এডিটর’স মাইন্ড

শোবিজের তারকারা কেন এমপি হতে চান

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ১২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪


Thumbnail

মাধুরী দীক্ষিত। ভারতে চলচ্চিত্রের মস্ত তারকা। সিমি গারেওয়াল শোতে এসে তার জীবনের অনেক প্রসঙ্গ নিয়ে খোলামেলা কথাবার্তা বলেছেন। সিমি ওই শোতে মাধুরীকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তোমার রাজনীতি করার ইচ্ছা আছে কি না? উত্তরে মাধুরী জানতে চান, রাজনীতি করতে হবে কেন? সিমি বলেছিলেন, মানুষের সেবা করার জন্য বা বড় কোনো মহৎ কাজ করার জন্য। উত্তরে মাধুরী বলেন, ‘মানুষের সেবা কিংবা মহৎ কোনো কাজ রাজনীতি না করেও করা যায়। প্রত্যেকে তার অবস্থান থেকেই দেশের জন্য, মানুষের জন্য কাজ করতে পারেন।’ হিন্দি সিনেমার এ জনপ্রিয় অভিনয় শিল্পী বলেছিলেন, ‘প্রত্যেকের কাজের আলাদা আলাদা ক্ষেত্র আছে। সেই জায়গায় থেকেই কাজ করা উচিত। এতে দেশের মঙ্গল, জনগণের কল্যাণ।’

মাধুরীর এ বক্তব্যটি নতুন করে মনে পড়ল সংরক্ষিত আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী শোবিজের তারকাদের হুমড়ি খাওয়া দেখে। গত ৬ থেকে ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সংরক্ষিত আসনের জন্য আওয়ামী লীগ মনোনয়ন ফরম বিক্রি ও জমা দেওয়ার সময়সীমা নির্ধারণ করেছিল। তিন দিনে আওয়ামী লীগ ১ হাজার ৫৪৯টি মনোনয়ন ফরম বিক্রি করে। শুধু ফরম বিক্রি করেই টানা চার মেয়াদে থাকা দলটির আয় প্রায় ৮ কোটি টাকা। মাত্র ৪৮টি আসনের বিপরীতে এত বিপুলসংখ্যক মনোনয়ন লাভে আগ্রহীর সংখ্যা নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর। প্রতিটি আসনের জন্য ৩২ জনের বেশি নারী মনোনয়নপ্রত্যাশী। অবশ্য এ রেকর্ডসংখ্যক প্রার্থী হওয়ার ঘটনা আওয়ামী লীগের নতুন নয়। টানা ক্ষমতায় থাকা, প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচন, ইত্যাদি নানা কারণে বিভিন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের টিকিট প্রাপ্তির এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা লক্ষ করা যাচ্ছে। এ দেশে এখন যেন সবাই আওয়ামী লীগ। সংরক্ষিত ৪৮টি আসনের জন্যও তাই আগ্রহীদের সংখ্যা বেড়েছে। সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টন করা হয় জাতীয় সংসদে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত আসনের ভিত্তিতে। বাংলাদেশে যারা নারী আন্দোলনের নেতৃত্বে, যেসব নারী বিভিন্ন পেশাগত ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন, তারা এই ‘পিঠা ভাগ নীতির’ তীব্র বিরোধী। ৫০টি সংরক্ষিত আসনে সরাসরি ভোটের দাবি দীর্ঘদিনের। কিন্তু দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অনেক বিষয়ে সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থান থাকলেও, এ বিষয় তারা একমত। ভাগবাটোয়ারার মাধ্যমে যাকে খুশি নারী সংসদ সদস্য বানিয়ে, নারীর ক্ষমতায়নের জায়গাটা নষ্ট হচ্ছে। যারা সংরক্ষিত আসনে নির্বাচিত হন, তাদের মধ্যে হাতেগোনা কয়েকজন মাত্র সংসদে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পেরেছেন। অধিকাংশ নারী সংসদ সদস্যরা এখনো সংসদে ‘অলংকার’ হিসেবেই বিবেচিত হন। যেটি সরকারের নারীর ক্ষমতায়ন নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত। তারপরও আওয়ামী লীগ সংরক্ষিত আসনে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বহুমাত্রিক বৈশিষ্ট্য রাখার চেষ্টা করে। ত্যাগী, পরীক্ষিত, মাঠে রাজনীতি করা নারীদের সামনে আনার সুযোগ কাজে লাগায় মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া দলটি। বিভিন্ন ক্ষেত্রে যারা অবদান রেখেছেন তাদের সংসদে আনার উদ্যোগ লক্ষ করা যায়। বিশেষ করে তৃণমূলের নারীদের ক্ষমতায়নের জন্য আওয়ামী লীগ সংরক্ষিত আসনকে ব্যবহার করতে একটা প্রচেষ্টা নেয় সবসময়। এ কারণে গত তিনবারে দেখা গেছে, রাজনীতিবিদদের বাইরেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখা অনেক নারীকে সংসদে আনা হয়েছে। একই মুখ বারবার সংরক্ষিত আসনে জায়গা পায়নি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এ প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু এর মাধ্যমে অনেকে সম্ভবত একটা ভুল বার্তা পেয়েছেন। বিশেষ করে শোবিজের প্রায় অবসরে যাওয়া, কর্মহীন কলাকুশলীরা। তারা মনে করেছেন, সংসদ বোধহয় রাজনীতিবিদদের জায়গা না। এটাকে তারা ক্লাব বা সমিতি মনে করেন। সংসদ সদস্য হওয়া মানে এলিট ক্লাবের সদস্য হওয়া। তাই টেলিভিশন, সিনেমায় অভিনয় করার কারণে তাদের যে পরিচিতি, সেটি ব্যবহার করে তারা সংসদ সদস্য হতে ব্যাপক আগ্রহী হয়ে উঠছেন দিনে দিনে। এবার যে ১ হাজার ৫৪৯ জন মনোনয়ন লাভের জন্য ৫০ হাজার টাকা খরচ করেছেন, তাদের বেশিরভাগই রাজনীতিবিদ। কিন্তু জনপরিচিতির কারণে শোবিজের তারকাদের নিয়ে হৈচৈ হচ্ছে। আমাদের গণমাধ্যম ২১ আগস্টে গ্রেনেড হামলায় ক্ষতবিক্ষত একজন পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদের চেয়ে শোবিজের প্রায় পরিত্যক্ত নায়িকার ফরম তোলার দৃশ্য কাভার করতে বিশেষ মনোযোগী। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াতের তাণ্ডবে হিংস্রতা ও বর্বরতার সাক্ষ্য বহনকারী নারীর মলিন মুখ, টেলিভিশন ক্যামেরায় ধরা পড়ে না। টিভি ক্যামেরা খোঁজে বিয়ের সাজে আসা নায়িকার গ্ল্যামারস হাসি। আওয়ামী লীগের ৪৮টি আসনে মনোনয়নে আগ্রহী শোবিজের তারকার সংখ্যা কম করে হলেও পঞ্চাশ। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ চেহারা দেখেও যদি সব সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন দেয়, তাহলেও অন্তত দুজন নায়িকা বাদ পড়বেন। শোবিজের সবাই যদি সংসদে যান তাহলে আমাদের নাটক সিনেমা কিংবা ওটিটির কী হবে? এমনিতে সিনেমার বারোটা বেজে গেছে। নাটকের মান নিয়েও অনেক প্রশ্ন। ওটিটি প্ল্যাটফর্মে ঘৃণা ও সন্ত্রাসের সংস্কৃতিকে উসকে দিচ্ছে। এখন সংস্কৃতিকর্মীদের অনেক কাজ। সংস্কৃতির মাধ্যমে ধর্ষণ, দুর্নীতি ও সামাজিক অস্থিরতার বিরুদ্ধে জাগরণ সৃষ্টি করার চ্যালেঞ্জ নিতে হবে তাদেরই। কিন্তু এ দায়িত্ব না নিয়ে কেন রাজনীতির মাঠে তাদের পদচারণা? তাদের কজন আদর্শের টানে আওয়ামী লীগে নৌকা ভিড়িয়েছেন তা নিয়ে দেশের জনগণের ঘোরতর সন্দেহ আছে। গত ১০ বছরে শোবিজের নারী-পুরুষ মিলে যে আওয়ামী-বলয় তৈরি করেছেন, তারা কজন ‘অতিথি পাখি’ আর কজন ‘সুবিধাবাদী’ তা সময়ই সব বলে দেবে। দুঃসময়ে তাদের কজন বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক থাকে তা দেখার অপেক্ষায় রইলাম। আমার এ সন্দেহের কারণ হলো, এসব তারকা আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে ফটোসেশন করেই চলে যান তদবিরে। কেউ টেন্ডারের তদবির করেন, কেউ করেন ব্যাংক লোনের, কেউ চলচ্চিত্র নির্মাণের অনুদানের। এসব কথিত তারকার রাজনীতি করার সঙ্গে নগদ প্রাপ্তির লোভ সম্পর্কিত। সন্দেহ হয়, আওয়ামী লীগ টানা ক্ষমতায় আছে, এজন্যই এ তারার মেলা। ক্ষমতা কেন্দ্রে থেকে নানারকম সুযোগ-সুবিধা লাভের হাতিয়ার হিসেবেই তাদের ‘আওয়ামী প্রেম’ কি না, সে প্রশ্ন অনেকের। কারণ পেশাগত জীবনে তাদের বেশিরভাগই কর্মহীন। টুকটাক যা কাজ করেন, তা দিয়ে এরকম বিলাসী জীবন সম্ভব নয়। অভিনয়ের কষ্টের চেয়ে রাজনীতি এখন অনেক সহজ। তাই রাজনীতিই এখন তাদের পেশা।

