এডিটর’স মাইন্ড

রাজনীতির মাঠে আবার ‘ভারত কার্ড’

প্রকাশ: ১১:০০ পিএম, ০২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪


Thumbnail

৭ জানুয়ারির নির্বাচনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি মেরুকরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিএনপির নেতৃত্বে নির্বাচন বর্জনকারী দলগুলো ভারত বিরোধিতায় মুখর হয়েছে। বিএনপির শীর্ষ নেতারা প্রায় সবাই ভারতের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলছেন। ‘ভারতের আর্শীবাদে’ এই সরকার টিকে আছে এমন বক্তব্য দিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. মঈন খান। রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, এই সরকার জনগণের নয়, ভারত-রাশিয়া-চীনের সরকার।’ বিএনপির চেয়ে একধাপ এগিয়ে তার মিত্র রাজনৈতিক দল গুলো। গণঅধিকার পরিষদের নেতা নুর ভারতীয় পণ্য বর্জনের আহ্বান জানিয়েছেন এক অনুষ্ঠানে। আর জুনায়েদ সাকী তো রীতিমতো ভারতকে হুমকি দিয়েছেন। 

দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি ভারত বিরোধী আবহ তৈরীর চেষ্টা চলছে। নির্বাচন এবং নতুন সরকার গঠিত হবার পর কিছু কিছু ঘটনা সাধারণ মানুষের নজর এড়ায়নি। যশোরের বেনাপোল সীমান্তে বিএসএফের গুলীতে প্রাণ হারিয়েছেন বিজেপির সিপাহী মোহাম্মদ রইশুদ্দিন। ভারত পেঁয়াজ রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, এই সুযোগে পেঁয়াজের দাম সেঞ্চুরি স্পর্শ করেছে। দ্রব্যমূল্য নিয়ে সাধারণ মানুষের যখন নাভিশ্বাস অবস্থা তখন ভারতের বিভিন্ন পন্যের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে আরো নাজুক করেছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে এর ফলে ভারত সম্পর্কে এক ধরনের নেতিবাচক মনোভাব তৈরী হচ্ছে। এই সুযোগটাই কাজে লাগাচ্ছে বিএনপি-জামায়াত। দীর্ঘ দুই দশক পর আবার বাংলাদেশে ভারত বিরোধি রাজনৈতিক আবহ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘ভারত বিরোধিতা’ এক জনপ্রিয় কৌশল। ৭৫ এর পর ভারত বিরোধিতার আড়ালে আসলে সাম্প্রদায়িকতা এবং ধর্মান্ধতাকে উস্কে দেয়ার এক হিংস্র প্রবণতা শুরু হয়। মূলত: মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তি পরিকল্পিত ভাবে সাধারন জনগণকে ভারত বিরোধিতায় উস্কে দেয়। এর পেছনে শুধু যে পাকিস্তানপন্থি রাজাকার এবং যুদ্ধাপরাধীরা ছিলো তা নয়, বাংলাদেশে ভারত বিদ্ধেষ ছড়াতে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই বিপুল অর্থ ব্যয় করে। রাজনীতিতে ভারত বিরোধিতার আরেক উদ্দেশ্য ছিলো আওয়ামী লীগকে ঠেকানো। ৭৫ এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে নির্মমভাবে স্বপরিবারে হত্যা করা হয়েছিল আসলে বাংলাদেশকে আবার পাকিস্তান বানানোর ষড়যন্ত্র থেকেই। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরও আওয়ামী লীগকে নি:শেষ করা যায়নি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা চিরতরে ধ্বংস করা যায়নি। এর প্রধান এবং একমাত্র কারণ শেখ হাসিনা। ১৯৮১ সালের ১৭ মে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দিতে তিনি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। এসময় শেখ হাসিনাকে ঠেকাতে ভারত বিরোধিতার নতুন রূপ আত্মপ্রকাশ করে। আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনাকে ‘ভারতের দালাল’ হিসেবে চিত্রিত করে স্বাধীনতা বিরোধি শক্তি রাজনীতির মাঠে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে কোণঠাসা করার কৌশল গ্রহণ করে। 

৭৫ এর পরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে দুটি সমান্তরাল ধারা সৃষ্টি হয়। একটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে, স্বাধীনতার পক্ষে। এই ধারার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ। অন্যটি স্বাধীনতা বিরোধি ধারা, যার নেতৃত্বে বিএনপি। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে মানেই ‘ভারতের দালাল’ এরকম একটি পরিকল্পিত অপপ্রচার চালানো হয় খুব কৌশলে। জামায়াত সহ স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তি এই অপপ্রচারে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিজয়, বাংলাদেশের অভ্যুদয়কেই প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছে। যেমনটি জামায়াত এবং যুদ্ধাপরাধী গোষ্ঠী ৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় করেছিল। জামায়াত ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধকে ভারতীয় আগ্রাসণ এবং আধিপত্যবাদ হিসেবে প্রচার করেছিল। ৭৫ এর পর ভারত বিরোধিতার আড়ালে ছিলো মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয়কে অস্বীকার করার চেষ্টা। বিএনপি সহ মুক্তিযুদ্ধে বিরোধী এই সব রাজনৈতিক দলগুলোর ভারত বিরোধি এজেন্ডা বাস্তবায়নের পেছনে মদদ দাতা ছিলো পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই। তারা ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের প্রশিক্ষণের ঘাটি বানায় বাংলাদেশে। বাংলাদেশকে ব্যবহার করে ভারতকে অস্থির করে তোলার চেষ্টা চলে।

৮১ সালের পর থেকে আওয়ামী লীগ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন নতুন করে শুরু করে। ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে জিয়ার নিহত হবার পর মঞ্চে আসেন এরশাদ। ততদিনে বাংলাদেশে ভারত বিরোধী একটি আবহ তৈরী হয়ে গেছে। ভারত নিয়ে এরশাদ দ্বিমূখী অবস্থান নেন। মুখে ভারত বিরোধিতা আর গোপনে ভারতের অনুগ্রহ লাভ এটাই ছিলো এরশাদের নীতি। এরশাদের ক্ষমতা দখলের পরপরই আওয়ামী লীগ অবৈধ সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন শুরু করে। এই আন্দোলনের মাধ্যমেই আওয়ামী লীগের পূণ:জাগরণ ঘটে। কিন্তু এসময়ে আওয়ামী লীগের কিছু নেতার মধ্যে আদর্শিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। অনেক নেতাই অসাম্প্রদায়িক চেতনার বদলে নিজেদের কট্টর মুসলমান প্রমানের চেষ্টা করেন। অনেক নেতাই টিকে থাকার জন্য প্রকাশ্যে ভারত বিরোধিতা নীতি গ্রহণ করেন। আওয়ামী লীগ মানেই ভারতের অন্ধ সমর্থক এই ভাবনা ভুল প্রমাণের চেষ্টা দেখা যায় আওয়ামী লীগের অনেক নেতার মধ্যে। ৮২ থেকে ৯০ দীর্ঘ- ৯ বছরে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে আবারও ঘুরে দাঁড়ায় আওয়ামী লীগ। ‘কিন্তু আওয়ামী লীগ ভারতীয় অনুগত’ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে দেশ ভারতের দখলে চলে যাবে’-এরকম সমালোচনা এবং অপপ্রচারের হাত থেকে আওয়ামী লীগ মুক্তি পায়নি। বরং ৯১ এর নির্বাচনে বিএনপি এবং জামায়াতের প্রধান হাতিয়ার ছিলো এসব বক্তব্য। বেগম জিয়া ঐ নির্বাচনে প্রায় সব জনসভায় বলেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে দেশ ভারতের দখলে চলে যাবে। ফেনী পর্যন্ত ভারত দখল করবে।’ এসব গোয়েবলীয় মিথ্যাচার অনেক মানুষ বিশ্বাস করেছে। ৯১ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয়ের যে সব কারণ ছিলো তার মধ্যে নি:সন্দেহে ‘ভারত কার্ড’ অন্যতম। জিয়া-এরশাদের অনুসরনে বেগম জিয়াও মুখে ভারত বিরোধিতা আর গোপনে ভারতের কাছে নি:শর্ত আপোষের নীতি অনুসরন করেন।

