ইনসাইড থট

কি ঘটেছিল ৭ নভেম্বর

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৮:০৪ এএম, ০৭ নভেম্বর, ২০২১


Thumbnail

খালেদ মোশাররফ যখন সেনাপ্রধান হওয়ার জন্য বঙ্গভবনে দেনদরবার করছিলেন, তাহের তখন বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্যদের সঙ্গে যোগযাযোগ রেখে চলেছিলেন। জাসদের পার্টি ফোরাম এ সময় একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়। সিদ্ধান্তটি ছিল ৯ নভেম্বর থেকে লগাতার হরতাল দেওয়া এবং ঢাকায় ব্যাপক শ্রমিক-ছাত্র-জনতার সমাবেশের আয়োজন করে একটি গণ-অভ্যূত্থান ঘটানো। জাসদের মূল রাজনৈতিক তত্ত্বের সঙ্গে এই অভ্যুত্থান পরিকল্পনা ছিল সামঞ্জস্যপূর্ণ। অন্য পিকিংপন্থী দলগুলোর মতো তাঁরা ‘মুক্ত এলাকার বিস্তার ঘটিয়ে রাজধানী অবরোধ করার’ কৌশলে বিশ্বাস করতেন না।

৬ নভেম্বর সন্ধ্যায় সাজদের পার্টি ফোরামের ইমার্জেন্সি ষ্ট্যান্ডিং কমিটির বৈঠক বসে ঢাকার কলাবাগানের একটি বাসায়। এই কমিটির সদস্য ছিলেন সিরাজুল আলম খান, আখলাকুর রহমান, মোহাম্মদ শাজাহান, হারুনুর রশীদ, মনিরুল ইসরাম, হাসানুল হক ইনু ও খায়ের এজাজ মাসুদ। সভায় হারুনুর রশীদ ও মোহাম্মদ শাজাহান উপস্থিত ছিলেন না। মো. শাজাহান তখন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী। সভায় উদ্ভুত পরিস্থিতি নিয়ে আলোচন চলছিল। কর্নেল তাহের সভায় এসে উপস্থিত হন। সরকারি চাকরিতে থাকার কারণে তাঁকে কোনো কমিটিতে রাখা হতো না। তবে তিনি ষ্ট্যান্ডিং কমিটির মিটিংয়ে অংশ নিতে পারতেন। তাহের উপস্থিত সবাইকে জানান, জিয়াউর রহমান টেলিফোনে তাঁকে বাঁচানোর অনুরোধ করেছেন।

কিছুক্ষণ পর সেনাবাহিনীর একজন তরুণ কর্মকর্তা আসেন অসামরিক পোষাকে। তিনি তাহেরকে ফিসফিস করে কিছু বলেন এবং তাঁর হাতে দুটো চিরকুট দেন। ওই ব্যক্তি চলে যাওয়ার পর তাহের একটি চিরকুট পড়ে শোনান। এটা জিয়ার হাতের লেখা:

আই অ্যাম ইনটার্নড, আই ক্যান্ট টেক দ্যা লিড। মাই মেন আর দেয়ার। ইফ ইউ টেক দ্যা লিড, মাই মেন উইল জয়েন ইউ (আমি বন্দী, আমি নেতৃত্ব নিতে পারছি না। আমার লোকেরা তৈরি। তুমি যদি নেতৃত্ব দাও, আমার লোকেরা তোমার সঙ্গে যোগ দেবে)।

তাহের প্রস্তাব দিলেন, জিয়াকে সামনে রেখে অভ্যুত্থান ঘটাতে হবে। আখলাকুর রহমান বেঁকে বসলেন। সভাবসুলভ কণ্ঠে বললেন, ‘ইতা কিতা কন? তাইনরে আমরা চিটি না।’ সভায় আর যাঁরা উপস্থিত ছিলেন, বাস্তবিকই তাঁরা কেউই জিয়াউর রহমানকে চেনেন না, তাঁর সঙ্গে কোন দিন আলাপ হয়নি। সবার মুখে প্রশ্ন, জিয়াকে কি বিশ্বাস করা যায়? তাহের বললেন, ‘আপনারা যদি আমাকে বিশ্বাস করেন, ত াহেল জিয়াকেও বিশ্বাস করতে পারেন। হি উইল বি আন্ডা মাই ফিট’ ( সে আমার পায়ের নিচে থাকবে)। তাহের আরও বললেন, তিনি ইতিমদ্যে সৈনিক সংস্থার লোকদের অভ্যুত্থান ঘটানোর নির্দেশ দিয়ে দিয়েছেন। তাহেরকে অনুরোধ করা হলো এই নির্দেশ প্রত্যাহার করার জন্য। কারণ, অন্যদের তেমন কোনো প্রস্তুতি নেই। তাহের জানালেন, ‘এটা ওয়ানওয়ে কমিউনিকেশন। আমার লোকেরা যোগাযোগ না করলে আমি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারব না।’ তিনি দ্বিতীয় চিরকুকটা বের করলেন। বললেন, এটা বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার গোয়েন্দা শাখা থেকে পাঠানো হয়েছে এবং এটু খুবই জরুরি বার্তা, তাকে লেখা:

খালেদ মোশাররফ’স মেন আর মুভিং ফাষ্ট। দ্যা আয়রন ইজ ট্যু হট। ইট ইজ টাইম টু হিট (খালেদ মোশাররফের লোকেরা খুব তৎপর। লোহা খুবই গরম। এটাই আঘাত করার উপযুক্তত সময়)

আখলাকুর রহমান তবু আপত্তি করছিলেন। তাহের বলশেভিক বিপ্লবের প্রসঙ্গ টেনে লেনিনীয় কায়দায় বললেন, ‘টু লাইট আর নেভার’ (আজ রাতে অথবা কখনোই নয়)। সিরাজুল আলম খান হ্যাঁ-না কিছুই বললেন না। তাহের হাসানুল হক ইনুকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। সভা শেষ হয়ে গেল। আখলাকুর রহমান রওনা হয়ে গেলেন ব্রাহ্মনবাড়িয়োর আখাউড়ার কাছে খড়মপুরে কল্লা শাহর মাজরেরর উদ্দেশে। তাঁর মাজারে মাজের ঘোরার বাতিক ছিল।

খায়ের এজাজ মাসুদের কাছে পুরো বিষয়টাই ‘বালখিল্য’ মনে হয়েছিল। তিনি ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের এফ রহমান হলে চলে এলেন। এটাই ছিল তাঁর কমান্ড হেডকোয়ার্টার।

আবু তাহেরের নির্দেশিত অভ্যুত্থান শুরু হওয়ার কথা ৭ নভেম্বরের প্রথম প্রহরে, রাত একটায়। অভ্যুত্থানের সাতটি লক্ষ্য ছিল:

১. খালেদ মোশাররফ চক্রকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করা;
২. বন্দিদশা থেকে জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করা;
৩. একটি বিপ্লবী মিলিটারি কমান্ড কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা করা;
৪. দলনির্বিশেষে রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দেওয়া;
৫. রাজনৈতিক কর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব গ্রেপ্তারি পরোয়ানা প্রত্যাহার করা;
৬. বাকশাল বাদে সব দলকে নিয়ে একটি গণতান্ত্রিক জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠা করা; এবং
৭. বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার বারো দফা দাবি বাস্তবায়ন করা।

নির্দেশনা ছিল রাত একটায় সুবেদার মাহবুব ফাঁকা গুলি ছুড়ে সংকেত দেবেন। তখন সৈনিকেরা অস্ত্রাগার ভেঙ্গে অস্ত্রশস্ত্র নেবে এবং ‘বিপ্লব’ শুরু করে দেবে। উত্তেজনার বশে সময় ঠিক রাখা যায়নি। এক ঘন্টা আগেই গোলাগুলি শুরু হয়ে যায়। একদল সৈন্য জিয়ার বাসায় গিয়ে জানান, তিনি মুক্ত, বিপ্লব হয়ে গেছে। জিয়া বেরিয়ে এলে সৈনিকেরা তাঁকে টু-ফিল্ড রেজিমেন্টের অফিসে নিয়ে আসেন।

তাহেরের লোকেরা ঢাকা বেতারের নিয়ন্ত্রন নেন। এঁদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, গায়ে খাকি শার্ট-প্যান্ট, কাঁধে রাইফেল। তাড়াহুড়োয় টুপি ও বুট জোগাড় হয়নি। স্পঞ্জের স্যান্ডেল পরেই চলে এসেছেন তাঁরা। এঁদের একজন ছিলেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সূর্য সেন হলের ছাত্রলীগ নেতা মো. শফিকুল ইসলাম। শফিকের মনে হয়েছিল, ‘বিপ্লব হয়ে গেছে, কিন্তু কী করতে হবে কেউ জানে না। পায়ে বুট না স্যান্ডেল-এটা দেখার মতো হুঁশ কারও ছিল না। ভোরবেলায় বেতারে একটা ঘোষণা দেওয়া হয়, বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা ও বিপ্লবী গণবাহিনীর নেতৃত্বে সিপাহি বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে। ঘোষণায় তাহের কিংবা জাসদের পরিচিত কোনো নেতার নাম উল্লেখ করা হয়নি। ঘোষক তাঁর নামটিও বলেননি।

ভোরে তাহের ও ইনু সেনানিবাসে যান এবং জিয়ার সঙ্গে কথা বলেন। জিয়া জানতে চান, সিরাজুল আলম খান কোথায়? জিয়া জাসদের মূল নেতৃত্বের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলেন। সিরাজুল আরম খান তখন কোথায়, তা কেউ জানেন না। তাঁর এই হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যাওয়া নিয়ে ধারণা করা হয়, তাহেরের এই উদ্যোগ সফল হওয়ার সম্ভাবনা নেই এবং তিনি এর সঙ্গে নিজেকে জড়াতে চাননি।