১৯৮৪ সালে যখন সবে সাংবাদিকতা শুরু করি, তখন বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের একটি অনুষ্ঠান কাভার করতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়েছিলাম। সেখানে আলমগীর কুমকুম, কবরী সারোয়ার এবং ফারুক ছাড়া পরিচিত কোনো মুখ দেখিনি। হাতেগোনা কয়েকজন মানুষ এ অনুষ্ঠানে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল এবং বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার দাবি করেন। এরশাদের সেই জমানায় বড় বড় সব তারকার ভিড় থাকত বঙ্গভবনের নানা অনুষ্ঠানে। রাজসভায় শুধু কবি ছিলেন না, গায়ক, নায়িকা, গায়িকা কোনো কিছুরই অভাব ছিল না। এরশাদও খুবই রোমান্টিক ছিলেন। শোবিজের তারকাদের তিনি বিশেষ যত্নআত্তি করতেন। এরশাদের পতনের পর এরশাদ ভক্ত এরকম বেশ কজন গণলাঞ্ছনার শিকার হন। কিন্তু তারা ভোল পাল্টাতে সময় নেননি। দ্রুত তারা জিয়ার সৈনিকে পরিণত হন। ’৯১ থেকে ’৯৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি জমানায় টেলিভিশন আর্কাইভ ঘাঁটলেই দেখা যাবে আমাদের টেলিভিশনে জিয়া ভক্তের কী বাম্পার ফলন হয়েছিল। এভাবেই শোবিজের তারকারা যখন যার তখন তার নীতিতে থেকেছেন। তাই এবার যারা আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়েছেন তাদের অনেকেই কখনো তারেক জিয়া, কখনো গয়েশ্বর রায়ের সঙ্গে ফটোসেশন করেছেন। কিছু দুষ্ট লোক এসব আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছে। কে ‘জাসাস’ আর কে ‘জিসাস’ করেছে, সেসব খবরও এখন প্রকাশ্যে। তারকারা অবশ্য এটাতে বিব্রত নন। কারণ তারা অভিনয়শিল্পী। চারপাশের সঙ্গে খাপ-খাওয়ানো অভিনয় শিল্পের একটি বড় যোগ্যতা। ২০০১ সালে যারা ‘হাওয়া ভবন’ কিংবা ‘খোয়াব ভবনে’ যেতেন, তারা চরিত্রের প্রয়োজনে যেতেন। এখন যারা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন জায়গায় যান সেটাও চিত্রনাট্যের দাবি। তারকা বেচারা কী করবেন। যারা মনোনয়ন ফরম কিনেছেন, তাদের সবাই যে এ কিসিমের তা বলাটা হবে রীতিমতো অন্যায়। তাদের অনেকেই কবরী কিংবা ফারুকের মতো বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী। দুঃসময়ে আওয়ামী লীগের পাশে ছিলেন। দুয়েকজনের কথা লিখতেই হয়। রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা। বন্যা আপাকে আমার মনে হয় বঙ্গবন্ধু এবং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ধারণ করা এক পরিপূর্ণ বাঙালি ব্যক্তিত্ব। সারা জীবন রবীন্দ্রসংগীতের মাধ্যমে বাঙালির আত্মপরিচয়কে তুলে ধরেছেন। অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে লালন করেছেন হৃদয় দিয়ে। শমী কায়সার শহীদ শহীদুল্লা কায়সারের কন্যা। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে সারা জীবন আপসহীন। ২০০১ সালের একটি ঘটনা আমি বিভিন্ন সময়ে স্মরণ করি। এখানেও করতে চাই। সেবারই বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো একটি সরকার তার মেয়াদ পূর্ণ করল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান লতিফুর রহমানের কাছে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করলেন শেখ হাসিনা। তখনই বিএনপি প্রচার শুরু করল ‘সাবাশ বাংলাদেশ’ শিরোনামে বিএনপি নির্মিত নির্বাচনী তথ্যচিত্র। এটিএন বাংলায় এটি প্রচারের পর হৈচৈ শুরু হলো। আওয়ামী লীগের ঘুম ভাঙল। পাল্টা প্রামাণ্যচিত্র বানানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো তাৎক্ষণিকভাবে। বর্তমান অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী, যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সভাপতি সুলতান শরীফ, বর্তমান হুইপ ইকবালুর রহিম আর নঈম নিজামকে দায়িত্ব দেওয়া হলো ‘সাবাশ বাংলাদেশের’ জবাব দেওয়ার জন্য। কাউকে না পেয়ে তারা এলেন আমার সিদ্ধেশ্বরীর অফিসে। তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে আমরা প্রায় অপ্রস্তুত অবস্থায় শুরু করলাম ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ। ‘সাবাশ বাংলাদেশের’ উপস্থাপক ছিলেন অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী। আমি একজন উপস্থাপকের সন্ধানে তারকাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরলাম। উপস্থাপনার দরকার নেই, শুধু মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে কথা বলার জন্য করজোড়ে অনুরোধ জানালাম কতজনকে। সবাই ফিরিয়ে দিলেন শুধু শমী কায়সার ছাড়া। ওই নির্বাচনী প্রামাণ্যচিত্রে উপস্থাপনার জন্য বিএনপি জোট আমলে সব চ্যানেলে নিষিদ্ধ হয়েছিলেন শমী কায়সার। প্রচণ্ড জনপ্রিয় এ শিল্পীর ক্যারিয়ার ধ্বংস করেছিল বিএনপি-জামায়াত সরকার। কিন্তু শমী সমঝোতা করেননি। আপস করেননি। শহীদের সন্তানরা কখনো বিশ্বাসঘাতকতা করে না। তারানা হালিম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার বিভাগের (আইন) মেধাবী শিক্ষার্থী। তিনি যুবলীগে যোগ দেন ১৯৯৪ সালে, আওয়ামী লীগের কঠিন সময়ে। যখন আওয়ামী লীগের পরিচয় দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। বঙ্গবন্ধু নিষিদ্ধ। কোনো কিছু প্রাপ্তির প্রত্যাশায় নয়, আদর্শের প্রতি ভালোবাসায় তিনি ওই সিদ্ধান্ত নেন। তাদের মধ্যে অতিচাটুকারিতা দেখা যায় না। তাদের আওয়ামী লীগ প্রমাণের জন্য অতি অভিনয়েরও দরকার হয় না। আওয়ামী লীগে যারা ’৭৫ দেখেছেন, ’৯১ বিপর্যয়ে বিধ্বস্ত হয়েছেন, ২০০১ সালে সর্বস্ব হারিয়েছেন, ২০০৭ সালে আওয়ামী লীগ সভাপতির পক্ষে লড়াই করেছেন, তারা হঠাৎ বনে যাওয়া আওয়ামী লীগের বাড়াবাড়ি দেখলে ভয় পান। শোবিজের তারকারা কেন এমপি হতে চান? নাটক, চলচ্চিত্রের মাধ্যমেও তো মানুষের জন্য, দেশের জন্য কাজ করা যায়। জনগণের মধ্যে জাগরণ সৃষ্ট করা যায়। সাম্প্রদায়িকতা, সন্ত্রাস এবং জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সংস্কৃতি সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। শোবিজের তারকাদের বহু কিছু করার আছে দেশের জন্য। সেটা না করে তাদের এমপি হতে হবে? জাতীয় সংসদে কি মধু আছে? সংস্কৃতি জগৎ থেকে নিশ্চয়ই সংসদে প্রতিনিধি দরকার। এরই মধ্যে আসাদুজ্জামান নূর এবং ফেরদৌস সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছেন। নারী সংসদ হিসেবে আরও এক-দুজন আসতেই পারেন। কিন্তু এভাবে এত তারকা কেন নারী কোটায় সংসদ সদস্য হতে আগ্রহী হলেন? কিছু পাওয়ার আশায়, নাকি শোবিজ জগতে তাদের প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে বলে?