তবে ৯০ এর দশকে এসে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে ভারত বিরোধিতার উত্তাপ কমতে শুরু করে। এর পেছনে বৈশ্বিক, আঞ্চলিক এবং দ্বিপাক্ষিক ইস্যু জড়িত ছিলো। বিশ্বের দরজা খুলে যায়। তরুণরা বুঝতে পারে ভারত বিরোধিতা অর্থহীন। রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের ব্যর্থতা আর ভারতের গণতান্ত্রিক বিকাশ মানুষের ভুল ভাঙ্গতে সাহায্য করে। স্যাটেলাইট যুগে ভারতীয় চলচ্চিত্র, গান বাংলাদেশে জনপ্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করে। অবাধ বাণিজ্যের যুগে আস্তে আস্তে আমরা ভারত নির্ভর হতে থাকি। ঘুম থেকে উঠে ভারতীয় কোলগেটে দাঁত ব্রাশ থেকে রাতে ভারতীয় গান শুনে ঘুমানোর মাধ্যমে আমাদের চৈতন্যে ভারত বাসা বাঁধে। চিকিৎসার জন্য ভারতে যাওয়া, উচ্চশিক্ষায় ভারত মুখী হবার প্রবণতা বাড়তে থাকে। এসবই জনগণকে ভারত বিদ্ধেষ থেকে বের করে আনে। এসময় ভারতও বাংলাদেশ নিয়ে আরও মনোযোগী হয়। ভারত বিরোধীতা বন্ধ, বাংলাদেশে ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের তৎপরতা দমনের জন্য প্রতিবেশী দেশটি বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দল গুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে উদ্যোগ নেয়। শুধু আওয়ামী লীগ নির্ভরতা থেকে সরে আসার ফলে রাজনীতির মাঠে ভারত বিরোধী আওয়াজ কমে যায়। আস্তে আস্তে ভারতীয় দূতাবাসের আড্ডায় জামায়াতের নেতাদেরও সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু ৭১ এর পরীক্ষিত বন্ধু ভারত এসব করে তেমন লাভবান হয়নি। মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো প্রকাশ্যে ভারত বিরোধিতা বন্ধ করলেও, গোপনে পাকিস্তানের স্বার্থ রক্ষার কাজটিই করে। বিশেষ করে বাংলাদেশের সীমান্ত অঞ্চল গুলো ভারতীয় বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অভায়ারন্যে পরিণত হয়। এমনকি ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের তৎপরতা অব্যাহত থাকে। এই বাস্তবতায় ভারত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আরও মনোযোগী হয়। 

২০০১ এর নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোটকে ক্ষমতায় আনতে ভারতের ভূমিকা ছিলো ওপেন সিক্রেট। এসময় বাংলাদেশে ভারতীয় কূটনীতির মূল প্রতিপাদ্য ছিলো-ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে আগ্রহী, বিশেষ কোন দলের সঙ্গে নয়। ২০০১ সালে বাংলাদেশে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এবং পাকিস্তানের আইএসআই এক সাথে মিলে বিএনপিকে ক্ষমতায় আনে। কিন্তু এটা যে ভারতের ভুল কূটনীতিত ছিলো এটা বুঝতে তাদের বেশী সময় লাগেনি। মুখে ভারত বন্দনা করলেও বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় এসে পাকিস্তানি এজেন্ডা বাস্তবায়ন শুরু করে। ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অস্ত্র এবং অর্থ সরবরাহের প্রধান রূটে পরিণত হয় বাংলাদেশ। ১০ ট্রাক অস্ত্রের ঘটনা তার বড় প্রমাণ। এরকম পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ বিরাজনীতিকরণের পক্ষে অবস্থান নেয় ভারত। আওয়ামী লীগ-বিএনপিকে বাদ দিয়ে সুশীলদের প্রতি হাত বাড়ায় বিশ্ব ক্রমশ: প্রভাবশালী হয়ে ওঠা দেশটি। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নকে সঙ্গে নিয়ে ২০০৭ সালে অনির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতায় আনতে এক-এগারো ঘটানোর ক্ষেত্রে ভারত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু গণতান্ত্রিক ধারায় বিশ্বাসী, বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশটি বুঝতে পারে এধরনের অনির্বাচিত সরকার জনগণের আস্থা অর্জনে অক্ষম। 

২০০৮ সাল থেকেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের ভূমিকা এবং প্রভাব প্রকাশ্য। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নও আঞ্চলিক স্থিতিশীলততার স্বার্থে এই অঞ্চলের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার দায়িত্ব ভারতের ওপর অর্পণ করে। এই সময় বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বেশ কিছু ঘটনা এঅঞ্চলে ভারতের প্রভাব বাড়িয়ে দেয়। প্রথমত; অর্থনীতিতে ভারতের বড় সাফল্য আসে। বিশ্বে প্রভাবশালী ও ক্ষমতাধর দেশ হিসেবে হিসেবে সামনে দাঁড়ায় দেশটি। দ্বিতীয়ত, ভারতের প্রধান শত্রু পাকিস্তান ক্রমশ একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রের দিকে ধাবিত হতে থাকে। দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা এবং লণ্ঠনতন্ত্র পাকিস্তানকে দেউলিয়া রাষ্ট্রের দ্বার প্রান্তে নিয়ে যায়। দেশটি শীর্ষ পর্যায়ের অসততা এবং মিথ্যাচার আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতাও নষ্ট করে দেয়। ভারতের চেয়ে যোজন যোজন দুর পিছিয়ে যাওয়া পাকিস্তান প্রতিযোগিতা করার সামর্থ্য টুকুও হারায়। তৃতীয়ত, চীনকে ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের ভারত নির্ভরতা বাড়ে। সব কিছু মিলিয়ে বিশ্বে অন্যতম প্রভাবশালী এবং ক্ষমতাধর রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের উত্থান ঘটে। এর ফলে বাংলাদেশে ভারতের প্রভাব বাড়ে। অন্যদিকে ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ ভারতের সাথে আস্থা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক স্থাপনে উদ্যোগী হয়। ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাফ বলে দেন বাংলাদেশের মাটি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের, সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করতে দেয়া হবে না। এটাই দুদেশের সম্পর্কের টার্নিং পয়েন্ট। দুই দেশ অমীমাংশিত সমস্যা গুলো সমাধানের উদ্যোগ নেয়। আস্থা আর বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরী করে। এ অবস্থায় ভারত যেমন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার নামে আওয়ামী লীগকেই ক্ষমতায় দেখতে চায়। তেমনি আওয়ামী লীগেরও ভারত নির্ভরতা বাড়ে। এবারের নির্বাচনের আগে বাংলাদেশ নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ মনোযোগ ছিলো। আওয়ামী লীগের ব্যাপারে তাদের নেতিবাচক অবস্থান ছিলো খোলামেলা। মার্কিন ভূমিকাকে নিস্ক্রিয় করতে ভারত প্রকাশ্য অবস্থান নিয়েছিল। এনিয়ে তারা কোন লুকোচুরি করেনি। ৭ জানুয়ারির নির্বাচন করার ক্ষেত্রে ভারতের ভূমিকা কোন গোপন বিষয় নয়। ভারতের এই অবস্থান প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ নিয়ে তারা আর কোন এক্সপেরিমেন্টে যেতে চায় না। ভারতের জন্যই বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু ভারতকেও বুঝতে হবে, বাংলাদেশের জনগণ স্বাধীনতা প্রিয়। রক্ত দিয়ে তারা এই দেশ স্বাধীন করেছে। ভারতের সঙ্গে এদেশের জনগণ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চায়। জনগণ ভারতের ৭১ এর ভূমিকার জন্য স্মরণ করে। বাংলাদেশের উন্নয়নে ভারতের অবদানকে স্বীকার করে। কিন্তু ভারতকে ‘বিগ ব্রাদার’ হিসেবে দেখতে চায় না। ভারতের কর্তৃত্ব পছন্দ করে না। সীমান্ত হত্যা, হুটহাট পেঁয়াজ, চিনি রপ্তানির নিষেধাজ্ঞার মতো স্পর্শকাতর ভারতীয় সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জনগণের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। জনগণের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করে। ভারতকে মনে রাখতে হবে, জনগণের সঙ্গে সম্পর্কটাই আসল। মালদ্বীপ, নেপাল এবং শ্রীলঙ্কার জনগণ কেন ভারত বিরোধী হয়ে উঠলো, তার কারণ নিশ্চয়ই ভারতের থিঙ্ক ট্যাঙ্করা গবেষণা করেছেন। বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে যেন এরকম মনোভাব তৈরী না হয় সেজন্য ভারতকে সচেতন থাকতে হবে। বাংলাদেশের জনগণকে আবার ভারত বিদ্বেষী করার চেষ্টা চলছে। ২০০৯ থেকে এপর্যন্ত সীমান্তে ৩০০ জনের বেশী বাংলাদেশী মারা গেছে। সীমান্ত হত্যা বন্ধের জন্য কম কথা হয়নি। আশ্বাসও অনেক দেয়া হয়েছে। তারপরও কেন এসব হচ্ছে। ফেলানী কিংবা রইশুদ্দিনের মৃত্যু সারাদেশের মানুষকে ক্ষুদ্ধ করে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সব সময় বলেন ‘প্রতিবেশী প্রথম।’ সব কিছু বদলে ফেলা যায়, কিন্তু প্রতিবেশী বদলানো যায় না। প্রতিবেশী যদি প্রথম হবে তাহলে সংকটে কেন প্রতিবেশী পাশে দাঁড়াবে না। বাংলাদেশ রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার আওতায় না এলে ভারতের কি ক্ষতি? বাংলাদেশীরা কেন ই-ভিসা পাবে না? সীমান্ত হত্যা কেন বন্ধ হবে না এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে ভারতকেই। ভারত আমাদের পরীক্ষিত বন্ধু। কিন্তু বিশ্বের এই ক্ষমতাধর দেশকে বাংলাদেশের জনগণের হৃদয় জয় করতে হবে বন্ধুত্ব দিয়েই, ‘দাদাগিরি’ করে নয়।

