ইনসাইড থট

‘৭ নভেম্বর ষড়যন্ত্রকারী এবং হত্যাকারীকে ঘৃণা দিবস’


Thumbnail

আজ ৭ নভেম্বর। এই দিনিটি এলেই ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের দিনটির কথা মনে পরে। ১৫ আগস্ট সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশে যে হত্যা, ক্যু, ষড়যন্ত্রের ঘটনাপ্রবাহ শুরু হয়েছিল ৭ নভেম্বর তারই ধারাবাহিকতা মাত্র।

আমার মতে জিয়াউর রহমান ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী একজন খুনি। তিনি ছিলেন একজন মেধাবী বিশ্বাসঘাতক। খুনি এবং বিশ্বাসঘাতকের আগে মেধাবী বলছি কারণ তিনি দেশকে ধ্বংস করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার দারুণ একটি রোডম্যাপ তৈরি করেছিলেন এবং সেটি তিনি বাস্তবায়নও করতে পেরেছিলেন।

৭৫’এর ১৫ আগস্ট তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করেছেন এবং এর তিন মাসেরও কমসময়ের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বীর সেনানী ও চার জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, এএইচএম কামারুজ্জামান এবং ক্যাপ্টেন মনসুর আলীকে এই দিনে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যন্তরে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। যারা তার কোন প্রতিপক্ষ হতে পারে তাদের সবাইকে তিনি খুব নিখুঁতভাবে নির্মূল করলেন। এই হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের রক্তাক্ত ইতিহাসে আরেকটি টার্নিং পয়েন্ট।

এরপর আসে ৭ নভেম্বর। বীর মুক্তিযোদ্ধা ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ, বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল হুদা, বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল হায়দারসহ বহু সৈনিক ও অফিসারকে হত্যা করা হয়। বহু সৈনিক ও অফিসারদের লাশের ওপর দাঁড়িয়ে এইদিন অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে জিয়াউর রহমান। পরবর্তী সময়ে এই হত্যার রাজনীতির মধ্য দিয়েই বিএনপি নামক দলটির জন্ম হয়।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যার পর বাংলাদেশে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছিল। সেনাবাহিনীর মধ্যে চেইন অব কমান্ড বলতে কিছুই ছিল না। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের উৎখাত করার লক্ষ্যে ৩ নভেম্বর সেনাবাহিনীতে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে একটি অভ্যুত্থান হয়; এবং অভ্যুত্থানে তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে আটক করা হয়। কিন্তু তার আগেই মোশতাক-জিয়া চক্র বুঝতে পারে তাদের ক্ষমতা ধরে রাখা কঠিন হবে, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ক্ষমতায় এলে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের জাতীয় চার নেতাই বাংলাদেশে নেতৃত্ব দেবে। সে আশঙ্কা থেকে ৩ নভেম্বর অভ্যুত্থানের আগের রাতেই মীরজাফর মোশতাক গং জিয়া-ফারুক-রশিদরা রাতের অন্ধকারে মানব সভ্যতার ইতিহাসের আরেক জঘন্যতম বর্বর হত্যাকাণ্ড ঘটায়।

৩ নভেম্বর অভ্যুত্থানের পর খালেদ মোশাররফ সেনাপ্রধান হয়ে খন্দকার মোশতাককে গ্রেপ্তার করেন। অবস্থা বেগতিক বুঝে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী ফারুক-রশিদ-ডালিমরা থাইল্যান্ডে পালিয়ে যায়। কিন্তু জাসদ ও তাদের নেতা কর্নেল তাহেরের হঠকারী সিন্ধান্তে ৭ নভেম্বর এক পাল্টা অভ্যুত্থানে জিয়াকে মুক্ত করে।

হত্যা করা হয় সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফ, সেক্টর কমান্ডার এটিএম হায়দার ও সাব-সেক্টর কমান্ডার খন্দকার নাজমুল হুদাকে। বাংলাদেশে স্বাধীনতা যুদ্ধে একজন সেক্টর কমান্ডারও নিহত হননি। অথচ ৭ নভেম্বর অভ্যুত্থানে শেরেবাংলা নগরে ১০ম বেঙ্গল রেজিমেন্টে দুজন সেক্টর কমান্ডার, একজন সাব কমান্ডার ও ১৩ সেনা কর্মতর্তা নিহত হন। কে বন্ধু আর কে শত্রু সেটি তিনি কখনও বিবেচনা করতেন না। যাকে তিনি তার পথের কাঁটা মনে করতেন তাকেই তিনি হত্যা করেছেন। আমি সিসিলি, কলোম্বিয়ার মাফিয়াদের ইতিহাস পড়েছি। আমার কাছে মনে হয়েছে মাফিয়ারা জিয়াউর রহমানের কাছে শিশু। জিয়াউর রহমান যেভাবে কখনও পর্দার আড়ালে আবার কখনও পর্দার সামনে থেকেই ঠাণ্ডা মাথায় হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে সেটি মাফিয়াদের পক্ষেও সম্ভব না। হত্যা এবং ষড়যন্ত্রের নতুন পন্থা তিনি আবিষ্কার করেছিলেন।

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনাবলিতে রাষ্ট্র ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসেন জিয়াউর রহমান। পরে জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপি দিনটিকে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি’ দিবস হিসেবে পালন করে থাকে। আবার সেদিনের অভ্যুত্থানের অন্যতম অনুঘটক রাজনৈতিক দল জাসদের চোখে দিনটি ‘সিপাহি বিপ্লব দিবস’। কিন্তু যারা সত্যি ইতিহাস জানে এবং যারা ইতিহাসকে অস্বীকার করে না তাদের কাছে এই দিনটি ষড়যন্ত্রকারী এবং হত্যাকারীকে ঘৃণা দিবস হিসেবেই পালন করবে।



মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

সিডেশনে মৃত্যু : করণীয় কি?


Thumbnail

সুন্নতি খৎনা ও এন্ডোস্কোপি করতে যেয়ে গত দেড় মাসে খোদ ঢাকা শহরে মারা গেছে তিনজন। অনেকে বলছেন, খৎনায় মৃত্যু, এন্ডোস্কোপিতে মৃত্যু, গ্যাপ কোথায়? এ ব্যাপারে আমার মতামত হচ্ছে, হাসপাতাল গুলোতে সিডেশন গাইডলাইন না থাকাটাই একটি বড় গ্যাপ।

ঢাকা শহরে কয়টি হাসপাতালে সিডেশন গাইডলাইন রয়েছে? দুয়েকটি হাসপাতালে থাকলেও সেখানে সে গাইডলাইন মানা হয় কিনা? 'সিডেশন' হচ্ছে, রোগীর শিরাপথ দিয়ে ঘুম পাড়ানোর ব্যবস্থা করা। সেই ঘুম মানে এনেসথেসিয়া নয়। তাই এ সব সিডেশনের জন্য এনেস্থেটিস্ট এর উপস্থিতি বাধ্যতামূলক নয়। তবে থাকলে ভাল, নিরাপদ।

সিডেশন যে কোন রেজিস্টার্ড চিকিৎসক দিতে পারে, তবে সেটা গাইডলাইন মেনে দিতে হয় । তিনি কি কি ওষুধ কতটুকু প্রয়োগ করতে পারবেন, কোথায় থাকে থামতে হবে সেটি গাইড লাইনে উল্লেখ থাকা প্রয়োজন। যিনি সিডেশন দেন, তাকে বেসিক লাইফ সাপোর্ট জানতে হয়। শুধু জানাটাই যথেষ্ট নয়। বেসিক লাইফ সাপোর্ট প্র্যাক্টিসটি তার রপ্ত রাখা প্রয়োজন। যেখানে গাইডলাইন নেই, সেখানে এ সব মানার সুযোগ কোথায়?   

এনেসথেসিয়ার  অভিধানে 'একটু সিডেশন' বা 'একটু এনেসথেসিয়া' নামে কোন শব্দ নেই। কারণ জীবনটা তো ‘একটু’ নয়। জীবন যার বা যাদের যায়, তারা এর মর্ম বোঝে। 'একটু সিডেশন' দিতে যেয়ে মৃত্যুর দায় কেউ এড়াতে পারে না।

উন্নত বিশ্বে এ ধরণের কোন ঘটনা ঘটলে পরবর্তী কয়েক মাসের মধ্যে সমগ্র দেশের জন্য একটি অবশ্য পালনীয় গাইড লাইন তৈরী হয়ে যায়। আশাকরি আমাদের বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী এমন একটি উদ্যোগ নিবেন, যেটি কার্যকর হতে পারে আগামী সর্বোচ্চ তিন মাসের মধ্যে।

এনেসথেসিয়া সোসাইটিকে অনুরোধ করব, গাইডলাইন তৈরীতে মাননীয় মন্ত্রীকে সহায়তা করুন। সেটি না করলে দিয়ে সিডেশন দিয়ে খৎনা বা এন্ডোস্কোপি করার রোগী দেশে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। সে সব রোগীদের তখন পাওয়া যাবে বেনাপোল সীমান্তে বা এয়ার ইন্ডিয়ার চেক ইন কাউন্টারে।

লেখকঃ ব্রুনাই প্রবাসী এনেস্থেটিস্ট


সুন্নতি খৎনা   এন্ডোস্কোপি   এনেসথেসিয়া সোসাইটি  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

'কুই' ভাষা কই?


Thumbnail

দেশে মাত্র চারজন বয়স্ক লোক এখন 'কুই' ভাষায় কথা বলে। এদের  মৃত্যুর সাথে সাথে দেশ থেকে এ ভাষার মৃত্যু হবে। মার্তৃভাষার দাবিতে যে দেশের সূর্যসন্তানেরা আত্মাহুতি দিয়েছেন, সে দেশে অযত্ন, অবহেলায় একটি ভাষার মৃত্যু কোন ভাবে মেনে নেয়া যায় না।

বলছিলাম 'কুই' ভাষার কথা। এটি বাংলাদেশে বসবাসকারী একটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী  'কন্দ' সম্প্রদায়ের ভাষা। দেশে প্রায় পাঁচ হাজার লোক এ সম্প্রদায়ের। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এরা বাংলাদেশে বসবাস শুরু করে। এদের আদিনিবাস ভারতের উড়িষ্যা রাজ্য। সে সময় কন্দরা চা ও রেল শ্রমিক হিসাবে এদেশে আসে। পরে তারা চা শ্রমিক হিসাবে এদেশে বসবাস শুরু করে। বর্তমানে এদের বসবাস মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার হরিণছড়া, উদনাছড়া, পুটিয়া ও লাখাউড়ায় এবং কমলগঞ্জ উপজেলার কুড়মাছরা চা বাগানে। ধীরে ধীরে মার্তৃভাষা ভুলে যায়, বাংলা শিখে যায়। এখন তারা বাংলা অথবা উড়িয়া ভাষায় কথা বলে। শুধুমাত্র চারজন প্রবীণ ব্যাক্তি এখন এ ভাষায় কথা বলে। 'কুই' ভাষায় কথা বলার মানুষ পাওয়া যায় না বলে এরা একা একাই 'কুই' ভাষায় কথা কয় (বলে)। এই চার জনের মৃত্যু হলে এদেশ থেকে 'কুই' ভাষা উধাও হয়ে যাবে। তখন 'কুই' ভাষা শুনতে উড়িষ্যা যেতে হবে।  

'কুই' ভাষার অস্তিত্ব রয়েছে ভারতের উড়িষ্যা রাজ্যে। সেখানে প্রায় সাড়ে নয় লাখ 'কন্দ' সম্প্রদায়ের লোক 'কুই' ভাষায় কথা বলে। এদের নিজস্ব কোন বর্ণমালা নেই। 'কুই' ভাষা বিহারে 'দেবনাগরী' লিপিতে ও উড়িষ্যায় 'উড়িয়া' লিপিতে লেখা হয়। ইন্দোনেশিয়ার তিমুর এলাকার কিছু ছিটমহলবাসী 'কুই' ভাষায় কথা বলে। তবে ইন্দোনেশিয়ার 'কুই' ভাষা ও উড়িষ্যার 'কুই' ভাষা পরিপূর্ণভাবে ভিন্ন, কোথাও কোন মিল নেই। তিমুরের ভাষা কে 'কুই' ভাষায় 'মাসিন লাক' বলা হয়।

