এডিটর’স মাইন্ড

সংসদে স্বতন্ত্ররা কি গৃহপালিত থাকবেন

প্রকাশ: ০৯:৫৯ এএম, ২৯ জানুয়ারী, ২০২৪


Thumbnail

আগামীকাল ৩০ জানুয়ারি শুরু হচ্ছে দ্বাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। ব্যতিক্রমী এবারের সংসদে সবার চোখ থাকবে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের ওপর। সদ্য সমাপ্ত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সবচেয়ে বড় চমক ছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। রেকর্ডসংখ্যক স্বতন্ত্র প্রার্থী এবার নির্বাচনে জয়ী হয়ে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছেন। বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে এত অধিকসংখ্যক স্বতন্ত্র এমপি আগে কখনো নির্বাচিত হননি। যে ৬২ জন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন, তাদের ৫৮ জনই বিভিন্নভাবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তারা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়ে ব্যর্থ হন। নৌকা প্রতীক না পেয়ে ঈগল, ট্রাক ইত্যাদি প্রতীক নিয়ে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করেন। নির্বাচনের পর তাদের বেশিরভাগই আওয়ামী লীগের পদপদবিতে বহাল আছেন। আওয়ামী লীগও কৌশলগত কারণে এসব বিদ্রোহীর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। গোটা নির্বাচন প্রক্রিয়ায় স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রতি প্রচ্ছন্ন সমর্থন দিয়েছে ক্ষমতাসীন দল। যেহেতু বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর বড় একটি অংশ নির্বাচন বর্জন করে, তাই প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের জন্য আওয়ামী লীগ এ কৌশল গ্রহণ করে। এ কথা অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই যে, নির্বাচন যেটুকু প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এবং অংশগ্রহণমূলক হয়েছে, তা স্বতন্ত্রদের অবদান। বিদ্রোহী প্রার্থীদের ছাড় না দিলে নির্বাচন হতো আরও একপেশে, বিবর্ণ। তাই ভোটের পরও ক্ষমতাসীনদের কাছে স্বতন্ত্রদের গুরুত্ব কমেনি। ২৮ জানুয়ারি গণভবনে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের আমন্ত্রণ জানানোর মধ্যে দিয়ে তা প্রমাণিত হয়েছে। স্বতন্ত্র এমপি কোন ভূমিকায় অবতীর্ণ হবেন? তারা কি মুক্ত স্বাধীন হিসেবে সংসদে জনগণের কণ্ঠস্বর হবেন, নাকি একান্ত অনুগত আওয়ামী লীগের গৃহপালিত হিসেবে সংসদে শুধু ক্ষমতাসীনদের বন্দনা করবেন; অথবা একটা মধ্যবর্তী অবস্থানে থাকবেন?

সংসদীয় গণতন্ত্রে দুই পক্ষ থাকে। ট্রেজারি বেঞ্চ বা সরকারি দল এবং বিরোধী দল। সরকারি ও বিরোধী দল মিলেই সংসদ পায় পূর্ণতা। সংসদে সরকারি দলের চেয়ে বিরোধীদের ভূমিকা অনেক ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ। একটি সংসদ কতটা কার্যকর, প্রাণবন্ত তা নির্ভর করে বিরোধী দল কতটা সক্রিয় তার ওপর। সরকারকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা, সরকারের ভুলত্রুটির সমালোচনা করা বিরোধী দলের প্রধান কাজ। বিরোধী দল যত ভালোভাবে এ কাজটি করতে পারে, গণতন্ত্র তত বিকশিত হয়, শক্তিশালী হয়। বিরোধী দলহীন সংসদ অকার্যকর। এরকম সংসদ সরকারি দলকে বেপরোয়া করে। তারা জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে চলে যায়। এ প্রবণতা গণতন্ত্রের জন্য, সুশাসনের জন্য ভালো নয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলো গত দুটি জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ ও হতাশাজনক। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে জাতীয় পার্টি কাগজে-কলমে বিরোধী দল হিসেবে সংসদে ছিল। কিন্তু বাস্তবে তারা ছিল সরকারের বাধ্যগত, গৃহপালিত। ২০১৪ সালে জাতীয় পার্টি নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু এরশাদের ওই সিদ্ধান্ত কার্যকর হতে দেননি রওশন এরশাদ। বেশ কিছু প্রার্থী নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেও শেষ পর্যন্ত দলটি নির্বাচনে থাকে। এরশাদ নিজেও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মন্ত্রিসভায় আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, মুজিবুল হক চুন্নু, মশিউর রহমান রাঙ্গা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। মন্ত্রিসভায় বিরোধী দলের অন্তর্ভুক্তি, ব্যতিক্রমী ও বিরল ঘটনা। এ কারণে ২০১৪ সালের সরকারকে সর্বদলীয় জাতীয় সরকারও বলা যায়। নানা চাওয়া-পাওয়ার হিসাব মেলাতে জাতীয় পার্টির নেতারা সংসদে সরকার বন্দনার প্রতিযোগিতায় মেতেছিলেন। সংসদে বিরোধী দল বলে কিছু ছিল না। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করেছিল বটে কিন্তু প্রধান বিরোধী দল হতে পারেনি। টানা দ্বিতীয়বারের মতো জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের মর্যাদা পায় জাতীয় পার্টি। এবার আওয়ামী লীগ সরকার গঠনে একলা চলো নীতি গ্রহণ করে। জাতীয় পার্টি তো নয়ই, ১৪ দলের কোনো শরিককেও মন্ত্রিসভায় রাখা হয়নি। এ সময় জাতীয় পার্টির পোষা বিরোধী দলের কলঙ্ক মুছে ফেলার চেষ্টা করে। সংসদে বিশেষ করে শেষদিকে তাদের সরকারের সমালোচনায় বেশ তৎপর দেখা যায়। এতে সংসদও খানিকটা প্রাণ ফিরে পেয়েছিল বটে। কিন্তু তখনো জাতীয় পার্টির কারও কারও মধ্যে সরকারের গুণকীর্তন করে কিছু প্রাপ্তির চেষ্টা ছিল দৃশ্যমান। ফলে সাধারণ জনগণ জাতীয় পার্টিকে সত্যিকারের বিরোধী দল ভাবতে পারেনি কখনো, বরং তারা অনুগত বিরোধী দল হিসেবেই পরিচিতি পায়। বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে ১৯৭৩-এর প্রায় বিরোধী দলশূন্য সংসদও দশম ও একাদশ সংসদের থেকে প্রাণবন্ত ছিল। হাতেগোনা কয়েকজন বিরোধী দলের সদস্যকে অবারিত সমালোচনার লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু সংসদীয় গণতন্ত্রকে অর্থপূর্ণ এবং কার্যকর করতে চেয়েছিলেন। বিরোধীদের সমালোচনাকে তিনি স্বাগত জানাতেন। এরপর সংসদীয় গণতন্ত্রের অবসান হয়। সামরিক স্বৈরাচাররা সংসদকে রাবার স্ট্যাম্প বানায়। কিন্তু তারপরও ’৭৯ ও ’৮৬-এর সংসদ ছিল প্রাণবন্ত। বিরোধী দলের উপস্থিতি এবং সক্রিয় অবস্থান ছিল দৃশ্যমান। সরকারের তীব্র সমালোচনা করে আলোচিত হয়েছিলেন বেশ কজন পার্লামেন্টারিয়ান। কিন্তু ’৮৮ সালের এরশাদের সাজানো নির্বাচন বর্জন করে আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ সব বিরোধী দল। এ সময় এরশাদ কাছে টানেন জাসদ নেতা আ স ম আবদুর রবকে। রবের নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘সম্মিলিত বিরোধী দল’ বা কপ। এই বিরোধী দলের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’। আ স ম রব এরশাদ বন্দনায় তার নিজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারকেই শুধু সংকটে ফেলেননি, সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকাকেও হাস্যকর করেছেন। ’৯১, ’৯৬ ও ২০০১ সালের জাতীয় সংসদগুলো ছিল প্রাণবন্ত, উত্তেজনাপূর্ণ। বিশেষ করে ’৯১-এর সংসদ সম্ভবত বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে কার্যকর সংসদ। বিরোধী দলে থেকেও আওয়ামী লীগ কোস্টগার্ড বিল পাস করিয়ে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু ২০১৪ সাল থেকে দেশে কার্যত সংসদীয় গণতন্ত্রের বদলে প্রধানমন্ত্রীশাসিত শাসনব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়। বাংলাদেশের গণতন্ত্র নিয়ে যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এত প্রশ্ন, তার একটি বড় কারণ হলো অকার্যকর সংসদ। অনুগত বিরোধী দল। এবারের নির্বাচনে বিএনপি এবং তার মিত্রদের অংশগ্রহণ না করার ফলে আবারও একটি গুরুত্বহীন সংসদ গঠিত হওয়ার শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছিল। ক্ষমতাসীনদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে থাকা সংসদে সরকারের ন্যূনতম সমালোচনাও হবে না বলে আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু ৬২ জন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ায় অনেকেই একটি প্রাণবন্ত সংসদের আশায় বুক বেঁধে আছেন। সংসদে ন্যায্য কথা বলা হবে, দুর্নীতি অর্থ পাচারকারীদের স্বরূপ উন্মোচন হবে, ব্যর্থ এবং অযোগ্য মন্ত্রীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে, এমন প্রত্যাশার প্রদীপ জ্বলতে শুরু করেছে। এরকম প্রত্যাশার কারণ, স্বতন্ত্রভাবে যারা নির্বাচিত হয়েছেন তাদের কেউ কেউ জাতীয়ভাবে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচিত। রীতিমতো সেলিব্রেটি। ব্যারিস্টার সুমনের কথাই ধরা যাক, তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রিয় মুখ। জনগণ যেসব বিষয়ে উদ্বিগ্ন, বিরক্ত; সেসব বিষয় নিয়ে তিনি গত কয়েক বছর কথা বলেছেন। অর্থ পাচার, দুর্নীতি নিয়ে তার বক্তব্য যেন সাধারণ মানুষের মনের কথার প্রকাশ। এবার তিনি স্বতন্ত্রভাবে এমপি হয়েছেন। তিনি শুধু তার নির্বাচনী এলাকাতেই পরিচিত মুখ নন, সারা দেশেও জনপ্রিয়। জাতীয় সংসদে এসব বিষয়ে তার শক্তিশালী অবস্থান দেখতে চায় দেশবাসী। এ. কে. আজাদ স্বতন্ত্রভাবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি ব্যবসায়ী নেতা বহু আগেই। আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ হলেও লুটপাট, অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা নিয়ে তিনি বেশ কিছুদিন ধরেই খোলামেলা কথা বলছেন। সংসদে তিনি এসব কথা বলবেন এটাই দেশবাসী প্রত্যাশা করে। মুজিবর রহমান চৌধুরী বা নিক্সন চৌধুরীও সরকারের ভেতরে থাকা ষড়যন্ত্রকারী, দুর্নীতিকারী, দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কথা বলবেন, এটা জনগণ চায়। এরকম বেশ কিছু ব্যক্তিত্ব এবার নির্বাচনে নিজেদের জনপ্রিয়তায় জয়ী হয়েছেন। যাদের জনপ্রিয়তা শুধু তাদের নির্বাচনী এলাকায় নয়, সারা দেশে। জনগণ তাদের দিকে তাকিয়ে আছে, তারা জাতীয় সংসদে কোন ভূমিকায় অবতীর্ণ হবেন।