তাহের জিয়াকে ভোরে বেতারকেন্দ্রে নিয়ে আসতে এবং তাঁকে দিয়ে একটি ভাষণ দেওয়াতে চেয়েছিলেন। জিয়া তাহেরের সঙ্গে কোথাও যেতে চাননি। কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা পরামর্শ দেন, সেনাপ্রধানের বেতারকেন্দ্রে যাওয়ার কী দরকার? ভাষণ তো এখানেই রেকর্ড করা যায়? এ প্রসঙ্গে সেনাবাহিনীর ওই সময়ের অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল কর্নেল মইনুল হোসেন চৌধুরীর বক্তব্য উল্লেখ করা যেতে পারে। ততাঁর বর্ণনামতে, ‘ লে. কর্নেল তাহের একটি বেসামরিক জিপে করে দু-তিনজন লোকসহ সেখানে এসে উপস্থিত হন। এসেই তিনি জিয়াকে রেডিও ষ্টেশনে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। আমরা জিয়াকে রেডিও ষ্টেশনে যেতে বারণ করি। এ সময় লে. কর্নেল আমিনুল হক ও তাহেরর মদ্যে ঝগড়া বেধে যায়। একপর্যায়ে আমিনুল হক তাহেরকে বলে বসেন, “আপনারা (জাসদ) তো ভারতের বি-টিম।” ফলে তাহের রাগান্বিত হয়ে সেখান থেকে চলে যান। শেষ পর্যন্ত জিয়ার ভাষণ সেনানিবাসেই রেকর্ড করা হয়। ৭ নভেম্বর সকালে এই ভাষণ প্রচার করা হয়। ভাষটি নিচে উদ্বৃত করা হলো:

প্রিয় দেশবাসী,
আসসালামু আলাইকুম।
আমি মেজর জেনারেল জিয়া বলছি। বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জনগণ, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিডিআর, পুলিশ, আনসার এবং অন্যদের অনুরোধে আমাকে সাময়িকভাবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের চিফ মার্শাল ল অ্যাডমিনিষ্ট্রেটর ও সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করতে হয়েছে। এ দায়িত্ব ইনশা আল্লাহ আমি সুষ্ঠুভাবে পালন করতে যথাসাস্য চেষ্টা করব। আপনারা সকলে শান্তিপূর্ণভাবে যথাস্থানে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করুন। দেশের সর্বস্থানে-অফিস-আদালত, যানবাহন, বিমানবন্দর, নৌবন্দর ও কলকারখানা পূর্ণভাবে চালূ থাকবে। আল্লাহ আমাদের সকলের সহায় হোন। খোদা হাফেজ। বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।

জিয়ার এই ভাষণে কোথাও জাসদ, গণবাহিনী বা তাহেরের উল্লেখ নেই। ভোরেই ‘সিপাহি বিপ্লবের’ ঘন্টা বেজে গিয়েছিল। এই ভাষণ ‘বিপ্লবের’ কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিল।

ঢাকা নগর গণবাহিনীর উদ্যোগে সকাল ১০টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমাবেশের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল এবং জিয়া ও তাহেরের সেখানে উপস্থিত হওয়ার কথা ছিল। জিয়া সেনানিবাসের বাইরে আসতে অস্বীকার করেন। তিনি জানান, একজন সৈনিক হিসেবে তিনি কোনো জনসমাবেশে গিয়ে বক্তৃতা দেওয়ার পক্ষপাতী নন। ততক্ষণে জিয়ার আশপাশে অনেক সেনা কর্মকর্তা উপস্থিত হয়েছেন। জিয়া তখন অনেকটা স্বচ্ছন্দ ও ভারমুক্ত।

ছাত্রলীগ-গণবাহিনীর সদস্যরা ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের চত্বরে শ্লোগান দিচ্ছেন, জিয়া-জলিল জিন্দাবাদ, জিয়া-তাহের জিন্দাবাদ। শহীদ মিনারে সকাল নয়টার দিকে মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে আবুল হাসিব খান সবাইকে সমবেত হওয়ার জন্য ডাকাডাকি করছিলেন। রাস্তায় বেশ কিছু ট্রাক দেখা গেল। ট্রাকে দাঁড়িয়ে সৈনিক ও অসামরিক জনতা মুহুর্মুহু শ্লোগান দিচ্ছেন, ‘জিয়া-মোশতাক জিন্দাবাদ’, ‘নারায়ে তাকবির আল্লাহ আকবর’। কোনো কোনো ট্রাকে খন্দকার মেশাতাকের ছবি। ছাত্রলীগের ঢাকা নগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবদুস সালাম একটা ট্রাকে মোশতাকের ছবি ছিঁড়ে ফেলতে গেলে সৈনিকরা সালামের ওপর চড়াও হন। তাঁরা এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়েন। সমাবেশ ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এরপর তাঁরা সবাই শহীদ মিনার চত্বর থেকে সরে যান এবং ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সায়েন্স অ্যানেক্স ভবনের সামনে জড়ো হন।

হাসিব খানকে লালবাগ থানা দখল করার অনুরোধ জানান আনোয়ার হোসেন। হাসিবকে তিনি বলেন, ‘পুলিশ হাসিনী ডিসব্যান্ড করা হয়েছে। আপনি থানা দখল করুন।’ হাসিব রাখি হননি। তাঁর কথা হলো, ‘আগে রেডিওতে পুলিশ ডিসব্যান্ড করার ঘোষণা দেন। তারপর দেখা যাবে।’ মোহাম্মদপুর-ধানমন্ডি ইউনিট গণবাহিনীকে বলা হয় মোহাম্মদপুর থানা দখল করতে। দেশে যদি বিপ্লব হয়ে থাকে, তাহলে আলাদা করে থানা দখল করার কী প্রয়োজন, এটা বোঝা গেল না। তবু গণবাহিনীর একটা দল মোহাম্মদপুর থানায় গিয়ে পুলিশ সদস্যদের বলল, ‘আমরা বিপ্লব করেছি। আনারা আমাদের সাথে আছেন তো?’ এর কয়েক দিন পর ওই দলের এক সদস্য খোকনকে একা পেয়ে মোহাম্মমদপুর থানার কয়েকজন পুলিশ বেধড়ক পেটায়। খোকন ছিলেন প্রখ্যাত সংগীত পরিচালক ধীর আলী মিয়ার ছেলে।

৭ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি সায়েম সন্ধ্যায় বেতার ও টেলিভিশনে একটা ভাষণ দেন। ভাষণে তিনি বলেন:

রাষ্ট্রপতির পদে জনাব খন্দকার মোশতাক আহমদের পুনর্বহাল হওয়ার পক্ষে স্বতঃস্ফূর্ত দাবি সত্ত্বেও তাঁরই অনুরোধক্রমে আমি রাষ্ট্রপতি দায়িত্বভার চালিয়ে যেতে সম্মত হয়েছি। জনাব খন্দকার মোশতাক আহমদের দেশব্যাপী জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও তিনি ক্ষমতা হস্তান্তরের যে মহান দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন, তা যেকোনো উন্নয়নশীল দেশে বিরল এবং সেই দেশের জনগনের জন্য গর্বের বিষয়।...

পরিবর্তত পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন পরিচালনার জন্য আমরা কতিপয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি।... এই কাঠামোতে রাষ্ট্রপতি স্বয়ং প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হবেন। এতে তিনজন উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক থাকবেন। তাঁরা হচ্ছেন সেনাবাহিনীর প্রধান মেজর জেনারেরল জিয়াউর রহমান, নৌবাহিনীর প্রধান কমোডর মোশাররফ হোসেন খান এবং বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল এম জি তাওয়াব।... জননেতাদের সমন্বয়ে একটা উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হবে।... রাজনৈতিক আদর্শগত কারণে যেসব জননেতা আটক আছেন, তাঁদের অবিরম্বে মুক্তি দেওয়া হবে।

বিচারপতি সায়েমের ভাষণের পরপরই খন্দকার মোশতাক আহমদের একটি ভাষণ প্রচার করা হয়। ‘স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুন্ন রাখার জন্য যে অভূতপূর্ব বিপ্লব সংঘটিত হয়েছৈ’, ভাষণে তিনি সে জন্য দেশের সেনাবাহিনী, বিমানবাহনী, সকল নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনী ও সর্বস্তরের জনগনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

৭ নভেম্বর সন্ধ্যায় জিয়া ঢাকা বেতার কেন্দ্রে যান। তাহের সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা একসঙ্গে বসে নতুন ও বিদায়ী রাষ্ট্রপতির ভাষণ শোনেন। উত্তেজিত সৈনিকেরা লিখিতভাবে তাঁদের বারো দফা দাবির একটি কাগজে জোর করে জিয়ার সই নেন। বেশ বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয় জিয়াকে।


সূত্র: জাসদের উত্থান পতন: অস্থির সময়ের রাজনীতি



মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

ইফতার পার্টি না করতে শেখ হাসিনার নির্দেশ: নেপথ্যে দার্শনিক ভিত্তি


Thumbnail

রমজান মাস হলো সংযমের মাস। সংযম হিসেবেই আমরা রোজা রাখবো আর ইফতারের নামে ইফতার বিলাশ করবো এটা একটা আরেকটার সাথে বিশেষ করে বর্তমান বিশ্বের অর্থনৈতিক বিচারে মানায় না। সম্প্রতি দার্শনিক রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা বড় ইফতার পার্টি আয়োজন না করার নির্দেশ দিয়েছেন। কি জন্য বারবার তাকে দার্শনিক বলি এটাই হচ্ছে তার বড় প্রমাণ। তিনি দেখলেন যে, যদি ইফতার বিলাশ বন্ধ না করা যায় তাহলে দুটি দিক ক্ষতি হবে। একটি হচ্ছে রোজার মাসে যে সংযম করার কথা সেটা হবে না। অন্যটি হলো ইফতার বিলাশের আড়ালে অপচয় হবে। ইফতার পার্টি না করলে অপচয় রোধ হবে। এই অপচয়কে রোধ করতে না পারলে সমস্ত জিনিসের দাম বাড়বে। আপাতত দৃষ্টিতে দার্শনিক শেখ হাসিনার এই সিদ্ধান্তটিকে ছোট মনে হলেও এর বিশাল একটা দার্শনিক ভিত্তি আছে। 