লাইফ সাপোর্টে থাকা 'কুই' ভাষাটির অস্তিত্ব বজায় রাখতে সরকারি উদ্যোগ ও পরিকল্পনা অত্যাবশ্যক। বাড়িতে নিজেদের মধ্যে মার্তৃভাষার প্রচলন বাড়ানোর জন্য ‘গৃহ ভাষার বিকাশ’ নামের কোনো কর্মসূচি নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে দেশের ভাষা গবেষকরা। 'কন্দ' অধ্যুষিত মৌলভীবাজার জেলায় এ কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে দেশে অবস্থানরত 'কুই' ভাষাভাষী চারজন, বা প্রয়োজনে উড়িষ্যা থেকে শিক্ষক আনা যেতে পারে। মোদ্দাকথা, লাইফ সাপোর্টে থাকা 'কুই' ভাষাকে বাঁচানো প্রয়োজন।  নতুবা, মার্তৃভাষার দাবিতে জীবনদানকারীদের দেশ থেকে একটি মার্তৃ ভাষার মৃত্যু হলে বায়ান্নর একুশের শহীদদের আত্মা শান্তি পাবে না। এবারের একুশের প্রত্যয় হোক, দেশের সকল মার্তৃভাষা বেঁচে থাকুক। 

লেখক: প্রবাসী চিকিৎসক, কলামিস্ট  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

আমাদের নতুন স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাই

প্রকাশ: ১২:০০ পিএম, ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪


Thumbnail

আমাদের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে সবচেয়ে নিবেদিতপ্রাণ ও একজন সৎ ব্যক্তিকে বেছে নিয়েছেন। আমরা সকল জনস্বাস্থ্য পেশাদার এবং সহায়তা গোষ্ঠী আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে স্বাগত জানাই এবং আসুন আমরা কোনো স্বার্থ ছাড়াই সকল প্রকার সহায়তার হাত বাড়াই। কয়েক দশক ধরে বড় সাফল্যের সাথে বাংলাদেশে একটি চিত্তাকর্ষক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছে – স্বাস্থ্যসেবা পরিষেবাগুলি এখন মাঠ পথের সম্প্রদায় থেকে সর্বোচ্চ স্তরের এমনকি তৃতীয় স্তর পর্যন্ত সকলের জন্য আজ উপভোগ করা সম্ভব।  সরকারি, অলাভজনক বেসরকারি সংস্থা এবং ক্রমবর্ধমান বেসরকারি সব খাতই আজ বাংলাদেশের জনগণের জন্য স্বাস্থ্যসেবা পরিষেবা উপলব্ধ করতে অবদান রাখছে। বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবার প্রাপ্যতা, ক্রয়ক্ষমতা এবং মান উন্নত হওয়ার সাথে সাথে, আজ (২০২০ সালের পরিসংখ্যান), বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারী গড় ব্যক্তি ৭২ বছরেরও বেশি বয়সে বেঁচে থাকার আশা করতে পারেন, যা ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশি - এই ক্রমবর্ধমান আয়ুর একক সূচক বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য উন্নত মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা পরিষেবার প্রমাণ প্রদান করে।

জনস্বাস্থ্যের ইতিহাস অনেক ঐতিহাসিক ধারণা, পথ এবং ত্রুটি, মৌলিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং মহামারীবিদ্যার বিকাশ থেকে উদ্ভূত। সমস্ত সমাজকে অবশ্যই রোগ এবং মৃত্যুর বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে এবং তাদের কার্যকরভাবে পরিচালনা করার জন্য ধারণা এবং পদ্ধতিগুলি বিকাশ করতে হবে। এই কৌশলগুলি বৈজ্ঞানিক জ্ঞান এবং পথ এবং ত্রুটি থেকে বিকশিত হয়, তবে সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক অবস্থা, বিশ্বাস এবং অনুশীলনের সাথে জড়িত যা স্বাস্থ্যের অবস্থা এবং স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য প্রতিরোধমূলক এবং নিরাময়মূলক হস্তক্ষেপ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, স্বাস্থ্যের উন্নতি বজায় রাখার জন্য, আমাদের অতীত এবং বর্তমান কৌশলগুলি বিশ্লেষণ করতে হবে এবং সাফল্য এবং ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিতে হবে। আমাদের স্বাস্থ্য পরিবর্তনগুলি বুঝতে হবে এবং পরিবর্তনশীল পরিবেশ এবং রোগ মূল্যায়নের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে। বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী জনস্বাস্থ্য নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মানুষ আজ তাদের অধিকার এবং তাদের নিজস্ব স্বাস্থ্য সম্পর্কে আরও সচেতন। শুধুমাত্র সমস্যা নয়, সাধারন মানুষ সমাধানের অংশ হতে চায়। ক্রমবর্ধমান পরিবর্তিত পরিবেশ এবং পরিবর্তনগুলি উপলব্ধি করে আমাদের স্বাস্থ্যসেবা পরিষেবার পুনর্বিবেচনা এবং সংস্কার করা দরকার। এই ধরনের সংস্কার ও প্রস্তুতি আগামীকালের জন্য অপেক্ষা না করে আজ থেকে শুরু করতে হবে। আসুন আমরা বাংলাদেশ সহ বিশ্বব্যাপী ঘটতে থাকা চলমান পরিবর্তনগুলির নিয়ে কিছু আলোচনা করি।

১.    মহামারী ও রোগের স্থানান্তর (epidemiological transition):  প্রতিটি দেশই সংক্রামক রোগ থেকে অসংক্রামক রোগে মহামারী সংক্রান্ত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। উন্নত পুষ্টি, আবাসন, পানি ও স্যানিটেশন, সফল টিকাদানের মত কর্মসূচির পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ থাকার কারনে কলেরা, টিবি, ম্যালেরিয়া, এইচআইভির মতো রোগে কম মানুষ মারা যাচ্ছে। তবে সামাজিক রীতিনীতি ভেঙ্গে পড়া, পরিবর্তিত খাদ্যাভ্যাস, বসে থাকা জীবন এবং ব্যায়ামের অভাব আর জীবনধারা/জীবনযাত্রার পরিবর্তনের ফলে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যান্সারের মতো অসংক্রামক রোগ ক্রমবর্ধমানভাবে বাড়ছে। সর্বশেষ বিশ্লেষণ অনুসারে বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর ৬০% এরও বেশি আজ অসংক্রামক রোগের কারণে। এগুলি দীর্ঘস্থায়ী রোগ। তাই তথ্য প্রদান, আচরণ পরিবর্তন এবং দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করা কঠিন এবং অনেক বেশি ব্যয়বহুল, যা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপর চাপ সৃষ্টি করছে।

২.    জনসংখ্যাগত পরিবর্তন: একদিকে ভৌগোলিকভাবে ছোট দেশ বাংলাদেশের বিশাল এবং ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা শিক্ষা, অর্থনৈতিক সুযোগ, চাকরি এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের জন্য চ্যালেঞ্জ আরোপ করছে। অন্যদিকে, উদাহরণস্বরূপ, সফল নারী শিক্ষা এবং ক্ষমতায়ন, ক্রয় ক্ষমতা বৃদ্ধির সাথে অত্যন্ত সফল মানের পরিবার পরিকল্পনা পরিষেবার কারণে বাংলাদেশের মোট জন্মের হার (total fertility rate) জনসংখ্যা প্রতিস্থাপন স্তরের নীচে নেমে আসছে, যা বাংলাদেশে ৬ থেকে বর্তমানে ১.৯ পর্যন্ত নেমে এসেছে। এই হ্রাস অব্যাহত থাকায়, নির্ভরশীলতার অনুপাত বাড়ছে, কারণ কাজের বয়সের জনসংখ্যার অনুপাতের অনুপাত হ্রাস পেতে শুরু করেছে এবং আয়ু বৃদ্ধির সাথে সাথে বয়স্ক ব্যক্তিদের সংখ্যা বাড়ছে, বয়স্কদের যত্ন পরিষেবার প্রয়োজনীয়তাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। যাইহোক, বাংলাদেশে এখনও একটি বৃহৎ তরুণ জনসংখ্যা রয়েছে, বাংলাদেশের শিশু ও যুবকদের সুস্থ রাখার আর দক্ষতা উন্নতির মাধ্যমে জনসংখ্যাগত লভ্যাংশের সুবিধা নেওয়ার সুযোগ এখনও রয়েছে। এই তরুণ ও সুস্থ প্রজন্মের জনসংখ্যা আর্থ-সামাজিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদানে রাখতে সক্ষম এবং প্রয়োজন।

৩.    অভিবাসন: চাকরি, অর্থনৈতিক সুযোগ, বিভিন্ন উন্নত সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার কারণে অনেক মানুষ স্থায়ীভাবে বা অস্থায়ীভাবে গ্রাম থেকে শহরাঞ্চলে অভিবাসন করছে। ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনও এই জনসংখ্যার অভিবাসনকে আরো বাড়িয়ে তুলবে। শহুরে অস্বাস্থ্যকর বস্তির জনসংখ্যা বাড়ছে। উপযুক্ত আবাসন, নিরাপদ পানীয় জল, স্যানিটেশন এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠছে। নগর স্বাস্থ্য সেবা অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব হয়ে উঠছে। তার উপরে বিভিন্ন সেক্টর এবং মন্ত্রীদের মধ্যে সমন্বয় চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠছে। আমাদের উপলব্ধি করতে হবে এই ভাসমান জনসংখ্যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। তাই তাদের স্বাস্থ্য বজায় রাখা কঠিন হলেও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক অভিবাসী শ্রমিক রয়েছে যাদের হয়তো স্বাগতিক দেশের স্বাস্থ্যসেবা পরিষেবাগুলিতে পর্যাপ্ত অ্যাক্সেস নেই এবং প্রায়শই রোগে আক্রান্ত হয়ে নিজ দেশে নির্বাসিত হচ্ছে। বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি বিদেশে কর্মরত এবং বসবাস করছেন, এই জনসংখ্যা তাদের রেমিট্যান্সের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও মানব উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। কোভিডের সময় এটি স্পষ্ট হয় যে বর্তমানের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এই অভিবাসী জনগোষ্ঠীকে পরিষেবা দেওয়ার জন্য পর্যাপ্তভাবে প্রস্তুত ছিল না। এই ভাসমান এবং স্থানান্তরিত জনসংখ্যার স্বাস্থ্যসেবা পরিষেবার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য এবং স্বাস্থ্য সেবা সরবরাহ করার জন্য বর্তমান ব্যবস্থার সংস্কার, পুনর্বিন্যাস এবং প্রস্তুত থাকতে হবে।

৪.    জলবায়ু পরিবর্তন: জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের অর্থনীতি, স্বাস্থ্যের পাশাপাশি বেঁচে থাকার উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলছে, ভবিষ্যতে আরো ফেলবে। জলবায়ু পরিবর্তন খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির ওপর প্রভাব ফেলছে। যদিও বাংলাদেশ একটি অত্যন্ত সফল প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি তৈরি করেছে, ঘূর্ণিঝড়ের ক্রমবর্ধমান ফ্রিকোয়েন্সি, বন্যা এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা স্বাস্থ্যসেবা পরিষেবা প্রদানের সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলবে। প্রমাণ দেখায় যে জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষ করে ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, খরা, বন্যা, পানীয় জল এবং খাদ্যের অভাব জনসংখ্যা বিশেষ করে গর্ভবতী মহিলা, নবজাতক এবং শিশু এবং সেইসাথে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলবে। জনসংখ্যার দরিদ্র অংশ জনগনকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করবে। অন্যদিকে ক্রমবর্ধমানভাবে অনুপযুক্ত অবকাঠামো, বর্জ্য, সরবরাহের ক্রমবর্ধমান চাহিদা, যন্ত্রপাতি ও ইলেকট্রনিক্স, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি ইত্যাদির মাধ্যমে গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমনে স্বাস্থ্য খাতের অবদান উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্বাস্থ্য পেশাদারদের মধ্যে সচেতনতার অভাব রয়েছে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে কীভাবে আরও পরিবেশবান্ধব এবং জলবায়ু পরিবর্তনকে স্থিতিস্থাপক করা যায় তা জরুরিভাবে প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ, পুনরায় ব্যবহারযোগ্য উপকরণের ব্যবহার বৃদ্ধি, বর্জ্য হ্রাস এবং সৌর শক্তির ব্যবহার।