 

লেখক: নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত



মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

সবচেয়ে সস্তা এখন মানুষের জীবন

প্রকাশ: ১০:০১ এএম, ০৪ মার্চ, ২০২৪


Thumbnail

বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে যেদিন (২৯ ফেব্রুয়ারি) প্রজ্ঞাপন জারি করা হলো, সেদিন রাতেই ভয়ংকর দুর্ঘটনায় বেইলি রোডে প্রাণ হারালেন বহু নিরীহ মানুষ। বাংলাদেশে গ্যাস দুর্ঘটনা, আগুন লাগা ইত্যাদি নানা বিপর্যয়ে মানুষের মৃত্যু যেন এখন এক স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। কয়েক মাস পরপর গ্যাস বিস্ফোরণ, বিদ্যুতের শর্টসার্কিট, রহস্যময় আগুনে বহু প্রাণ যায়। কিছুদিন চলে হৈচৈ। গঠিত হয় তদন্ত কমিটি। অনিয়ম বন্ধে অঙ্গীকারের দীর্ঘ তালিকা তৈরি হয়। কিছু মানবিক বিপর্যয়ের গল্প আমরা সংবাদপত্রে পড়ি। ব্যস, তারপর সব ঠিকঠাক।

সবকিছু চলে আগের মতোই। কেউ দায় নেয় না, কারও বিচার হয় না, অনিয়ম বন্ধ হয় না। আমরা অপেক্ষা করি, আরেকটি বড় দুর্ঘটনার। বেইলি রোডের দুর্ঘটনার পর জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান বলেছেন—মনে হচ্ছে অন্ধকার যুগে বাস করছি। এসব দুর্ঘটনায় যারা মারা যান, তাদের খবর পরে কেউ রাখে না। প্রতি বছর ঘটা করে এরকম বিপর্যয় আমাদের সামনে আসে। মানুষের মৃত্যু হয়, আমরা আর্তনাদ করি। তারপর...। নিমতলী, চুড়িহাট্টা, বনানী এফআর টাওয়ার, বঙ্গবাজার, নিউমার্কেট, মগবাজার দুর্ঘটনার এই তালিকা দীর্ঘ। এসব ঘটনা প্রমাণ করেছে আমাদের জীবন কত তুচ্ছ, মূল্যহীন। এসব ট্র্যাজেডিতে যারা মারা গিয়েছিলেন তাদের পরিবারগুলোর খবর কজন রেখেছে? এসব হৃদয়বিদারক ঘটনার পর সরকার কোথাও কোথাও নিহত পরিবারকে যৎসামান্য আর্থিক সহায়তা দেয়। কিন্তু এত নগণ্য যে, যারা এসব চেক বা টাকা হস্তান্তর করেন, তারাও লজ্জায় কুণ্ঠিত থাকেন।

বেইলি রোডে দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া পরিবারের জন্য এখন পর্যন্ত কোনো আর্থিক অনুদানের ঘোষণা জানা যায়নি। বেশিরভাগ দুর্ঘটনার পর নিহতদের পরিবার পায় একদিনের সান্ত্বনা। সাধারণ মানুষের চোখের জল আর মিডিয়ার প্রচারণা। কোথাও এক লাখ, কোথাও পঞ্চাশ হাজার টাকা অনুদান দেওয়া হয়। জেলা প্রশাসক কিংবা সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে। এক লাখ টাকায় কত কেজি চাল কিনতে পাওয়া যায়? কত কেজি পেঁয়াজ হয় এই টাকায়? বাজারে জিনিসপত্রের দামের সঙ্গে একটি জীবনের দাম মেলালে দেখা যায়, জীবনের মূল্যই সবচেয়ে সস্তা, সুলভ। এরকম হিসাব মাথায় এলো এ কারণে যে, মুদ্রাস্ফীতির চাপে মানুষ এখন পিষ্ট। বাজারে গিয়ে আমাদের মতো মধ্যবিত্তের দম বন্ধ হয়ে আসে। ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে বাজারের ফর্দ।

