ইনসাইড থট

অনন্ত অনুপ্রেরণার উৎস শেখ হাসিনা ফিরলেন

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ০৭ মে, ২০২৩


Thumbnail

২০০৭ সালের ৭ মে শেখ হাসিনা সকল রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে দেশে ফিরেছিলেন। আজ থেকে ১৬ বছর আগে রাজনীতি থেকে তাঁকে ‘‘মাইনাস’’ করার ষড়যন্ত্র হয়েছিল। সামরিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার তখন জনগণের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য তাঁর নামে দুর্নীতির বদনাম রটিয়েছিল। সবকিছুকে সৎ সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করার জন্য তিনি দেশে ফিরে এসেছিলেন। তাঁর জন্য বাংলাদেশ আজ ধন্য হয়েছে। তিনি ফিরে না এলে ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে কে সরকার গঠন করত- আমাদের জানা নেই। কিন্তু তিনি ফিরে এসে হাল ধরেছিলেন গণতন্ত্রের। ফলে গত ১৪ বছর দেশের উন্নয়ন আকাশ ছুঁয়েছে। এদেশ প্রকৃতপক্ষে এগিয়েছে তাঁর অসীম সাহসিকতা ও যোগ্য নেতৃত্বের কারণে।

বলাবাহুল্য, ২০০৭ সালের ৭ মে

তিনি ফিরে না এলে এদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার হতো না। আর ২০০৯ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত তাঁর নেতৃত্বের মহিমান্বিত রূপ দেখা যেত না।  বাঙালির চিরঞ্জীব আশা ও অনন্ত অনুপ্রেরণার উৎস শেখ হাসিনা বর্তমানে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধজনিত বিশ্ব সংকটে দেশের মানুষকে রক্ষার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রমে দিনযাপন করছেন। ২০০৭ সালের ৭ মে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ঘোষিত জরুরি অবস্থা চলাকালীন শত বাধা ও হুমকি উপেক্ষা করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসা শেষে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরে আসেন। সামরিক সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে হাজার হাজার মানুষের অভিনন্দনে সেদিন পুনরায় আপ্লুত হন তিনি। দেশে ফিরে জনগণের হারানো গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠায় শুরু করেন নতুন সংগ্রাম। আর কয়েকদিন পর শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ৪২তম বার্ষিকী ১৭ মে উদযাপিত হবে। তবে ভারত থেকে এই প্রথম প্রত্যাবর্তন এবং আমেরিকা থেকে ৭ মে দ্বিতীয় প্রত্যাবর্তন দিবস বাংলাদেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

২.

১৯৮১ সালের ১৭ মে শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরে এসেছিলেন। এটি ছিল তাঁর প্রথম স্বদেশ প্রত্যাবর্তন; তখন থেকেই বাংলাদেশের পুনর্জন্ম ঘটে। তাঁর ফিরে আসার পর বাংলাদেশ পুনরায় বাংলাদেশ হয়ে উঠেছিল। ৪২ বছর পূর্বে তাঁর প্রত্যাবর্তন ছিল অতি সাধারণ, কারণ সেভাবেই তিনি দেশের জনগণের সামনে দাঁড়াতে চেয়েছিলেন। তিনি এক বৃহৎ শূন্যতার মাঝে এসে দাঁড়ালেন। এখানে তাঁর ঘর নেই; ঘরের আপনজনও কেউ নেই। তাই সারা দেশের মানুষ তাঁর আপন হয়ে উঠল। তিনি ফিরে আসার আগে ছয় বছর স্বৈর শাসকরা বোঝাতে চেয়েছিল তারাই জনগণের মুক্তিদাতা। কিন্তু সাধারণ মানুষ ক্ষণে ক্ষণে জেগে উঠছিল, বিচার দাবি করছিল জাতির পিতার হত্যাকাণ্ডের। সেনা শাসকের হাতে ক্ষমতা কুক্ষিগত থাকায় জনগণের শাসনের দাবি নিয়ে রাজনীতির মাঠে রাতদিনের এক অক্লান্ত কর্মী হয়ে উঠলেন শেখ হাসিনা। তিনি নেতা কিন্তু তারও বেশি তিনি কর্মী। কারণ দলকে ঐক্যবদ্ধ করা, বঙ্গবন্ধু ও তাঁর শাসনকাল সম্পর্কে অপপ্রচারের সমুচিত জবাব দেওয়া, পাকিস্তান ও অন্যান্য দেশের ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করা তাঁর প্রাত্যহিক কর্মে পরিণত হলো। দেশে ফেরার প্রতিক্রিয়ায় আবেগসিক্ত বর্ণনা আছে তাঁর নিজের লেখা গ্রন্থগুলোতে। তুলে ধরছি একটি উদ্ধৃতি : ‘আমার দুর্ভাগ্য, সব হারিয়ে আমি বাংলাদেশে ফিরেছিলাম। লক্ষ মানুষের স্নেœহ-আশীর্বাদে আমি সিক্ত হই প্রতিনিয়ত। কিন্তু যাঁদের রেখে গিয়েছিলাম দেশ ছাড়ার সময়, আমার সেই অতি পরিচিত মুখগুলি আর দেখতে পাই না। হারানোর এক অসহ্য বেদনার ভার নিয়ে আমাকে দেশে ফিরতে হয়েছিল।’(ড. আবদুল মতিন চৌধুরী: আমার স্মৃতিতে ভাস্বর যে নাম, বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্রের জন্ম, পৃ ৭৪) আমরা জানি রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হিসেবে ছাত্র জীবন থেকেই তিনি ছিলেন রাজনীতি সচেতন। শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের (১৯৮১ সালের ১৭ মে) আগে ৫ মে বিশ্বখ্যাত নিউজউইক পত্রিকায় বক্স আইটেমে তাঁর সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায়, জীবনের ঝুঁকি আছে এটা জেনেও তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন। ১৯৮৩ সালের ২৪ মার্চের সামরিক শাসন জারির দুইদিন পর স্বাধীনতা দিবসে একমাত্র শেখ হাসিনাই সাভার স্মৃতিসৌধে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘আমি সামরিক শাসন মানি না, মানবো না। বাংলাদেশে সংসদীয় ধারার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করবোই করবো।’ তাই তো কবি ত্রিদিব দস্তিদার শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ করে লিখেছেন, ‘আপনিই তো বাংলাদেশ’। ঐতিহাসিক মুহূর্তটি কেবল পাকিস্তানের কারাগার থেকে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সঙ্গেই তুলনীয়।

৩.

দুঃখী রাজকন্যার মতো হৃত রাজ্য, হৃত গৌরব পুনরুদ্ধারের জন্য শেখ হাসিনার জন্ম ও পুনর্জন্মের খুব বেশি প্রয়োজন ছিল দেশ ও জনতার। তাঁর প্রথম প্রত্যাবর্তনের আগে নৈরাজ্যের যাঁতাকলে পিষ্ঠ হচ্ছিল মানুষ। তেমনি ২০০৭ সালের ৭ মে’র আগে সামরিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার দুর্নীতিবিরোধী অভিযান চালিয়ে, মামলা-মোকাদ্দমা করে রাজনীতিকে হত্যা করতে চেয়েছিল।

১৯৮৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০০৭ সালের সামরিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমল পর্যন্ত একাধিক বার বন্দি অবস্থায় নিঃসঙ্গ মুহূর্ত কাটাতে হয়েছে তাঁকে। তিনি লিখেছেনÑ‘দেশ ও জনগণের জন্য কিছু মানুষকে আত্মত্যাগ করতেই হয়, এ শিক্ষাদীক্ষা তো আমার রক্তে প্রবাহিত। ১৫ আগষ্ট ১৯৭৫-এর পর প্রবাসে থাকা অবস্থায় আমার জীবনের অনিশ্চয়তা ভরা সময়গুলোয় আমি তো দেশের কথা ভুলে থাকতে পারিনি? ঘাতকদের ভাষণ, সহযোগীদের কুকীর্তি সবই তো জানা যেত।’ (নূর হোসেন, ওরা টোকাই কেন, পৃ ৫৩) ২০০৬ থেকে ২০০৭ সালে দেশে তখন শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করার চেষ্টা চলছিল। দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, রাজনীতিবিদদের বিশেষ আইনে কারান্তরীণ করে রাখা হয়। এমন এক পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়নের পথ সুগম হয় শেখ হাসিনার আগমনে।

৪.

আসলে ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশ ও জনগণের কাছে প্রত্যাবর্তনের (জন্মান্তরের) মতো শেখ হাসিনার ২০০৭ সালের ৭ মে আমেরিকা থেকে দ্বিতীয় প্রত্যাবর্তনও (তৃতীয় জন্ম) ছিল আমাদের জন্য মঙ্গলকর। ২০০৭ সালে ১১ জানুয়ারির পর তাঁর দেশে ফেরার ওপর বিধিনিষেধ জারি করে সামরিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার। তাঁকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার সেই চক্রান্ত ব্যর্থ হয়। তিনি দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। কিন্তু ১৬ জুলাই যৌথবাহিনী তাঁকে মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করে ৩৩১ দিন কারাগারে বন্দি করে রাখে। সেসময় গণমানুষ তাঁর অনুপস্থিতি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছে। তাঁর সাবজেলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের উদ্বেগ, গ্রেফতারের সংবাদ শুনে দেশের বিভিন্ন স্থানে চারজনের মৃত্যুবরণ, বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের উৎকণ্ঠা আপামর জনগোষ্ঠীকে স্পর্শ করেছিল। কারণ সে সময় আদালতের চৌকাঠে শেখ হাসিনা ছিলেন সাহসী ও দৃঢ়চেতা; দেশ ও মানুষের জন্য উৎকণ্ঠিত; বঙ্গবন্ধুর কন্যা হিসেবে সত্যকথা উচ্চারণে বড় বেশি সপ্রতিভ। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার সন্ত্রাস, দুর্নীতি, ধর্ষণ ও লুটপাটের মাধ্যমে এদেশকে নরকে পরিণত করেছিল। নেত্রীকে গ্রেনেড, বুলেট, বোমায় শেষ করতে চেয়েছিল। কিন্তু তিনি ছিলেন নির্ভীক; এখনো তেমনটাই আছেন। ২০০১ সালের নির্বাচনোত্তর জোট সরকারের অত্যাচার-নির্যাতন-ধর্ষণ তাঁকে কতটা ব্যথিত করেছিল তা এখনও বিভিন্ন সভা-সমাবেশের বক্তৃতায় শুনে থাকি আমরা। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যবস্থা করে নতুন প্রজন্মকে যথার্থ ইতিহাসের পথ দেখিয়েছেন তিনি নিজেই।  

 

৫.

