ইনসাইড থট

গবেষণা চুরি, পাঠ্য বইতে চুরি, পাঠদানে চুরি– আমাদের ভবিষ্যৎ কি?


Thumbnail

সপ্তম শ্রেণীর বিজ্ঞান পাঠ্যপুস্তকে লেখা চুরির অভিযোগ এসেছে - এবং সেই চুরি ও দায়িত্ব পালনের ব্যর্থতা লেখকদের পক্ষে বিজ্ঞানী, যিনি ছিলেন সম্পাদক ও লেখক উভয় দায়িত্বে, অধ্যাপক জাফর ইকবাল এবং অধ্যাপক হাসিনা খান দায় স্বীকার করেছেন। বিষয়টি নাদিম মাহমুদ নামে একজন গবেষক “প্রথম আলো” পত্রিকাতে উপস্থাপন করেছেন - এবং সেটা ৭১ টিভিতে আলোচিত হয়েছে। আমরা জেনেছি কোনো একজন লেখক এই দুর্জনের কাজটি করেছেন। শুধু তাই নয় নিজে অনুবাদ না করে গুগল ট্রান্সলেশন ব্যবহার করে অনুবাদ করেছেন। এবং সেটা তিনি স্বীকার করেননি। যদিও সমালোচকেরা মনে করছেন অধ্যাপক জাফর ইকবাল বিষয়টিকে হালকা করে দেখাচ্ছেন। কেবল অধ্যাপক জাফর ইকবাল নন সমাজে অনেকেই আছেন অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে হালকা করে দেখেন। এবং এই হালকা করে দেখার প্রবণতা আমাদের অনেকেরই মাঝে সংক্রমিত হচ্ছে। একটি গবেষণা চুরির বিষয়কে এভাবে হালকা করে দেখার পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে বলেন- আমরা সবাই কম বেশি ভুল করে থাকি। এভাবে যদি উত্তর দেয়া হয়, তবে হতাশা ছাড়া আশার কিছু থাকে কি? তবুও কিছু মানুষ চেষ্টা করে যান।  

আমি জনাব নাদিম মাহমুদ এবং অধ্যাপক জাফর ইকবাল এবং অধ্যাপক হাসিনা খানকে ধন্যবাদ দিতে চাই। জনাব নাদিম মাহমুদ অনুসন্ধান করে জাতীয় পর্যায়ে সুনাগরিকের দায়িত্ব পালন করেছেন -যখন সুশাসন একটি প্রত্যয় মাত্র এবং লজ্জায় সে মরে যাচ্ছে আমাদের কর্মকান্ড দেখে! আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষক জাতিকে যা উপহার দিচ্ছি তা এক নিলজ্জতার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। সেই সত্য আমাদের বিবেককে যেন নাড়া দেয় - আমরা যেন বলতে পারি গবেষণা চুরি সত্য -মিথ্যা কিংবা ষড়যন্ত্র নয়।  

সরকার শুদ্ধাচার নীতি গ্রহণ করেছে। সেখানে যারা পাঠদান করেন সেটাও প্রশ্ন করা যায় - চিকিৎসক -বিজ্ঞানীরা হয়ে গেছেন নীতিবিদ সক্রেটিস, দোকানদার হয়ে গেছেন ডাক্তার, চিকিৎসা ছেড়ে ডাক্তার হয়েছেন আইনজীবী কিংবা সাংসদ। ঠিক এমন সময়ে - অধ্যাপক জাফর ইকবাল সত্য লুকাতে চাননি। অর্থাৎ সত্য যে এখনো বেঁচে আছে সেটা তিনি প্রমাণ করেছেন।  সমাজের দাবি তেমনিভাবে শিক্ষক -উপাচার্যরা যেন প্রমাণ করেন উনারা দুর্নীতিকে ফাঁসি দিতে মায়ার জালে আটকে নেই।  গবেষণা চুরির একটি মারাত্মক অপরাধ। সেই চুরির অনেক অভিযোগ মহামান্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, এবং উপাচার্যদের কাছে দিনের পর দিন পড়ে আছে বা থাকে।  

শিক্ষকদের চুরির মাথায় পচনের মতো একটি বিষয়। সেই পচন রোধ না করলে আমরা যতই উন্নয়ন করি না কেন সেটা টেকসই হবে না। সেটি ওই মঞ্চের মতো হুড়মুড় করে ভেঙে পড়বে। নৈতিকতা হলো সমাজের সিমেন্ট - আর শিক্ষা হলো ওই ভবনের রড বা মেরুদন্ড। এই মেরুদন্ড যদি শক্ত না হয় কিংবা সিমেন্ট যদি ভেজালের হয় বা কমতি থাকে তবে জাতি হাজার বছর পিছিয়ে পড়বে। স্মার্ট বাংলাদেশ অধরা থেকে যাবে।   

এখানে একটি ঘটনার কথা বলি। গবেষণা চুরির একটি অভিযোগ প্রায় এক বছর আগে একটি জার্নাল এর সম্পাদকের কাছে করা হয়। জার্নালের সম্পাদক অভিযোগকারীকে বলেন পত্রিকায় দিতে- তাহলে বিচার করা সহজ হবে। অপরদিকে, অভিযোগকারীকে আরেকটি মহল অনুরোধ করে এটা গুরুত্ব না দিতে। আরেকটি মহল নরম-কোমল একটি হুমকি দিয়ে রাখেন। অভিযোগকারী বিগত ৭ মাস দ্বারে দ্বারে ঘুরছে! অভিযোগকারী অন্তত ২৫ জন সাংবাদিককে এই তথ্য দিয়েছে।  গোয়েন্দা সংস্থার লোক, সরকারি দপ্তর অভিযোগ সম্পর্কে জানেন-আমলে নিয়েছেন কেউ কি যদি জানতে চান উত্তরটা বেদনা দায়ক। একটি মাত্র পত্রিকা এই সংবাদটি ছেপেছে।  অনেক স্বনামধন্য সম্পাদককে লেখা হয়েছে, টেলিফোন বলা হয়েছে ।  তাদের কেউই অভিযোগ আমলে নেয় নি। সাংবাদিক নির্ভিকতার প্ৰতীক। সত্যের সন্ধানী, সত্য প্রকাশ অবিচল। কিন্তু সত্য এখন বোতল বন্দি। মিথ্যা এখন বুক ফুলিয়ে চলে।  

গবেষণা চুরির বিষয়টি নিয়ে একটি পোস্ট দেখে ওই সংবাদটি কমেন্ট কলামে শেয়ার করেছি। কিন্তু কিছুক্ষণের মাঝে ওই পোস্টটি উধাও হয়ে গেছে! দৈনিক মানবজমিনের শিরোনাম ‘গবেষণায় অন্যদের ৯৮ শতাংশ চুরি, আমার ৭২ শতাংশ চুরিতে প্রশ্ন কেন? সূত্রঃ দৈনিক মানবজমিন, ৩ জানুয়ারি ২০২৩, মঙ্গলবার’ - এভাবে যদি কেউ বলেন তবে কি বলার আছে? তিনি এই মন্তব্য করে থাকেন,  তিনি যদি ভুল পথে চলার বিষয়কে এভাবে স্বীকার করে থাকেন, তবে তাকেও কি আমরা ধন্যবাদ দেব?   সত্যের পথে ফিরে আসার জন্য আরেকটু পথ বাকি আছে। যে বেতন সুবিধা নেয়া হচ্ছে সেটাও সংশোধনের প্রয়োজন আছে বৈকি!

অধ্যাপক জাফর ইকবালকে তাই আমার আবারও ধন্যবাদ।  মাত্র দুটি প্যারাগ্রাফ চুরি করা হয়েছে বলে যদিও গুরুত্ব কমাতে চেয়েছেন তবুও অকপটে স্বীকার করেছেন যে ঘটনাটি সত্য। তিনি তো বলতে পারতেন ওনাদেরকে না জানিয়ে কেউ ঢুকিয়ে দিয়েছে! কিংবা এটা অমুক বা তমুক গ্ৰুপের কারসাজি! মানবজমিনের রিপোর্ট পত্রিকায় এসেছে - সেটার কোনো প্রতিবাদ আমরা পাই নি। যেসব শিক্ষকের নাম এসেছে তারা কি জানেন না? এই যদি হয় বাস্তবতা - তাহলে উপাচার্যরা কেন আছেন? কেন প্রশাসন আছে? কেন supervisor বা reviewer আছেন? বিশ্ববিদ্যালয় একজন তত্ত্বাবধায়ক নিয়োগ দেন কি চুরি বা অনুবাদকে উচ্চতর ডিগ্রী দেয়ার জন্য? যদি আমার চুরিবিদ্যাকে এভাবে বিভিন্ন মহল থেকে আমলে আনার পরিবর্তে সুরক্ষা দেই, চেপে যাই, মানবিকতাকে আনি তবে জাতির ভবিষ্যৎ কি হতে পারে। এভাবে যদি আমরা শর্ট -কাট পদ্ধতিতে উন্নত জাতিতে উন্নীত হতে চাই সেটা কি সম্ভব ?

অভিযোগকারী  থিসিসের পরীক্ষকদেরকে কাছে জানতে চেয়েছেন- অধ্যাপক জাফর ইকবাল দায় স্বীকার করেছেন- আপনারা কি করবেন? চেয়েছেন  উত্তর পাননি ! শিক্ষক হলেন শিক্ষার্থী ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আদর্শ পুরুষ বা নারী।  তিনি সত্যের সন্ধানী ও অনুসারী।  তিনি কি তবে শক্তিহীন যে সত্যকে আলিঙ্গন করবার শক্তি ও সাহস নেই ? 

আরেকটি পুরনো ঘটনা বলে শেষ করতে চাই। ২০১০ সালে আমার বিভাগের সহকর্মীদের দক্ষতায় একটি গবেষণা কর্মের চুরি সম্পর্কে জানতে পারি। তারা আমার কাছে একটি আবেদন করে। আমি বিভাগের সভাপতি হিসেবে আবেদনটি তত্ত্বাবধায়কের কাছে অগ্রায়ণ করি মৌখিক পরীক্ষার আগের দিন। পরের দিন ভাইভাতে এসে একজন পরীক্ষক আমাকে বুকে টেনে দিয়ে বলেন - তুমি আমাকে জীবনের শেষ বেলায় একটি অসন্মমানের হাত থেকে বাঁচিয়েছো। অভিযোগকারী ভেবে ছিল ঠিক সেইভাবে এবারও কেউই বুকে টেনে নিয়ে বলবে – “সাবাশ! তুমি আমার মান রক্ষা করেছো। “ কিন্তু তিনি অধ্যাপক জাফর ইকবাল হতে পারেননি।  

আমরা আরও অধ্যাপক জাফর ইকবালের অপেক্ষায় আছি! আমরা ওই উপাচার্য মহোদয়দের দিয়ে তাকিয়ে - যারা  বিচারহীনতা, ইনডেমনিটির বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন - আমাদের  আশা উপাচার্যরা  বিচারহীনতার সংস্কৃতি আর চালু করবেন না।  

অধ্যাপক হুমায়ন আজাদ আশির দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষকের গ্রন্থের উপর একটি লেখা লিখে ছিলেন। আমাদের এক শিক্ষক তিনি সন্তানকে মাদকের হাত থেকে বাঁচাতে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। আমরা সেই রকম নৈতিকতার অপেক্ষায় আছি। একদিন আমাদের বিবেক জাগবে!  

