ইনসাইড থট

আমাদের কাছে নির্বাচন ছিলো আনন্দ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ১৬ নভেম্বর, ২০২১


Thumbnail

বেশি দিন আগের কথা নয়, একবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকের কথা,তখন আমাদের কাছে নির্বাচন মানেই ছিলো আনন্দ। আমাদের কাছে তখন নির্বাচন ছিলো উৎসব।তখন আমি প্রাইমারির শিক্ষার্থী। সম্ভবত তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ি। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন এলো। আমাদের গ্রাম থেকে মেম্বার পদে তিন জন প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলো। একজনের প্রতীক কলসি,আরেক জনের মোরগ,অন্য একজনের মই। আমরা স্কুল থেকে ফিরেই মিছিল বের করতাম। একদিন মিছিল করতাম কলসি`র,আবার পরের দিন মোরগ প্রতীকের, পরদিন মই প্রতীকের। আবার এমন ও হয়েছে সকালে এক প্রার্থীর তো বিকেলে অন্য প্রার্থীর।

মিছিল শেষ হতো প্রার্থীর বাড়ি গিয়ে। আমাদের ১০/২০ টাকা বকশিস দিতো, তা দিয়ে বিস্কুট কিনে আনন্দ করে সবাই মিলে খেতাম। সপ্তাহে একদিন উঠান বৈঠক হতো, আমরা সব বৈঠকেই যেতাম, সেদিন খিচুড়ি রান্না হতো। আমরা বৈঠক শেষে মজা করে খেতাম। আবার নির্বাচনের তারিখ ঘনিয়ে আসলে বড় বড় মিছিল হতো,মিছিল শেষে ঠোঙ্গা বোঝাই মুড়ি-গুড় দিতো,আমরা মজা করে খেতাম। প্রার্থীর বাড়িতে রাতভর আড্ডা হতো,ভোটাররা চা-পান খেতো,গল্প গুজব করতো,এ যেন মিলন মেলা। মোট কথা কে হারবে, কে জিতবে তা আমাদের চিন্তার বিষয় ছিলো না। নির্বাচন ছিলো আমাদের কাছে এক উৎসবের নাম।

তখন নির্বাচনে ভোটারদের আকৃষ্ট করতে বিড়ি, সিগারেট, সাবান, শ্যাম্পু ইত্যাদি পুরস্কার দেবার প্রচলন ছিলো।আমাদের ছোটদের দিতো বিস্কুট, ৫/১০ টাকা। আমরা লুকিয়ে মাঝে মধ্যে ২/১ টান বিড়ি-সিগারেট ও খেতাম।

চাকুরীজীবীরা নির্বাচনের দিন বাড়ি আসতো। বাড়িতে ভাল-মন্দ রান্না হতো, আমরা নতুন জামা কাপড় পড়ে ভোট কেন্দ্রে যেতাম। সারা দিন ভোট গ্রহণ চলতো। ভোট কেন্দ্রে মেলা বসতো। মেলায় খেলনা থেকে শুরু করে ভাজা জিলাপি, পিয়াজু, বিভিন্ন পিঠা সহ নানা ধরনের খাবার বিক্রি হতো। আমরা টাকা জমাতাম এই দিনের জন্য।

বিকেলে ফলাফল ঘোষণা হতো। আমরা বিজয় মিছিল করতাম। দুদিন ধরে গ্রামে চলতো বিজয় উৎসব। এরপর বিজয়ী প্রার্থী গরু জবাই করে গ্রামবাসীকে খাওয়াতো।

আমরা কবজি ডুবিয়ে খেতাম। সাত দিন পর আবার সবাই যার যার মতো স্বাভাবিক জীবনে প্রবেশ করতো।কিছুটা রেষারেষি থাকলেও তা খুব বেশি প্রকাশ পেতো না।

বর্তমানে সেই উৎসব টা নেই। এখন ভোট আসে,ভোট যায়,আমরা আনন্দ পাই না। সেই মিছিল হয় না। রাতভর নির্বাচনী আড্ডা হলেও আগের সেই আমেজ টা নেই। ভোটের দিন আগের মতো আর কেউ সেজেগুজে  কেন্দ্রে যায় না। অনেকেই ছুটি নিয়ে বাড়ি আসে না। আগের সামাজিক সম্প্রীতি আর চোখে পড়েনা।

দিন পালটে গেছে। চারপাশে ডিজিটাল ফেস্টুন, ব্যানার, নির্বাচনী গান, মাইকিং, প্রজেক্টর, অথচ আমার ছেলেবেলার সেই হাতে আঁকা ব্যানারটা আমি খুঁজে পাই না। দড়িতে বাধা কাগজের পোস্টার এখন নেই। আমরা আর দলবেঁধে মিছিলে যাই না। মিছিল শেষে মুড়ি-গুড়ের প্যাকেটের জন্য অপেক্ষা করি না।

আমার আগের মতো নির্বাচন চাই। আমার উৎসব চাই। আমি আবার দলবেঁধে ভোট কেন্দ্রে যেতে চাই। ভোটের দিন মেলা চাই। আমি ভোটকেন্দ্র গিয়ে গরম গরম গুড়ের জিলাপি খেতে চাই। আমি আবার ভোট গণনা শেষে বিজয় মিছিল করতে চাই। আমি আবার সামাজিক সম্প্রীতি চাই। আমার ছেলেবেলার দিনগুলো ফেরত চাই।আমি পরের নির্বাচনের জন্য অপেক্ষা করতে চাই।

লেখক: শিক্ষক ও সাংবাদিক।



মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

১০ ডিসেম্বরকে অবশ্যই প্রতিহত করতে হবে


Thumbnail

১০ ডিসেম্বর বিএনপি ঢাকায় একটি সমাবেশ ডেকেছে। এটি শুধু বাংলাদেশে নয় বিদেশেও এখন আলাপ আলোচনা হচ্ছে। বিদেশে অনেকের ভেতরেই এটি নিয়ে উৎকণ্ঠা কাজ করছে। কারণ তাদের সবারই ঢাকায় আত্মীয় স্বজন আছে। বিএনপি বলছে বিপুল সংখ্যক লোক তাদের এই সমাবেশে যোগদান করবে। তাদের সহযোগিতার জন্য দার্শনিক রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা বলছেন, কোন যানজটের ধর্মঘট যেনো না হয় সেটি বিষয়টি খেয়াল রাখতে এবং ছাত্রলীগের সম্মেলনকেও তিনি এগিয়ে এনেছেন যাতে বিএনপি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মঞ্চসজ্জা থেকে শুরু করে সকল পুর্বপ্রস্তুতি নিতে পারে। এবং আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে তিনি ইতিমধ্যে এ ব্যাপারে নির্দেশনা দিয়েছেন বলে আমরা বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে জানতে পেরেছি। ব্যাক্তিগতভাবে অনেকের সাথে যোগাযোগ করেও আমি জানতে পেরেছি যে, তিনি তার দল এবং যারা আইন রক্ষাকারী বাহিনী কেউ যাতে বাড়াবাড়ি না করে এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তারা যেনো শান্তিতে তাদের মহাসমাবেশ করতে পারে এবং সরকারের পক্ষ থেকে যতটুকু সাহায্য সহযোগিতা করা প্রয়োজন সেটুকু তারা করবেন। যদিও এটি কোনো পত্রিকায় আসেনি কিন্তু আমার ধারণা যেহেতু মহাসমাবেশে বিপুল সংখ্যক মানুষ আসবে বলে দাবি করছে বিএনপি, সেখানে পানির অসুবিধা হতে পারে, আমার ধারণা সরকার সেখানে তাদের জন্য পানির ব্যাবস্থাও করে দিবেন। সুতরাং আমার মনে হয় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ১০ তারিখ বিএনপির সমাবেশ করতে কোন অসুবিধা হবে না।

 