সংসদে স্বতন্ত্রদের অদ্ভুত এক সুবিধাজনক অবস্থান আছে। সংসদীয় গণতন্ত্র স্বতন্ত্র এমপিদের বলা হয় ‘গ্রে মেম্বার’। সাদা ও কালোর মাঝামাঝি যে অবস্থান তাকে বলা হয় গ্রে বা ধূসর। সেই ধূসর অবস্থানে থেকে স্বতন্ত্রদের যেমন সরকারের ভালো কাজের প্রশংসা করতে পারবেন, তেমনি সরকারের মন্দ কাজের সমালোচনা করতে পারবেন। এই স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের শৃঙ্খলমুক্ত। ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী একজন দলীয় নির্বাচিত সংসদ সদস্য সংসদে দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারবেন না। তার সংসদ সদস্য পদ চলে যাবে। তিনি শৃঙ্খলিত। অথচ একজন ‘স্বতন্ত্র’ সংসদ সদস্য মুক্ত, স্বাধীন। এই স্বাধীনতার কি সঠিক প্রয়োগ করতে পারবেন স্বতন্ত্ররা?

আমি জানি, যারা স্বতন্ত্র নির্বাচিত হয়েছেন তাদের প্রায় সবাই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। মনোনয়ন না পেয়ে নিজেদের যোগ্যতা এবং জনপ্রিয়তা প্রমাণের চ্যালেঞ্জ হিসেবে তারা নির্বাচন করেছিলেন। তাদের অনেকেরই লক্ষ্য আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ থাকা। আগামী নির্বাচনে যেন তারা ‘নৌকা’ প্রতীক পান তা নিশ্চিত করা। সরকার এবং ক্ষমতাসীন দলে তাদের নড়বড়ে অবস্থান সংহত করা। এজন্য অনেকেই সংসদে আওয়ামী লীগেরই অংশ হিসেবে কাজ করতে চাইবেন। নির্বাচনের পর থেকে বেশিরভাগ স্বতন্ত্রের মধ্যে এই প্রবণতা দৃশ্যমান। কিন্তু মনে রাখতে হবে, জনগণ তাদের ভোট দিয়েছে ‘নৌকা’র প্রতিপক্ষ হিসেবে; আওয়ামী লীগ হিসেবে নয়। আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের প্রত্যাখ্যান করেই স্বতন্ত্র জয়ী করেছেন ভোটাররা। তাই স্বতন্ত্ররা যদি আওয়ামী লীগের অনুগত এবং গৃহপালিত হন তাহলে সেটি হবে ভোটারদের সঙ্গে এক ধরনের প্রতারণা। এর ফলে জাতীয় সংসদ হবে স্তাবকদের ক্লাব। অতি স্তুতি, চাটুকারিতা সরকারকে জবাবদিহিতা ঊর্ধ্বে নিয়ে যাবে। জনবিচ্ছিন্ন করবে। সংসদের প্রতিও জনগণের আস্থা নষ্ট হবে। এই সরকারের বিগত ১৫ বছরে যেমন অনেক ভালো কাজ আছে, তেমনি আছে অনেক ব্যর্থতা। পৃথিবীর কোনো সরকারই সব কাজ ভালো করে না। দেশ চালালে ভালো-মন্দ দুটিই হবে। সরকারের মন্দ কাজের সমালোচনার সব দরজা বন্ধ হলে তা হবে দেশের জন্য ভয়াবহ ক্ষতিকর। ক্ষমতাসীনদের জন্যও ভালো নয়। দুর্নীতি, অর্থ পাচার, ব্যাংক লুট, খেলাপি ঋণ—এসব বিষয়ে সংসদে কথা বলা না হলে, সংসদ গ্রহণযোগ্যতা হারাবে। হারাবে কার্যকারিতা। আওয়ামী লীগ আর আওয়ামী লীগে সয়লাব এ সংসদ হবে চাটুকারদের প্রতিযোগিতা মঞ্চ। এর ফলে গণতন্ত্রবিরোধীরা, নির্বাচন বর্জনকারীরা সুযোগ পাবে। রাজনীতি সংসদ থেকে চলে যাবে রাজপথে। অথচ স্বতন্ত্ররা যদি স্বমহিমায় উজ্জ্বল হন, নিজেদের বিবেক-বুদ্ধি এবং মেধা দিয়ে পরিচালিত হন, তাহলে এই সংসদ একটি অনবদ্য সংসদ হতে পারে। সংসদ হতে পারে রাজনীতির প্রাণকেন্দ্র। যারা স্বতন্ত্র নির্বাচিত হয়েছেন, তাদের জনপ্রিয়তা ধরে রাখার জন্যও স্বাধীন অবস্থান জরুরি। আমরা তো জানি, এই জাতীয় সংসদ বহু কিংবদন্তি পার্লামেন্টারিয়ান তৈরি করেছে। আসাদুজ্জামান খান, সুধাংশু শেখর হালদার, সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, মিজানুর রহমান চৌধুরী, যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, রাজাকার সবুর খান, শাহ আজিজরা জাতীয় রাজনীতিতে আলোচিত হয়েছেন সংসদের মাধ্যমে। ২০০৮ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদে বক্তৃতা দিয়েই তারকা হয়ে ওঠেন আন্দালিব রহমান পার্থ। আর তারা কেউ ট্রেজারি বেঞ্চে থেকে দক্ষ পার্লামেন্টারিয়ান হননি। বিরোধী দলে থেকে সরকারের সমালোচনা করেই তারা ‘তারকা’ হয়েছিলেন। এবার যারা স্বতন্ত্র এমপি হয়েছেন তাদের সামনে ‘তারকা’ হওয়ার সুবর্ণ সুযোগ। সংসদে সত্য কথা বলে, ন্যায় দাবি তুলেই তারা জনগণের হৃদয় জয় করতে পারেন। তাহলে এই সংসদও হবে প্রাণবন্ত। জনগণের আস্থার প্রতীক। ৭ জানুয়ারির নির্বাচনের সাফল্য বড় কৃতিত্ব যেমন স্বতন্ত্রদের, তেমনি এই সংসদ কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করছে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যের ওপর। বাস্তবতা হলো, এই সংসদে সত্যিকারের বিরোধী দল নেই। বিরোধী দল ছাড়া সংসদ অপূর্ণ। জাতীয় সংসদে ৬২ জন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য কি এই অপূর্ণতার অন্ধকার ঘোচাবেন? জাতির কণ্ঠস্বর হবেন? এটা যদি তারা সাহস নিয়ে করেন, তাহলে লাভ হবে গণতন্ত্রের, আওয়ামী লীগ সরকারের। কিন্তু তারা যদি অনুগত আচরণ করেন, তাহলে সংকটে পড়বে গণতন্ত্র।