সৈয়দ বোরহান কবীর, নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত
ই-মেইল: poriprekkhit@yahoo.com


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে হেভিওয়েট নেতাকে আনা হচ্ছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে?

প্রকাশ: ১০:০০ পিএম, ২০ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪


Thumbnail

সরকারের এখন সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ দ্রব্যমূল্য। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের জন্য একের পর এক পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার। বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে কথা বলছে, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এখন দম ফেলার সময় নেই। তারা বিভিন্ন রকমের উদ্যোগ, কর ছাড়, শুল্ক ছাড় সহ নানামুখী পদক্ষেপ নিচ্ছে। কিন্তু তারপরও এখন পর্যন্ত তারা দ্রব্যমূল্যে লাগাম টেনে ধরতে পারেনি। দ্রব্যমূল্যের লাগাম টেনে ধরাই সরকারের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। 

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও বলেছেন, তার সরকার বসে নেই। দ্রব্যমূল্য মূল্য নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকার চেষ্টা করে যাচ্ছে। রমজান আসতে অল্পদিন বাকি রয়েছে। এর মধ্যে যদি দ্রব্যমূল্যকে সহনীয় না রাখা যায়, অন্তত স্থিতিশীল রাখা না যায় তাহলে পরিস্থিতি সামনের দিকে খারাপ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এরকম বিষয়টি নিয়ে সরকারের নীতি নির্ধারক মহলে আলোচনা হচ্ছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মতো একটা স্পর্শকাতর মন্ত্রণালয়ে একজন তরুণ প্রতিমন্ত্রীকে দেওয়াটা কতটুকু নিরাপদ এবং যুক্তিসঙ্গত সেটি নিয়েও কোন কোন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। 

নতুন প্রতিমন্ত্রী অবশ্য যথেষ্ট পরিশ্রম করছেন এবং আগের পূর্ণমন্ত্রীর চেয়ে এখন পর্যন্ত তিনি সংযত এবং তার দৃশ্যমান চেষ্টা লক্ষণীয়। কিন্তু বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং বাজারে যারা বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী আছে তাদের সঙ্গে দর কষাকষি করে তাদের লাভের লাগাম টেনে ধরার মতো কঠিন কাজটা একজন আওয়ামী লীগের তরুণ নেতার পক্ষে কতটুকু সম্ভব এ নিয়ে কোন কোন মহলে ব্যাপক প্রশ্ন উঠেছে। আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারক মহলেও এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এই কারণেই দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে একজন হেভিওয়েট নেতাকে দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে এমন গুঞ্জন রয়েছে। 

আওয়ামী লীগের মধ্যে আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র বলছে, আওয়ামী লীগের প্রায় সবাই মনে করেন যে, মন্ত্রিসভায় আছেন বা মন্ত্রিসভার বাইরে আছেন এমন একজন ব্যক্তি গুরুত্বপূর্ণ জনপ্রিয় নেতাকে এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কারণ এই মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের সাথে কথাবার্তা বলতে হয়, তাদের সঙ্গে দর কষাকষি করতে হয় এবং একজন রাজনৈতিক নেতার পক্ষে এটাই যতটা সহজ অন্য কারও পক্ষে ততটা সহজ নয়। 

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা তোফায়েল আহমেদের উদাহরণ দিয়েছেন। দুই মেয়াদে তোফায়েল আহমেদ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন এবং এসময় দ্রব্যমূল্যকে নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রে তিনি যথেষ্ট সফল ছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সঙ্গে তার সুসম্পর্ক থাকাটাকে তিনি কাজে লাগিয়েছিলেন। আর অন্যদিকে টিপু মুনশি এবং ২০০৮ এর আংশিক সময়ে ফারুক খান এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হিমশিম খেয়েছেন, রীতিমতো ব্যর্থ হয়েছেন। 

ফারুক খানকে একটা পর্যায়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে দেওয়া হলেও টিপু মুনশি পাঁচ বছর ধরে এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করে সরকারের এবং নিজের বদনাম করেছেন মাত্র। এখন দলের যদি কোন সিনিয়র নেতাকে এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় তাহলে সরকারের পক্ষ থেকে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকার যে কতটা আগ্রহী এবং সর্বাত্মক সেরকম একটি বার্তা দেওয়া সম্ভব হবে। 

বিভিন্ন মহল মনে করেন এখন যারা মন্ত্রিসভায় আছেন তাদের মধ্যে অন্তত তিনজন আছেন যারা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের চেহারা দৃশ্যমান ভাবে পালন করতে পারবেন। আবার অনেকে মনে করেন মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হননি এমন কোন নেতারাও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়ে চালাতে পারবেন। তবে কোন টেকনোক্র্যাট বা আমলা নন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে একজন জনপ্রিয় গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিবিদের আসা উচিত বলে মনে করেন অধিকাংশ সাধারণ মানুষ।

দ্রব্যমূল্য   বাণিজ্য মন্ত্রণালয়  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

চুক্তির ভারে নুয়ে পড়েছে প্রশাসন

প্রকাশ: ০৫:০০ পিএম, ১৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪


Thumbnail

আরও একজন সচিব চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেলেন। রেলওয়ের সচিব ড. মোঃ হুমায়ুন কবীরের চাকরির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি। তার আগেই গত ১৫ ফেব্রুয়ারি তাকে এক বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সচিব হিসেবে ড. মোঃ হুমায়ুন কবীর খুব একটা দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন, এমন কোন প্রমাণ নেই। জনমনে তার কোন কর্মকাণ্ড নিয়ে উচ্ছ্বাস-উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে, এমন কোন দৃষ্টান্তও নেই। ছাত্রজীবনে তার রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তার সহকর্মীরা অনেকেই দাবি করেন যে, তিনি ছাত্রজীবনে বিরুদ্ধ মতের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তারপরও রেলপথ মন্ত্রণালয়ে তিনি আরও এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেলেন। এর ফলে মোট সচিবদের প্রায় অর্ধেকই এখন চুক্তিতে নিয়োগ পেয়েছেন। সচিবালয়ে এ নিয়ে তোলপাড় চলছে। 