এর মধ্যে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলো। প্রতিমন্ত্রী অবশ্য একে মূল্যবৃদ্ধি বলতে শরম পান। তিনি বলেন দাম সমন্বয়। বাংলাদেশে দাম সমন্বয় এক অদ্ভুত গণিত। সমন্বয়ে শুধু মূল্য বাড়ে, কমে না। পেট্রোল, অকটেনের দাম সমন্বয় করা হয়েছিল, কিন্তু বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমলেও দাম কমেনি বাংলাদেশে। এই দেশে কোনো কিছুর দাম বাড়লে সেটি আর কমে না। স্থিতিশীল থাকলেই মানুষ স্বস্তি পায়। সামনে রোজা। সবকিছুর দাম বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। দৃশ্যত বাজারের ওপর কারও কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। বাজারের ওপর সরকার নিয়ন্ত্রণ নিতে চায় কি না, তা নিয়েও আজকাল জনগণের সন্দেহ। গত মেয়াদে বাণিজ্যমন্ত্রী ছিলেন এক অর্বাচীন বাঁচাল।

পাঁচ বছরে তিনি বাজার ব্যবস্থাপনার সর্বনাশ করেছেন। বাজারকে তুলে দিয়েছেন সিন্ডিকেটের হাতে। সেই সিন্ডিকেট এখন দানবে পরিণত হয়েছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন ধরনের অভিযান হয় বটে। কিন্তু ফল হয় হিতে-বিপরীত। জিনিসপত্রের দাম আরও বাড়ে। মজুতদাররা আরও সতর্ক হয়ে যায়। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, মজুতদার ও সিন্ডিকেটকে গণধোলাই দিতে। এ থেকে বোঝা যায় সিন্ডিকেট কত শক্তিশালী। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হয় সিন্ডিকেটের কাছে বশীভূত অথবা অসহায়। এজন্য জনগণের প্রতিরোধের ডাক দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু সিন্ডিকেটের কাছে জনগণও অসহায়। গত পাঁচ বছরে টিপু মুন্সির উদ্ভট মন্ত্রিত্বের অবসানের পর আশা করেছিলাম এবার একজন দক্ষ, যোগ্য মন্ত্রী দেওয়া হবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে। সরকার এই মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল নেতাকে দেবে। এরকম বহু ব্যক্তি আওয়ামী লীগে আছেন, যারা ব্যবসায়ী, মজুতদারদের বেপরোয়া মুনাফার লাগাম টেনে ধরতে পারবেন। কিন্তু বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে একজন পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রীও দেওয়া হলো না। অনভিজ্ঞ এক তরুণের হাতে তুলে দেওয়া হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়টি। নতুন বালক পুকুরে সাঁতার কাটতে গিয়ে যেমন পানিতে হাবুডুবু খায়, বর্তমান বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রীর হয়েছে সেই হাল। নতুন সরকারের কথা আর কাজের অসামঞ্জস্যতা এখানে বিকটভাবে ধরা দেয়। আওয়ামী লীগ তার নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষণা করেছিল যে, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ তাদের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার।

১১ জানুয়ারি সরকার গঠনের পর দ্রব্যমূল্যে নিয়ন্ত্রণকে প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল সরকারের পক্ষ থেকে। প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রত্যেকেই দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারের অগ্রাধিকারের কথা বলেছেন। কিন্তু সরকারের এ আগ্রহের প্রতিফলন দেখা যায়নি মন্ত্রিসভার দপ্তর বণ্টনে। এটি যদি সরকারের কাছে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুই হয়, তাহলে এখানে কেন সিনিয়র মন্ত্রীকে দায়িত্ব দেওয়া হলো না? এরকম সংকট মোকাবিলা দলের সাধারণ সম্পাদক কিংবা কোনো গুরুত্বপূর্ণ নেতার এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিলে জনগণ আশ্বস্ত হতো। তারা বুঝত যে, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকার সত্যিই আন্তরিক। কিন্তু তা হয়নি। তা ছাড়া দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি শুধু সিন্ডিকেটের কারণে হয় না। বিদ্যুতের দাম বাড়লে চালের দাম বাড়বেই। চালের দাম বাড়লে শাকসবজির দাম বাড়বে। পুরো বাজার অস্থির হবে। পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়। একটি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি আরেকটি পণ্যের দাম বাড়ার কারণ। সরকার বাজার ব্যবস্থাপনা, পরিবহন খাতে নৈরাজ্য এসব বন্ধের উদ্যোগ না নিলে দ্রব্যমূল্যের লাগাম টেনে ধরতে পারবে না। টানা চতুর্থবারের মতো সরকার গঠনের পর আওয়ামী লীগ সরকার ঘোষণা দিয়ে কিছু জিনিসের দাম বাড়াচ্ছে। সরকারি সেবা সংস্থাগুলোতে যেন মূল্যবৃদ্ধির প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। যে ওয়াসা সাধারণ মানুষকে নিরাপদ পানি সরবরাহ করতে পারে না, তারা পানির দাম বাড়াতে চায়।

বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। গ্যাসের মূল্য আরেক দফা বাড়ানোর কথা শোনা যাচ্ছে। রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলো চিনির মূল্য বাড়ানোর ঘোষণা দিয়ে আবার সরে এসেছে বটে, কিন্তু ততক্ষণে অঘটন যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। সরকারের এসব সিদ্ধান্তের প্রভাব চাল-ডাল-পেঁয়াজসহ নিত্যপণ্যের বাজারে পড়বেই। এটা অর্থনীতির সাধারণ সূত্র। অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় ভর্তুকি সংস্কৃতি থেকে সরকার বেরিয়ে আসতে চাইছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভর্তুকি বন্ধে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংকসহ ঋণদাতাদের বড় চাপ আছে। সরকারের রাজস্ব আহরণ ঠিকঠাকমতো হচ্ছে না। ঋণে জর্জরিত অর্থনীতি বাঁচাতে জনগণের ওপর চড়াও হওয়ার সহজ পথ বেছে নিয়েছে সরকার। ভর্তুকি কমিয়ে, কর বাড়িয়ে ঘাটতি মেটানোর কৌশল পুরোনো ও বস্তাপচা। এর মধ্যে কোনো সৃজনশীলতা নেই। এই পথ গণবিরোধী ও স্ববিরোধীও বটে, একদিকে সরকার দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের কথা বলছে, অন্যদিকে আবার সরকারই সেবা খাতে মূল্য বাড়াচ্ছে।