এই বিষয় নিয়ে আমাকে হঠাৎ করে গতরাত্রে ওয়েলস থেকে একজন ফোন করলেন। তার বাবা ছিলেন মরহুম সমাজকল্যাণ মন্ত্রী মহসিন সাহেবের বন্ধু। তারা আওয়ামী লীগ পরিবারের হলেও সরাসরি আওয়ামী লীগ দলের সাথে যুক্ত নয়। তার পিতাও দলের সাথে যুক্ত ছিলেন না। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে তিনি অনেক শ্রদ্ধা করতেন। তারা সকলেই খুবই নিভৃত মনে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারন করেন এবং তার কন্যাকেও খুবই সম্মানের চোখে দেখেন। আর এ কারণে তাদের সাথে আমার গত ৩০ বছরের যোগাযোগ। তিনি আমাকে বললেন, একটা সংবাদ এই মাত্র তিনি তার ছোট ভাইয়ের মাধ্যমে পেয়েছেন। কথাটি শুনে মনটা খুবই খারাপ হয়ে গেলো। বিষয়টি হলো কেনো ১০ ডিসেম্বর তারা মহাসমাবেসের তারিখ ঠিক করল। ১০ ডিসেম্বর আমরা জানি মানবাধিকার দিবস। তার চেয়ে গুরুত্বপুর্ন যে বিষয়টি তা হলো ১০ ডিসেম্বর প্রথম ১৯৭১ সালে এ দেশে বুদ্ধিজীবীদের ধরে নিয়ে যেয়ে রাজাকার আল-বদররা হত্যা করে। যাতে দেশ স্বাধীন হলেও কোনো বুদ্ধিজীবী যেনো জীবিত না থাকে। একটি গোষ্ঠী যদি ধরি তাহলে ১৯৭১ সালে চিকিৎসকরা সবচেয়ে বেশি জীবন দিয়েছে এবং ব্যাক্তিগতভাবে আমারও একটি দুর্বলতা আছে, কারণ আমার সরাসরি ২ জন শিক্ষক অধ্যাপক আলিম চৌধুরী এবং অধ্যাপক ফজলে রাব্বি। অধ্যাপক ফজলে রাব্বির অধীনে মিয়া চাকরীও করেছি। এই দুইজনকেও একই ধারাবাহিকতায় হত্যা করা হয়। বুদ্ধিজীবী হত্যার দিবসটি তাই আমার কাছে একটি ব্যাক্তিগত বেদনারও বিষয়। ওয়েলসের আমার সেই ছোট ভাই বললো পাকিস্তানের ইন্টিলিজেন্ট ব্রাঞ্চ আইএসআই’র টাকা দিয়ে এবং আইএসআই এর বুদ্ধিমতো বিলেতে অবস্থিত রাজপুত্রের মাধ্যমে ১০ডিসেম্বরকে ঠিক করা হয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও যাতে এগিয়ে না যেতে পারে তার সর্বশেষ চেষ্টা হচ্ছে ১০ ডিসেম্বর। এটা শোনার পর আমার মনে হলো কেবল সোহরাওয়ার্দী উদ্যান নয়, শুধু মাত্র শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে ছাড়া আর কোথাও কোনো গনজামায়াত বা কোনো কিছু হতে দেওয়া উচিত না।  আর সেইখানে বিএনপি দাবি করছে তারা সোহরাওয়ার্দী উদ্যান নয় পল্টন ময়দানে সমাবেশ করবে। এটাতো মামা বাড়ির আবদার না। আমি মনে করি ৯ তারিখ রাত ১২ টার পর শহীদ মিনারে প্রতিকি মোমবাতি জালিয়ে আমাদের শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণ করা উচিত এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের আসে পাশে না করে বাকি বিভন্ন জায়গায় আমরা ৯ তারিখ থেকে ১০ তারিখ পর্যন্ত ছোট ছোট আকারে হলেও সভা করা উচিত। তাদের আত্মা যাতে শান্তি পায়। তাদেরকে ভুলে যাইনি। কেননা এটা সরাসরি আমাদেরকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। যারা সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বন্দবন্ধুর নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে, ৩০ লক্ষ মানুষ তাদের জীবন দিলো, ২ লক্ষ মা বোন তাদের ইজ্জত দিলো তাদের কি আমরা স্মরণ করবো না? আমরা মৃত্যুর আগের যদি তাদের ভুলে যাই তাহলে কিভাবে হবে। ৯ এবং ১০ ডিসেম্বর হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নিবেদিত। যেহেতু সরকার তাদের অনুমতি দিয়েছে তারা তাদের সমাবেশ করুক। কোন প্রকার পেশি শক্তি দেখি আমরা তাদের সমাবেশ নষ্ট করতে চাই না। এটা কোনো রাজনীতির ভাষা নয়। যেহেতু দার্শনিক রাষ্ট্রনায়ক নির্দেশ দিয়েছেন এখানে তাদের গনজামায়াত হবে তাই এই ব্যাপারে আমরা কোনো কথা বলবো না। তারা সমাবেশ করুক। কিন্তু বাকি শহরগুলোতে সকলে মিলে নিজের দলের পরিচয় ভুলে গিয়ে আমরা ৯ এবং ১০ ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় অবশ্যই শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণ করবো এবং এই আইএসআইের পরিকল্পনা মতো ঠিক করা ১০ ডিসেম্বরকে অবশ্যই প্রতিহত করতে হবে। কেননা তা না হল আমাদের আরেটি পরাজয় গ্রহণ করতে হবে। আমরা পরাজিত হবার জন্য মুক্তিযুদ্ধ করিনি। পরাজিত হবার জন্য দার্শনিক রাষ্ট্রনায়ক দেশকে এগিয়ে নিচ্ছেন না। এটাতে অবশ্যই দার্শনিক রাষ্ট্রনায়কের হাত শক্তিশালী করা হবে এবং একই সাথে আওয়ামী লীগও উপকৃত হবে। কিন্তু আওয়ামী লীগকে সাহায্য করার জন্য আমরা এটি করছি না। আমরা করছি বঙ্গবন্ধুর কথা মনে করে, আমরা করছি দার্শনিক রাষ্ট্র নায়ক শেখ হাসিনার নির্দেশিত কথা মনে করে এবং সর্বোপরি যারা এ দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন তাদের স্মরণ করে এবং তাদের পরিবারের সাথে একতা ঘোষণার জন্যে। সুতরাং, আইএসআই এর দেওয়া ১০ তারিখে বিএনপি এবং জামাতসহ অন্যান্য ধর্মান্ধরা আমাদের আই শহীদ বুদ্ধিজীবীদের আত্মাকে অপমান করবে এটাকে কিছুতেই গ্রহণ করা যায় না। 



মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

ছাত্রলীগের সম্মেলন এবং প্রাসঙ্গিক ভাবনা


Thumbnail

শিক্ষা, শান্তি, প্রগতির পতাকাবাহী সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিজ হাতে গড়া এই ছাত্র সংগঠনটির রয়েছে অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল এক রাজনৈতিক ইতিহাস। এদেশের প্রতিটি গণআন্দোলনের সাথে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত হয়ে আছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নাম। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি সময়ের প্রয়োজনে বাংলা, বাঙালি, স্বাধীনতা ও স্বাধিকার অর্জনের লক্ষে তৎকালীন তরুণ নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রেরণা ও পৃষ্ঠপোষকতায় একঝাঁক স্বাধীনতাপ্রেমী তারুণ্যের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় এশিয়া মহাদেশের ‘বৃহত্তম’ ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। প্রতিষ্ঠাকালীন নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ। পরবর্তী সময়ে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশে সংগঠনটির পরিবর্তিত নাম হয় বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।