২০০৭ সালের ৭ মে হাসিনা ফিরে এসেছিলেন মাটি ও মানুষের কাছে। এজন্য ‘আমার বাংলাদেশ, আমার ভালোবাসা’ এই অমৃতবাণী তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে। তিনি নানা বিশেষণে বিশেষায়িত। সততা, নিষ্ঠা, রাজনৈতিক দৃঢ়তা; গণতন্ত্র, শান্তি, সম্প্রীতি ও বিশ্বভ্রাতৃত্বের অনন্য রূপকার আর মানব কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণÑ তার চেয়েও আরো আরো অনেককিছু তিনি। এই দরদী নেতা দুঃখী মানুষের আপনজন; নির্যাতিত জনগণের সহমর্মী তথা ঘরের লোক। তিনি বলেছেন, ‘বাবার মতো আমাকে যদি জীবন উৎসর্গ করতে হয়, আমি তা করতে প্রস্তুত।’ শান্তির অগ্রদূত শেখ হাসিনা দেশের মানুষের জন্য নিজের প্রাণকে তুচ্ছ করতে পারেন নির্দ্বিধায়। সাধারণ মানুষের আস্থা ও ভরসার কেন্দ্রবিন্দু তিনি। ধৈর্য ও সাহসের প্রতিমূর্তি শেখ হাসিনা গণতন্ত্রের মানসকন্যা, দেশরত্ন, কৃষকরত্ন, জননেত্রীÑ বহুমাত্রিক জ্যোতিষ্ক। তাঁকে কেন্দ্র করে, তাঁর নেতৃত্বে আবর্তিত হচ্ছে বাংলাদেশ।      

পদ্মাসেতু, মেট্রোরেল, গভীর সমুদ্রবন্দর প্রভৃতি বড় প্রকল্পের বাস্তবায়নই মনে করিয়ে দিচ্ছে শেখ হাসিনা প্রকৃতপক্ষে আলাদা, ভিন্ন, স্বতন্ত্র ও নেতৃত্বের গৌরবজনক আসনে সমাসীন। তিনি জনগণের ইচ্ছা অনুযায়ী অর্থনৈতিক বিকাশ ত্বরান্বিত করেছেন; সংকট উত্তরণে অনন্য ভূমিকা রেখেছেন। তিনি জনতার আকাঙ্ক্ষাসমূহ এবং টিকে থাকার বাস্তবতার মধ্যে সেতুবন্ধনের সাহায্যে স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে এনেছেন। তাঁর নেতৃত্বের সাফল্যে বাংলাদেশ আজ গৌরবজনক অধ্যায়ের সূচনা করেছে। ১৯৭৪ সালে মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাস্তবতায় ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে আমেরিকার তৎকালীন পররাষ্ট্র মন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। এ ধরনের মন্তব্য করেই ক্ষান্ত হননি তিনিÑ বিভিন্ন দেশ ও সংস্থাকে পরামর্শ দেন বাংলাদেশকে কোনো প্রকার সাহায্য-সহযোগিতা না করার। তাদের বিরোধিতা ও ষড়যন্ত্রের পরও বাংলাদেশ আজ গৌরবজনক  অবস্থানে পৌঁছেছে। শেখ হাসিনার শাসনামলেই কিসিঞ্জারের পরবর্তী নেতৃবর্গ ভিন্ন সুরে কথা বলে গেছেন। ‘এশিয়ার টাইগার’ তথা বাংলাদেশ এশিয়ার একটি মডেল হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশকে ‘নাম্বার ওয়ান উন্নয়নমুখী দেশ’ বলেছেন অনেক বিখ্যাত ব্যক্তি।

গত ১৪ বছরের শাসনামলে দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রকারীদের সফলভাবে মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়েছেন শেখ হাসিনা। খালেদা জিয়াকে ক্যান্টনমেন্ট থেকে সরিয়ে দেয়া ছিল শেখ হাসিনার একটি অনন্য কাজ। আধুনিক সিঙ্গাপুরের ‘উন্নয়নে’ প্রয়াত লি কুয়ান ইউ সরকারের নেতৃত্বের সঙ্গে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের তুলনা করা হয়। অন্যদিকে মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মহাম্মদ ১৯৮১ সাল থেকে পাঁচের অধিক সংসদ নির্বাচনে জয়ী ছিলেন। এশিয়ার এই দুই নেতাই দুটি দেশের প্রধান হিসেবে সকলের কাছে সম্মানীয়। লি সিঙ্গাপুরের প্রথম তিন দশকের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে একটি দরিদ্র বন্দরকে তৃতীয় বিশ্বের তলানি থেকে মাত্র এক প্রজন্মের চেষ্টাতেই প্রথম বিশ্বের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে একনাগাড়ে ৩০ বছর (১৯৯০ সাল পর্যন্ত) দায়িত্ব পালন করেন। শেখ হাসিনা ওই দুই শাসকের মতো আরো সময় পেলে এদেশের মানুষকে অধিকতর উত্তম জীবনব্যবস্থা দিতে পারবেন। বর্তমান মানুষ অধিকতর সম্মান ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ চায়Ñ শেখ হাসিনা তা ভালই জানেন।

বর্তমান প্রজন্মের কাছে শেখ হাসিনা এক সাহসী রাজনীতিকের নাম; যাঁর সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনায় ভবিষ্যতের বাংলাদেশ উন্নয়নের ধারায় এগিয়ে চলেছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি পাল্টে গেছে; বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার, জেল হত্যাকাণ্ডের বিচারসহ একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচার তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তরুণ প্রজন্ম প্রত্যাখ্যান করেছে বিএনপি-জামায়াতকে। বিএনপি-জামায়াতের সহিংস বীভৎসতাকে। অতীতে সহিংসতা আর জ্বালাও-পোড়াও করে, পেট্রলবোমায় মানুষ হত্যা করে তারা থামাতে পারেনি যুদ্ধাপরাধের বিচার। বরং কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ায় জনগণ শেখ হাসিনাকে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে, তারা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে। দমে গেছে স্বাধীনতা বিরোধী জামায়াতের রাজনৈতিক তৎপরতা। শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নয়, কূটনীতিক দিক থেকেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছেন। তিনি মেধা ও প্রজ্ঞা দিয়ে সব বিরূপ পরিস্থিতিকে নিজের অনুকূলে নিয়ে এসেছেন। তাঁর মন্ত্রিসভায় যুক্ত হয়েছেন অভিজ্ঞ ও বর্ষীয়ান রাজনীতিক। কিছু বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা সত্ত্বেও উন্নয়ন সহযোগী ও অংশীদার বানিয়ে ফেলেছেন রাশিয়াসহ অন্য অনেক দেশকে। প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের পরীক্ষিত বন্ধুত্বের বন্ধন আরো সুদৃঢ় হয়েছে। পূর্বমুখী কূটনীতির অংশ হিসেবে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কোন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছেন। তাঁর সরকারের উন্নয়নের মডেল অন্যান্য দেশের কাছে প্রশংসিত হচ্ছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে ঈর্ষণীয় সাফল্য দেখিয়েছে। এছাড়া আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও অগ্রগতি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। এজন্যই চীন-জাপান-ভারতের রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকার প্রধানসহ বিশ্বের সকল নেতৃবৃন্দ শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রশংসা করেছেন।

২০২০ সালে করোনা সংকট মোকাবেলায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রশংসা করেছে মার্কিন ম্যাগাজিন ‘ফোর্বস’। অন্যদিকে ব্রিটেনের ‘দ্য ইকোনমিস্ট’ মহামারির মধ্যেও এদেশের অর্থনীতির নিরাপত্তা বিষয়ে ইতিবাচক প্রতিবেদন ছাপিয়েছে। আবার ২০২২ সালের প্রথম মাস থেকেই ভ্যাকসিন হিরোর দেশে পরিণত হয় বাংলাদেশ। কারণ সকল কুসংস্কার ও অপপ্রচার মুক্ত হয়ে দেশের মানুষকে টিকা নিতে উৎসাহী করেছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