লেখক: নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত



মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

নেতাদের মুক্তি, বিএনপির মুক্তি কবে

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ২৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪


Thumbnail

একে একে কারাগার থেকে মুক্তি পাচ্ছেন বিএনপির শীর্ষ নেতারা। ২৮ অক্টোবর বিএনপির সমাবেশে যে তাণ্ডব হয়, তার পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপির বহু নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হন। দলের মহাসচিবসহ স্থায়ী কমিটির গুরুত্বপূর্ণ একাধিক নেতার বিরুদ্ধে সন্ত্রাস এবং নাশকতার অভিযোগে মামলা হয়েছিল। এসব গ্রেপ্তারে বিএনপির আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ে। আন্দোলন পথ হারায়। ৭ জানুয়ারি নির্বাচন প্রতিহত করার ডাক দিয়েছিল ১৭ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটি। কিন্তু তাদের নির্বাচন বর্জন আন্দোলন সফল হয়নি। অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়ে বিএনপি তার অক্ষমতা ও দুর্বলতা প্রকাশ করে। বিএনপি এবং তার মিত্রদের নামমাত্র আন্দোলন নির্বাচনে বাধা সৃষ্টি করতে পারেনি। ৭ জানুয়ারির নির্বাচনের পর ১১ জানুয়ারি নতুন সরকার শপথ নেয়। টানা চতুর্থবারের মতো দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ। নির্বাচনের পর বিএনপি নেতারা আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন। বিএনপির কালো পতাকা বা লিফলেট বিতরণ কর্মসূচি পানসে। এসব কর্মসূচিতে জনসম্পৃক্ততা নেই। বিএনপির নেতাকর্মীরাও স্বীকার করেন আন্দোলন পথহারা। মুখে তারা যাই বলেন না কেন, তাদের হতাশার দীর্ঘশ্বাস এখন সর্বত্র শোনা যায়। বিএনপির নেতারা যখন হতাশ, ক্লান্ত, বিধ্বস্ত; ঠিক তখনই বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ আটক নেতারা মুক্ত হচ্ছেন। নেতারা স্বীকার করেছেন, তাদের মুক্তি আন্দোলনকে বেগবান করবে। মির্জা ফখরুল, মির্জা আব্বাস, আমীর খসরুর মুক্তিতে বিএনপি কর্মীদের মধ্যে একধরনের উচ্ছ্বাস লক্ষ করা যাচ্ছে। বিএনপি নেতাদের মুক্তির পর আমার মনে যে প্রশ্নটি ঘুরপাক খাচ্ছে তা হলো—নেতাদের তো মুক্তি হলো, কিন্তু রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি কি মুক্ত?

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একটি রাজনৈতিক দল একটি স্বাধীন সত্তা। রাজনৈতিক সংগঠন যদি নিজ ইচ্ছায় গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তখন সেই দল বা সংগঠনকে মুক্ত বা স্বাধীন বলা যায়। অন্যদিকে একটি রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্ত যদি বাইরের কোনো রাষ্ট্র, ব্যক্তি বা দল নির্ধারণ করে, দলটির সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া যদি গণতান্ত্রিক না হয় এবং দলের অভ্যন্তরে যদি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা না থাকে, তাহলে সেই দলটি মুক্ত থাকে না। মুক্ত গণতন্ত্রের জন্য মুক্ত রাজনৈতিক সংগঠন জরুরি। মুক্ত গণতন্ত্র ও মুক্ত রাজনৈতিক সংগঠনের ধারণাটি এসেছে মূলত কমিউনিস্ট পার্টির উত্থানের পর থেকে। উদার ও মুক্ত গণতন্ত্রে বিশ্বাসী রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা দেশে দেশে কমিউনিস্ট পার্টিগুলোকে রাজনৈতিক দলের স্বীকৃত দিতে অস্বীকৃতি জানায়। এ ক্ষেত্রে তাদের প্রধান যুক্তি ছিল বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কমিউনিস্ট পার্টিগুলো সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত। এসব দলের নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা নেই। দলের ভেতর মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নেই এবং গণতান্ত্রিক চর্চা নেই। জার্মানিতে নাৎসি পার্টির উত্থানের পর দলের ভেতর গণতন্ত্রের চর্চা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একটি দলে যদি গণতন্ত্র না থাকে তাহলে রাজনৈতিক দলটি ফ্যাসিস্ট দলে পরিণত হতে পারে। নাৎসিবাদের উত্থান ও বিপর্যয় নিয়ে বিশ্বে যত গবেষণা হয়েছে, তাতে একক সিদ্ধান্ত, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র চর্চার বিষয়টি সামনে এসেছে। গ্লাসনস্ত ও পেরেস্ত্রোইকা তত্ত্বের মাধ্যমে বিশ্বে কমিউনিস্ট আন্দোলন বিপর্যয়ে পড়ে। এ সময় গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত হিসেবে রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের চর্চার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একটি দলের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার বিষয়টিও সামনে আসে। এভাবে গণতন্ত্রের সংজ্ঞা এবং তার পরিধি বিস্তৃত হয়। একটি দেশে গণতন্ত্র মানে শুধু নির্বাচন নয়; রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরে গণতন্ত্র চর্চার বিষয়টি স্বীকৃত পায়। এ তত্ত্বকে সামনে রেখে আমরা প্রশ্ন করতেই পারি, বিএনপি কি স্বাধীন, মুক্ত?

