এডিটর’স মাইন্ড

একমাত্র টার্গেট শেখ হাসিনা

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ২৪ মে, ২০২৩


Thumbnail

শেখ হাসিনাই এখন রাষ্ট্রদ্রোহী, ষড়যন্ত্রকারী, গণতন্ত্র বিনাশী শক্তির একমাত্র বাধা।

শেখ হাসিনাকে হটাতে পারলেই নির্বাসনে পাঠানো যাবে গণতন্ত্রকে।

শেখ হাসিনাকে সরিয়ে দিতে পারলেই জঙ্গিবাদের উত্থান হবে বাংলাদেশে। শেখ হাসিনাকে নিঃশেষ করলেই বাংলাদেশ পাকিস্তান কিংবা আফগানিস্তান হবে। শেখ হাসিনাকে মাইনাস করলে এদেশের উন্নয়নের চাকা থেমে যাবে।

শেখ হাসিনা না থাকলেই বাংলাদেশের অস্তিত্ব বিপন্ন হবে।

আর তাই বিরোধী দলের আন্দোলন, আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার সবকিছুর একমাত্র টার্গেট হচ্ছেন শেখ হাসিনা। তাঁকেই আক্রমণের একমাত্র লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। গত ১৪ বছর একাই লড়ছেন তিনি স্রোতের বিপরীতে। নিঃসঙ্গ একাকী একযোদ্ধা আগলে রেখেছেন বাংলাদেশকে, এদেশের জনগণকে। সরকারের অনেকে প্রকাশ্যে বা গোপনে ষড়যন্ত্রকারীদের সঙ্গে আপস রফার চেষ্টা করছেন। কিন্তু শেখ হাসিনা লক্ষ্যে অবিচল নির্ভীক। তিনি তাঁর বিশ্বাস চিন্তায় অটল রয়েছেন। আর এ কারণেই তাঁকে একমাত্র টার্গেট করা হয়েছে। নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই কুৎসিত এবং হিংসাত্মক আক্রমণের শিকার হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

রাজশাহীতে বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার হুমকি দিয়েছেন বিএনপির আহ্বায়ক আবু সায়ীদ চাঁদ। ইতোমধ্যে তার বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে। কিন্তু এই হত্যার হুমকি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা বিভিন্ন সময়ে তাকে হত্যার চেষ্টা করেছে। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা ছিল শেখ হাসিনাকে হত্যার সবচেয়ে বীভৎস ষড়যন্ত্রের প্রকাশ্য রূপ। কিন্তু এ ছাড়াও তাকে দুই ডজন বার হত্যার চেষ্টা হয়েছে। কাজেই এবারের ঘটনা সেই ঘৃণ্য অভিপ্রায়ের আরেকটি প্রকাশ। এটি স্রেফ কথার কথা নয়। মেঠো বক্তৃতা নয়। আন্দোলনের মূল লক্ষ্য বিএনপির ওই নেতা ফাঁস করে দিয়েছেন। বাংলাদেশের প্রতিপক্ষরা, মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধ শক্তি, গণতন্ত্র বিরোধী অপশক্তি সবাই এখন একটি স্থির বিশ্বাসে এসে উপনীত হয়েছে যে, শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারলে বা সরিয়ে দিতে পারলেই আওয়ামী লীগকে সরকার থেকে হটানো যাবে। শেখ হাসিনা থাকলে কোনো ষড়যন্ত্রই কাজে আসবে না। আর এ কারণেই তিনিই টার্গেট।

বিএনপি নেতা চাঁদের এই ঘোষণা দেওয়ার দুদিন আগে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঘোষণা করেছিলেন যে, তাদের দাবি ১০ দফা বা ২০ দফা নয়। দাবি একটাই। সেটি হলো শেখ হাসিনার পদত্যাগ। শেখ হাসিনার পদত্যাগ ছাড়া তারা ঘরে ফিরে যাবেন না এমন ঘোষণাও তিনি দেন। এখন মির্জা ফখরুলের বক্তব্যের সঙ্গে চাঁদের বক্তব্যের যোগসূত্র পাওয়া যাচ্ছে।

বিএনপির পক্ষ থেকে কূটনীতিকদের সঙ্গে দফায় দফায় যোগাযোগ করা হচ্ছে এবং সেখানে কূটনীতিকদের বলা হচ্ছে যে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা থাকতে পারবেন না। তাদের একমাত্র আক্রোশ শেখ হাসিনার প্রতি। শেখ হাসিনাতেই তাদের যত আপত্তি। শুধু বিএনপি নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কিছু দেশের কাছে শেখ হাসিনা এখন প্রধান টার্গেটে পরিণত হয়েছেন। বাংলাদেশ গত ১৪ বছরে উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ উন্নয়নের ক্ষেত্রে সারা বিশ্বের জন্য বিস্ময়। এ কারণে বাংলাদেশ পরনির্ভরতা থেকে স্বনির্ভরতার পথে যাত্রা করেছে। মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। এটিকে পছন্দ করছে না প্রভাবশালী কিছু দেশ। তারা চায় বাংলাদেশ সব সময় নতজানু হয়ে থাকুক। তাদের আদেশ নির্দেশ অনুগত ভৃত্যের মতো অক্ষরে অক্ষরে পালন করুক। তাদের তুষ্ট করতে দেশের স্বার্থ বিলিয়ে দিক। কিন্তু শেখ হাসিনা নতজানু হন না। তিনি বঙ্গবন্ধুর কন্যা। এ কারণেই শেখ হাসিনাকে তারা টার্গেট করেছে। তাই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অভিযোগের ডালি নিয়ে বসেছে পশ্চিমারা। শেখ হাসিনা বিরোধী অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখছে আমাদের সুশীল সমাজ। বিএনপি জামায়াত শেখ হাসিনাকে শারীরিকভাবে হত্যা করতে চায়। আর সুশীলরা তার রাজনৈতিক মৃত্যুর জন্য অহর্নিশ কাজ করে যাচ্ছে। এ কারণেই তারা শেখ হাসিনার নীতি ও কৌশলের সমালোচক। সুশীল সমাজের একটি বড় অংশের সঙ্গে আওয়ামী লীগের অনেক হোমরাচোমরা নেতার সখ্য রয়েছে। আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই তাদের সঙ্গে প্রকাশ্যে এবং গোপনে বৈঠক করেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাদের একসঙ্গে দেখাও যায়। সেসব আড্ডায় শেখ হাসিনার সমালোচনা মুখর থাকেন দুই পক্ষ। শেখ হাসিনা কী কী ভুল করছেন তা নিয়ে তাদের আধো আর্তনাদ, আধো উল্লাস বোঝা যায় সহজেই। এরা সবাই একটি ব্যাপারে একমত। তারা শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করতে চান। এক-এগারোর কুশীলবরাই বাংলাদেশের সুশীল সমাজের একটি বড় প্রতিনিধিত্বশীল অংশ। এই কুশীলবরা মাইনাস ফর্মুলা বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শেখ হাসিনার রাজনৈতিক দৃঢ়তায় সেটি শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। কিন্তু এখনো তারা সেই চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। এ কারণেই এখনো শেখ হাসিনাকে মাইনাস করার নতুন করে ষড়যন্ত্রের চেষ্টা চলছে। কর্তৃত্ববাদী সরকারের তকমা লাগিয়ে তার অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টায় ব্যস্ত সুশীলরা।

শেখ হাসিনা যে এখন প্রধান টার্গেট সেটি লক্ষ্য করা যায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপপ্রচার এবং কুৎসিত মিথ্যাচারগুলোতে। তারেক জিয়ার পৃষ্ঠপোষকতায় সাইবার সন্ত্রাসীরা কিছুদিন আগেও সরকারের বিভিন্ন ব্যক্তি, ব্যবসায়ী, শিল্পপতি আক্রমণ করত। কিন্তু এখন টার্গেটের এর মূল কেন্দ্র হচ্ছেন শেখ হাসিনা। ফেসবুক, ইউটিউবে দিনরাত অবিরত শেখ হাসিনাকে অকথ্য নোংরা ভাষায় গালাগাল করা হচ্ছে। জাসদ থেকে আমদানিকৃত এক গণবাহিনীর পরিত্যক্ত বিপ্লবীর হাতে দেওয়া হয়েছে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। তার অধীনে বিটিআরসি। এসব নর্দমার চেয়ে নোংরা শব্দ দূষণের বিরুদ্ধে তিনি নীরব। মন্ত্রী বলছেন, ফেসবুক, ইউটিউবের কনটেন্টের ব্যাপারে আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এটি বলেই দায়িত্ব এড়িয়ে নিজস্ব আয় রোজগারে তিনি ধ্যানের মতো মনোনিবেশ করেছেন। কী আশ্চর্য! তাহলে ভারত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড অসত্য, হিংসাত্মক কনটেন্ট আটকায় কীভাবে? ৫ কোটি ব্যবহারকারীর এই দেশে কেন এখন পর্যন্ত ফেসবুক অফিস করেনি? এই প্রশ্নের উত্তরে একদা বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রী লা জবাব। ফলে অপ্রতিরোধ্য গতিতে সাইবার সন্ত্রাসীরা মিথ্যাচারের বমি করছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। শেখ হাসিনা এবং তার পরিবারকে লক্ষ্য করেই চলছে কুৎসিত অপপ্রচার। কারণ শেখ হাসিনা তার আদর্শের সঙ্গে আপস করেন না। সাইবার সন্ত্রাসী, যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে লড়াই করে তিনি টিকে আছেন। এভাবেই শেখ হাসিনা নির্বাচনের আগে বিরোধী পক্ষের প্রধান টার্গেটে পরিণত হয়েছেন। সব পক্ষ একজোট হয়েছে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে। তাকে একাত্তরের পরাজিত শক্তি, ’৭৫-এর খুনিচক্র বারবার শারীরিকভাবে হত্যা করতে চেয়েছে, তেমনি রাজনৈতিকভাবে হত্যারও চেষ্টা চলছে। বার বার মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসে কুৎসিত মিথ্যাচারের জবাব দিয়ে জনগণের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে তিনি এগিয়ে যাচ্ছেন। প্রজ্ঞা, মেধা এবং দূরদর্শিতায় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদেরও হতাশ করেছেন বারবার। এবারও জিতবেন শেখ হাসিনাই। তাকে জিততেই হবে কারণ, শেখ হাসিনা হারলে হারবে বাংলাদেশ।