৫.    হামারী বা মহামারী: কোভিড-১৯ নগ্নভাবে আমাদের দেখিয়েছে যে বাংলাদেশ সহ এমনকি সবচেয়ে ধনী দেশগুলোও কোভিড-১৯ মহামারী মোকাবিলা ও পরিচালনা করতে প্রস্তুত ছিল না। এটি অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং স্বাস্থ্যগতভাবে প্রতিটি দেশকে অনেক নিচে ঠেলে দিয়েছে। লকডাউন, আয় হ্রাস, জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় স্বাস্থ্যসেবা পরিষেবাগুলিতে অ্যাক্সেসকে আরও কঠিন করে তুলেছিল, বিশেষত শিশু, বয়স্ক এবং গর্ভবতী মহিলাদের জন্য। যেহেতু মানুষ প্রাণীদের আবাসস্থল সীমিত করে ক্রমবর্ধমান প্রাণীর সাথে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসছে, ভাইরাসগুলি পরিবর্তিত হচ্ছে এবং মানুষের স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করছে। আমরা ক্রমবর্ধমানভাবে বিভিন্ন উদীয়মান রোগ দেখতে পাচ্ছি যেমন SARS, Ebola, Zika এবং তারপর CIVID-19। ডেঙ্গু আমাদের নীতি এবং সিস্টেম ব্যর্থতার আরেকটি উদাহরণ। আমরা নিশ্চিত নই কোভিডের পরবর্তী কি হবে। তাই ত্রুটি এবং সফলতা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন এবং পর্যাপ্ত প্রস্তুতির প্রয়োজন। স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে পূর্ব সতর্কতা এবং সামঞ্জস্য ও প্রস্তুত করার জন্য পর্যাপ্ত সময় প্রদানের জন্য আমাদের টেকসই এবং কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

৬.    অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ: নন-প্রেসক্রিপশন অ্যান্টিবায়োটিকের প্রাপ্যতার কারণে, অ্যান্টিবায়োটিকের অনুপযুক্ত ব্যবহার এবং প্রাণীদের জন্য অ্যান্টিবায়োটিকের বিপুল অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের কারনে এন্টিবায়োটিক সহ বহু ওষুধের প্রতিরোধের কারণ হচ্ছে। সংক্রমণ ব্যবস্থাপনা কঠিন এবং ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। এসব ধারা বন্ধ না হলে ভবিষ্যতে অনেক মানুষ অকালে মারা যেতে পারে।

৭.    মুঠোফোন আর ডিজিটাল রূপান্তর: বাংলাদেশের প্রতিটি কোণায় এবং জনসংখ্যায় মোবাইল এবং ডিজিটাল পরিষেবাগুলির প্রাপ্যতা, বিশেষ করে প্রতিরোধমূলক এবং ফলো-আপের পাশাপাশি বেশিরভাগ জনসংখ্যার জন্য পরামর্শ/প্রেসক্রিপশন পরিষেবাগুলি তৈরি করার সুযোগ দিচ্ছে তবে অপব্যবহার, গুজব ছড়ানো, অপতৎপরতা এবং মিথ্যা প্রতিকার প্রতিরোধে একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশে কোভিড-১৯-এর সময় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলি মানুষের কাছে পৌঁছাতে এবং সময়মতো পরিষেবা দেওয়ার জন্য ব্যাপক ব্যবহার করা হয়েছিল। সৌভাগ্যবশত বাংলাদেশের প্রয়োজনীয় জ্ঞান, প্রযুক্তি, বিশেষজ্ঞ এবং বাস্তবায়ন ক্ষমতা রয়েছে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জনসংখ্যাকে সময়োপযোগী এবং প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদানের জন্য, ফলো-আপ কেয়ার, বয়স্ক এবং দীর্ঘস্থায়ী হোম কেয়ারের জন্য এবং ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনীয়তা কমাতে মোবাইল এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে হবে। এই প্ল্যাটফর্মগুলি পরিষেবা প্রশিক্ষণেও ব্যবহার করা যেতে পারে যা স্বাস্থ্যকর্মীদের তাদের কার্য স্থান ছেড়ে যাওয়ার প্রয়োজন কমাতে সহায়তা করবে।

৮.    অসমাপ্ত এজেন্ডা: মানসিক স্বাস্থ্য এখনও স্বাস্থ্যসেবার একটি অবহেলিত এলাকা। এটি কলঙ্ক, কুসংস্কার, জ্ঞান এবং বোঝার অভাবের কারণে, আর এই সমস্যার ব্যাপকতার প্রমাণের অভাবের পাশাপাশি জনসংখ্যা, নীতিনির্ধারক এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের সচেতনতার অভাবের কারনে অবহেলিত হচ্ছে। অনেকে এখনও সমাজের দ্বারা কলঙ্কিত হওয়ার ভয়ে তাদের সমস্যা প্রকাশ করতে চান না। স্বাস্থ্য ব্যবস্থা পর্যাপ্তভাবে প্রতিক্রিয়াশীল বা তথ্য এবং পরিষেবা প্রদান করতে সক্ষম নয়। বিশেষ করে তরুণরা ব্যাপক সামাজিক পরিবর্তন এবং ভবিষ্যতের উন্নয়নের সুযোগের অভাবের কারণে চাপের সম্মুখীন হচ্ছে। মানসিক চাপ এবং বিষণ্নতায় ভুগছেন, আত্মবিশ্বাস হারাচছে। তরুণদের আত্মহত্যার হার বাড়ছে। তাদের প্রয়োজনীয় সময়মত সহায়তা প্রতিরোধ এবং প্রদানের জন্য স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এখনও পর্যাপ্ত নয়। অন্যান্য অসমাপ্ত এজেন্ডা হল মা, নবজাতক এবং শিশুর স্বাস্থ্য সমস্যা। যদিও তাদের স্বাস্থ্যের উন্নতি এবং বেঁচে থাকার জন্য অনেক কিছু অর্জন করা হয়েছে, কোভিড-১৯ দেখিয়েছে যে আকস্মিক পরিবর্তনগুলি সমস্ত অর্জনকে দুর্বল করে দিতে পারে।

৯.    স্বাস্থ্যের রাজনীতি: যদিও কিছু সময়ের জন্য জনস্বাস্থ্য নেতারা বুঝতে পেরেছিলেন যে স্বাস্থ্য নীতি, কৌশল এবং এর বাস্তবায়ন রাজনীতি এবং রাজনীতিবিদদের দ্বারা ইতিবাচক পাশাপাশি নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে, কোভিড-১৯ মহামারী আরও স্পষ্ট করে তুলেছে যে এটি জনস্বাস্থ্য নেতারা নয় বরং এটি রাজনীতি এবং রাজনীতিবিদরা তা নির্ধারিত হচ্ছে। রাজনীতি এবং রাজনীতিবিদরা নির্ধারণ করছেন স্বাস্থ্য পরিচর্যা পরিষেবার বিধান এবং পর্যাপ্ত অর্থ ও বাজেট বরাদ্দের জন্য কী, কখন বা কিভাবে প্রয়োজন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞকে আরও বুঝতে হবে যে আজকে শুধু রোগ থেকে জীবন বাঁচানো যথেষ্ট নয়, স্বাস্থ্য নীতি এবং কৌশল নির্ধারণের সময় জীবিকা থেকে জীবন বাঁচানো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। স্বাস্থ্য মানে শুধু রোগ বা জীবানু থেকে জীবন বাঁচানো নয় বরং জীবিকা থেকেও জীবন বাঁচানো। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের স্বাস্থ্য নীতি তৈরির সময় স্বাস্থ্যের রাজনীতি বুঝতে হবে, রাজনৈতিক ভাষা শিখতে হবে এবং জয়ের পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে।  স্বাস্থ্য রক্ষা এখন আর জনস্বাস্থ্য আধিকারিকদের বা স্বাস্থ্য মন্ত্রকের একার ডোমেইন নয়। আমাদের বিভিন্ন সেক্টর এবং মন্ত্রণালয়, সুশীল সমাজ, এনজিও, বেসরকারি খাত এবং সামগ্রিক সাধারণ জনগণকে জড়িত করতে হবে। আজ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা স্বাস্থ্য নীতি, কৌশল এবং হস্তক্ষেপ প্রণয়ন করতে পারেন তবে রাজনীতিবিদরাই সেইগুলি ঘটাবেন এবং বাস্তবে বাস্তবায়ন করবেন।

১৯৮০ সালে বাংলাদেশের একটি প্রত্যন্ত থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কাজ করার সময়, আমি দেখেছি যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সকল স্তরের অদক্ষতা, নিরাপত্তাহীনতা এবং দুর্নীতি জনসংখ্যার জন্য স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকে কঠিন করে তুলেছে। সেই অবস্থায় আমার কাছে দুটি বিকল্প ছিল, হয় সেই দুর্নীতির অংশ হওয়া বা চলে যাওয়া। এখন হয়তো পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। আমি অনেক জেলা ও উপজেলা এবং শিক্ষণ হাসপাতালে গিয়েছি, এমনকি অতি সম্প্রতি এবং দেখেছি বেশ দক্ষ ভাবে চালিত হাসপাতাল এবং সেইসাথে অকার্যকর অব্যবস্থাপিত ব্যবস্থার হাসপাতাল, দেখেছি বিপুল সংখ্যক কেনা কিন্তু অব্যবহৃত আধুনিক এবং দামী যন্ত্রপাতি এবং সরবরাহ মেঝেতে অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকতে। আমাদের নতুন স্বাস্থ্য মন্ত্রীর প্রচুর চ্যালেঞ্জ রয়েছে,  বার্ন এবং প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে তার অতীত উত্সর্গ, নিরবধি প্রচেষ্টা এবং কৃতিত্বের কথা বিবেচনা করে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে তিনি সেই চ্যালেঞ্জগুলিকে সুযোগে পরিণত করতে সবচেয়ে বেশি সক্ষম। আমাদের প্রধানমন্ত্রী স্বাস্থ্যকে তার একটি অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচি হিসেবে বিপুল বাজেট বরাদ্দ দিয়েছেন। হ্যাঁ, কেউ কেউ বলতে পারে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আরও অর্থের প্রয়োজন, কিন্তু আমি মনে করি প্রথমে আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যেই যে অর্থ বরাদ্দ আছে, তা যেন সময় মত, সৎ ভাবে ব্যবহার করা হয়- যেন অপচয় না হয়, দুর্নীতি না হয়, অদক্ষতা না থাকে এবং জবাবদিহিতার মানসিকতা এবং কাজের কাঠামো নিয়ে কাজ করা হয়। মন্ত্রী নিজেকে অকার্যকর, স্বার্থপর, দুর্নীতিগ্রস্ত, চাটুকার, যারা তাকে খুশি করার জন্য ফিল্টার করা তথ্য দেবে, তাকে বাস্তব থেকে অন্ধ করে রাখবে এমন লোকেদের সাথে তাকে ঘিরে রাখার পরিবর্তে তিনি এমন লোকেদের ডাকবেন যারা বর্তমান পরিস্থিতি এবং জনস্বাস্থ্যের পরিবর্তনের উপরে বিশ্লেষণ করতে সক্ষম এবং যারা তাকে নিঃস্বার্থভাবে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করবে, এবং তাকে সত্য, বাস্তবতা, তথ্য জানাবে যা তার জ্ঞাত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে। আমি জানি একজন বহিরাগতের জন্য সংস্কার সম্পর্কে অনেক কিছু বলা সহজ, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন এবং অনেক কঠিন। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি যে আমাদের মন্ত্রী একজন সৎ প্রমাণিত নেতা এবং তিনি অনেক দীর্ঘ প্রতিষ্ঠিত ইনসুলেটেড জং ধরা প্রতিষ্ঠানের আরপিত বাধা অতিক্রম করতে সক্ষম হবেন। জাতি, সাধারণ মানুষ তার দিকে তাকিয়ে আছে। বাংলাদেশে অনেক চমৎকার এবং সবচেয়ে দক্ষ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আছেন এবং আমি নিশ্চিত যে তাদের মধ্যে অনেকেই তাদের সেবা দিতে ইচ্ছুক হবে, যদি সেই সুযোগ দেওয়া হয়। আমার মনে আছে, প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন যখন নির্বাচিত হয়েছিলেন, তখন তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়ার আগে বিভিন্ন ট্রানজিশন টিম গঠন করেন। আমি তখন WHO/HQ-এ ছিলাম, কেন জানি না, তার স্বাস্থ্য খাতের ট্রানজিশন টিমে যোগ দিতে আমাকে ওয়াশিংটনে ডাকা হয়। আমি সেখানে দেখেছি কিভাবে আমরা প্রত্যেকে আলোচনা করেছি, বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেছি, উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বাস্থ্য উন্নয়নে প্রয়োজন আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এর প্রভাব এবং বিভিন্ন উপায় ও উপায় গুলো সুপারিশ করেছি। আমরা শুধু সুপারিশ করেছি কিন্তু রাষ্ট্রপতি এবং তার দল শেষ পর্যন্ত নীতি ও কৌশল নির্ধারণ করেছিল। ঠিক একই ভাবে, প্রমাণিত জনস্বাস্থ্য নেতারা স্বাস্থ্য লক্ষ্য অর্জনের উপায় এবং উপায় প্রদানে আমাদের  স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে সমর্থন করতে পারে কিন্তু  স্বাস্থ্যমন্ত্রী আমাদের নেতা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব ও চূড়ান্ত কর্তৃত্ব তাঁর। আমাদের কেবল সেবা বিস্তৃত করা/কভারেজ উন্নত করার জন্য কাজ করা উচিত নয়, আমরা এটি প্রায় অর্জন করেছি, এখন সেবার গুণমান, প্রতিক্রিয়াশীলতা এবং জবাবদিহিতা উন্নত করার সময় এসেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে একটি রূপান্তরমূলক পরিবর্তন আশা করছি। আমি বিশ্বাস করি হ্যাঁ তিনি পারবেন।