আমার বিবেচনায় বিএনপি পরাধীন, শৃঙ্খলিত এক রাজনৈতিক দল। একটি মুক্ত স্বাধীন রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে জবাবদিহিতা থাকাটা জরুরি। নেতারা যদি নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হন তাহলে তাদের সরে দাঁড়াতে হয়। দেশে দেশে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এই চর্চা প্রচলিত। বেশি দূরে যাওয়ার দরকার নেই, ভারতের ন্যাশনাল কংগ্রেসের কথাই ধরা যাক। ঐতিহাসিকভাবে এই দলটি নেহরু পরিবার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ২০১৪ সালের নির্বাচনের শোচনীয় পরাজয়ের পর সোনিয়া গান্ধী দলের নেতৃত্বে থেকে সরে দাঁড়ান। রাহুল গান্ধীকে করা হয় ঐতিহ্যবাহী দলটির সভাপতি। ২০১৯ সালের নির্বাচনেও কংগ্রেস বিজেপির কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। এবার সভাপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ান রাহুল গান্ধীও। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে কংগ্রেস নতুন সভাপতি নির্বাচন করে। মল্লির্কাজুন খড়গে এখন কংগ্রেসের সভাপতি। কংগ্রেসে রাহুল গান্ধীর জনপ্রিয়তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। তরুণরা তাকেই সভাপতি হিসেবে রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে রাহুল তার পদত্যাগের সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন। বিএনপি ২০০৮-এর নির্বাচনে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। পরাজয়ের পরও খালেদা জিয়া দলের নেতৃত্বে থেকে সরে দাঁড়াননি। ২০১৪ সালে বিএনপির আন্দোলনের কৌশল ব্যর্থ হয়। পাঁচটি সিটি নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পরও বিএনপি কেন সংসদ নির্বাচন বর্জন করল—সেই প্রশ্নের উত্তর নেই। নেই জবাবদিহি। একইভাবে ২০১৫ সালের আন্দোলনেও বিএনপি শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হলো। এ নিয়েও দলে কোনো সমালোচনা নেই। নেই নেতৃত্বের পরিবর্তন। ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগেই দুটি দুর্নীতির মামলার দণ্ডিত হন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। যে কোনো গণতান্ত্রিক দলের নিয়ম হলো দুর্নীতির দায়ে কেউ দণ্ডিত হলে তিনি তার দলীয় পদে থাকার অধিকার হারান। বিএনপির গঠনতন্ত্রেও এমন বিধান ছিল। কিন্তু খালেদা জিয়া কারান্তরীণ হওয়ার আগেই কোনোরকম কাউন্সিল ছাড়াই তড়িঘড়ি করে গঠনতন্ত্রের বিধানটি বাতিল করা হয়। বিএনপির শীর্ষ দুই নেতাই দণ্ডিত। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির শোচনীয় বিপর্যয়ে পড়ে। এরপর দলের ভেতর কিছু আত্মসমালোচনা লক্ষ করা যায়। নেতৃত্ব পরিবর্তনের দাবি তোলেন অনেক নেতা। ‘জাতীয় ঐক্য ফ্রন্টে’ যোগদান, ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে নির্বাচন ইত্যাদি ‘ভুল’ সিদ্ধান্ত নিয়ে কথাবার্তা হয়। কিন্তু এত ভুলের পর একজন নেতাও পদত্যাগ করেননি। একজনও পদ হারাননি। এবারও বিএনপির আন্দোলন এবং নির্বাচন বর্জনের কৌশল ভুল প্রমাণিত হয়েছে। লন্ডন থেকে যে আন্দোলনের কর্মসূচি দেওয়া হয়েছিল, তা ছিল বাস্তবতা-বিবর্জিত। আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ নেতারা কি পদত্যাগ করবেন? তারা যদি পদত্যাগ করে নতুন নেতৃত্ব সামনে আনেন তাহলে বিএনপি মুক্ত হবে।

একটি মুক্ত রাজনৈতিক দলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো দলের ভেতর গণতন্ত্র চর্চা। দলের ভেতর কতটুকু গণতন্ত্র আছে তা বোঝা যায়, সাংগঠনিক বিন্যাসে, নিয়মিত সম্মেলনে। আট বছর ধরে বিএনপির কেন্দ্রীয় কাউন্সিল হয় না। দলের স্থায়ী কমিটিতে শূন্য পদ পূরণের কোনো উদ্যোগ নেই। প্রায় অর্ধেক জেলায় কমিটি নেই। অঙ্গ সহযোগী সংগঠনগুলো এখনো জেলায় জেলায় পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করতে পারেনি। এরকম অবস্থায় একটি দল কীভাবে চলছে, সেটাই এক বড় প্রশ্ন। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বিএনপির নীতিনির্ধারণী সংস্থা হলো স্থায়ী কমিটি। কিন্তু বিএনপির স্থায়ী কমিটি এখন অকার্যকর, অসম্পূর্ণ। একে তো স্থায়ী কমিটির পাঁচটি পদ খালি, অন্যদিকে যারা আছেন তাদের কয়েকজন অসুস্থ। দলীয় কাজকর্মে অংশগ্রহণের মতো অবস্থা তাদের নেই। স্থায়ী কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় না। সিদ্ধান্ত আসে লন্ডন থেকে। গত দুই বছর বিএনপির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এক ব্যক্তির ইচ্ছায় সবকিছু হচ্ছে। লন্ডন থেকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান যা নির্দেশ দিচ্ছেন, নেতারা বিনা প্রশ্নে তা প্রতিপালন করছেন। একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক, আলোচনা, সমালোচনার সুযোগ নেই বিএনপিতে। বিএনপির অনেক প্রবীণ নেতাই ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় স্বীকার করেন, বেগম জিয়া যখন দলের চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন করতেন তখন যে কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে তর্ক-বিতর্ক হতো। বেগম জিয়া কথা বলতেন কম, শুনতেন বেশি। এখন বিএনপিতে ঠিক উল্টো ধারা চলছে। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানই শুধু কথা বলেন, বাকিরা শোনেন এবং নির্দেশ প্রতিপালন করেন। যে কোনো রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব দিতে হয় সামনে থেকে। বাংলাদেশের বাস্তবতা, জনগণের মনোভাব ইত্যাদি অনুধাবন করার জন্য প্রয়োজন সার্বক্ষণিক নেতৃত্ব। বিএনপি এখন চলছে খণ্ডকালীন নেতৃত্বে। দূর থেকে পরিস্থিতি বিবেচনা না করেই দেওয়া হচ্ছে কর্মসূচি। এসব কর্মসূচি বুমেরাং হচ্ছে দলটির জন্য। বিএনপির ভেতরই গণতন্ত্রকে বন্দি করে রাখা হয়েছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নেই দলের ভেতর। ভিন্নমতকে দমন করা হচ্ছে কঠোরভাবে। বিএনপি কি এক ব্যক্তির ইচ্ছার কারাগার থেকে মুক্তি পাবে? বিএনপিতে অনেক পোড়খাওয়া ত্যাগী নেতা রয়েছেন। তাদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা প্রমাণিত, বাংলাদেশে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে যারা রাজনীতি করেছেন, জেল-জুলুম সহ্য করেছেন। এরকম কাউকে দলের নেতৃত্ব দিলে সমস্যা কোথায়? কেন দূর থেকে রিমোর্ট কন্ট্রোলে দল চালাতে হবে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে বিএনপিকেই।

বিএনপি যে আন্দোলনের কর্মসূচি পালন করছে, নির্বাচনে যাওয়ার বা বর্জনের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তা কি স্বাধীন চিন্তার ফসল নাকি কারও আশ্বাসে বিএনপি এসব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। দলটি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কতটা স্বাধীন, মুক্ত? ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত বিএনপি নিয়েছিল কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের পরামর্শে। বিএনপির অন্তত দুজন প্রয়াত নেতা একাধিক সাক্ষাৎকারে এরকম অভিযোগ করেছেন। তারা বলেছেন, বিএনপিকে নির্বাচন থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছিল কোনো বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা। বিএনপি নির্বাচন না করলেই ১৯৯৬ বা ২০০৭ সালের মতো ঘটনা ঘটবে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটবে—এমন নিশ্চিত আশ্বাস ছিল তাদের পক্ষ থেকে। আবার ২০১৮ সালে বিএনপিকে নির্বাচনে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল বিদেশি রাষ্ট্র। তাদের বুদ্ধিতেই ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে জোট করে বিএনপি। বিএনপির অনেক নেতাই এ সিদ্ধান্তে বিস্মিত ও হতবাক হয়েছিলেন। অনেকেই এ সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেননি। গত দুই বছর বিএনপি আন্দোলন করেছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের পরিস্থিতি দেখে। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে যেভাবে সরব হয়েছিল, তাতেই বিএনপি আশাবাদী হয়ে উঠেছিল। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মনোভাব দেখেই বিএনপির আন্দোলনের কর্মসূচি বেগবান হচ্ছিল। নিজেদের ইচ্ছা, লাভ-ক্ষতি হিসাব, প্রতিপক্ষের শক্তি কিংবা বিশ্ব মেরূকরণ ইত্যাদি কোনো কিছুই মাথায় নেয়নি দলটি। অনেক সময় মনে হয়েছে, বিএনপি বোধহয় পশ্চিমাদের ইচ্ছে পূরণের হাতিয়ার কিন্তু স্বাধীনভাবে দলের কৌশল নির্ধারণ না করলে যে শেষতক হতাশার সাগরে হাবুডুবু খেতে হয়, বিএনপির এবারের আন্দোলন তার প্রমাণ।