দেশের দুটি ধারার রাজনৈতিক বলয়ের একটির লক্ষ্য, বাংলাদেশকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করা। অন্যদিকে আরেকটি শক্তির অভিলাষ, যে কোনো মূল্যে ১৫ কিংবা ২১ আগস্টের মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হওয়া। এসব দুষ্কৃতিকারী সবসময় দেশের অগ্রগতিকে থামিয়ে দিতে চেয়েছে। বিশেষত স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর থেকে একাধিকবার শেখ হাসিনার প্রাণনাশের চেষ্টা করা হয়েছে। ১৯৮৩ সালের ১৬ আগস্ট জননেত্রীর ওপর ঢাকায় গ্রেনেড হামলা করা হয়েছিল। ১৯৮৬ সালের ১৬ অক্টোবর তাঁর বাসভবন আক্রান্ত হয়। ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি- শেখ হাসিনার নেতৃত্বে চট্টগ্রাম বিমানবন্দর থেকে একটি বিরাট মিছিল নগরীর দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর ওপর গুলিবর্ষণ করা হয়। এতে ৪০ জন নিহত হন। ১৯৮৯ সালের ১১ আগস্ট ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাসভবনে থাকাকালে বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিদের সংগঠন ফ্রিডম পার্টির ক্যাডাররা শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি ছোড়ে। ১৯৯১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদের উপ-নির্বাচনের সময় ধানমন্ডিতে তাঁর ওপর বন্দুকধারীরা রাসেল স্কোয়ারে আক্রমণ চালায়। ১৯৯৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর- ট্রেনে ভ্রমণকালে ঈশ্বরদী ও নাটোরে অজ্ঞাত বন্দুকধারীরা জননেত্রীর ওপর গুলিবর্ষণ করেছিল। এভাবেই দেশ-বিদেশে কখনো গোপনে কখনো বা প্রকাশ্যে চলেছে হত্যার ষড়যন্ত্র। ২০০০ সালের ২০ জুলাই পূর্ব নির্ধারিত জনসভাস্থল কোটালিপাড়া থেকে শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ৭৬ কেজি বিস্ফোরকের বোমা উদ্ধার করা হয়। ২০০৪ সালের ৫ জুলাই তুরস্কে সফরের সময় জননেত্রীকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছিল। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ছিল ভয়াবহতম দিন। অজস্র গ্রেনেড নিক্ষেপের পরও নেতাকর্মীদের মানবঢালের বেষ্টনীর কারণে প্রাণে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধু কন্যা। তবে নিহত হন অনেক আওয়ামী লীগের নিবেদিতপ্রাণ নেতা-কর্মী। এছাড়া অনলাইন, ব্লগ এবং ফেসবুকে জননেত্রীকে কটাক্ষ করে খাটো করার চেষ্টা করা হয়েছে বারবার।

মূলত হত্যার প্রচেষ্টা ও হুমকির মধ্যেও শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে তাতে করোনা কবলিত হয়েও বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবেÑ এটা নিশ্চিত। তাই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তিকে ঐক্যবদ্ধভাবে সকল অশুভ শক্তির মোকাবেলা করতে হবে। সামনে বাধা এলে তা বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধারণ করে ধৈর্যের সঙ্গে মোকাবেলায় সচেষ্ট থাকতে হবে। ৭১-এর পরাজিত শক্তিরা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে দেশের স্বাধীনতা ও স্বপ্নকে হত্যা করতে চেয়েছিল। শেখ হাসিনা জীবিত রয়েছেন। তিনিই তাঁর পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কিন্তু ৭১-এর পরাজিত শক্তিরা বসে নেই; ষড়যন্ত্রকারীরা নতুন নতুন ষড়যন্ত্রের জাল বুনছে। তাই সকলকে এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। শেখ হাসিনার নেতৃত্ব বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। তাঁর ধারাবাহিকতা ভবিষ্যতেও বজায় থাকবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।

৬.

২০০৭ সালের ৭ মে শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। কারণ তিনি ‘আদর্শবাদী ও আত্মত্যাগী রাজনৈতিক নেতা’ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের যোগ্য উত্তরসূরি। বঙ্গবন্ধু আজীবন সংগ্রাম করে বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন, বিশ্বের কাছে বাংলাদেশকে অনন্য মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছেন; সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন দেখেছেন ও বাস্তবায়নে অগ্রসর হয়েছেন; তাঁর সেই আদর্শিক ধারায় স্নাত হয়ে শেখ হাসিনা মেধা ও দূরদর্শিতাসম্পন্ন রাজনীতিক হিসেবে জনগণের ভাগ্য বদলে দিয়েছেন। জননেত্রীর নেতৃত্বে এ মুহূর্তে বাংলাদেশও সকল সংকট মোকাবেলা করতে সক্ষম হচ্ছে।



মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

যেভাবে আওয়ামী লীগকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন শেখ মুজিব


Thumbnail

আওয়ামী লীগের ইতিহাস সংগ্রাম, সৃষ্টি, অর্জন ও উন্নয়নের ইতিহাস। আওয়ামী লীগ ছিল পাকিস্তানে প্রথম কার্যকর কোনো বিরোধী দল। শুধু তাই নয়, আওয়ামী লীগের যাত্রাই শুরু হয় বাঙালিদের স্বার্থের সত্যিকার ও আপসহীন প্রতিনিধি হিসেবে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার এক বছর ১০ মাসের মধ্যে পুরানো ঢাকায় ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন অনুষ্ঠিত এক রাজনৈতিক কর্মী সম্মেলনে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা। প্রতিষ্ঠার পর থেকে আওয়ামী লীগ গত ৭৩ বছর ধরে রাজনীতির অগ্রভাগে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। সে সময়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রে কোনো বিরোধী দল গঠন কিছুতেই সহজসাধ্য ছিল না। শাসকগোষ্ঠীর রক্ত চক্ষু আর সকল বাধা-প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে বিরোধী দল হিসেবে আওয়ামী লীগের শুধু প্রতিষ্ঠা লাভই সেদিন ঘটেনি, অতি দ্রুত এর জনপ্রিয়তাও বৃদ্ধি পেতে থাকে। কী করে এটি সম্ভব হলো? এর প্রতিষ্ঠার পটভূমিই বা কী? আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করতে ও এর মূল লক্ষ্য অর্জনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান কী ছিল?

৪০ এর দশকে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগ অভ্যন্তরীণভাবে দ্বি-ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়ে— সোহরাওয়ার্দী-হাশিম গ্রুপ বনাম ঢাকার নবাব পরিবারের খাজা নাজিমুদ্দীনের নেতৃত্বাধীন গ্রুপ, যা খাজা গ্রুপ নামে পরিচিত ছিল। এর একদিকে মধ্যবিত্ত, অন্যদিকে অভিজাত-জমিদারি স্বার্থের দ্বন্দ্ব। অনেকে একে ‘জনগণ’ বনাম ‘প্রাসাদ’ দ্বন্দ্ব হিসেবে আখ্যায়িত করেন। প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি ও দৈনিক আজাদ পত্রিকার স্বত্বাধিকারী মওলানা আকরম খাঁ ছিলেন খাজা গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত। মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় অবাঙালি নেতৃত্বের সমর্থন-সহানুভূতিও ছিল এদের প্রতি। সোহরাওয়ার্দী-হাশিম গ্রুপের পেছনে ছিল বাঙালি মধ্যবিত্ত ও ছাত্র-তরুণদের নিয়ে গঠিত এক বিশাল কর্মীবাহিনী। এ ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এরাই ছিলেন বাংলায় পাকিস্তান আন্দোলনের মূল শক্তি। সোহরাওয়ার্দীর প্রত্যক্ষ সমর্থন নিয়ে ১৯৪৩ সালে আবুল হাশিম বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের জেনারেল সেক্রেটারি নির্বাচিত হয়েছিলেন। এরপর বাংলায় লীগকে সুদৃঢ় সাংগঠনিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে তিনি নিজেকে সার্বক্ষণিকভাবে নিবেদিত করেন। তার প্রগতিশীল নেতৃত্বের কারণে শতশত ছাত্র-যুবক দলের সার্বক্ষণিক কর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসে। তাদের কাজ-কর্ম, থাকা-খাওয়া চালিয়ে নেওয়ার জন্য ছিল ‘পার্টি হাউজ’। ঢাকার ১৫০ মুগলটুলী পার্টি হাউজ ছিল পূর্ব বাংলার তরুণ লীগ কর্মীদের প্রধান কেন্দ্র। ১৯৪৪ সালে আবুল হাশিমের নির্দেশে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। খাজা গ্রুপের হেডকোয়ার্টার্স ঢাকার ‘আহসান মঞ্জিল’-এর বিপরীতে ‘মুগলটুলী ওয়ার্কার্স ক্যাম্প’ বা ‘পার্টি হাউজ’ গড়ে ওঠেছিল।

১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিম প্রথমে পাকিস্তানে না এসে ভারতে থেকে যান। এর মূলে ছিল মুসলিম লীগ কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বিদ্বেষী আচরণ। আনুষ্ঠানিকভাবে ভারত বিভক্তি ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পূর্বেই ১৯৪৭ সালের ৫ আগস্ট কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নির্দেশে পূর্ব বাংলার জন্য মুসলিম লীগ সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে সোহরাওয়ার্দীর স্থলে লীগ হাইকমান্ডের প্রিয়ভাজন খাজা নাজিমুদ্দীন নতুন নেতা নির্বাচিত হয়ে পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হন। এমনকি, ১৯৪৮ সালের জুন মাসে সোহরাওয়ার্দী পেশাগত কারণে একবার ঢাকা এলে, তাকে জোর করে স্টিমারে তুলে ভারতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পাকিস্তানের গণপরিষদ থেকে তার সদস্যপদ পর্যন্ত বাতিল ঘোষণা করা হয়। যাহোক, এ সময় ১৫০ মুগলটুলী ওয়ার্কার্স ক্যাম্প বা পার্টি হাউজ ছিল সোহরাওয়ার্দী-হাশিম সমর্থক ছাত্র ও তরুণ কর্মীদের মিলন কেন্দ্র। এখান থেকে তারা ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মপন্থা স্থির করেন। এভাবে ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে গণতান্ত্রিক যুবলীগ এবং ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগ ও নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা লাভ করে (১৯৫৩ সালে সংগঠনের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দ বাদ দেওয়া হয়)। উল্লেখ্য, দেশ বিভাগের পর সেপ্টেম্বর মাসে (১৯৪৭) বঙ্গবন্ধু কলকাতা থেকে ঢাকায় ফিরে আসেন এবং প্রথমে ১৫০ মুগলটুলী পার্টি হাউজে ওঠেন।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্রের শাসকগোষ্ঠী সরকারি দল মুসলিম লীগকে কার্যত একটি ‘পকেট সংগঠন’ বানিয়ে রাখে। লীগের ত্যাগী, পরীক্ষিত নেতা-কর্মী, যাদের অধিকাংশ সোহরাওয়ার্দী-হাশিম গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত ছিল, তাদের দলে বা সরকারের কোথাও কোনো স্থান হলো না। উদ্ভূত অবস্থায় করণীয় স্থির করার লক্ষ্যে টাঙ্গাইল ও নারায়ণগঞ্জে প্রগতিশীল মুসলীম লীগ কর্মীদের দু’টি সভাও ডাকা হয়েছিল।