সৈয়দ বোরহান কবীর, নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত
poriprekkhit@yahoo.com



মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

মতির রত্নভান্ডারে ছাগলের অনুপ্রবেশ

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ২৪ জুন, ২০২৪


Thumbnail

দরিদ্র বাবা অর্থাভাবে সন্তানকে বিক্রি করে দিয়েছেন, অভাবের তাড়নায় সন্তানকে হাসপাতালে রেখে পালিয়েছেন মা—এমন খবর মাঝেমধ্যে আমরা গণমাধ্যমে পাই। এসব খবরে আমরা উদ্বিগ্ন হই, আতঙ্কিত হই। অনেকেই নানা টানাপোড়েনের কারণে সন্তানকে ফেলে দেন ডাস্টবিনে অথবা রেলস্টেশনে। অজ্ঞাতপরিচয় শিশুকে কুড়িয়ে পাওয়ার খবর আমাদের ব্যথিত করে। দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিতরা তাদের প্রাণের ধন বিক্রি করে দেন বা অস্বীকার করেন। এটি একটি নির্মম বাস্তবতা। এটি হওয়া উচিত নয়। এ ধরনের দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতি কাম্য নয়। কিন্তু অবৈধভাবে ফুলেফেঁপে ওঠা ধনাঢ্য ব্যক্তিরাও যে তাদের অবৈধ সম্পদ রক্ষা করার জন্য সন্তানকে অস্বীকার করেন—এ গল্প আমাদের অনেকেরই অজানা ছিল। মানুষ মাঝেমধ্যে অর্থলোভে পৈশাচিক, বীভৎস হয়ে যায়। তারা এত মানবিক বোধশূন্যহীন হয় যে, নিজের সন্তানকেই অস্বীকার করে। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা এ রকম একটি ঘটনা প্রত্যক্ষ করলাম।

ঘটনার সূত্রপাত একটি ছাগলকে ঘিরে। ‘ছাগলকাণ্ডে’ এক দুর্নীতিবাজের মুখোশ উন্মোচন হয়ে গেল। ঈদুল আজহার আগে ১৫ লাখ টাকায় একটি ছাগল কিনতে গিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হন মুসফিকুর রহমান ইফাত। শুরু হয় খোঁজ, কার ছেলে সে? শেষ পর্যন্ত দেখা যায় তিনি এনবিআর কর্মকর্তা মতিউর রহমানের ছেলে। এ নিয়ে যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা রকম চর্চা হচ্ছে, ঠিক সে সময় বোমা ফাটান এনবিআরের এই কর্মকর্তা নিজেই। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, মুসফিকুর রহমান ইফাত নামে তার কোনো ছেলে নেই। ইফাতকে তিনি চেনে না বলেও হুংকার দেন। এ কথার পর চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। মতিউর রহমান হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন, যারা অপপ্রচার করছেন তাদের বিরুদ্ধে তিনি আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। তখন সবার দৃষ্টি যায় ইফাতের দিকে। ছাগল নিয়ে থাকা এই মিষ্টি ছেলেটির বাবা তাহলে কে?

একজন বাবা তার সন্তানকে অস্বীকার করতে পারেন—এমন নির্মমতা আমাদের সমাজে খুব একটা দেখা যায় না। আমাদের বাবারা প্রচণ্ড কষ্টের মধ্যেও নিজের জীবন উৎসর্গ করেন সন্তানদের জন্য। নিজেদের সব আনন্দ-বিলাসিতা ত্যাগ করে সন্তানকে মানুষ করতে চান। সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে নিজেদের সব কিছু উজাড় করে দেন। সেখানে একজন বাবা সন্তানকে অস্বীকার করবেন কী করে? তাই শুরুতে মতিউরের কথাই সত্য বলে ধরে নিতে হয়। সন্তানকে কি কেউ অস্বীকার করে? আমরা মতিউরের ওপরই আস্থা রাখি। কিন্তু দুষ্ট ছাগলের ক্রেতা খুঁজতে খুলে যায় মতিউরের রত্নভান্ডার। এখন গণমাধ্যম নিশ্চিত করেছে যে, ইফাত মতিউর রহমানের সন্তান। তার দ্বিতীয় সংসারের প্রথম সন্তান ইফাত। ইফাতের মাধ্যমিক পরীক্ষার যে নম্বরপত্র, তাতেও দেখা যাচ্ছে তার বাবার নাম মতিউর রহমান। মতিউর রহমান তাহলে কেন অস্বীকার করলেন তার প্রিয় সন্তানকে? ছাগলকাণ্ডে মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে যেসব তথ্য বেরোচ্ছে, সেগুলো ভয়ংকর। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাবেক পুলিশপ্রধান বেনজীরকেও হার মানিয়েছে তা। তার এই গুপ্তধনের খোঁজ যেন আমরা না পাই, সেজন্যই কি তিনি এই কাণ্ড করলেন?

আমি মতিউরের অবৈধ সম্পদের ফিরিস্তি দিতে যাব না। কারণ, এটি ইতোমধ্যে কালবেলাসহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হচ্ছে। ১৫ লাখ টাকা দিয়ে যে কিশোর ছাগল কিনেছে, তা নিয়েও ঠাট্টা, রসিকতা আমি করব না। আমি শুধু একটি বিষয় নিয়ে বিব্রত, হতাশ, বিস্মিত। তা হলো একজন বাবা কতটা বর্বর, পৈশাচিক হলে তার অর্থ এবং অবৈধ কর্মকাণ্ড গোপন করার জন্য নিজের সন্তানকে অস্বীকার করতে পারেন। টাকা থাকলে মানুষ কী না করে। একাধিক বিয়ে করে, উপপত্নী, বান্ধবী রাখে, বেপরোয়াভাবে সম্পদ ক্রয় করে দেশে-বিদেশে। মতিউর রহমান যেন সেরকমই একটি চরিত্র। তার প্রথম স্ত্রীর ঘরে সন্তানাদি আছে। তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। তার দ্বিতীয় স্ত্রী থাকেন ধানমন্ডিতে। সেখানে তিনি মাঝে মাঝে যান। ভাগ্যিস তিনি তৃতীয় বিয়ে করেননি। অথবা তিনি তৃতীয় বিয়ে করেছেন কি না, তা আমরা জানি না। এ রকম কত বৈধ-অবৈধ স্ত্রী তার আছে, সে বিতর্কেও আমি যাব না। আমার শুধু একটিই প্রশ্ন, মতিউর রহমান তার ছেলেকে কেন অস্বীকার করলেন? এর মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা কী? মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা অনেক রকম হতে পারে। আমরা যদি খুব সরলীকরণ ব্যাখ্যা দিতে যাই, তা হলে ব্যাখ্যাটি এ রকম দাঁড়ায়—মতিউর রহমান তার ছেলেকে বাঁচানোর জন্যই পিতৃত্ব অস্বীকার করেছেন। মতিউর রহমান হয়তো ভেবেছেন, সব কিছু ম্যানেজ করা যাবে। তার যেসব কেচ্ছা-কাহিনি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে তাতে প্রমাণিত হয়, তিনি অতীতে বিভিন্ন অপকর্মে জড়িয়েছেন। দুর্নীতি দমন কমিশন আগেও তার অবৈধ সম্পদ খুঁজেছে। সেটা ম্যানেজ করেছেন তিনি টাকার জোরেই। কাজেই তার সন্তান যে ছাগলকাণ্ড করেছেন, সেটাও তিনি ম্যানেজ করতে পারবেন বলে তার বদ্ধমূল ধারণা ছিল। এ কারণেই তিনি তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি সামাল দিতে সব কিছু অস্বীকার করেছেন। মানুষের দৃষ্টি সাময়িকভাবে আড়াল করার জন্যই তিনি সন্তানকে অস্বীকার করেছিলেন। এর দ্বিতীয় আরেকটি ব্যাখ্যা থাকতে পারে। তা হলো সন্তানকে যদি তিনি অস্বীকার করেন, তাহলে তার অবৈধ সম্পদের খোঁজ-খবর কেউ নেবে না। তাকে নিয়ে কেউ খোঁচাখুঁচি করবে না। ছাগলকাণ্ডেই বিষয়টি শেষ হবে। সবাই নতুন ইস্যুতে ঝুঁকবে। কিন্তু মানুষ যখন প্রচণ্ড দুর্নীতিবাজ হয়ে যায়, বিপুল অবৈধ সম্পদের মালিক হন, তখন তিনি বেপরোয়া হন। হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে যান। বাস্তবতা থেকে তিনি নিজেকে অনেক দূরে সরিয়ে ফেলেন। এ কারণেই তিনি অনুভব করতে পারেন না কোনটা ভুল আর কোনটা সঠিক। মতিউর রহমান মনে করেছিলেন, টাকা থাকলেই বোধহয় সব কিছু সামাল দেওয়া যায়। এ কারণেই তিনি ছেলেকে অস্বীকার করে সবাইকে ধোঁকা দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এ যুগে তথ্য গোপন আদৌ কি রাখা যায়! তথ্য গোপন রেখে বাঁচা যায়! মতিউর রহমান যে বিপুল সম্পদ-বিত্ত বানিয়েছেন সে বিপুল সম্পদ যে বৈধ পথে উপার্জন করেননি, তা সন্তানকে অস্বীকার করার মধ্য দিয়েই প্রমাণিত হয়েছে। মতিউর যদি বৈধ পথে অর্থ উপার্জন করতেন, তাহলে তার সন্তানের ১৫ লাখ টাকার ছাগল কেনা নিয়ে তিনি গর্বিত হতেন। যেভাবে তিনি অবলীলায় শেয়ারবাজারে তার অর্থপ্রাপ্তির বিবরণ দিচ্ছিলেন একটি টেলিভিশনে, সেভাবেই তিনি ১৫ লাখ টাকার ছাগল কেনার একটা ব্যাখ্যা দিতেন। আম্বানির ছেলের বিয়েতে বিত্তের উৎসব হলো না, কার কী? এই ঢাকা শহরে কেউ কেউ বিয়ের অনুষ্ঠানে ভারতীয় তারকাদের নিয়ে এসে ফুর্তি করেন। এসব তো এখন সমাজে ‘জায়েজ’ হয়ে গেছে। এবার ঈদে কেউ কেউ কোটি টাকার গরু কিনেছে। অনেক বিত্তশালী অরুচিকরভাবে তাদের বিত্তের প্রকাশ ঘটান। এসব বিত্তের উৎকট বিলাস মানুষ নীরবে সহ্য করে।