এখন বিএনপি নতুন করে হিসাব কষছে। অনেকে মনে করেন, দলের সিনিয়র নেতারা মুক্ত হয়েছেন, নিশ্চয়ই তারা নতুন করে আন্দোলন শুরু করবেন। আমার কিন্তু তা মনে হয় না। আমি মনে করি, বিএনপিকে আগে মুক্ত হতে হবে। দলে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। ব্যর্থদের সরে দাঁড়াতে হবে। নতুন নেতৃত্ব সামনে আনতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, বিএনপিতে মতপ্রকাশের, চিন্তার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা দিতে হবে। না হলে দল হিসেবে বন্দি বিএনপির মৃত্যু হবে নিজেদের তৈরি কারাগারেই। নেতারা মুক্ত হলো, বিএনপি কি মুক্ত হবে।


লেখক: নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত

ইমেইল: poriprekkhit@yahoo.com



মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

সাবেক বামদের প্ররোচনায় বিভ্রান্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র?

প্রকাশ: ১০:০০ পিএম, ২৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪


Thumbnail

বাংলাদেশ সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের এক ধরনের নেতিবাচক এবং বিভ্রান্তি মূলক মনোভাব তৈরি হয়েছিল। বাংলাদেশের মানবাধিকার, সুশাসন, আইনের শাসন ইত্যাদি নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অনেকগুলো নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেছিল। আর এই নেতিবাচক ধারণাগুলো প্রধান কারণ ছিল বাংলাদেশ সম্পর্কে তাদের ভুল তথ্য এবং বিভ্রান্তিমূলক তথ্য প্রাপ্তি। এই তথ্য প্রাপ্তির যে উৎসগুলো ছিল তার উৎসের একটি বড় অংশই দিয়েছিল ব্যাধিগ্রস্ত বামরা। 

সাবেক বাম হিসেবে পরিচিত যারা বামপন্থার বাল্য ব্যাধিতে আক্রান্ত, এখন তারা পুঁজিবাদের ধারক বাহক হয়েছেন এরকম কিছু উচ্চাভিলাষী দুর্বৃত্ত বাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এজেন্ট হিসাবে কাজ করেছিল এবং তাদের দেওয়া তথ্যগুলো ছিল বিভ্রান্তিমূলক। একাধিক সূত্র এই তথ্য জানিয়েছে যে, সমস্ত ব্যক্তিরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে গত দুই বছর ধরে অবিরল ধারায় সরকারের বিরুদ্ধে নানা রকম মিথ্যা, অসত্য ও ভিত্তিহীন তথ্য দিয়ে আসছিল। আর এই সমস্ত ব্যক্তিরা যে এখনও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ, বিশেষ করে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন দূতাবাসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ তার প্রমাণ পাওয়া গেল মার্কিন প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকের মধ্য দিয়ে। এই বৈঠকে যে কয়েকজনকে ডাকা হয়েছিল তারা সবাই পরিত্যক্ত বাম থেকে আসা নব্য পুঁজিবাদ এবং উদার গণতন্ত্রের ধারক বাহক হয়েছেন। অথচ তারা জীবনেও গণতান্ত্রিক ধারার প্রতি ন্যূনতম শ্রদ্ধা দেখেননি। 

গত দুই বছরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যাদের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করেছে, তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন  ইলিনয় স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আলী রীয়াজ। আলী রীয়াজ বাসদের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। এক সময় হয় বিপ্লবের মাধ্যমে সরকার পতন করে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন বিভ্রান্তি চোরাগলিতে আটকে গেছে। এখন তিনি বিশ্বের পুঁজিবাদের ধারক বাহক। আর এই সুযোগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ। বাংলাদেশের অনেক বিষয় নিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ করেন, নালিশ করেন, পরামর্শ দেন। সাবেক এই বাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা বিবেচনা করা যায়। 

আরেক বিভ্রান্ত বাম জিল্লুর রহমান। জিল্লুর রহমান মূলত আলী রীয়াজের শিষ্য হিসাবেই পরিচিত। বলা যায় যে বাংলাদেশে আলী রীয়াজের স্বার্থরক্ষাকারী। তিনি এখন সুশীল সমাজ হলেন কী ভাবে সে নিয়ে হাস্যকৌতুক সৃষ্টি হয়েছে বিভিন্ন মহলে। সাবেক এই বিভ্রান্ত বামও বাসদের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল। তার সঙ্গে জামাতেরও একটা গভীর সংযোগ রয়েছে। আর এই কারণেই মার্কিন দূতাবাসের কিছু বাঙালি কর্মকর্তার সাথে জিল্লুরের সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতার প্রমাণ পাওয়া যায়। 

আদিলুর রহমান খান: আদিলুর রহমান খান এক সময় বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী বাম ছিলেন। এই বামরাই গণবাহিনী তৈরি করেছিল। সন্ত্রাস, সহিংসতার রাজনীতি বাজারজাত করেছিল। আদিলুর রহমান খান এখন অধিকার নামে একটি বিতর্কিত মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা এবং এই সংগঠনটি নানা সময়ে অসত্য মিথ্যা, বিভ্রান্তিমূলক তথ্য দেওয়ার জন্য আলোচিত। বিশেষ করে ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতকে নিয়ে তথ্য প্রদানের ক্ষেত্রে অধিকারের ভূমিকা প্রশ্ন সৃষ্টি করেছে। 

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য: বাকি তিন জন চৈনিক বাম হলেও দেবপ্রিয় সোভিয়েত বাম ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নে তিনি পড়াশোনা করেছেন। কিন্তু বিভ্রান্ত হয়ে এখন তিনি বিশ্বে ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রবর্তক কিন্তু তিনি যে সমস্ত তথ্য উপাত্ত প্রদান করেন তা সবই ভুলে ভরা। কোন বৈজ্ঞান ভিত্তিক ডাটা বা গবেষণা তার নেই। তবে তাকে একজন কথক অর্থনীতিবিদ বলা হয়। মৌলিক কোন গবেষণা ছাড়া শুধুমাত্র জ্যোতিষীর মতো বিভিন্ন বিষয়ে ঢালাও মন্তব্য করার জন্য তিনি সমালোচিত বিতর্কিত। এই সমস্ত বামদের খপ্পর থেকে যদি ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস বেরিয়ে না আসে তাহলে সামনের দিনগুলোতে বাংলাদেশ-মার্কিন সম্পর্কের যে অংশীদারিত্বের ধারা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ঘোষণা করা হয়েছে তা কখনো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। মার্কিন দূতাবাসের উচিত অবিলম্বে নির্মোহ নিরপেক্ষ এবং দায়িত্বশীল সূত্রের সাথে একটা সুসম্পর্ক এবং সেতুবন্ধন তৈরি করা। তাহলেই বাংলাদেশ-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক নতুন মাত্রা পাবে।


সাবেক বাম   যুক্তরাষ্ট্র   আলী রীয়াজ   জিল্লুর রহমান   আদিলুর রহমান খান   দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