একজন সচিব চুক্তিতে নিয়োগ পেলে অন্তত এক ডজন ব্যক্তির পদোন্নতি রুদ্ধ হয়ে যায়। এখন ১৫তম ব্যাচ সচিব হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। প্রশাসন ক্যাডারের অনেকগুলো ব্যাচ রয়েছে যারা এখনও পর্যন্ত পদোন্নতির অপেক্ষায় আছেন। তাছাড়া ১০, ১১ এবং ১৩ ব্যাচের অনেক যোগ্য কর্মকর্তা রয়েছেন যারা সচিব হওয়ার অপেক্ষায়। এই পর্যায়ে নির্বাচনের পর পর নতুন সরকার রেলওয়ের সচিবকে কোন যোগ্যতায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিলেন তা নিয়ে সচিবালয়ে বিস্ময় সৃষ্টি হয়েছে। 

বর্তমানে প্রশাসনের শীর্ষ সব কর্মকর্তাই চুক্তিতে নিয়োগপ্রাপ্ত। আর এই চুক্তির কারণে চিলে চ্যাপটা হয়েছে প্রশাসন। চুক্তির ভারে প্রশাসন যান এখন চলতে ফিরতে পারছে না। 

বর্তমানে যে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা চুক্তিতে আছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোঃ মাহবুব হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মোঃ তোফাজ্জল হোসেন মিয়া, প্রধানমন্ত্রীর এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক মো. আখতার হোসেন, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ বা এনবিআরের চেয়ারম্যান আবু হেনা মোঃ রহমাতুল মুনিম, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মাসুদ বিন মোমেন, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চলের নির্বাহী চেয়ারম্যান সিনিয়র সচিব পদমর্যাদায় শেখ ইউসুফ হারুন, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান লোকমান হোসেন মিয়া, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব তপন কান্তি ঘোষ, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব গোলাম মোঃ হাসিবুল আলম, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব কে এম আব্দুস সালাম, জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব জনাব মোস্তাফিজুর রহমান, রাষ্ট্রপতির সচিব সম্পদ বড়ুয়া, রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে সংযুক্ত ওয়াহিদুল ইসলাম খান, বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারম্যান প্রদীপ রঞ্জন চক্রবর্তী, বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত সচিব জনাব মোকাম্মেল হোসেন, ইরাকে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ফজলুল বারী, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের চেয়ারম্যান এ বি এম আজাদ, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরী, গৃহায়ন পূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিন, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান যিনি সচিব পদমর্যাদায় আছেন জনাব মো. আনিসুর রহমান মিয়া। 

এছাড়াও এডিবির বিকল্প নির্বাহী পরিচালক ফাতেমা ইয়াসমিন এবং বিশ্ব ব্যাংক ওয়াশিংটন থেকে সদ্য পদত্যাগ করা প্রধানমন্ত্রী সাবেক মূখ্য সচিব ড. আহমেদ কায়কাউস এখন চুক্তির তালিকায় রয়েছেন। কারণ, ড. কায়কাউসের পদত্যাগপত্র বিশ্ব ব্যাংকের বোর্ডসভায় এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত অনুমোদিত হয়নি। 

গুরুত্বপূর্ণ সব মন্ত্রণালয়সহ সচিবদের অর্ধেকই এখন চুক্তিতে নিয়োগপ্রাপ্ত। আর এই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের হিড়িকে মেধাবী-দক্ষ কমকর্তারা পিছিয়ে পড়ছেন। নতুন করে হুমায়ুন কবীরের চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া নিয়ে সচিবালয়ে প্রশ্ন উঠেছে, বিতর্ক উঠেছে, বিষয়টি সমালোচিত হচ্ছে।

চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ   প্রশাসন  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

ড. ইউনূসই কি আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ১৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪


Thumbnail

সাড়ে তিন মাস কারাভোগের পর গত ১৫ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পান বিএনপির শীর্ষ দুই নেতা। মির্জা ফখরুল-আমীর খসরুর মুক্তির দিনে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশের প্রধান খবর ছিল ড. ইউনূস। ওইদিন সকালে গ্রামীণ কল্যাণ অফিসে গিয়ে ড. ইউনূস অভিযোগ করেন, তার আটটি প্রতিষ্ঠান জবরদখল হয়েছে। নির্বাচনের পর বিএনপির চেয়ে বেশি আলোচনায় শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস। শ্রম আদালতের একটি মামলায় তিনি ছয় মাসের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন। অর্থ পাচার ইস্যুতে তার বিরুদ্ধে চার্জশিট দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন। আদালতের অনুমতি ছাড়া তার বিদেশযাত্রার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। সর্বশেষ ‘গ্রামীণ কল্যাণ’কে তার আসল মালিক ‘গ্রামীণ ব্যাংকে’র কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এসব আইনি প্রক্রিয়া স্বাভাবিক এবং সহজাত। কিন্তু ড. ইউনূস এবং তার দেশি-বিদেশি বন্ধুরা এটিকে আক্রোশ হিসেবেই মনে করছেন। ড. ইউনূস প্রসঙ্গে উদ্বেগ জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। ড. ইউনূসের প্রথম স্ত্রীর কন্যা সিএনএনকে এক সাক্ষাৎকারে সরকারের সঙ্গে সমঝোতার যে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, সেটিও সরকার আমলে নেয়নি। ড. ইউনূস ক্রমেই আন্তর্জাতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছেন। ৭ জানুয়ারির নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সরকার বিএনপির ব্যাপারে যত উদার ও নমনীয়, ড. ইউনূসের ব্যাপারে ততই কঠোর, কঠিন। আওয়ামী লীগের এ কৌশলের রাজনৈতিক তাৎপর্য অনুধাবন করাটা জরুরি। সরকার বিএনপি বা অন্য বিরোধী দলের চেয়ে ড. ইউনূসের ব্যাপারে বেশি মনোযোগী কেন? নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর থেকে আওয়ামী লীগের পরিবর্তিত এই রাজনৈতিক কৌশল থেকে সরকারের আসল প্রতিপক্ষ কে তার একটা ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কাগজে-কলমে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ জাতীয় পার্টি। সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দলই ক্ষমতাসীনদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু মাত্র ১১ জন সংসদ সদস্য নিয়ে জাতীয় পার্টি নিজেই নিজেদের বিরোধী দল ভাবতে লজ্জা পায়। জাতীয় পার্টির যে অবস্থা তাতে তাদের পক্ষে সরকারকে চ্যালেঞ্জ জানানো অসম্ভব। ছায়া সরকার গঠনের মতো সদস্যও তাদের সংসদে নেই। আওয়ামী লীগের অনুগ্রহ নিয়েই তারা বেঁচে আছে। সংসদের বাইরে আওয়ামী লীগের একমাত্র রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি এবং তার মিত্ররা। নির্বাচন এবং নতুন সরকার গঠনের পরও বিএনপি আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েই চলেছে। লিফলেট বিতরণ, কালো পতাকা কর্মসূচি নিয়ে দলটি হতাশা আর ব্যর্থতার বৃত্ত থেকে বেরোনোর চেষ্টা করছে। ২৮ অক্টোবরের পর বিএনপির বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। অনেকেই ছিলেন পলাতক। নির্বাচনের পর তারা কারাগার এবং আত্মগোপন থেকে বেরিয়ে আসছেন। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও মুক্তি পেয়েছেন। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটি নতুন করে আন্দোলন শুরু করতে চায়। কিন্তু ভুল কৌশল এবং ব্যর্থ নেতৃত্বের কারণে এখন বিএনপি পথহারা। নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা। দলের সাংগঠনিক অবস্থা শোচনীয়। দলের ভেতর থেকেই এখন ব্যর্থ নেতৃত্বের সরে দাঁড়ানোর দাবি উঠেছে। বিদেশি বন্ধুরা আগের মতো বিএনপিকে আশা-ভরসা দিচ্ছে না। সবকিছু মিলিয়ে দলটি এলোমেলো, বিধ্বস্ত, বিপর্যস্ত। এই বিএনপি আওয়ামী লীগকে এখনই চাপে ফেলতে পারে—এমনটি তাদের নেতারাও আশা করেন না। গত বৃহস্পতিবার মির্জা ফখরুল ও আমীর খসরু মাহমুদের মুক্তিতে কর্মীরা কিছুটা হলেও উজ্জীবিত। কিন্তু মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একটি নতুন সরকারের বিরুদ্ধে চটজলদি বড় আন্দোলন গড়ে তুলতে পারবেন না। সামনে রমজান, তারপর ঈদুল আজহা, এরপর বর্ষাকাল। আগামী কিছুদিন আন্দোলনের সময় নয়। আওয়ামী লীগ বুঝেশুনেই বিএনপিকে দল গোছানোর সুযোগ দিয়েছে। বিএনপির নেতাদের মুক্তির ব্যাপারেও সরকার উদার। নির্বাচনী কৌশলে বিএনপিকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেছে আওয়ামী লীগ। এখন বিএনপির প্রতি আওয়ামী লীগের এক ধরনের উপেক্ষা এবং করুণা লক্ষ করা যায়। বিএনপি এখন আওয়ামী লীগের ভয়ংকর শত্রু না। বরং বিএনপি ধুঁকে ধুঁকে বাঁচলে আওয়ামী লীগের লাভ। না হলে দেশ রাজনীতিশূন্য হবে। জঙ্গিবাদ ও উগ্র সন্ত্রাসী শক্তির উত্থান ঘটবে। বিএনপির সঙ্গে কথার বাহাস না করলে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই বেকার হয়ে যাবেন। বিএনপির বলয়ের বাইরে যেসব বাম ও উগ্র ডান কট্টর মৌলবাদী দলগুলো আছে, তাদের শক্তি সম্পর্কে আওয়ামী লীগ ভালোভাবেই অবগত। ইসলামী দলগুলো বশীভূত রাখার কৌশলও আওয়ামী লীগ রপ্ত করেছে বহু আগেই। নির্বাচনের আগে যেমনটি মনে করা হয়েছিল যে আন্তর্জাতিক চাপ আসবে। একতরফা নির্বাচন সরকারকে চাপে ফেলবে, সেটি হয়নি। বাংলাদেশের ব্যাপারে ভারতের বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। নতুন সরকারের সঙ্গে অংশীদারত্বের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বার্তা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। ফ্রান্স, যুক্তরাজ্যের অভিনন্দন আওয়ামী লীগকে করেছে চাপমুক্ত। নিষেধাজ্ঞা, স্যাংশন নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের চেহারায় যে আতঙ্কের চাপ দেখা যেত, সেটাও এখন নেই।