সংগ্রামী এবং স্বাধীনতার চেতনায় লালিত সংগঠনটির প্রতিষ্ঠা পরবর্তী প্রথম প্রত্যক্ষ সংগ্রাম ছিলো বাঙালীর ভাষা আন্দোলন। ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে বুকের তাজা রক্তের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠা হয় বাঙালির ভাষার অধিকার। ১৯৫৪ সালের যুক্রফ্রন্ট নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভ্যানগার্ড হিসেবে নিয়োজিত ছিলো ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা। যুক্তফ্রন্টের বিজয় সুনিশ্চিত করতে যাদের ছিলো অনবদ্য ভূমিকা। শিক্ষার অধিকার আদায়ে ১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর রাজপথে রক্ত দিয়েছিলো বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ- বঙ্গবন্ধু প্রণিত ঐতিহাসিক ছয় দফা, যার পরিপ্রেক্ষিতে বেগবান হয় আমাদের মহান স্বাধীনতা আন্দোলন; এই ছয় দফা দেশের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, প্রতিটি অলিতে গলিতে ছড়িয়ে দিতে নিরলসভাবে পরিশ্রম করেছিলো বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। তৎকালীন শাসক শ্রেণীর রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে দেশপ্রেমের বলে বলিয়ান হয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছিলো বঙ্গবন্ধুর ভ্যানগার্ড হয়ে। ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে ছাত্রলীগের ভূমিকা ছিলো ঐতিহাসিক। ছাত্রলীগের নেতৃত্বে বাংলার ছাত্রসমাজ সারাদেশে দুর্বার গণআন্দোলন গড়ে তোলে, যা  রূপ নেয় গণঅভ্যুত্থানে। পদত্যাগে বাধ্য করা হয় পাক শাসককে এবং বন্দীদশা থেকে মুক্ত হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ বাংলার ছাত্র সমাজের পক্ষ থেকে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন। ৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন এবং একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে সারা বাংলাদেশে পাকিস্তানের অপশাসনের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন গড়ে তুলতে ছাত্রলীগ ছিলো সদা তৎপর। 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের  ঐতিহাসিক ৭ই  মার্চের ভাষণে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে সারা বাংলাদেশে ছাত্র-সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ এবং শহীদ হন ছাত্রলীগের বহু নেতাকর্মী।  ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছাত্রলীগের সমাবেশে বলেছিলেন- ‘দানবের সঙ্গে লড়াইয়ে যে কোনো পরিণতিকে মাথা পেতে বরণের জন্য আমরা প্রস্তুত। তেইশ বছর রক্ত দিয়ে এসেছি। প্রয়োজনবোধে বুকের রক্তে গঙ্গা বহাইয়া দেব। তবু সাক্ষাৎ মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও বাংলার বীর শহীদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি করব না।’ বঙ্গবন্ধুর কথাতেই তাঁর একান্ত অনুগত বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সতেরো হাজার নেতা-কর্মী মহান মুক্তিযুদ্ধে তাদের বুকের তাজা রক্তে স্বাধীন করেছিল প্রিয় মাতৃভূমি।  

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়েও বাংলাদেশ ছাত্রলীগের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ধারা অব্যাহত থাকে। ঘৃণ্য রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রে ৭৫-এ বঙ্গবন্ধু হত্যা  পরবর্তী সময়ে যখন এদেশের গণতন্ত্র হাটতে শুরু করে উল্টোপথে, তখন গণতন্ত্র পূনরুদ্ধারের বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ছিলো ঐতিহাসিক ভূমিকা। সামরিক জান্তা সরকারের জুলুম, নির্যাতন, বুলেটের আঘাতকে উপেক্ষা করে সৈরাচার বিরোধী গণআন্দোলনের মাধ্যমে অবসান ঘটায় দীর্ঘ পনেরো বছরের সামরিক শাসনের। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের দেশপ্রেম, মানবপ্রেম এবং দেশের স্বার্থে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ধারা অব্যাহত আছে আজও। এদেশের ইতিহাসের অন্যতম কালো অধ্যায় ১/১১’র সময় জননেত্রী শেখ হাসিনাসহ ছাত্র-শিক্ষক সবার মুক্তি এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দাবিতে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ গড়ে তুলেছিলো দুর্বার গণআন্দোলন। প্রতিষ্ঠার সূচনালগ্ন থেকে যখনই বাংলাদেশ সামাজিক, রাজনৈতিক, সংস্কৃতির সংকটের মুখোমুখি হয়েছে তখনই আলোর দিশা হয়ে সংকট মোকাবেলা করেছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। প্রতিষ্ঠাকালীন থেকে এখনও অবধি বাংলাদেশ ছাত্রলীগ তৈরি করেছে হাজার হাজার দেশপ্রেমিক নেতা-কর্মী। যাদের অবদানে আজও স্ব-মহিমায় উড়ছে শিক্ষা শান্তি প্রগতির পতাকা। এদেশের স্বাধীনতা এবং স্বাধীনতা পরবর্তী সামাজিক, রাজনৈতিক, সংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের অবদান অনস্বীকার্য। দেশ এবং মানবসেবায় নিরলস পরিশ্রমী এই ছাত্র সংগঠনটি তাই রয়েছে সারাদেশের মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায়। ৭৫ পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সুনির্দিষ্ট দিক নির্দেশনায় সকল অপশক্তির ষড়যন্ত্রকে নস্যাৎ করে সফলতার সাথে কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম এই সংগঠনটি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীদের হাতে অস্ত্রের বদলে কলম তুলে দেওয়ার কৃতিত্বও ঐতিহাসিক এই ছাত্রসংগঠনটির। আমরা দেখেছি করোনা মহামারির সময়ে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ সৃ‌ষ্টি করেছে মানবতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সারা বাংলাদেশের প্রতিটি আনাচে কানাচে বাংলাদেশর ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা পাশে দাঁড়িয়েছে অসহায় মানুষের। খাদ্য সহায়তা, অক্সিজেন সহায়তা, চিকিৎসা সেবাসহ যেকোনো প্রয়োজনে দেশের সংকটকালে সর্বদা মানুষের পাশে ছিলো বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।

তবে কালের বিবর্তনে আওয়ামীলীগের ভ্রাতৃপ্রতিম এই সংগঠনটি এখ সবচেয়ে অবহেলিত। ছাত্রলীগের প্রটোকল নিয়ে এমপি মন্ত্রী হওয়া যায়।যেকোন প্রোগ্রামে অডিটোরিয়াম বা মাঠ ভরাতে আদম হিসেবে ব্যবহার করা যায়। কখনো কখনো লাঠিয়াল হিসেবেও কাজে লাগানো হয়। কিন্তু ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করা যায় না। দিনশেষে চাটুকারদের ভিড়ে হারিয়ে যায় ছাত্রলীগের প্রকৃত ত্যাগী কর্মীরা। 

ছাত্রলীগের শরীরে ঘামের গন্ধ থাকে। ছাত্রলীগ স্যুটেড বুটেড থাকে না কারণ সারাদিন যে আপনাদের কামলাগিরি করতে হয়। তবে ছাত্রলীগের রক্তে উন্মাদনা থাকে, দেশপ্রেম থাকে, কম্প্রোমাইজ না করার দূর্বিনীত দু:সাহস থাকে। বঙ্গবন্ধু আর শেখ হাসিনাকে বুকে ও মগজে নিয়ে ঘুমাতে যায় ছাত্রলীগ।

দিনশেষে তাই শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত বিশেষ বিশেষ আয়োজনে ছাত্রলীগের দাওয়াত মেলে না,সেখানে জায়গা করে নেয় রাজাকারের ছানাপোনারা। ছাত্রলীগের বহু ত্যাগি নেতাকর্মীদের  জীবন সংসারে, ঘরে-বাইরে সবকিছু ত্যাগ করতে করতে বাকি আছে শুধু দলটা ত্যাগ করার। সেই সময়ও হয়তো সমাগত। আর তারা সুসময়ে এমনিতেই অভিমানে দুরে থাকে। দুঃসময়ে বুক পেতে আগলে রাখে দলটাকে। আগামীতে হয়তো আগলে রাখার হিসেবটাও বদলে যাবে। কেননা বক্তৃতায় আপনারা যতই বলেন তারা দলের প্রাণ, এগুলো শুধুই আপনাদের বয়ান।  