২. যে আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে পাকিস্তান আন্দোলনে বাঙালিরা সর্বাত্মক সমর্থন জ্ঞাপন ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছিল, ১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান তাদের সেই প্রত্যাশিত রাষ্ট্র ছিল না। পাকিস্তান আন্দোলনের মধ্যে তাদের রাষ্ট্রভাবনা ছিল ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব অনুযায়ী ভারতের পূর্বাঞ্চলে (বর্তমান বাংলাদেশ ও তদ্সংলগ্ন এলাকা) একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। সে লক্ষ্যে দেশ বিভাগের প্রাক্কালে অবিভক্ত বাংলার সর্বশেষ মুখ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বঙ্গীয় মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশিম এবং কংগ্রেসের এককালীন কেন্দ্রীয় নেতা ও নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর অগ্রজ শরৎ চন্দ্র বসু, প্রাদেশিক কংগ্রেসের পার্লামেন্টারি দলের নেতা কিরণ শংকর রায়, কংগ্রেস নেতা ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, জে এম সেন গুপ্ত প্রমুখদের সঙ্গে নিয়ে পাকিস্তান ও ভারতের বাইরে তৃতীয় ‘স্বাধীন অখণ্ড বাংলা রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রতিশ্রুতিশীল ছাত্র-তরুণ নেতা হিসেবে এ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত থেকে কলকাতায় স্বাধীন বাংলার পক্ষে একাধিক ছাত্র-জনতার সমাবেশে বক্তব্য রাখেন। শর্তসাপেক্ষে ব্রিটিশ সরকারের ‘স্বাধীন অখণ্ড বাংলা রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠায় এক ধরনের সম্মতি থাকলেও, কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ নেতৃত্বের অবাঙালি হাই কমান্ডের মধ্যে ঐকমত্যের অভাবে সে উদ্যোগ সফল হতে পারেনি।

শুরু থেকেই পাকিস্তান রাষ্ট্রে বাঙালিদের ওপর নেমে আসে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শাসন-শোষণ, আঞ্চলিক বৈষম্য ও জাতি-নিপীড়ন। পাকিস্তানের স্বাধীনতাকে বঙ্গবন্ধু আখ্যায়িত করেছিলেন ‘ফাঁকির স্বাধীনতা’ বলে। সামগ্রিকভাবে পাকিস্তান রাষ্ট্রে বাঙালিদের অবস্থা দাঁড়ায়, বঙ্গবন্ধুর ভাষায়, ‘এক শকুনির হাত থেকে আরেক শকুনির হাতে পড়া’র মতো। বাংলাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’— পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর এই ভাষানীতি ঘোষণার মধ্য দিয়ে তাদের বাংলা ও বাঙালি বিদ্বেষী ঔপনিবেশিক চরিত্রের প্রকাশ ঘটে। এদিকে রাজনৈতিক ভিন্ন মতাবলম্বীদের ওপর শাসকগোষ্ঠীর জুলুম-নির্যাতন চলছিলই। এ অবস্থায়, বিভাগ-পূর্ব বঙ্গীয় মুসলিম লীগের সোহরাওয়ার্দী-হাশিম সমর্থকরা একটি পৃথক রাজনৈতিক সংগঠনের আবশ্যকতা উপলব্ধি করতে থাকেন। অবিভক্ত বাংলায় মুসলিম লীগ ও পাকিস্তান আন্দোলনের প্রধান সংগঠক হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এ সময়ে ভারতে অবস্থান করলেও, ঢাকার মুগলটুলী ওয়ার্কার্স ক্যাম্পের কর্মী-সংগঠকদের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। এদিকে, পাশাপাশি সময়ে আরও দু’টি ঘটনা বিরোধী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠাকে ত্বরান্বিত করেছিল। এর একটি হলো, ১৯৪৯ সালের এপ্রিল মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের আন্দোলনে নেতৃত্বদানের কারণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্য ছাত্র নেতাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার, অন্যটি, একই মাসে টাঙ্গাইলের উপনির্বাচনে ক্ষমতাশীল মুসলীম লীগের প্রার্থী জমিদার পরিবারের খুররম খান পন্নীকে পরাজিত করে ১৫০ নম্বর মুগলটুলী পার্টি হাউজের প্রগতিশীল লীগ কর্মীদের প্রধান সংগঠক শামসুল হকের (টাঙ্গাইলের শামসুল হক নামে খ্যাত) বিজয় অর্জন। শেষের ঘটনাটি মুসলীম লীগ সরকারবিরোধী লীগ নেতা-কর্মীদের বিপুলভাবে অনুপ্রাণিত করে।

৩. পুরানো ঢাকায় যে রাজনৈতিক কর্মী সম্মেলনে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা, তার জন্য ঢাকা শহরের কোথাও হল বা স্থান না পাওয়া যাওয়ায় কে এম দাস লেনের কে এম বশির ওরফে হুমায়ুন সাহেবের প্রাইভেট বাড়ি ‘রোজ গার্ডেন’-এ ১৯৪৯ সালের ২৩ ও ২৪ জুন ওই কর্মী সম্মেলন আহ্বান করা হয়। আসাম প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সাবেক সভাপতি ও মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খাঁন ভাসানী মুসলীম লীগ সরকারবিরোধী ত্যাগী নেতাকর্মীদের সঙ্গে পূর্বেই একাত্মতা ঘোষণা করেন। সম্মেলন যেন সফল না হতে পারে, সেজন্য সরকার ও ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের অপচেষ্টার অন্ত ছিল না। পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক মুসললিম লীগের সাধারণ সম্পাদক ইউসুফ আলী চৌধুরী, ঢাকা জেলা মুসলিম লীগের সভাপতি নবাব খাজা হাবিবুল্লাহ এবং সিটি মুসলিম লীগের সভাপতি সৈয়দ সাহেবে আলম ২১ এক বিবৃতিতে সম্মেলনের উদ্যোক্তাদের ‘ক্ষমতালোভী’, ‘পাকিস্তানের সংহতি বিনষ্টকারী’, ‘মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টিকারী’ ইত্যাদি অখ্যায়িত করে ওই সম্মেলনে যোগদান বা কোনোরূপ সংশ্লিষ্টতা না রাখার জন্য পূর্ব বাংলার মুসলমান জনগণ বিশেষ করে ঢাকাবাসীর উদ্দেশে যৌথ আহ্বান জানিয়ে বলেন—

‘মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সাহেবের দ্বারা আগামী ২৩ ও ২৪ জুন তারিখে ঢাকায় মুসলিম লীগ কর্মী সম্মেলনের নামে যে সভা আহূত হইয়াছে তাহার সহিত মুসলিম লীগের কোনো সম্পর্ক নাই। বস্তুত ইহা দলগত স্বার্থ ও ক্ষমতালাভের জন্য মুসলমানদের মধ্যে বিভেদের সৃষ্টির দ্বারা মুসলমান সংহতি নষ্ট করিয়া পাকিস্তানের স্থায়ীত্ব এবং অগ্রগতির পথে বাধা সৃষ্টি করিবার উদ্দেশ্যে আহূত হইয়াছে (আজাদ, ২২ জুন ১৯৪৯, পৃ ৬)।’

কর্মী সম্মেলনের পাঁচ দিন আগে তড়িঘড়ি করে ১৮ থেকে ২০ জুন কার্জন হলে (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক মুসলিম লীগের কাউন্সিল সম্মেলন আহ্বান করা হয়। ওই সম্মেলনেও সরকারবিরোধী লীগ কর্মী-সম্মেলন আহ্বানের নিন্দা ও মুসলমানদের তাতে যোগদান করা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়।

যা হোক, আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত রোজ গার্ডেনের কর্মী সম্মেলনে প্রায় ৩০০ প্রতিনিধি যোগ দেন। অনেক রাজনৈতিক নেতাও যোগ দিয়েছিলেন, যাদের মধ্যে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, খয়রাত হোসেন এম এল এ, বেগম আনোয়ারা খাতুন এম এল এ, আলী আহমেদ খান এম এল এ, আল্লামা রাগীব আহসান, হাবিবুর রহমান চৌধুরী ওরফে ধনু মিয়া উল্লেখযোগ্য। সম্মেলনের প্রথম দিনেই মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে সভাপতি, টাঙ্গাইলের শামসুল হককে সাধারণ সম্পাদক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে (জেলে বন্দি অবস্থায়) যুগ্ম-সম্পাদক ও ইয়ার মোহাম্মদ খানকে কোষাধ্যক্ষ করে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ নামে নতুন রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করা হয় (বিস্তারিত দ্রষ্টব্য, হারুন-অর-রশিদ, মূলধারার রাজনীতি: বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কাউন্সিল ১৯৪৯-২০১৬, বাংলা একাডেমি ২০১৬)। ‘আওয়াম’ শব্দের অর্থ জনগণ, আর ‘লীগ’ মানে ঐক্য বা সম্মিলনী। অর্থাৎ সরকারি মুসলিম লীগের বিপরীতে জনগণের প্রতিষ্ঠান হিসেবে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা। দলের প্রতিষ্ঠাকালীন সহ-সভাপতিরা ছিলেন আতাউর রহমান খান, আব্দুস সালাম খান, আলী আহম্মদ খান, আলী আমজাদ খান ও সাখাওয়াত হোসেন।

নতুন এ দলের জন্য ৪০ সদস্যের একটি ওয়ার্কিং কমিটি গঠন করা হয়। দলের নবনির্বাচিত কর্মকর্তা ছাড়াও বেগম আনোয়ারা খাতুন এম এল এ, খয়রাত হোসেন এম এল এ, আব্দুল হামিদ চৌধুরী, মোল্লা জালাল উদ্দিন আহমদ, খন্দকার মোশতাক আহমেদ, নারায়ণগঞ্জের আব্দুল আউয়াল, আলমাস আলী, শামসুজ্জোহা প্রমুখ এর সদস্য ছিলেন। সরকারি হয়রানি-গ্রেফতারের ভয়ে কমিটির বেশকিছু সদস্য অচিরেই বিবৃতি দিয়ে পদত্যাগ করেন। এদের মধ্যে সাখাওয়াত হোসেন ও এ কে এম রফিকুল ইসলাম ছিলেন। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য ছিলেন। তার আর্থিক অসুবিধা ও সরকারের অ্যাডভোকেট জেনারেলের চাকরিটি তার প্রয়োজন এ কথা বলে তিনিও ওয়ার্কিং কমিটি থেকে অব্যাহতি নেন।