লেখার পরিসমাপ্তি ঘটাতে চাই - গবেষণা চুরি সম্পর্কিত একটি বিভ্রান্তিকে দূরীভূত করবার চেষ্টা থেকে। গবেষণা চুরি সম্পর্কে আমাদের একটি ভুল ধারণা আছে। আমরা কেউ কেউ বলি ২০% বা ৩০% গ্রহণযোগ্য। কিন্তু এটা একটি ভুল ধারণা। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে আছে "Plagiarism (চন্দ্ররেণু বিদ্যা- অমর্ত্য সেনের স্ত্রী নবনিতা সেন এই অনুবাদক জানালেন ইতিহাসের অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন, চ্যানেল ২৪, ইউটিউবে আছে /২০/১/২০২৩ দেখা) is presenting someone else’s work or ideas as your own, with or without their consent, by incorporating it into your work without full acknowledgement. All published and unpublished material, whether in manuscript, printed or electronic form, is covered under this definition. Plagiarism may be intentional or reckless, or unintentional. Under the regulations for examinations, intentional or reckless plagiarism is a disciplinary offence (https://www.ox.ac.uk/students/academic/guidance/skills/plagiarism). "যথাযথভাবে স্বীকার না করলে কিংবা যথাযথভাবে রেফারেন্স না দিলে চুরি হিসেবে গণ্য হবে। একটি আইডিয়া একটি শব্দ দিয়ে প্রকাশ করা যেতে পারে। যেমন গণতন্ত্র একটি "প্রক্রিয়া" গবেষককে এখানে বলতে হবে এটি কোন রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর আবিষ্কার। তেমনি "নিজেকে জানো" বক্তব্যটি সক্রেটিসের। সেটাকে গবেষণায় ব্যবহার করতে হলে যথাযথ স্বীকৃতি দিয়ে বলতে হবে। 

গবেষণা বা পাঠ্য পুস্তক রচনা কঠিন একটি কাজ যেখানে সতর্কতা খুবই জরুরি। গবেষণা সৃষ্টিকে বলা হয় অভিসন্দৰ্ভ। এর মানে হলো - অতীব সুন্দর একটি রচনা। এখানে থাকে সদুর প্রসারী পরিকল্পনা ও নকশা। পিএইচডি তাই অতি মূলবান। আমরা অভিযোগ শুনি পিএইচডি এখন কিছু শিক্ষক মুড়ি মুড়কির মতো বিলোচ্ছেন। অধ্যাপক পদ হয়ে গেছে হাতের মোয়া। যেন তেন কাজ দিয়ে সেটাকে পাওয়া যাচ্ছে। সুড়ঙ্গ পথে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়ে পদোন্নতি নিচ্ছি। এই অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণের দায়িত্ব আমাদের। দিনে পর দিন ক্লাস হয়না শুনতে আর ভালো লাগে না। পাঠ দানে চুরি, গবেষণা চুরি, পাঠ্য পুস্তকে চুরির দায় প্রতিষ্ঠানের কর্তারা কি দায় এড়াতে পারেন?

গবেষণা চুরি করে পদোন্নতি নেয়া রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে অর্থ চুরি এবং তার বিচার না করা চুরিকে বৈধতা দেয়া। রাষ্ট্রীয় কোষাগারে আছে ভিক্ষুক, গরীব চাষী, ভূমি হীন, গৃহহীন, অসহায় বিধবা, পাথর ভাঙা শিশুর কষ্ট, খেটে  খাওয়া মজুরের পানি করা রক্ত -ঘাম। আমরা  যেন রক্ত চোষা নিম্নতর প্রাণী না হই! শিক্ষকদের জাগরণের প্রত্যাশায় জাতি অপেক্ষায়।



মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

নব পরিচয়ে বাংলার রঘু ডাকাতরা

প্রকাশ: ০৩:১১ পিএম, ১৪ জুলাই, ২০২৪


Thumbnail

ডাকাতি বাংলা মুল্লুকে এক সময় একটি বড় পেশা ছিল। এনিয়ে লেখক খগেন্দ্রনাথ মিত্র গত শতকের ত্রিশের দশকে ‘বাংলার ডাকাত’ নামের একটি গ্রস্থ রচনা করে বেশ সুনাম কুড়িয়েছিলেন। ডাকাত ছাড়াও এই দেশে এক সময় সিঁদেল চোর, বাটপার, জোচ্চোর, চশমখোর শব্দগুলো বাংলা লৌকিক সাহিত্যে বেশ পরিচিত ছিল। খগেন মিত্রের ডাকাতরা কাঠের উঁচু পা যাকে বলা হতো রণপা লাগিয়ে কয়েক ক্রোশ দূরে গিয়ে ডাকাতি করে নিজ গ্রামে দ্রুত ফিরে আসতো। কোন কোন ডাকাত ডাকাতি করতে বের হওয়ার আগে মন্দিরে কালি পূজা দিতো যাতে সে তার কর্মকাণ্ডের সময় কোন প্রকারের বিপদের সম্মুখীন না হয়। সিঁদেল চোরেরা বাড়ির দাওয়ায় সুড়ঙ্গ (সিঁদ) কেটে ঢুকতো। বাড়ির কর্তা যদি আগে হতে টের পেতো তার ঘরে সিঁদেল চোর ঢুকছে তাহলে সে বাড়িতে রাখা একটি রামদা নিয়ে চোরের জন্য অপেক্ষা করতো। যেই চোর মাথা ঢুকালো এক কোপে মাথা ধর থেকে আলাদা। তখনকার দিনে চোরও কম চালাক ছিল না। তারা মাথা ঢুকানোর আগে একটি কালো পাতিল ঢুকিয়ে দিত। কোন কোন চোর বা ডাকাত সারা গায়ে তেল মেখে উলঙ্গ হয়ে বাড়িতে ঢুকতো যাতে কেউ ঝাপটে ধরলে সে সহজে ছাড়া পেয়ে যেতে পারে। বাংলা সাহিত্যে রঘু ডাকাত নামের এক ডাকাতের বেশ নামডাক ছিল। তাকে নিয়ে গবেষণা পর্যন্ত হয়েছে। গবেষকরা মনে করেন তার জন্ম অষ্টাদশ শতকে। রঘু ডাকাত একটি নৈতিক অবস্থান থেকে ডাকাতি করতো। সে জমিদারদের সোনা দানা লুট করে গরীব মানুষের মাঝে বিলিয়ে দিতো। যে দিন সে ডাকাতি করতে বের হতো তার আগে সে জমিদারকে খবর দিয়ে রাখতো। ইংরেজি সাহিত্যের রবিনহুডের কথা সকলে জানি। সে সাহেব ডাকাত ছিল। ধনীদের টাকা নিয়ে গরিবদের মাঝে বিলিয়ে দিতো। তাও প্রায় তিনশত বছর আগের কথা। আর আছে আরব্য রজনীর ‘আলিবাবা চল্লিশ চোরে’র কথা। ডাকাত আলিবাবা গরীবদের ধন সম্পদ লুট করতো না। সে ধনীর সম্পদ লুট করে গরীবদের মাঝে বিলিয়ে দিয়ে ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে। 

বাংলাদেশে এখন উল্লেখিত ডাকাতদের প্রাদুর্ভাব চলছে। তবে তাদের সাথে তাদের পূর্বসূরিদের তফাৎ হচ্ছে বাংলার নূতন ডাকাতরা জনগণ তথা রাষ্ট্রের ধনসম্পদ টাকা পয়সা ডাকাতি করে নিজেরা জমিদার বনে যায়, কারো কারো অবস্থাতো একটি ছোটখাট রাজ্যের সুলতানের মতো। স্বাধীন বাংলাদেশে নূতন অবয়বে এই ডাকাতদের যাত্রা শুরু হয়েছিল সিঁদেল চোরের মতো কারণ তখন ডাকাতি করার মতো মানুষের কাছে তেমন অর্থকরী বা সোনাদানা ছিল না। দেশ স্বাধীন হওয়ার পূর্ব মুহূর্তে তদানীন্তন পশ্চিম পাকিস্তানের শিল্পপতি আর ব্যবসায়ীরা তাদের অনেক কলকারখানা আর ছোট খাটো ব্যবসা এই দেশে ফেলে চলে গিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু সরকার আইন করে সেই সব প্রতিষ্ঠানকে সরকারের আয়ত্বে নিয়ে এসে সেখানে তত্ত্বাবধায়ক বসিয়েছিলেন। তত্বাবধায়করা  বেশীর ভাগই ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। বঙ্গবন্ধুর একটি বড় গুণ ছিল তিনি যখন দেখতেন তার কোন বিশ্বস্ত মানুষ তার দায়িত্বে অবহেলা করছেন বা অনিয়ম করছেন তাৎক্ষণিক ভাবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দ্বিধাবোধ করতেন না। নানা অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, রিলিফ চুরি ইত্যাদি অপরাধে তিনি ২৩ জন সংসদ সদস্যকে বহিষ্কার করে এক অনন্য নজির সৃষ্টি করেছিলেন। এদের মধ্যে দু’এক মন্ত্রীও ছিলেন । 

স্বাধীন বাংলাদেশের শুরুতে রিলিফের কম্বল, গম, চিনি বা তেল চুরি হতো। কালোবাজারি হতো। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস পত্র গুদামজাত করে বাজার কারসাজি করার চেষ্টা চলতো। ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বর মাসে এই সব চোরদের শায়েস্তা করার জন্য বঙ্গবন্ধু দেশ জরুরী আইন জারি করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে নির্দেশ দেন সকল চোর বাটপারদের গ্রেফতার করার জন্য। কে কোন পার্টি করে তা বিবেচ্য বিষয় ছিল না। স্বাধীনতার পর অনেকে নানা অজুহাতে অন্যের জায়গা জমি সম্পদ দখল করেছিল। বঙ্গবন্ধু যতটুকু সম্ভব তাদের জায়গা জমি উদ্ধার করে তাদের কাছে ফিরিয়ে দেন। পঁচাত্তর পরবর্তী কালে বদলে যাওয়া শুরু করে দেশের সার্বিক চিত্র। চোরের জায়গা দখল করে ডাকাত, সমাজের দুর্বৃত্তরা হয়ে উঠে সমাজপতি আর রাজনীতিবিদ। নূতন শ্লোগানের জন্ম হয়। যে মানুষটি হয় পতিতার দালাল ছিল অথবা পকেটমার তার নামে স্লোগান উঠে ‘অমুক ভাইয়ের চরিত্র ফুলের মতো পবিত্র’। তারপর একদিন সেই ‘পবিত্র’ দূর্বৃত্তটি হয়ে উঠে সবক্ষেত্রে মহা ক্ষমতাধর ব্যক্তি। কালে ক্রমে জন্ম হয় বেনজির আহমেদ, মতিউর রহমান, পিকে হালদার, মোশারফ হোসেন  আর আবিদ আলির মতো নব্য রঘু ডাকাত আর সুলতানদের। তফাৎ এই যুগের রঘু ডাকাতরা গরীব আর রাষ্ট্রের সম্পদ লুঠ করে বিদেশে নিজেদের আস্তানা গাড়েন আর বলে বেড়ান ‘বাংলাদেশে কি থাকা যায়? সন্তানের নিরাপত্তা নাই, লেখা পড়ার সুযোগ নাই, জীবনের নিরাপত্তা নাই আর ঢাকা শহরের যানজটের জন্য নড়াচড়া যায় না। চারিদিকে দূষিত বাতাস।’ 

বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবদ্দশায় যত বক্তৃতা বিবৃতি দিয়েছেন তার প্রায় প্রত্যেকটিতে রাষ্ট্রীয় সম্পদ চুরি আর চোরদের কথা বলেছেন। ১৯৭২ সালের ৭ জুন সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে এক শ্রমিক সমাবেশে বলেন ‘...মজুদদার, চোরাকারবারি আর চোরাচালানকারীরা হুঁশিয়ার হয়ে যাও। ..তাদের অনুরোধ করেছি, আবেদন করেছি, বুঝিয়েছি, অনেক বলেছি, একাজ করো না। আমার বিশ্বাস ছিল যে, তারা আমার কথা শুনবে। কিন্তু দেখছি “চোরা নাহি শুনে ধর্মের কাহিনী”।’ বঙ্গবন্ধুর সেই চোরারা আজ দেশ বিদেশে ইতোমধ্যে যশ আর খ্যাতি কুড়িয়ে বেশ বাহবা পেতে পাচ্ছেন। আর ধর্মের কাহিনী শুনবে কি তারাতো নিজেরাই এখন ধর্মের ফেরিওয়ালা যার উৎকৃষ্ট উদাহরণ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সাবেক গাড়ী চালক কোটিপতি আবিদ আলী। কি একটা নূরানি চেহারা। অকপটে স্বীকার করে বলেছেন চুরির টাকা আল্লাহর রাস্তায় কাজে লাগিয়েছি। সৃষ্টিকর্তা মর্ত্যে ধর্ম নাজিল করেছিলেন বিপথগামী বান্দাকে সুপথে আনার জন্য। সৃষ্টিকর্তা হয়তো এটি ধারণা করতে পারেন নি এই যুগে আবিদ আলীদের জন্ম হবে আর তারা পবিত্র ধর্মকে সাইনবোর্ড হিসেবে দুনিয়ার এমন কোন হারাম কাজ নেই যা তারা করবে না। ইদানীং যে সব নব্য রঘু ডাকাতদের আবির্ভাব হচ্ছে তাদের মধ্যে একটি বিষয়ের মিল আছে। তাদের সকলেরই বেশ লম্বা সুন্নতি দাঁড়ি আছে, কপালে সিজদার দাগ জ্বলজ্বল করছে আর প্রায় সকলেই  আলহাজ। ধর্মের এমন অপব্যবহার এই দেশে কেউ কখনো দেখেনি। বঙ্গবন্ধু একটা কথা প্রায় বলতেন ‘আমার শ্রমিক, খেটে খাওয়া মানুষ দুর্নীতি করে না করেন শিক্ষিত জনেরা’। বঙ্গবন্ধুর এই উক্তি এই যুগের রঘু ডাকাতরা অসত্য প্রমাণ করেছে। এক আবিদ আলীই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন তার পূর্বের কর্মক্ষেত্রে একজন ডেসপ্যাচ রাইডার পর্যন্ত কি ভাবে রঘু ডাকাত হয়ে উঠতে পারে। মালিক হতে পারে কোটি কোটি টাকার সম্পদের। বড়কর্তারাতো আছেনই। এক এগারোর পর অনেকেই ‘বনের রাজা ওসমান গনির’ নাম শুনে থাকবেন। ছিলেন একজন বনরক্ষক। দেশের বনবাদার উজাড় করে টাকাকড়ি যা কামিয়েছিলেন তা নিজের বাড়ীর চালের ড্রাম থেকে শুরু করে শোয়ার বালিশে রেখে নিজের বাড়ীকেই আলিবাবার মতো ধনসম্পদের গুহা বানিয়ে ফেলেছিলেন। যখন সব ধরা পড়লো তার সেই টাকা গোনাগুনতির জন্য ব্যাংক হতে টাকা গোনার মেশিন আনতে হয়েছিল। এখন তার নূতন সংস্করণ বন সংরক্ষক মোর্শারফ হোসেন। পুলিশের সাবেক আইজি বেনজীরের নজীর বিহীন কর্মকাণ্ডের পর এখন নানা স্তরের পুলিশ কর্মকর্তাদেরও নাম প্রকাশিত হচ্ছে। রাস্তায় ট্রাক থামিয়ে যখন একজন ট্রাফিক পুলিশ একশত টাকা সালামি নেয় সেটা হয় পকেট কাটা আর তাদের উদ্বর্তন কর্মকর্তারা যখন লক্ষ কোটি টাকার নীচে কথা বলেন না তখন তা হয় ডাকাতি। সেই পুরানো দিনের রঘু ডাকাতরা তাদের স্ত্রীদের তেমন একটা মর্যাদা দিতেন বলে জানা যায় না। বর্তমানের রঘু ডাকাতরা স্ত্রীদের প্রতি বেশ অনুগত কারণ তাদের সাথে তাদের ডাকাতির অংশ স্ত্রী সহ পরিবারের অন্য সদস্যদের অংশীদার করেন। একজনতো চালাকি করে নিজের নামে ব্যাংকে সাতশত হিসাব খুলেছিলেন। তা কি ভাবে সম্ভব সেই প্রশ্ন এখন অবান্তর কারণ এই দেশে রঘু ডাকাতের বারবাড়ন্ত শুরু হয়েছে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ কোন কোন সদস্যদের দিয়ে। অনেক ব্যাংক পরিচালক গ্রাহকের টাকাকে অনায়াসে নিজের টাকা মনে করে বিদেশে চালান করতে দ্বিধাবোধ করেন না। ডিজিটাল যুগে দেশে এত ব্যাংক কেন দরকার সেই প্রশ্নের মীমাংসা জরুরী হয়েছে ।

জনপ্রশাসন, অর্থ, ভূমি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা সহ খুব কম মন্ত্রণালয় আছে যেখানে এই সব নব্য রঘু ডাকাতদের বিচরণ নাই। কোন মন্ত্রণালয়ে বেশী দুর্নীতি হয় তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। এই সব মন্ত্রণালয়ের কিছু বিভাগ বা অধিদপ্তরের মধ্যে প্রতিযোগিতা হতে পারে। এর মধ্যে আছে এনবিআর, মাউসি, পুলিশ প্রশাসন, পরিবেশ ও বন অধিদপ্তর, সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত বিভিন্ন কমিটি। 

বর্ণিত নব্য রঘু ডাকাতদের সাথে এখন জন্ম হয়েছে আর এক শ্রেণীর উঠতি ডাকাত। অভিযোগের তীরটা কোন কোন মন্ত্রীর এপিএস’র দিকে। এরা মন্ত্রী নিজের পছন্দের লোক হয়। এপিএস হওয়ার আগে সাধারণত এরা মন্ত্রীর টেণ্ডল অর্থাৎ তাদের বস মন্ত্রী হওয়ার আগে গুরুর ফায় ফরমায়েশ খাটে। গুরু মন্ত্রী হয়ে গেলে তার পদোন্নতি হয়ে সে এপিএস হয়ে যায়। তারপর তার হাতে চলে আসে টাকা বানানোর পরশ পাথর। মন্ত্রীর হাতে ফাইল যাওয়ার আগে তাকে খুশি করতে হয়। বাকিটা সহজে অনুমেয়। একজনের একটি নিয়োগের ফাইল প্রায় তিন বছর আটকে ছিল একটি মন্ত্রণালয়ে। সেই নিয়োগ না হওয়াতে সেই ব্যক্তি এখন দেশ ছাড়ছেন। অনেক এপিএস আছেন যাদের আগে রিক্সায় চড়ার পয়সা ছিল না। এখন তারা ঢাকা শহরেই একাধিক বাড়ী আর গাড়ীর মালিক। এদের দিকে তাকানোর সময় দুর্নীতি দমন কমিশনের তেমন একটা সময় নেই কারণ তারা নব্য রঘু ডাকাতদের নিয়ে ব্যস্ত যদিও মানুষ জানে এই যুগের রঘু ডাকাতদের তেমন কিছু একটা হবে না। হবে কি ভাবে তাদের সম্পদের প্রায় সকলটাইতো এই দেশের ব্যাংকের মাধ্যমেই দেশের বাইরে পাচার করে দিয়েছেন? সাধারণত ব্যাংকে একটি পঞ্চাশ হাজার টাকার চেক দিলে জাতীয় পরিচয় পত্র চায় আবার অস্বাভাবিক লেনদেন হলে বাংলাদেশ ব্যাংকে অবহিত করে। এখন প্রশ্ন বেনজীর কি ভাবে হাজার কোটি টাকা ব্যাংক থেকে তুলে বিদেশে পাচার করে দিয়েছে। তার এই অপকর্মের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকও কি জড়িত ছিল? এই অনুসন্ধান করার দায়িত্ব কার? 

ইদানিং এই সব রঘু ডাকাতদের কর্মকাণ্ড দেখে মনে হতে পারে দেশে বুঝি রঘু ডাকাতরা কিলবিল করছে? না তেমনটি না। এখনো দেশে সৎ মানুষ আছে তবে তাদের কদচিৎ সরকার  কাজে লাগায়। লাগালে তারা কি অসাধ্য সাধন  করতে পারেন পদ্মাসেতু কার জ্বলন্ত প্রমান। বঙ্গবন্ধু সরকার গঠন করার শুরুতেই তার আস্থাভাজন সৎ ও যোগ্য মানুষদের বেছে নিয়েছিলেন যাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে তিনি একটি যুদ্ধবিধ্বস্থ দেশকে শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে হাঁটতে শিখিয়েছিলেন। তাঁর সাথে তিনি পেয়েছিলেন জাতীয় চার নেতাকে। পরিকল্পনা কমিশনকে সাজিয়েছিলেন এমন সব মানুষ দিয়ে যারা একটি যুদ্ধবিধ্বস্থ দেশকে পুনর্গঠন করতে তাঁকে কার্যকর ভাবে সহায়তা করেছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশের শুরুতে বেশীর ভাগ পুলিশের পায়ে কোন প্রকার জুতা ছিল না। এমন একটি চিত্র বিশ্বখ্যাত মাসিক পত্রিকা ‘ন্যাসন্যাল জিওগ্রাফিক্স’ এর প্রচ্ছদে ছাপা হয়েছিল। যে মুহূর্তে বঙ্গবন্ধুর নীতি নির্ধারণী বলয়ে খোন্দকার মোশতাক, তাহের উদ্দিন ঠাকুর আর মাহবুব আলম চাষীরা ঢুকে পড়েছিলেন সেই মুহূর্তে জাতির পিতার দুঃসময় শুরু হয়। দুঃখের বিষয় হচ্ছে পিতার মতো কন্যার ভাগ্যটা তেমন নয়। এখনতো যে দিকেই দৃষ্টি যায় সে দিকেই মোশতাক, চাষী আর ঠাকুরের বংশধররা। কারো নাম বেনজির, কেউ বা মতিউর অথবা আবিদ আলী বা মোশারফ হোসেন। আগে মানুষ বলতো কোর্ট কাচারি আর থানার দেয়ালের ইটও পয়সা খায়। এখন সরকারের কোন অফিস তা খায় না তা গবেষণার বিষয় বটে। শুধু পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সাম্প্রতিক সব নাটকীয় ঘটনা বিচার করলে দেশের অন্যান্য দপ্তরের চেহারা কেমন হতে পারে তা অনুমান করা যায়। এই সব নব্য রঘু ডাকাতরা যখন মিডিয়ার কল্যাণে জনসম্মুখে চলে আসে তখন সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষ তাকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে শুধু বদলি করা হয় কারণ এদের খুটির জোর বেশ শক্ত। এমন ব্যবস্থা কোন শাস্তি হতে পারে না। সম্প্রতি একটি শিক্ষা বোর্ডের একজন শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নানা ধরণের দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত হচ্ছে ঠিক তখন তাকে একই পদমর্যাদায় একই জেলায় অন্য আর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা হয় কারণ তার খুটির জোর বেশ শক্ত । 

সব শেষে দেশের প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের একটি বক্তব্য দিতে চাই। গত ৮ই জুলাই তিনি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইন্সটিউটে এক সেমিনারে বক্তব্য দিতে গিয়ে বলেন ‘উন্নয়নের সুফল দুর্নীতির চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে’। তাঁর এই বক্তব্যেও সাথে দ্বিমত করার  কোন কারণ নেই। তবে এই যুগের রঘু ডাকাতদের কি ভাবে দমন করা যাবে তা নিয় সরকারকেই গভীর ভাবে চিন্তা করতে হবে। 


