারের মূল্য ৭ টাকা বাড়িয়ে ১১৭ টাকা করা হয়েছে। ডলার নিয়ে এখন হাহাকার। ডলারের অভাবে আমদানি করা যাচ্ছে না অনেক গুরুত্বপূর্ণ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য। রপ্তানিতেও শুভঙ্করের ফাঁকি। রপ্তানি আয়ের টাকা কাগজে আছে, ব্যাংকে নেই। ব্যাংকগুলোর অবস্থা খুবই নাজুক। দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূত করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সে উদ্যোগও এখন হালে পানি পাচ্ছে না। ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, আর্থিক সংকটে ধুঁকছে ব্যাংকগুলো। ব্যাংকে সুদসীমা উঠিয়ে দেওয়ার পর এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। ব্যবসায়ীরা আতঙ্কে। ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের নেতারা বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। ভুল নীতি এবং ভুল পরিকল্পনার কারণে মুদ্রাস্ফীতি এখন ১০ শতাংশের আশপাশে ঘোরাফেরা করছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে মানুষের জীবনযাত্রায় নাভিশ্বাস উঠেছে। এসব কিছুর প্রধান কারণ হিসেবে আমি মনে করি, ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণ, অর্থ পাচার এবং দুর্নীতি। এই তিনটি বিষয়ে যদি সরকার পদক্ষেপ গ্রহণ না করে, তা হলে সামনের দিনগুলোতে অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে তোলা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ব্যাপার হয়ে যাবে। যেভাবে পাকিস্তানের অর্থনীতি ডুবেছে, সেভাবে কি বাংলাদেশের অর্থনীতির বারোটা বাজানোর ষড়যন্ত্র চলছে? এখন পর্যন্ত দুর্নীতিবাজ, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি এবং অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না। বিপুল বিস্ময়কর উন্নয়নকে ম্লান করে দিয়েছে মুষ্টিমেয় কিছু লুটেরা দুর্বৃত্ত।

গত তিন-চার বছরে অর্থ পাচারের নতুন ঠিকানা হয়েছে দুবাই। আগে যারা বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার করেছেন, তাদের মূল ঠিকানা ছিল যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড। অনেকে এসব দেশের নাগরিকত্ব নিয়েছেন। বাংলাদেশ থেকে লুণ্ঠিত সম্পদ নিয়ে সেই দেশে শীর্ষ ধনীদের তালিকায় নাম লিখিয়েছেন। তারা এখন ধরাছোঁয়ার বাইরে। এখন দুবাইয়ের প্রতি অর্থ পাচারকারীদের আগ্রহ বেড়েছে। এর কারণ হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশ অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে বেশ কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। এ কারণেই সেসব দেশে নতুন করে অর্থ পাচার কঠিন হয়ে পড়ছে। আমরা সুইস ব্যাংকে যেসব অর্থ পাচারকারী অর্থ পাচার করেছে তাদের তথ্য জানি না। এ তথ্যগুলো সংগ্রহের জন্য বাংলাদেশ সরকার কী ধরনের অবস্থান গ্রহণ করেছে, সে সম্পর্কেও আমরা অন্ধকারে রয়েছি। আমরা জানি না যে, ‘ট্যাক্স হেভেন’ বলে পরিচিত দ্বীপরাষ্ট্রগুলোতে যারা কোম্পানি খুলে অর্থ পাচার করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ওসিসিআরপি এ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছিল। কিন্তু সেই তথ্যের তদন্ত হয়নি। আমরা এটাও জানি না যে, বাংলাদেশের যেসব ব্যবসায়ী রপ্তানির নামে ‘ওভার ইনভয়েসিং’-এর মধ্যে বিদেশে অর্থ পাচার করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নিয়েছে। আমরা জানি না কানাডার বেগমপাড়ায় যাদের বাড়িঘর আছে তাদের তালিকা কার কাছে। এই তালিকা প্রকাশের জন্য কয়েক বছর ধরেই হৈচৈ হয়েছে, আলোচনা হয়েছে; কিন্তু তালিকা আলোর মুখ দেখেনি। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়ায় যারা সম্পদের পাহাড় গড়েছেন, তারা কারা?

অর্থ পাচার রোধে সরকারের গ্রহণ করা ব্যবস্থাগুলো কতটুকু বাস্তবে রূপ নিয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সরকার অর্থ পাচার রোধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পেরেছে কি না, তা নিয়েও অনেকের মধ্যে সংশয় ও সন্দেহ রয়েছে। গত বছর অর্থনৈতিক সংকটের মুখে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সংকটের কারণে অর্থ পাচারকারীদের থেকে অর্থ ফেরত নেওয়ার জন্য কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল সরকার। বিদেশ থেকে অর্থ নিয়ে এলে কোনো প্রশ্ন করা হবে না—এমন দায়মুক্তিও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তার পরও অর্থ পাচারকারীদের শুভবুদ্ধির উদয় হয়নি। একটি ডলারও পাচারকারীরা দেশে ফিরিয়ে আনেনি। কানাডা, যুক্তরাজ্য, আমেরিকার কথা বাদই দিলাম; মালয়েশিয়ায় ‘সেকেন্ড হোম’ করা বাঙালির সংখ্যা হাজারের ওপর। সিঙ্গাপুরে অলিগলিতে বাঙালিদের বিভিন্ন সম্পদ পাওয়া যায়। অর্থ পাচার যদি বন্ধ না হয়, তা হলে অর্থনৈতিক সংকট কাটানো যাবে না। দুর্নীতি যদি বন্ধ না করা যায়, তা হলে অর্থনীতি আরও ভয়াবহ রূপ নেবে। আমরা যদি ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে না পারি, তা হলে অর্থনীতির ধ্বংস ঠেকানো অসম্ভব। দুর্নীতি, অর্থ পাচার এবং লুণ্ঠনে পাকিস্তান বাংলাদেশের চেয়ে অনেক এগিয়ে।

পাকিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতায় যারা ছিলেন, তারা যেভাবে দুর্নীতি করে দেশকে ফোকলা বানিয়েছেন, বাংলাদেশ তার থেকে অনেক পেছনে। কিন্তু বাংলাদেশে যেভাবে অর্থ পাচার হচ্ছে, যেভাবে দুর্নীতি হচ্ছে, তা যদি অব্যাহত থাকে, তা হলে বাংলাদেশ পাকিস্তান হতে বাধ্য। আমরা কি বাংলাদেশকে পাকিস্তান বানাতে চাই? যারা বাংলাদেশ চায়নি তারাই অর্থনীতির বারোটা বাজাচ্ছে। আমজাদ হোসেনের ফরিদ আলী ‘টেকা’ নিয়ে বিদেশ যেতে চেয়েছিল। নিজের ভাগ্য গড়তে চেয়েছিল। সেখান থেকে অর্থ উপার্জন করে দেশে পাঠানোর স্বপ্ন ছিল তার। কিন্তু এখনকার নব্য ফরিদ আলীরা ব্যাংক খালি করে, জনগণের সম্পদ লুট করে দুবাই যাচ্ছে। এই ফরিদ আলীদের রুখতে হবে। তাদের হাত থেকে বাঁচাতে হবে অর্থনীতি, বাংলাদেশকে।


লেখক: নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত

ইমেইল: poriprekkhit@yahoo.com



মন্তব্য করুন


বিজ্ঞাপন