আগামী ৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ৩০ তম জাতীয় সম্মেলন। এই সম্মেলনে ত্যাগীদের সর্বোচ্চ মূল্যায়নের প্রত্যাশা তৃণমূলের। আগামীর জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিগত দিনে রাজপথের নেতৃত্ব দানকারী, জননেত্রী শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করতে অবদান রাখা, বিচক্ষণ নেতৃত্বের কাঁধেই উঠুক ছাত্রলীগের ভার। ছাত্রলীগ প্রসঙ্গে জাতির পিতা বলেছেন- আমি দেখতে চাই যে, ছাত্রলীগের ছেলেরা যেন ফার্স্টক্লাস বেশি পায়। আমি দেখতে চাই, ছাত্রলীগের ছেলেরা যেন ওই যে কী কয়, নকল, ওই পরীক্ষা না দিয়া পাস করা, এর বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলো। বঙ্গবন্ধুর সেই আকাঙ্খা পূরনের দায়িত্ব ছাত্রলীগের। তাই যোগ্য ব্যক্তিদের ছাত্রলীগের নেতৃত্ব প্রদানের মাধ্যমে ছাত্রলীগকে একটি মেধীবী সংগঠনে পরিণত করা এখন সময়ের দাবী। জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু।

লেখক: এন আই আহমেদ সৈকত 
সাবেক ছাত্রনেতা (shadshaikatbd@gmail)


ছাত্রলীগ   আওয়ামী লীগ   সম্মেলন  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

বিজয়ের এই মাসে

প্রকাশ: ০৮:০০ এএম, ০২ ডিসেম্বর, ২০২২


Thumbnail

শুরু হলো বিজয়ের মাস। মহান বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি বক্তব্য এরকম-‘এই বাংলাদেশ লালন শাহ, রবীন্দ্রনাথ, কাজী নজরুল, জীবনানন্দের বাংলাদেশ। এ বাংলাদেশ শাহজালাল, শাহ পরান, শাহ মকদুম, খান জাহান আলীর বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ, ধর্মান্ধ নয়। তাই ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার করবেন না। প্রত্যেককে নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকার রাখেন। বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান- সকল ধর্মের-বর্ণের মানুষের রক্তের বিনিময়ে এ দেশ স্বাধীন হয়েছে।’প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিষয়টি স্পষ্ট করে ব্যক্ত করেছেন। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সংকটের মধ্যে বিজয় দিবস পালিত হচ্ছে। স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী অতিক্রম করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে শেখ হাসিনার বাংলাদেশে, মানুষের এগিয়ে চলার মহামন্ত্র আজ বিশ্ববাসী শুনতে পাচ্ছে। আসলে গভীরতর অর্থে, চেতনার পরিমাপে মুক্তিযুদ্ধের একটি ব্যাপক এবং বহুমাত্রিক রূপ রয়েছে। রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলন থেকে শুরু করে পাকিস্তানি অপশাসন-বিরোধী প্রতিটি আন্দোলনের সেই অনিবার্য চেতনা আমাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক জীবনে যুগান্তকারী পরিবর্তন সাধন করেছে। ‘মুক্তি’ আন্দোলনের গণজাগরণ ও সংগ্রামী চেতনার স্পর্শে এক অপরিমেয় সম্ভাবনায় উজ্জীবিত হয়ে উঠেছিল আমাদের জনতা। সেই উজ্জীবনী শক্তি একাত্তরের রক্তস্নাত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়ে বর্তমান সময়েও চলিষ্ণু। সংগত কারণেই একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের অগ্রগতিতে মুক্তিযুদ্ধের অবদানকে নতুন করে মূল্যায়ন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। যুদ্ধোত্তরকালে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ঘটনা সদ্য স্বাধীন দেশের বাস্তবতায় ছিল ভয়ঙ্কর ও অনাকাঙ্ক্ষিত। এসময় থেকে বাংলাদেশ ভূখণ্ডের নবতর অভিযাত্রা ব্যাহত হয়। যুগান্তকারী সব পরিবর্তন-সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবার পরই আবার রুদ্ধ হয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধের মুক্ত চেতনা, গণতন্ত্র ও শিল্পবিপ্লবের অবাধ বিকাশ হয় প্রলম্বিত। দীর্ঘ ২১ বছর পর পুনরায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধু ফিরে এলেন, জয় বাংলা ধ্বনিত হলো এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে স্বমহিমায় পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হলো। আর ২০০৮ ও ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে একাধারে সাড়ে ১৩ বছর ক্ষমতায় থাকায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আপামর জনগণের সঙ্গে বর্তমান প্রজন্ম তথা আড়াই কোটি তরুণ ভোটার আজ উজ্জীবিত। এজন্যই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবসময় বলে থাকেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা যায়। তাঁর মতে, সংবিধান ও গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষার মাধ্যমে সামগ্রিক উন্নয়ন অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। এসময়ে এ কথার গুরুত্ব অপরিসীম। তিনি বলেছেন, ‘আমার চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। জাতির পিতা স্বপ্ন দেখেছিলেন বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের। আমি সেই লক্ষ্যে নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে যাচ্ছি।’ রাষ্ট্রনায়কের এই কথার মধ্যেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অভিব্যক্তি রয়েছে। 

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধ্বংস করা হয়েছিল। আর সেই চেতনা পুনরুদ্ধারে সক্ষম হয়েছেন শেখ হাসিনা। অন্যদিকে একজন রাষ্ট্রনায়কের প্রধান কর্তব্য জনগণের সেবা করা যা বঙ্গবন্ধু তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংগ্রাম আর সরকার প্রধান হিসেবে দেখিয়ে গেছেন। দেশপ্রেমিক শাসক আর জনগণের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার লালন করার মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রকাশ পায়। তবে স্বাধীনতার ৫১ বছর পরও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিষয়টি অমীমাংসিত থেকে গেছে। কারণ মুক্তিযুদ্ধের পরও আমরা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তিকে রাজনৈতিকভাবে নির্মূল করতে পারিনি। আমরা মনে করেছিলাম, রণাঙ্গনের সংগ্রামের ভেতর দিয়ে পাকিস্তানপন্থীদের অস্তিত্ব বিলীন হবে। কিন্তু বিস্ময়করভাবে দেখলাম বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যার পর ওই বাংলাদেশ বিরোধীরাই ২১ বছর একাধারে এবং ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করেছে। এবং উপহার দিয়েছে জঙ্গিবাদ, মৌলবাদ, সন্ত্রাস আর দুর্নীতি। অবশ্য একথা মনে রাখতে হবে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই প্রধান প্রধান যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন হয়েছে।

এদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আওয়ামী লীগের দিক থেকে উত্থাপিত হয়েছে বারবার। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বকারী বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক মতাদর্শের দিক থেকে প্রগতিপন্থী। কেননা আমরা তাদেরই নেতৃত্বে স্বাধীনতা পেয়েছি। কিন্তু বিএনপির স্লোগানই হচ্ছে গণতন্ত্র। আর সেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় বিএনপির প্রধান সহযোগী হচ্ছে জামায়াতে ইসলাম। গণতন্ত্র বিরোধী শক্তিকে সঙ্গে নিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা কি সম্ভব? শুধু তাই নয় বিএনপির নিজের ভাবমূর্তি গণতান্ত্রিক কি? গত ১৩ বছরে তাদের সুযোগ ছিল বিরোধী দল হিসেবে জনগণের আস্থার জায়গা তৈরি করা। বিশেষ করে জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ, ১৫ আগস্টের নির্মমতার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বর্জন, ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের দল থেকে বহিঃষ্কার করা- তবেই তাদের দলীয় ভাবমূর্তি স্বচ্ছ হতো।