সময়-অসময়   রঘু ডাকাত   দুর্নীতি  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

‍‌‌‌‌‌'কোটা ব্যবস্থা থাকা জরুরি‍‌'

প্রকাশ: ০৩:৩০ পিএম, ১২ জুলাই, ২০২৪


Thumbnail

বাংলাদেশের খ্রিষ্টান সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে আমি মনে করি এই ধর্ম বিশ্বাসী শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারি চাকরিতে কোটা সুবিধা থাকা দরকার। কারণ স্বাধীনতার ৫৪ বছরে খ্রিষ্টান সমাজের কোনো ব্যক্তিকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, ট্রেজারার করা হয়নি। এমনকি হাতে গোনা কয়েকজন অধ্যাপক রয়েছেন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে। যদিও এদেশের মিশনারি স্কুল-কলেজগুলো শত বছর যাবৎ শিক্ষা বিস্তারে কাজ করে চলেছে, তবু নিজেদের সমাজের উচ্চশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কম হওয়ার কারণই হলো সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব।

সরকারি চাকরিতে খ্রিষ্টান সমাজের জন্য কোটা সুবিধা থাকলে এই সমাজে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে কর্মে নিয়োজিত হওয়ার উৎসাহ বৃদ্ধি পেত। যেহেতু এ ধর্মবিশ্বাসীর ১০ লাখ জনগোষ্ঠী সরকারি চাকরিতে কোনো অর্থেই সুযোগ-সুবিধা পায় না সেজন্য পিছিয়ে পড়েছে আমাদের খ্রিষ্টান সমাজ। আশ্চর্য হলো ব্রিটিশ আমলের সেন্সাস রিপোর্টগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায় সেখানেও এই ধর্মবিশ্বাসীদের কোনো আলাদা সুযোগ-সুবিধা কখনো প্রদান করা হয়নি। বরং ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য ব্রিটিশরা হিন্দু-মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য বেশি চিন্তা করেছে এবং সমকালে নানা ধরনের ব্যবস্থাও গ্রহণ করেছিল। এজন্য সেন্সাসগুলোতে অনগ্রসর জনগোষ্ঠী, অবহেলিত-অস্পৃশ্য পরিবার, নিম্নবর্গ ইত্যাদির পরিসংখ্যান লিপিবদ্ধ করা হতো। ভারতের রাজনীতিতে তপসিলি চেতনা ও অধিকার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে।

তফসিলি জাতি (এসসি) ও তফসিলি জনজাতি (এসটি) হচ্ছে সরকারিভাবে স্বীকৃত ভারতের সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত আর্থসামাজিক জনগোষ্ঠী। আর তাদের জন্য সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু সেখানেও খ্রিষ্টান সমাজের জন্য কোনো ব্যবস্থা না থাকায় জাতীয় পর্যায়ে ওই ধর্মবিশ্বাসীদের বিচরণ একেবারেই হাতে গোনা।  কথা বলছিলাম বাংলাদেশের খ্রিষ্টান সমাজ নিয়ে। প্রকৃতপক্ষে উপজাতি জনগোষ্ঠীর দিকে তাকিয়ে আমরা নিজেরাই নিজেদের কথা ভেবে হতাশায় নিমজ্জিত হই। চাকমা, বড়ুয়া প্রভৃতি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে উপাচার্য, সরকারি আমলা এবং বিপুল সংখ্যক পুলিশ ও অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারী। পক্ষান্তরে খ্রিষ্টান সমাজের শূন্যতায় ব্যাপ্ত চরাচর। সরকারি চাকরিতে খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠীর জন্য কোটা ব্যবস্থা জরুরি হয়ে উঠেছে।    

আর এসব বিবেচনায় চলমান কোটা বাতিলের আন্দোলনকে আমরা সমর্থন করতে পারি না। বরং কোটা সংখ্যা আরো বৃদ্ধি করা জরুরি বলে মনে করি। শেখ হাসিনা সরকার ২০১৮ সালে কোটা ব্যবস্থা বাতিল করে ভুল করেছিল। কারণ সরকার প্রধান শেখ হাসিনার কথা থেকেই আমরা জানতে পেরেছি, কোটা ব্যবস্থা তুলে দেওয়ার ফলে নারী কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা কমে গেছে। কোনো কোনো সুবিধাবঞ্চিত জেলার কেউ-ই চাকরি পায়নি। পত্রিকায় প্রকাশিত এক পরিসংখ্যান চিত্র এরকম-কোটা ব্যবস্থা রদের পর পর বিসিএস(পুলিশ)-এ  নারী কর্মকর্তা ও জেলাভিত্তিক কোটার বর্তমান অবস্থা হলো- কোটাভিত্তিক নিয়োগ ৩৮ ব্যাচ পর্যন্ত বহাল ছিলো। কিন্তু ৪০ ও ৪১ ব্যাচ নিয়োগে কোনো কোটা ছিলো না।  কোটা বাতিলের পর বিসিএস পুলিশে নারীদের নিয়োগের সংখ্যা কমে আসতে শুরু করে।

তাছাড়া ৪০ ব্যাচে ২৪টি জেলা ও ৪১ ব্যাচে ১৮টি জেলা থেকে কোন কর্মকর্তা নিয়োগ লাভ করে নি। নারী কোটা সংক্রান্ত আনুষঙ্গিক তথ্যাদি হচ্ছে-৪০ ব্যাচের সুপারিশকৃত মোট সংখ্যা ৫৭৪ জনের মধ্যে নারী সুপারিশকৃত ১২১ জন। যা মোট সুপারিশকৃত সংখ্যার ২১.০৮%। ৪১ ব্যাচে সুপারিশকৃত মোট সংখ্যা ৮১৬ জনের মধ্যে নারী সুপারিশকৃত ১৭৩ জন। যা মোট সুপারিশকৃত সংখ্যার ২১.২০%। ৪৩ ব্যাচের সুপারিশকৃত মোট সংখ্যা ৬৪৫ জনের মধ্যে নারী সুপারিশকৃত ১১০ জন। যা মোট সুপারিশকৃত সংখ্যার ১৭.০৫%। এ তথ্য সাধারণ ক্যাডার সংক্রান্ত, যা কোটার প্রভাব বা অভিঘাত সম্পর্কে একটি সাধারণ ধারণা দেয়।

অথচ ৩৮ ব্যাচের সকল ক্যাডারের সুপারিশকৃত কর্মকর্তার সংখ্যা ছিল ২২০৪, নারী সুপারিশকৃত ৫৭৮, যা মোট সুপারিশকৃতের ২৬.৮৭%। ৩৭ ব্যাচের সকল ক্যাডারের সুপারিশকৃত কর্মকর্তার সংখ্যা ছিল ১৩১৩, নারী সুপারিশকৃত ৩০৯ জন। যা মোট সুপারিশকৃতের ২৪.৭৩%। ৩৬ ব্যাচের সকল ক্যাডারের সুপারিশকৃত কর্মকর্তার সংখ্যা ছিল ২৩২৩, নারী সুপারিশকৃত ৫৮৪ জন। যা মোট সুপারিশকৃতের ২৫.৮৯%।

উল্লেখ্য, কোটা পদ্ধতি বাতিল হয় ৪০ বিসিএস থেকে। কোটাযুক্ত সর্বশেষ ব্যাচ ছিল বিসিএস ৩৮ ব্যাচ। ২০২০ সালের পর পুলিশের চাকরিতে কোটা  না থাকায় মাত্র চার জন নারী অফিসার সুযোগ পেয়েছে, আর ফরেন সার্ভিসে মাত্র দুইজন নারী প্রার্থী সুযোগ পেয়েছে। ২৩ টি জেলায় একজনও পুলিশের চাকরি পায় নি। অন্যদিকে ৫০ টি জেলায় নারীরা চাকরির ক্ষেত্রে কোন সুযোগ পায়নি। যখন কোটা পদ্ধতি ছিল নারীদের চাকরিপ্রার্থী কম বেশি ২৬ পার্সেন্ট এর উপরে চাকরি পেয়েছিল। কোটা তুলে দেওয়ার ফলে এই চাকরি প্রাপ্তি কোন কোন বছর ১৯ পার্সেন্টে নেমে এসেছে। একমাত্র মেডিকেলে ডাক্তারদের চাকরি ক্ষেত্রে মেয়েরা কিছুটা অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছে।

২০১৮ সালে যারা কোটাবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিল তারা কেউই পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় বা প্রিলিমিনারিতেও যোগ দেয় নি। তাহলে ২০১৮ সালের মতো ২০২৪ সালে এসে তাদের এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য খুঁজে বের করতে হবে আমাদের। এ দেশে যে কোন চাকরি সর্বপ্রথম মুক্তিযোদ্ধা পরিবার সন্ত্রাস-সন্ততি নাতি-নাতনীকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। মুক্তিযোদ্ধা পরিবার মেধাবী না, মেধাবী হল রাজাকারের নাতি পুতিরা? আন্দোলনকারী কেন পিএসসি-এর পরীক্ষা দিল না, অংশগ্রহণ করলো না? জবাব তাদের দিতে হবে। ৩০% কোটা অবশ্যই থাকতে হবে। অগ্রাধিকার পাবে মুক্তিযোদ্ধা পরিবার, তারা চাকরি পাবে আগে। যোগ্য কাউকে না পাওয়া গেলে কিংবা যদি না থাকে কেউ তাহলে বাকি যা থাকবে অন্যরা পাবে। এভাবেই কোটা ব্যবস্থা প্রচলিত থাকবে।

মনে রাখতে হবে শেখ হাসিনা সরকারই শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে ২০১৮ সালের ৪ অক্টোবর সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিলের পরিপত্র জারি করে। ফলে ৯ম থেকে ১৩তম গ্রেড পর্যন্ত বাতিল হয় সব ধরনের কোটা। কিন্তু কোটা পুনর্বহালের দাবিতে ২০২১ সালে আদালতে রিট করেন কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। যার পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ৫ জুন কোটা বাতিলের পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্ট। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের ফলে ১০ জুলাই হাইকোর্টের রায়ের উপর ৪ সপ্তাহের স্থিতাদেশ দেয় আপিল বিভাগ। স্থগিত হয় কোটা পুনর্বহালের রায়। অর্থাৎ কোটা ব্যবস্থা ফিরে আসা এখন কোর্টের রায়ের উপর নির্ভর করছে। সরকারের দায় নেই। বরং আন্দোলনকারীদের মনে রাখা দরকার শেখ হাসিনা সরকার কোটা ব্যবস্থা বাতিল করে ভুল করেছিল।

কারণ কোটা ব্যবস্থা পৃথিবীর নানা দেশে প্রচলিত আছে। আর জনগোষ্ঠীর ভৌগোলিক অবস্থান ও অর্থনৈতিক নানা স্তরের জন্য কোটা ব্যবস্থা সংরক্ষণ আবশ্যক। এমনকি বাংলাদেশে কোটা ব্যবস্থা প্রচলিত থাকার সময় বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের রিপোর্ট ২০২০ অনুসারে বিগত ৩৫ থেকে ৩৯তম বিসিএস-এর ৫টি নিয়োগ পরীক্ষার পরিসংখ্যান দেখলে যে কেউ বুঝতে পারবেন যে, কোটায় চাকরি পাওয়ার সংখ্যা নগণ্য। ওই সময়ে মোট নিয়োগ পেয়েছে- ১৪,৮১৩ জন। তার মধ্যে মোট কোটা ৯,৮১৮ জন (৬৬.২%)। এর মধ্যে জেলা কোটা ২১২৪ জন, নারী কোটা ১৪২৬ জন, মুক্তিযোদ্ধা কোটা ১২৯৮ জন (৮.৭%), ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কোটায় ১৩১ জন এবং প্রতিবন্ধী কোটায় ১৬ জন নিয়োগ পেয়েছেন।