 


Prof Dr Quazi Monirul Islam, MBBS, MPH, FRCOG

Department of Epidemiology, Prince of Songkla University, Hat Yai, Thailand

Senior Specialist, International Centre for Migration, Health and Development

Former Senior Specialist (Maternal and Newborn), Liverpool School of Tropical Medicine, UK

Former WHO Director and WHO Country Representative to Thailand and Namibia



মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

বঙ্গবন্ধুর ২১ শে ফেব্রুয়ারি

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪


Thumbnail

২১ ফেব্রুয়ারির সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর নাম নিবিড়ভাবে জড়িত, সংবিধানে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার সঙ্গেও।১৯৫৬, ১৯৬২ এবং ১৯৭২ সালের সংবিধানে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মর্যাদা দিয়ে গেছেন তিনি।জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিসংঘে মাতৃভাষা বাংলায় বক্তৃতা করেছিলেন ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ২৯তম অধিবেশনের সেই দিনটি ছিল বুধবার।আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ওই ঘটনা সদ্য স্বাধীন একটি দেশের মর্যাদাকে অনেকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।বঙ্গবন্ধুকে অনুসরণ করে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগদান করে বাংলাতেই একযুগ ধরে ভাষণ দিচ্ছেন।উল্লেখ্য, ১৯৭৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে বাংলাদেশকে জাতিসংঘের ১৩৬তম সদস্য রাষ্ট্ররূপে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়।এটি শোনার পর বঙ্গবন্ধু তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেছিলেন, ‘আমি সুখী হয়েছি যে, বাংলাদেশ জাতিসংঘে তার ন্যায্য আসন লাভ করেছে। জাতি আজ গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করবে, যারা বাংলাদেশকে স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে তাদের জীবন উৎসর্গ করে গেছেন; সেই শহীদদের কথা জাতি আজ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে।’ রাজনীতিবিদ তোফায়েল আহমেদ লিখেছেন- ‘জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুই প্রথম রাষ্ট্রনায়ক, যিনি মাতৃভাষা বাংলায় বক্তৃতা করেন। বঙ্গবন্ধুকে প্রথমেই অনুরোধ করা হয়েছিল, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি ইংরেজিতে বক্তৃতা করবেন।’ কিন্তু প্রিয় মাতৃভাষা বাংলার প্রতি সুগভীর দরদ ও মমত্ববোধ থেকে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমি মাতৃভাষা বাংলায় বক্তৃতা করতে চাই।’ সিদ্ধান্তটি তিনি আগেই নিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর বাংলা বক্তৃতার ইংরেজি ভাষান্তর করার গুরুদায়িত্বটি অর্পিত হয়েছিল ফারুক চৌধুরীর ওপর। তিনি ছিলেন লন্ডনে বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনার। ছুটিতে দেশে এসেছেন। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ, ‘ফারুক, তোমার ছুটি নাই। তোমাকে এখানে কাজ করতে হবে।’ কাজগুলো হচ্ছে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলি ভুট্টোর আসন্ন বাংলাদেশ সফরের প্রস্তুতি গ্রহণ; বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা নির্ধারণে বার্মার (বর্তমান মিয়ানমার) সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা শুরু করতে প্রতিনিধি দল নিয়ে বার্মায় গমন। বার্মা থেকে ফেরার পর বঙ্গবন্ধু ফারুক চৌধুরীকে ডেকে বলেছিলেন, ‘তোমার লন্ডন যাওয়া চলবে না। তুমি আমার সাথে নিউইয়র্ক যাবে এবং জাতিসংঘে আমি বাংলায় যে বক্তৃতাটি করব, তাৎক্ষণিকভাবে তুমি সেই বক্তৃতার ইংরেজি ভাষান্তর করবে।’ ফারুক ভাই সুন্দর ইংরেজি বলেন ও লিখেন। প্রথমে ফারুক ভাই একটু ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। তখন পরিস্থিতি সহজ করতে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘রিহার্সাল দাও। বক্তৃতা ভাষান্তরের সময় ভাববে, যেন তুমিই প্রধানমন্ত্রী। তবে পরে কিন্তু তা ভুলে যেও।’

অর্থাৎ সেদিন বাংলায় বক্তৃতা প্রদান করে দায়িত্ব শেষ করেননি বঙ্গবন্ধু। ইংরেজিতে তা অনুবাদ করে বিশ্বনেতৃবৃন্দকে বোঝানোর ব্যবস্থাও গ্রহণ করেছিলেন তিনি।এখান থেকে আমরা শিখেছি যে, মাতৃভাষার মর্যাদা আমি রক্ষা করব কিন্তু একইসঙ্গে অনুবাদের মাধ্যমে তার আবেদন অন্যভাষীদের মধ্যেও সঞ্চারিত করব।তবে এর আগে ১৯৭৩ সালে আলজেরিয়ায় অনুষ্ঠিত ৭৩ জাতি জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু বাংলায় বক্তৃতা দেন। কারণ তিনি বলতেন, ‘আমি বাঙালি, বাংলা আমার ভাষা। বাংলার কৃষ্টি, বাংলার সভ্যতা, বাংলার ইতিহাস, বাংলার মাটি, বাংলার আকাশ, বাংলার আবহাওয়া, তাই নিয়ে বাংলার জাতীয়তাবাদ।’

২.

কেবল স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে জাতিসংঘ কিংবা জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে বাংলায় ভাষণ নয়, বঙ্গবন্ধু ১৯৫২ সালের অক্টোবর মাসে অনুষ্ঠিত নয়া চীনের আন্তর্জাতিক শান্তি সম্মেলনে বাংলায় বক্তৃতা দিয়েছিলেন।সে ঘটনা অসমাপ্ত আত্মজীবনী এবং আমার দেখা নয়া চীনে লিপিবদ্ধ রয়েছে। অংশ দুটি নিম্নরূপ- 

ক) ‘শান্তি সম্মেলন শুরু হল। তিনশত আটাত্তর জন সদস্য সাঁইত্রিশটা দেশ থেকে যোগদান করেছে। সাঁইত্রিশটা দেশের পতাকা উড়ছে। শান্তির কপোত একে সমস্ত হলটা সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছে। প্রত্যেক টেবিলে হেডফোন আছে। আমরা পাকিস্তানের প্রতিনিধিরা একপাশে বসেছি। বিভিন্ন দেশের নেতারা বক্তৃতা করতে শুরু করলেন। প্রত্যেক দেশের একজন বা দুইজন সভাপতিত্ব করতেন। বক্তৃতা চলছে। পাকিস্তানের পক্ষ থেকেও অনেকেই বক্তৃতা করলেন। পূর্ব পাকিস্তান থেকে আতাউর রহমান খান ও আমি বক্তৃতা করলাম। আমি বাংলায় বক্তৃতা করলাম। আতাউর রহমান সাহেব ইংরেজি করে দিলেন। ইংরেজি থেকে চীনা, রুশ ও স্পেনিশ ভাষায় প্রতিনিধিরা শুনবেন। কেন বাংলায় বক্তৃতা করব না? ভারত থেকে মনোজ বসু বাংলায় বক্তৃতা করেছেন। পূর্ব বাংলার ছাত্ররা জীবন দিয়েছে মাতৃভাষার জন্য। বাংলা পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু লোকের ভাষা। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে না জানে এমন শিক্ষিত লোক চীন কেন দুনিয়ায় অন্যান্য দেশেও আমি খুব কম দেখেছি। আমি ইংরেজিতে বক্তৃতা করতে পারি। তবু আমার মাতৃভাষায় বলা কর্তব্য। আমার বক্তৃতার পরে মনোজ বসু ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “ভাই মুজিব, আজ আমরা দুই দেশের লোক, কিন্তু আমাদের ভাষাকে ভাগ করতে কেউ পারে নাই। আর পারবেও না। তোমরা বাংলা ভাষাকে জাতীয় মর্যাদা দিতে যে ত্যাগ স্বীকার করেছ আমরা বাংলা ভাষাভাষী ভারতবর্ষের লোকেরাও তার জন্য গর্ব অনুভব করি।”

বক্তৃতার পর, খন্দকার ইলিয়াস তো আমার গলাই ছাড়ে না। যদিও আমরা পরামর্শ করেই বক্তৃতা ঠিক করেছি। ক্ষিতীশ বাবু পিরোজপুরের লোক ছিলেন, বাংলা গানে মাতিয়ে তুলেছেন। সকলকে বললেন, বাংলা ভাষাই আমাদের গর্ব।...(অসমাপ্ত আত্মজীবনী, অধ্যায় ৭৩)

খ) ‘বাংলা আমার মাতৃভাষা। মাতৃভাষার বক্তৃতা করাই উচিত। কারণ পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলনের কথা দুনিয়ার সকল দেশের লোকই কিছু কিছু জানে। মানিক ভাই, আতাউর রহমান খান ও ইলিয়াস বক্তৃতাটা ঠিক করে দিয়েছিল। দুনিয়ার সকল দেশের লোকই যার যার মাতৃভাষায় বক্তৃতা করে। শুধু আমরাই ইংরেজি ভাষায় বক্তৃতা করে নিজেদের গর্বিত মনে করি।

পাকিস্তানের কেহই আমরা নিজেদের ঘরোয়া ব্যাপার বক্তৃতায় বলি নাই। কারণ মুসলিম লীগ সরকারের আমলে দেশের যে দুরবস্থা হয়েছে তা প্রকাশ করলে দুনিয়ার লোকের কাছে আমরা ছোট হয়ে যাব। অনেকেই আমাদের জিজ্ঞাসা করলো, ভারত থেকে একজন বাংলায় বক্তৃতা করলেন, আর পাকিস্তান থেকেও একজন বক্তৃতা করলেন, ব্যাপার কী? আমি বললাম, বাংলাদেশ ভাগ হয়ে একভাগ ভারত আর একভাগ পাকিস্তানে পড়েছে। বাংলা ভাষা যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষা এ অনেকেই জানে। ঠাকুর দুনিয়ার ‘ট্যাগোর’ নামে পরিচিত। যথেষ্ট সম্মান দুনিয়ার লোক তাকে করে। আমি বললাম, পাকিস্তানের শতকরা ৫৫ জন লোক এই ভাষায় কথা বলে। এবং দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ ভাষার অন্যতম ভাষা বাংলা। আমি দেখেছি ম্যাডাম সান ইয়াৎ-সেন খুব ভালো ইংরেজি জানেন, কিন্তু তিনি বক্তৃতা করলেন চীনা ভাষায়। একটা ইংরেজি অক্ষরও তিনি ব্যবহার করেন নাই।’(আমার দেখা নয়া চীন)

আন্তর্জাতিক ফোরামে নিজের মাতৃভাষা বাংলাকে পরিচিত করার কৃতিত্ব নিঃসন্দেহে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের- সে কথা স্বীকার করেই বঙ্গবন্ধু চীনের শান্তি সম্মেলনে এবং জোট নিরপেক্ষ সম্মেলন ও জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দেন। তবে মনে রাখা দরকার, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে তাঁর সম্পৃক্ততা এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পর পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে লন্ডন-দিল্লি হয়ে দেশে ফিরে আসার সময়ও তিনি মিডিয়ার সামনে যেমন ইংরেজি ব্যবহার করেছেন তেমনি কথা বলেছেন বাংলাতেও।

৩.