মৃত্যু বাংলাদেশে, সমাধি পাকিস্তানে

প্রকাশ: ১১:০০ পিএম, ২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪


Thumbnail

৮ ফেব্রুয়ারি ঘটনা বহুল নির্বাচনের পর পাকিস্তানের ‘দ্যা ন্যাশন’ পত্রিকার সম্পাদকীয় শিরোনাম ছিলো ‘ডেথ অফ কেয়ার টেকার গর্ভরমেন্ট সিস্টেম’ (তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার মৃত্যু)। সম্পাদকীয় শিরোনাম দেখে চমকিত হলাম। পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচন নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে দেশে-বিদেশে। এই বিতর্কিত নির্বাচন নিয়ে আরও কিছু দিন চর্চা হবে, নির্বাচনে নজির বিহীন কারচুপির পরও ইমরান খানের দল ভোট বিপ্লব ঘটিয়েছে। নওয়াজ আর বিলওয়ালের ঐক্য পাকিস্তানের জনগণ কতটা গ্রহণ করেছে? এই প্রথম সেনাবাহিনী নির্বাচনী পরিকল্পনায় হোঁচট খেয়েছে। পাকিস্তানে ভেস্তে গেছে মার্কিন পরিকল্পনা-ইত্যাদি নানা বিষয় নিয়ে বিভিন্ন জনের মত উঠে আসছে বিশ্বের গণমাধ্যমে। কিন্তু আমার চোখ আটকে আছে পাকিস্তানে কেয়ার টেকার সরকার ব্যবস্থার মৃত্যুর খবরে। তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার জন্ম হয়েছিল পাকিস্তানে। জামায়াতের তত্বাবধানে পাকিস্তান থেকে এই মডেল আমদানি করা হয়েছিল বাংলাদেশে। এক যুগ আগেই বাংলাদেশ তত্বাবধায়ক সরকারকে বিদায় দিয়েছে। পাকিস্তানি এই ‘গণতন্ত্রের মডেল’ অবশ্য বাংলাদেশে পাকিস্তান পন্থীরা এখনও আঁকড়ে ধরে আছে। এবার পাকিস্তানের নির্বাচনের পর বাংলাদেশে তত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষের উকিলরা কি বলবেন?  

বিশ্বে কেয়ার টেকার বা তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রবর্তক হলেন সামরিক একনায়ক জিয়াউল হক। ১৯৮৮ সালে মোহাম্মদ জুনেজুকে অপসারণ করেন। তার অনুগতদের মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দিয়ে যে নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করেন তার নাম দেন ‘কেয়ার টেকার সরকার’। সামরিক এক নায়কের আবিস্কৃত এই তত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি দেশটিতে স্থায়ী রূপ পায় ১৯৯০ সালের ৬ আগস্ট। পাকিস্তানে গোলাম মোস্তফা জাতুই প্রথম তত্বাবধায়ক সরকার প্রধান। তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের বাহ্যিক লক্ষ্য হিসেবে বলা হয়েছিল অবাধ, সুষ্ঠু এবং প্রভাবমুক্ত নির্বাচন আয়োজন নিশ্চিত করা। কিন্তু এর অর্ন্তনিহিত তাৎপর্য ছিলো নির্বাচনের পুরো নিয়ন্ত্রণ সেনাবাহিনীর কাছে রাখা। তত্বাবধায়ক সরকারের নামে একটি পুতুল সরকারকে নির্বাচনকালীন সময়ে ক্ষমতায় বসানো হয়। যার রিমোট কন্ট্রোল থাকে সেনাবাহিনীর সাথে। সেনাবাহিনী যাকে নির্বাচনে জেতাতে চায়-তত্বাবধায়ক সরকার এবং নির্বাচন কমিশন তাদের হয়ে কাজ করে এবং জিতিয়ে আনে। তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতার চিরস্থায়ী মালিকানা নেয় পাকিস্তানের সেনাবাহিনী। 

এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে ফ্যাসিষ্ট জামায়াত রাজনৈতিক দল হিসেবে মূলধারার রাজনীতিতে ফিরে এসেছিল। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের এক পর্যায়ে জামায়াত কৌশলে কেয়ার টেকার সরকারের পাকিস্তানি মডেল রাজনীতির মাঠে ছেড়ে দেয়। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির তখন প্রধান লক্ষ্য ছিলো এরশাদকে ক্ষমতা থেকে হটানো। জামায়াতের কেয়ার টেকার সরকারের অস্পষ্ট ধারণাকে পূর্ণতা দেয় আওয়ামী লীগ। পান্থপথের জনসভায় আওয়ামী লীগ সভাপতি তত্বাবধায়ক সরকারের এক পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা ঘোষণা করেন। ৭৫ এর পর বাংলাদেশের রাজনীতিও পাকিস্তানি ধারায় চলতে শুরু করে। ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নেয় সেনাবাহিনী। বার বার সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে পাঠানো হয় নির্বাসনে। রাজনীতিবিদ, আমলাদের চেয়ে সেনাবাহিনী হয়ে ওঠে অনেক বেশী ক্ষমতাবান। ঐ বাস্তবতায় গণতন্ত্রে উত্তরণে ‘তত্বাবধায়ক’ সরকার ছিলো একটি সাময়িক সমাধান। ৯১ এর নির্বাচনে বাংলাদেশে প্রথম তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু হয়। পাকিস্তানের কেয়ার টেকার সরকার ব্যবস্থার কয়েক মাস পর। কিন্তু শুরুতেই তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা গণতন্ত্রের মৌলিক চেতনাকে আঘাত করে। সংবিধান লঙ্ঘন করে। একজন প্রধান বিচারপতিকে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব দেয়া হয়। বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হয়ে প্রধান বিচারপতির পদ ছাড়েননি। উপরন্ত নির্বাচনের পর তাকে প্রধান বিচারপতি পদে ফেরাতে রাজনৈতিক দলগুলো সংবিধান সংশোধন পর্যন্ত করে। এটি নজির বিহীন অন্যায়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে সুশীল সমাজের সুপ্ত ক্ষমতার লোভ জাগ্রত হয়। তারা অনুভব করে, রাজনৈতিক দলগুলো এই তত্বাবধায়ক সরকারের মাধ্যমে একান্ত অনুগত রাখা যায়। 

৯১, ৯৬ এবং ২০০১ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের রাজনীতিতে সুশীল সমাজের প্রভাব বাড়ে। তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা আসলে এমন এক ব্যবস্থা যেখানে ৯০ দিনের জন্য বসা ক্ষমতাবানরা পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য জাতির ভাগ্য নির্ধারণ করে। এই ব্যবস্থায় নির্বাচন বাইরে থেকে সুন্দর পরিপাটি, ভেতরে পরিকল্পিত কারচুপি। তত্বাবধায়ক সরকার কাকে নির্বাচিত করতে চায়, তার একটি বার্তা তারা আগে থেকেই পায়। সুশীল এবং বিদেশী প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলো যার ব্যাপারে সবুজ সংকেত দেয়, নির্বাচনে তারই জয় হয়। বাংলাদেশে তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় বিরাজনীতিকরণ বাস্তবায়নে নতুন কৌশল নেয়া হয়। একটি রাজনৈতিক দল যেন পরপর দুবার ক্ষমতায় না আসে, সেটি নিশ্চিত করা হয় এই ব্যবস্থায়। বিএনপির পর আওয়ামী লীগ আবার বিএনপি। ৫ বছর পরপর ক্ষমতার পট পরিবর্তনের রীতি চালু হয়। একটি রাজনৈতিক দল, একটি সুনির্দিষ্ট কর্মসূচী এবং পরিকল্পনা নিয়ে ভোটে যায়। জয়ী হবার পর মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে সেই কর্মসূচী সম্পন্ন করা কিংবা তার ইতিবাচক ফলাফল জনগণের সামনে তুলে ধরা অসম্ভব। আবার বাংলাদেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের অবস্থান দুই মেরুতে। একটি দল সরকার গঠন করে যে সব উদ্যোগ গ্রহণ করে, অন্যদল পাঁচ বছর পর এসে সব বাতিল করে দেয়। ফলে কোন রাজনৈতিক দলের কর্মসূচীর ধারাবাহিকতা থাকে না। সুফল পায় না। কমিউনিটি ক্লিনিক কার্যক্রমের কথাই ধরা যাক। আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৭ সালে কমিউনিটি ক্লিনিক কার্যক্রম শুরু করে। প্রান্তিক জনগণ এর সুফল পেতে শুরু করার আগেই বিএনপি-জামায়াত জোট ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে কমিউনিটি ক্লিনিক বন্ধ করে দেয়। এরকম অনেক উদাহরণ দেয়া যায়। সে বিতর্কে আমি এখন যেতে চাই না। একটি সরকারের ধারাবাহিকতা না থাকলে, বাংলাদেশের মতো দেশ গুলোতে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকে না। এর ফলে গণতন্ত্র এবং রাজনৈতিক সরকারের ওপর জনগণের অনীহা তৈরী হয়। রাজনৈতিক সরকার গুলো দেশ পরিচালনায় দক্ষ নয়, এমন একটি মনোভাব সৃষ্টি হয়। এই পরিস্থিতির সুযোগ নেয়, অনির্বাচিত গোষ্ঠী। 