দ্রব্যমূল্য, অর্থনীতি ছাড়া এ সরকারের সামনে দৃশ্যত কোনো সংকট নেই। আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষরা এখন বাঘ থেকে বিড়ালে পরিণত হয়েছে। দেশে টানা চতুর্থবারের মতো ক্ষমতায় আসা দলটিকে চ্যালেঞ্জ জানানোর কেউ নেই। একজন ছাড়া, তিনি ড. ইউনূস। আওয়ামী লীগ সভাপতি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দূরদর্শী রাজনীতিবিদ। আওয়ামী লীগ যে টানা ক্ষমতায় আছে তার প্রধান কারণ শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা। তার রাজনৈতিক কৌশলেই বেগম খালেদা জিয়া এবং বিএনপি ধরাশায়ী হয়েছে। তিনি দূর ভবিষ্যৎ দেখতে পান। শত্রু-মিত্র চিনতে খুব একটা ভুল করেন না। শেখ হাসিনা জানেন তাকে এবং আওয়ামী লীগকে যদি কেউ চাপে ফেলতে পারে সেটা ড. ইউনূস। বাংলাদেশে রাজনৈতিক আন্দোলন করে সরকার পতনের দিন শেষ হয়ে গেছে বহু আগেই। মানুষ এখন ভীষণ আত্মকেন্দ্রিক। চায়ের আড্ডায় কিংবা টকশো দেখে ড্রইংরুমেই তারা রাজা-উজির মারেন। রাস্তায় গিয়ে আন্দোলন করতে আগ্রহী নন। তরুণ প্রজন্ম রাজনীতিবিমুখ। তাই নব্বইয়ের মতো আন্দোলন বাংলাদেশে এখন অলীক কল্পনা। হত্যা-ক্যু-ষড়যন্ত্র করে সরকার হটানো এখন অসম্ভব। আমাদের সশস্ত্র বাহিনী এখন পেশাদার, আন্তর্জাতিক মানের। তারা পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর মতো সবকিছুতে নাক গলায় না। তা ছাড়া সংবিধানের ‘৭ক’ অনুচ্ছেদের মাধ্যমে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের পথ চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পেছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতা দখল করলে, একদিন তাকে কাঠগড়ায় ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ হিসেবে দাঁড়াতেই হবে। সরকারকে একমাত্র চাপে ফেলতে পারে বিদেশি শক্তি। যুক্তরাষ্ট্র এবং তার পশ্চিমা মিত্ররা যে বাংলাদেশের মতো একটি রাষ্ট্রে কী করতে পারে তা তো আমরা প্রতিনিয়তই দেখছি। গত দুই বছর মার্কিন চাপে আওয়ামী লীগ রীতিমতো আতঙ্কে ছিল। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি নিজেই বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যে কোনো দেশে ক্ষমতার ওলটপালট ঘটাতে পারে।’ তিনি মার্কিন চাপ সম্পর্কে এটাও বলেছিলেন, ‘তারা হয়তো চায় না আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকুক।’ দেশে দেশে মার্কিন স্বার্থরক্ষায় নিজস্ব ব্যক্তি রয়েছেন। এসব ব্যক্তির প্রভাব মার্কিন নীতিনির্ধারকদের মধ্যে প্রবল। এমনই একজন ড. ইউনূস। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ খেতাবপ্রাপ্ত। হিলারি ও বিল ক্লিনটন তাকে নোবেল পাইয়ে দিয়েছেন, এই তথ্য বিল ক্লিনটন তার লেখা বইতেই স্বীকার করেছেন। বয়সের কারণে যখন ড. ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ হারান, তখন হিলারি যেভাবে ড. ইউনূসের পক্ষে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, তাতেই বোঝা যায় ড. ইউনূস তাদের কত আপন। তিনি এবং তার অনুসারীরা সুযোগ পেলেই আওয়ামী লীগকে বেকায়দায় ফেলতে চান—এমন অভিযোগ আওয়ামী লীগ সবসময়ই করে। বাংলাদেশে একটি দীর্ঘমেয়াদি অনির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতায় বসানোর মূল পরিকল্পনা ড. ইউনূস ও তার বন্ধুদের। সুশীল গোষ্ঠী ক্ষমতায় বসলে বঙ্গোপসাগর, সেন্টমার্টিন, তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের ঠিকাদারি সব পাবে যুক্তরাষ্ট্র। তাই কখনো প্রকাশ্যে বা কখনো গোপনে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের নিরন্তর চেষ্টা চালান ড. ইউনূসের নেতৃত্বে সুশীল সমাজ। এর সংঘবদ্ধ রূপ ছিল ২০০৭ সালের এক-এগারো। ২০০৬ সালে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পরপরই ড. ইউনূস বাংলাদেশে মার্কিন এজেন্ডা বাস্তবায়নে মাঠে নেমেছিলেন। প্রথমে রাজনৈতিক দল করে তিনি ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু ড. ইউনূস ঝানু ব্যবসায়ী। সুদ-আসলের হিসাব তিনি ভালো বোঝেন। জনগণের ভোটে জেতা তার পক্ষে অসম্ভব এটা বুঝতে তিনি সময় নেননি। এরপরই আসে এক-এগারো। অনেকেই মনে করেন, এক-এগারোর মাস্টারপ্ল্যান ড. ইউনূসের মস্তিষ্কপ্রসূত। মঈন ইউ আহমেদের আত্মজীবনীমূলক ‘শান্তি স্বপ্নে, সময়ের স্মৃতিচারণ’ গ্রন্থে ড. ইউনূসের উচ্চাভিলাষের একঝলক প্রমাণ পাওয়া যায়। বইটির ৩২৮ ও ৩২৯ পৃষ্ঠায় মঈন ইউ লিখেছেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান হওয়ার অনুরোধ জানিয়ে তিনি (মঈন) ড. ইউনূসকে ফোন করেছিলেন। উত্তরে শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশকে তিনি যেমন দেখতে চান সেরকম বাংলাদেশ গড়তে খণ্ডকালীন সময় যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশকে তিনি আরও দীর্ঘ সময় ধরে সেবা দিতে চান।’ তিনি নিজে অনির্বাচিত সরকারপ্রধান না হয়ে ড. ফখরুদ্দীন আহমদকে এ দায়িত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন। ড. ইউনূসের দীর্ঘমেয়াদে দেশ সেবার মহাপরিকল্পনা এখনো বাতিল হয়নি। ক্লিনটন পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সূত্রে ড. ইউনূস মার্কিন নীতিনির্ধারকদেরও ঘনিষ্ঠ হয়েছেন। জাতিসংঘেও তার প্রভাব রয়েছে। এই ঘনিষ্ঠতা তিনি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে একাধিকবার কাজেও লাগিয়েছেন। বিশেষ করে পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন বন্ধে ড. ইউনূসের ভূমিকার কথা আওয়ামী লীগ প্রকাশ্যেই অভিযোগ করে। যদিও ড. ইউনূস তা অস্বীকার করেন। কিন্তু বাংলাদেশের প্রতি তার একধরনের অবজ্ঞা, উপেক্ষা সবসময়ই দেখা যায়। শান্তিতে নোবেলজয়ী এই ব্যক্তি কখনো শহীদ মিনারে প্রভাতফেরিতে যান না। ৭১-এর বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করতে তাকে দেখিনি। এমনকি বন্যা, খরা দুর্বিপাকে তিনি নীরব। সামান্য সমবেদনা জানানোর সৌজন্যতাও দেখাননি। বাংলাদেশের প্রতি তার তাচ্ছিল্যের প্রকাশ পাওয়া যায় দেশের আইনকানুনকে তোয়াক্কা না করার মধ্য দিয়ে। ড. ইউনূস ছিলেন যুগ্ম সচিব পদমর্যাদায় গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। এ চাকরিতে যখন তিনি যোগ দেন, তখনই জানতেন অবসরের বয়স কত। কিন্তু বয়স অতিক্রান্ত হওয়ার পরও তিনি দায়িত্বে বহাল ছিলেন। গ্রামীণ ব্যাংককে তিনি ব্যবহার করেছেন পারিবারিক প্রতিষ্ঠানের মতো। গ্রামীণ ব্যাংকের মাধ্যমে এবং এই ব্যাংকের টাকাতেই গ্রামীণ কল্যাণ গঠন করা হয়। ১৯৯৬ সালের ২৫ এপ্রিল গ্রামীণ ব্যাংকের বোর্ড সভায় ‘গ্রামীণ কল্যাণ’ গঠনের প্রস্তাব আনা হয়। প্রস্তাবে বলা হয়, গ্রামীণ ব্যাংকের সদস্য ও কর্মীদের কল্যাণে ‘কোম্পানি আইন ১৯৯৪’-এর আওতায় গ্রামীণ কল্যাণ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গঠন করা। গ্রামীণ ব্যাংকের বোর্ড সভা এ প্রস্তাব অনুমোদন করে। এটি গ্রামীণ ব্যাংকেরই অঙ্গ প্রতিষ্ঠান। গ্রামীণ কল্যাণ যে গ্রামীণ ব্যাংকেরই শাখা প্রতিষ্ঠান, তা আরও স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় এর মূলধন গঠন প্রক্রিয়ায়। গ্রামীণ কল্যাণে গ্রামীণ ব্যাংকের সোশ্যাল অ্যাডভান্সমেন্ট ফান্ড (এসএএফ) থেকে ৬৯ কোটি টাকা প্রদান করা হয়। গ্রামীণ কল্যাণের মেমোরেন্ডাম অব আর্টিকেলেও গ্রামীণ ব্যাংকের সঙ্গে এর সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মেলে। মেমোরেন্ডাম অব আর্টিকেল অনুযায়ী গ্রামীণ কল্যাণের ৯ সদস্যের পরিচালনা পরিষদের ২ জন সদস্য গ্রামীণ ব্যাংকের মনোনীত প্রতিনিধি। এ ছাড়া গ্রামীণ কল্যাণের চেয়ারম্যান হবেন গ্রামীণ ব্যাংকের মনোনীত প্রতিনিধি। গ্রামীণ ব্যাংকের মনোনীত প্রতিনিধি হিসেবে ড. ইউনূস গ্রামীণ কল্যাণের চেয়ারম্যান হন। গ্রামীণ কল্যাণের মাধ্যমে তিনি গড়ে তোলেন একাধিক প্রতিষ্ঠান।