মনে রাখতে হবে, পাকিস্তান গণপরিষদে সব বাধা অগ্রাহ্য করে বঙ্গবন্ধু বাংলায় বক্তৃতা দিয়েছিলেন।তবে বাংলা ভাষার জন্য তাঁর লড়াই শুরু হয়েছিল অনেক আগে থেকে।তাঁর ওপর তৎকালীন পাকিস্তান ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চের গোপন নথি নিয়ে ১৪ খণ্ডের বইয়ের মধ্যে প্রকাশিত প্রথম থেকে চৌদ্দ খণ্ড(২০২৩) পর্যন্ত পাঠকের হাতে এসেছে। ‘সিক্রেট ডকুমেন্টস অব ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ অন ফাদার অব দ্য নেশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ শীর্ষক গ্রন্থের প্রথম খণ্ডের সময়কাল ১৯৪৮-১৯৫০ এবং দ্বিতীয় খণ্ডের ১৯৫১-১৯৫২ পর্যন্ত অর্থাৎ ১৯৪৮ সাল থেকে গোয়েন্দা নজরদারিতে ছিলেন শেখ মুজিব আর ১৯৪৮-৫২ ছিল রাষ্ট্রভাষা বাংলা প্রতিষ্ঠার কাল।

এ দু’খণ্ডের গ্রন্থ ছাড়াও ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর সরাসরি অংশগ্রহণের প্রমাণ রয়েছে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও ‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থদ্বয়ে। আরো আছে বিশিষ্টজনদের লেখায় বঙ্গবন্ধুর বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশ নিয়ে স্বপ্নের কথা। সাহিত্যিক অন্নদাশঙ্কর রায়ের লেখায় বঙ্গবন্ধুর ভাষা আন্দোলনে জড়িত হওয়ার প্রসঙ্গ আছে এভাবে- ‘শেখ সাহেবকে আমরা প্রশ্ন করি, ‘বাংলাদেশের আইডিয়াটি প্রথম কবে আপনার মাথায় এলো?’ ‘শুনবেন?’ তিনি (বঙ্গবন্ধু) মুচকি হেসে বললেন, ‘সেই ১৯৪৭ সালে।আমি সুহরাবর্দী (সোহরাওয়ার্দী) সাহেবের দলে। তিনি ও শরৎচন্দ্র বসু চান যুক্তবঙ্গ। আমিও চাই সব বাঙালির এক দেশ।... দিল্লি থেকে খালি হাতে ফিরে এলেন সুহরাবর্দী ও শরৎ বোস। কংগ্রেস বা মুসলিম লীগ কেউ রাজি নয় তাদের প্রস্তাবে।...তখনকার মতো পাকিস্তান মেনে নিই কিন্তু আমার স্বপ্ন সোনার বাংলা।... হঠাৎ একদিন রব উঠল, আমরা চাই বাংলাভাষা। আমিও ভিড়ে যাই ভাষা আন্দোলনে।

ভাষাভিত্তিক আন্দোলনকেই একটু একটু করে রূপ দিই দেশভিত্তিক আন্দোলনে। পরে এমন একদিন আসে যেদিন আমি আমার দলের লোকদের জিজ্ঞেস করি, আমাদের দেশের নাম কী হবে? কেউ বলে, পাক বাংলা। কেউ বলে, পূর্ব বাংলা। আমি বলি, না বাংলাদেশ। তারপর আমি স্লোগান দিই, ‘জয়বাংলা’।... ‘জয় বাংলা’ বলতে আমি বোঝাতে চেয়েছিলুম বাংলা ভাষা, বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির জয় বা সাম্প্রদায়িতকার ঊর্ধ্বে।’

১৯৫৬ সালের ২৩ মার্চ গৃহীত পাকিস্তানের প্রথম সংবিধানে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয় কিন্তু পূর্ববাংলা নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় পূর্ব পাকিস্তান। যার বিরুদ্ধে শেখ মুজিবুর রহমান তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে গণপরিষদে জ্বালাময়ী বক্তব্য রাখেন। ওই বছর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শহীদ মিনারের পূর্ণাঙ্গ নকশা তৈরি এবং নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়।

১৯৫৩ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস উদযাপনে যে কর্মসূচি নেয়া হয় তার সঙ্গেও শেখ মুজিবের সম্পৃক্ততা ছিল নিবিড়। তখন তিনি আওয়ামী লীগের সম্পাদক। ওইদিন সকাল থেকে তিনি সাইকেলে করে গোটা ঢাকা শহরে টহল দিয়ে বেড়ান এবং মিছিলের সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন। পরে আরমানিটোলা ময়দানে লক্ষাধিক লোকের সভায় শেখ মুজিব ভাষণ দেন। তাঁর অনুরোধে গাজীউল হক নিজের লেখা গান ‘ভুলবো না’ পরিবেশন করেন। সভায় অন্যান্য স্লোগানের মধ্যে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, গণপরিষদ ভেঙ্গে দাও, গণপরিষদ ভেঙ্গে দাও, সাম্রাজ্যবাদ ধ্বংস হোক’ সচকিত করে তোলে।

ইতিহাসের এই অর্জন একদিনে সম্ভব হয়নি। আমরা জানি, ভারত বিভাগের পর এই ভূখণ্ডের ছাত্রনেতারা অনুমান করেছিলেন ১৯৪০ সালের ‘লাহোর প্রস্তাব’ অনুসারে মুসলমানদের জন্য দুটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে এক রাষ্ট্র পাকিস্তান হওয়ায় বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর আঘাত আসবে এবং ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের বদলে পাকিস্তানের উপনিবেশে পরিণত হবে।

এজন্য দেখা যায়, ১৯৪৭ সালের আগস্টে ‘নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগ’ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানসহ অনেকেই কলকাতা থেকে ঢাকায় আসেন এবং পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাত্র একুশ দিনের মধ্যে ১৯৪৭ সালের ৬ ও ৭ সেপ্টেম্বর কমরুদ্দিন আহাম্মদ, শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ, শামসুদ্দিন আহাম্মদ, মোহাম্মদ তোয়াহা, নুরুদ্দিন আহম্মদ, আবদুল অদুদ প্রমুখের প্রচেষ্টায় ‘পাকিস্তান গণতান্ত্রিক যুবলীগ’ প্রতিষ্ঠা হয়।

এই সংগঠনের কর্মী সম্মেলনে ভাষাবিষয়ক কিছু প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল। সম্মেলনের কমিটিতে গৃহীত প্রস্তাবগুলো পাঠ করেন ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান। ভাষা সম্পর্কিত প্রস্তাব উত্থাপন করে তিনি বলেছিলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তান কর্মী সম্মেলন প্রস্তাব করিতেছে যে, বাংলা ভাষাকে পূর্ব পাকিস্তানের লিখার বাহন ও আইন আদালতের ভাষা করা হউক। সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হইবে তৎসম্পর্কে আলাপ-আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার জনসাধারণের উপর ছাড়িয়া দেওয়া হউক এবং জনগণের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলিয়া গৃহীত হউক।’

অন্যদিকে বাঙালির ভাষা ও কৃষ্টির প্রতি সম্ভাব্য হামলার প্রতিরোধ এবং জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি শেখ মুজিবকে আহ্বায়ক কমিটির সদস্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফজলুল হক হল মিলনায়তনে এক সভায় ‘নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগ’ সংগঠনটি ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ’ নামে পুনর্গঠিত হয়। সেসময় ছাত্রলীগের ১০ দফা দাবির মধ্যে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার ও সামরিক বাহিনীতে বাঙালিদের নিয়োগ এবং বাধ্যতামূলক সামরিক শিক্ষার দাবি ছিল অন্যতম।

১৯৪৮ সালের ৪ মার্চ ঢাকা জেলা গোয়েন্দা তথ্যে বলা হয়, ‘শেখ মুজিবুর রহমানসহ যারা মুসলিম ছাত্রলীগ গঠনে কাজ করেছে তারাই বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে লিফলেট ছড়াচ্ছে।’(ভলিউম-১, পৃঃ ৭) ৩ মার্চ গোপালগঞ্জে শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্য নেতৃবৃন্দ ছাত্রদের সম্মেলনে বাংলা ভাষার অধিকার নিয়ে কথা বলেন। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে পালিত ধর্মঘটটি ছিল ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে প্রথম সফল ধর্মঘট। এই ধর্মঘটে বঙ্গবন্ধু নেতৃত্ব প্রদান করেন এবং পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়ে গ্রেফতার হন।

পাকিস্তানি গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ১ম খণ্ডের পৃঃ ৭-এ সেই তথ্য আছে। অন্যদিকে ‘কারাগারের রোজনামচা’য় বঙ্গবন্ধু লিখেছেন- ‘প্রথম ভাষা আন্দোলন শুরু হয় ১১ই মার্চ ১৯৪৮ সালে। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ (এখন পূর্বপাকিস্তান ছাত্রলীগ) ও তমদ্দুন মজলিসের নেতৃত্বে। ঐদিন ১০টায় আমি, জনাব শাসমুল হক সাহেবসহ প্রায় ৭৫ জন ছাত্র গ্রেফতার হই এবং আবদুল ওয়াদুদসহ অনেকেই ভীষণভাবে আহত হয়ে গ্রেফতার হয়।’(পৃঃ-২০৬)

উল্লেখ্য, ভারত ভাগের আগেই উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছিল। ১৯৪৭ সালের ১৮ মে লাহোরের হায়দ্রবাদে উর্দু সম্মেলনে চৌধুরী খালেকুজ্জামানের ঘোষণা ছিল ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা।’ (দৈনিক আজাদ, ১৮ মে ১৯৪৭)। দেশভাগের পর ১৯৪৭ সালের ৬ ডিসেম্বর মর্নিং নিউজ পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে রয়েছে- করাচীতে অনুষ্ঠিত শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করার জন্য সুপারিশ।

উপরন্তু কায়েদে আযমকে দেওয়া জমিয়ত প্রতিনিধিদের স্মারকলিপিতে ‘পূর্ববঙ্গের জনগণ উর্দুর সমর্থক বলে দাবি করা হয়।’(দৈনিক আজাদ, ২৬ মার্চ ১৯৪৮) ‘ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, বাঙালি প্রতিনিধি কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমানের নির্দেশে ১৯৪৮ সালে তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষা উপদেষ্টা মাহমুদ হাসান ভাষাবিজ্ঞানী ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে একটি পত্র লেখেন। তাতে বলা হয়, ‘সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, পাকিস্তানকে ইসলামী মতে গঠন করতে এবং সেই উদ্দেশ্যে তাঁরা বাংলা ভাষায় উর্দু অক্ষর প্রবর্তন করতে চান এবং এর জন্য তাঁর সাহায্য পেলে তাঁরা উপকৃত হবেন।’

ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সেই চিঠির জবাব দেননি বরং ভিন্নমত পোষণ করেন যা কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত। এছাড়া তৎকালীন প্রাদেশিক মন্ত্রী হাবিবুল্লাহ বাহার প্রাদেশিক পরিষদে ১৯৪৮ সালের ৮ এপ্রিল পূর্ববাংলায় সরকারি অফিস ও শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বাংলাভাষা চালুর বিরোধিতা করেই ক্ষান্ত হননি বরং বাংলা আরবি হরফে লেখার পক্ষে জোর প্রস্তাব রাখেন।