সাম্প্রতিক সময়ে আমরা অদ্ভুত কিছু ব্যাপার লক্ষ করছি। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যেন চাকরির নামে আলাদিনের চেরাগ পাচ্ছেন। সরকারি চাকরি পাওয়া মানে যেন দুর্নীতির লাইসেন্স পাওয়া। বিপুল বিত্তের মালিক হওয়ার সুবর্ণ সুযোগ যেন এখন সরকারি চাকরি। কেউ কেউ সরকারি চাকরিতে যাচ্ছেনই যেন বিত্তবান হওয়ার জন্য। অবৈধ পন্থায় সীমাহীন সম্পদের মালিক হওয়ার লোভে। ইদানীং সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়ার প্রবল আগ্রহ দেখা যাচ্ছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে। মাঝেমধ্যে মনে হয়, শিক্ষার একমাত্র লক্ষ্য যেন সরকারি চাকরি পাওয়া। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির সামনে গেলে দেখা যায়, লাইন ধরে শিক্ষার্থীরা সেখানে প্রবেশ করছেন। খুব আগ্রহ নিয়ে যদি আপনি তাদের জিজ্ঞেস করেন, কেন তারা লাইব্রেরিতে গেছেন? দেখবেন প্রায় সবাই লাইব্রেরিতে যাচ্ছেন বিসিএসের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য। বেশিরভাগ শিক্ষার্থী এখন উদ্যোক্তা হতে চান না, করপোরেট চাকরি করতে চান না, সৃজনশীলতা চান না। কবি, লেখক, গবেষক হওয়ার আগ্রহ খুব কম শিক্ষার্থীর। আমাদের তারুণ্যের মধ্যে সরকারি চাকরির প্রবণতা ভয়ংকরভাবে বেড়ে গেছে। এটির একটি বাস্তবভিত্তিক কারণও আছে। আমাদের দেশে সরকারি চাকরিগুলো নিরাপদ, চিন্তামুক্ত জীবন দেয়। একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ মাইনে, একটি রুটিন জীবন এবং ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা প্রদান করে। সে কারণেই হয়তো অনেকেই সরকারি চাকরিতে ঢোকেন। বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে একটি অংশ বর্তমানে এখন বিদেশ চলে যাচ্ছেন। দ্বিতীয় অংশ চাকরির জন্য হামলে পড়ছেন। হোক না তিনি ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার কিংবা কৃষিবিদ। তার শেষ পর্যন্ত লক্ষ্য সরকারি চাকরি। সরকারি চাকরিতে ঢুকলেই যেন তার জীবন ধন্য হয়ে যায়। মা-বাবা মনে করেন তার সন্তান সত্যিকার অর্থে মানুষ হয়েছে। আসলে তিনি মানুষ হচ্ছেন নাকি একজন দুর্নীতিবাজ হিসেবে পুনর্জন্ম নিচ্ছেন, সে বিতর্ক এখানে নাইবা করলাম। কদিন আগে একজন তথ্য ক্যাডারের কর্মকর্তা চাকরি ছেড়ে দিয়ে সাব-রেজিস্ট্রার হয়েছেন। ক্যাডারের চাকরি ছেড়ে নিম্নপদে কেন গেলেন, সেটা বুঝতে পণ্ডিত হওয়ার দরকার নেই। আমরা লক্ষ্য করি মেধাবী পরীক্ষার্থীরা যারা বিসিএস পরীক্ষা দিচ্ছেন, তাদের কেউ কেউ কাস্টম, আয়কর, এনবিআরের মতো জায়গাগুলোয় বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন। প্রশাসন ক্যাডারের চেয়ে এ ধরনের ক্যাডার সার্ভিসগুলোয় মেধাবীদের ঝোঁক যে কাউকে প্রশ্নবিদ্ধ করবেই। কেন তারা এনবিআরের চাকরি চান, কেন কাস্টমের চাকরি চান, কেন একজন তথ্য ক্যাডারের কর্মকর্তা সাব-রেজিস্ট্রার হতে চান? মতিউর রহমানের ঘটনায় সব প্রশ্নের উত্তর এক বিন্দুতে মিলিয়ে দিয়েছে। যে তরুণটি তথ্য ক্যাডারের চাকরি ছেড়ে সাব-রেজিস্ট্রারে যোগদান করেছেন, তিনি মতিউর রহমান হতে চান। প্রচণ্ড বিত্তশালী একজন দুর্নীতিবাজ সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চান। যে তরুণরা এখন প্রশাসন ক্যাডার, তথ্য ক্যাডার, কৃষি ক্যাডার, স্বাস্থ্য ক্যাডারের চেয়ে কাস্টমস কর্মকর্তা, এনবিআর কর্মকর্তা হতে বেশি আগ্রহী, তাদের উদ্দেশ্য মতিউর রহমান হওয়া। এখন মতিউর রহমানরাই হচ্ছেন অনেকের অনুকরণীয়। এখন দুর্নীতিবাজদের দেখলে কেউ ঘেন্না করে না। দুর্নীতিবাজদের উদহারণ মনে করেন। এখন যার যত সম্পদ তিনিই সমাজে তত প্রতিপত্তিশালী। এখন যিনি যেই পরিমাণ বিত্তশালী, তা হোক বৈধ পথে কিংবা অবৈধ পথে, তিনিই সবচেয়ে বেশি ক্ষমতাবান। টাকা থাকলে এখন সব কিছু হয়। মতিউর রহমান টাকার জোরে এখন দুই স্ত্রীকে আনন্দে রাখছেন। তার এক স্ত্রী রাজনীতিতেও নেমেছেন। মতিউর রহমান ভবিষ্যতে যে রাজনীতি করবেন না, তা কে নিশ্চিত করে বলবে। মতিউর রহমানের টাকা আছে। তাই টাকা দিয়ে তিনি ভবিষ্যতে মনোনয়ন কিনবেন। এমপি হবেন। মতি মন্ত্রী হলেও জাতি অবাক হবে না। কাজেই মতিউর রহমান কিছু তরুণকে উৎসাহী করবেন। যে তরুণ শিক্ষাজীবন শেষ করে সরকারি চাকরির দিকে ঝুঁকছেন, তাদের কেউ কেউ নিশ্চয়ই একজন মতিউর রহমান হতে চাইবেন। তারা ড. আকবর আলী খান হতে চাইবেন না, ড. সাদাত হোসেন হতে চাইবেন না। কারণ মতিউর রহমানরা বিত্তশালী, দেশে-বিদেশে তার অঢেল সম্পদ। বেহেশতি সুখে টইটম্বুর তার জীবন। একজন ব্যবসায়ীকে টাকা উপার্জন করতে কত কাঠখড় পোড়াতে হয়। ঝুঁকি নিতে হয়। শ্রমিক সামাল দিতে হয়। প্রতিযোগিতা করতে হয়। কিন্তু মতিরা শুয়ে-বসে বাতাস থেকে টাকা উপার্জন করেন। বর্ষাকালে আমরা বৃক্ষরোপণ করি, কেউ ঔষধি গাছ রোপণ করি, কেউ ফলের চারা। মতিউর রহমান রোপণ করেছিলেন টাকার গাছ। একটা না অনেক টাকার গাছ। গাছ থেকে পাতার বদলে মতি টাকা পারেন। সেই টাকা দিয়ে হাজার কোটি টাকার সম্পদ বানিয়েছেন। গড়েছেন রত্নভান্ডার। কিন্তু মতির রত্নভান্ডারে ঢুকেছে দুষ্ট ছাগল। আর সবাই বিত্ত-বৈভবের কথা জেনে ফেলেছে তাতে। তবে মতিউর রহমানের বিশেষ কিছু হবে বলে আমি মনে করি না। বিত্তশালী হলে সব কিছুকে অস্বীকার করা যায়। আইনকে অস্বীকার করা যায়, দুর্নীতি দমন কমিশনকে বাগে আনা যায়, প্রশাসনকে ম্যানেজ করা যায়, এমনকি গণমাধ্যমের মুখও বন্ধ করা যায়। কিছুদিন পর মতিউর রহমানকে নিয়ে হুলুস্থুল হয়তো বন্ধ হয়ে যাবে। মতিউর রহমান হয়তো সব কিছু ম্যানেজ করে ফেলবেন। তার দ্বিতীয় ঘরের সন্তানরাও বিদেশে স্থায়ী হবেন। মতির রত্নভান্ডারের সন্ধান দিল যে ছাগল, এর কী হবে?


মতিউর রহমান   ছাগল  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

আওয়ামী লীগের ইতিহাসই বাংলাদেশের ইতিহাস

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ২৩ জুন, ২০২৪


Thumbnail

২৩ জুন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অনন্য, অসাধারণ দিন। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। আওয়ামী লীগ তার অভিযাত্রার ৭৫ বছর পূর্ণ করল। শুধু বাংলাদেশে নয়, এই উপমহাদেশে অন্যতম প্রাচীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ। এই ৭৫ বছর আওয়ামী লীগ যেমন সুসময় পার করেছে, তেমনি পাড়ি দিয়েছে প্রতিকূলতার ঝঞ্ঝা। সবকিছু সামাল দিয়ে আওয়ামী লীগ স্বমহিমায় উদ্ভাসিত। একটি শক্তিশালী, বর্ণাঢ্য এবং চিরসবুজ রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে নিজেকে।

আওয়ামী লীগ যেন অমলিন, আওয়ামী লীগ যেন চিরসজীব, প্রাণস্পন্দনে ভরপুর। এই ৭৫ বছরে আওয়ামী লীগের ইতিহাস যদি আমরা নির্মোহভাবে মূল্যায়ন করি, তাহলে দেখব, আওয়ামী লীগের ইতিহাস এবং বাংলাদেশের ইতিহাস একবিন্দুতে মিলিত হয়েছে। আওয়ামী লীগের ইতিহাসই যেন বাংলাদেশের ইতিহাস। ইতিহাসের দুটি অধ্যায়। প্রথম অধ্যায় সংগ্রামের ইতিহাস আর দ্বিতীয় অধ্যায়টি হলো বিনির্মাণের ইতিহাস। আওয়ামী লীগের হাত ধরেই বাংলাদেশের অভ্যুদয়, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, আমাদের জাতীয় পতাকা, মানচিত্র এবং ভূখণ্ড। আওয়ামী লীগর মাধ্যমেই জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা। আওয়ামী লীগই বাংলাদেশের উন্নয়নের কান্ডারি।