তাই ড. ইউনূস গ্রামীণ কল্যাণের মালিক হন কীভাবে? গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠানই তিনি এতদিন অবৈধভাবে দখল করেছিলেন। ড. ইউনূস মনে করেছিলেন, তিনি প্রচণ্ড ক্ষমতাবান, আইনের ঊর্ধ্বে। যুক্তরাষ্ট্র তার পক্ষে। বিশ্বে সব দেশেই তিনি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তাই অবলীলায় রাষ্ট্রীয় সম্পদ দখল করে নিজের পৈতৃক সম্পত্তির মতো ব্যবহার করেছেন। গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ হারিয়ে ড. ইউনূস সারা বিশ্বে তুলকালাম করেছিলেন। এখন শ্রম আদালতের দণ্ড, দুর্নীতির মামলা আর গ্রামীণ কল্যাণের ঘটনায় তিনি নিশ্চয়ই সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবেন। আওয়ামী লীগের আসল প্রতিপক্ষ এখন ড. ইউনূসই।

 

লেখক: নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত

ইমেইল: poriprekkhit@yahoo.com


কারাভোগ   বিএনপি   আন্তর্জাতিক  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ

প্রকাশ: ১১:০০ পিএম, ১৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪


Thumbnail

গ্রামীণ কল্যাণ নিয়ে ড. ইউনূস এবং গ্রামীণ ব্যাংকের মধ্যে এখন কথার বাহাস চলছে। ড. ইউনূস দাবি করেছেন ‘গ্রামীণকল্যাণ’ তার প্রতিষ্ঠান। এটি ‘জবর দখল’ করা হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেছেন। অন্যদিকে ‘গ্রামীণ ব্যাংক’ আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন করে তথ্য প্রমাণ দিয়ে জানিয়েছে গ্রামীণ কল্যাণ তাদের।

ড. ইউনূস যখন আর্তনাদ করেন, তখন তার সাথে তার বন্ধুরাও কোরাস করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হোমড়া চোমড়া ব্যক্তি, জাতিসংঘের মহাসচিব ড. ইউনূস প্রসঙ্গে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সবকিছু দেখে শুনে মনে হতেই পারে, সরকার এবং রাষ্ট্র তার প্রতি অবিচার করছে। ড. ইউনূস সংবাদ সম্মেলনে যেভাবে কথা বলছিলেন, তাতে মনে হচ্ছিল তিনি নির্যাতিত। আসলে কার বক্তব্য সত্য? ‘গ্রামীণ কল্যাণ’ আসলে কার?