মানানীয় প্রধানমন্ত্রী যে আহ্বান আমাদেরকে জানিয়েছেন আমরা যদি এই আহ্বান পালন করি তাহলে রোজার মাসে কোন দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়ার কোন সম্ভাবনা থাকবে না। তখন আর পেঁয়াজের দামও বাড়াতে পারবে না। বেগুনির নামে বেগুনের দামও আর বাড়াতে পারবে না। কারণ এতোদিন পর্যন্ত বড় বড় ইফতার পার্টিতে আমরা দেখেছি যে অপচয়ই হয় বেশি। কারণ দাওয়াত করলে পার্টিতে অনেক কিছুর আয়োজন করা হয়। কোন কোন সময় সেটা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি করা হয়। অথচ ইফতার যার যার ব্যক্তিগত ব্যাপার। রোজার মাসে আমাদের প্রতিটি ক্ষেত্রে সংযম করতে হবে। এই কারণেই দার্শনিক রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দিলেন যে, অপচয় করা যাবে না এবং ইফতার বিলাশ বন্ধ করতে হবে। এজন্য তার প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা। 

আমরা যদি সঠিকভাবে সংযম করতে পারি তাহলে দেশের বাইরে থেকে আমাদের অনেক কিছু আমদানি করতে হবে না। এর ফলে আমাদের ডলারেরও অপচয় রোধ করা হবে। কারণ অনেক অপ্রয়োজনীয় জিনিস আমরা আমদানি করে থাকি যা আসলে দরকারই নয়। ইফতার পার্টি না করার নির্দেশ দিয়ে দার্শনিক শেখ হাসিনার ধর্মের সাথে জাগতিক বিষয়ের একটা অসাধারণ সমন্বয় ঘটালেন। এর ফলে উনি আমাদের মধ্যে ধর্মের ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করলেন। এতে বুঝা যায় যে, তিনি সত্যিকারে কতটুকু ধার্মিক। একজন সত্যিকারের ধার্মিক না হলে তার পক্ষে রোজার মাসে এ ধরনের নির্দেশ নিশ্চিয় আসত না। প্রতিটি জিনিসের ক্ষেত্রে দার্শনিক শেখ হাসিনা মাইক্রো লেভেল পর্যন্ত খোঁজ খরব রাখন এবং উপযুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তিনি আমাদের দেখালেন যে, আমরা যদি ইফতার বিলাশ বন্ধ করি তাহলে শুধু অপচয় রোধই হবে না, এর ফলে জিনিসপত্রের দাম যেমন বাড়বে না তেমনি ডলারের অপচয় রোধ হবে। ফলে বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী একটি পিলারের ওপর দাঁড়াতে পারবে। সুতরাং এই নির্দেশ আমাদের অবশ্যই মানতে হবে। এর সুদূরপ্রসারী একটি ফল পাবে বাঙালিরা। এই নির্দেশ মানার ফলে অপচয় না করার একটা অভ্যাস আমাদের মধ্যে তৈরি হবে এই এক মাসে। ফলে আমাদের অপ্রয়োজনীয় অনেক খরচই কমে আসবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে যে, আমরা বিলাশ বহুল অনেক জিনিস আমদানি করি যার কোন প্রয়োজন নেই। এই যে অপচয় করার অভ্যাস এই অভ্যাস থেকে আমাদের মুক্তি হবে যদি আমরা শেখ হাসিনার নির্দেশ মানি। আমাদের রোজার মাসের যাত্রাটাও অনেক সুন্দর হবে। আমরা দার্শনিক শেখ হাসিনার নির্দেশ মানলে আমাদের আর শুনতে হবে না যে, কালকে পেঁয়াজ নাই, পরশু দিন পেঁয়াজের দাম বেড়ে গেছে। সুতরাং অপচয় বন্ধের আমরা যে নির্দেশনা পেয়েছি আমরা যদি এটা পালন করি তাহলে আমরা ধর্মের সাথে আমাদের জাগতিক বিষয়গুলো সুন্দর ভাবে মেলাতে পারব এবং আমাদের জীবনযাত্রায় অভূতপূর্ব ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।


রমজান   ইফতার পার্টি   দার্শনিক  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

পিলখানা ট্র্যাজেডি ও শেখ হাসিনার নেতৃত্ব

প্রকাশ: ১১:০০ এএম, ২৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪


Thumbnail

আজ থেকে ১৫ বছর আগে ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি (২০০৯) বিডিআর সদর দফতর পিলখানায় ইতিহাসের বর্বরতম হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়। এটি ছিল জাতির জীবনের অন্যতম কলঙ্কিত অধ্যায়। সেসময় রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার দৃঢ় ও সাহসী ভূমিকার জন্য বাংলাদেশ কঠিন সংকট মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত জোটের দুঃসহ অত্যাচার, অনাচার এবং দুর্নীতির প্রেক্ষাপটে দেশের মানুষ নিজের অধিকার আদায়ের জন্য নিরপেক্ষ-নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সর্বজন প্রশংসিত নির্বাচনের মাধ্যমে ২০০৯ সালে মহাজোটকে দেশ পরিচালনার ম্যান্ডেট দেয়। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট দেশের দায়িত্বভার গ্রহণ করার মাত্র ৪৭ দিনের মাথায় পিলখানার বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। ওই বীভৎস ঘটনায় সর্বমোট ৭৪ জন প্রাণ হারান। যার মধ্যে ৫৭ জন ছিলেন দেশের মেধাবী সেনা কর্মকর্তা। এটি সহজে অনুমান করা যায় যে, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ববিরোধী অপশক্তি নতুন সরকারকে অস্থিতিশীল করার জন্যই এ ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়েছিল।

২০১৩ সালে তার রায় ঘোষিত হওয়ার মধ্য দিয়ে, ইতিহাসের বীভৎসতম হত্যাকাণ্ডের কলঙ্ক মোচন হয়েছে। পিলখানায় ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে হত্যার দায়ে ডিএডি তৌহিদসহ ১৫২ জনের ফাঁসির আদেশ হয়েছে। বিএনপির নেতা নাসিরউদ্দিন পিন্টু ও স্থানীয় নেতা তোরাব আলীসহ ১৬১ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে। সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডসহ বিভিন্ন মেয়াদে সাজার আদেশ হয়েছে ২৬২ জনের। রাষ্ট্রপক্ষ অভিযোগ প্রমাণে ব্যর্থ হওয়ায় খালাস পেয়েছে ২৭১ জন। বিডিআর হত্যাকাণ্ডের পর সরকার কালবিলম্ব না করে তিন পর্যায়ে ওই ঘটনার তদন্ত কাজ সম্পন্ন করে। এগুলো হলো- বিডিআর কর্তৃক তদন্ত, সেনাবাহিনী কর্তৃক তদন্ত এবং জাতীয় তদন্ত। তদন্ত শেষে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে কয়েকটি দাবি উত্থাপিত হয়। দাবিসমূহের মধ্যে একটি দাবি ছিল বিদ্রোহের বিচার সামরিক আইনে করা। শেখ হাসিনা সরকার অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে সেনা কর্মকর্তাদের সব দাবি পূরণ করেছেন। একই সঙ্গে বিচার প্রক্রিয়াকে সর্বপ্রকার বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখার জন্য ১৭ আগস্ট ২০০৯ তারিখে মহামান্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক সংবিধানের আর্টিকেল ১০৬-এর অধীনে সুপ্রিম কোর্টে রেফারেন্স প্রেরণ করেন। ১৯ আগস্ট ২০০৯ তারিখে সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক ১০ জন সিনিয়র আইনজীবীকে এমিকাস কিউরি নিয়োগ করা হয়। দীর্ঘ বিচার ও রায় শেষে ২০২০ সালের ৮ জানুয়ারি পিলখানা হত্যা মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেন হাইকোর্ট।

পৃথিবীর ইতিহাসে আসামির সংখ্যা বিবেচনায় এত বড় বিচার কার্যক্রম কোথাও কখনো অনুষ্ঠিত হয়নি। সঙ্গত কারণেই এই বিচারকে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও প্রশ্নাতীত করার লক্ষ্যে কিছুটা সময় লেগেছে। এরই সুযোগ নিয়ে বিএনপি-জামায়াত জোট এই বিচার বাধাগ্রস্ত করার লক্ষ্যে বিরতিহীনভাবে নানাবিধ অপপ্রচার চালিয়েছে। এমনকি তারা ক্ষমতায় গেলে বিজিবি-এর নাম পরিবর্তন করে আগের নাম এবং পোশাক বহাল রাখার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে বলেও জানা যায়। বিজিবিতে ভবিষ্যতে যে কোনো প্রকার বিদ্রোহ বন্ধের জন্য বর্তমান সরকার ‘বিজিবি এ্যাক্ট-২০১০’ সংসদে পাস করেছে, যা আর্মি এ্যাক্টের অনুরূপ। এই আইনে বিদ্রোহের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। দুঃখজনক হলেও সত্য, বিএনপি-জামায়াত জোট আজও বিডিআরের বিচার-সংক্রান্ত বিভিন্ন অপপ্রচার চালিয়ে সেনাবাহিনী এবং দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চক্রান্তে জড়িত। তাদের অনেকেই ওই সময় সেনা বিধি ৫ মোতাবেক সেনা আইনে এ বিদ্রোহের বিচারের বিরোধিতা করেছিল। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বিডিআর বিদ্রোহ চলাকালীন রহস্যজনক অবস্থান অনেকের মনে প্রশ্নের উদ্রেক করেছে। বিএনপি শাসনামলে ১৯৭৭-১৯৮১ সাল পর্যন্ত সংঘটিত ২১টি সামরিক অভ্যুত্থানে ১২০০’র বেশি সেনা ও বিমানবাহিনীর সদস্য নিহত হলেও এসব অভ্যুত্থানের কোনো দৃশ্যমান বিচার হয়নি। এমনকি অনেক মামলার নথিও গায়েব হয়ে গেছে।