সরকারের পক্ষ থেকে কেউ কেউ বলছেন, সংকট মোকাবিলায় বাধ্য হয়েই সরকারকে এটা করতে হচ্ছে। সরকার উপায়হীন। কিন্তু আসলে কি সরকার উপায়হীন? সরকারের হাতে কি আর কোনো বিকল্প ছিল না? আমি মনে করি, সংকট মোকাবিলায় সরকারের কাছে আরও বিকল্প আছে। জনগণের ওপর চাপ সৃষ্টি না করেই সরকার অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে পারে। খেলাপি ঋণ আদায়ে সরকার কঠোর হচ্ছে না কেন? ইচ্ছাকৃত খেলাপিরা জনগণের টাকা লুণ্ঠন করে রাজার হালে আছে। ব্যাংক লুটের টাকায় তারা বিলাসী জীবন কাটাচ্ছে। তাদের কেউ কেউ সংসদেও জায়গা করে নিয়েছে। এসব লুটেরার বিরুদ্ধে সরকার কেন অসহায়? খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি কমিয়ে আনলে অর্থনীতি চাঙ্গা হয়। অর্থ পাচারকারী লুটেরাদের ব্যাপারে সরকার নির্মোহ এবং কঠোর হতে পারছে না কেন? কারা অর্থ পাচার করেছে সবাই জানে। বিদেশে কার কোথায় সম্পদ কারও অজানা নয়। সুইস ব্যাংকে টাকা উদ্ধারে সরকার কি কোনো ব্যবস্থা নিতে পেরেছে? কদিন আগে ব্লুমবার্গের একটি প্রতিবেদন নিয়ে দেশ-বিদেশে হৈচৈ হলো। সাবেক এক মন্ত্রীর লন্ডনে সম্পদের ফিরিস্তি দেখে গোটা জাতি হতবাক। কিন্তু এ খবর প্রকাশের পর সরকার নীরব কেন? ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা লন্ডনে গেল কোন পথে? আওয়ামী লীগ সরকার কেন এসব অনিয়মকে প্রশ্রয় দিচ্ছে? এসব অপকর্মের ভাগীদার হচ্ছে। খেলাপি ঋণ, অর্থ পাচার আর দুর্নীতি বন্ধ করলে বাংলাদেশের অর্থনীতির এ বিবর্ণ চেহারা থাকবে না; এটা সবাই জানে। কিন্তু তারপরও সরকার এসব দুর্বৃত্তের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে কেন জনগণের ওপর নিত্যনতুন বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে?

কালো অর্থনীতিতে বলা হয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম যখন বাড়ে তখন ঘুষের রেটও বাড়ে। বাংলাদেশেও এখন ঘুষের পরিমাণ বেড়েছে। টেন্ডার থেকে শুরু করে চাকরি, ব্যবসা থেকে পদোন্নতি সর্বত্র মূল্যবৃদ্ধির আওয়াজ শোনা যায়। রাজনীতিতেও মূল্যবৃদ্ধির উত্তাপ বোঝা যায়।

৭ জানুয়ারির নির্বাচনে কোন কোন প্রার্থী শতকোটি টাকা খরচ করে বিজয়ী হয়েছেন, এমন খবর রাজনীতির আড্ডায় কান পাতলেই শোনা যায়। রাজনৈতিক দলের কোনো কমিটিতে ঢুকতেও এখন আগের চেয়ে বেশি টাকা গুনতে হয়। মূল্যবৃদ্ধি কোথায় নেই? চাল থেকে নুন। মাছ-মাংস-ডিম-দুধ। বিদ্যুতের দাম থেকে বাসের ভাড়া। স্কুলের বেতনসহ হাসপাতালের চিকিৎসা। এমনকি ভিক্ষুকের দানেও এখন মূল্যবৃদ্ধির উত্তাপ। এমন কোনো পণ্য নেই যার মূল্য বৃদ্ধি হয়নি। শুধু একটি ছাড়া—একমাত্র জীবনের মূল্য কমছে। মানুষের দাম বাড়ছে না। এক কেজি পেঁয়াজের চেয়েও সস্তা মানুষের জীবন। শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা বিশ্বেই মানুষের জীবন ক্রমেই মূল্যহীন হয়ে পড়ছে। গাজায়, মধ্যপ্রাচ্যে, ইউক্রেনে। মানবতার আর্তনাদ আজ বিশ্বজুড়ে। কিন্তু বাংলাদেশে মানুষের মৃত্যু যেন পাখির পালক পড়ার মতো। আমরা যেন বাস করছি এক মৃত্যু উপত্যকায়। আপনি সাবধানে গাড়ি নিয়ে আধুনিক সড়কে বাড়িতে ফিরতে যাবেন, হঠাৎ নির্মাণাধীন রড, ইট কিংবা গার্ডার পড়বে আপনার ওপর। কেউ আপনার মৃত্যুর দায় নেবে না। আপনি মূল্যহীন। আপনার সন্তানকে আধুনিক হাসপাতালে নিয়ে যাবেন সুন্নতে খতনার জন্য। তার মৃত্যু হবে অবহেলা, অযোগ্য চিকিৎসকের হাতে। জীবন মূল্যহীন। কফি পানের জন্য আপনি কোনো অভিজাত রেস্তোরাঁয় যাবেন। আপনি ফিরবেন লাশ হয়ে। এভাবেই মানুষের জীবন হয়ে যাচ্ছে মূল্যহীন। সবকিছু দামি, বাড়ছে সবকিছুর দাম, তুচ্ছ শুধু মানুষের জীবন।



মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

এতো ভয় দেখান কেন

প্রকাশ: ১১:০০ পিএম, ০১ মার্চ, ২০২৪


Thumbnail

ছোট বেলায় খুব ডানপিটে ছিলাম। বন্ধুদের সাথে কাঁদা মেখে ফুটবল খেলতাম। ভরদুপুরে পুকুরে সাঁতার কাঁটতাম। পড়াশুনার ধারে কাছেও ছিলাম না। আমার এই বহেমিয়ান শিশুকাল দেখে মুরুব্বীরা ভয় দেখাতেন। ‘এই ছেলের লেখা পড়া হবে না। একে হাল চাষ করে খেতে হবে।’ আমি ভয়ে আঁতকে উঠতাম। প্রায়ই স্বপ্নে দেখতাম আমি হাল চাষ করছি। মাঝে মাঝে স্বপ্নে নিজেকে নাপিত হিসেবেও দেখতাম। জেলা স্কুলে ভর্তি হলাম। কিন্তু তাতে আমার দুরন্তপনা এতোটুক কমেনি। গুরুজনরা বাবা-মাকে পরামর্শ দিলো, একে মানুষ করতে হলে ক্যাডেট কলেজে পাঠিয়ে দাও। কিন্তু ক্যাডেট কলেজে ভর্তি কি এতো সোজা। আত্মীয়-স্বজনরাই ভয় দেখালেন। তারপরও ভর্তি পরীক্ষা দিলাম। কেউ কেউ বললেন, ‘ওর হবে না।’ কিন্তু কি আশ্চর্য আমি ঠিকই ক্যাডেট কলেজে চান্স পেলাম। পড়াশুনা এবং দুষ্টমি রেল লাইনের মতো সমান্তরাল ধারায় চলতে থাকলো। এবার এসএসসি পরীক্ষার পালা। 

আমার দুই মামাকে ছোট বেলায় দেখেছি এসএসসি পরীক্ষার আগে বাড়িতে রীতিমতো কেয়ামত করে ফেলেছিলেন। ঘরের দরজা বন্ধ করে চিৎকার করে সারা দিনরাত পড়তেন। ডিম খেতেন এক হালি। দু গ্লাস দুধ খেতেন অংক ঠিক ঠাক মতো করার জন্য। সাথে নানা রকম গাছগাছালী। এক মামা গলায় তাবিজও লাগিয়েছিলেন। এসময় নানা বাড়িতে রীতিমতো কারফিউ জারি করা হয়েছিল। কেউ জোরে কথা বলতোনা, পাছে পরীক্ষার্থীর পড়াশুনার ক্ষতি হয়। সবাই পা টিপে হাটতো। এরকম এক সময়ে গ্রীষ্মের ছুটিতে গিয়ে আমি রীতিমতো আঁতকে উঠেছিলাম। সেদিন মনে মনে ভেবেছিলাম জীবনেও এতো কঠিন লেখাপড়া করতে পারবো না। আমার এসএসসি পাশ করাও হবে না। এসএসসি পরীক্ষার আগে সবাই ভয় দেখালো। আমার লেখাপড়ায় মন নেই, এনিয়ে নানা জনের হতাশা। পরীক্ষা দিলাম। রেজাল্টের দিন দেখলাম আমি মেধা তালিকায় ষষ্ঠ হয়েছি। কি আশ্চর্য কথা। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগে দেখি চারপাশে বন্ধু বান্ধবরা কেউ কথা বলে না। সবাই কোচিং এ ব্যস্ত। সারাদিন বই এর মধ্যে ডুবে থাকে। 