১৯৪৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘তমদ্দুন মজলিস’ ও পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের সভায় ভাষার দাবিতে ১১ মার্চ সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে সাধারণ ধর্মঘট আহ্বানে সম্মিলিত এক বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন শেখ মুজিব, নইমুদ্দিন আহম্মদ, আবদুর রহমান চৌধুরী। ওইদিন পিকেটিং করেন শামসুল হক, শেখ মুজিব, অলি আহাদ প্রমুখ এবং সে সময় তাঁরা বন্দি হন।

কিন্তু প্রতিবাদ মিছিল বের হয় দুপুর দুটোর দিকে। ১৯ মার্চ জিন্নাহ সাহেবের ঢাকা আগমন উপলক্ষে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা যেন না ঘটে সেজন্য প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন ১৫ মার্চ ১৯৪৮। এ সময় সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি সংগ্রাম পরিষদের সব দাবি মেনে নেন কিন্তু এসব ছিল খাজা নাজিমুদ্দিনের রাজনৈতিক চাল। কারণ তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উর্দুর পক্ষে ওকালতি করেছিলেন।

জিন্নাহ সাহেব ১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ ঢাকায় এসে রেসকোর্স ময়দানে সদম্ভে ঘোষণা করে বলেন, একমাত্র উর্দুই হবে রাষ্ট্রভাষা। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে বঙ্গবন্ধু জানিয়েছেন, ‘জিন্নাহ পূর্ব পাকিস্তানে এসে ঘোড়দৌড় মাঠে বিরাট সভায় ঘোষণা করলেন, ‘উর্দুই পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে।’ আমরা প্রায় চার-পাঁচ শত ছাত্র এক জায়গায় ছিলাম সেই সভায়। অনেকে হাত তুলে দাঁড়িয়ে জানিয়ে দিল, ‘মানি না।’(পৃ ৯৯) জিন্নাহ সাহেব একই কথার প্রতিধ্বনি করেন ২৪ মার্চ কার্জন হলে সমাবর্তন উৎসবে।

জিন্নাহ সাহেবের সে উক্তির যথাযথ প্রতিবাদ করেন সমবেত ছাত্র-জনতা। তিনি ঢাকা ত্যাগ করে যাবার পর সেদিনকার ঘটনা স্মরণ করে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে বঙ্গবন্ধু আরো লিখেছেন, ‘বাংলা ভাষা শতকরা ছাপান্নজন লোকের মাতৃভাষা, পাকিস্তান গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, সংখ্যাগুরুদের দাবি মানতেই হবে। রাষ্ট্রভাষা বাংলা না হওয়া পর্যন্ত আমরা সংগ্রাম চালিয়ে যাব। তাতে যাই হোক না কেন, আমরা প্রস্তুত আছি। সাধারণ ছাত্ররা আমাকে সমর্থন করল। এরপর পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র ও যুবকরা ভাষার দাবি নিয়ে সভা ও শোভাযাত্রা করে চলল।’(পৃঃ ৯৯-১০০) তবে তার আগে খাজা নাজিমুদ্দিনের চুক্তি মোতাবেক ১৫ মার্চ সন্ধ্যায় শেখ মুজিব প্রমুখরা মুক্তি পান।

পরদিন ১৬ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের সভাপতিত্বে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের এক সভা হয়। সভায় তিনি জ্বালাময়ী বক্তৃতা করেন। ভাষার দাবিতে আন্দোলন চলতে থাকে আর সুশীলসমাজ তথা সাহিত্যিকদের যৌক্তিক বয়ানও উপস্থাপিত হতে থাকে। ১৯৪৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর ঢাকায় পূর্ববঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনের উদ্বোধনী দিবসে সভাপতির ভাষণে মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, ‘আমরা হিন্দু না মুসলমান এ কথা যেমন সত্য, তার চেয়েও বড় সত্য আমরা বাঙালী।এটা কোন আদর্শের কথা নয়, এটি একটি বাস্তব কথা। প্রকৃতি নিজের হাতে আমাদের চেহারায় ও ভাষায় বাঙালিত্বের এমন ছাপ মেরে দিয়েছেন, তা মালা-তিলক-টিকি কিংবা লুঙ্গি-টুপি-দাড়িতে ঢাকার জো নেই।’

এই সত্যকে সামনে রেখে ভাষা আন্দোলন হয়েছিল। অর্থাৎ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে যে সংগ্রাম সংঘটিত হয়েছিল তা ছিল সর্বধর্ম-বর্ণ মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসে।

১৯৪৯ সালের ৮ জানুয়ারি ধর্মঘটের মাধ্যমে সমগ্র পূর্ববঙ্গে জুলুম প্রতিরোধ হিসেবে পালিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয় ময়দান সভায় নইমুদ্দিন আহম্মদ সভাপতিত্ব করেন এবং বক্তব্য রাখেন শেখ মুজিব, আঃ রহমান চৌধুরী প্রমুখ। পরে ভাষা আন্দোলন কিছুটা স্তিমিত হয়ে আসে। তবে শেখ মুজিবুর রহমান আন্দোলনে জড়িত থাকার কারণে ১৯৪৯ সালে দু’বার গ্রেফতার হন।

১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম।১৯৪৯ সালের ১৫ অক্টোবর খাদ্যের দাবিতে ভুখা মিছিলে নেতৃত্ব দানের সময় শেখ মুজিব বন্দি হন এবং মুক্ত হন ১৯৫২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি। তার আগে ১৯৪৯ সালের মার্চ মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের ধর্মঘটকে সমর্থন করায় শেখ মুজিবসহ ২৭ শিক্ষার্থীর ওপর বহিষ্কারাদেশসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়। তিনি তখন আইনের ছাত্র। তাঁর শাস্তি হয় মুচলেকা এবং ১৫ টাকা জরিমানা, না হয় চূড়ান্ত বহিষ্কার। তিনি মুচলেকা দেননি, তাই বহিষ্কার এবং ছাত্রজীবন পরিসমাপ্ত হয়।

তবে ১৯৪৯ সালের ৯ জানুয়ারি গোপন দলিলের ২৭ নম্বর ভুক্তিতে ভাষা প্রসঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক কার্যক্রমের কয়েকটি বিষয় লিপিবদ্ধ রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, আদালতের ভাষা হিসেবে বাংলাকে গ্রহণ ও চালু করার বিষয়ে তিনি তাঁর একাধিক ভাষণে জোর দিয়েছেন। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের রক্তাক্ত পর্বে শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন জেলে। তবে তাঁর সক্রিয় ভ‚মিকা ছিল আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি মুহূর্তেও।

১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ঢাকা সফরকালে পল্টন ময়দানে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দিলে পূর্ববাংলায় প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। বন্দিদশার ভেতর থেকেই শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ছাত্রনেতাদের আলোচনা হয় পরবর্তী কর্মসূচি নিয়ে। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে বঙ্গবন্ধুর বর্ণনা- (খাজা নাজিমুদ্দীনের ঘোষণার পর) ‘দেশের মধ্যে ভীষণ ক্ষোভের সৃষ্টি হল। তখন একমাত্র রাজনৈতিক দল পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ, ছাত্র প্রতিষ্ঠান ছাত্রলীগ এবং যুবাদের প্রতিষ্ঠান যুবলীগ সকলেই এর তীব্র প্রতিবাদ করে।

আমি হাসপাতালে আছি। সন্ধ্যায় মোহাম্মদ তোয়াহা ও অলি আহাদ দেখা করতে আসে। আমার কেবিনের একটা জানালা ছিল ওয়ার্ডের দিকে। আমি ওদের রাত একটার পরে আসতে বললাম। আরো বললাম, খালেক নেওয়াজ, কাজী গোলাম মাহাবুব আরও কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতাকে খবর দিতে। দরজার বাইরে আইবিরা পাহারা দিত। রাতে অনেকে ঘুমিয়ে পড়েছে। তখন পিছনের বারান্দায় ওরা পাঁচ-সাতজন এসেছে। আমি অনেক রাতে একা হাঁটাচলা করতাম। রাতে কেউ আসে না বলে কেউ কিছু বলত না।

পুলিশরা চুপচাপ পড়ে থাকে, কারণ জানে আমি ভাগব না। গোয়েন্দা কর্মচারী একপাশে বসে ঝিমায়। বারান্দায় বসে আলাপ হলো এবং আমি বললাম, সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন করতে। আওয়ামী লীগ নেতাদেরও খবর দিয়েছি। ছাত্রলীগই তখন ছাত্রদের মধ্যে একমাত্র জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠান। ছাত্রলীগ নেতারা রাজি হলো। অলি আহাদ ও তোয়াহা বলল, যুবলীগও রাজি হবে। আবার ষড়যন্ত্র চলছে বাংলা ভাষার দাবিকে নস্যাৎ করার। এখন প্রতিবাদ না করলে কেন্দ্রীয় আইনসভায় মুসলিম লীগ উর্দুর পক্ষে প্রস্তাব পাস করে নেবে।

নাজিমুদ্দীন সাহেব উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার কথাই বলেন নাই, অনেক নতুন নতুন যুক্তিতর্ক দেখিয়েছেন। অলি আহাদ যদিও আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সদস্য হয় নাই, তবুও আমাকে ব্যক্তিগতভাবে খুবই শ্রদ্ধা করত ও ভালোবাসত। আরো বললাম, খবর পেয়েছি, আমাকে শীঘ্রই আবার জেলে পাঠিয়ে দিবে, কারণ আমি নাকি হাসপাতালে বসে রাজনীতি করছি।

তোমরা আগামীকাল রাতেও আবার এসো। আরো দু’একজন ছাত্রলীগ নেতাকে আসতে বললাম। শওকত মিয়া ও কয়েকজন আওয়ামী লীগ কর্মীকেও দেখা করতে বললাম। পরের দিন রাতে এক এক করে অনেকেই আসল। সেখানেই ঠিক হলো আগামী একুশে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা দিবস পালন করা হবে এবং সভা করে সংগ্রাম পরিষদ গঠন করতে হবে। ছাত্রলীগের পক্ষ থেকেই রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের কনভেনর করতে হবে। ফেব্রুয়ারি থেকেই জনমত সৃষ্টি করা শুরু হবে।’ (পৃ. ১৯৬-৯৭) ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারির ইতিহাস আমাদের সকলেরই জানা।

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের গতিপথ বেয়ে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে জয়ী হওয়ার স্বপ্ন বাস্তব হয়েছিল। তাই মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু হওয়ার আগে ১৯৭১ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাত ১২:০১ মিনিটে শহীদ মিনারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘১৯৫২ সালের আন্দোলন কেবলমাত্র ভাষা আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, এ আন্দোলন ছিল সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। আপনাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যথেষ্ট রক্ত দিয়েছি। আর আমরা শহীদ হওয়ার জন্য জীবন উৎসর্গ করব না এবার আমরা গাজী হব।সাত কোটি মানুষের অধিকার আন্দোলনের শহীদানদের নামে শপথ করছি যে, আমি নিজের শরীরের শেষ রক্তবিন্দু উৎসর্গ করব।’

এই প্রতিজ্ঞা ফলপ্রসূ করতে গিয়ে তথা মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রামে নিয়োজিত হয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানি শাসকদের কারাগারে ৩০৫৩ দিন জেল খেটেছেন। তবু তিনি মাথা নত করেননি অন্যায়ের কাছে। বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে মাথা নত না করার প্রত্যয় বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে পাওয়া।

অর্থাৎ ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে পাঠানো চিরকুটে তাঁর নির্দেশ ছিল, ‘বাংলা ভাষার প্রশ্নে কোনো আপস নেই। প্রয়োজনে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করবে।’বায়ান্নর পরবর্তী তেপ্পান্নর প্রথম একুশে উদযাপনের বিরাট শোভাযাত্রায় নেতৃত্ব দেন মওলানা ভাসানী এবং শেখ মুজিব।১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী ইশতেহারে সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার, বাংলাকে শিক্ষার মাধ্যম করা, পশ্চিম পাকিস্তানের উর্দু একাডেমির মতো পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা ভাষার সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠা, বাংলার লোকসাহিত্য ও ঐতিহ্যের পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ ইত্যাদি দাবি যুক্ত করা হয়।

আবদুল গাফফার চৌধুরীর স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, ১৯৫৩ সালে একুশের একটি আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হয় ঢাকার মাহবুব আলী ইনস্টিটিউটে। সভাপতিত্ব করেন ড. এনামুল হক। এই সভায় শেখ মুজিব বলেন, ‘ভারত ও বাংলাদেশ ভাগ হওয়ার প্রাক্কালে ১৯৪৬ সালে কলকাতার ইসলামিয়া কলেজের ছাত্রসভায় বক্তৃতা দিতে গিয়ে বলেছিলাম, প্রস্তাবিত পাকিস্তানে বাঙালিরা বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায় হওয়ায় দেশের রাজধানী, নেভাল হেডকোয়ার্টার পূর্ব পাকিস্তানে হওয়া উচিত। বাংলা ভাষার মতো সেরা ভাষা সারা পাকিস্তানে আর নেই। উর্দুও তার সমকক্ষ নয়। তাই আমরা দাবি করতে পারতাম বাংলাই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। আমরা তা করিনি। আজ তারই খেসারত দিতে হচ্ছে বাংলার দামাল সন্তানদের বুকের রক্ত ঢেলে।’

১৯৫৫ সালে বগুড়ার মোহাম্মদ আলী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এ ব্যাপারে বেশির ভাগ রাজনৈতিক নেতা সন্তুষ্টি প্রকাশ করলেও শেখ মুজিব তাঁর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, ‘এটা বাংলা ভাষাকে জাতীয় জীবনে প্রতিষ্ঠার এক ধাপ মাত্র। এই ভাষা জাতীয় জীবনে ও সরকারি কাজকর্মের সর্বস্তরে ব্যবহার না করা হলে, শিক্ষার মাধ্যম না করা হলে কেবল অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে কেতাবি স্বীকৃতি দ্বারা কোনো লাভ হবে না’...