শেখ হাসিনা বিডিআর হত্যাযজ্ঞ পরিস্থিতি সেদিন দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করেছিলেন। অপরাধীদের বিচারকার্য সম্পন্ন করে দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীকে সম্মানিত করার প্রতিজ্ঞাও রয়েছে তাদের। ২০০৯ সালে মহাজোট সরকারের নেতৃত্বে গণতন্ত্র নতুন করে বিকশিত হওয়ার সময় চক্রান্তকারীদের পিলখানা হত্যাযজ্ঞ দেশের ইতিহাসে মর্মন্তুদ ঘটনা। ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র দেড় মাসের মাথায় এই বর্বরোচিত ঘটনা কিসের আলামত ছিল? সেনাবাহিনীর ৫৭ কর্মকর্তা হত্যার শিকার হবার পরেও গোটা ফোর্স ধৈর্য ধারণ করেছেন; ন্যায় বিচারের অপেক্ষা করেছেন। বর্তমান সরকারের প্রতি সেনাবাহিনীর এরচেয়ে বড় অবদান আর কি হতে পারে? গত আমলে দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে আরো একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এসব কেবল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আস্থা থেকে সম্ভব হয়েছে। ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০০৯-এ বিডিআরদের উদ্দেশ্যে তাঁকে বলতে শোনা যায়- ‘আপনারা জানেন, গতকাল (২৫ ফেব্রুয়ারি) ঢাকার পিলখানায় বিডিআর সদর দপ্তরে যে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটেছে তার জন্য আমি অত্যন্ত মর্মাহত। আত্মঘাতী এই হানাহানিতে জীবন দিতে হয় আমাদের দেশপ্রেমিক সশস্ত্র বাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তা, বিডিআর সদস্য ও বেসামরিক নাগরিকদের। এ প্রাণহানির ঘটনায় আমি দারুণভাবে মর্মাহত এবং দুঃখিত। আমি নিহতদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। তাদের পরিবারের প্রতি সহমর্মিতা জানাই। আমার প্রশ্ন, কার বুকে গুলি চালাবেন? তারা তো আপনারই ভাই। ভাই হয়ে ভাইয়ের বুকে গুলি করবেন না। আপনার বোনকে বিধবা করবেন না। আমরা আপনাদের সমস্যা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। অত্যন্ত ধৈর্য সহকারে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা আমরা করে যাচ্ছি। আপনারা আমাকে সাহায্য করুন। এমন পথ নেবেন না যে ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। আমাকে দেশের স্বার্থে কঠোর ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করবেন না। মনে রাখবেন, সংঘাত আরো সংঘাত বাড়ায়। আপনারা সংযত হোন। অস্ত্র সমর্পণ করুন। আপনাদের কোনো ক্ষতি হবে না, আমি আশ্বস্ত করছি।’

প্রধানমন্ত্রীর সেদিনের পুরো ভাষণ জুড়ে ছড়িয়ে আছে নিহতদের জন্য শোক আর তাদের স্বজনদের জন্য কাতরতা। ভাষণটির শেষাংশে তিনি বিডিআর হানাদারদের কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি করেছেন যেমন, তেমনি বারবার সেনা পরিবারের ক্ষতির কথা স্মরণ করেছেন। এর চেয়ে মানবিক দলিল আর কি হতে পারে? ২৫ ফেব্রুয়ারি সকালে পিলখানার তাণ্ডবের খবর পেয়ে তিনি সংকট সমাধানে নিজেই উদ্যোগ গ্রহণ করেন। মন্ত্রিসভার সদস্য, নিজের দল ও মহাজোটের নেতৃবৃন্দ, তিন বাহিনী প্রধান, পুলিশের আইজি, র্যাবের ডিজিসহ আরো অনেকের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেন। সকলের পরামর্শের ভিত্তিতেই প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক ও হুইপ মির্জা আজমকে পিলখানায় প্রেরণ করা হয়। তাঁরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নেত্রীর নির্দেশে সংকট নিরসনে প্রচেষ্টা চালান। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুনসহ আওয়ামী লীগ ও মহাজোটের বেশ কয়েকজন নেতা বর্বর বিডিআর জওয়ানদের ভয়ে ভীত না হয়ে পিলখানায় ঢুকে জিম্মিদশা থেকে উদ্ধার করেন সেনা কর্মকর্তাদের পরিবারদের। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর প্রজ্ঞা, বুদ্ধিমত্তা, কৌশল ও দূরদর্শী নেতৃত্ব, সশস্ত্র বাহিনী প্রধানদের আন্তরিক সহযোগিতায় অবসান ঘটে তথাকথিত বিডিআর বিদ্রোহের।

বড় ধরনের রক্তপাত থেকে দেশ ও জাতিকে রক্ষা করলেও শেখ হাসিনার দায়িত্ব তখনো শেষ হয়নি। কঠিন শোকের মধ্যেও সমগ্র সেনাবাহিনীর সদস্যরা শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে প্রতিশোধ স্পৃহায় মেতে ওঠেননি নেত্রীর প্রতি আস্থার কারণে। আর তাদের দেশপ্রেম ও সংযমের কথা দেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে বলেই তিনি মার্চের প্রথম দিন সেনাকুঞ্জে সেনা-কর্মকর্তাদের মুখোমুখি হয়ে তাদের ক্ষোভের প্রশমন করেন। সেনাকুঞ্জের এই সাক্ষাতের ঘটনা নিয়ে বিরুদ্ধ পক্ষ ইন্টারনেটে নানা অপপ্রচার চালায় এবং এখনো তা অব্যাহত রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগত জীবনের শোকের কথা বলে সেদিন উপস্থিত সেনাদের প্রাথমিক বিভ্রান্তির অবসান করেছিলেন। তবে সেনাপ্রধান ও প্রধানমন্ত্রীর সামনে বিক্ষুব্ধ অফিসারদের আচরণ শৃঙ্খলা পরিপন্থী হলেও শেখ হাসিনার পরিস্থিতি মোকাবিলার ক্ষমতায় তা বীভৎস হয়ে ওঠেনি। বরং নির্বাচিত ও গণতান্ত্রিক সরকারের নির্দেশকে অসীম মর্যাদা দিয়েছিলেন সেনা কর্মকর্তারা। সেনাকুঞ্জে তাদের চিৎকার ও ক্রন্দনের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী সেদিন শোকের প্রকাশ দেখেছিলেন।

মূলত শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় নৃশংস বিডিআর বিদ্রোহের কারণে এ বাহিনীর পুনর্গঠনের দাবি ওঠে। ২০০৯ সাল থেকেই সরকার দ্রুততার সঙ্গে বিডিআরকে পুনর্গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। বিজিবিকে পুনর্গঠনের লক্ষ্যে নতুন আইনের খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর ‘বর্ডার গার্ড আইন ২০১০’ সংসদে পাস করা হয়েছে। ফলে বিডিআর বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবি নামে আত্মপ্রকাশ করেছে। নতুন পোশাক, নতুন নাম এবং সংশোধিত আইন নিয়ে এই প্রতিষ্ঠান আবারো দৃঢ় পদক্ষেপে সামনের দিকে এগিয়ে চলছে মাথা উঁচু করে। পুনর্গঠনের আওতায় বিজিবির ৩৬ ব্যাটালিয়ন বিজিবি অবলুপ্ত করা হয়েছে ২০১৩-এর ১৫ জুলাই এবং ১৩ ব্যাটালিয়ন বিজিবিকে ২৫ আগস্ট অবলুপ্ত করা হয়। এর আগে ২০১১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ২৪ ব্যাটালিয়নকে (পিলখানায় অবস্থিত) অবলুপ্ত করা হয়। প্রথম পর্যায়ে ২০১২-১৩ অর্থবছরে চারটি অঞ্চল, চারটি সেক্টর, চারটি অঞ্চল ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো এবং তিনটি বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের জন্য (বিয়ানীবাজার, রুমা ও বাবুছড়া) মোট ছয় হাজার ৩১৬টি পদের বিপরীতে লোক নিয়োগের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।

দ্বিতীয় পর্যায়ে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বাগাইহাট এবং কুলাউড়া বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের জন্য এক হাজার ৫২৪টি পদে লোক নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন সম্পন্ন হয়েছে। পুনর্গঠনে পাল্টে গেছে বিজিবির প্রশাসনিক ও অপারেশনাল কাঠামো। পাশাপাশি বেড়েছে জওয়ানদের সুযোগ-সুবিধাও। এখন বিজিবি সব সদস্যই সীমান্ত ভাতা পাচ্ছে। একই সঙ্গে জওয়ানদের পরিবারের মাসিক জ্বালানি খরচও বাড়ানো হয়েছে ৩ গুণ। বাড়ানো হয়েছে মসলা ভাতার পরিমাণও। পুনর্গঠনের আলোকে বিজিবিকে ৪টি অঞ্চলে ভাগ করা হয়। এসব অঞ্চলের মধ্যে উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের সদর দফতর হয়েছে নওগাঁয়, দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের সদর দফতর যশোর, উত্তর-পূর্ব সদর দফতর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে এবং দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের সদর দফতর চট্টগ্রাম। একজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদমর্যাদার কর্মকর্তা আঞ্চলিক সদর দফতরের প্রধান। তাছাড়া নতুনভাবে তৈরি ১১টি ব্যাটালিয়ন নিয়ে সদর দফতর করা হয়েছে। বিজিবির পুনর্গঠন প্রস্তাবের আলোকে বেশকিছু সংস্কারমূলক কাজে হাত দেয় কর্তৃপক্ষ।