ঢাকায় এসে আমি উঠলাম ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফজলে রাব্বী হলের ৯ নম্বর রুমে। এই রুমের অধিপতি জাহাঙ্গীর সাত্তার টিংকু। এটা যেন রুম না লঙ্গর খানা। খাট নেই, চাদর বিছিয়ে শোয়ার ব্যবস্থা হয় রাতে। দিনে সবাই বাইরে থাকে। আমাদের ক্যাডেট কলেজের সিনিয়র রুমী ভাইয়ের কল্যাণে এখানে জায়গা পেয়েছিলাম। সবাই লাইব্রেরীতে ভর্তির পড়া পড়ে। আমি পড়ি গল্পের বই, বায়োগ্রাফি। বলাকা, গুলিস্তান সিনেমা হলে ছবি দেখি। বড় ভাইরা বললো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে না হলে অন্য কোথাও চেষ্টা কর। রাজশাহী, জাহাঙ্গীরনগর ইত্যাদি। আমি কোথাও পরীক্ষা দিলাম না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিয়ে রংপুরে চলে গেলাম। আমার বন্ধু তাহের আলীর আড্ডায়। হঠাৎ একদিন ঢাকা থেকে ফোন করলো বড় ভাইয়া। বললো, তুই তো ভালোই রেজাল্ট করেছিস। বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে পড়লাম। এবার সবাই ভয় দেখালো, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া অনেক কঠিন। বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করলাম। চাকরি করলাম। নিজের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুললাম। কিন্তু ভয় দেখানো মানুষেরা পিছু ছাড়লো না। এখনও মানুষ ভয় দেখায়। বয়স হচ্ছে শরীরের যত্ম নাও। নিজের একটা ফ্ল্যাট কর। সঞ্চয় কর। পিছনে ফিরে তাকিয়ে মনে হলো, ভয় পেয়েই জীবনটা কেটে গেল।

না, নিজের জীবন কাহিনী লিখতে বসিনি। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের ঢাকা সফরের পর এক বিরোধী দলের নেতার সাথে টেলি আলাপের প্রেক্ষিতে ‘ভয়ের সংস্কৃতি’র মধ্যে বেড়ে ওঠা ছোট্ট জীবনটা স্মৃতির পর্দায় ভেসে উঠলো। আমি ঐ নেতাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, যুক্তরাষ্ট্র কেন ইউটার্ন নিলো? গুরুগম্ভীর ভঙ্গিতে ঐ নেতা আমাকে বললেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র এখনও কিছু পরিকল্পনা করছে। সামনে ভয়ংকর কিছু করবে।’ আবার ভয়। আমার জীবনের মতো ‘বাংলাদেশ’কে সবাই সারাজীবন ভয় দেখিয়েই গেল। আর এই অপরূপা দেশটি ভয়কে জয় করেই এগিয়ে চলছে অবিরত।

ভাষা আন্দোলনের সময় বলা হলো, বাঙালীরা এসব আন্দোলন করে কি পারবে নিজের ভাষাকে বাঁচাতে? কিন্তু তরুণরা বুকের রক্ত দিয়ে বাংলা ভাষার স্বীকৃতি আদায় করলো। টুঙ্গিপাড়ার অজো পাড়া-গাঁ থেকে উঠে আসা এক তরুণ বাঙালীর মুক্তির দাবী উচ্চারণ করলো। বাঙালীর অধিকারের কথা বললো। সবাই বললেন, এতো সব বড় বড় সব নেতা আছেন, হোসেন শহীদ সোরওয়ার্দী, শেরে বাংলা ফজলুল হক, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী-এদের ছাপিয়ে এই পুচকে তরুণ নেতা হবে? কিন্তু অমিত সাহস আর দেশ প্রেমকে পুজি করে শেখ মুজিব হয়ে উঠলেন বাঙালীর অবিসংবাদিত নেতা। বঙ্গবন্ধু যখন ছয়দফা ঘোষণা করলেন, তখন তাচ্ছিল্যের হাসির লোকের অভাব হয়নি। অনেকে বলেছিলেন, এসব পাগলামী। আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের গন্ধও এর মধ্যে খুঁজেছিলেন অনেকে। কিন্তু ছয় দফাই হয়ে উঠেছিল বাঙালীর মুক্তি সনদ। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার পর ভয় দেখানোর লোকের অভাব হয়নি। অনেকেই মুজিবের রাজনীতির সমাপ্তি দেখেছিলেন। কিন্তু বন্দী মুজিব হয়ে উঠেছিলেন অপ্রতিরোধ্য। আগরতলা মামলা শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধুতে রূপান্তর করেছিল। ৭১ এ ২৫ মার্চ অপারেশন সার্চ লাইটের পর ভয়ে কুঁচকে অনেকে বলেছিলেন ‘সব শেষ’। বাঙালী জাতির নাম নিছানা মুছে দেবে পাকিস্তানিরা। লাঠি সোটা নিয়ে লুঙ্গিপড়া ভেতোঁ বাঙালী কিনা যুদ্ধ করবে পৃথিবীর অন্যতম সেরা সামরিক শক্তির সাথে? কি তাজ্জব কথা! কিন্তু বীর বাঙালী নয় মাসের যুদ্ধে ভয়কে জয় করেছিল। প্রমাণ করেছিল, বাঙালী জাতিকে দাবায়ে রাখা যায় না। অবশেষে ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে ভয়কে জয় করে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদ্দয় হলো। কিন্তু ভয় দেখানো ভুতরা বাংলাদেশের পিছু ছাড়লো না। বলা হলো, বাংলাদেশ টিকবে না। এটা হবে দারিদ্রের মডেল। হেনরি কিসিঞ্জার বললেন, বাংলাদেশ তলা বিহীন ঝুঁড়ি। জাদরেল মার্কিন অর্থনীতিবিদ ভ্রু কুচকে বললো, বাংলাদেশ ঠিকবে না। কিন্তু বাংলাদেশ টিকে আছে। বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেল। 