মনে রাখতে হবে, গণতন্ত্র আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অন্যতম অনুধ্যান। কারণ আমাদের স্বাধীনতাপ্রাপ্তির একেবারে মর্মমূলে রয়েছে গণন্ত্রের আদর্শ। বাঙালির গণতান্ত্রিক চেতনাকে যখন রুদ্ধ করার চেষ্টা করেছিল তথাকথিত পাকিস্তান, তারই প্রতিবাদে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিজয়ী দলকে একাত্তরে ক্ষমতায় যেতে দেওয়া হয়নি বলে গণযুদ্ধ হয়েছিল। এটা তাৎক্ষণিক কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণ। অবশ্য গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে বাংলাদেশের মানুষকে বঞ্চিত করার ঘটনা অনেকদিনের। সেই ইতিহাসে বাংলাদেশের মানুষকে, নানান প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলা করে গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামে অংশগ্রহণ করতে হয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বলিষ্ঠ ও আপসহীন নেতৃত্বে ৫২এর ভাষা আন্দোলন, ৬২এর শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬এর ৬-দফা, ৬৯এর ১১-দফা ও গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত হয়ে ওঠে বাঙালি জাতি। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগষ্ঠিরতা অর্জন করে। ফলে বৈধ ভিত্তি পায় বাঙালির স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা। আবার এ কথাও সত্য যে, দীর্ঘ ৫০ বছরে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার পথ মসৃণ ছিল না। কখনো একদলীয় শাসন ব্যবস্থায় আর একাধিকবার সামরিক অভ্যুত্থানে পিছিয়ে পড়েছে এদেশ। ২০২২ সালে যুদ্ধের সংকটের মধ্যে যখন বাংলাদেশ বিজয় দিবস পালন করা হচ্ছে তখন গণতন্ত্রের মূল্যায়ন হচ্ছে পুনরায়। বিএনপি-জামায়াতের জনসমাবেশের নামে তাণ্ডবের আশঙ্কা বারবার জেগে উঠছে। ফলে ফিরে এসেছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রসঙ্গ।

২. জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালি জাতি হিসেবে আমরা পেয়েছি স্বাধীন রাষ্ট্র, নিজস্ব পতাকা ও জাতীয় সংগীত। ত্রিশ লাখ শহীদ এবং দুই লক্ষ মা-বোনের অসামান্য আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি স্বাধীন বাংলাদেশ। এজন্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলতে হলে ফিরে যেতে হবে ১৯৭১-এ। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণে স্বাধীনতা ও মুক্তির যে ডাক তিনি দিয়েছিলেন সেখান থেকে যাত্রারম্ভে অতীতের সংগ্রামের ইতিহাসকে স্মরণ করে ভবিষ্যৎপ্রসারি করতে হবে দৃষ্টিভঙ্গিকে। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণা করে মুজিবনগর সরকার। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রথম বাংলাদেশ সরকার হিসেবে খ্যাত এই সরকারের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছিল, ‘১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর থেকে ১৯৭১ সালের ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশে অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে শাসনতন্ত্র রচনার উদ্দেশ্যে প্রতিনিধি নির্বাচিত করা হয়েছিল।... সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী বাংলাদেশের জনগণ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রতি যে ম্যান্ডেট দিয়েছেন সে ম্যান্ডেট মোতাবেক আমরা, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা, আমাদের সমবায়ে গণপরিষদ গঠন করে পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশকে একটি সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্র ঘোষণা করছি।’

সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত ‘বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশকে একটি সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্র ঘোষণা’ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। অন্যদিকে ১৯৭২ সালের সংবিধানের ৪টি মূলনীতিও আমাদের মুক্তিসংগ্রামের অংশ। উল্লেখ্য, ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর জাতীয় সংসদে পাস হয় বাংলাদেশের সংবিধান। গত ৫০ বছরে সংবিধান সংশোধন হয়েছে ১৬ বার। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বিভিন্ন সময়ে অগণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় এসে এই সংবিধানের চার মূলনীতিও বদলে ফেলার চেষ্টা চালিয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার ২০১১ সালের ৩০ জুন পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলোপের পাশাপাশি অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা দখলের জন্য রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধ বিবেচনায় সর্বোচ্চ দণ্ডের বিধান রাখা হয় এ সংশোধনীতে। এছাড়া এ সংশোধনীর মাধ্যমে ৭২র সংবিধানের চার মূলনীতি জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনা হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রও এই সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও সংবিধান অনুসারে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হলো স্বাধীন ভাবে আমাদের বেঁচে থাকা; ব্যক্তিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক মুক্তি, সকল মৌলিক অধীকার সমানভাবে নিশ্চিত করা; অর্থাৎ বৈষম্যহীন, মুক্ত এবং ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন, রাষ্ট্রে বলিষ্ঠ জাতি হিসেবে আমাদের বিকাশের সুযোগ থাকা এবং রাষ্ট্রে বেড়ে ওঠা আমাদের মানব সত্তা বিশ্বে মর্যাদা পাওয়া- সব মিলে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনের কথা বলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।

৩. পদ্মা সেতু ও মেট্রোরেলের বিজয়গাথার কথা মনে রেখে বলতে হয় বাঙালির যা কিছু গৌরবের তার স্বীকৃতি ঘটেছে আন্তর্জাতিক পরিসরে যার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ সরাসরি সম্পৃক্ত। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে করণীয় বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ ‘ইউনেস্কো ইন্টারন্যাশনাল মেমোরি অব দ্য’ ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টার-এ অন্তর্ভুক্ত করে ‘বিশ্বপ্রামাণ্য ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ২৫ মার্চকে আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস ঘোষণার জোর দাবি উঠেছে। কানাডা প্রবাসী প্রয়াত রফিকুল ইসলাম এবং আবদুস সালামের উদ্যোগে এবং তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রচেষ্টায় ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। আমাদের ঐতিহ্যবাহী জামদানি, মঙ্গল শোভাযাত্রা, নকশিকাঁথা এবং সিলেটের শীতল পাটি ইতোমধ্যে ইউনেস্কোর আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য-তালিকায় স্থান পেয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অগ্রসর না হলে এসব অর্জন সম্ভব হতো না।

৪. কিন্তু দুর্নীতি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করে মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন ও চেতনাকে অবমাননা করছে। সমাজ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে আদর্শ ও নৈতিকতা।  প্রকৃতপক্ষে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রাখার জন্য রাষ্ট্রীয় দুর্নীতির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু স্বয়ং। তাঁর শাসনামলে ১৯৭৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর জাতির উদ্দেশে প্রদত্ত ভাষণে তিনি বলেছিলেন, ‘... সুখী ও সমৃদ্ধিশালী দেশ গড়তে হলে দেশবাসীকে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়াতে হবে। কিন্তু একটি কথা ভুলে গেলে চলবে না- চরিত্রের পরিবর্তন না হলে এই অভাগা দেশের ভাগ্য ফেরানো যাবে কি না সন্দেহ। স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি ও আত্মপ্রবঞ্চনার ঊর্ধ্বে থেকে আমাদের সকলকে আত্মসমালোচনা, আত্মসংযম ও আত্মশুদ্ধি করতে হবে।’