বিজিবির পুনর্গঠনে জওয়ানদের সুযোগ-সুবিধার বিষয়গুলোতে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে জওয়ানদের রেশন ও অন্যান্য ভাতাও। সীমান্ত ভাতা অনুমোদিত হওয়ায় এখন থেকে সব বিজিবি সদস্যই মাসিক ৩৩৮ টাকা ভাতা পাচ্ছেন। ইতোমধ্যে জওয়ানদের রেশন সুবিধা বাড়ানো হয়েছে শতভাগ। বাড়ানো হয়েছে যানবাহন ও চিকিৎসা সুবিধাও। এ জন্য বিজিবি সদস্যদের জন্য আরো ৩টি হাসপাতাল তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তাছাড়া বিজিবি সদস্যদের জাতিসংঘ মিশনে পাঠানোর বিষয়টিও সক্রিয়ভাবে সরকার বিবেচনা করছে। পুনর্গঠনের আলোকে বিজিবি জওয়ানদের মানবাধিকার বিষয়েও প্রশিক্ষণ দেয়া শুরু হয়েছে।

তাছাড়া প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাপনাতেও আমূল পরিবর্তনের অংশ হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে নতুন পাঠ্যসূচি। বিশেষ করে সীমান্ত সুরক্ষা, জওয়ানদের শারীরিক ও মানসিক যোগ্যতার বিষয়াদি নিয়ে পৃথক ট্রেনিং অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাছাড়া যুক্ত করা হয়েছে নারী ও শিশু পাচার রোধে করণীয়-সংক্রান্ত অধ্যায়ও। একইভাবে বিজিবি জওয়ানরা কীভাবে সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় পারদর্শিতা অর্জন করতে পারবে সে বিষয়েও শিক্ষা দেয়া হচ্ছে। তাছাড়া সীমান্তে অপারেশনাল কর্মকাণ্ড জোরদারের পাশাপাশি চোরাচালন, মাদক নিয়ন্ত্রণ ও নিয়োগ প্রক্রিয়া ডিজিটাল পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। একই সঙ্গে সীমান্তে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনার জন্য সরকার বিজিবি সদস্যদের ১৪শ মোটরসাইকেল সরবরাহ করেছে।

বিজিবি পুনর্গঠনের এই ব্যাপক তৎপরতার সঙ্গে সঙ্গে শেখ হাসিনা সরকার কর্তৃক নিহত সেনা পরিবারদের জন্য নেয়া উদ্যোগগুলো উল্লেখের দাবি রাখে। বিজিবি হত্যাকাণ্ডে নিহত সামরিক কর্মকর্তাদের পরিবারের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে সরকারের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। আর্থিক সহযোগিতা দেয়া হয়েছে কয়েকটি তহবিল থেকে। প্রতিটি পরিবারের জন্য প্রধানমন্ত্রীর অনুদান দশ লাখ টাকা; সেনাবাহিনী কল্যাণ তহবিল থেকে অনুদান পাঁচ লাখ; বিডিআর তহবিল থেকে অনুদান পঞ্চাশ হাজার; বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব ব্যাংকস কর্তৃক প্রতি বছর চার লাখ আশি হাজার টাকা হিসেবে অদ্যাবধি সর্বমোট বিগত ৫ বছরে চব্বিশ লাখ টাকা প্রদান করা হয়েছে।

এ ছাড়া নিহত অফিসার পরিবারবর্গকে দুই লাখ টাকার ট্রাস্ট মিউচুয়্যাল ফান্ডের প্লেসমেন্ট শেয়ার প্রদান করা হয়েছে। তাছাড়া নিয়মানুযায়ী প্রত্যেক নিহতের পরিবারকে পরিবার নিরাপত্তা প্রকল্প তহবিল, ডিএসওপি ফান্ড, কল্যাণ তহবিল থেকে অনুদান, মৃত্যু আনুতোষিক, ছুটির পরিবর্তে নগদ অর্থ, কম্যুটেশন এবং মাসিক পেনশন প্রদান করা হয়েছে। আর্থিক প্রণোদনা ও সহযোগিতার সঙ্গে অন্যান্য কল্যাণমূলক কাজও করা হয়েছে নিহতদের পরিবারবর্গের জন্য। নিহত অফিসার পরিবারের ৩২ জন সদস্যকে চাকরি প্রদান করা হয়েছে, ৮৪ জন সদস্যকে (স্ত্রী/সন্তান) বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি এবং বিনা বেতনে অধ্যয়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাদের স্থায়ী আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিতের জন্য ৩৭ জনকে মিরপুর ডিওএইচএসে প্লট দেয়া হয়েছে। ১০ জনকে মিরপুর ডিওএইচএসে ২টি করে স্বয়ংসম্পূর্ণ ফ্ল্যাট প্রদানের জন্য বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে।

নিহতদের পরিবারবর্গের দুধ কুপন কার্ড, সামরিক টেলিফোন সংযোগ এবং নিয়মানুযায়ী সিএমএইচে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। নানা প্রতিকূলতা, অপপ্রচার ও চক্রান্তকে অতিক্রম করে তথাকথিত বিডিআর বিদ্রোহের বিচার সম্পাদনের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা সরকার একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছে। যারা নানা ধূম্রজাল সৃষ্টি করে এ ন্যক্কারজনক হত্যাকাণ্ডের বিচারকে বাধাগ্রস্ত করতে চেয়েছে তাদের অপপ্রয়াস ভেস্তে গেছে। বরং জাতি একটি কলঙ্কের দায় থেকে মুক্তি পেয়েছে।

গত ১৫ বছরে পুনর্গঠিত বিজিবি অতীতের গ্লানি ভুলে নবউদ্যমে সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে। কেবল রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা সরকারের সদিচ্ছার কারণে দেশবাসীর প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে; বাহিনীগুলোর মধ্যে পারস্পরিক হৃদ্যতা বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রকৃতপক্ষে ২০০৯ সালে পরিস্থিতি মোকাবিলা থেকে শুরু করে ২০২৩ সাল অবধি সেনা ও বিজিবি’র জন্য যা কিছু কর্মসূচি বাস্তবায়ন হয়েছে তার জন্য অবশ্যই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রশংসার দাবি রাখেন।তাঁর সহানুভূতি, মমত্ববোধ ও আন্তরিকতার জন্যই শোকাহত পরিবারগুলো শোক কাটিয়ে উঠতে পেরেছে।


(লেখক : ড. মিল্টন বিশ্বাস, বঙ্গবন্ধু গবেষক, অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, বাংলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়,  বিশিষ্ট লেখক, কবি, কলামিস্ট, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রগতিশীল কলামিস্ট ফোরাম, নির্বাহী কমিটির সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ email-drmiltonbiswas1971@gmail.com)    



মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

সিডেশনে মৃত্যু : করণীয় কি?


Thumbnail

সুন্নতি খৎনা ও এন্ডোস্কোপি করতে যেয়ে গত দেড় মাসে খোদ ঢাকা শহরে মারা গেছে তিনজন। অনেকে বলছেন, খৎনায় মৃত্যু, এন্ডোস্কোপিতে মৃত্যু, গ্যাপ কোথায়? এ ব্যাপারে আমার মতামত হচ্ছে, হাসপাতাল গুলোতে সিডেশন গাইডলাইন না থাকাটাই একটি বড় গ্যাপ।

ঢাকা শহরে কয়টি হাসপাতালে সিডেশন গাইডলাইন রয়েছে? দুয়েকটি হাসপাতালে থাকলেও সেখানে সে গাইডলাইন মানা হয় কিনা? 'সিডেশন' হচ্ছে, রোগীর শিরাপথ দিয়ে ঘুম পাড়ানোর ব্যবস্থা করা। সেই ঘুম মানে এনেসথেসিয়া নয়। তাই এ সব সিডেশনের জন্য এনেস্থেটিস্ট এর উপস্থিতি বাধ্যতামূলক নয়। তবে থাকলে ভাল, নিরাপদ।

সিডেশন যে কোন রেজিস্টার্ড চিকিৎসক দিতে পারে, তবে সেটা গাইডলাইন মেনে দিতে হয় । তিনি কি কি ওষুধ কতটুকু প্রয়োগ করতে পারবেন, কোথায় থাকে থামতে হবে সেটি গাইড লাইনে উল্লেখ থাকা প্রয়োজন। যিনি সিডেশন দেন, তাকে বেসিক লাইফ সাপোর্ট জানতে হয়। শুধু জানাটাই যথেষ্ট নয়। বেসিক লাইফ সাপোর্ট প্র্যাক্টিসটি তার রপ্ত রাখা প্রয়োজন। যেখানে গাইডলাইন নেই, সেখানে এ সব মানার সুযোগ কোথায়?   

এনেসথেসিয়ার  অভিধানে 'একটু সিডেশন' বা 'একটু এনেসথেসিয়া' নামে কোন শব্দ নেই। কারণ জীবনটা তো ‘একটু’ নয়। জীবন যার বা যাদের যায়, তারা এর মর্ম বোঝে। 'একটু সিডেশন' দিতে যেয়ে মৃত্যুর দায় কেউ এড়াতে পারে না।

উন্নত বিশ্বে এ ধরণের কোন ঘটনা ঘটলে পরবর্তী কয়েক মাসের মধ্যে সমগ্র দেশের জন্য একটি অবশ্য পালনীয় গাইড লাইন তৈরী হয়ে যায়। আশাকরি আমাদের বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী এমন একটি উদ্যোগ নিবেন, যেটি কার্যকর হতে পারে আগামী সর্বোচ্চ তিন মাসের মধ্যে।

এনেসথেসিয়া সোসাইটিকে অনুরোধ করব, গাইডলাইন তৈরীতে মাননীয় মন্ত্রীকে সহায়তা করুন। সেটি না করলে দিয়ে সিডেশন দিয়ে খৎনা বা এন্ডোস্কোপি করার রোগী দেশে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। সে সব রোগীদের তখন পাওয়া যাবে বেনাপোল সীমান্তে বা এয়ার ইন্ডিয়ার চেক ইন কাউন্টারে।

লেখকঃ ব্রুনাই প্রবাসী এনেস্থেটিস্ট


সুন্নতি খৎনা   এন্ডোস্কোপি   এনেসথেসিয়া সোসাইটি  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

'কুই' ভাষা কই?