৭৫ এর ১৫ আগস্টের পর বাংলাদেশ উল্টো পথে হাটতে শুরু করলো। আবার ‘ভয়’ দেখানোর উৎসব শুরু হলো। আওয়ামী লীগ কবে বিলুপ্ত হবে তা নিয়ে গবেষণা চললো। পাকিস্তানে ফিরে যাওয়ার আওয়াজ উঠলো। কিন্তু ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা ভয়কে জয় করে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করলেন। তিনি যেন দেশে না ফেরেন এজন্য কত ভয় দেখানো হলো তার ইয়াত্তা নেই। কিন্তু ভয়ের টুটি চেপে ধরেই শেখ হাসিনা পিতার রক্তে ভেজা মাটি স্পর্শ করলেন। নতুন করে শুরু করলেন গণতন্ত্রের সংগ্রাম। মুক্তির আন্দোলন। আবার ‘ভয়’ এর ভুতরা নৃত্য শুরু করলো। ‘শেখ হাসিনা ভুল করছেন’। ‘তাকে দিয়ে হবে না।’ ‘রাজনীতি কি ছেলে খেলা’- ইত্যাদি কত কথা। সব শঙ্কাকে মিথ্যে প্রমাণ করে ৯৬ এর নির্বাচনে জয়ী হলেন বঙ্গবন্ধু কন্যা। দীর্ঘ ২১ বছর আবার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেল আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর আবার শুরু হয় ভয় দেখানো। আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে ভালো, দেশ পরিচালনার যোগ্য না-এমন কথা বলার লোকের অভাব ছিলো না। বাংলাদেশ ভারতের দখলে চলে যাবে। দুর্ভিক্ষ গ্রাস করবে-ইত্যাদি কত ভবিষ্যৎ বাণী। আমরা আতঙ্কিত হলাম। ভয়ে কুকুড়ে থাকলাম। কিন্তু পাঁচ বছর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ দেশ পরিচালনা করলেন অসম্ভব দক্ষতায়। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর বলা হলো আওয়ামী লীগ শেষ। এই দলই আর থাকবে না। আওয়ামী লীগের ‘মুসলিম লীগে’ রূপান্তর নাকি সময়ের ব্যাপার মাত্র। এরপরও আওয়ামী লীগ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ঘুরে দাড়ালো। 

২০০৯ সালের সরকার গঠনের পর থেকে এপর্যন্ত ভয়ের ভুতের নৃত্য চলছে অবিরত। ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০০৯ এর বিডিআর বিদ্রোহের পর বলা হলো, সরকারের পতন হচ্ছে খুব শিগগিরই। আমরা ভয় পেলাম। সরকার টিকে থাকলো। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পর বলা হলো, এটা হজম করার ক্ষমতা আওয়ামী লীগের নেই। ‘শেখ হাসিনা নিজেই নিজের পতন ডেকে আনলেন।’ এমন কথা আওয়ামী লীগ শিবিরেও চর্চা হতে লাগলো। বিশেষ করে যুদ্ধাপরাধী সাকা চৌধুরীর ফাঁসির রায় ঘোষণার পর, ভয়ে আওয়ামী লীগেরই অনেকের ভয়ে ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ঐ ঘৃণ্য যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির পর কিছুই হয়নি এই দেশে। ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতের তাণ্ডবের পর ভয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের অনেক বীর পুরুষ।। সরকার পতনের খোয়াব দেখেছিলেন অনেকে। কিন্তু হেফাজতই পরে খাঁচায় ঢুকে গেছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে ভয় দেখানো মানুষের সংখ্যাই ছিলো বেশী। যেই নির্বাচনের পর টানা দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হয়ে শেখ হাসিনা মেয়াদ পূর্ণ করেন। এভাবে ভয় আর জোতিষীদের অনুমানের ফিরিস্তি দিলে আরব্য রজনীও হার মানবে। করোনার সময় ভয় দেখানো হলো, রাস্তায় নাকি লাশ পরে থাকবে। মৃত্যুর মিছিল হবে। শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পর এক কথক অর্থনীতিবিদ মুখ বেঁকিয়ে বললেন ‘বাংলাদেশ অচিরেই শ্রীলঙ্কা হবে।’ 

২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে এক বাঁচাল সুজন ঘোষণা করলেন, দেশ নাকি ধ্বংস হয়ে যাবে। কোন আশঙ্কাই সত্যি হলো না। তবে সত্যি সত্যি আমরা ভয় পেয়েছিলাম, বাংলাদেশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের তৎপরতা দেখে। র‌্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা, নির্বাচন নিয়ে মার্কিন হুমকির পর দেশজুড়ে ভয়ের কোরাস সঙ্গিত শুরু হয়েছিল। কার কার ভিসা বাতিল হলো এনিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চললো হৈ চৈ। বিদেশে বসে বাংলাদেশি গোয়েবলসরা প্রলাপ বকার নতুন রেকর্ড করলো। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে কি কি করবে তারা ফিরিস্তি নিয়ে টেলিভিশনে সুশীলদের কর্কশ চিৎকারে রীতিমতো মাথা ধরে গেল। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের কাউন্ট-ডাউন চললো লাগাতার। বিএনপি নেতারা ঘরে বসে হিন্দি সিরিয়াল দেখে আর বলে ‘ঘুম থেকে উঠলেই দেখবেন আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত।’ আহা কি আনন্দ। নির্বাচন বর্জন করে তারা চুপচাপ ঘরে বসে থাকলো। নির্বাচন হয়ে গেল। ভয় এবং আতঙ্কের ক্ষণগণনা শুরু হলো নতুন করে। সুশীলদের কথা শুনে মনে হলো, শিগগিরিই বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাবে টর্নেডো। কিন্তু কোথায় কি? অভিনন্দনের বৃষ্টি শুরু হলো। এমনকি জাতিসংঘের মহাসচিব, মার্কিন প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত অভিনন্দন জানালেন শেখ হাসিনাকে। এরপরও শুরু হলো নানা ব্যাখা বিশ্লেষণ। বাইডেনের চিঠির মর্মার্থ উদ্ধারে যদি, কিন্তু আবিষ্কারের গবেষণা শুরু হলো। এর মধ্যেই এলেন তিন সদস্যের মার্কিন প্রতিনিধি দল। এবার ভয় সন্ত্রাসীরা বলা শুরু করলো, এবার হবে আসল খেলা। বাংলাদেশে এসেই নাকি আফরিন আক্তার বোমা ফাটাবেন। এমন বক্তব্য দিয়ে অনেক বুদ্ধিজীবী তৃপ্তির ঢেকুর তুললেন। ওমা কিসের বোমা, কিসের কি। মার্কিন প্রতিনিধিদল বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক মেরামতে যেন মরিয়া। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে তাদের আন্তরিকতায় ‘ভয় বাদীরা’ কি কিঞ্চিত লজ্জিত?

আমাদের সমাজে কিছু নেতিবাচক মানুষ আছেন। এরা সব কিছুর মধ্যে ছিদ্র খোঁজেন। মানুষকে আতঙ্কিত করে এরা এক ধরনের পৈশাচিক আনন্দ পান। নৈরাশ্যবাদীদের আপনিও নিশ্চয়ই আপনার চলার পথে পেয়েছেন। সারাজীবন ভয়কে জয় করে আমি যেমন বেড়ে উঠেছি, তেমনি হয়তো অনেকেই। বাংলাদেশের গল্পটাও ভয়কে মিথ্যা প্রমাণের। বাংলাদেশ নিয়ে হতাশাবাদী, নিরাশাবদীদের ভবিষ্যৎ বাণী ভুল প্রমাণিত হয়েছে বারবার। মার্চ মাস আমাদের স্বাধীনতার মাস। জাগরণের মাস। আমাদের আত্ম পরিচয়ে উজ্জীবিত হবার মাস। এই মাসের শুরুতে যারা ভয় দেখিয়ে নিজেদের জ্ঞানী ভাবেন, তাদের বলতে ইচ্ছা করে ‘এতো ভয় দেখান কেন?’