১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল পাকিস্তানি শাসক-শোষকদের বঞ্চনা, লাঞ্ছনা এবং অপশাসনের বিরুদ্ধে। মুসলিম লীগের প্রতি মানুষের আক্রোশ এবং আশাহতের বেদনা থেকেই জনগণের আকাঙ্ক্ষা এবং প্রান্তিক দরিদ্র মানুষের ভালোবাসার এক সামষ্টিক রূপ ছিল আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ তার প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বাঙালির মুক্তির অবিচল সংগঠন হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল।

অভিযাত্রায় আওয়ামী লীগ বারবার বাধা পেয়েছে। সংগ্রাম করতে হয়েছে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। মানুষের মৌলিক অধিকার সুরক্ষার জন্য। আর এটি করতে গিয়ে আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতাকর্মী নির্যাতিত হয়েছেন, নিপীড়িত হয়েছেন। দলটি বিভিন্ন সময় অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। কিন্তু তার পরও আওয়ামী লীগ স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা বুকে ধারণ করেছে এবং স্বাধীনতার সুপ্ত বাসনাকে ধীরে ধীরে প্রস্ফুটিত করেছে। এই দল কখনো লক্ষ্যচ্যুত হয়নি।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের দায়িত্ব নেওয়ার পরই আওয়ামী লীগের নবযাত্রার সূচনা হয়। তিনিই আওয়ামী লীগকে তিল তিল করে গড়ে তুলেছিলেন। জাতির পিতাই আওয়ামী লীগকে গণমানুষের সংগঠনে পরিণত করেছিলেন। তিনি গ্রামগঞ্জে প্রত্যন্ত এলাকায় মানুষের কাছে গিয়েছিলেন। মানুষের অধিকারের বার্তা দিয়েছিলেন, দিয়েছেন মুক্তির বার্তা।

সে কারণেই আওয়ামী লীগ জনমানুষের প্রাণের দলে পরিণত হয়েছে। আর গণমানুষের আকাঙ্ক্ষা ধারণ করেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তিল তিল করে বাংলাদেশকে স্বাধীনতার দিকে নিয়ে গিয়েছিলেন।৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ’৫৪-এর নির্বাচন, ’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ছয় দফা ঘোষণা, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং৭০-এর নির্বাচন প্রতিটি ধাপে আওয়ামী লীগ জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আরও বিকশিত হয়েছে। বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রামে দীপ্ত হয়েছে। জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করেছে। জনগণের ঐক্যের শক্তিতেই আওয়ামী লীগ বলীয়ান।

৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের সংগ্রামের ইতিহাসের পথ ধরেই বাংলাদেশ স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। বাংলাদেশের মুক্তির সংগ্রামের ইতিহাস আওয়ামী লীগের ইতিহাস একই সূত্রে গাঁথা। দুটি নদী যেমন এক মোহনায় মিলিত হয় ঠিক তেমনি বাংলাদেশের সংগ্রামের ইতিহাস আর আওয়ামী লীগের ইতিহাস এক মোহনায় মিলিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মধ্য দিয়ে। শহীদের রক্তে রঞ্জিত পবিত্র স্বাধীনতা এসেছে, পথ দিয়েই।

স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশকে পুনর্গঠনের সংগ্রাম শুরু করে। বঙ্গবন্ধু শুরু করেন সোনার বাংলা বিনির্মাণের এক কঠিন যুদ্ধ। কিন্তু স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি এবং৭১-এর পরাজিত শক্তিরা নতুন করে ষড়যন্ত্র করে। সেই ষড়যন্ত্রে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। পথ হারায় বাংলাদেশ। বাংলাদেশকে আবার পাকিস্তান বানানোর এক নীল নকশা বাস্তবায়ন শুরু করে। এমন একটি পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অস্তিত্ব অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ধূসর অন্ধকারে ঢাকা পড়ে যায়। সেখান থেকেই ঘুরে দাঁড়ানোর যে গল্প সেই গল্পের নায়কশেখ হাসিনা তার হাত ধরেই আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবিত হয়। তার হাত ধরেই বাংলাদেশ আবার জেগে ওঠে। অধিকারহারা মানুষ আবার আশার আলো দেখে। অন্ধকার টানেল থেকে বাংলাদেশের জনগণ এক নতুন যুদ্ধের সূচনা করে।

১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আওয়ামী লীগ তার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ওই কাউন্সিলে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত করা হয় সর্বসম্মতভাবে। তখন আওয়ামী লীগ একটি বিপর্যস্ত-বিধ্বস্ত রাজনৈতিক দল। অস্তিত্বের সংকটে ভুগছে। এরকম এক অবস্থায় দলটির হাল ধরেন শেখ হাসিনা। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সব প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে তিনি ১৯৮১ সালের ১৭ মে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। এখান থেকেই শুরু হয় আওয়ামী লীগের ঘুরে দাঁড়ানোর সূচনা আর এখান থেকেই বাংলাদেশের গণতন্ত্রের সংগ্রামের নবযাত্রা।

শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের সংগ্রামের দ্বিতীয় অধ্যায়ের সূচনা হয়। একই সময় শুরু হয় বাংলাদেশে গণতন্ত্রের সংগ্রামের জন্য এক নতুন যুদ্ধের। যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্র জয়ী হয়। জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়, ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রামে বিজয়ী হন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে। এরপর শুরু হয় বাংলাদেশের উন্নয়ন এবং মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম।সোনার বাংলা বিনির্মাণেরউন্নয়নের অভিযাত্রার গল্প এখান থেকেই শুরু হয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর যে দেশটিকে তলাবিহীন ঝুড়ি বলা হয়েছিল, যে দেশটি টিকবে কি না, তা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে রীতিমতো গবেষণা হতো, সেই বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়ানো শুরু করে। স্বাধীন-সার্বভৌম, আত্মনির্ভর, আত্মপ্রত্যয়ী এবং আত্মমর্যাদাশীল একটি রাষ্ট্র বিনির্মাণ শুরু করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল, মাত্র পাঁচ বছরে তিনি বাংলাদেশকে বদলে দেন। আশার প্রদীপ জ্বালান দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। তিনি একদিকে যেমন গঙ্গার পানি চুক্তি, পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তিচুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যাগুলোর দিকে নজর দেন, তেমনি অন্যদিকে তিনি বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, কমিউনিটি ক্লিনিক, আশ্রয়ণ, আমার বাড়ি আমার খামার প্রকল্পের মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের অংশীদার করেন। স্বাধীনতা প্রতিটি মানুষের জন্য। স্বাধীনতার সুফল যেন সব মানুষ পায় তা নিশ্চিত করার জন্য এক অনবদ্য অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মকৌশল গ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

কিন্তু ২০০১ সালের অক্টোবরের নির্বাচনের পর আবার ভাগ্য বিপর্যয় ঘটে বাংলাদেশের। আবার ক্ষত-বিক্ষত হয় আওয়ামী লীগ। সারা দেশে দলটির ওপর জুলুম-নিপীড়ন চলে সীমাহীনভাবে। আওয়ামী লীগ নিধন যেন একটি রাষ্ট্রীয় কর্তব্যে পরিণত হয়। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার দেশব্যাপী শুরু করে হত্যা, নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ, লুণ্ঠন। আর কর্মসূচির কারণে ঘরহারা হয়ে পড়ে বহু মানুষ। বহু মানুষ প্রাণ দেয়। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগ নিধনের চূড়ান্ত নীল-নকশা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়। শেখ হাসিনাকে হত্যা করার জন্য আওয়ামী লীগের জনসভায় চালানো হয় নজিরবিহীন গ্রেনেড হামলা। কিন্তু তার পরও অলৌকিকভাবে বেঁচে যান আওয়ামী লীগ সভাপতি, বেঁচে যায় বাংলাদেশ।

২০০৭ সালে আওয়ামী লীগকে নিয়ে আবার ষড়যন্ত্র হয়, ষড়যন্ত্র হয় গণতন্ত্র এবং বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। সংস্কারপন্থিরা আওয়ামী লীগকে আবার বিভক্ত করার চেষ্টা করে। আওয়ামী লীগ নিয়ে শুরু হয় ষড়যন্ত্র। শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করার অপচেষ্টা শুরু হয়। কিন্তু আওয়ামী লীগের তৃণমূল শেখ হাসিনার রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ষড়যন্ত্রকে মোকাবিলা করে সফলভাবে।

২০০৭ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয় বিপুলসংখ্যক গরিষ্ঠতা নিয়ে। এর পরই শুরু হয়েছে বাংলাদেশের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। বাংলাদেশের ইতিহাস উন্নয়নের ইতিহাস, বাংলাদেশের ইতিহাস অগ্রযাত্রার ইতিহাস। বাংলাদেশ এখন বিশ্বে অনুকরণীয় উদাহরণ। শেখ হাসিনা তার দীর্ঘ ১৫ বছরের বেশি শাসনকালে বাংলাদেশকে বদলে দিয়েছেন। বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে একটি উদাহরণ হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন। একদিকে যেমন তিনি মেগা প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশকে বদলে দিয়েছেন; পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেলের মাধ্যমে তিনি দেশের অবকাঠামো উন্নয়নের এক বিপ্লব ঘটিয়েছেন, ঠিক তেমনি ডিজিটাল বাংলাদেশের মাধ্যমে তিনি তথ্যপ্রযুক্তি ছড়িয়ে দিয়েছেন সারা দেশে। যার সুফল ভোগ করছে প্রতিটি নাগরিক।

বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়নি, বাংলাদেশের মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন হয়েছে। উন্নয়নের সুফল পেয়েছে প্রতিটি মানুষ। আর কারণে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে। বেড়েছে মাথাপিছু আয়। প্রান্তিক মানুষ পাচ্ছে নানা সুযোগ-সুবিধা। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতার মতো সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচিগুলো আজ ছড়িয়ে গেছে গোটা দেশে। গৃহহীনরা ঘর পাচ্ছে, কোনো মানুষ কর্মহীন থাকছে না।

খাদ্য উৎপাদনে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ। প্রতিটি ক্ষেত্রে আজ বাংলাদেশের সাফল্যের গল্পগুলো চর্চা হচ্ছে সারা বিশ্বে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আজ বাংলাদেশ অনুকরণীয় মডেল। সারা বিশ্বকে বাংলাদেশ দেখিয়ে দিয়েছে, সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব এবং কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়এটি স্রেফ কথার কথা নয়, এটি বাস্তবতা। আর সবকিছুই শেখ হাসিনার প্রজ্ঞায় হয়েছে। নির্মোহভাবে বাংলাদেশের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের যা কিছু অর্জন তার সবকিছুই আওয়ামী লীগের হাত ধরেই। আওয়ামী লীগ বিগত নির্বাচনে স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের ঘোষণা দিয়েছে।

স্মার্ট বাংলাদেশ মানে মুক্ত মনের বাংলাদেশ। স্মার্ট বাংলাদেশ মানে আধুনিক প্রগতিশীল এক বাংলাদেশ। স্মার্ট বাংলাদেশ মানে শিক্ষিত-উদ্দীপ্ত, অগ্রসর এক বাংলাদেশ। আর এরকম একটি বাংলাদেশ বিনির্মাণের মাধ্যমে বিশ্বে উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে আমাদের দেশ। আওয়ামী লীগের হাত ধরেই বাংলাদেশের জন্ম, আওয়ামী লীগের হাত ধরেই বাংলাদেশের বিকাশ। আওয়ামী লীগের ইতিহাস আর বাংলাদেশের ইতিহাস যেন একাকার হয়ে গেছে, মিলেছে একবিন্দুতে।


লেখক: নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত

ইমেইল: poriprekkhit@yahoo.com


আওয়ামী লীগ   ইতিহাস   বাংলাদেশ  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

শেখ হসিনার পর আওয়ামী লীগের হাল ধরবে কে?