পরিসংখ্যান থেকে দেখা যাচ্ছে, পিএসসি’র বিদ্যমান পদ্ধতিতে মেধায় নিয়োগ হওয়ার কথা ছিল ৪৪% কিন্তু কোটায় উপযুক্ত প্রার্থী না থাকায় নিয়োগ হয়েছে ৬৬.২%। অন্যদিকে মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০% কিন্তু কোটার জন্য বিবেচিত হয়েছে মাত্র ৮.৭%। উপযুক্ত প্রার্থী যারা সকলেই নিঃসন্দেহে মেধাবী।

উপরের পর্যালোচনা ও পরিসংখ্যান বিবেচনায় নিয়ে আমরা মনে করি বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা অবশ্যই প্রচলিত থাকতে হবে। উপরন্তু খ্রিষ্টান সমাজের জন্য স্বতন্ত্র কোটার প্রচলন সময়ের দাবি। অবলিম্বে কোটা ব্যবস্থার পুনর্বহাল এবং খ্রিষ্টান কোটা প্রচলন করে সমগ্র জনগোষ্ঠীর মঙ্গল করলে সম্প্রীতির দেশ, সমৃদ্ধির দেশ গড়ে উঠবে।

(লেখক : ড. মিল্টন বিশ্বাস, বঙ্গবন্ধু গবেষক, অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, বাংলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, বিশিষ্ট লেখক, কবি, কলামিস্ট, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রগতিশীল কলামিস্ট ফোরাম, নির্বাহী কমিটির সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ, email-drmiltonbiswas1971@gmail.com)


কোটাবিরোধী আন্দোলন   ছাত্র আন্দোলন   ঢাকা   অবরোধ  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

কোটাবিরোধী আন্দোলনের নামে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আঘাত

প্রকাশ: ০৩:০০ পিএম, ১২ জুলাই, ২০২৪


Thumbnail

বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ, জাতীয় পতাকা এগুলোর প্রতি সম্মান রেখে সবার কথা বলা উচিত। মাথায় পতাকা বেধে, হাতে পতাকা নিয়ে আজকাল মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তির লোকজনও এখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বড় অংশীদার। বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীর আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য সবচেয়ে নিবেদিত, লাল সবুজের পতাকা বাধা মাথা, হাতে পতাকা দেথে প্রশ্ন জাগে মনের ভেতর থেকে তা করছেন তো না লোক দেখানো, আপনি, আপনার পরিবার ও চৌদ্দ গোষ্ঠী স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন তো?

সরকারি চাকরিতে কোটা বহাল রেখে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের ওপর ১০ জুলাই এক মাসের জন্য স্থিতাবস্থা দিয়েছেন আপিল বিভাগ। তবে কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীরা তা প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। আন্দোলনকারীরা বলেছেন, এ দাবি নির্বাহী বিভাগ থেকে যতক্ষণ না পূরণ করা হবে ততক্ষণ তারা রাজপথে থাকবে।

আন্দোলনকারীদের দাবি নিয়ে প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান বলেছেন, কোটা নিয়ে যারা আন্দোলন করছেন তাদেরকে পরামর্শ দিন, তারা কেন নির্বাহী বিভাগের কথা বলে? নির্বাহী বিভাগের যে কোনও সিদ্ধান্ত তো আদালতে চ্যালেঞ্জ হতে পারে। কোটা আন্দোলনকারীদের জন্য আদালতের দরজা সবসময় খোলা। কোটা আন্দোলনকারীদের এক দফা দাবি ‘সংসদে আইন পাশ করে সরকারি চাকরির সব গ্রেডে শুধু পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য ন্যূনতম কোটা রেখে সকল ধরনের বৈষম্যমূলক কোটা বাতিল করতে হবে।’

বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন রিপোর্ট ২০২০ অনুসারে বিগত ৩৫-৩৯তম বিসিএস ৫টা নিয়োগ পরীক্ষার পরিসংখ্যানে দেখা যায় মোট নিয়োগ-১৪,৮১৩ জন  সাধারণ মেধা কোটা-৯,৮১৮ জন (৬৬.২%) জেলা কোটা-২,১২৪ জন (১৪.৪%), নারী কোটা - ১,৪২৬ জন (৯.৬%), মুক্তিযোদ্ধা কোটা-১,২৯৮ জন (৮.৭%), ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী কোটা- ১৩১ জন (০.৯%), প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য কোটা-১৬ জন (০.১১%)।

আরো কিছু পরিসংখ্যান দেখলেই এর প্রয়োজনীয়তা সবার কাছে পরিস্কার হয়ে যাবে। ৪০ ব্যাচের সুপারিশকৃত মোট সংখ্যা ৫৭৪ জনের মধ্যে নারী সুপারিশকৃত ১২১ জন। যা মোট সুপারিশকৃত সংখ্যার ২১.০৮%। ৪১ ব্যাচে সুপারিশকৃত মোট সংখ্যা ৮১৬ জনের মধ্যে নারী সুপারিশকৃত ১৭৩ জন। যা মোট সুপারিশকৃত সংখ্যার ২১.২০%। ৪৩ ব্যাচের সুপারিশকৃত মোট সংখ্যা ৬৪৫ জনের মধ্যে নারী সুপারিশকৃত ১১০ জন। যা মোট সুপারিশকৃত সংখ্যার ১৭.০৫%। উপরোক্ত তথ্য সাধারণ ক্যাডার সংক্রান্ত। যা কোটার প্রভাব বা অভিঘাত সম্পর্কে একটি সাধারণ ধারণা দেয়। ৩৮ ব্যাচের সকল ক্যাডারের সুপারিশকৃত কর্মকর্তার সংখ্যা ২২০৪, নারী সুপারিশকৃত ৫৭৮, যা মোট সুপারিশকৃতের ২৬.৮৭%। ৩৭ ব্যাচের সকল ক্যাডারের সুপারিশকৃত কর্মকর্তার সংখ্যা ১৩১৩, নারী সুপারিশকৃত ৩০৯ জন। যা মোট সুপারিশকৃতের ২৪.৭৩%।

৩৬ ব্যাচের সকল ক্যাডারের সুপারিশকৃত কর্মকর্তার সংখ্যা ২৩২৩, নারী সুপারিশকৃত ৫৮৪ জন। কোটা ব্যবস্থা রদের পর পর বিসিএস (পুলিশ) এ  নারী কর্মকর্তা ও জেলাভিত্তিক কোটার বর্তমান অবস্থা। কাটাভিত্তিক নিয়োগ ৩৮ ব্যাচ পর্যন্ত বহাল ছিলো। অত:পর ৪০ ও ৪১ ব্যাচ নিয়োগে কোন কোটা ছিলো না। কোটা বাতিলের পর বিসিএস পুলিশে নারীদের নিয়োগের সংখ্যা কমে আসতে শুরু করে, তাছাড়া ৪০ ব্যাচে ২৪টি জেলা ও ৪১ ব্যাচে ১৮টি জেলা থেকে কোন কর্মকর্তা নিয়োগ লাভ করেনি।

পুলিশের চাকরিতে কোটা  না থাকায় মাত্র চার জন নারী অফিসার সুযোগ পেয়েছে, আর ফরেন সার্ভিসে মাত্র দুইজন নারী প্রার্থী সুযোগ পেয়েছে। ২৩ টি জেলায় একজনও পুলিশের চাকরি পায়নি। ৫০ টি জেলায় নারীরা চাকরির ক্ষেত্রে কোন সুযোগ পায়নি। যখন কোটা পদ্ধতি ছিল নারীদের চাকরিপ্রার্থী কম বেশি ২৬ পার্সেন্ট এর উপরে চাকরি পেয়েছিলেন। কোটা তুলে দেওয়ার ফলে এই চাকরি প্রাপ্তি কোন কোন বছর ১৯ পার্সেন্ট নেমে এসেছে। একমাত্র মেডিকেলে ডাক্তারদের চাকরি ক্ষেত্রে নারীরা কিছুটা অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছেন।

যারা কোটাবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলো তারা  কেউই পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় বা প্রিলিমিনারিতেও তারা যোগ দেয়নি আবার যারা যোগ দিয়েছিলো তাদের কেউ কেউ পাশ করতে পারেনি, আকার অনেকে লিখিত পরীক্ষায় পাশ করেনি, গণমাধ্যমে আমরা তাই দেখেছি। তাহলে তাদের এই আন্দোলনের উদ্দেশ্যটা কি। আমাদের দেশে যে কোন চাকরি সর্বপ্রথম মুক্তিযোদ্ধা পরিবার সন্তান-সন্ততি নাতি-পুতিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। মুক্তিযোদ্ধা পরিবার মেধাবী না রাজাকারের নাতি পুতিরা মেধাবী সে বিতর্ক নিস্প্রয়োজন। আন্দোলনকারী কেন পিএসসিতে পরীক্ষা দিল না অংশগ্রহণ করলো না? সেটা একটা বিস্ময়।

প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে ৪৬ বছর ধরে চলা কোটাব্যবস্থা বাতিল ঘোষণা করে সরকার। সরকারি চাকরিতে নবম থেকে ত্রয়োদশতম গ্রেডে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটা তুলে দিয়ে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগে সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। কোটা পর্যালোচনা কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ২০১৮ সালের ৩ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু গত ৫ জুন প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলে ২০১৮ সালের ৪ অক্টোবর জারি করা পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। ফলে সরকারি চাকরিতে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা বহাল থাকবে বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা।

মুক্তিযুদ্ধের কোটার ক্ষেত্রে বলতে গেলে, আমাদের দেশ স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেতে মুক্তিযোদ্ধাদের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। প্রতিদিনই শিক্ষার্থীরা সাধারণ মানুষকে অবর্ণনীয় দুর্ভোগে ফেলে দাবি আদায়ের চেষ্টা করা হচ্ছে। কোটার বিরুদ্ধে যারা আন্দোলন করছে, তাদের আন্দোলন করার পূর্ণ অধিকার আছে। কিন্তু দিনের পর দিন রাস্তা আটকে মানুষকে জিম্মি করার অধিকার কারও নেই। আপিল বিভাগও কিন্তু বলেছেন, রাজপথের আন্দোলন দিয়ে আদালতের রায় বদলানো যাবে না। কোটা থাকলে মেধাবীরা বঞ্চিত হয় এই অতি সরলীকরণের মাধ্যমে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে নামানো হয়েছে।
কোটায় নিয়োগপ্রাপ্ত প্রার্থীরাও সবাই মেধাবী, কেউ মেধাহীন নয়। কেউ কেউ মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগপ্রাপ্তদের অমেধাবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন। সাধারণ প্রার্থীদের সঙ্গে একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে প্রাথমিক বাছাই, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর কোটা প্রয়োগ হওয়ার কারণে তা বৈষম্যমূলক নয়।

কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীদের মূল লক্ষ্য হলো আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ। বিশ্বের আরও অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও কোটা আছে। সেটা শুরু হয়েছে স্বাধীনতার পরপরই। বঙ্গবন্ধুর আমল থেকে শুরু করে ২০১৮ সাল পর্যন্ত কোটা ছিলো। সবাই মনে করেন ২০১৩ সালে শাহবাগে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে গণজাগরণ সৃষ্টি হয়েছিল। তার কাউন্টার দেয়ার জন্য স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি ভিন্ন কৌশল অবলম্বন হিসেবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে বঞ্চনার ক্ষোভ সঞ্চারিত করে। মুক্তিযোদ্ধারা তাদের চাকরি নিয়ে নিচ্ছে, এই সরল হিসাবে তাদের সংক্ষুব্ধ করে তোলে। তারপর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের গণজাগরণের পাল্টা হিসেবে কোটাবিরোধী গণজাগরণ সৃষ্টি করে।

১৯৭৫-এর পর ২১ বছর বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধারা অবহেলিত ছিল। কোনো সুযোগ-সুবিধা পাননি। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে মুক্তিযোদ্ধাদের নানা সুযোগ-সুবিধা দেয়। সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধাদের উত্তরসূরিদের জন্য কোটাব্যবস্থা প্রচলন করে। সবদিক দিয়েই স্বাধীনতাবিরোধীরা কোণঠাসা হয়ে যায়। আর দেরিতে হলেও মুক্তিযোদ্ধারা ফিরে পায় তাদের প্রাপ্য মর্যাদা। তরুণ প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করে কোটার বিরুদ্ধে মাঠে নামায় স্বাধীনতার অপশক্তি।

১৮ কোটি মানুষের দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৭ লাখ শিক্ষত বেকার। সবাই তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি  পেতে চাইবে এটা স্বাভাবিক। কিন্তু তাদের মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্র সবার পাশেই দাঁড়াবে। আদিবাসীরা চাকরি পাবে না, নারীরা চাকরি পাবে না, প্রতিবন্ধীরা ব্যক্তিরা চাকরি পাবে না, মুক্তিযোদ্ধার উত্তরসূরিরা চাকরি পাবে না; তাহলে দেশের বৈষম্য কি যাবে?