রাজনৈতিক কর্মী সম্মেলন, নতুন দলের প্রতিষ্ঠা ও এর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর নিজের সম্পৃক্ততা সম্বন্ধে এভাবে বর্ণনা করেন—

…পুরানা লীগ কর্মীরা মিলে এক কর্মী সম্মেলন ডাকল ঢাকায়, ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা ঠিক করার জন্য। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন সে সভা আহ্বান করা হয়েছিল… আমরা জেলে বসেই সে খবর পাই… আমরা সম্মেলনের ফলাফল সম্বন্ধে খুবই চিন্তায় দিন কাটাচ্ছিলাম। আমার সাথে যোগাযোগ করা হয়েছিল, আমার মত নেওয়ার জন্য। আমি খবর দিয়েছিলাম, “আর মুসলিম লীগের পিছনে ঘুরে লাভ নাই, এ প্রতিষ্ঠান এখন গণবিচ্ছিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এরা আমাদের… নিতে চাইলেও যাওয়া উচিত হবে না। কারণ এরা কোটারি করে ফেলেছে। একে আর জনগণের প্রতিষ্ঠান বলা চলে না। এদের কোনো কর্মপন্থাও নাই।” আমাকে আরও জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, আমি ছাত্র প্রতিষ্ঠান করব, না রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গঠন হলে তাতে যোগদান করব? আমি উত্তর পাঠিয়েছিলাম, ছাত্র রাজনীতি আমি আর করব না, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানই করব। কারণ বিরোধী দল সৃষ্টি করতে না পারলে এ দেশে একনায়কত্ব চলবে… সকলেই একমত হয়ে নতুন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গঠন করলেন; তার নাম দেওয়া হলো, ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী [মুসলীম] লীগ।’ মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি, জনাব শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক এবং আমাকে করা হল জয়েন্ট সেক্রেটারি। খবরের কাগজে দেখলাম, আমার নামের পাশে লেখা আছে, ‘নিরাপত্তা বন্দি’। (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃ. ১২০-১২১)।

‘মুসলিম’ শব্দ যুক্ত করে নব প্রতিষ্ঠিত দলের নামকরণ সম্বন্ধে বঙ্গবন্ধু বলেন—

আমি মনে করেছিলাম, পাকিস্তান হয়ে গেছে সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের দরকার নাই। একটা অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হবে, যার একটা সুষ্ঠু ম্যানিফেস্টো থাকবে। ভাবলাম, সময় এখনও আসে নাই। তাই যারা বাইরে আছেন তারা চিন্তাভাবনা করেই করেছেন (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃ ১২১)। উল্লেখ্য, আলোচ্য রাজনৈতিক কর্মী সম্মেলন সফল করতে পুরান ঢাকার দুই কৃতী সন্তান ও নিবেদিতপ্রাণ লীগ কর্মী শওকত আলী ওরফে শওকত মিয়া (১৫০ মুগলটুলী পার্টি হাউজের স্বত্বাধিকারী) ও ইয়ার মোহাম্মদ খান (কারকুন বাড়ি লেন) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। শুরুর দিকে শওকত আলীর বাড়িই ছিল আওয়ামী মুসলিম লীগের অফিস।

আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা উপলক্ষে আয়োজিত কর্মী সম্মেলনে শামসুল হক ‘মূল দাবি’ নামে একটি পুস্তিকা ছাপিয়ে বিবেচনার জন্য তা পেশ করেন। পরবর্তীতে কিছু পরিবর্তন-পরিমার্জন করে খসড়া ম্যানিফেস্টো আকারে তা গৃহীত হয়। এর প্রধান দিকসমূহ ছিল— পাকিস্তানের জন্য ফেডারেল বা যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা, পূর্ণ গণতন্ত্র, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান নিয়ে গঠিত দু’টি পৃথক আঞ্চলিক ইউনিট এবং এর জন্য পূর্ণ আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার, জনগণের সার্বভৌমত্ব, সকল সম্প্রদায়ের জন্য ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষার সমান অধিকার, সভা-সমাবেশ-সংগঠনসহ পূর্ণ বাক-স্বাধীনতা, সার্বজনীন ভোটাধিকার, রাষ্ট্র কর্তৃক প্রত্যেকের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসার ও শিক্ষার ব্যবস্থা, প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করা, বিভিন্ন স্থানে পর্যাপ্ত কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন ও বিপুল সংখ্যক যুবকদের কারিগরি শিক্ষাদানের ব্যবস্থা, মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদান, সারাদেশে দাতব্য চিকিৎসালয় ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গরীবদের জন্য চিকিৎসার ব্যবস্থা, বৃদ্ধ, অনাথ, অক্ষম, দুঃস্থদের রক্ষণাবেক্ষণে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা, সর্বক্ষেত্রে নারীর সম অধিকার, মাতৃমঙ্গল, শিশু সদন ও শিশু-শিক্ষালয় প্রতিষ্ঠা, মাতৃত্বকালীন ছুটি, বিচার বিভাগকে শাসন বিভাগ থেকে পৃথক করা ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মুসলিম দেশসমূহের পাশাপাশি প্রতিবেশি রাষ্ট্রসমূহের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন, বিশ্ব শান্তি রক্ষা, পাট, চা, ব্যাংক, বীমা, যান-বাহন, বিদ্যুৎ, খনিজ সম্পদসহ প্রাথমিক শিল্প জাতীয়করণ, সমবায় ও যৌথ কৃষি ব্যবস্থা প্রবর্তন, ইসলামের সত্যিকার শিক্ষা ও নৈতিক মূল্যবোধ গ্রহণ, ইত্যাদি।

এছাড়া আশু লক্ষ্য ও কর্মসূচি হিসেবে বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ, কৃষকদের মধ্যে ভূমি বণ্টন, মূল শিল্প জাতীয়করণ, প্রশাসন ও সমাজ থেকে দুর্নীতি দূরীকরণ, প্রশাসনের ব্যয় হ্রাস, কেন্দ্র ও প্রদেশের মধ্যে রাজস্বের ন্যায্য বণ্টন ইত্যাদি তাতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

কর্মী সম্মেলনের পর দ্রুত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সাংগঠনিক বিস্তৃতি ঘটতে থাকে। পাকিস্তান সৃষ্টির পূর্বে বঙ্গীয় মুসলিম লীগের মধ্যে যে দু’টি ধারার সৃষ্টি হয়েছিল (যা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে), এর মধ্যে সোহরাওয়ার্দী-হাশিম সমর্থক হিসেবে পরিচিত মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আগত, পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত, বয়সে অপেক্ষাকৃত তরুণ প্রগতিশীল অংশের নেতাকর্মীরা জেলায়-জেলায় এ সময়ে নতুন প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতি সমর্থন জানিয়ে সংগঠিত হতে থাকে। স্বল্প সময়ের মধ্যে দেশজুড়ে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক রূপ লাভের ক্ষেত্রে এই বিশেষ অবস্থা খুবই অনুকূল হয়েছিল। এছাড়া বিভিন্ন গণদাবি, যেমন— বিদ্যমান খাদ্য সংকট নিরসনের ব্যাপারে সভা-সমাবেশ, ভুখা মিছিল ইত্যাদির মাধ্যমে সরকারের ওপর অব্যাহত চাপ প্রয়োগের নীতি গ্রহণ করায় নতুন এ দলের প্রতি দ্রুত জনসমর্থন বাড়তে থাকে।

পাকিস্তানি রাষ্ট্র কাঠামোর ভেতর প্রতিষ্ঠা লাভ করায় আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার শুরুতে নামের সঙ্গে ‘মুসলিম’ শব্দ যুক্ত রাখতে হয়েছিল। তবে ১৯৫৫ সালে বঙ্গবন্ধুর উদ্যোগে (তখন তিনি দলের সাধারণ সম্পাদক) দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দ বাদ দিয়ে সংগঠনের সদস্য পদ সবার জন্য উন্মুক্ত করা হয়। বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে একটি বিস্তারিত কর্মসূচিও গ্রহণ করা হয়, যা আগে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাই ছিল বাঙালিদের দল হিসেবে। এর চেতনামূলে ছিল বাঙালির জাতীয় মুক্তি বা স্বাধীনতা। স্বল্প সময়ের মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দলের নেতৃত্বের অগ্রভাগে চলে আসেন। ১৯৫২ সালে তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৫৩-১৯৬৫ সাল পর্যন্ত ১৩ বছর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১৯৬৬ সালে তিনি আওয়ামী লীগ কাউন্সিলে সভাপতি নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগকে তৃণমূল পর্যায় থেকে শক্তিশালী ভিতের ওপর দাঁড় করিয়ে বাঙালির জাতীয় মুক্তির মঞ্চে পরিণত করতে তিনি সর্বশক্তি নিয়ে আত্মনিয়োগ করেন। এমনকি এ জন্য ১৯৫৭ সালে মন্ত্রিত্বের পদ পর্যন্ত ছেড়ে দিয়ে তিনি দলের সাধারণ সম্পাদকের পদে নিজেকে বহাল রেখেছিলেন। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধোত্তর তার বাঙালির মুক্তি সনদ ৬-দফা কর্মসূচি (১৯৬৬) (দ্রষ্টব্য হারুন-অর-রশিদ, ‘আমাদের বাঁচার দাবি’ ৬-দফা’র ৫০ বছর, বাংলা একাডেমি ২০১৬), তার বিরুদ্ধে আগরতলা মামলা (১৯৬৮) মোকাবিলা, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ৭০-এর নির্বাচনে ৬-দফা প্রশ্নে বাঙালিদের আওয়ামী লীগের পক্ষে গণরায় বা ম্যান্ডেট লাভ ও বিপুল বিজয় অর্জন, ‘নির্বাচনের রায় বানচাল করতে ইয়াহিয়ার সামরিক জান্তার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর ২-২৫ মার্চ ১৯৭১ অসহযোগ আন্দোলনের ডাক, ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে স্বাধীনতার লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণে বাঙালিদের প্রতি আহ্বান, ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হওয়ার পূর্ব মুহূর্ত বঙ্গবন্ধুর সরাসরি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা, তাকে রাষ্ট্রপতি করে ১০ এপ্রিল ১৯৭১ গঠিত মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্বে ৯ মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের মধ্যদিয়ে স্বাধীন বাঙালি জাতি ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়। এরই সঙ্গে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার অন্তর্নিহিত চেতনা এবং বাঙালি ও বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ লালিত নিজস্ব স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্নের সফল বাস্তবায়ন ঘটে। আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও তাৎপর্য এখানেই।