প্রকাশ: ০৮:০০ এএম, ২৩ জুন, ২০২৪


Thumbnail

আওয়ামী লীগ তার গৌরবের ৭৫ বছর পার করছে। এক ঝঞ্ঝা, বিক্ষুব্ধ, প্রতিকূল অবস্থাকে জয় করে আওয়ামী লীগ তার ৭৫ বছর সময় কাটিয়েছে। যেকোনো রাজনৈতিক দলের জন্য ৭৫ বছর টিকে থাকা গৌরবের এবং অবিস্মরণীয় সাফল্যের অধ্যায়। ৭৫ বছরে আওয়ামী লীগ ক্ষয়িষ্ণু হয়নি, আওয়ামী লীগ ম্রিয়মান হয়নি। আওয়ামী লীগ পথ হারায়নি। বরং এখনো জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শকে উর্ধ্বে তুলে রেখে দলটি এগোচ্ছে। এখনো প্রান্তিক, দরিদ্র মানুষের আশার ঠিকানা হলো আওয়ামী লীগ। এখনো জনগণের আশা-ভরসার কেন্দ্রস্থল আওয়ামী লীগ। এখনো আওয়ামী লীগকে ঘিরেই মানুষের সব স্বপ্ন, সব চাওয়া-পাওয়া, সব প্রত্যাশা, সব দাবি। আর একারণেই আওয়ামী লীগের সমালোচনাও বেশি হয়। যাকে মানুষ ভালোবাসে, যার কাছে মানুষের প্রত্যাশা বেশি তাকে ঘিরেই মানুষ সমালোচনা করে। আওয়ামী লীগ মিশে আছে এদেশের মাটি এবং মানুষের সঙ্গে। আওয়ামী লীগ এমন একটি রাজনৈতিক দল যে রাজনৈতিক দলের শেকড় জনগণের হৃদয়ে প্রোথিত। এই শেকড় এতো গভীর যে সেখান থেকে আওয়ামী লীগকে কেউই উপড়ে ফেলতে পারেনি। বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা হয়েছে কিন্তু সেই চেষ্টা জনগণই প্রতিহত করেছে। আওয়ামী লীগ জনগণের ভালোবাসার দল। কিন্তু আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে এসে সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি উঠেছে তা হলো আওয়ামী লীগের পরবর্তী নেতা কে? শেখ হাসিনার পর আওয়ামী লীগের হাল কে ধরবে? 

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগকে জনগণের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। জনগণের ভরসার স্থল হিসেবে সৃষ্টি করেছিলেন আওয়ামী লীগকে। বিশেষ করে দরিদ্র, প্রান্তিক, খেটে খাওয়া মানুষের আপন ঠিকানায় পরিণত হয়েছিল আওয়ামী লীগ। তাদের অধিকার, তাদের আশা-আকাঙ্খার প্রতীক হয়ে উঠেছিল আওয়ামী লীগ। বঙ্গবন্ধু সারা দেশে আওয়ামী লীগকে জনপ্রিয়ই শুধু করেননি, জনগণের একান্ত আপন-বিশ্বস্ত একটি রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। ৭৫’এর ১৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগ ঠিকানা বিহীন হয়ে পরেছিল। অস্তিত্বের সংকটে পরেছিল মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী দলটি। এ দলটি টিকবে কি টিকবে না তা নিয়েও অনেকের প্রশ্ন ছিল। অনেকেই ধারণা করেছিল শেষ পর্যন্ত হয়তো আওয়ামী লীগ বিলুপ্ত যাবে। আওয়ামী লীগ হবে মুসলিম লীগ, এমন কথাও বলেছিলেন অনেকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এগুলোর কোনটাই সত্য হয়নি। সত্য না হওয়ার একটি বড় কারণ হলেন ‘শেখ হাসিনা’। ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি হতশ্রী অবস্থা থেকে আস্তে আস্তে আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠন করেন। হতশা গ্রস্থ নেতা-কর্মীদের জাগ্রত করেন। অধিকারহারা মানুষকে নতুন করে স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেন। গণতন্ত্রহীন মানুষকে গণতন্ত্রের জন্য উজ্জ্বীবিত করেন। শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে আবার নতুন ঠিকানা দেয়ার জন্য সংগ্রাম শুরু করেন। আর সেকারণেই শেখ হাসিনা বাংলাদেশের মানুষের সবচেয়ে আস্থার প্রতীক। বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা হিসেবেও তিনি প্রতিষ্ঠিত। আওয়ামী লীগের ৭৫ বছরের ইতিহাসের ৪৩ বছরই শেখ হাসিনা দলটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি আওয়ামী লীগকে কেবল পুনর্গঠিতই করেননি, আওয়ামী লীগকে কেবল সংগঠিতই করেননি, তিনি আওয়ামী লীগকে দিয়েছেন এক নতুন জীবন। তার হাত ধরেই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছে। এই ৪৩ বছরের নেতৃত্বদান কালের প্রায় অর্ধেক সময় তিনি আওয়ামী লীগকে দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আনতে পেরেছেন। অর্থাৎ জনগণের ভালোবাসা এবং জনগণের আস্থাভাজন রাজনৈতিক দল হিসেবে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। 

আওয়ামী লীগের বয়স যেমন ৭৫, শেখ হাসিনার বয়সও ৭৬। তাই তিনি অবসরের কথা বলেন। গত কয়েকটি কাউন্সিলে বার বার তিনি বলেছেন, ‘আমার বিদায় নেয়ার সময় হয়েছে, আমাকে বিদায় দেন।’ আওয়ামী লীগ সভাপতি এটিও বলেছেন, ‘একজন কাউন্সিলরও যদি বলেন তারা আমাকে দলের সভাপতি হিসেবে চান না তাহলে আমি আর নেতৃত্বে থাকবো না।’ কিন্তু শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা এমনই যে, আওয়ামী লীগের কোন কাউন্সিলরই কেন, আওয়ামী নেতৃবৃন্দ ও দেশের সাধারণ মানুষও মনে করে শেখ হাসিনা বিকল্পহীন। শুধু আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে নয়, দেশের অভিভাবক হিসেবে শেখ হাসিনার বিকল্প কেউ নেই। শেখ হাসিনার চরম শত্রুও স্বীকার করেন, তিনি আছেন জন্যই বাংলাদেশ এই উন্নতি করেছে। শেখ হাসিনার চরম প্রতিপক্ষও স্বীকার করেন, আজকের বাংলাদেশকে যে মর্যাদার জায়গায় পৌঁছেছে সেটিও শেখ হাসিনার অবদান। বাংলাদেশের জন্য যা ছিলো অকল্পনীয়। যে দেশটি বিদেশিদের কাছে হাত পেতে থাকতো সাহায্য সহযোগিতার জন্য, যে দেশটি সব সময়ই দারিদ্রের প্রতীক হিসেবে ছিলো, যে দেশটি ছিলো অভাব-অনটনের দেশ, ক্ষুধা, বন্যা, দুর্ভিক্ষ পিড়িত দেশ হিসেবে বিশ্বে পরিচিত ছিলো, সেই দেশকে শেখ হাসিনা বদলে দিয়েছেন। দীর্ঘ সংগ্রাম এবং কঠোর পরিশ্রম করে তিনি বাংলাদেশেরই নতুন গল্প লিখেছেন। বাংলাদেশের মানুষের স্বপ্নে সীমানাটা তিনি অনেক বড় করে দিয়েছেন। আওয়ামী লীগকে তিনি সংগঠিত করেছেন। বিভক্ত-কোন্দলরত দলটিকে তিনি তিল তিল করে গড়েছেন। এদেশের প্রতিটি মানুষ যেমন মনে করে শেখ হাসিনা ছাড়া বাংলাদেশের কি হবে? এদেশের প্রতিটি মানুষ যেমন শংকিত যে, শেখ হাসিনা না থাকলে বাংলাদেশ পথ হারাবে। ঠিক তেমনিই আওয়ামী লীগের প্রতিটি নেতা-কর্মীও উদ্বিগ্ন। তারা মনে করে, যদি শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে না থাকে তাহলে আওয়ামী লীগ পথ হারাবে। আওয়ামী লীগকে ঐক্যবদ্ধ রাখা দুঃস্বাধ্য হবে অন্য কারো আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মধ্যে এ আশঙ্কা এখন প্রবল। 

গত ১৫ বছর ধরে টানা ক্ষমতায় থাকার কারণে আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশকারীরা ঢুকেছে, ঢুকেছে সুবিধাবাদী-মতলববাজরা। এরা আওয়ামী লীগকে রীতিমতো ঘিরে ফেলেছে। এদের কারণে আওয়ামী লীগের অনেক বদনাম হচ্ছে। আওয়ামী লীগের ত্যাগী, পরীক্ষিত, দুঃসময়ের সঙ্গীরা এখন কোণঠাসা এমন অভিযোগ উঠে। কিন্তু এই সমস্ত ত্যাগী, পরীক্ষিত এবং দুঃসময়ের সাথীরাও আশা-ভরসার একমাত্র ঠিকানা মনে করেন শেখ হাসিনাকে। শেখ হাসিনাও তাদেরকে ডাক দিলে ছুটে আসেন। শেখ হাসিনাও তাদেরকে মূল্যায়নের চেষ্টা করেন। শেখ হাসিনা আছে জন্যই এখনো আওয়ামী লীগের তৃণমূল শক্তিশালী, তারাই ক্ষমতাবান। প্রশ্ন উঠেছে শেখ হাসিনার পর কে? 