তবে কোটাবিরোধী চলমান আন্দোলনের মূল লক্ষ্য মুক্তিযুদ্ধ। তরুণ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপক্ষে দাঁড় করিয়ে দেওয়া কোন শুভ লক্ষণ নয়। মুক্তিযোদ্ধারা নিজের জীবনের সবকিছু উজাড় করে দিয়ে করে দেশের জন্য লড়েছেন, শহীদ হয়েছেন। যখন যুদ্ধ করেছেন, তখন নিশ্চয়ই তারা ভাবেননি, তাদের সন্তানরা কোটায় চাকরি পাবে। তারা ভাবেননি বলে আমরাও ভাবব না? আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, তাদের রক্তে আজকে আমরা স্বাধীন দেশে বসে কোটার বিপক্ষে আন্দোলন করতে পারছি।

দেশ স্বাধীন না হলে এই শিক্ষার্থীদের পূর্ব পাকিস্তানের কোটার জন্য আন্দোলন করতে হতো। তাই এ দেশটার ওপর মুক্তিযোদ্ধাদের দাবি একটু বেশিই থাকবে। মুক্তিযোদ্ধারা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। কিন্তু তাদের অনেকেই ছিলেন কৃষক, শ্রমিক, কামার, কুমার, গ্রামের সাধারণ মানুষ।

স্বাধীনতার পর চাইলেও রাষ্ট্র তাদের সবাইকে চাকরি দিতে পারেনি। দেশ স্বাধীন করার মতো সাহস থাকলেও, সেই স্বাধীন দেশে কোনো চাকরি করার মতো যোগ্যতা হয়তো বা তাদের ছিল না। পরে হয়তো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার গুরুত্ব বুঝে নিজের সন্তানকে নানা কষ্টে পড়াশোনা করিয়েছেন। এখন সেই সন্তানের পাশে রাষ্ট্র দাঁড়াবে না? অবশ্যই দাঁড়াবে। এটা তো বৈষম্য নয়, এটা ঋণ শোধ। মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট ভুয়া না আসল সেটা যাচাই করার দায়িত্ব পিএসসির বা রাষ্ট্রের। কিন্তু এই অজুহাতে মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্মান করা যাবে না, তাদের বিপক্ষে রাজপথে স্লোগান দেওয়া যাবে না, তাদের কোটা বাতিলের দাবি করা যাবে না। যারা দেশের জন্য লড়েছেন, দেশের কাছে তাদের চাওয়ার কিছু না থাকতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রের উচিত সবসময় তাদের জন্য বাড়তি আসন রাখা।

কোটাবিরোধী আন্দোলনের নামে যখন রাজপথে মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে স্লোগান ওঠে, তখন আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের বিপক্ষে স্লোগান শুনে নিশ্চয়ই মুক্তিযোদ্ধারা কষ্ট পেয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধার উত্তরসূরিদের জন্য ৩০ শতাংশ কোটা রাখা হলেও অনেক বছর ধরেই এ কোটা পূরণ করার মতো লোক পাওয়া যায় না। আর পাওয়া না গেলে তা সাধারণ আবেদনকারীদের মধ্য থেকে পূরণ করা হয়। তাই মুক্তিযোদ্ধাদের উত্তরসূরিরা ৩০ ভাগ চাকরি নিয়ে নিচ্ছে, পরিসংখ্যানগতভাবেই এটা ঠিক নয়।

এ আন্দোলন মুক্তিযোদ্ধাদের হেয় করার জন্য, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভূলুণ্ঠিত করার জন্য। তাই যারা আন্দোলন করছেন, তাদের সতর্ক থাকতে হবে। আপনার মাধ্যমে স্বাধীনতাবিরোধীরা যেন কোন সুযোগ নিতে না পারে। স্বাধীন বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধারা একটু বাড়তি সুবিধা পাবেন এটাই স্বাভাবিক, এটাই যৌক্তিক, এটাই ন্যায্য।

পাক হানাদার বাহিনীর অগ্নিসংযোগে অনেক পরিবার সর্বস্বান্ত হয়েছে। অনেক বাঙালি গণহত্যার শিকার হয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সংকল্প দৃঢ় করতে, দেশ-বিদেশে জনমত তৈরিতে এদের অবদান কম নয়। এসব ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও নিঃসন্দেহে মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিকামী সাধারণ মানুষ মুক্তিযোদ্ধাদের পথ দেখিয়েছেন, পাকিস্তানি সৈন্য ও রাজাকারদের সম্পর্কে তথ্য দিয়েছেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছেন, তাদের অস্ত্র নিরাপদে লুকিয়ে রেখেছেন-তাদের কি মুক্তিযোদ্ধার তালিকার বাইরে রাখা যায়?

আসা যাক আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের দাবি প্রসঙ্গে। প্রথমে শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে প্রতিবন্ধী ছাড়া সব কোটা বাতিল করার। কিন্তু পরে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কোটা বাতিলের বিষয়টি এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। শিক্ষার্থীরা বলছেন, তারা কোটাব্যবস্থা যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার পক্ষে। অবশ্যই এটি একটি যৌক্তিক দাবি। অন্যদিকে মহামান্য উচ্চ আদালত রাষ্ট্রপক্ষকে বলেছেন, আন্দোলনের কারণে আদালতের আদেশ পাল্টাতে চান কি না? এ বিষয়ে লিভ টু আপিল করারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এটিও, অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী চাইলেও ঘোষণা দিতে পারবেন না। কারণ তার ওপর আদালত রয়েছেন। অতএব বিষয়টি কিছুটা জটিল হয়ে পড়েছে।  এমনও হতে পারে, লিভ টু আপিলের নিষ্পত্তি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে। আন্দোলনের সমর্থনে যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখছেন, তাদের অনেকেই মুক্তিযোদ্ধা বা সন্তানদের অসম্মান করে কথা বলছেন। মনে রাখতে হবে, ওই সূর্যসন্তানরা না হলে এ লেখালেখিও করতে পারতেন না।

বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর মুক্তিযুদ্ধফেরত অনেকেই আঙুল ফুলে কলা গাছ হয়েছে। কিন্তু খেটে খাওয়া কৃষক, দিনমজুর, ঘাম ঝরানো শ্রমিক এমনকি তখন অনেক ছাত্রের জীবনে কোনো পরিবর্তন আসেনি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই তাদের খোঁজ করেছেন এবং তাদের বেঁচে থাকার একটা আপাত ব্যবস্থা করেছেন। এর মধ্যে খুঁজলে দেখা যাবে যে, একজন মুক্তিযোদ্ধার একজন ছেলেকে বা নাতি-নাতনিকে তিনি একজন অফিস সহায়ক বা প্রহরী বা মালী বা পাচক পদে চাকরির জন্য সচেষ্ট হয়ে উঠেছেন। কারণ সুযোগের অভাবে তাদের তেমন পড়াশোনা করানো যায়নি। এই শ্রেণির কোটাব্যবস্থা উঠে গেলে ওই মানুষটির আর কোনো সম্ভাবনা থাকে না। এ ধরনের বহু বীর মুক্তিযোদ্ধা দেশে রয়েছেন।

তাই কোটা আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ যদি সত্যিই বাংলাদেশকে লালন করেন তাহলে এ বিষয়টি তাদের বিবেচনায় থাকা উচিত। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণিতে সম্মানজনক পর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধা কোটা থাকা বাঞ্ছনীয়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগেও পোষ্য কোঠা রয়েছে। অন্যান্য গ্রেডে কোটাব্যবস্থার সংস্কার হতে পারে।

কোটা থেকে যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া গেলে শূন্য পদগুলো অবশ্যই মেধা তালিকা থেকে পূরণ করতে হবে। কোটার জন্য কোনো বিশেষ পরীক্ষা নেই। বয়স-সীমা প্রত্যেক প্রার্থীর জন্য একই হতে হবে। কোনো প্রার্থী একাধিকবার কোটা সুবিধা ব্যবহার করতে পারবেন না। পরিস্থিতি সরকার বিরোধী ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পরিপন্থী হওয়ায় ২০১৮ সালের ২১ মার্চ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুক্তিযোদ্ধা, তাদের সন্তান ও নাতি-নাতনিদের জন্য সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি চালু রাখার ঘোষণা দেন।

নিজেদের যোগ্যতা বৃদ্ধির জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সুযোগ সুবিধা বাড়ানোর দাবি করতে পারে তারা। নিজেদের দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করার জন্য যা যা দরকার তার ব্যবস্থা হওয়ার পরই তাদের কোটা ও চাকরির বিষয়ে ভাবনা আসা উচিত।

২০২৪ সালে পুনরায় আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসীন হয়েছে। যুব শক্তিকে অগ্রাধিকার দিয়ে দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার জন্য শুরু হয়েছে স্মার্ট বাংলাদেশের কর্মসূচি। এজন্য আদালতের বিপক্ষে যারা রাস্তা দখল করে জনগণের ভোগান্তি সৃষ্টি করছে তারা সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ করছে।

কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধির দাবি জানানো প্রথমেই দরকার ছিল। উপরন্তু নিজেদের যোগ্যতা বৃদ্ধির জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সুযোগ সুবিধা বাড়ানোর দাবি করতে পারে তারা। নিজেদের দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করার জন্য যা যা দরকার তার ব্যবস্থা হওয়ার পরই তাদের কোটা ও চাকরির বিষয়ে ভাবনা আসা উচিত। সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বহাল রাখার দাবিতে ‘মুক্তিযোদ্ধা কোটা পুনর্বহাল আন্দোলন’ ব্যানার নিয়ে যৌথভাবে নানা কর্মসূচি চালিয়ে আসছে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড ও বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ।

মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার কারণে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও রাজাকারদের হাতে বাড়িঘর ও পরিবার হারানো মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের পরিবারের জন্য নির্ধারিত কোটার সঠিক বাস্তবায়ন হয়নি। এ কারণে এখনো অনেক মুক্তিযোদ্ধা পরিবার সমাজে পিছিয়ে আছে এবং প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি।

প্রাথমিক বাছাই, লিখিত ও ভাইভা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধা কোটা পূরণ করার জন্য যথেষ্ট প্রার্থী থাকেন। তারপরও কিছু স্বাধীনতাবিরোধী আমলা কোটায় প্রার্থী পাওয়া যাচ্ছে না বলে সুকৌশলে শূন্য পদ দেখিয়ে সাধারণ প্রার্থীদের দিয়ে পদগুলো পূরণ করে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত স্বাধীনতাবিরোধীরা রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকাকালে মুক্তিযোদ্ধা কোটার বাস্তবায়ন করেনি।