১৯৮৩ সালের ৪ সেপ্টেম্বর সরকার গ্রামীণ ব্যাংক অধ্যাদেশ নামে একটি অধ্যাদেশ (অধ্যাদেশ নম্বর-৪৬) জারি করে। সে সময়ে গ্রামীণ ব্যাংক শুরু হয় মাত্র তিন কোটি টাকা মূলধন দিয়ে। এরমধ্যে বেশিরভাগ টাকা অর্থাৎ ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা ছিল সরকারের এবং ১ কোটি ২০ লাখ টাক ছিল ঋণ গ্রহীতাদের।
 
অর্থাৎ গ্রামীণ ব্যাংকে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ব্যক্তিগত কোনো টাকা ছিল না। অথচ গ্রামীণ ব্যাংককে ব্যবহার করেই ড. ইউনূস পেয়েছেন সবকিছু। কাগজে কলমে গ্রামীণ ব্যাংকের মালিক সরকার এবং ঋণ গ্রহীতা জনগণ। কিন্তু ‘অসাধারণ’ মেধায় রাষ্ট্র ও জনগণের অর্থ ড. ইউনূস পুরে ফেলেন তার পকেটে। গ্রামীণ ব্যাংকের টাকায় ড. মুহাম্মদ ইউনূস গড়ে তুলেছেন নিয়ন্ত্রণাধীন ২৮টি প্রতিষ্ঠান এবং গ্রামীণ ব্যাংক তথা সরকারের টাকা আত্মসাৎ করে তিনি এখন হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন।
 
গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দাতা গোষ্ঠী অনুদান এবং ঋণ দেয় গ্রামীণ ব্যাংককে। অনুদানের সব অর্থ যদি রাষ্ট্র এবং জনগণের কাছে যায় তাহলে ড. ইউনূসের লাভ কি? তাই দাতাদের অনুদানের অর্থ দিয়ে গঠন করলেন সোশ্যাল ভেনচার ক্যাপিটাল ফান্ড (এসভিসিএফ)। ১৯৯২ সালের ৭ অক্টোবর ওই ফান্ড দিয়ে আলাদা একটি প্রতিষ্ঠান গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
 
১৯৯৪ সালে ‘গ্রামীণফান্ড’ নামের একটি লিমিটেড কোম্পানি গঠন করা হয়। তাতে ওই ফান্ডের ৪৯ দশমিক ১০ কোটি টাকা স্থানান্তর করা হয়। গ্রামীণ ব্যাংক দেখিয়ে বিদেশ থেকে টাকা এনে তা সরিয়ে ফেলার চেষ্টা ছিল শুরু থেকেই। গ্রামীণ ব্যাংক সরকারি প্রতিষ্ঠান হলেও ড. ইউনূস প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে সব সিদ্ধান্ত একাই নিতেন। পরিচালনা পর্ষদ এমনভাবে গঠন করা হয়েছিল, যাতে কেউ ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে কথা না বলেন। ড. ইউনূস এই সুযোগটিই কাজে লাগান।
  
১৯৯৩ সালের ১৯ ডিসেম্বর গ্রামীণ ব্যাংকের ৩৪তম বোর্ড সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় সিদ্ধান্ত হয় দাতা গোষ্ঠীর অনুদানের অর্থ এবং ঋণ দিয়ে সোশ্যাল এডভান্সমেন্ট ফান্ড (এসএএফ) গঠন করা হবে। কিন্তু দাতারা গ্রামীণব্যাংক থেকে এভাবে অর্থ সরিয়ে ফেলার আপত্তি জানায়। দাতারা সাফ সাজিয়ে দেন, এভাবে অর্থ স্থানান্তর জালিয়াতি। এবার ভিন্ন কৌশল গ্রহণ করেন ড. ইউনূস।
 
২৫ এপ্রিল ১৯৯৬ সালে গ্রামীণ ব্যাংকের বোর্ড সভায় ‘গ্রামীণকল্যাণ’ গঠনের প্রস্তাব আনেন। প্রস্তাবে বলা হয়, গ্রামীণ ব্যাংকের সদস্য ও কর্মীদের কল্যাণে‘ কোম্পানি আইন ১৯৯৪’ এর আওতায় গ্রামীণকল্যাণ নামের একটি প্রতিষ্ঠান গঠন করা হবে। গ্রামীণ ব্যাংকের বোর্ড সভা এই প্রস্তাব অনুমোদন করে। এটি গ্রামীণ ব্যাংকেরই অঙ্গ প্রতিষ্ঠান। গ্রামীণ কল্যাণ যে গ্রামীণ ব্যাংকেরই শাখা প্রতিষ্ঠান, তা আরও স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় এর মূলধন গঠন প্রক্রিয়ায়।
 
গ্রামীণকল্যাণ-এ গ্রামীণ ব্যাংকের সোশ্যাল এডভ্যান্সমেন্ট ফান্ড (এসএএফ) থেকে ৬৯ কোটি টাকা দেয়া হয়। গ্রামীণ কল্যাণের মেমোরেন্ডাম অব আর্টিকেলে ও গ্রামীণ ব্যাংকের সঙ্গে এর সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মেলে। মেমোরেন্ডাম আব আর্টিকেল অনুযায়ী গ্রামীণ কল্যাণের ৯ সদস্যের পরিচালনা পরিষদের ২ জন সদস্য গ্রামীণ ব্যাংকের মনোনীত প্রতিনিধি। এছাড়াও গ্রামীণকল্যাণের চেয়ারম্যান হবেন গ্রামীণ ব্যাংকের মনোনীত প্রতিনিধি।
 
সে অনুযায়ী গ্রামীণ ব্যাংকের মনোনীত প্রতিনিধি হিসেবে ড. ইউনূস গ্রামীণ কল্যাণের চেয়ারম্যান হন। এরপরে গ্রামীণকল্যাণ হয়ে ওঠে ড. ইউনূসের ‘সোনার ডিম পাড়া রাজহাঁস’। গ্রামীণ কল্যাণের মাধ্যমে তিনি গড়ে তোলেন একাধিক প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- ১.গ্রামীণ টেলিকম লিমিটেড ২. গ্রামীণ ডিস্ট্রিবিউশন লিমিটেড ৩. গ্রামীণশিক্ষা ৪. গ্রামীণ নিটওয়্যার লিমিটেড ৫. গ্রামীণব্যবস্থা বিকাশ ৬. গ্রামীণ আইটিপার্ক ৭. গ্রামীণ ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট ৮. গ্রামীণ সলিউশন লিমিটেড ৯. গ্রামীণ ডানোন ফুডস লিমিটেড ১০. গ্রামীণ হেলথ কেয়ার সার্ভিসেস লিমিটেড ১১. গ্রামীণ স্টার এডুকেশন লিমিটেড ১২. গ্রামীণ ফেব্রিক্স অ্যান্ড ফ্যাশন লিমিটেড ১৩. গ্রামীণ কৃষি  ফাউন্ডেশন।
  
অন্যদিকে, গ্রামীণ কল্যাণের আদলে প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ফান্ডের মাধ্যমে গঠন করা হয় আরও কিছু প্রতিষ্ঠান। এগুলো হল- ১.গ্রামীণ ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড ২. গ্রামীণ সল্যুশন লিমিটেড ৩. গ্রামীণ উদ্যোগ ৪. গ্রামীণ আইটেক লিমিটেড ৫. গ্রামীণ সাইবারনেট লিমিটেড ৬. গ্রামীণ নিটওয়্যার লিমিটেড ৭. গ্রামীণ আাইটি পার্ক ৮. টিউলিপ ডেইরি অ্যান্ড প্রোডাক্ট লিমিটেড ৯. গ্লোব কিডস ডিজিটাল লিমিটেড ১০. গ্রামীণ বাইটেক লিমিটেড ১১. গ্রামীণ সাইবার নেট লিমিটেড ১২. গ্রামীণ স্টার এডুকেশন লিমিটেড ১২. রফিক আটোভ্যান মানুফ্যাকটার লিমিটেড ১৩. গ্রামীণ ইনফরমেশন হাইওয়ে লিমিটেড ১৪. গ্রামীণ ব্যবস্থা সেবা লিমিটেড ১৫. গ্রামীণ সামগ্রী।
 