মানুষের বয়স বাড়বেই এবং একটা সময় তাকে অবসরে যেতে হবে, বিদায় নিতে হবে। এটাই চিরন্তন সত্য। আওয়ামী লীগে অনেকের মধ্যেই ইদানিং উৎকণ্ঠা দেখা যায়। শেখ হাসিনার পর আওয়ামী লীগের কি হবে? কে হাল ধরবে? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে আওয়ামী লীগের অনেক নেতারাই নানারকম আলোচনা করেন। কিন্তু কেউই সন্তুষ্ট হতে পারেন না। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা বারবার একটি কথায় বলেন, ‘শেখ হাসিনার বিকল্প একমাত্র শেখ হাসিনা নিজেই।’ কিন্তু তিনি যখন থাকবেন না তখন এ দলটির কি হবে? কে হাল ধরবে?  অনেকেই মনে করেন যে নতুন নেতৃত্ব বাছাইয়ের সময় হয়েছে। অন্যান্য রাজনৈতিক দল যেমন সাম্ভাব্য ভবিষ্যত নেতা নির্ধারণ করে ফেলে বহু আগেই সেখানে আওয়ামী লীগ অদ্ভুত ও আশ্চর্য ব্যতিক্রম। এই ব্যতিক্রম কি সঠিক না ভুল তা নিয়েও কম চর্চা হয় না, কম বিতর্ক হয় না। অনেক সমালোচক বলার চেষ্টা করেন যে, এখনই উচিত আওয়ামী লীগের বিকল্প নির্বাচন করা। পরবর্তী নেতা হিসেবে কাউকে গড়ে তোলা এবং আস্তে আস্তে তাকে জনসমক্ষে নিয়ে আসা। জনগণের কাছে তিনি যেন গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারেন সেই চেষ্টা করা উচিত। কিন্তু শেখ হাসিনা এই ব্যাপারে আশ্চর্য নির্লিপ্ত। তিনি এ ব্যাপারে মোটেও কথা বলতে রাজি না। আওয়ামী লীগের পরবর্তী নেতৃত্ব কে হবে এসব প্রশ্নের উত্তরে তিনি সবসময় দার্শনিক উত্তর দেন। তিনি বলেন, এটি আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাই ঠিক করবেন। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা যেভাবে নেতৃত্ব বাছাই করবে সেইভাবে নতুন নেতা তৈরী হবে। 

একথা সত্য যে, শেখ হাসিনার শূন্যস্থান কখনো পূরণ হবে না। কিন্তু শেখ হাসিনা যদি নেতৃত্ব থেকে চলে যান তাহলে নতুন নেতা কি পারবে শেখ হাসিনার মতো দলকে আগলে রাখতে। টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া সকল নেতা-কর্মীকে চিনতে? তাদের নাম বলতে? এই প্রশ্ন নিয়ে আওয়ামী লীগের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ক্রমশ বাড়ছে। এই উদ্বেগ-উৎকন্ঠার প্রেক্ষাপটেই আমি ৭৫ পরবর্তী আওয়ামী লীগের কথা স্মরণ করতে চাই। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কাউকে তার উত্তরসূরী হিসেবে মনোনীত করেন নি। তিনি সবসময় জনগণের উপর আস্থা রাখতেন এবং জনগণ নেতা-কর্মীদের উপর ভরসা রাখতেন। বঙ্গবন্ধু যখন ছিলেন তখন দ্বিতীয় নেতা কে হবে তা নিয়ে কোন রকম আলোচনায় হতো না। বঙ্গবন্ধুর শূন্যস্থান যে শেখ হাসিনা পূরণ করবেন সেটিও কারও ভাবনায় ছিলো না। বাস্তবতাই শেখ হাসিনাকে নেতৃত্বের আসনে আসীন করেছে। শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সভাপতি হবেন ১৯৭৩ কিংবা ৭৪ সালে কয়জন ভেবেছিল? হয়তো কেউই ভাবেনি। কিংবা যারা ভেবেছেন তারাও হয়তো সুপ্ত আকঙ্খার কথা জনসমক্ষে প্রকাশ করতে পারেন নি। কিন্তু পরিস্থিতি শেখ হাসিনাকে আওয়ামী লীগের  সভাপতি করেছে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের ইতিহাস যদি আমরা মূল্যায়ন করি তাহলে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কেউই একজন আরেকজনের হাতে নেতৃত্ব তুলে দেননি। বরং কর্মীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে যাকে নেতা হিসেবে নির্বাচিত করেছেন তিনি নেতা হয়েছেন। জাতির  পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের সভাপতি হয়েছেন কর্মীদের প্রবল আকাংখার প্রকাশ হিসেবে। নেতা-কর্মীরা তাকে আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে বসিয়েছে। তিনি নিজে আওয়ামী লীগের সভাপতি হননি। শেখ হাসিনাও স্বেচ্ছায় বা আগ্রহ প্রকাশ করে আওয়ামী লীগের সভাপতি হননি। আওয়ামী লীগের সভাপতি হয়েছেন নেতা-কর্মীদের অকুণ্ঠ ভালোবাসায়, সমর্থনে। নেতা-কর্মীরা বুঝেছিলো এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগকে টিকে থাকতে হলে শেখ হাসিনার বিকল্প নাই। যেমনটি তারা বুঝেছিলো বঙ্গবন্ধু ছাড়া আওয়ামী লীগ কখনোই লড়াই-সংগ্রামে জয়ী হতে পারবে না। আর ঠিক সেই কারণে শেখ হাসিনা অত্যন্ত সচেতনভাবে তার উত্তরাধিকার ঠিক করছেন  না। এটি তিনি নেতা-কর্মীদের উপর ছেড়ে দিয়েছেন। এটি সম্ভবত একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। উত্তরাধিকার নির্ধারন করা বা আগে থেকেই জোর করে নেতৃত্ব কারো কাঁধে চাপিয়ে দেয়া কোন গণতান্ত্রিক দলের কাজ নয়। গণতান্ত্রিক কাঠামোতে, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংগঠনে নেতৃত্ব উঠে আসে কর্মীদের আকাঙ্খার প্রকাশ হিসেবে। কর্মীরাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে একজনকে নেতা বানান। কর্মী এবং সাধারণ জনগণ একজনকে নেতা হিসেবে সিংহাসনে বসান, তাকে সম্মান করেন, ভালোবাসেন এবং তার জন্য জীবন উৎসর্গ করেন। আওয়ামী লীগ জনগনের রাজনৈতিক দল। জনগণের হৃদয় থেকে উৎসারিত এ দলের নেতৃত্ব কার কাছে যাবে সেটি ঠিক করবে আওয়ামী লীগের কর্মীরাই। তৃণমূলের আওয়ামী লীগের কর্মীদের কাছে যিনি বিশ্বাসযোগ্য হবেন, যিনি আস্থাভাজন হবেন তিনি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের আসনে অলংকিত হবে। আওয়ামী লীগ গত ৭৫ বছরে একটি বিষয় প্রমাণ করেছে। তাহলো জনগণের চেয়ে বড় কোন শক্তি নেই। আর একটি রাজনৈতিক দলের মূল শক্তির জায়গা হলো তৃণমূল। আর একারণে তৃণমূলের শক্তিতে বলীয়ান জনগণের ভালোবাসায় সিক্ত আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব আসবে একদম প্রান্তিক মানুষের আকাংখা থেকে। প্রান্তিক মানুষ যেভাবে তাদের নেতাকে পছন্দ করবেন সেভাবে নেতৃত্ব নির্বাচিত হবে। নেতৃত্ব কোন উপর থেকে চাপিয়ে দেয়ার বিষয় নয়। নেতৃত্ব স্বতঃস্ফূর্ত ভালোবাসা থেকে উৎসারিত একটি আকাঙ্খার নাম। আর একারণেই আওয়ামী লীগে শেখ হাসিনার পর কে তার উত্তরের জন্য আমাদের তাকাতে হবে জনস্রোতের দিকে, জনগণের দিকে, তৃণমূলের দিকে। তৃণমূলই নির্ধারন করবে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব কার হাতে যাবে। আওয়ামী লীগ কোন ব্যক্তির দল নয়। আওয়ামী লীগ জনগণের ক্ষমতায়নের এক প্রতীক। শেখ হাসিনা গত ৪৩ বছরে এই সত্যকেই প্রতিষ্ঠিত করেছেন। যেই সত্য আবিষ্কার করেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। 

সৈয়দ বোরহান কবীর, নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত
ই-মেইল: poriprekkhit@yahoo.com


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

দুর্নীতিগ্রস্ত অফিসগুলোতে যাবে দুদক?