পাকিস্তানে কেয়ার টেকার পদ্ধতির মাধ্যমে যেমন রাষ্ট্র ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নেয় সেদেশের সেনাবাহিনী। ঠিক তেমনি বাংলাদেশে তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নেয় বিদেশী প্রভু এবং তাদের অনুগত সুশীল সমাজ। বাংলাদেশে তত্বাবধায়ক সরকারের কাঠামো করা হয় এমন ভাবে যে, তা আসলে সুশীলদের অনির্বাচিত সরকার। সংবিধান তাদের রুটিন কাজের দায়িত্ব দিলেও অপছন্দের দলকে হারাতে এরা সব কিছু করে। জনগণের ভোট নয়, তত্বাবধায়ক সরকারে কারা থাকছে তার ওপর নির্ভর করে নির্বাচনের ফলাফল। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এসে ক্ষমতায় থাকার এই সূত্রটি প্রথম আবিস্কার করে। তত্বাবধায়ক সরকার প্রধান হিসেবে বিচারপতি কে.এম. হাসানকে অভিষিক্ত করতে ক্ষমতাসীন জোট সংবিধান সংশোধন করে। তিন স্তরে দলীয় ক্যাডার দিয়ে প্রশাসন সাজায়। একটি প্রহসনের নির্বাচন কমিশন গঠন করে। দেড় কোটি ভুয়া ভোটার সৃষ্টি করা হয়। সার্বিক ভাবে এমন একটি আবরণ তৈরী করা হয় যে, নির্বাচন যেভাবেই হোক বিএনপি আবার ক্ষমতায় আসবে। বাংলাদেশে তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার মৃত্যু হয় তখনই। বিএনপি-জামায়াত জোট পুতুল রাষ্ট্রপতি ড. ইয়াজউদ্দিন আহমেদকে তত্বাবধায়ক সরকার প্রধান করে, এই ব্যবস্থার কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয়। রাজনৈতিক দলগুলোর অনঢ় অবস্থান, ক্ষমতায় টিকে থাকার উদগ্র বাসনা সুশীলদের জন্য অভাবনীয় সুযোগ সৃষ্টি করে। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনা সমর্থনে বাংলাদেশে একটি সুশীল কু সংগঠিত হয়। দুই বছর জগদ্দল পাথরের মতো চেপে থাকে অক্ষম, অযোগ্য একটি সুশীল সরকার। এসময় বাংলাদেশে তত্বাবধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে একটি জাতীয় ঐক্যমত তৈরী হয়। আওয়ামী লীগ-বিএনপি সবাই তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে কাঠগড়ায় দাড় করায়। সীমাহীন নানা সংকটের মুখে সুশীল সরকার একটি নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়। এসময় বাংলাদেশ সুপ্রীম কোট এক ঐতিহাসিক রায়ে তত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতিকে বাতিল ঘোষণা করে।

বাংলাদেশ সব কিছুতেই পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে। ৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের পর গত ৫২ বছরে বাংলাদেশ নানা ঘাতপ্রতিঘাত পেরিয়ে যতটা এগিয়েছে, পাকিস্তান ঠিক ততোটাই পিছিয়েছে। বিশ্বে বাংলাদেশ যতটা অনুকরণীয় সম্ভাবনাময় রাষ্ট্র, পাকিস্তান ঠিক ততোটাই বর্জনীয় ব্যর্থ রাষ্ট্র। পাকিস্তানিদের কেয়ার টেকার পদ্ধতি ডাষ্টবিনে ফেলে দিয়ে বাংলাদেশ প্রমাণ করেছে, গণতান্ত্রিক চেতনাতেও তারা পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে। কিন্তু বাংলাদেশে পাকিস্তানের প্রেত্মাত্বারা এখনও সজাগ, সক্রিয়। সর্বোচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তের পরও কেউ কেউ তত্বাবধায়ক সরকার পূণ:বহালে দাবী করে আসছে। ২০১৪ সালে এই দাবীতে বিএনপি নির্বাচন বর্জন করে। এর পেছনে ছিলো পাকিস্তানপন্থীদের ভুল রাজনৈতিক হিসেব। ২০২৪ সালে নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি ২০১৪ সালের চেয়েও বড় ভুল করে। সুশীলরা কেন তত্বাবধায়ক সরকার চায়, তা সহজেই বোঝা যায়। এর মাধ্যমে জনরায় ছাড়াই সুশীলরা ক্ষমতার হালুয়া রুটির ভাগ পায়। কিন্তু বিএনপি কেন তত্বাবধায়ক সরকার চায় তা অনুভব করতে হলে দলটির জন্ম ও মনস্তত্ব বুঝতে হবে। বিএনপি মূলত: পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের গর্ভজাত সন্তান। বাংলাদেশে পাকিস্তানের স্বার্থ সংরক্ষণই দলটির প্রধান এজেন্ডা। গভীর মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, পাকিস্তানে যখন সেনাবাহিনী তরতাজা থাকে, তখন বিএনপির মধ্যেও তেজী ভাব লক্ষ্য করা যায়। এখন অর্থনেতিক সংকটে জর্জরিত পাকিস্তান। নিজের দেশেই কোণঠাসা পাকিস্তানের সেনাবাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থা। বিএনপিকে তারা চাঙ্গা করবে কিভাবে। পাকিস্তানে অস্থিরতা মানেই বিএনপি পথ হারা। পাকিস্তান যত দেউলিয়া এবং ব্যর্থ হবে ততোই বিএনপি ক্ষয়িষ্ণুও হবে। এটাই সমীকরণ। পাকিস্তানের বহুল আলোচিত, বিতর্কিত নির্বাচনের পর সেদেশের তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রশ্নের মুখে। সাধারণ গণতন্ত্রকামী মানুষ এই ব্যবস্থাকে সেনাবাহিনীর ‘পুতুল’ বলছে। পাকিস্তানে যদি গণতন্ত্র অব্যাহত রাখতে হয় তাহলে সেখানে কেয়ার টেকার পদ্ধতি বাতিল করতেই হবে। পাকিস্তানে তত্বাবধায়ক সরকার বাতিল হলে, বাংলাদেশের সুশীলরা কি করবে? কি করবে বিএনপি-জামায়াত? তত্বাবধায়ক সরকারের মৃত্যুতে তারা একটি শোক প্রস্তাব নিতেই পারে। যে ব্যবস্থাটি গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর, সেই ব্যবস্থা বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে চায় কারা? নিশ্চয়ই গণতন্ত্রের শত্রুরা।

সৈয়দ বোরহান কবীর, নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত
poriprekkhit@yahoo.com


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে হেভিওয়েট নেতাকে আনা হচ্ছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে?

প্রকাশ: ১০:০০ পিএম, ২০ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪


Thumbnail

সরকারের এখন সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ দ্রব্যমূল্য। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের জন্য একের পর এক পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার। বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে কথা বলছে, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এখন দম ফেলার সময় নেই। তারা বিভিন্ন রকমের উদ্যোগ, কর ছাড়, শুল্ক ছাড় সহ নানামুখী পদক্ষেপ নিচ্ছে। কিন্তু তারপরও এখন পর্যন্ত তারা দ্রব্যমূল্যে লাগাম টেনে ধরতে পারেনি। দ্রব্যমূল্যের লাগাম টেনে ধরাই সরকারের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। 

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও বলেছেন, তার সরকার বসে নেই। দ্রব্যমূল্য মূল্য নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকার চেষ্টা করে যাচ্ছে। রমজান আসতে অল্পদিন বাকি রয়েছে। এর মধ্যে যদি দ্রব্যমূল্যকে সহনীয় না রাখা যায়, অন্তত স্থিতিশীল রাখা না যায় তাহলে পরিস্থিতি সামনের দিকে খারাপ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এরকম বিষয়টি নিয়ে সরকারের নীতি নির্ধারক মহলে আলোচনা হচ্ছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মতো একটা স্পর্শকাতর মন্ত্রণালয়ে একজন তরুণ প্রতিমন্ত্রীকে দেওয়াটা কতটুকু নিরাপদ এবং যুক্তিসঙ্গত সেটি নিয়েও কোন কোন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। 