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই ২০৪১ সালে বাংলাদেশ হবে ক্ষুধা, দারিদ্র, অশিক্ষা, সাম্প্রদায়িকতামুক্ত, উন্নত-সমৃদ্ধ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’। দেশের ঐতিহ্যবাহী, বৃহত্তম ও জনগণের দল আওয়ামী লীগের ৭৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এটিই দেশবাসীর প্রত্যাশা।

লেখক: সাবেক উপাচার্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়


আওয়ামী লীগ   শেখ মুজিব  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

স্বেচ্ছা পদাবনতি, এত ট্রল কেন?


Thumbnail

স্বেচ্ছায় ক্যাডার চাকুরী ছেড়ে দেয়ার অনেক নজির রয়েছে। কিন্তু স্বেচ্ছায় পদাবনতি। স্বেচ্ছায় ক্যাডার চাকুরী ছেড়ে নন ক্যাডার চাকুরী গ্রহণ। এসব খবর সচরাচর শোনা যায় না। সম্প্রতি বিসিএস তথ্য ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা ক্যাডার চাকুরী ছেড়ে দিয়ে সাব রেজিস্ট্রার হয়েছেন। সাব রেজিস্ট্রার পদটি নন ক্যাডার ভুক্ত। পদোন্নতির সম্ভাবনা সীমিত। কিন্তু এখানে নিজের অর্থনৈতিক উন্নতির অপার সম্ভাবনা। বিয়ের বাজারেও খুব দাম। অফিস কক্ষটিতে একটা আদালত ভাব রয়েছে। সভা কক্ষটি যেন একটি এজলাস। শান শওকত মন্দ নয়। আশে পাশে শুধু টাকা আর টাকা। বোধ করি সেজন্যই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিরাট হৈচৈ। সবাই তাকে নিয়ে ট্রল করছে। অনেকেই বলছেন, তিনি বুদ্ধিমান, তিনি স্মার্ট। টাকার খনির মালিক হবার জন্য তার এ স্বেচ্ছায় পদাবনতি।

স্বেচ্ছায় ক্যাডার চাকুরী অনেকেই ছাড়েন। তিনিও ছেড়েছেন। তাতে অবাক হবার কিছু নেই। তিনি ক্যাডার হবেন নাকি নন ক্যাডার হবেন, সেটি তার একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার। এখানে না জেনে শুনে ট্রল করার কোন যৌক্তিকতা দেখি না। ট্রলকারীদের বক্তব্যের সারাংশ হচ্ছে, তিনি দুর্নীতি করার জন্য সাব রেজিস্ট্রার হচ্ছেন। কারণ সাব রেজিস্ট্রার অফিসের দুর্নীতি সর্বজন বিদিত। বছর দুয়েক আগে টিআইবি'র এক জরিপে দেখা গেছে, ভূমি খাতের দুর্নীতি দেশে ষষ্ঠ স্থান অধিকার করেছে। প্রথম স্থানে রয়েছে পুলিশ বিভাগ। ভূমি খাতে সেবা নিতে এসে দুর্নীতির শিকার হয়েছে ৪৬.৩ শতাংশ খানা। ঘুষ দিয়েছে এমন খানার সংখ্যা ৩১.৫ শতাংশ। গড় ঘুষের পরিমাণ ৭ হাজার ২৭১ টাকা।

এমন তো হতে পারে, ভূমি খাতের এ সব দুর্নীতির কথা শুনে তার বিবেক দংশিত হয়েছে। তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদ করার জন্য রেজিস্ট্রি অফিসে যোগ দিচ্ছেন! জাতিসংঘের সংজ্ঞায় যাদের বয়স ১৫ থেকে ২৯ বছরের মধ্যে, তাদেরই তরুণ বলা হয়। সেই হিসাবে তিনি বয়সে তরুণ। ‘দুর্জয় তারুণ্য দুর্নীতি রুখবেই’- তিনি হয়ত এ স্লোগানে বিশ্বাস করেন! তিনি হয়ত নিজ কর্মক্ষেত্র থেকে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যেতে চান! নিজের অর্থনৈতিক উন্নয়ন নাকি দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের জন্য তিনি স্বেচ্ছায় পদাবনতি বেছে নিয়েছেন, সেটি এখন একটি মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। আমরা ভালটাই বিশ্বাস করতে চাই। বিশ্বাস করতে চাই যে, এই তরুণ দুর্নীতির জন্য নয়, দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য স্বেচ্ছায় পদাবনতি বেছে নিয়েছেন।

বর্তমান সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছে। দুদক এ ব্যাপারে খুবই সজাগ। আয়কর বিভাগও পিছিয়ে নেই। সবার প্রত্যাশা, দুদক ও আয়কর বিভাগ স্বেচ্ছায় পদাবনতি গ্রহনকারী কর্মকর্তাকে শুরু থেকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখুক। তাহলে ভবিষ্যতে বোঝা যাবে তিনি কি দুর্নীতির করার মোহে আকৃষ্ট হয়ে স্বেচ্ছা পদাবনতি নিলেন, নাকি দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেহাদ করতে সাব রেজিস্ট্রার হলেন।

আবার কেউ কেউ বলছেন, তথ্য ক্যাডারে নাকি ১০ বছরেও পদোন্নতি হয় না। তাতে আর্থিক সংকটে ভুগতে হয়। মর্যাদা সংকটও হয়। শুধু তিনি এক নন, আরো অনেকেই নাকি তথ্য ক্যাডারের চাকুরী ছাড়ার কথা ভাবছেন। বিষয়টি সত্য হলে সেটি ভাবনার বিষয়, দুঃখজনকও বটে। সেক্ষেত্রে সরকারের উচিত ক্যাডার বৈষম্য কমানোর উদ্যোগ নেয়া। উক্ত কর্মকর্তার স্বেচ্ছায় পদাবনতিকে একটি কেস হিস্ট্রি হিসাবে গ্রহণ করে সরকারের উচিত এটির ময়না তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। 

লেখকঃ প্রবাসী চিকিৎসক, কলামিস্ট 


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

এখুনি না বলি, সাবাস মায়ের দোয়ার দল!


Thumbnail

টি-২০ ফরম্যাটে যে কোন দল অন্য দলকে হারাতে পারে। তাই বলে র‌্যাংকিং এর ৮৮ নম্বরের একেবারে তলানির দল ক্রোয়েশিয়া, এক নম্বর দল ভারতকে হারাবে সেটি নিশ্চয়ই কেউ বিশ্বাস করবে না। ব্যতিক্রম যে হয় না, তা নয়। যেমন ৭ নম্বর দল পাকিস্তান সেদিন ১৭ নম্বর দল আমেরিকার কাছে হেরেছে। সেসব ব্যতিক্রম সব সময় হয় না, কালে ভদ্রে হয়।  

র‌্যাংকিং এ বাংলাদেশের অবস্থান এখন ৯ নম্বরে (রেটিং ২২৬)। এবারের টি-২০ বিশ্বকাপ আসরে তারা খেলছে ৫ নম্বর দল সাউথ আফ্রিকা (রেটিং ২৪৯), ৮ নম্বর দল শ্রীলংকা (রেটিং ২৩০), ১৫ নম্বর দল নেদারল্যান্ড (রেটিং ১৮৫) ও ১৮ নম্বর দল নেপালের সাথে (রেটিং  ১৭০)। বাংলাদেশ সাউথ আফ্রিকার সাথে  হারবে, নেদারল্যান্ড ও নেপালের সাথে  জিতবে, সেটা স্বাভাবিক। এটির ব্যতিক্রম হলে সেটা অস্বাভাবিক, সেটা কারো জন্য চমক, কারো জন্য দুর্ভাগ্য। র‌্যাংকিং এ বাংলাদেশ ও শ্রীলংকা সমানে সমান, ৮ আর ৯। রেটিং ব্যবধান মাত্র ৪। শ্রীলংকার সাথে জিতেছে, প্ৰশংসা করা যায়। তবে তাতে মাথায় তোলার মত কিছু হয়নি।

গত রাতে ৯ নম্বর বাংলাদেশ দল যখন ১৫ নম্বর দল নেদারল্যান্ডের বিরুদ্ধে খেলছিল, তখন ভয় আতংকে গা হাত পা কাঁপছিল। এক পর্যায়ে উইন প্রিডিক্টর বলছিল, নেদারল্যান্ডের জেতার সম্ভাবনা ৫৭ শতাংশ। সেটি হলে, তা হতো নেদারল্যান্ডের জন্য চমক, বাংলাদেশের জন্য দুর্ভাগ্য।  

গা হাত পা কাঁপাকাপি শেষে ঘুমের পর সকালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখি আমরা প্রায় বিশ্বকাপ পেয়ে গেছি। দেশীয় মিডিয়াতে দেখি বাংলাদেশ কি সব অর্জন করেছে। ক্রিকেটে অর্জনের যেন কিছু আর বাকি নেই। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে নেপালের সাথে জেতার পর জাতির পা আর মাটিতে পড়বে না, এভারেস্টের চূড়ায় উঠে যাবে। 