প্রকাশ: ০৫:০০ পিএম, ২২ জুন, ২০২৪


Thumbnail

সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক আলোচনায় এসেছে দুর্নীতি নিয়ে। বিভিন্ন সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার দুর্নীতির বিভিন্ন কেচ্ছা মানুষকে শিহরিত করেছে। এই সমস্ত দুর্নীতির গল্প সরকারকে অস্বস্তি এবং বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে ফেলেছে। কোনো কোনো কর্মকর্তার দুর্নীতি এতই বেপরোয়া যে, তা সীমাহীন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে। 

গণমাধ্যমে এসব সংবাদ প্রকাশিত হবার পর দুর্নীতি দমন কমিশন নড়েচড়ে বসে এবং তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে। আর এর ফলে দুর্নীতি দমন কমিশনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর কেন দুদক ব্যবস্থা নিচ্ছে? দুদক কেন আগে বিষয়টি দেখে না? এই প্রশ্ন উঠেছে অনেকের মনে। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানাচ্ছে, দুর্নীতি দমন কমিশন নিজেও এই বিষয়টি নিয়ে কিছুটা বিব্রত। আর এ কারণেই নড়েচড়ে বসেছে দুদক। সামনের দিনগুলোতে দুদক বিভিন্ন দুর্নীতিগ্রস্ত অফিসগুলোতে নজরদারি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেখানে দুদকের কর্মকর্তারা নিয়মিত যাবেন। কোথাও কোথাও অফিস করবেন বলেও ভাবা হচ্ছে। আর এ বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনে খুব শীঘ্রই আলোচিত হবে বলেই জানা গেছে।

সাধারণভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে যে সমস্ত প্রতিষ্ঠানগুলো চিহ্নিত, সেই সমস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতেই দুদকের কর্মকর্তাদের নজরদারি বাড়ানো হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। যেমন- জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআর, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন প্রকল্প। যে প্রকল্পগুলো সম্পর্কে দুর্নীতির কথাবার্তা শোনা যায়। তবে দুর্নীতি দমন কমিশন মনে করে ঢালা ভাবে কাউকে দুর্নীতিবাজ বলা ঠিক নয়। সব কিছু যাচাই বাছাই করেই কাউকে অভিযুক্ত করা উচিত। আর এ কারণেই হুটহাট করে যেন কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতির গল্প ফাঁদা হয়, কেউ যেন বিনা কারণে ভিক্টিম না হয় সে কারণেও নজরদারি বাড়াচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন। 

দুর্নীতি দমন কমিশনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে কমিশনের কাজের পরিধি বেড়েছে‌, কমিশন নজরদারি বাড়িয়েছে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে দ্রুত অনুসন্ধানের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তবে যে সমস্ত দুর্নীতিবাজদের নিয়ে এখন কথা উঠছে, সেই সমস্ত দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে আগেই কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, এ রকম প্রশ্নের উত্তরে কমিশন বলছে যে অতীতে কী হয়েছে না হয়েছে সেসব নিয়ে তারা ভাবতে রাজি নয় বরং তারা বর্তমান নিয়ে ভাবতে রাজি। বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশন ব্যাংকিং খাত, আর্থিক খাত এবং স্বাস্থ্য খাতসহ বিভিন্ন দুর্নীতিগ্রস্ত খাতগুলোকে নিয়ে কাজ করতে চাইছে। 

উল্লেখ্য, এর আগে দুর্নীতি দমন কমিশন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে বৈঠক করেছিল। সেখানে দুর্নীতি দমন করার জন্য সহযোগিতা আশ্বাসও দিয়েছিল এবং সুনির্দিষ্ট কিছু রূপ পরিকল্পনাও মন্ত্রণালয়কে দেয়া হয়েছিলো। দুর্নীতি দমন কমিশনের সাবেক কমিশনার ড. মোজাম্মেল নিজে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এবং সচিবদের সঙ্গে এ নিয়ে বৈঠক করেছিলেন। কিন্তু কোন মন্ত্রনালয়ই। শেষ পর্যন্ত দুর্নীতি দমন কমিশনের কাজে সহযোগিতা করেননি বলে অভিযোগ রয়েছে। আর এ কারণেই দুর্নীতি দমন কমিশন স্বপ্রণোদিত হয়ে বিভিন্ন অফিস পরিদর্শন এবং কার্যক্রম নিরীক্ষার উদ্দ্যোগ গ্ৰহণ করেছে বলে জানা গেছে।

দুদক   দুর্নীতি  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

একালের হীরক রাজা

প্রকাশ: ১০:৩০ পিএম, ২১ জুন, ২০২৪


Thumbnail

কিংবদন্তী চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের অমর সৃষ্টি ‘হীরক রাজার দেশে’। ১৯৮০ সালে মুক্তি পাওয়া এই চলচ্চিত্রটি একটি কালজয়ী সৃষ্টি। রূপকের মাধ্যমে, প্রতীকী চরিত্রে সত্যজিৎ রায় উদ্ভট শাসনের স্বরূপ উন্মোচন করেছেন। ‘হীরক রাজা’ স্বৈরশাসন, অপশাসনের প্রতীক। এই রাজার স্বেচ্ছাচারিতায় বিপর্যস্ত হয়েছিল একটি দেশ। ‘হীরক রাজার দেশে’ চলচ্চিত্রটি যুগে যুগে সব অযোগ্য, স্বৈরাচারী, লোভী শাসকদের বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদ। হাস্যরসের মাধ্যমে অপশাসনের স্বরূপ উন্মোচন করেছিলেন সত্যজিৎ রায়। তবে, উদ্ভট এবং অপরিণামদর্শী নেতৃত্ব শুধু একটি দেশ বা রাষ্ট্রের জন্যই ক্ষতিকর নয়। স্বেচ্ছাচারী, একনায়ক একটি দল এবং একটি পরিবারের জন্যও বিপদজ্জনক। ‘হীরক রাজা’ কেবল দেশের জন্য প্রযোজ্য নয়, পরিবার এবং দলের জন্যও প্রযোজ্য। একজন অযোগ্য নেতা তার ‘তুঘলকী নেতৃত্বে’ তার নিজের দলেরই বারোটা বাজিয়ে দিতে পারেন। সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপিতে যা ঘটছে তাতে হীরক রাজার কথা নতুন করে মনে পড়লো। 

গত কয়দিনে বিএনপিতে যা চলছে তা কেবল হীরক রাজার অবাস্তব, একগুয়ে সিদ্ধান্তের সাথেই তুলনীয়। ঈদের ছুটি শুরু হবার আগেই বিএনপিতে ঘটে গেল ভূমিকম্প। এই ভূমিকম্পে তছনছ, লন্ডভন্ড দলটি। একটি দলে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃত্বে পরিবর্তন আসতেই পারে। অযোগ্যতা এবং ব্যর্থতার কারণে কমিটি বাতিল হতেই পারে। দলের ভেতরে কেউ শৃঙ্খলা ভঙ্গ করলে তার শাস্তি হওয়াই উচিত। কিন্তু এসব প্রতিটি কাজই হওয়া দরকার নিয়ম নীতি মেনে। আইন সিদ্ধ পথে, গঠনতন্ত্র অনুসরণ করে, একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়, আলাপ আলোচনার মাধ্যমে। কিন্তু বিএনপিতে এখন যা হচ্ছে তা অগণতান্ত্রিক এবং স্বেচ্ছাচারিতার চূড়ান্ত রূপ। বিএনপিতে ভূমিকম্প শুরু হয় ১৩ জুন মধ্যরাতে। গভীর রাতে ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশালের মহানগর আহ্বায়ক কমিটি ভেঙ্গে দেয়া হয়। বিলুপ্ত করা হয় যুবদলের কমিটি, ছাত্রদলের মহানগর কমিটি। এসব কমিটি বাতিল এতোটাই আকস্মিক যে দলের শীর্ষ নেতারাও এ সম্পর্কে অন্ধকারে ছিলেন। অনেক নেতাই টিভি স্ক্রলে বিএনপির বিভিন্ন কমিটি বিলোপের সংবাদ দেখেন। 

বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মেয়াদ উত্তীর্ণ হবার কারণেই কমিটি বিলোপ করা হয়েছে। হতেই পারে। কিন্তু তাহলে তো দলটির কোন কমিটিই এখন থাকার কথা নয়। নয় বছর ধরে বিএনপিতে কোন কাউন্সিল হয় না। যিনি কমিটি বিলোপ করলেন তিনিই তো মেয়াদোত্তীর্ণ। এসব কমিটি বিলোপ করেই ক্ষান্ত হননি দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। কেন্দ্রীয় কমিটিতেও আনা হয়েছে বড় রদবদল। গত ১৫ জুন মধ্যরাতে এই রদবদল করা হয়। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটিতে ৩৯ টি পদে নেতাদের অনেককে নতুন করে যুক্ত করা হয়েছে। অনেকের পদ পরিবর্তন করা হয়েছে।’ বিএনপিতে মধ্যরাতে কেন এই ‘ক্যু’ হলো এনিয়ে নানাজনের নানা মত। অনেকে বলছেন, আন্দোলনে ব্যর্থতার জন্য এই অ্যাকশন। আন্দোলনের ব্যর্থতার জন্য কি এসব পুঁচকে নেতারা দায়ী? শীর্ষ নেতারা কি এই ব্যর্থতার দায় এড়াতে পারে? ব্যর্থতার প্রধান দায়তো ভারপ্রাপ্ত প্রধান নেতার। 

কেউ কেউ বলার চেষ্টা করছেন যে বিএনপির তৃণমূলের আকাঙ্খা বাস্তবায়নের জন্যই এই পরিবর্তন। এতে তৃণমূল খুশী এমন কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু তৃণমূল কি চেয়েছিল? তাদের মতামত কে নিয়েছে? সংস্কারপন্থীদের পদোন্নতি দেয়া হলো তৃণমূলের ইচ্ছায়? এটা কেউ বিশ্বাস করবে? কিন্তু আমি এ বিতর্কে যেতে চাইনা। বিএনপির এই পরিবর্তন কতটা জরুরি ছিলো, কেন এই পরিবর্তন, এই একতরফা সিদ্ধান্ত গুলো কতটা সঠিক হয়েছে, আমি সেই প্রসঙ্গে যেতে চাই না। আমার খুব সহজ এবং সাধারণ একটি প্রশ্ন। এই সিদ্ধান্ত গুলো কীভাবে নেয়া হলো! এধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণে কি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে, নাকি এক ব্যক্তির খেয়াল খুশীতেই সব কিছু ওলট পালট করা হলো? 

বিএনপির নেতারাই স্বীকার করেছেন, তারা এধরনের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে অন্ধকারে ছিলেন। কেউ কিছুই জানতেন না। প্রশ্ন হলো, একটি গণতন্ত্রে বিশ্বাসী রাজনৈতিক দল অগণতান্ত্রিক কায়দায় এধরনের সিদ্ধান্ত নিতে পারে? এই ঘটনার পর একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে, বিএনপি যে গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন করছে তা কোন গণতন্ত্র? তারেক জিয়ার গণতন্ত্র? মধ্যরাতে ‘ক্যু’ এর গণতন্ত্র? বর্তমান গণতন্ত্র বিদায় করে বিএনপি এই গণতন্ত্র আনতে চায়? 