১৯৫৬ সালে আইন পরিষদের অধিবেশনে সংসদের কার্যসূচি বাংলায় লিপিবদ্ধ করার আহ্বান জানান। সে বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারির অধিবেশনে তিনি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়েছিলেন।তিনি বাংলাকে ব্যাবহারিক ভাষা করার ওপর জোর দিয়েছিলেন।এরপর তাঁর নিজের প্রতিষ্ঠিত সাপ্তাহিক ‘নতুন দিন’ পত্রিকায় নিজের নামে প্রকাশিত প্রবন্ধে লেখেন, ‘মোগলরা ফার্সিকে রাজভাষা করেছিল। সাত’শ বছর তা রাজভাষা হিসেবে চালু থাকলেও জনজীবনে প্রতিষ্ঠা পায়নি। ভারতের মানুষ এক’শ বছরের মধ্যে তা ভুলে গেছে। বাংলাকে তেমন সরকারি ভাষা করলে চলবে না। তার আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠা চাই। আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য, আর্থিক কার্যক্রমে বাংলা ভাষা ব্যবহার করা দরকার। ওষুধের একটা প্রেসক্রিপশন বাংলায় লেখা যায় না। ভাষার এই দুর্বলতা দূর করা দরকার। আমাদের ধর্মীয় ও সামাজিক কাজকর্মে ফার্সি, উর্দু, আরবির বদলে বাংলা ভাষা ব্যবহার সর্বজনীন করা দরকার।’

আইয়ুবি জামানায় যখন রোমান হরফে বাংলা লেখার সরকারি প্রস্তাব উঠেছিল, তখন তিনি অধ্যাপক মুনীর চৌধুরীর সঙ্গে মিলে সেই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন এবং সফল হন। ছয় দফা আন্দোলন চলাকালেই তিনি পূর্ব পাকিস্তানের নাম আগের বাংলাদেশ রাখার ঘোষণা দেন এবং বলেন, ‘আজ থেকে আমাদের জাতি পরিচয় হবে বাঙালি।’

১৯৭১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগ সভাপতি বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমার দল ক্ষমতা গ্রহণের দিন থেকেই সকল সরকারি অফিস-আদালত ও জাতীয় জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে বাংলা চালু হবে।’ ১৯৭২ সালে দেশের প্রথম সংবিধানে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়া হয়।১৯৭৫ সালের ১২ মার্চ অফিস-আদালতে বাংলা ব্যবহারের নির্দেশ জারি করেন। ওই আদেশে বলা হয়, দেশ স্বাধীনের দীর্ঘ তিন বছর পরেও বাংলাদেশের বাঙালি কর্মচারীরা ইংরেজি ভাষায় নথি লিখবেন সেটা অসহনীয়।

৪.

মূলত ২০২৪ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী ও মুজিব বর্ষ পেরিয়ে মহিমান্বিত। এজন্য বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করা অনিবার্য। বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় জাতির পিতার অবদানকে স্মরণ করে বিশ্বের কাছে তুলে ধরবার দিনও এটি।বঙ্গবন্ধু বাংলাকে জাতিসংঘের অন্যতম দাপ্তরিক ভাষা করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন।সেই প্রচেষ্টা শেখ হাসিনা সরকারের আমলেও অব্যাহত রয়েছে; কিন্তু শীঘ্রই এর বাস্তবায়ন দেখতে চাই আমরা।রবীন্দ্রনাথের পর বঙ্গবন্ধু বিশ্বসভায় বাংলাকে মর্যাদার আসনে আসীন করেছিলেন বলেই আমরা আজ বিদেশে বাঙালি হিসেবে সম্মান পাচ্ছি। যেমন, ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের অধিবেশনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাংলায় ভাষণ দেওয়ার দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য প্রচলিত হয়েছে ‘বাংলাদেশি ইমিগ্র্যান্ট ডে’ বা ‘বাংলাদেশি অভিবাসী দিবস’।২০১৯ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক স্টেট সিনেটর টবি অ্যান স্ট্যাভিস্কি এই দিনটিকে ‘বাংলাদেশ ইমিগ্রান্ট ডে’হিসেবে রেজ্যুলেশন পাস করার জন্য ২৭ ফেব্রুয়ারি আলবেনিতে অনুষ্ঠিত সিনেট অধিবেশনে বিলটি উপস্থাপন করেন এবং দীর্ঘ শুনানির পর তা সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদিত ও স্টেট ক্যালেন্ডারে অন্তর্ভুক্ত হয়। ফলে ২০১৯ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে প্রতিবছর নিউইয়র্ক স্টেটে দিবসটি পালন করা হচ্ছে।বঙ্গবন্ধুর বাংলা ভাষা প্রীতির কথা স্মরণ করে আরো বিস্তৃত হোক আমাদের একুশের গৌরব।

(লেখক : ড. মিল্টন বিশ্বাস, বঙ্গবন্ধু গবেষক, অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, বাংলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, বিশিষ্ট লেখক, কবি, কলামিস্ট, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রগতিশীল কলামিস্ট ফোরাম, নির্বাহী কমিটির সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ, email-drmiltonbiswas1971@gmail.com)


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

‘প্রয়োজনে শেষ বয়সে এসেও যুদ্ধে নামতে প্রস্তুত আছি’


Thumbnail

দার্শনিক রাষ্ট্রনায়ক যতদিন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আছেন এবং দেশ পরিচালনা করছেন, ততদিন বাংলাদেশে আইনের শাসন এবং মানবাধিকার সম্পূর্ণভাবে আছে। এটা বাংলাদেশের প্রায় ১৮ কোটি মানুষের অধিকাংশের ধারণা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতাও তা-ই বলে। অল্প কিছু মানুষের কাছে এটা বিশ্বাসযোগ্য না। তারা এর বিপরীত কথা বলেন।

এরা কারা? এরা হচ্ছেন বুদ্ধিজীবী। আরও পরিষ্কারভাবে বলার সময় এসেছে। এরা হচ্ছে ডেইলি স্টার এবং প্রথম আলো কর্তৃক তৈরি বুদ্ধিজীবী। কারণ উদাহরণ হিসেবে একটা আর্টিকেল পরে দেখলাম। আনু মুহাম্মদ একজন ভাল ইকনমিস্ট এবং দেশের জন্য খুব চিন্তা করেন। তার ব্যবহার খুবই ভাল। অনেকদিন আগে বিবিসি বাংলা সার্ভিসে আমি তার সাথে আলাপ করেছিলাম। সে জায়গায় আমি খুব কঠিন একটি কথা বলেছিলাম। যখন পরিচালক বললেন যে, এই আনু মুহাম্মদ একজন ইকনমিস্ট এবং এই ব্যাপারে জানেন। ওই সময়ে কয়লা দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্পর্কে তিনি একটা স্ট্যান্ট নিয়েছিলেন। তার স্ট্যান্টটাকে আমি অবশ্যই রেসপেক্ট করি। কারণ, ডেমোক্রেসির এটাই সৌন্দর্য যে, এক একজনের একেক মত। কিন্তু আমি যেটা বলেছিলাম পরে মনে করেছি যে, বিষয়টা ওইভাবে না বললেই ভাল হতো। আমি বলেছি যে, উনি তো এই বিষয়ে একমাত্র বিজ্ঞ না। আরও অনেক বিজ্ঞ লোক আছে। আমি বলেছিলাম এবং সেটা এখনও আমার মনে আছে। এখন মনে হচ্ছে যে, ওই সময়ে আমি আসলে ভুল বলিনি। কারণ, এদেশে বুদ্ধিজীবী বানানোর একটি কারখানা আছে। এই কারখানার মালিক হলো এই প্রথম আলো আর ডেইলি স্টার। আরও স্পেসিফিক্যালি বলা চলে যে, এখানে মতিউর রহমান সাহেব আর মাহফুজ আনাম। এরা ছাড়া এই পত্রিকায় যদি আপনি না লেখেন, এদের ফাংশনে যদি ঠিক মতো না যান তাহলে আপনি বুদ্ধিজীবী হতে পারলেন না। এমনকি বর্তমান সরকারের অনেক মন্ত্রীও সেখানে যেত কিন্তু, তাদের সংখ্যা এখন একটু কম। তা বিশাল বিজ্ঞাপন দেয়, খাতিরও রাখে। কারণ, তারা জানে যে, এত কিছু করেও বুদ্ধিজীবী হতে পারবে না। তবুও তাদের বিরুদ্ধে যেন না লেখে। এই তেলটা তারা ঠিক মতোই দেন। এই প্রথম আলো আর ডেইলি স্টারা যেহেতু বুদ্ধিজীবী এবং মানবাধিকারকর্মী তৈরি করেন, মানবাধিকার রক্ষার নেতা তৈরি করেন, বলা চলে তারা এ দেশের আরও একটা কাউন্টার সরকার।

তাদের কথা, তারা বিশ্বে যেটা প্রচার করবে সেটাই। তারা আইনেরও উর্ধ্বে এবং বাংলাদেশে যে মানবাধিকার তারও ঊর্ধ্বে। কিন্তু একটি দেশ এইভাবে চলতে পারে না। সম্প্রতিকালে এই ডেইলি স্টারের একজন সিনিয়র পার্সন তার বাসায় পরপর দুইজন কাজের মেয়ে মারা গেল এবং এই নিয়ে আইন তার নিজস্ব গতিতে চলছে। সেই জায়গায় আমি অবাক হয়ে গেলাম যে, আনু মুহাম্মদের মত লোক, তিনি যেসব ইস্যু নিয়ে ডেইলি স্টারে লিখছেন, আমি এর কোন আগা-মাথা বুঝলাম না। হয়তো আমার বুদ্ধি কম। তিনি এই বিষয়টি না লিখে বাচ্চাদের কোথায় খাটছে, কোথায় বাচ্চাদের কী করা হয়েছে? তা নিয়ে লিখলে, এটা তো সেই ইস্যু না। আসলে, ওই বাসায় বাচ্চাদের প্রতি আইন অমান্য করেছে কি না বলতে পারছি না। এরপরও আইনকে বাঁচিয়ে বলছি, সাধারণের ধারণা যে নিশ্চয়ই এখানে কোন ব্যাপার আছে। সেটা আইন রক্ষাকারী অর্থাৎ যারা দায়িত্বে তারা দেখবেন, কোর্ট দেখবেন। এটা আগের থেকেই আমার তো নয়ই কারও রিমার্ক করা ঠিক না। তবে একটা জনধারণা আছে, যেটা সকলে প্রকাশ করতে পারে না। কিন্তু তা প্রকাশ করা হয় তারা অ্যাফেকটেড হলে। এটি যদি অন্য কোন পত্রিকা হতো তাহলে আনু মুহাম্মদের মতো লোক এই সকল বুদ্ধিজীবী এবং মানবাধিকার নেতাদের খোঁজ পাওয়া যেত না। এ রকম অনেক ঘটনা ঘটেছে। সেখানে তাদের পাওয়া যায় না। 