Thumbnail

দেশে মাত্র চারজন বয়স্ক লোক এখন 'কুই' ভাষায় কথা বলে। এদের  মৃত্যুর সাথে সাথে দেশ থেকে এ ভাষার মৃত্যু হবে। মার্তৃভাষার দাবিতে যে দেশের সূর্যসন্তানেরা আত্মাহুতি দিয়েছেন, সে দেশে অযত্ন, অবহেলায় একটি ভাষার মৃত্যু কোন ভাবে মেনে নেয়া যায় না।

বলছিলাম 'কুই' ভাষার কথা। এটি বাংলাদেশে বসবাসকারী একটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী  'কন্দ' সম্প্রদায়ের ভাষা। দেশে প্রায় পাঁচ হাজার লোক এ সম্প্রদায়ের। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এরা বাংলাদেশে বসবাস শুরু করে। এদের আদিনিবাস ভারতের উড়িষ্যা রাজ্য। সে সময় কন্দরা চা ও রেল শ্রমিক হিসাবে এদেশে আসে। পরে তারা চা শ্রমিক হিসাবে এদেশে বসবাস শুরু করে। বর্তমানে এদের বসবাস মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার হরিণছড়া, উদনাছড়া, পুটিয়া ও লাখাউড়ায় এবং কমলগঞ্জ উপজেলার কুড়মাছরা চা বাগানে। ধীরে ধীরে মার্তৃভাষা ভুলে যায়, বাংলা শিখে যায়। এখন তারা বাংলা অথবা উড়িয়া ভাষায় কথা বলে। শুধুমাত্র চারজন প্রবীণ ব্যাক্তি এখন এ ভাষায় কথা বলে। 'কুই' ভাষায় কথা বলার মানুষ পাওয়া যায় না বলে এরা একা একাই 'কুই' ভাষায় কথা কয় (বলে)। এই চার জনের মৃত্যু হলে এদেশ থেকে 'কুই' ভাষা উধাও হয়ে যাবে। তখন 'কুই' ভাষা শুনতে উড়িষ্যা যেতে হবে।  

'কুই' ভাষার অস্তিত্ব রয়েছে ভারতের উড়িষ্যা রাজ্যে। সেখানে প্রায় সাড়ে নয় লাখ 'কন্দ' সম্প্রদায়ের লোক 'কুই' ভাষায় কথা বলে। এদের নিজস্ব কোন বর্ণমালা নেই। 'কুই' ভাষা বিহারে 'দেবনাগরী' লিপিতে ও উড়িষ্যায় 'উড়িয়া' লিপিতে লেখা হয়। ইন্দোনেশিয়ার তিমুর এলাকার কিছু ছিটমহলবাসী 'কুই' ভাষায় কথা বলে। তবে ইন্দোনেশিয়ার 'কুই' ভাষা ও উড়িষ্যার 'কুই' ভাষা পরিপূর্ণভাবে ভিন্ন, কোথাও কোন মিল নেই। তিমুরের ভাষা কে 'কুই' ভাষায় 'মাসিন লাক' বলা হয়।

লাইফ সাপোর্টে থাকা 'কুই' ভাষাটির অস্তিত্ব বজায় রাখতে সরকারি উদ্যোগ ও পরিকল্পনা অত্যাবশ্যক। বাড়িতে নিজেদের মধ্যে মার্তৃভাষার প্রচলন বাড়ানোর জন্য ‘গৃহ ভাষার বিকাশ’ নামের কোনো কর্মসূচি নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে দেশের ভাষা গবেষকরা। 'কন্দ' অধ্যুষিত মৌলভীবাজার জেলায় এ কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে দেশে অবস্থানরত 'কুই' ভাষাভাষী চারজন, বা প্রয়োজনে উড়িষ্যা থেকে শিক্ষক আনা যেতে পারে। মোদ্দাকথা, লাইফ সাপোর্টে থাকা 'কুই' ভাষাকে বাঁচানো প্রয়োজন।  নতুবা, মার্তৃভাষার দাবিতে জীবনদানকারীদের দেশ থেকে একটি মার্তৃ ভাষার মৃত্যু হলে বায়ান্নর একুশের শহীদদের আত্মা শান্তি পাবে না। এবারের একুশের প্রত্যয় হোক, দেশের সকল মার্তৃভাষা বেঁচে থাকুক। 

লেখক: প্রবাসী চিকিৎসক, কলামিস্ট  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

আমাদের নতুন স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাই

প্রকাশ: ১২:০০ পিএম, ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪


Thumbnail

আমাদের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে সবচেয়ে নিবেদিতপ্রাণ ও একজন সৎ ব্যক্তিকে বেছে নিয়েছেন। আমরা সকল জনস্বাস্থ্য পেশাদার এবং সহায়তা গোষ্ঠী আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে স্বাগত জানাই এবং আসুন আমরা কোনো স্বার্থ ছাড়াই সকল প্রকার সহায়তার হাত বাড়াই। কয়েক দশক ধরে বড় সাফল্যের সাথে বাংলাদেশে একটি চিত্তাকর্ষক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছে – স্বাস্থ্যসেবা পরিষেবাগুলি এখন মাঠ পথের সম্প্রদায় থেকে সর্বোচ্চ স্তরের এমনকি তৃতীয় স্তর পর্যন্ত সকলের জন্য আজ উপভোগ করা সম্ভব।  সরকারি, অলাভজনক বেসরকারি সংস্থা এবং ক্রমবর্ধমান বেসরকারি সব খাতই আজ বাংলাদেশের জনগণের জন্য স্বাস্থ্যসেবা পরিষেবা উপলব্ধ করতে অবদান রাখছে। বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবার প্রাপ্যতা, ক্রয়ক্ষমতা এবং মান উন্নত হওয়ার সাথে সাথে, আজ (২০২০ সালের পরিসংখ্যান), বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারী গড় ব্যক্তি ৭২ বছরেরও বেশি বয়সে বেঁচে থাকার আশা করতে পারেন, যা ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশি - এই ক্রমবর্ধমান আয়ুর একক সূচক বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য উন্নত মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা পরিষেবার প্রমাণ প্রদান করে।

জনস্বাস্থ্যের ইতিহাস অনেক ঐতিহাসিক ধারণা, পথ এবং ত্রুটি, মৌলিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং মহামারীবিদ্যার বিকাশ থেকে উদ্ভূত। সমস্ত সমাজকে অবশ্যই রোগ এবং মৃত্যুর বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে এবং তাদের কার্যকরভাবে পরিচালনা করার জন্য ধারণা এবং পদ্ধতিগুলি বিকাশ করতে হবে। এই কৌশলগুলি বৈজ্ঞানিক জ্ঞান এবং পথ এবং ত্রুটি থেকে বিকশিত হয়, তবে সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক অবস্থা, বিশ্বাস এবং অনুশীলনের সাথে জড়িত যা স্বাস্থ্যের অবস্থা এবং স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য প্রতিরোধমূলক এবং নিরাময়মূলক হস্তক্ষেপ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, স্বাস্থ্যের উন্নতি বজায় রাখার জন্য, আমাদের অতীত এবং বর্তমান কৌশলগুলি বিশ্লেষণ করতে হবে এবং সাফল্য এবং ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিতে হবে। আমাদের স্বাস্থ্য পরিবর্তনগুলি বুঝতে হবে এবং পরিবর্তনশীল পরিবেশ এবং রোগ মূল্যায়নের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে। বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী জনস্বাস্থ্য নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মানুষ আজ তাদের অধিকার এবং তাদের নিজস্ব স্বাস্থ্য সম্পর্কে আরও সচেতন। শুধুমাত্র সমস্যা নয়, সাধারন মানুষ সমাধানের অংশ হতে চায়। ক্রমবর্ধমান পরিবর্তিত পরিবেশ এবং পরিবর্তনগুলি উপলব্ধি করে আমাদের স্বাস্থ্যসেবা পরিষেবার পুনর্বিবেচনা এবং সংস্কার করা দরকার। এই ধরনের সংস্কার ও প্রস্তুতি আগামীকালের জন্য অপেক্ষা না করে আজ থেকে শুরু করতে হবে। আসুন আমরা বাংলাদেশ সহ বিশ্বব্যাপী ঘটতে থাকা চলমান পরিবর্তনগুলির নিয়ে কিছু আলোচনা করি।

১.    মহামারী ও রোগের স্থানান্তর (epidemiological transition):  প্রতিটি দেশই সংক্রামক রোগ থেকে অসংক্রামক রোগে মহামারী সংক্রান্ত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। উন্নত পুষ্টি, আবাসন, পানি ও স্যানিটেশন, সফল টিকাদানের মত কর্মসূচির পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ থাকার কারনে কলেরা, টিবি, ম্যালেরিয়া, এইচআইভির মতো রোগে কম মানুষ মারা যাচ্ছে। তবে সামাজিক রীতিনীতি ভেঙ্গে পড়া, পরিবর্তিত খাদ্যাভ্যাস, বসে থাকা জীবন এবং ব্যায়ামের অভাব আর জীবনধারা/জীবনযাত্রার পরিবর্তনের ফলে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যান্সারের মতো অসংক্রামক রোগ ক্রমবর্ধমানভাবে বাড়ছে। সর্বশেষ বিশ্লেষণ অনুসারে বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর ৬০% এরও বেশি আজ অসংক্রামক রোগের কারণে। এগুলি দীর্ঘস্থায়ী রোগ। তাই তথ্য প্রদান, আচরণ পরিবর্তন এবং দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করা কঠিন এবং অনেক বেশি ব্যয়বহুল, যা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপর চাপ সৃষ্টি করছে।