বিএনপি দীর্ঘ ১৭ বছরের বেশি সময় ধরে ক্ষমতার বাইরে। এই ১৭ বছরের মধ্যে ১৩ বছর ধরে তারা তাদের ভাষায় ‘গণতন্ত্রের জন্য লড়াই’ করছে। গণতন্ত্রের সংগ্রামের অংশ হিসেবে দলটি ২০১৪ সালে এবং ২০২৪ সালে নির্বাচন বর্জন করে। নানা রকম আন্দোলন সংগ্রাম করেও তারা একটি সত্যিকারের আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি। বার বার ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে বিএনপি নিজেই এখন সংকটে। বিএনপির প্রধান নেতা বেগম খালেদা জিয়া এখন রাজনীতি থেকে নিজেকে গুটিয়ে রেখেছেন। শেখ হাসিনার কৃপায় তিনি জেল থেকে ফিরোজায় থাকছেন। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে জেলে যাবার আগে বেগম জিয়া সর্বময় ক্ষমতা তুলে দেন তার পুত্রের হাতে। পুত্র তারেক জিয়াকে রাজনীতিতে টিকিয়ে রাখার জন্য সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান পদ সৃষ্টি করা হয়েছিল দলের শেষ কাউন্সিলে। চেয়ারপার্সনের অনুপস্থিতিতে বা অক্ষমতায় সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের হাতেই চেয়ারম্যানের সব ক্ষমতা অর্পিত হবে। জেলে যাবার আগে বেগম জিয়া তেমনটিই করে গেছেন। সেই ব্যবস্থা এখনও বহাল রয়েছে। কেউ যদি বিএনপির গঠনতন্ত্র গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়েন তাহলে দেখবেন, এই দলে চেয়ারপার্সনের হাতে নিরঙ্কুশ এবং সর্বময় ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। চেয়ারপার্সন পারেন না, এমন কোন কাজ নেই। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রধানের হাতে যেভাবে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা গঠনতন্ত্রে দেয়া হয়েছে, সেই ক্ষমতা জার্মানিতে নাৎসী পার্টির হিটলারের হাতেও ছিলো না। ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সম্পর্কে বলা হয় যে, ‘একজন নারীকে পুরুষ এবং একজন পুরুষকে নারী করা ছাড়া ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সব কিছু করতে পারে।’ বিএনপি চেয়ারপার্সনের ক্ষমতা ব্রিটিশ পার্লামেন্টের চেয়েও বেশী। তিনি চাইলে রুমিন ফারহানাকে ‘রুমী ফারহান’ বানাতে পারেন আবার রিজভী আহমেদকে রিজভী বেগম বানিয়ে দিতে পারেন। চেয়ারম্যান যা বলবে সেটিই সত্য, সেটিই শিরোধার্য। বেগম জিয়া এই নিরঙ্কুশ ক্ষমতা উত্তরাধিকার সূত্রে তারেক জিয়ার কাছে হস্তান্তর করেছেন। 

নিরঙ্কুশ ক্ষমতা থাকলেও বেগম জিয়া সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সিনিয়র নেতাদের মতামত নিতেন। কমিটি বাতিল কিংবা দল থেকে কাউকে বাদ দেয়ার মতো সিদ্ধান্ত গুলো স্থায়ী কমিটিতে নেয়া হতো। তার তবু চক্ষু লজ্জা ছিলো। অন্তত যৌথ সিদ্ধান্তের একটি আবরণ তিনি দিতেন। বিএনপি মহাসচিব কে.এম ওবায়দুর রহমান এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের এক পর্যায়ে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হন। এই বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত দলের ভেতর আলোচনা হয়েছিল। তিনদিন লাগাতার বৈঠকের পর ঐ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ৯১ সালে দলের হেভিওয়েট নেতা ব্যরিস্টার নাজমুল হুদাকে দল থেকে সাময়িক বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল দলগত ভাবে। স্থায়ী কমিটিতে সিদ্ধান্ত নিয়ে। অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে ২০০১ সালে নির্বাচনে জয়ী হয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করেছিল বিএনপি। কিন্তু রাষ্ট্রপতি হয়েই তিনি স্বাধীন সত্ত্বায় নিজেকে প্রকাশ করার চেষ্টা করেন। জিয়ার মাজারে না যাবার কারণে তাকে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে অভিসংশন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ঐ সিদ্ধান্ত বেগম জিয়া একা নেন নি। সংসদীয় দলের বৈঠকে এ ব্যাপারে সর্ব সম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছিল। অবশ্য সংসদে রাষ্ট্রপতির অভিশংসন প্রস্তাব উত্থাপনের আগেই অধ্যাপক চৌধুরী পদত্যাগ করেন।

২০১৪ সাল থেকে ২০১৮ পর্যন্তও বিএনপির স্থায়ী কমিটি সক্রিয় ছিলো। সিদ্ধান্ত যেই নিক, বিষয়টি স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত হিসেবে ঘোষিত হতো। কিন্তু এখন বিএনপিতে এসব সৌজন্যতার বালাই নেই। বিএনপিতে এখন সিদ্ধান্ত নেয়া হয় লন্ডন থেকে। এক ব্যক্তির খেয়াল খুশীমতো। তারেক জিয়া দলের অন্য নেতাদের চাকর-বাকর মনে করেন। তাদের মতামত নিয়ে তিনি নিজেকে খাটো করতে চান না। অন্যের মতামত নিলে যদি দুষ্ট লোকেরা তাকে মুর্খ বলে-এজন্য তারেক হীরক রাজার স্টাইলে সিদ্ধান্ত নেন। ২০১৮ সালে বিএনপির সামনে নির্বাচনে যাওয়া ছাড়া কোন বিকল্প ছিলো না। নির্বাচনে না গেলে দলটির নিবন্ধন বাতিল হয়ে যেত। এরকম পরিস্থিতিতে বিএনপি জোটগতভাবে নির্বাচনে যাবার সিদ্ধান্ত নেয়। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের বাইরে একটি বৃহত্তর জোট গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়। অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী, কর্ণেল (অবঃ) অলি আহামেদ সহ বিভিন্ন সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে দফায় দফায় বৈঠক হলো। চূড়ান্তভাবে যখন জোট হবে ঠিক সেই সময় লন্ডন থেকে বার্তা এলো জোটে থাকবে না অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী। ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে গঠন করতে হবে ‘জাতীয় ঐক্য ফ্রন্ট’। বিএনপির অনেক নেতাই সেদিন লন্ডনের ‘ওহী’ তে বিস্মিত হয়েছিলেন। ড. কামাল হোসেন আওয়ামী বিরোধী, কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী। তার সাথে আওয়ামী লীগের বিরোধ ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। ড. কামাল হোসেন মনে করেন, আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে বিচ্যুত। আর বিএনপি হলো বঙ্গবন্ধুর হত্যার বেনিফিসিয়ারী। জিয়া বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের অন্যতম পরিকল্পনাকারী। বিএনপি ৭৫ এর নারকীয় হত্যাকান্ডকে সমর্থন করে। এটাই তাদের রাজনৈতিক অস্তীত্বের শেকড়। তারা ৭৫ এর খুনী এবং ৭১ এর ঘাতকদের লালন পালন করে। এটাই তাদের রাজনীতির মূল ভিত্তি। ৭৫ এর শোকাবহ দিনে কেক কেটে জন্মদিনের বীভৎস, অরুচীকর উৎসব করে। এই দলটি যখন ড. কামাল হোসেনকে নেতা হিসেবে বরণ করে নিলো, তখনই বিএনপির অনেক নেতাই মিউ মিউ করে তার প্রতিবাদ করেছিল। কিন্তু বিএনপির হীরক রাজা কারো কথা শোনেন না। তিনি শুধু নির্দেশ দেন। নির্বাচনে শোচনীয় বিপর্যয়ের পরও বিএনপিতে দেখা গেল উদ্ভট সিদ্ধান্ত। প্রথমে জানানো হলো, তারা (বিএনপি) এই নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের দল থেকে যারা নির্বাচিত হয়েছেন তারা শপথ নেবেন না, সংসদে যাবেন না। কিন্তু কদিন পরই লন্ডন থেকে নতুন বার্তা এলো। এবার পুরোপুরি ইউ টার্ন। বলা হলো সংসদে যেতে হবে, শপথ নিতে হবে। এভাবেই চলছে বিএনপি। 

এবার নির্বাচনের আগেও চললো নাটকের পর নাটক। বিএনপির শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মধ্যেই হঠাৎ করে ২৮ অক্টোবরের আত্মঘাতী নাশকতা কেন করা হলো? লন্ডনের নির্দেশে। আন্দোলন যখন স্তিমিত, নেতা-কর্মীরা পালিয়ে বেড়াচ্ছে, তখন অসহযোগ আন্দোলনের পাগলামী সিদ্ধান্ত কে নিলো? লন্ডনে বসে থাকা বিএনপির মহা ক্ষমতাধর ব্যক্তি। এভাবে উদহারণ দিলে সেই তালিকা শেষ হবে না। এক ব্যক্তির ভুলের মাশুল দিচ্ছে বিএনপি। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গোটা দল। আর রাজনীতির নামে নব্য হীরক রাজা করছেন ব্যবসা। দল এবং কমিটিকে রীতিমতো পণ্য বানিয়ে বেচা কেনায় নেমেছেন এই মুর্খ রাজা। বিএনপিতে কখন কোন সিদ্ধান্ত আসছে কেউ জানে না। দেশের বাস্তবতা, কর্মীদের মনোভাব, অভিজ্ঞ নেতাদের পরামর্শ মূল্যহীন। লন্ডনে বসে যা মনে চায় তাই করছেন তারেক জিয়া। বিএনপিতে তিনি এখন হীরক রাজা। হীরক রাজার মতোই স্তাবকদের প্রশংসায় বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারছেন না। নিজে নিরাপদ দূরত্বে থেকে তিনি কর্মীদের ফেলে দিচ্ছেন অগ্নিকুন্ডে। কিছু চাটুকাররা তার সব কাজের প্রশংসা করছে। তাকে নিয়ে ধন্য ধন্য করছে। তার সমালোচনা করা মানেই কচু কাটা হওয়া। তার বিরোধীতা মানেই বহিষ্কার। নেতা কর্মীরা অনাহারে অর্ধাহারে থাকলেও তাকে খাজনা দিতেই হবে। খাজনা না দিলেই পেতে হবে সাজা। খাজনার টাকা দিয়ে লন্ডনে  আয়েশী জীবন কাটাচ্ছেন একালের হীরক রাজা। সত্যজিৎ রায় যদি বেঁচে থাকতেন তাহলে নির্ঘাত এই মুর্খ নেতার উপর হীরক রাজার নতুন সিক্যুয়াল বানাতেন।   

সৈয়দ বোরহান কবীর, নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত
ই-মেইল: poriprekkhit@yahoo.com


মন্তব্য করুন


বিজ্ঞাপন