নতুন প্রতিমন্ত্রী অবশ্য যথেষ্ট পরিশ্রম করছেন এবং আগের পূর্ণমন্ত্রীর চেয়ে এখন পর্যন্ত তিনি সংযত এবং তার দৃশ্যমান চেষ্টা লক্ষণীয়। কিন্তু বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং বাজারে যারা বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী আছে তাদের সঙ্গে দর কষাকষি করে তাদের লাভের লাগাম টেনে ধরার মতো কঠিন কাজটা একজন আওয়ামী লীগের তরুণ নেতার পক্ষে কতটুকু সম্ভব এ নিয়ে কোন কোন মহলে ব্যাপক প্রশ্ন উঠেছে। আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারক মহলেও এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এই কারণেই দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে একজন হেভিওয়েট নেতাকে দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে এমন গুঞ্জন রয়েছে। 

আওয়ামী লীগের মধ্যে আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র বলছে, আওয়ামী লীগের প্রায় সবাই মনে করেন যে, মন্ত্রিসভায় আছেন বা মন্ত্রিসভার বাইরে আছেন এমন একজন ব্যক্তি গুরুত্বপূর্ণ জনপ্রিয় নেতাকে এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কারণ এই মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের সাথে কথাবার্তা বলতে হয়, তাদের সঙ্গে দর কষাকষি করতে হয় এবং একজন রাজনৈতিক নেতার পক্ষে এটাই যতটা সহজ অন্য কারও পক্ষে ততটা সহজ নয়। 

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা তোফায়েল আহমেদের উদাহরণ দিয়েছেন। দুই মেয়াদে তোফায়েল আহমেদ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন এবং এসময় দ্রব্যমূল্যকে নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রে তিনি যথেষ্ট সফল ছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সঙ্গে তার সুসম্পর্ক থাকাটাকে তিনি কাজে লাগিয়েছিলেন। আর অন্যদিকে টিপু মুনশি এবং ২০০৮ এর আংশিক সময়ে ফারুক খান এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হিমশিম খেয়েছেন, রীতিমতো ব্যর্থ হয়েছেন। 

ফারুক খানকে একটা পর্যায়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে দেওয়া হলেও টিপু মুনশি পাঁচ বছর ধরে এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করে সরকারের এবং নিজের বদনাম করেছেন মাত্র। এখন দলের যদি কোন সিনিয়র নেতাকে এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় তাহলে সরকারের পক্ষ থেকে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকার যে কতটা আগ্রহী এবং সর্বাত্মক সেরকম একটি বার্তা দেওয়া সম্ভব হবে। 

বিভিন্ন মহল মনে করেন এখন যারা মন্ত্রিসভায় আছেন তাদের মধ্যে অন্তত তিনজন আছেন যারা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের চেহারা দৃশ্যমান ভাবে পালন করতে পারবেন। আবার অনেকে মনে করেন মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হননি এমন কোন নেতারাও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়ে চালাতে পারবেন। তবে কোন টেকনোক্র্যাট বা আমলা নন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে একজন জনপ্রিয় গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিবিদের আসা উচিত বলে মনে করেন অধিকাংশ সাধারণ মানুষ।

দ্রব্যমূল্য   বাণিজ্য মন্ত্রণালয়  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

চুক্তির ভারে নুয়ে পড়েছে প্রশাসন

প্রকাশ: ০৫:০০ পিএম, ১৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪


Thumbnail

আরও একজন সচিব চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেলেন। রেলওয়ের সচিব ড. মোঃ হুমায়ুন কবীরের চাকরির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি। তার আগেই গত ১৫ ফেব্রুয়ারি তাকে এক বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সচিব হিসেবে ড. মোঃ হুমায়ুন কবীর খুব একটা দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন, এমন কোন প্রমাণ নেই। জনমনে তার কোন কর্মকাণ্ড নিয়ে উচ্ছ্বাস-উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে, এমন কোন দৃষ্টান্তও নেই। ছাত্রজীবনে তার রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তার সহকর্মীরা অনেকেই দাবি করেন যে, তিনি ছাত্রজীবনে বিরুদ্ধ মতের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তারপরও রেলপথ মন্ত্রণালয়ে তিনি আরও এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেলেন। এর ফলে মোট সচিবদের প্রায় অর্ধেকই এখন চুক্তিতে নিয়োগ পেয়েছেন। সচিবালয়ে এ নিয়ে তোলপাড় চলছে। 

একজন সচিব চুক্তিতে নিয়োগ পেলে অন্তত এক ডজন ব্যক্তির পদোন্নতি রুদ্ধ হয়ে যায়। এখন ১৫তম ব্যাচ সচিব হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। প্রশাসন ক্যাডারের অনেকগুলো ব্যাচ রয়েছে যারা এখনও পর্যন্ত পদোন্নতির অপেক্ষায় আছেন। তাছাড়া ১০, ১১ এবং ১৩ ব্যাচের অনেক যোগ্য কর্মকর্তা রয়েছেন যারা সচিব হওয়ার অপেক্ষায়। এই পর্যায়ে নির্বাচনের পর পর নতুন সরকার রেলওয়ের সচিবকে কোন যোগ্যতায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিলেন তা নিয়ে সচিবালয়ে বিস্ময় সৃষ্টি হয়েছে। 

বর্তমানে প্রশাসনের শীর্ষ সব কর্মকর্তাই চুক্তিতে নিয়োগপ্রাপ্ত। আর এই চুক্তির কারণে চিলে চ্যাপটা হয়েছে প্রশাসন। চুক্তির ভারে প্রশাসন যান এখন চলতে ফিরতে পারছে না। 

বর্তমানে যে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা চুক্তিতে আছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোঃ মাহবুব হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মোঃ তোফাজ্জল হোসেন মিয়া, প্রধানমন্ত্রীর এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক মো. আখতার হোসেন, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ বা এনবিআরের চেয়ারম্যান আবু হেনা মোঃ রহমাতুল মুনিম, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মাসুদ বিন মোমেন, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চলের নির্বাহী চেয়ারম্যান সিনিয়র সচিব পদমর্যাদায় শেখ ইউসুফ হারুন, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান লোকমান হোসেন মিয়া, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব তপন কান্তি ঘোষ, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব গোলাম মোঃ হাসিবুল আলম, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব কে এম আব্দুস সালাম, জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব জনাব মোস্তাফিজুর রহমান, রাষ্ট্রপতির সচিব সম্পদ বড়ুয়া, রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে সংযুক্ত ওয়াহিদুল ইসলাম খান, বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারম্যান প্রদীপ রঞ্জন চক্রবর্তী, বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত সচিব জনাব মোকাম্মেল হোসেন, ইরাকে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ফজলুল বারী, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের চেয়ারম্যান এ বি এম আজাদ, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরী, গৃহায়ন পূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিন, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান যিনি সচিব পদমর্যাদায় আছেন জনাব মো. আনিসুর রহমান মিয়া। 

এছাড়াও এডিবির বিকল্প নির্বাহী পরিচালক ফাতেমা ইয়াসমিন এবং বিশ্ব ব্যাংক ওয়াশিংটন থেকে সদ্য পদত্যাগ করা প্রধানমন্ত্রী সাবেক মূখ্য সচিব ড. আহমেদ কায়কাউস এখন চুক্তির তালিকায় রয়েছেন। কারণ, ড. কায়কাউসের পদত্যাগপত্র বিশ্ব ব্যাংকের বোর্ডসভায় এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত অনুমোদিত হয়নি। 

গুরুত্বপূর্ণ সব মন্ত্রণালয়সহ সচিবদের অর্ধেকই এখন চুক্তিতে নিয়োগপ্রাপ্ত। আর এই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের হিড়িকে মেধাবী-দক্ষ কমকর্তারা পিছিয়ে পড়ছেন। নতুন করে হুমায়ুন কবীরের চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া নিয়ে সচিবালয়ে প্রশ্ন উঠেছে, বিতর্ক উঠেছে, বিষয়টি সমালোচিত হচ্ছে।

চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ   প্রশাসন  


মন্তব্য করুন


বিজ্ঞাপন