জাতি হিসাবে আমরা আসলে অল্পতে তুষ্ট। যে দুটি খেলায় জেতার কথা, সে দুটোতে জিতলে আমরা আবার শান্তদের মাথায় তুলবো।  তাসকিনদের বেতন বাড়াবো। হাতুরীদের সুযোগ সুবিধা বাড়াবো, চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধি করব। ছাদখোলা বাসে সম্বর্ধনা দিব। সাকিবরা দেশে ফিরে এমপি মন্ত্রী হবে। খেলা বাদে সব কিছুই করবে। তাই আমাদের ক্রিকেটে উন্নতি হয় না। বিশ বছর আগে যা ছিল, এখনো তাই। এখনো তাদের খেলা দেখতে বসলে সমস্ত শরীর কাঁপে। প্রেসারের ওষুধ খেতে হয়। নিজেরা দোয়া পড়ি।  মায়েদের দোয়া করতে অনুরোধ করি। মায়েদের দোয়ায় কাজ যে হয় না, তা নয়। হয়। দোয়ায় দোয়ায় র্যাংকিং এর নিচের দলকে মায়ের দোয়ার দলটি হারিয়েছে সৌম্য শান্তর উপর্যুপুরি একক ব্যর্থতার পরও।  

মায়ের দোয়ার দলটির উন্নতি চাইলে র‌্যাংকিং এর নিচের দলকে হারালে অতি তুষ্টতা পরিহার করা উচিত। অভিনন্দনের মধ্যেই থাকি, মাথায় না তুলি। পার্শবর্তী সব ক্রিকেট খেলুড়ে দেশগুলো থেকে আমার অনেক সহকর্মী রয়েছে। স্বাভাবিক জয়ের পর তাদের মধ্যে কখনোই উচ্ছাস দেখি না। উদ্বেলিত হয় বিশ্বকাপ জিতলে। তবে হাঁ, আমরা যদি র্যাংকিং এর উপরের কোন দলকে হারাই, তবেই বলি, সাবাস বাংলাদেশ। সাবাস মায়ের দোয়ার দল। 

লেখক: প্রবাসী চিকিৎসক, কলামিস্ট 


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

দূর-নিরীক্ষণ স্বাস্থ্য সেবা


Thumbnail

আজ থেকে চার বছর আগে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের মোকাবেলায় প্রায় সব দেশেই জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষা একটি চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়েছিল যার জের আজও চলছে। কোভিড-১৯ সংক্রমণের মাত্রা এতোই তীব্র যে, কে কখন আক্রান্ত হয়েছে বা কে নীরব আক্রান্তের ঝুঁকির মধ্যে আছে তা তাৎক্ষণিক যাচাই করাও কঠিন ছিল। পরীক্ষার সীমিত ব্যবস্থাদি বা সুযোগের সীমাবদ্ধতার প্রধান কারণ সবগুলো দেশ প্রায় একই সাথে আক্রান্ত হয়েছে ও পরীক্ষার কীট ও যন্ত্রপাতি সব দেশে সমান্তরাল রীতিতে বিতরণ নিশ্চিত করা যাচ্ছিল না। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্যে এই সঙ্কট আরও জটিল কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় সময়োচিত পদক্ষেপ নেয়ার ফলে বাংলাদেশ পরিস্থিতিকে আয়ত্তাধীন রাখতে সক্ষম হয়েছে।  

কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল বাংলাদেশের সাধারণ স্বাস্থ্য ও হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থার নিয়মগুলো সঠিকভাবে বজায় রাখা। কোভিড ও নন-কোভিডের পার্থক্য নিরূপণ প্রথম শর্ত না কি মানুষের স্বাস্থ্য জটিলতার আপাত নিরসণ কাম্য – এই নিয়ে সরব তর্ক চলেছে দেশ জুড়ে। কিন্তু আমাদের চিকিৎসক সমাজকে সংখ্যানুপাতে বেশী মানুষের সেবা দিতে হয় ও তাঁদের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ঝুঁকিও কোন অংশে কম নয়। শুধু চিকিৎসকই নয়, স্বাস্থ্য সেবায় নিয়োজিত অন্যান্য জনশক্তির সংখ্যা সামর্থ্যও আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে। বাংলাদেশে করোনায় আক্রান্ত হয়েছে স্বাস্থ্য সেবায় নিয়োজিত একটি বিপুল জনগোষ্ঠী ও অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের পরিবারের সদস্যগণও আক্রান্ত হয়েছেন। অনেক চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য কর্মী মারাও গেছেন যা বাংলাদেশের জন্যে অপূরণীয় ক্ষতি। আমাদের এ-ও বিবেচনায় রাখতে হবে পরিবারের কোন সদস্য আক্রান্ত হলে বা দুর্ভাগ্যবশত মারা গেলে সমগ্র পরিবারেই তার প্রভাব পড়ে ফলে স্বাস্থ্য সেবায় নিয়োজিত চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্মীদের পারিবারিক দুর্গতি ও মানসিক স্বাস্থ্যের কথাও আমাদের ভাবতে হবে। 

ফলে আমরা চিকিৎসা কেন্দ্রে তখন রোগী কম দেখে বা চিকিৎসকদের একটি নিয়মের মধ্যে সেবা দিতে দেখে পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে বলে যে হইচই করেছি তা বাস্তবসম্মত ছিল না। যেমন ধরুন, করোনা পরিস্থিতির আগে আমাদের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোর যে উপচে পড়া ভিড়ের চিত্র আমরা দেখেছি শেষের দিকে তা ছিল না। এর অন্যতম প্রধান কারণ আমাদের স্বাস্থ্য সচেতনতা বেড়েছে ও বেশিরভাগ মানুষ উপসর্গ অনুযায়ী বাড়ি বসে চিকিৎসা নিয়েছে ও যথাসম্ভব ভালো থেকেছে। সামান্য উপসর্গে মানুষের চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার যে সাধারণ প্রবণতা তা অনেক কমে এসেছে ও তাতে চিকিৎসকদের উপর চাপও কমেছে। আমার বন্ধু চিকিৎসকদের অনেকেই বলেছেন তখন শান্তিতে অন্তত মনোযোগ দিয়ে চিকিৎসা সেবা দিতে পেরেছি, আগে এতো ভিড়ের চাপে রোগী সামলানো কঠিন ছিল। সবচেয়ে বড়ো কথা, চিকিৎসকগণ সানন্দে এগিয়ে এসেছেন যাতে সাধারণ মানুষ ঘরে বসেই ফোনের মাধ্যমে তাঁদের পরামর্শ সেবা পেয়ে ভালো থাকেন। বাংলাদেশের অনেক চিকিৎসক বিনামূল্যে এই সেবা দিয়েছেন এমন কি মোবাইল ফোনের ভিডিওতেও রোগীর সাথে কথা বলে, লক্ষণের সামগ্রিক বিবরণ শুনে ব্যবস্থাপত্র দিয়েছেন ও ফলো-আপ করছেন। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে রোগীকে চিকিৎসা কেন্দ্রে যাবার পরামর্শও দিয়েছেন।

এই বাস্তবতা মাথায় রেখে আমাদের বুঝতে হবে চিকিৎসা কেন্দ্রে বেশী মানুষের উপস্থিতি চিকিৎসার মান মোটেও নিশ্চিত করে না বা ব্যবস্থাপনার সাফল্য নির্দেশ করে না। অসুস্থ বা রোগপ্রায় মানুষ চিকিৎসা সেবা পেয়ে ও যথাযথ চিকিৎসা সেবা দিতে পেরে যুগপৎ জনসাধারণ ও চিকিৎসক সমাজ  কতখানি নিশ্চিত বোধ করছেন সেখানেই স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সাফল্য নির্ভর করে। ফলে আমাদের সেই স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এখন নিশ্চিত করতে হবে যেখানে দেশের সব মানুষ সেবার আওতায় আসবে। আমার বিশ্বাস গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে দূর-নিরীক্ষণ পরামর্শ সেবা তা নিশ্চিত করতে পারে যা মোবাইল ফোন, ভিডিও কথোপকথন ওই ইন্টারনেটের অন্যান্য সুবিধা দিয়ে নিশ্চিত করা যায়।

স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় পরামর্শ সেবার বহির্বিভাগের চাপ কমাতে আরও বিনিয়োগ না বাড়িয়েও আমরা খুব সহজে ইন্টারনেটভিত্তিক সেবা সম্প্রসারণ করতে পারি কারণ সরকারের উদ্যোগে এখন প্রায় সব গ্রাম ও ইউনিয়ন পর্যায়ে উচ্চ গতির ইন্টারনেট সহজলভ্য হয়েছে। একটি গ্রামের প্রশিক্ষিত ও সরকার কর্তৃক নিবন্ধিত স্বাস্থ্যকর্মী ইন্টারনেট পরিষেবায় শারীরিক লক্ষণ অনুযায়ী চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ তৈরি করিয়ে দিতে পারে (শুধু লক্ষ্য রাখতে হবে সেসব চিকিৎসক যেন সরকার স্বীকৃত নিবন্ধনপ্রাপ্ত হয় নতুবা এই সেবায় এক শ্রেণীর ফড়িয়া চিকিৎসা সেবার নামে প্রতারণাও করতে পারে)। একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ থেকে চিকিৎসকের তথ্য নিয়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে সারা দেশে প্রাথমিক পরামর্শ সেবা ছড়িয়ে দেয়া সম্ভব। আর এই সেবার বাস্তবায়ন, তত্ত্বাবধান ও মনিটরিং-এর দায়িত্ব দেয়া যাবে নানা স্তরে- কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র ও উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোকে। 