২.    জনসংখ্যাগত পরিবর্তন: একদিকে ভৌগোলিকভাবে ছোট দেশ বাংলাদেশের বিশাল এবং ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা শিক্ষা, অর্থনৈতিক সুযোগ, চাকরি এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের জন্য চ্যালেঞ্জ আরোপ করছে। অন্যদিকে, উদাহরণস্বরূপ, সফল নারী শিক্ষা এবং ক্ষমতায়ন, ক্রয় ক্ষমতা বৃদ্ধির সাথে অত্যন্ত সফল মানের পরিবার পরিকল্পনা পরিষেবার কারণে বাংলাদেশের মোট জন্মের হার (total fertility rate) জনসংখ্যা প্রতিস্থাপন স্তরের নীচে নেমে আসছে, যা বাংলাদেশে ৬ থেকে বর্তমানে ১.৯ পর্যন্ত নেমে এসেছে। এই হ্রাস অব্যাহত থাকায়, নির্ভরশীলতার অনুপাত বাড়ছে, কারণ কাজের বয়সের জনসংখ্যার অনুপাতের অনুপাত হ্রাস পেতে শুরু করেছে এবং আয়ু বৃদ্ধির সাথে সাথে বয়স্ক ব্যক্তিদের সংখ্যা বাড়ছে, বয়স্কদের যত্ন পরিষেবার প্রয়োজনীয়তাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। যাইহোক, বাংলাদেশে এখনও একটি বৃহৎ তরুণ জনসংখ্যা রয়েছে, বাংলাদেশের শিশু ও যুবকদের সুস্থ রাখার আর দক্ষতা উন্নতির মাধ্যমে জনসংখ্যাগত লভ্যাংশের সুবিধা নেওয়ার সুযোগ এখনও রয়েছে। এই তরুণ ও সুস্থ প্রজন্মের জনসংখ্যা আর্থ-সামাজিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদানে রাখতে সক্ষম এবং প্রয়োজন।

৩.    অভিবাসন: চাকরি, অর্থনৈতিক সুযোগ, বিভিন্ন উন্নত সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার কারণে অনেক মানুষ স্থায়ীভাবে বা অস্থায়ীভাবে গ্রাম থেকে শহরাঞ্চলে অভিবাসন করছে। ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনও এই জনসংখ্যার অভিবাসনকে আরো বাড়িয়ে তুলবে। শহুরে অস্বাস্থ্যকর বস্তির জনসংখ্যা বাড়ছে। উপযুক্ত আবাসন, নিরাপদ পানীয় জল, স্যানিটেশন এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠছে। নগর স্বাস্থ্য সেবা অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব হয়ে উঠছে। তার উপরে বিভিন্ন সেক্টর এবং মন্ত্রীদের মধ্যে সমন্বয় চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠছে। আমাদের উপলব্ধি করতে হবে এই ভাসমান জনসংখ্যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। তাই তাদের স্বাস্থ্য বজায় রাখা কঠিন হলেও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক অভিবাসী শ্রমিক রয়েছে যাদের হয়তো স্বাগতিক দেশের স্বাস্থ্যসেবা পরিষেবাগুলিতে পর্যাপ্ত অ্যাক্সেস নেই এবং প্রায়শই রোগে আক্রান্ত হয়ে নিজ দেশে নির্বাসিত হচ্ছে। বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি বিদেশে কর্মরত এবং বসবাস করছেন, এই জনসংখ্যা তাদের রেমিট্যান্সের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও মানব উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। কোভিডের সময় এটি স্পষ্ট হয় যে বর্তমানের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এই অভিবাসী জনগোষ্ঠীকে পরিষেবা দেওয়ার জন্য পর্যাপ্তভাবে প্রস্তুত ছিল না। এই ভাসমান এবং স্থানান্তরিত জনসংখ্যার স্বাস্থ্যসেবা পরিষেবার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য এবং স্বাস্থ্য সেবা সরবরাহ করার জন্য বর্তমান ব্যবস্থার সংস্কার, পুনর্বিন্যাস এবং প্রস্তুত থাকতে হবে।

৪.    জলবায়ু পরিবর্তন: জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের অর্থনীতি, স্বাস্থ্যের পাশাপাশি বেঁচে থাকার উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলছে, ভবিষ্যতে আরো ফেলবে। জলবায়ু পরিবর্তন খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির ওপর প্রভাব ফেলছে। যদিও বাংলাদেশ একটি অত্যন্ত সফল প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি তৈরি করেছে, ঘূর্ণিঝড়ের ক্রমবর্ধমান ফ্রিকোয়েন্সি, বন্যা এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা স্বাস্থ্যসেবা পরিষেবা প্রদানের সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলবে। প্রমাণ দেখায় যে জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষ করে ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, খরা, বন্যা, পানীয় জল এবং খাদ্যের অভাব জনসংখ্যা বিশেষ করে গর্ভবতী মহিলা, নবজাতক এবং শিশু এবং সেইসাথে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলবে। জনসংখ্যার দরিদ্র অংশ জনগনকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করবে। অন্যদিকে ক্রমবর্ধমানভাবে অনুপযুক্ত অবকাঠামো, বর্জ্য, সরবরাহের ক্রমবর্ধমান চাহিদা, যন্ত্রপাতি ও ইলেকট্রনিক্স, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি ইত্যাদির মাধ্যমে গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমনে স্বাস্থ্য খাতের অবদান উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্বাস্থ্য পেশাদারদের মধ্যে সচেতনতার অভাব রয়েছে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে কীভাবে আরও পরিবেশবান্ধব এবং জলবায়ু পরিবর্তনকে স্থিতিস্থাপক করা যায় তা জরুরিভাবে প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ, পুনরায় ব্যবহারযোগ্য উপকরণের ব্যবহার বৃদ্ধি, বর্জ্য হ্রাস এবং সৌর শক্তির ব্যবহার।

৫.    হামারী বা মহামারী: কোভিড-১৯ নগ্নভাবে আমাদের দেখিয়েছে যে বাংলাদেশ সহ এমনকি সবচেয়ে ধনী দেশগুলোও কোভিড-১৯ মহামারী মোকাবিলা ও পরিচালনা করতে প্রস্তুত ছিল না। এটি অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং স্বাস্থ্যগতভাবে প্রতিটি দেশকে অনেক নিচে ঠেলে দিয়েছে। লকডাউন, আয় হ্রাস, জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় স্বাস্থ্যসেবা পরিষেবাগুলিতে অ্যাক্সেসকে আরও কঠিন করে তুলেছিল, বিশেষত শিশু, বয়স্ক এবং গর্ভবতী মহিলাদের জন্য। যেহেতু মানুষ প্রাণীদের আবাসস্থল সীমিত করে ক্রমবর্ধমান প্রাণীর সাথে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসছে, ভাইরাসগুলি পরিবর্তিত হচ্ছে এবং মানুষের স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করছে। আমরা ক্রমবর্ধমানভাবে বিভিন্ন উদীয়মান রোগ দেখতে পাচ্ছি যেমন SARS, Ebola, Zika এবং তারপর CIVID-19। ডেঙ্গু আমাদের নীতি এবং সিস্টেম ব্যর্থতার আরেকটি উদাহরণ। আমরা নিশ্চিত নই কোভিডের পরবর্তী কি হবে। তাই ত্রুটি এবং সফলতা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন এবং পর্যাপ্ত প্রস্তুতির প্রয়োজন। স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে পূর্ব সতর্কতা এবং সামঞ্জস্য ও প্রস্তুত করার জন্য পর্যাপ্ত সময় প্রদানের জন্য আমাদের টেকসই এবং কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

৬.    অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ: নন-প্রেসক্রিপশন অ্যান্টিবায়োটিকের প্রাপ্যতার কারণে, অ্যান্টিবায়োটিকের অনুপযুক্ত ব্যবহার এবং প্রাণীদের জন্য অ্যান্টিবায়োটিকের বিপুল অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের কারনে এন্টিবায়োটিক সহ বহু ওষুধের প্রতিরোধের কারণ হচ্ছে। সংক্রমণ ব্যবস্থাপনা কঠিন এবং ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। এসব ধারা বন্ধ না হলে ভবিষ্যতে অনেক মানুষ অকালে মারা যেতে পারে।

৭.    মুঠোফোন আর ডিজিটাল রূপান্তর: বাংলাদেশের প্রতিটি কোণায় এবং জনসংখ্যায় মোবাইল এবং ডিজিটাল পরিষেবাগুলির প্রাপ্যতা, বিশেষ করে প্রতিরোধমূলক এবং ফলো-আপের পাশাপাশি বেশিরভাগ জনসংখ্যার জন্য পরামর্শ/প্রেসক্রিপশন পরিষেবাগুলি তৈরি করার সুযোগ দিচ্ছে তবে অপব্যবহার, গুজব ছড়ানো, অপতৎপরতা এবং মিথ্যা প্রতিকার প্রতিরোধে একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশে কোভিড-১৯-এর সময় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলি মানুষের কাছে পৌঁছাতে এবং সময়মতো পরিষেবা দেওয়ার জন্য ব্যাপক ব্যবহার করা হয়েছিল। সৌভাগ্যবশত বাংলাদেশের প্রয়োজনীয় জ্ঞান, প্রযুক্তি, বিশেষজ্ঞ এবং বাস্তবায়ন ক্ষমতা রয়েছে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জনসংখ্যাকে সময়োপযোগী এবং প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদানের জন্য, ফলো-আপ কেয়ার, বয়স্ক এবং দীর্ঘস্থায়ী হোম কেয়ারের জন্য এবং ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনীয়তা কমাতে মোবাইল এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে হবে। এই প্ল্যাটফর্মগুলি পরিষেবা প্রশিক্ষণেও ব্যবহার করা যেতে পারে যা স্বাস্থ্যকর্মীদের তাদের কার্য স্থান ছেড়ে যাওয়ার প্রয়োজন কমাতে সহায়তা করবে।