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রতিষ্ঠার জন্য দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। কিন্তু সেই চেতনা প্রতিষ্ঠার জন্য কেবল রাষ্ট্রীয় নিয়মনীতি, আইনকানুন প্রণয়ন ও প্রয়োগই যথেষ্ট নয়; তার জন্য সামগ্রিক এবং নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ প্রয়োজন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘নেশন মাস্ট বি ইউনাইটেড অ্যাগেইনস্ট করাপশন। পাবলিক ওপিনিয়ন মবিলাইজ না করলে শুধু আইন দিয়ে করাপশন বন্ধ করা যাবে না।’ স্বাধীনতার পর থেকেই দুর্নীতি দমন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিভিন্ন সময় বহুবিধ আইন, বিধি-বিধান প্রণয়ন করা হয়েছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর আরো কিছু নতুন আইন প্রণয়ন করেছে, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার উন্নয়নে বেশ কিছু নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছে এবং এগুলির ব্যবস্থাপনা ও পদ্ধতির উন্নয়ন সাধন করা হয়েছে। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (২০১১-২০১৫) শেখ হাসিনা সরকার সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি দমনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে। ‘রূপকল্প ২০২১’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রণীত ‘বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০১০-২০২১’ শীর্ষক দলিলে দুর্নীতি দমনকে একটি আন্দোলন হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে। এই আন্দোলনে সবাইকে অংশীদার হতে উদ্যোগও নেয়া হচ্ছে। এছাড়া দুর্নীতি দমনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম যেসব আইন গত মহাজোট সরকারের সময় প্রণীত হয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল: সন্ত্রাস বিরোধী আইন, ২০০৯, তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯, সরকারি অর্থ ও বাজেট ব্যবস্থাপনা আইন, ২০০৯, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০০৯, চার্টার্ড সেক্রেটারিজ আইন, ২০১০, জনস্বার্থ-সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশ (সুরক্ষা প্রদান) আইন, ২০১১, মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২, প্রতিযোগিতা আইন, ২০১২ ইত্যাদি। এসব আইন প্রণয়নের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের সর্বস্তরে দুর্নীতিমুক্ত রাখার প্রত্যয় ঘোষিত হয়েছে। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর আওতাধীন অপরাধও দুর্নীতি হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু দুর্নীতিকে কেবল আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে দমন করা সম্ভব নয়, তার জন্য প্রয়োজন সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গ্রহণ ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা। এজন্য সরকারি কর্মকর্তা, বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন, সুশীল সমাজ ও নাগরিকগোষ্ঠীর সম্মিলিত প্রয়াস দরকার। দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়ে বর্তমান অবস্থার পরিবর্তন করতে দেশের যুবসমাজ বড় শক্তি এবং অপার সম্ভাবনাময় বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশ বলতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হওয়া ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার বাংলাদেশকে বুঝতে হবে। এই বাংলাদেশে জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ প্রণীত হয়েছে। যে শিক্ষানীতি ২০১০-এ ছাত্রদের চরিত্র গঠনের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। শিক্ষানীতির শিক্ষার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য তিন- অংশে বলা হয়েছে : ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করে তোলা ও তাদের চিন্তা-চেতনায় দেশাত্মবোধ, জাতীয়তাবোধ এবং তাদের চরিত্রে সুনাগরিকের গুণাবলি (যেমন: ন্যায়বোধ, অসাম্প্রদায়িক চেতনাবোধ, কর্তব্যবোধ, মানবাধিকার সচেতনতা, মুক্তবুদ্ধির চর্চা, শৃঙ্খলা, সৎ জীবনযাপনের মানসিকতা, সৌহার্দ্য, অধ্যবসায় ইত্যাদি) বিকাশ ঘটানো হবে। অর্থাৎ জাতীয় শিক্ষানীতিও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শাণিত।’

৫. মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় পরিচালিত হচ্ছে রাষ্ট্র এজন্য বাংলাদেশের সবচেয়ে বৃহৎ দল আওয়ামী লীগের নির্বাচনি ইশতেহারে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ২০১৮ সালের নির্বাচনি ইশতেহারে ৮১ বছরের পরিকল্পনা সংযুক্ত হয়েছে। ২০০৮ সালে দিনবদলের সনদ নামে নির্বাচনী ইশতেহারে ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশের প্রতিশ্রুতি ছিল আওয়ামী লীগের। টানা দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসতে ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের ইশতেহারের স্লোগান ছিল শান্তি গণতন্ত্র উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। সেই ইশতেহারে ২০৪১ সালের মধ্যে দেশকে উন্নত সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করার ঘোষণা দিয়েছিল দলটি। ১৩ বছরে এই দুই ইশতেহারে যেসব প্রতিশ্রুতি ছিল সেগুলোই ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতির পর এখন লক্ষ্য মধ্যম আয়ের দেশ গড়ে তোলা। গত ইশতেহারে ৮১ বছরের অর্থাৎ ২০১৯ সাল থেকে ২১০০ সাল পর্যন্ত পরিকল্পনা ঘোষিত হয়েছে। ডেল্টা প্ল্যানের কথা ইতোমধ্যে সকলে অবগত হয়েছেন। এ ছাড়া ইশতেহারে সন্ত্রাস জঙ্গিবাদ এবং মাদক নির্মূলের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপিত। দ্বিতীয় পদ্মা ও যমুনা সেতু, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ উৎক্ষেপণসহ দেশের সার্বিক উন্নয়নের বিভিন্ন বিষয় ছিল গত ইশতেহারে। দেশের প্রবৃদ্ধি যেন দুই অঙ্কে পৌঁছায় সেজন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের ঘোষণা ছিল সেখানে। উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশবাসী সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফলে বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত এখন, অপুষ্টির অভিশাপ দূর হতে যাচ্ছে; দারিদ্র্যের লজ্জা ঘুচেছে, নিরক্ষরতা দূর হচ্ছে, শিক্ষিত দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে উঠছে, শিল্প-সভ্যতার ভিত্তি রচিত হয়েছে; প্রতি ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছানোর ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। অন্যদিকে বেকারত্বের অবসান ও কোটি কোটি যুব সমাজের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হচ্ছে, সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হবে, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটচ্ছে; যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন হচ্ছে, পরিকল্পিত নগর-জনপদ গড়ে উঠছে এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ সমৃদ্ধির সোপানে পা রাখছে। রাজনীতি থেকে হিংসা, হানাহানি, সংঘাতের অবসান হচ্ছে, দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়নের ধারা থেকে বাংলাদেশ বেরিয়ে এসেছে; গড়ে উঠেছে একটি সহিষ্ণু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা।

বর্তমান সরকারের আমলে উন্নয়নমূলক অনেক কাজ ত্বরান্বিত হয়েছে। আগামী দিনগুলোতে জাতিকে উপহার দেওয়া হবে নতুন ভিশন- নতুন প্রেক্ষিত পরিকল্পনা রূপকল্প-২১০০। আর ২০৪১ সালের বাংলাদেশ হবে মধ্যম আয়ের পর্যায় পেরিয়ে এক শান্তিপূর্ণ, সমৃদ্ধ, সুখী এবং উন্নত জনপদ। সুশাসন, জনগণের সক্ষমতা ও ক্ষমতায়ন হবে এই অগ্রযাত্রার মূলমন্ত্র।

৬. মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা নিজেদের জন্য একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রকাঠামো পেয়েছি। যে রাষ্ট্রের ভিত্তি গণতন্ত্র, সামাজিক সাম্য এবং মৌলিক অধিকার চর্চা। আজ আমরা স্বাধীন জাতি হিসেবে উচ্চ মর্যাদায় অভিষিক্ত। যে রাজনৈতিক সংগ্রাম আর ত্যাগের মধ্য দিয়ে এই রাষ্ট্রের জন্ম সেই ইতিহাসকে যথাযথ উপলব্ধি করাই হলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। এই চেতনার মধ্যে গণতান্ত্রিক দাবি আদায়ের আদর্শ রয়েছে, মুক্তির স্বপ্ন আছে আর আছে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ না করার মূল্যবোধ। অন্যদিকে বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা, সাম্য ও মানবাধিকার আমাদের বর্তমান বাংলাদেশের অগ্রগতির অন্যতম অনুপ্রেরণা যা আবার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অন্যতম অনুষঙ্গ।

(লেখক : ড. মিল্টন বিশ্বাস, অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, বাংলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং বঙ্গবন্ধু গবেষক,  বিশিষ্ট লেখক, কবি, কলামিস্ট, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রগতিশীল কলামিস্ট ফোরাম, নির্বাহী কমিটির সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ email-drmiltonbiswas1971@gmail.com)



মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

কবিতা

প্রকাশ: ০২:০০ পিএম, ০১ ডিসেম্বর, ২০২২


Thumbnail

গত সপ্তাহে বাসার বিদ্যুৎবিল পরিশোধ বিষয়ক না দাবী সনদপত্র খুঁজতে গিয়ে হঠাৎ পেয়ে যাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের এক স্মৃতি-স্মারক। আমার দু'চোখের পাতা কেঁপে  ওঠলো। যেন পলকে চার দশক পেছনে ফিরে  গেলাম। ধুলোয় মলিন নথিপত্রের সঙ্গে লেপ্টে থাকা একখানা অসাধারণ কাব্যগ্রন্হ। ধূসর বিবর্ণ সে বইয়ের গা থেকে ময়লা সরিয়ে হাতে নিয়ে দেখি কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ' বই 'আমার সময়'

আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে বইটা আমার

হাতে এসেছিল। ছেঁড়া মলাট উল্টিয়ে আরও একবার চমকে যাই।

ভেতরে নিজ হাতে লেখা --

এম.. মান্নান

৬৪৫, মহসীন হল,

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

তাং ০৭- ১০- ৮৭ইং।

 

ভাবছিলাম, আমি কি এক সময়ে নামটা এভাবে লিখতাম? আমার হাতের লেখাটা এমন ছিল?