ইন্টারনেট ব্যবহার করে স্তন ক্যান্সার চিকিৎসায় এরকম একটি দূর-নিরীক্ষা চিকিৎসা পরামর্শ সেবা ২০০৯ সাল থেকে চালু আছে খুলনা ও বাগেরহাটের গ্রামাঞ্চলে। ‘আমাদের গ্রাম’ পরিচালিত এই প্রকল্পটি ইতোমধ্যে দেশে বিদেশে একটি মডেল হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে। পরামর্শের জন্যে আগত সকল রোগীর বিস্তারিত তথ্য একটি নির্ধারিত ইন্টারনেটভিত্তিক সফটওয়্যারে সংরক্ষিত থাকে। এরকম ক্ষেত্রে কেবল চিকিৎসার দ্বিতীয় ধাপে সন্দেহভাজন বা সম্ভাব্য রোগীকে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হয়। ডিজিটাল বাংলাদেশের এরকম আরও অনেক অভিজ্ঞতা দেশের নানা স্থানে ছড়িয়ে আছে যেগুলো পর্যবেক্ষণ করে ও আধুনিক ভাবনার সাথে মিলিয়ে আমরা একটি নতুন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারি। এখানে একটি বিষয় হয়তো সামনে আসবে সে হলো চিকিৎসার নৈতিক শর্ত যা হলো রোগীকে উপস্থিত স্পর্শ করে পরীক্ষা করা যাকে আমরা ‘ইন্টারমেডিয়ারী’ বলি তা কেমন করে নিশ্চিত হবে। এ ক্ষেত্রে আমাদের মনে রাখতে হবে প্রযুক্তির হাতে তাপমাত্রা নিরীক্ষণ বা নাড়ী নিরীক্ষণ-সহ অনেক চিকিৎসা সেবা ব্যবস্থা অনেক আগেই আমরা ছেড়ে দিয়েছি। সে ক্ষেত্রে একজন প্রশিক্ষিত ও নিবন্ধিত স্বাস্থ্য কর্মী শর্ত অনুযায়ী যেটুকু নিরীক্ষা করা সঙ্গত তার একটি প্রাথমিক নীতিমালা/গাইডলাইন নিশ্চয়ই আমরা তৈরি করে নিতে পারি।

দেশের বেশিরভাগ মানুষের জন্যে একটি উপযুক্ত দূর-নিরীক্ষণ প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা প্রক্রিয়া গঠন ও তা মানসম্মত উপায়ে সমুন্নত রাখা এখন অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়েছে। সদাশয় সরকার ও আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা পরিকল্পনার সাথে যুক্ত সকলে মিলে এই ভাবনার বাস্তব ও নীতিসঙ্গত উপায় তৈরি করে নেয়া এখন জরুরি। আশা করি সংশ্লিষ্ট সবাই বিষয়টি ভেবে দেখবেন।    


--রেজা সেলিম

পরিচালক, আমাদের গ্রাম গবেষণা প্রকল্প



দূর-নিরীক্ষণ   স্বাস্থ্য সেবা   রেজা সেলিম   মতামত   মাটির টানে  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ও আশ্রয়ণ প্রকল্পের আম্পায়ারিং


Thumbnail

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ক্রিকেট শুরু হয়েছে। প্রথমবারের মত টুর্নামেন্টটি চলছে আমেরিকায়। এবারই প্রথম সবচেয়ে বেশি ২০টি দল খেলছে এ টুর্নামেন্টে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে দুটি খেলেছে। একটিতে জয়। আরেকটিতে হার। জয়টি নিয়ে যতটা না আলোচনা, হারটি নিয়ে আলোচনা সমালোচনা তার চেয়ে ঢের বেশি। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষের খেলাটির আম্পায়ারিং নিয়ে তুমুল সমালোচনা। আম্পায়ার কেন মাহমুদউল্লাহকে আউট দিল। ভুল আউট টি না দিলে বাংলাদেশ চার রান পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয় না। চার রান পেলে বাংলাদেশ ম্যাচটি জিতে যেত। আম্পায়ার কেন কয়েকটি ওয়াইডও দেয়নি যা ওয়াইড ছিল। এসবের মধ্যে আরেকটি ক্রিকেট ম্যাচ দেখলাম ছিন্নমূল, ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের মাঝে দলিলসহ জমি-ঘর হস্তান্তর অনুষ্ঠানে। অন্যান্য ক্রিকেট ম্যাচের মত এ অনুষ্ঠানটিও টিভিতে সরাসরি সম্প্রচার হচ্ছিল। সেখানেও ছিল বিতর্কিত আম্পায়ারিং ।

জমি-ঘর হস্তান্তর অনুষ্ঠানটিতে গণভবন থেকে সরাসরি অনলাইন কনফারেন্সের মাধ্যমে যুক্ত হন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একপ্রান্তে গণভবন। আরেক প্রান্তে লালমনিরহাট জেলার কালীগঞ্জ থানার মহিষামুড়ি আশ্রয়ণ প্রকল্প। ম্যাচটিতে আম্পায়ার ছিলেন স্থানীয় টিএনও। আশ্রয়ণ প্রকল্পের খেলোয়াড় (বক্তা) টিএনও ঠিক করে রেখেছিলেন কি না জানিনা। তবে এসব অনুষ্ঠানে স্থানীয় প্রশাসন সাধারণত আগে থেকে বক্তা ঠিক করে রাখেন।

ক্রিকেট খেলার কিছু মহান ঐতিহ্য রয়েছে। এমনই একটি ঐতিহ্য হল একজন খেলোয়াড়ের আবেদন করার পদ্ধতি। প্রায়ই খেলোয়াড়দের "হাউজাট" বলে চিৎকার করতে দেখা যায়। কখনও কখনও যতটা জোরে পারেন, ডাকেন। প্রশ্ন হচ্ছে, এর মানে কি? হাউজাট (Howzat) শব্দটি হাউ ইজ দ্যাট (How's that) এর একটি সংক্ষিপ্ত রূপ, যা একজন ব্যাটসম্যান আউট হয়েছে কি না তা একজন আম্পায়ারকে জিজ্ঞাসা করার একটি উপায় হিসাবে বিবেচিত হয়। আপিল ছাড়া একজন আম্পায়ার কিছু কিছু ক্ষেত্রে একজন ব্যাটসম্যানকে আউট দিতে পারে না। ক্রিকেটের আপীল সংক্রান্ত প্রবিধান ৩১ নম্বর অনুচ্ছেদে এমনটা উল্লেখ আছে। সেখানে বলা হয়েছে যে, ফিল্ডিং দলকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আম্পায়ারের কাছে আবেদন করতে হবে। সেজন্য বোলার, কিপার এবং ফিল্ডিং দলের অন্যান্য সদস্যরা 'হাউজাট' বলে চিৎকার করেন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রান্তিক জনগণের কথা শুনতে পছন্দ করেন। সেদিন তিনি খুব মনযোগের সাথে শুনছিলেন মহিষামুড়ি আশ্রয়ণ প্রকল্পের বিধবা বৃদ্ধা শাহেরুন এর কথা। বৃদ্ধা খুবই আবেগের সাথে নিজের দুঃখ দুর্দশার কথা বলছিলেন। মমতাময়ী প্রধানমন্ত্রী বৃদ্ধার মর্মস্পর্শী বক্তব্য হৃদয় দিয়ে অনুধাবন করছিলেন। বক্তব্য শেষে বৃদ্ধা মোনাজাত ধরলেন। এরই মধ্যে আম্পায়ার আউট দিয়ে দিলেন। বৃদ্ধা তো আর 'হাউজাট' জানেন না। তিনি আপীল করেন। ডান হাতের মাইক্রোফোন বা হাতে নিয়ে আপীলের জানান দেন। আম্পায়ার নাছোড়বান্দা। তিনি বৃদ্ধার কাছ থেকে মাইক্রোফোন কেড়ে নিয়ে আবার আউট দিলেন।

এ ঘটনায় অনলাইনে সরাসরি যুক্ত থাকা প্রধানমন্ত্রী উষ্মা প্রকাশ করেন। তিনি বলে ওঠেন ‘এটা কী, একজন মানুষ মোনাজাত করছেন, আর হাত থেকে সেটা (মাইক্রোফোন) কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। হোয়াট ইজ দিস। এটা কী?’ প্রধানমন্ত্রী আবারও বলেন, 'এই এই এটা কী করো, এটা কেমন কথা হলো। মোনাজাত করছে আর তার হাত থেকে মাইক্রোফোনটি কেড়ে নিল। হোয়াট ইজ দিস?' এ সময় প্রধানমন্ত্রী যা বলেন, তা ক্রিকেটীয় পরিভাষায় বললে দাঁড়ায়, হাউজাট বা হাউ ইজ দ্যাট। প্রধানমন্ত্রী ক্রিকেট খেলা দেখেন। সময় পেলে দেশের ক্রিকেট সরাসরি দেখেন। এমনকি মাঝে মাঝে তাঁকে স্টেডিয়ামে যেয়েও খেলা দেখতে দেখা যায়। তিনি ক্রিকেটীয় পরিভাষার 'হাউ ইজ দ্যাট' বোঝেন। কিন্তু তিনি সেদিন দাপ্তরিক পরিভাষায় 'হোয়াট ইজ দিস’ বলেন। বারবার আপিল করাতে আম্পায়ার আউটটি বাতিল করেন। বৃদ্ধা শাহেরুন মাইক্রোফোন ফিরে পেয়ে মোনাজাত সম্পন্ন করে তার ইনিংস শেষ করেন।

ক্রিকেটের সৌন্দর্য আম্পায়ারিং এ। আম্পায়ারিং ভাল না হলে খেলাটি তার সৌন্দর্য হারায়। খেলায় ছন্দপতন হয়। জয় পরাজয় নির্ধারণে স্বাভাবিকতা থাকে না। তেমনি আম্পায়ারের অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্তের কারণে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে ছিন্নমূল, ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের লাইভ অনুষ্ঠানটি দৃষ্টিকটু লেগেছে। এসব আম্পায়ারদের আরো বেশি দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজন 'আম্পায়ারিং' এর উপর আরো বেশি বেশি প্রশিক্ষণ। 

লেখক: প্রবাসী চিকিৎসক, কলামিস্ট

আশ্রয়ণ প্রকল্প   বিতর্ক   আম্পায়ারিং  


মন্তব্য করুন


বিজ্ঞাপন