৮.    অসমাপ্ত এজেন্ডা: মানসিক স্বাস্থ্য এখনও স্বাস্থ্যসেবার একটি অবহেলিত এলাকা। এটি কলঙ্ক, কুসংস্কার, জ্ঞান এবং বোঝার অভাবের কারণে, আর এই সমস্যার ব্যাপকতার প্রমাণের অভাবের পাশাপাশি জনসংখ্যা, নীতিনির্ধারক এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের সচেতনতার অভাবের কারনে অবহেলিত হচ্ছে। অনেকে এখনও সমাজের দ্বারা কলঙ্কিত হওয়ার ভয়ে তাদের সমস্যা প্রকাশ করতে চান না। স্বাস্থ্য ব্যবস্থা পর্যাপ্তভাবে প্রতিক্রিয়াশীল বা তথ্য এবং পরিষেবা প্রদান করতে সক্ষম নয়। বিশেষ করে তরুণরা ব্যাপক সামাজিক পরিবর্তন এবং ভবিষ্যতের উন্নয়নের সুযোগের অভাবের কারণে চাপের সম্মুখীন হচ্ছে। মানসিক চাপ এবং বিষণ্নতায় ভুগছেন, আত্মবিশ্বাস হারাচছে। তরুণদের আত্মহত্যার হার বাড়ছে। তাদের প্রয়োজনীয় সময়মত সহায়তা প্রতিরোধ এবং প্রদানের জন্য স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এখনও পর্যাপ্ত নয়। অন্যান্য অসমাপ্ত এজেন্ডা হল মা, নবজাতক এবং শিশুর স্বাস্থ্য সমস্যা। যদিও তাদের স্বাস্থ্যের উন্নতি এবং বেঁচে থাকার জন্য অনেক কিছু অর্জন করা হয়েছে, কোভিড-১৯ দেখিয়েছে যে আকস্মিক পরিবর্তনগুলি সমস্ত অর্জনকে দুর্বল করে দিতে পারে।

৯.    স্বাস্থ্যের রাজনীতি: যদিও কিছু সময়ের জন্য জনস্বাস্থ্য নেতারা বুঝতে পেরেছিলেন যে স্বাস্থ্য নীতি, কৌশল এবং এর বাস্তবায়ন রাজনীতি এবং রাজনীতিবিদদের দ্বারা ইতিবাচক পাশাপাশি নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে, কোভিড-১৯ মহামারী আরও স্পষ্ট করে তুলেছে যে এটি জনস্বাস্থ্য নেতারা নয় বরং এটি রাজনীতি এবং রাজনীতিবিদরা তা নির্ধারিত হচ্ছে। রাজনীতি এবং রাজনীতিবিদরা নির্ধারণ করছেন স্বাস্থ্য পরিচর্যা পরিষেবার বিধান এবং পর্যাপ্ত অর্থ ও বাজেট বরাদ্দের জন্য কী, কখন বা কিভাবে প্রয়োজন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞকে আরও বুঝতে হবে যে আজকে শুধু রোগ থেকে জীবন বাঁচানো যথেষ্ট নয়, স্বাস্থ্য নীতি এবং কৌশল নির্ধারণের সময় জীবিকা থেকে জীবন বাঁচানো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। স্বাস্থ্য মানে শুধু রোগ বা জীবানু থেকে জীবন বাঁচানো নয় বরং জীবিকা থেকেও জীবন বাঁচানো। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের স্বাস্থ্য নীতি তৈরির সময় স্বাস্থ্যের রাজনীতি বুঝতে হবে, রাজনৈতিক ভাষা শিখতে হবে এবং জয়ের পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে।  স্বাস্থ্য রক্ষা এখন আর জনস্বাস্থ্য আধিকারিকদের বা স্বাস্থ্য মন্ত্রকের একার ডোমেইন নয়। আমাদের বিভিন্ন সেক্টর এবং মন্ত্রণালয়, সুশীল সমাজ, এনজিও, বেসরকারি খাত এবং সামগ্রিক সাধারণ জনগণকে জড়িত করতে হবে। আজ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা স্বাস্থ্য নীতি, কৌশল এবং হস্তক্ষেপ প্রণয়ন করতে পারেন তবে রাজনীতিবিদরাই সেইগুলি ঘটাবেন এবং বাস্তবে বাস্তবায়ন করবেন।

১৯৮০ সালে বাংলাদেশের একটি প্রত্যন্ত থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কাজ করার সময়, আমি দেখেছি যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সকল স্তরের অদক্ষতা, নিরাপত্তাহীনতা এবং দুর্নীতি জনসংখ্যার জন্য স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকে কঠিন করে তুলেছে। সেই অবস্থায় আমার কাছে দুটি বিকল্প ছিল, হয় সেই দুর্নীতির অংশ হওয়া বা চলে যাওয়া। এখন হয়তো পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। আমি অনেক জেলা ও উপজেলা এবং শিক্ষণ হাসপাতালে গিয়েছি, এমনকি অতি সম্প্রতি এবং দেখেছি বেশ দক্ষ ভাবে চালিত হাসপাতাল এবং সেইসাথে অকার্যকর অব্যবস্থাপিত ব্যবস্থার হাসপাতাল, দেখেছি বিপুল সংখ্যক কেনা কিন্তু অব্যবহৃত আধুনিক এবং দামী যন্ত্রপাতি এবং সরবরাহ মেঝেতে অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকতে। আমাদের নতুন স্বাস্থ্য মন্ত্রীর প্রচুর চ্যালেঞ্জ রয়েছে,  বার্ন এবং প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে তার অতীত উত্সর্গ, নিরবধি প্রচেষ্টা এবং কৃতিত্বের কথা বিবেচনা করে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে তিনি সেই চ্যালেঞ্জগুলিকে সুযোগে পরিণত করতে সবচেয়ে বেশি সক্ষম। আমাদের প্রধানমন্ত্রী স্বাস্থ্যকে তার একটি অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচি হিসেবে বিপুল বাজেট বরাদ্দ দিয়েছেন। হ্যাঁ, কেউ কেউ বলতে পারে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আরও অর্থের প্রয়োজন, কিন্তু আমি মনে করি প্রথমে আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যেই যে অর্থ বরাদ্দ আছে, তা যেন সময় মত, সৎ ভাবে ব্যবহার করা হয়- যেন অপচয় না হয়, দুর্নীতি না হয়, অদক্ষতা না থাকে এবং জবাবদিহিতার মানসিকতা এবং কাজের কাঠামো নিয়ে কাজ করা হয়। মন্ত্রী নিজেকে অকার্যকর, স্বার্থপর, দুর্নীতিগ্রস্ত, চাটুকার, যারা তাকে খুশি করার জন্য ফিল্টার করা তথ্য দেবে, তাকে বাস্তব থেকে অন্ধ করে রাখবে এমন লোকেদের সাথে তাকে ঘিরে রাখার পরিবর্তে তিনি এমন লোকেদের ডাকবেন যারা বর্তমান পরিস্থিতি এবং জনস্বাস্থ্যের পরিবর্তনের উপরে বিশ্লেষণ করতে সক্ষম এবং যারা তাকে নিঃস্বার্থভাবে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করবে, এবং তাকে সত্য, বাস্তবতা, তথ্য জানাবে যা তার জ্ঞাত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে। আমি জানি একজন বহিরাগতের জন্য সংস্কার সম্পর্কে অনেক কিছু বলা সহজ, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন এবং অনেক কঠিন। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি যে আমাদের মন্ত্রী একজন সৎ প্রমাণিত নেতা এবং তিনি অনেক দীর্ঘ প্রতিষ্ঠিত ইনসুলেটেড জং ধরা প্রতিষ্ঠানের আরপিত বাধা অতিক্রম করতে সক্ষম হবেন। জাতি, সাধারণ মানুষ তার দিকে তাকিয়ে আছে। বাংলাদেশে অনেক চমৎকার এবং সবচেয়ে দক্ষ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আছেন এবং আমি নিশ্চিত যে তাদের মধ্যে অনেকেই তাদের সেবা দিতে ইচ্ছুক হবে, যদি সেই সুযোগ দেওয়া হয়। আমার মনে আছে, প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন যখন নির্বাচিত হয়েছিলেন, তখন তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়ার আগে বিভিন্ন ট্রানজিশন টিম গঠন করেন। আমি তখন WHO/HQ-এ ছিলাম, কেন জানি না, তার স্বাস্থ্য খাতের ট্রানজিশন টিমে যোগ দিতে আমাকে ওয়াশিংটনে ডাকা হয়। আমি সেখানে দেখেছি কিভাবে আমরা প্রত্যেকে আলোচনা করেছি, বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেছি, উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বাস্থ্য উন্নয়নে প্রয়োজন আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এর প্রভাব এবং বিভিন্ন উপায় ও উপায় গুলো সুপারিশ করেছি। আমরা শুধু সুপারিশ করেছি কিন্তু রাষ্ট্রপতি এবং তার দল শেষ পর্যন্ত নীতি ও কৌশল নির্ধারণ করেছিল। ঠিক একই ভাবে, প্রমাণিত জনস্বাস্থ্য নেতারা স্বাস্থ্য লক্ষ্য অর্জনের উপায় এবং উপায় প্রদানে আমাদের  স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে সমর্থন করতে পারে কিন্তু  স্বাস্থ্যমন্ত্রী আমাদের নেতা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব ও চূড়ান্ত কর্তৃত্ব তাঁর। আমাদের কেবল সেবা বিস্তৃত করা/কভারেজ উন্নত করার জন্য কাজ করা উচিত নয়, আমরা এটি প্রায় অর্জন করেছি, এখন সেবার গুণমান, প্রতিক্রিয়াশীলতা এবং জবাবদিহিতা উন্নত করার সময় এসেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে একটি রূপান্তরমূলক পরিবর্তন আশা করছি। আমি বিশ্বাস করি হ্যাঁ তিনি পারবেন।

 


Prof Dr Quazi Monirul Islam, MBBS, MPH, FRCOG

Department of Epidemiology, Prince of Songkla University, Hat Yai, Thailand

Senior Specialist, International Centre for Migration, Health and Development

Former Senior Specialist (Maternal and Newborn), Liverpool School of Tropical Medicine, UK

Former WHO Director and WHO Country Representative to Thailand and Namibia



মন্তব্য করুন


বিজ্ঞাপন