এখন কি এভাবে লিখতে পারব? মনে হয় কত যুগ-যুগান্তর ধরে স্বহস্তে কিছু লিখি না। কলমের পরিবর্তে আমরা সবাই এখন কিবোর্ডে আঙুল ছুঁয়ে থাকি। সারাক্ষণ চোখে চোখে লেগে আছি এক অবাক স্পর্শের সাথে।

 

) এটা এক দীর্ঘ কবিতার বই। মোট ছয়টি কবিতা নিয়ে তেতাল্লিশ পৃষ্ঠার কাব্য প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ফেব্রুয়ারি ১৯৮৭ সালে।

বোঝা যায়, তখনকার বই মেলার আয়োজনকে

সামনে রেখেই বোধকরি বাজারে আসে। অনিন্দ্য প্রকাশন, নবাবপুর রোড, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। প্রচ্ছদ মুদ্রন সে সময়ের তুলনায় চমৎকার দৃষ্টিনন্দন। কবিতাগুলোর শিরোনামও ছিল বেশ চিত্তাকর্ষক এবং চমকপ্রদ 

 

'আমার সকল কথা'

'আমার সময়'

'পরিচিত পথঘাট'

'আমি এখন যাবার জন্যে তৈরী'

'এখন ভয় করে না'

'আমার গোপন ব্যথা'

বইটি কবি তাঁর মা'কে উৎসর্গ করেছেন।

লিখেছেন, "আমার মা কাকাতুয়া"কে --

 

) প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর পরে পুনর্পাঠ করতে গিয়ে মনে পড়ছিল, ছাত্র জীবনে কবিতাগুলো যেন বাঁধ-ভাঙা আবেগের প্রগলভতা নিয়ে পড়েছিলাম। সে বয়সে রবীন্দ্র, নজরুলের বাইরে নাজিম হিকমত, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শামসুর রাহমান, আবুল হাসান, রফিক আজাদ, রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, মোহন রায়হান এঁরা ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক ফ্যাশনে পরিণত হয়েছিল। বাঁশী বা কেউ কথা রাখেনি, কবির মৃত্যু, বা জেলখানার চিঠি ইত্যাদি কবিতা থেকে দু'চার ছত্র মুখস্থ থাকা চা'ই। তখনকার দিনে কবিতা আওড়ানোর মধ্যেও একপ্রকার আভিজাত্য ছিল। আজকাল ক্যাম্পাসে কি হয় খুব জানতে ইচ্ছে করে। তবু বলা যায়, মুখস্হ যুগের অবসান হয়েছে। তবে কবিকে না পড়লে বলা যাবেনা, কী বিস্ময়কর খেদ মনোবেদনা নিয়ে পৃথিবীর অশ্রুত গান তিনি গেয়ে গেছেন। কেমন নিপুণ কারিগরের হাত দিয়ে নিজের শৈশব, কৈশোর, যৌবন বা বার্ধক্যের জলছবি তিনি এঁকেছেন। প্রকৃতির রূপ-রূপান্তর, বৃক্ষ লতাপাতা, নদী-নালা, দিগন্ত উন্মোচিত নিসর্গের সংগীত ভেসে আসছে তাঁর নির্বাচিত বর্ণমালায়। ইংরেজি সাহিত্যের মেধাবী ছাত্র এবং তৎকালীন পাকিস্তান এলিট সার্ভিসের সদস্য হয়েও মাতৃভাষা বাংলার প্রতি তাঁর অপরিমেয় ভালবাসার এক আশ্চর্য চিত্র ফুটে ওঠেছে কবিতার প্রতিটি শব্দের গভীরে, অনুপ্রাসের গহীনে বা অন্ত্যমিলের বৃত্তাংশে। কবিরা নাকি কল্পলোকের বাসিন্দা হয় কিন্তু এই কবির দৃষ্টিতে যেন আষ্টেপৃষ্টে ধরা পড়েছিল আবহমান বাংলা, মা, মৃত্তিকা মানুষের ক্ষুদ্র জীবনকালের বিমূর্ত রূপের নিগূঢ় ভাষাচিত্র। বিশেষ করে তাঁর 'আমার সময়' কবিতাটি তখনও আমি বারবার পাঠ করেছি এবং মুগ্ধতা ভরে কল্পনা করেছি। দেখেছি চোখের আলোয় উদ্ভাসিত গাঢ় শ্যামল এক মনোজ্ঞ ক্যানভাস।

 

তিনি লিখেছেন--

আমার মা' চুল

লম্বা এবং কাল ছিল

কবর কি চুলের মত কালো?

বা --

এবং ইদানীং

আমি আমার বন্ধুদের

অনায়াসে এড়িয়ে চলি।

 

আমি কখনো

মেষ পালক ছিলাম না

অথচ গোধূলি এবং সন্ধ্যার

অন্তর্বতী বিষাদ

রাখালের বাঁশির মত

আমার সঙ্গে বাস করে।

অথবা --

আমার সময়ে যুবকেরা

হয় আত্মগোপন করতো

অথবা ধরা পড়তো

অথবা মরে যেতো।

আরও --

বৃক্ষ যেমন পাখির জন্য

ছায়া ধরে রাখে

নদী যেমন মাছের জন্য

কোল পেতে থাকে

কালো মেঘ যেমন ফুলের জন্য

বর্ষিত হয়

ফুল যেমন মৌমাছির জন্য

মধুময় হয়

আমি কিছু দিতে পারি না।

 

আমি কবিতার কিছু বুঝি না। লিখতে সাহসও করি না। যদিও কখনও কখনও কবিতা আমাকে মোহাচ্ছন্ন করে রাখে। তবে মনে হয়, কবিতা কেবল শোনার বিষয়, ভাব ভঙ্গির বিষয়। ছন্দের টানেই রচিত হয় কবিতা, কবিতায় ব্যবহৃত শব্দের সমন্বিত মিছিলের প্রতিধ্বনি পাঠকের কর্ণ থেকে হৃদয়ে দোলা দিতে পারে। কবিতা পড়ে এর যথাযথ অর্থ খোঁজা পাঠকের কাজ নয়। কবিতার জন্য প্রয়োজন একটি সংবেদনশীল কান এবং মন , যা আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ' শব্দে উপমায় প্রস্ফুটিত হয়ে চারদিকে   ধ্বনিত হয়েছে।

 

) বইটির এক প্রান্তের ফ্ল্যাপে লেখা মন্তব্যও পাঠযোগ্য-

'আবহমান বাংলা বাঙালীর ইতিহাসের রক্তাক্ত পথ ধরে দেশ কাল সময়ের পটভূমিতে স্বদেশের প্রতি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ' প্রগাঢ় কন্ঠের দূরাগত ঝর্ণাধ্বনির মত মন্ত্রোচ্চারণ 'আমার সময়'কে বাংলাদেশের জাতীয় মহাকাব্য বললে অত্যুক্তি করা হয় না।

সেই সঙ্গে খালিদ আহসানের সাবলীল রঙ রেখার টানে রচিত হয়েছে এক আশ্চর্য ধাতব সঙ্গীত নির্ঝর'

 

) সত্তুরের দশকের শেষ দিকেই কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ্ ' মৌলিক কবিতাগুলো জনপ্রিয়তার বিচারে উচ্চ মাত্রায় পৌঁছেছিল।

বিশেষ করে তাঁর 'আমি কিংবদন্তির কথা বলছি' এবং 'বৃষ্টি সাহসী পুরুষের জন্য প্রার্থনা' নতুন প্রজন্মকে দারুণ ভাবে আকৃষ্ট করেছিল। আবৃত্তি শিল্পী বা বাচিকগন তাঁর কবিতাকে স্বকন্ঠে লালন করে নিজেরাও আলোচিত হয়েছেন। বলা যায়, আমি কিংবদন্তির কথা বলছি, আমি আমার পূর্ব পুরুষের কথা বলছি এই কবিতাটি স্বাধীনতােত্তর কালের সর্বাধিক জনপ্রিয় কবিতার অন্যতম প্রধান একটি।