বীর মুক্তিযোদ্ধারা দেশ ও জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীদের কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিনিয়ত বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কটূক্তি করে যাচ্ছেন, যা আইনের দৃষ্টিতে সুস্পষ্ট অপরাধ।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও গবেষক


কোটাবিরোধী আন্দোলন   ছাত্র আন্দোলন   ঢাকা   অবরোধ  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন সাধন


Thumbnail

আজ বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস। ১৯৮৭ সালের ১১ জুলাই বিশ্ব জনসংখ্যা প্রায় পাঁচ বিলিয়ন পৌঁছায়। এই দিনটি টেকসই উন্নয়ন, সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং জনসংখ্যা সম্প্রসারণের গতিশীলতার সাথে সম্পর্কিত বিষয়গুলোকে বিশ্বব্যাপী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে। এই দিনটি স্মরণীয় করে রাখার জন্য প্রথম ১৯৯০ সালের ১১ জুলাই ৯০টির বেশি দেশে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস পালিত হয়। এই দিনটি বিশ্ব জনসংখ্যার সমস্যা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে পালিত হয়। এটি পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি এবং শিক্ষার সুযোগ সহ সকল ব্যক্তির জন্য  প্রজনন স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং অধিকার প্রচার করে। দিবসটি লিঙ্গ সমতা ও নারীর ক্ষমতায়নেরও ইঙ্গিত দেয়। টেকসই উন্নয়ন ও বৈশ্বিক সহযোগিতাও প্রচার করা হয়।

বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসের প্রতিপাদ্য প্রতি বছর পরিবর্তিত হয় এবং জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিলের (UNFPA) সাথে সমন্বয় করে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি  (UNDP) দ্বারা নির্ধারিত হয়। এবারের প্রতিপাদ্য “কাউকে ত্যাগ না করি, সবাইকে গণনা করি” (To Leave  No  One Behind, Count Everyone)। বর্তমানে বিশ্বের জনসংখ্যা ৮ বিলিয়নের বেশি। ২০৫০ সালে ৯.৭ বিলিয়ন এবং এই শতাব্দীর শেষে ১০.৪ বিলিয়নে পৌঁছাবে। বিশ্বের জনবহুল ১০টি দেশ হচ্ছে ভারত, চীন ,আমেরিকা, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, নাইজেরিয়া, ব্রাজিল, বাংলাদেশ, রাশিয়া ও ইথোপিয়া।

বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য বিশ্বে যে প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে তা সর্বত্র সমভাবে বণ্টিত নয়। কোথাও সম্পদের আধিক্য রয়েছে আবার কোথাওবা মারাত্মক অপ্রতুল। বাংলাদেশ সীমিত আয়তনের জনবহুল একটি দেশ। বাংলাদেশ প্রাকৃতিক সম্পদে খুব বেশি সমৃদ্ধ না হলেও এদেশে বেশ কিছু সম্পদ রয়েছে যা অনুসন্ধান, আহরণ ও ব্যবস্থাপনার অভাবে জনগণের চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো কৃষিজ সম্পদ, খনিজ সম্পদ, বনজ সম্পদ, মৎস্য সম্পদ, ভূমি সম্পদ, পানি সম্পদ, মানব সম্পদ প্রভৃতি। কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা খাদ্য চাহিদা পূরণের পাশাপাশি নানা ধরনের আর্থ-সামাজিক সূচকসমূহ উন্নয়নে কাজ করে থাকে। কৃষি শ্রমিকের অভাব এবং বর্তমান সময়ের চাহিদার প্রেক্ষিতে কৃষিজ উৎপাদনে যান্ত্রিকীকরণ ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। কৃষি উৎপাদন যাতে ব্যাহত না হয় সে লক্ষ্যে কৃষি সেক্টরে কারিগরি জ্ঞান সম্পন্ন দক্ষ জনবল গড়ে তোলা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৯৮ লাখ ২৮ হাজার ৯১১ জন এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১.২২ শতাংশ (৬ষ্ঠ জনশুমারি ও গৃহগণনা, ২০২২)। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমে যাচ্ছে -১৯৯১ সালে ২.০১ শতাংশ, ২০০১ সালে ১.৫৮ শতাংশ, ২০১১ সালে ১.৮৬ শতাংশ। ২০১১ সালে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৯৭৬ জন করে বসবাস করলেও ২০২২ সালে এসে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১ হাজার ১১৯ জন করে বসবাস করছেন। জনশুমারি অনুযায়ী ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের সংখ্যা ৩ কোটি ১৫ লাখ ৬১ হাজারের বেশি, যা মোট জনসংখ্যার ১৯.১১%। কিশোর-কিশোরীর সংখ্যা ২৮.৬১ %। তরুণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেশি আছে বলে জনমিতির দিক থেকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে। এরাই পোশাক কারখানায় কাজ করে আর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সাহায্য করে, বিদেশে পাড়ি জমায় আর দেশে রেমিট্যান্স পাঠায়। তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তি হিসাবে গড়ে তুলে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কাজে লাগাতে হবে। এ লক্ষ্যে কারিগরী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণকে প্রাধান্য দিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে যারা জড়িত তারা হয়ত বলবেন যে, কারিগরী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। এসব বক্তব্যের সাথে মাঠ পর্যায়ে কোন মিল নেই।

বিশ্বের ১৭৬টি দেশে কাজের উদ্দেশ্যে যাওয়া বাংলাদেশিদের সংখ্যা ১ কোটি ৫৫ লাখ ১৩ হাজার (প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী, জাতীয় সংসদ, সেপ্টেম্বর ২০২৩)। সম্প্রতি জাপান বাংলাদেশ থেকে কৃষিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষ শ্রমিক নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এ লক্ষ্যে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে জাপানের প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। সম্প্রতি ওমান সরকার চিকিৎসক, প্রকৌশলী, নার্স, শিক্ষকসহ ১২ ক্যাটাগরিতে শ্রমবাজার উন্মুক্ত করেছে। ওমানে অদক্ষ জনবল প্রেরণের জন্য সরকার চেষ্টা চালাচ্ছে। বিদেশে কর্মরত অদক্ষ জনবল যে পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠায়, সেই একই সংখ্যক  জনবল দক্ষ হলে রেমিট্যান্সের পরিমাণ কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। বিষয়টি সরকারের কর্তাব্যক্তিদের অনুধাবন করতে হবে এবং কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

দক্ষ জনশক্তি, বিশেষ করে শীর্ষ ও মধ্য পর্যায়ের ব্যবস্থাপকের চাহিদা পূরণে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ২০২১-২২ অর্থবছরে ১৫ হাজার ১২৮ বিদেশির ওয়ার্ক পারমিট অনুমোদন দেয়। এটি আগের বছরের তুলনায় ৮৭ দশমিক ৩২ শতাংশ বেশি। বিডা ছাড়া আরো অনেকগুলো সংস্থা বিদেশিদের ওয়ার্ক পারমিট দিয়ে থাকে। শিল্প-বাণিজ্যের প্রসারের ফলে বাংলাদেশে বিদেশি কর্মীর সংখ্যা বেড়েছে। অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা প্রয়োজনীয় দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে যে ব্যর্থ তা এর মাধ্যমে ফুটে উঠে। টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস সেক্টরে ভারত, পাকিস্তান, তুরস্ক, তাইওয়ান ও জাপানের অনেক নাগরিক বাংলাদেশে দক্ষ কর্মীর চাহিদা মেটাচ্ছেন। দেশের উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর দেশের এবং বিদেশের চাহিদার  আলোকে দক্ষ কর্মী গড়ে তোলার কোন উদ্যোগ নেই এবং এক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ব্যর্থ।

প্রাকৃতিক গ্যাস শক্তি সম্পদের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। যা দেশের মোট বাণিজ্যিক জ্বালানি ব্যবহারের শতকরা ৭১ ভাগ পূরণ করে। দেশের মূল ভূখণ্ডে এ পর্যন্ত ২৯টি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী এসব গ্যাস ক্ষেত্রে মোট মজুতের পরিমাণ ৩০.৮৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। সেখান থেকে এতদিন পর্যন্ত ১৯.৯৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুটের  বেশি গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে। বড় ধরনের মজুদ পাওয়া না গেলে আগামী আট থেকে ১০ বছরের মধ্যে দেশের গ্যাস ফুরিয়ে যাবে। যা দেশে শক্তি সম্পদের ভয়াবহ সংকট সৃষ্টি করবে এবং জনজীবনে নেমে আসবে অভাবনীয় দুর্ভোগ। বাংলাদেশে প্রাপ্ত গ্যাস অত্যন্ত উৎকৃষ্টমানের  কারণ এতে মিথেনের পরিমাণ প্রায় ৯৪-৯৯% হওয়ায়  পরিশোধন ছাড়াই এই গ্যাস ব্যবহার করা যায়।

দেশের ৫টি খনিতে ৭ হাজার ৮২৩ মিলিয়ন টন কয়লা মজুদ রয়েছে, যা ২০০ ট্রিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাসের মজুদের সমান। এই কয়লা উত্তোলন করতে পারলে অন্তত ৫০ বছরের জ্বালানি নিশ্চিত হবে। দেশের কয়লা উন্নত মানের বিধায় বায়ু দূষণের মাত্রা আমদানীকৃত নিম্নমানের কয়লার চেয়ে অনেক কম হবে। যা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য সুফল বয়ে আনবে এবং বিপুল অংকের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১০ দশমিক ১২ মিলিয়ন টন কয়লা আমদানি করা হয়েছে এবং এতে খরচ হয়েছে ৭০ কোটি ডলার। এ অবস্থায় ২০৩০ সালে আমদানির পরিমাণ দাঁড়াবে ২৭ দশমিক ২ মিলিয়ন টন এবং ২০৪১ সালে হবে ৭১ দশমিক ২ মিলিয়ন টন। কয়লার বর্ধিত চাহিদা, আমদানীকৃত নিম্নমানের কয়লা সৃষ্ট পরিবেশ দূষণ এবং বিপুল অংকের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে দেশের কয়লা উত্তোলনের উদ্যোগ করা প্রয়োজন।

আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মধ্যে সমুদ্রসীমা বিরোধের ২০১২ সালের ১৪ মার্চ এবং স্থায়ী সালিশি আদালতে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে সমুদ্রসীমা বিরোধের ২০১৪ সালের ৭ জুলাই রায়ের ফলে বাংলাদেশ এক লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র অঞ্চল, সেন্ট মার্টিনস দ্বীপে ১২ নটিক্যাল মাইলের রাষ্ট্রাধীন সমুদ্র, ২০০ নটিক্যাল  মাইল পর্যন্ত একচ্ছ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপনে অবস্থিত সব প্রাণিজ ও খনিজ সম্পদের ওপর সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। দেশের বিশাল সমুদ্র এলাকায় গ্যাস ও তেল পাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকা সত্তে¦ও দীর্ঘ এক দশকেও গ্যাস ও তেল অনুসন্ধানে কার্যকর কোন উদ্যোগ করা হয়নি। দেশের শক্তি সম্পদের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে যত দ্রুত সম্ভব সমুদ্রে অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করা অত্যাবশ্যক।