সেই জিয়াউর রহমান সাহেবের সময় থেকে শুরু করে বিএনপির সময় ২০০১ সালে যেরকম ভাবে মানুষের প্রতি অত্যাচার করা হয়েছে, নির্বাচনের নামে বিভিন্ন কিছু হয়েছে। তারা বঙ্গবন্ধুর হত্যা নিয়ে কিছু বলে না। অথচ, এরপরও তারা নিজেদের বুদ্ধিজীবী বলে এদেশে অনেক জায়গায় গিয়ে চিফ গেস্ট হন, অ্যাউয়ার্ড পান। কিছুই পেতেন না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কথা কয়বার লেখেন? তা নিয়ে তো উচ্চবাচ্য শোনা যায় না। আপনারা হচ্ছেন আসলে ফ্যাক্টরিতে তৈরি। সুতরাং, ফ্যাক্টরির মালিক সেভাবে চাইবে সেভাবেই হবে। যেমন তুলা যদি তৈরি করা হয়, সেই তুলার যেমন মূল্য থাকে, আপনাদের মূল্যও সেইভাবে। যদি কাগজ তৈরি করে, কাগজের মূল্য যেমন আপনারও তাই। একটা কাগজ, সুতা কিংবা কাপড় বানানো হয় একটি কারখানায়। আর আপনারা এই দুই পত্রিকার কারখানায় তৈরি বুদ্ধিজীবী এবং একই সাথে আপনারাই আবার সিভিল সোসাইটির মেম্বার। আপনারাই আবার মানবাধিকার সংগঠনের সোল এজেন্ট। 

আজ ড. ইউনূসকে নিয়ে আলোচনা হয়। তিনি কি কি আইন ভঙ্গ করেছেন, গ্রামীণ ব্যাংক তৈরি করলো কারা? তাদের সম্পত্তি তাদের অধীনে থাকবে না, সেখানে আপনারা এসব বাইরে পর্যন্ত প্রচার করা শুরু করে দিয়েছেন। আপনাদের সকলের রুট তো এক! দালালি আর কতকাল করবেন? উপরে ভাব দেখাবেন বাম দলের, আর পয়সা-বেনিফিট নেবেন আমেরিকায়। 

উদাহরণ দিয়ে যদি বলি, আজকে যদি আনু আহম্মদের মতো একটা লোক ভিসা চায় আমেরিকায় বা ওয়েস্টার্ন দেশে তাহলে সঙ্গে সঙ্গে ভিসা দিয়ে দেবে সময় লাগবে না। আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ছিলাম পাঁচ বছর। আমি গেলেও এতো তাড়াতাড়ি দেবে না, সময় লাগবে। কারণ, আমি তো বুদ্ধিজীবী না। আমি তো আর আপনাদের মতো না। মানুষের বিবেক হিসেবে আপনারা পরিচিত। একটা গরীব মানুষের বাচ্চা প্রাণ হারিয়েছে, আর তারা ডেইলি স্টারের মতো প্রতিষ্ঠানের লোক। আজ যদি ইত্তেফাকের কারও ক্ষেত্রে এমন ঘটতো? তাহলে তো ফাটিয়ে দিতেন। তাহলে দেখা যেত যে, যত বুদ্ধি আছে এবং প্রয়োজনে ভাড়া করে বা লোক নিয়ে চালিয়ে দিতেন। 

আমার মনে হয়, দেশে এখন আইনের শাসন সঠিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া দরকার। এর আগেও আমি একটা লেখায় লিখেছি, এখনো বলি। তাতে যদি আমাদের প্রতি স্যাংশন আসে, না খেয়েও থাকতে হয় তবুও সম্মান নিয়ে বাঁচতে চাই। বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে দেশে আমি একজন সক্রিয় মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এবং আমি মৃত্যু পর্যন্ত নিজেকে গর্বিত ভাবি। রাষ্ট্র বা কোন ব্যক্তি আমায় মূল্যায়ন করে কি করে না বা অ্যাউয়ার্ড দেয় নাই, এটা কোন বিষয় না। বিষয় হচ্ছে, আমার বিবেক বলে যে আমি ঠিক কাজ করেছি। অন্তত আপনাদের মতো কোন ফ্যাক্টরিতে তৈরি মুক্তিযোদ্ধা আমি না। আপনারা তো ফ্যাক্টরিতে তৈরি হন। যে কারণে, আপনাদের প্রত্যেকের রোল জানা দরকার। 

টাকা পয়সার কথা নিয়ে বলি। প্রথম যখন একতা চালাতেন, তখন বিজনেস ম্যানদের কাছ থেকে টাকা পয়সা খুঁজতেন। আমি তো ওপেন চ্যালেঞ্জ করি। আমি এবং আমার ছেলে-মেয়ে; এমনকি দেশের বাইরে যারা আছে তাদের সম্পূর্ণ সম্পত্তি সম্বন্ধে যে কোন ডিসক্লোজার দিতে রাজি আছি। আমার ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে আলাপ করেছি তারাও রাজি আছে। কারণ, এখানে কোন হারাম পয়সা নাই। কিন্তু, আপনাদের যদি বলা হয় যে, মতিউর রহমান সাহেব একতায় থাকতে আপনার কি ইনকাম ছিল, আর এখন আপনি সর্বোচ্চ ট্যাক্সপেয়ার কিভাবে হন? আপনারা তো আলাদিনের প্রদীপ দেখেন। আপনারা মানুষ আটকে কিভাবে বিজ্ঞাপন নেওয়া যায় তাও দেখেন। আর আমাদের মন্ত্রীরাই আপনাদের দেখে ভয়ে খুত খুত করে। তারাই বড় বড় বিজ্ঞাপন দেয়, অন্যরা তো দূরের কথা। আপনাদের পত্রিকা চলে, তো দেবে না কেন।

স্বাভাবিক নিয়ম হচ্ছে, যে কোন দেশে যারা সরকারে থাকে তাদের বিরুদ্ধে বললে সকলে তা আগ্রহ নিয়ে পড়ে। এটা ঠিক এবং স্বাভাবিক সাইকোলজি। এটা আমার মধ্যেও আছে, আমি অস্বীকার করি না। কিন্তু, সরকারের ভালোটা দেখার জন্য অবজেকটিভ হতে হয়, নিজের বিবেকের কাছে প্রশ্ন করতে হয়। যে কোন কাজ পছন্দ না হলে তা আমি বলি। কিন্তু, আপনাদের কি কোন কাজই কি চোখে পড়ে না যা লেখার মতো? এই পত্রিকায় একটা এডিটোরিয়াল লিখে একটা অন্যায়কে আপনাদের জাস্টিফাই করতে হবে। আপনারা কি এতো পঁচে গেছেন? আপনারা হচ্ছেন দুর্গন্ধযুক্ত বুদ্ধিজীবী, দুর্গন্ধযুক্ত সিভিল সোসাইটির মেম্বার এবং দুর্গন্ধযুক্ত মানবাধিকার নেতা সাজা মানুষ। এই দুর্গন্ধ যদি সমাজ থেকে দূর না হয় তাহলে সমাজ সঠিক হবে না। সব সরকারি দুর্নীতি যদি ঠিক হয়ে যায় তাতেও আমি বিশ্বাস করি না বাংলাদেশের দুর্নীতি বন্ধ হবে। কারণ, আমি বিশ্বাস করি এই সমস্ত দুর্নীতির গোড়াপত্তন করেন আপনাদের মতো ভাড়াটিয়া, কারখানায় তৈরি বুদ্ধিজীবীরা। 

আমি বলবো এখন আর দেরি করার নতুন এক্সপেরিমেন্ট করার সময় নাই। সমাজ দুইভাগে ভাগ হয়ে গেছে। আগে ছিল একদিকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ, আরেকদিকে রাজাকার আল-বদর। তারা রয়ে গেছে, তাদের ভাগ হয়নি। কিন্তু যেটা নতুন উপদ্রব সৃষ্টি হয়েছে দিনে দিনে সেটা হচ্ছে প্রথম আলো আর ডেইলি স্টারের বদান্যতায় এই তথাকথিত বুদ্ধিজীবী, সিভিল সোসাইটি আর মানবাধিকার কর্মী এই তিনদল। এদের যদি ঠিক মতো আইনের আওতায় না রাখা যায় তাহলে বিপাক। সরকার কিছু করে না, করে আইন। যেমন ড. ইউনূসের ব্যাপারে সরকারের কিছু করণীয় নাই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অনেক ক্ষমতাশালী এবং অনেক কিছু করতে পারলেও আইন এবং কোর্টের ব্যাপারে তার কোন ক্ষমতা নাই। তিনি সম্পূর্ণভাবে এর বাইরে থাকেন। ব্যাপারটা এমন না যে, মাহফুজ সাহেব ডিজিএফআইয়ের কাছ থেকে রিপোর্ট এনে লিখে দিলেন যে, শেখ হাসিনা চুরি করেছেন। এরকম রেকর্ড নাই দার্শনিক রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার। তিনি দর্শন দিয়ে দেশ পরিচালনা করে, বিশ্ব পরিচালনা করেন। যার জন্য কেউ যে পয়েন্ট বলতে সাহস করেন নাই, অথচ তিনি খুব দামি কথা বললেন এবার জার্মানিতে গিয়ে। ইউক্রেনকে যুদ্ধ থামাতে বললেন। আর অফ দ্যা রেকর্ডে আমরা বিভিন্ন সোর্স থেকে বুঝেছি যে, শুধুমাত্র ন্যাটো মেম্বারশীপের জন্য অগণিত মানুষ যুদ্ধে মারা যাবে, বিশ্বের বহু মানুষ এর ভুক্তভোগী হবে, এটা কাম্য হতে পারে না। সুতরাং, এই বিষয়টি ফয়সালা করুন। এটা কেবল দার্শনিক রাষ্ট্রনায়কের পক্ষেই সম্ভব, শুধু শেখ হাসিনা হলে তিনি এটা পারতেন না। আর আমরা এরকম একজন দার্শনিক রাষ্ট্রনায়কই চাই এবং অনেকদিন পর্যন্ত চাই।

আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি আগামী নির্বাচনেও এই দার্শনিক রাষ্ট্রনায়কই আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব দিবেন এবং আবারও প্রধানমন্ত্রী হবেন। আমাদের দেশ সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে উঠবে কিন্তু এর আগে এই আগাছা পরিস্কার করতে হবে। সব জায়গায় আগাছা পরিস্কার না করলে কোন ফসল ঠিক মতো হয় না। আমার মতে এই আগাছা হচ্ছে এই দুই পত্রিকা। আমি এই দুই পত্রিকা বন্ধ করার পক্ষে না। যে যার ভিউ তারা লিখুক। কিন্তু, আইনের যারা সামান্য একটু বাইরেও যারা যাবে তাদের সাথে সাথে এর আওতায় নেওয়া উচিত। বিএনপির দুইজন নেতা যদি এতোদিন জেল খাটতে পারে, তাদের নিয়ে কয়টা লেখা লিখেছে এসব বুদ্ধিজীবীরা। আমার তো একটাও চোখে পড়ে না। বুঝলাম আমি বিএনপির আদর্শে বিশ্বাস করি না। কিন্তু, যে দুইজন জেলে থাকলে তাদের নিয়ে তো লেখা যেত। তা নিয়ে কোন এডিটোরিয়াল বের হয় না। আপনাদের কারখানা যখন এফেকটে হলো তখন এডিটোরিয়াল বের হলো। এই আপনাদের বুদ্ধিজীবী। আর কতকাল এই সব ভাঁওতাবাজি করবেন? আমরা ভাঁওতাবাজি ফ্রি দার্শনিক রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সঠিক আইনের শাসন এবং একই সাথে সিভিল সোসাইটি যেন সুসংগঠিত হয়, মানবাধিকার যেন প্রতিষ্ঠিত হয় সেই সংগ্রামে প্রয়োজনে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এই শেষ বয়সে এসেও যুদ্ধে নামতে প্রস্তুত আছি।


দার্শনিক   রাষ্ট্রনায়ক   আইন   শাসন   মানবাধিকার  


মন্তব্য করুন


বিজ্ঞাপন