মজার বিষয় হলো গ্রামীণ ব্যাংকের অর্থে এবং বোর্ড সভার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে গ্রামীণ কল্যাণ এবং গ্রামীণ ফান্ড গঠিত হয়। এই দুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যে প্রতিষ্ঠানগুলো গঠিত হয়েছে- তা সবই আইনত গ্রামীণ ব্যাংকের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান। কিন্তু ২০২০ সাল পর্যন্ত গ্রামীণ ফান্ড এবং গ্রামীণ কল্যাণের পরিচালনা পর্ষদে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিনিধি থাকলেও ২০২১ সাল থেকে এই প্রতিষ্ঠান দুটিতে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিনিধি ছিল।
 
গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এ দুটি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হবেন গ্রামীণ ব্যাংকের মনোনীত ব্যক্তি। কিন্তু ড. মুহাম্মদ ইউনূস এখনও গ্রামীণকল্যাণ এবং গ্রামীণ ফান্ডের চেয়ারম্যান পদে বহাল ছিলেন কোন ক্ষমতা বলে।
 
তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতাটির কথা মনে পড়ে। জমিদার তার বাগানের পরিধি বাড়ানোর জন্য গরিবের দুই বিঘা জমি দখল করে। এরপর এই নিঃস্ব ব্যক্তি সাধু বেশে ঘুরে যখন তার ভিটেতে ফিরে আসেন এবং একটি পরে যাওয়া ফল নেন, তখন তাকে চোর বানানো হয়। ড. ইউনূস যেন সেই জমিদার। গ্রামীণ ব্যাংকের গরিব মানুষের সম্পত্তি আত্মসাৎ করে তাদেরই এখন জবর দখলকারী বলছেন। হায়রে ‘তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ, আমি আজ চোর বটে।’
 
লেখক: নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত
ই-মেইল: poriprekkhit@yahoo.com


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

শিরীন আখতারের মনোনয়ন নিয়ে কি হয়েছিল?

প্রকাশ: ১০:০০ পিএম, ১৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪


Thumbnail

জাসদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা শিরীন আখতার শেষ পর্যন্ত জাতীয় সংসদে যেতে পারলেন না। ফেনীর যে আসনটি থেকে তিনি নির্বাচন করতে চেয়েছিলেন সেই আসনে আওয়ামী লীগের ত্যাগী পরীক্ষিত এবং দুঃসময়ের নেতা আলাউদ্দিন নাসিমকে মনোনয়ন দেয়া হয়। আলাউদ্দিন নাসিম ওই এলাকায় অবিসংবাদিত ভাবে জনপ্রিয়। 

আওয়ামী লীগ নির্বাচনের আগে যে জনমত জরিপগুলো করেছিল সেই জনমত জরিপে আলাউদ্দিন নাসিম শিরীন আখতারের চেয়ে বিপুল ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন। একারণে আওয়ামী লীগ সেই শিরীন আখতারকে প্রার্থী করার ঝুঁকি নেয়নি। শিরীন আখতারকে প্রার্থী না করার ফলে ১৪ দলের শরিকদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা এবং অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। এ নিয়ে ১৪ দলের নেতারা গণভবনে আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকও করেছিলেন। সেই সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আশ্বস্ত করেছিলেন যে, শিরীন আখতারের বিষয়টি পরে দেখা হবে এবং সেই আশ্বাসে শিরীন আখতারের আসনটি নিয়ে আর এগোয়নি। ওই আসনে আলাউদ্দিন নাসিম নির্বাচন করেন এবং তিনি বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। 

আলাউদ্দিন নাসিম সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব ছিল যে, তিনি ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে পেরেছিলেন। বিএনপি নির্বাচন না করার পরও যে সমস্ত আসনগুলোতে ভোটার উপস্থিতি ছিল উৎসাহজনক তার মধ্যে ফেনীর ওই আসনটি অন্যতম। কিন্তু নির্বাচনের পর শিরীন আখতার সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন পেতে পারেন এমন একটি আলোচনা ছিল। শিরীন আখতার নিজেও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। ওবায়দুল কাদের তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন, বিষয়টি আমরা দেখছি, আমাদের মাথায় আছে। 

হাসানুল হক ইনু নিজে আমির হোসেন আমুর সঙ্গে দেখা করেছিলেন, যিনি ১৪ দলের সমন্বয়কও বটে। আমির হোসেন আমু তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, বিষয়টি নিয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলবেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ যখন ৪৮ টি আসনে মনোনয়ন চূড়ান্ত করল তখন দেখা গেল শিরীন আখতার নেই। 

আওয়ামী লীগের কোনো কোনো পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে যে, শিরীন আখতারের মনোনয়ন না পাওয়ার জন্য ১৪ দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল দায়ী। জাসদ তাদের প্রধান নেতা হাসানুল হক ইনুকে সংসদে না পেয়ে মন খারাপ করেছে এবং এই কারণেই তারা সংরক্ষিত আসনে প্রার্থী দিতে চাননি। কিন্তু হাসানুল হক ইনু বাংলা ইনসাইডার এর সঙ্গে আলাপকালে এই বক্তব্য অস্বীকার করেছেন। তিনি বরং বলেছেন যে, শিরীন আখতারের বিষয়টি মোটামুটি সিদ্ধান্ত ছিল। তারপরও কেন আওয়ামী লীগ তাকে মনোনয়ন দিল না সংরক্ষিত আসনে সেটা তাদের কাছেও বিস্ময়! তারা অপেক্ষা করেছিলেন যে, আওয়ামী লীগ থেকে তাদেরকে ডাকা হবে বা শিরীন আখতারকে মনোনয়ন দেওয়ার ব্যাপারে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। 

হাসানুল হক ইনু বলেছেন যে, আমরা অপেক্ষায় ছিলাম। আমরা কেন রাগ করব, আমরা কেন বলব যে শিরীন আখতারকে আমরা সংসদে পাঠাব না। বরং তিনি নিজেই বিষয়টি নিয়ে ১৪ দলের সমন্বয়কের সাথে কথা বলেছিলেন। সেই প্রসঙ্গটিও উত্থাপন করেন। 

প্রশ্ন হল যে, জাসদ যদি আগ্রহী থাকে এবং প্রধানমন্ত্রী যদি এ ধরনের কোন অঙ্গীকার করে থাকেন তাহলে শিরীন আখতার কেন সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন পেলেন না? এটি নিয়ে জাসদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হয়েছে। এ নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। 

তবে বিভিন্ন সূত্রগুলো বলছে, আওয়ামী লীগ এখন ১৪ দলের ব্যাপারে নতুন করে ভাবছে। শিরীন আখতারের মনোনয়ন না পাওয়াটা তার একটি বার্তা। আওয়ামী লীগ মনে করছে যে, ১৪ দলের যে শরিক দলগুলো আছে সেই শরিক দলগুলো কতটা গুরুত্বপূর্ণ। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক চাপ অনেকে বেড়েছে। এখন আওয়ামী লীগে মনোনয়ন লাভে ইচ্ছুক প্রার্থীর সংখ্যা অনেক বেড়েছে। এবার সংরক্ষিত আসনে ১৫৪৯ জন মনোনয়ন জমা দিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে মাত্র ৪৮ জনকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এ কারণেই আওয়ামী লীগ শেষ পর্যন্ত শিরীন আখতারকে সংরক্ষিত আসনে আনতে পারেনি।

আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সূত্রগুলো বলছে যে, আওয়ামী লীগ এখন ১৪ দল কতটুকু প্রয়োজনীয় সেই হিসেবে নিকাশ করছে। সেই হিসেবে নিকেশে শেষ পর্যন্ত ১৪ দল টিকবে কিনা সেটাই এখন দেখার বিষয়।

শিরীন আখতার   ১৪ দল   আওয়ামী লীগ   সংরক্ষিত আসন  


মন্তব্য করুন


বিজ্ঞাপন