দেশের প্রাকৃতিক পানি সম্পদের উপর রাষ্ট্রের প্রত্যেক নাগরিকের সমঅধিকার রয়েছে। সমাজের কতিপয় ব্যক্তির কার্যক্রম দ্বারা নাগরিকদের এই অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে। একজন শিল্প উদ্যোক্তা শিল্পকারখানায় ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করে অপরিশোধিত বর্জ্য নিকটবর্তী পানি প্রবাহে ফেলে দিচ্ছে এবং ভূউপরিস্থ পানি দূষিত করছে। পয়:বর্জ্য পরিশোধনের দায়িত্বে নিয়োজিত সংস্থা অপরিশোধিত পয়:বর্জ্য পানি প্রবাহে ফেলে দিচ্ছে এবং ভূউপরিস্থ পানি দূষিত করছে। 

বাংলাদেশে নিরাপদ পানির উৎস হচ্ছে ভ’উপরিস্থ মিঠা পানি এবং ভূগর্ভস্থ পানি। নদীমাতৃক এদেশে রয়েছে অসংখ্য নদী, খাল, বিল, হাওর, জলাশয়। এদেশের ভূমি গঠন থেকে সভ্যতা, সংস্কৃতি, কৃষি, যোগাযোগ-সব কিছুই প্রধানত নদীনির্ভর। নদী হচ্ছে আমাদের দেশের প্রাণ। নদীর সঙ্গেই আবর্তিত এই ভূখণ্ডের সভ্যতার ইতিহাস। নদীর তীরে তীরে মানুষের বসতি, কৃষির পত্তন, গ্রাম, নগর, বন্দর, সম্পদ, সমৃদ্ধি, শিল্প-সাহিত্য, ধর্ম-কর্ম সব কিছুর বিকাশ। বাংলাদেশের নদ-নদীর সংখ্যা অগণিত হলেও কোনটাই বিচ্ছিন্ন নয়। একে অন্যের সাথে প্রাকৃতিক নিয়মে সুশৃঙ্খলভাবে সংযোজিত। 

পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র রক্ষা এবং খাবার পানি সরবরাহ, নৌ চলাচল, কৃষি ও শিল্প উৎপাদনে নদীর গুরুত্ব অপরিসীম। এদেশে রয়েছে ছোট বড় ৪০৫টি নদী। এর মধ্যে অভিন্ন নদীর সংখ্যা ৫৭টি। ৫৪টি ভারতের এবং ৩টি মিয়ানমারের সাথে সংশ্লিষ্ট। দেশের নদীগুলোর ৪৮টি সীমান্ত নদী, ১৫৭টি বারোমাসি নদী, ২৪৮টি মৌসুমি নদী। মানুষের অত্যাচারে নদীগুলো আজ মৃতপ্রায়। দখল, ভরাট, আর বর্জ্যে নদীগুলো এখন নিস্তব্ধ স্রোতহীন এবং দূষণের ভারে পানি ব্যবহারের অযোগ্য এবং জীববৈচিত্র শূন্য হয়ে পড়ছে।

ভাটির দেশ হিসাবে অভিন্ন  নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা না পাওয়ায় উত্তরাঞ্চলের নদীসমূহ শুষ্ক বালুচরে পরিণত হচ্ছে, দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিদ্যমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে।। নদীতে পানি কমে যাওয়া বা না থাকায় ভূগর্ভস্থ পানির উপর নির্ভরশীলতা ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানি নির্বিচারে উত্তোলন এবং শুষ্ক মৌসুমে নদী শুকিয়ে যাওয়ার কারণে ভূগর্ভস্থ পানির ¯তর প্রতিনিয়ত নিচে নেমে যাচ্ছে। খরা মৌসুমে সেচ ও রাসায়নিক সার  নির্ভর ধান চাষের ফলে ভূউপরিথ’ ও ভূগর্ভস্থ পানি সংকট তীব্রতর হচ্ছে। ভূউপরিথ’ ও ভূগর্ভস্থ পানি সংকট মোকাবেলায় আমাদেরকে প্রকৃতি নির্ভর ধান চাষে গবেষণা জোরদার এবং গবেষণালব্ধ ফলাফল মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন করতে হবে।

উজানে বাঁধ নির্মাণসহ পানি প্রত্যাহার ছাড়াও অপরিকল্পিতভাবে নির্মাণ করা হচ্ছে রাস্তাঘাট ও সেতু। যমুনা, মেঘনা-গোমতি, কর্ণফুলি নদীতে সেতু নির্মাণের ফলে প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে উজানে চর পড়ছে, ভাটিতে পানি প্রবাহ কমে যাচ্ছে। পদ্মা নদীতে নির্মাণাধীন সেতুও একই ধরনের প্রভাব ফেলবে। মেঘনা নদীর ওপর শরীয়তপুর-চাঁদপুর এবং গজারিয়া-মুন্সীগঞ্জ সড়কে সেতু নির্মাণে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনা এবং মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হচ্ছে। দেশের বড় বড় নদীতে পিলার বিশিষ্ট সেতু নির্মাণ করা হলে তা শুধুমাত্র নদীর প্রবাহ বাধাগ্রস্ত ও হ্রাস এবং চর পাড়াকে ত্বরান্বিত করবে না। তা জীববৈচিত্র্যকেও হুমকির মুখে ফেলবে। দেশের নদীগুলো প্রচুর পরিমাণে পলি বহন করায় এসব নদীতে পিলারসমৃদ্ধ ব্রিজের স্থলে ঝুলন্ত ব্রিজ বা টানেল নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। 

বাংলাদেশ বর্ষা মৌসুমে ব্যাপক পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে এবং শুষ্ক মৌসুমে পানি ঘাটতির অভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। শুষ্ক মৌসুমে কৃষি কাজে ভ’উপরিস্থ পানির মাধ্যমে পরিচালিত সেচ ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। ফলে বিপুল জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদা পূরণে সেচ কাজে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করতে হচ্ছে। অতিমাত্রায় ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে নেমে যাচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর, পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে, বাড়ছে ঝুঁকি। কোন কোন এলাকায় সুপেয় পানির সংকট দেখা দিয়েছে। উপকূলীয় এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানিতে লবণ পানির অনুপ্রবেশ ঘটে চলেছে। ভূগর্ভে কৃত্রিম রিচার্জ এবং কৃষি কাজে পানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া প্রতিরোধ করা যেতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সাথে পানি প্রাপ্তি আরও জটিল হয়ে উঠবে। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে এই মূল্যবান সম্পদকে টেকসইভাবে পরিচালনা করতে হবে। পানি সাশ্রয় করা আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব এবং পানি সাশ্রয়ের অনেক উপায় রয়েছে। গোসলখানায় দীর্ঘক্ষণ ঝর্না ব্যবহার না করা, দাঁত ব্রাশ ও সেভিং করার সময় কল ছেড়ে না রাখা বরং মগ বা গ্লাসে পানি ব্যবহার করা। অল্প জামাকাপড় না ধুয়ে বেশি করে জামাকাপড় এক সঙ্গে ধোয়া। সব সময় মনে রাখতে হবে এক ফোঁটা পানি মূল্যবান। আসুন প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে পানি সংরক্ষণ করি।


বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

কেমন কাটলো সরকারের প্রথম ৬ মাস


Thumbnail

এ বছর ৭ জানুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে দার্শনিক রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে এবং ১১ জানুয়ারী তারা মন্ত্রী সভা গঠন করে এবং শপথ গ্রহণ করে। সুতরাং সেই হিসাবে বর্তমান সরকারের ৬ মাস পার হয়েছে। আওয়ামী লীগ এবার সরকার গঠন করল তখন দেশের জিনিসপত্রের দাম অনেক আকাশচুম্বী এবং এর প্রধান বা একমাত্র কারণ হচ্ছে যে আন্তর্জাতিকভাবে যুদ্ধবিগ্রহের কারণে ডলারের দাম বৃদ্ধি। 

তাছাড়া আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ কিছু কারণও আছে। সেটা হচ্ছে ফড়িয়ারা বা মজুদদার। অর্থাৎ কৃষক যে দাম পায় আর আমরা যে দামে কিনি এর ভিতরে কোনও সামঞ্জস্যতা নেই। কৃষক যে দামে বিক্রি করে আর আমরা যে দামে কিনি তার মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য। 

এতে কাউকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। তবুও আমি বলব যে ৬ মাস সরকার সবকিছু সামাল দিয়ে, বিশেষ করে আন্তর্জাতিকভাবে দার্শনিক শেখ হাসিনা বিভিন্ন দেশে যাচ্ছেন এবং সেই দেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক একটি সম্পর্ক এবং এর একটি মাল্টিল্যাটারাল যে পরিধি আছে সেটা তিনি স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছেন।

কয়েকদিন আগে জাপানের একটি পত্রিকায় দেখেছিলাম দুটি আমের দাম ৫ হাজার ডলার। সেটা আমাদের দেশের একজন কৃষক ছাদে লাগিয়েছে। এবং আশা করছে এ দুটি আমের জন্য সে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত পাবে। এখানে দেখার বিষয় লাখ টাকার দুইটি আম নিজেরা চাষ করে যদি মাত্র ২ হাজার টাকায় আনতে পারে তাহলে এ আমের চাষ আমাদের দেশে করা সম্ভব।  

কিন্তু আমাদের সমস্যা হচ্ছে আমরা কৃষকদের সম্মান জানাতে হবে। আমাদের কৃষিবিদ এবং কৃষি গবেষণা ক্ষেত্রে যারা কাজ করে তাদের অবশ্যই আমাদের ধন্যবাদ দেয়া উচিত। কারণ আমাদের চাষ যোগ্য জমি কমে গেলেও খাদ্য উৎপাদন করে আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে। আমাদের স্মার্ট বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন স্মার্ট কৃষি ব্যবস্থা। কারণ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে মানুষের নাভিশ্বাস অবস্থা। তাই দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ করতে আমাদের কৃষির দিকে আরো নজর দিতে হবে। 

দেশের থেকে অনেক টাকা পাচার হয়েছে। কিন্তু এটাতো বাস্তব এই টাকা একদিনে যায়নি। সেই বিএনপির আমল থেকে শুরু করে অর্থ পাচার শুরু হয়েছিলো। তাহলে এই যে, দুদক বা অন্যান্য সংস্থা এরা কি কাজ করলো। তবে দার্শনিক রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনাকে এব্যাপারে ধন্যবাদ জানাতে হয় কারণ এই সময় এসে তিনি দুর্নীতি এবং অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে শুরু করলেন। 

সম্প্রতি দেশে কোটা নিয়ে ছাত্রদের আন্দোলন চলছে। ছাত্ররা রাস্তাঘাট সব বন্ধ করে দিচ্ছে। তবে এতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী খুবই ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে। কিন্তু এই ছাত্রদের অবরোধের দোহাই দিয়ে যদি ব্যবসায়ীরা দ্রব্যমূল্যের দাম আবার বাড়িয়ে দেয় তাহলেও আমাদের মানুষ তা কিনবে। 

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। কারণ আমাদের সমাজ ঘুণে ধরে গিয়েছে। এখানে কথায় আমলা বা রাজনীতিবিদদের দোষ দিয়ে কোন সমাধান সম্ভব নয়। সব দেশেই আমলাতন্ত্র সুযোগ পেলে সুযোগ গ্রহণ করে এবং দেখা যায় তার বিচারও হয়। কিন্তু একটি ব্যবস্থা যদি গঠন করা যায় যে, তুমি চুরি করলে তোমার রেহাই নেয়। এবং একবার চোর প্রমাণ হলে তাকে বিচারের সম্মুখীন হতেই হবে তাহলে তা কমে যাবে। আর সেটিই দার্শনিক রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা শুরু করেছেন। আমি আগামী দিনগুলোতে চাইবো আমাদের ঘুণে ধরা সমাজকে মেরামত করা। এবং সকলে মিলে যদি কোন আবেগে না জড়িয়ে দেশের জন্য কাজ করি তাহলেই দেশ এগিয়ে যাবে। 


সরকার   ৬ মাস   দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি  


মন্তব্য করুন


বিজ্ঞাপন