এই কবিই বলেছেন,

 

"আমি কিংবদন্তির কথা বলছি

আমি আমার পূর্ব পুরুষের কথা বলছি,

বা

জিহবায় উচ্চারিত প্রতিটি সত্য শব্দ কবিতা।

যে কবিতা শুনতে জানেনা সে আজন্ম

কৃতদাস থেকে যাবে"

 

জয়তু কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ তাঁর

কাব্যগ্রন্হ 'আমার সময়'



মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

প্রাণিসম্পদের উন্নয়নে, প্রাণিবীমার সম্প্রসারণ ও প্রযুক্তির ব্যবহার: আমাদের করনীয়

প্রকাশ: ১১:০০ এএম, ০১ ডিসেম্বর, ২০২২


Thumbnail

বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে প্রাণিসম্পদ একটি ঝুঁকিপূর্ণ খাত। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বা জলবায়ু প্রভাবজনিত কারণে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দূর্যোগ কিংবা নিত্যনতুন অনিয়ন্ত্রিত রোগ-ব্যাধি সংক্রমণ গুরুত্বপূর্ণ এই খাতটিকে বাণিজ্যিকীকরণে বাঁধাগ্রস্থ করছে। অথচ এর সঙ্গে সরাসরি জড়িত রয়েছে ১ কোটি ৪ লক্ষ পরিবার। শুধু তাই নয়, নিরাপদ প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র বিমোচন, মেধাবী জাতিগঠন ও গ্রামীন অর্থনীতিতে রয়েছে প্রাণিসম্পদের বিশাল অবদান।

বীমা এমন একটা ফিনেন্সিয়াল ইন্সট্রুমেন্ট যা দিয়ে সোসাইটির রিস্কটাকে বহন করা যায়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিশেষত উন্নত দেশগুলোতে বীমাখাত অত্যন্ত সম্প্রসারিত। বীমার অবদান জিডিপির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু আমাদের বীমার অবদান ১% এরও কম। তবে বাংলাদেশেও বীমার সম্প্রসারণ এবং এতে অবদান বৃদ্ধির অনেক সম্ভাবনা ও সুযোগ রয়েছে। এক্ষেত্রে বীমা কোম্পানি এবং বীমা গ্রহীতা দু-পক্ষেরই স্বার্থ রক্ষা করে নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। তবেই এটি স্থায়ীত্বশীল এবং গ্রহণযোগ্য হবে।

প্রা্ণিসম্পদ উন্নয়নে প্রাণিবীমা জরুরি। কারন প্রানিসম্পদ উন্নয়নে গবাদিপ্রানী পালন বাড়াতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান (ব্যাংক/এমএফআই) থেকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা জরুরি। প্রাণিসম্পদ উন্নয়নে আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ খামারীকে ঋণ দিবে। তবে সেই ঋণ ইন্সুরেন্স বেইজড হতে হবে। অর্থ্যাৎ ব্যাংক যখনই কাউকে ঋণ দিবে, ঋণের টাকা ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তার জন্য অবশ্যই প্রাণির বীমা করতে হবে। এক্ষেত্রে বীমা করাটা কিছুটা বাধ্যতামূলক হওয়া জরুরি।

প্রানিবীমা সম্প্রসারণের জন্য প্রাণিসম্পদ বিভাগ, বীমা প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, আর্থিক প্রতিষ্ঠান (ব্যাংক/এমএফআই), এনজিও সহ সকল স্টেকহোল্ডারদের সমন্বয়ে একটি গ্রহণযোগ্য প্রাণিবীমা নীতিমালা/ কৌশলপত্র প্রনয়ণ করা প্রয়োজন। যেখানে প্রাণিসম্পদ বিভাগ প্রান্তিক খামারিদের সুরক্ষা দেয়ার পাশাপাশি ইনফ্রাস্ট্রাকচারাল ফ্যাসিলিটি সমন্বিত আধুনিক প্রাণিসম্পদ ডাটা ব্যাংক ব্যবস্থাপনা করবে যার মধ্যে ফার্ম রেজিষ্ট্রেশন, সার্ভিলেন্স সিস্টেম, কম্পিউটর নেটওয়ার্ক ডাটাবেইজ, ডিজিস প্রেডিকশন সিস্টেম, আরলি ওয়ারনিং সিস্টেম, একক বা সামষ্টিক মৃত্যুহার, ডিজিস ম্যাপিং, এনিমেল মর্টালিটি ম্যাপিং থাকবে। এই ডাটাবেইজ থেকে বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো রিস্ক এসেসমেন্ট করে তাদের প্রিমিয়াম ক্যালকুলেশন করবে।

প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো গবাদিপ্রাণী সনাক্তকরণ থেকে শুরু করে তাদের ট্রেসিং আউট করা, বীমা পদ্ধতি ডিজিটালাইজেশন ও খামারি বান্ধব করা, টেকনোলজির মাধ্যমে প্রোডাক্ট সেল বাড়ানো, প্রোডাক্টের অপারেশন কষ্ট কমানো, খামারিদের ভ্যালু এডেড সার্ভিস প্রদান করা প্রভৃতি কাজ করবে। বীমা কোম্পানীর নিকট অনেক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তাদের সার্ভে রিপোর্ট এবং বিভিন্ন রিপোর্ট পেতে সময় লাগে, যার কারণে আস্থার একটি সংকট দেখা যায়। এক্ষেত্রেও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান সেবা সহজীকরণ ও দ্রুততা নিশ্চিতকরণে মাধ্যমে আস্থা অর্জনে সহায়তা করতে পারে।

এনজিও গুলো মানুষের কাছে বীমা সুবিধার প্রচারনা করাতে সাহায্য করবে যাতে তাদের প্রাণিসম্পদ মৃত্যু ঋণ সুরক্ষা পায়। আর প্রিমিয়াম ইস্যুতে কৃষককে সহায়তায় রাষ্ট্র বা সরকার ১%, স্থানীয় সরকার ১% ও কৃষক ১% দেওয়ার বিধান করা যেতে পারে। এইভাবে আমরা প্রাণিবীমার পুরো সিস্টেমটাকে জনপ্রিয় করতে পারি। মাইক্রো ইন্সুরেন্স এর বিষয়ে বীমা আইন ও মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি আইনের কিছু জটিলতা রয়েছে যা নিরসন করা আশু প্রয়োজন।

অন্যদিকে প্রাণী যদি মারা না যায়, সে ক্ষেত্রে কৃষকের জন্য কিছু একটা বেনিফিট প্রদান, বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে রিস্ক কাভারেজ বীমা চালু করা, সরকারের দিক থেকেও বীমা খাতে সাবসিডির বিধান রাখা, প্রিমিয়াম হ্রাস করার মাধ্যমে বীমা কার্যক্রমটিকে আরও বেশী সম্প্রসারিত করা, রিলিফ নির্ভরতা কাটিয়ে উঠতে দুর্যোগকে বীমায় কনভার্ট করা প্রভৃতি বিষয়ে নীতি নির্ধারনী পর্যায়ের সহযোগিতা প্রয়োজন। এর জন্য একটা ওয়ার্কিং কমিটি গঠন করে স্বল্প সময়ের মধ্যে নীতিমালা প্রণয়নের একটা পরিকল্পনা হাতে নেয়া জরুরি। প্রাণিসম্পদ খাতে বীমার সুবিধা দিলে জনগণ অধিক উৎপাদনশীল গাভী পালনে উৎসাহিত হবে, বিনিয়োগ সুরক্ষিত হবে, নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে, প্রান্তিক পর্যায়ে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধি পাবে এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব মোকাবেলায় আমাদের সক্ষমতা বাড়বে।



মন্তব্য করুন


বিজ্ঞাপন