সৈয়দ বোরহান কবীর, নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত
ই-মেইল: poriprekkhit@yahoo.com


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

মন্ত্রিসভার সম্প্রসারণ: আরও চমক আছে?

প্রকাশ: ১০:০০ পিএম, ০১ মার্চ, ২০২৪


Thumbnail

আজ সাত জন নতুন প্রতিমন্ত্রীর শপথ নেওয়ার মধ্য দিয়ে মন্ত্রিসভার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ৪৪ জন। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি মন্ত্রিসভার সম্প্রসারণের শেষ ধাপ নয়। এখনও মন্ত্রিসভা অসম্পূর্ণ রয়েছে। সামনের দিনগুলোতে মন্ত্রিসভা আরও সম্প্রসারিত হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। 

একাধিক সূত্র বাংলা ইনসাইডারকে বলছেন, যেহেতু রাষ্ট্রপতি চিকিৎসার জন্য আগামীকাল দেশের বাইরে যাচ্ছেন। এজন্য তড়িঘড়ি করে সাত জন প্রতিমন্ত্রী নিয়োগের মাধ্যমে মন্ত্রিসভাকে আংশিক সম্প্রসারণ করা হয়েছে। এখনও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী নিয়োগ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। 

সরকারের এক ঘনিষ্ঠ সূত্র বলছেন, মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণ বা মন্ত্রিসভার রদবদল একটি ধারাবাহিক কার্যক্রম। এটি কোনো রকম চিরন্তন ব্যবস্থা নয়। একজন মন্ত্রীকে দায়িত্ব দেওয়া মানেই যে তিনি পাঁচ বছরের জন্য চাকরি পেলেন বিষয়টি এমন না। আর একারণেই আজ মন্ত্রিসভায় যে সাত জন প্রতিমন্ত্রী নেওয়া হলো সেটি শেষ ধাপ নয়। এই মন্ত্রিসভার সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে যে মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণের কার্যক্রম শেষ হলো না তার প্রমাণ পাওয়া যায় অনেকগুলো বাস্তব কারণে। 

প্রথমত, মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় হিসাবে পরিচিত বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে এখনও কোন পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া হয়নি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় মতো একটি স্পর্শকাতর মন্ত্রণালয়ে পূর্ণমন্ত্রী না থাকাটা অত্যন্ত প্রশ্নবোধক। অনেকেই মনে করছেন যে, প্রধানমন্ত্রী আর কিছুদিন অপেক্ষা করার পর এই মন্ত্রণালয়ে একজন পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রী দিলেন। এখনও অনেকগুলো মন্ত্রণালয় রয়েছে যে মন্ত্রণালয়গুলো আকারে অনেক বড়। কিন্তু সেখানে এখন পর্যন্ত প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এটিও মন্ত্রিসভার সম্প্রসারণের পূর্ণতা না প্রাপ্তির একটি বড় উদাহরণ বলে অনেকে মনে করছেন। 

তাছাড়া ৪৪ সদস্যের মন্ত্রিসভায় টেকনোক্রেট মন্ত্রী হয়েছেন দুজন। আরও অন্তত দুজনকে টেকনোক্রেট মন্ত্রী করার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এই প্রেক্ষিতে মন্ত্রিসভায় রদবদলের এটিই শেষ নয়, সামনে আরও চমক থাকতে পারে বলে মনে করছেন বিভিন্ন মহল। বিশেষ করে যে সমস্ত মন্ত্রণালয়গুলোতে প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন বা একজন মন্ত্রী রয়েছেন, সেই সব মন্ত্রণালয়গুলোতে সামনের দিনগুলোতে আরও নতুন মুখ দেখা গেলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না বলে অনেকে মনে করছেন। সামনে পবিত্র রমজান। তারপর ঈদ উল ফিতর এবং এর পরপর বাজেট প্রক্রিয়া শুরু হবে। ধারণা করা হচ্ছে যে, ঈদের পর মন্ত্রিসভায় টেকনোক্রেট সদস্যদেরকে অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। 

তবে আওয়ামী লীগের অনেক নেতা বলছেন যে, মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণ বা মন্ত্রিসভার রদবদল ইত্যাদি বিষয়গুলো নিয়ে এখন প্রধানমন্ত্রী অনেক বেশি গোপনীয়তা নীতি অনুসরণ করে চলছেন। কারা মন্ত্রী হবেন বা কারা কোন দপ্তর পাবেন সে সম্পর্কে সকলে অন্ধকারে। কাজেই মন্ত্রিসভার এটিই শেষ কি না সামনের দিনগুলোতে মন্ত্রিসভার কলেবর আরও বাড়বে কি না সেই সিদ্ধান্ত একমাত্র প্রধানমন্ত্রী নিতে পারবেন, অন্য কেউই নয়। তবে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর দু দফায় মন্ত্রিসভার সম্প্রসারণ হয়েছিল। আর ২০১৪ সালে মন্ত্রিসভার সম্প্রসারণ হয়েছিল থেমে থেমে। ২০১৮ সালে অবশ্য মন্ত্রিসভার তেমন কোন পরিবর্তন বা সম্প্রসারণ হয়নি। এবার মন্ত্রিসভা দু দফায় ৪৪ জন সদস্য নিয়োগ দেওয়া হলো। সামনের দিনগুলো আরও মন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া হবে কি না তা সময়ই বলে দেবে।

মন্ত্রিসভার সম্প্রসারণ  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণ নিয়ে দিনভর টেনশন-গুঞ্জন

প্রকাশ: ০৫:০০ পিএম, ২৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪


Thumbnail

গতকাল জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে ৫০ জন নারী সদস্য শপথ নিয়েছেন। শপথ গ্রহণের পরই তারা সংসদে যোগ দান করেন। তাদের সংসদে যোগদানের পরেই মন্ত্রিসভার সম্প্রসারের গুঞ্জনটি পল্লবিত হতে শুরু করেছে। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, সংরক্ষিত আসনের মনোনয়ন চূড়ান্ত হওয়ার পর মন্ত্রিসভার সম্প্রসারণ করা হতে পারে। বর্তমানে ৩৭ সদস্যের মন্ত্রিসভা অপূর্ণাঙ্গ। অনেকগুলো মন্ত্রণালয়ে এখন পর্যন্ত মন্ত্রী দেওয়া হয়নি। 

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও বলেছেন যে, মন্ত্রিসভার সম্প্রসারণ করা হবে শীঘ্রই। তবে এখন পর্যন্ত মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণের আনুষ্ঠানিক কোন ঘোষণা সরকারের পক্ষ থেকে জানা যায়নি। মহামান্য রাষ্ট্রপতি আগামী ২ মার্চ থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত দেশের বাইরে অবস্থান করবেন। আর এ কারণেই আগামীকাল বা পরশুর মধ্যে মন্ত্রিসভা সম্প্রসারিত হতে পারে এমন গুঞ্জন রয়েছে। দিনভর আওয়ামী লীগের বিভিন্ন আলাপ আলোচনায়, আড্ডায় মন্ত্রিসভার সম্প্রসারণের বিষয়টি নিয়ে নানারকম আলোচনা হয়েছে।

কারা মন্ত্রী হতে পারেন তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে জল্পনা কল্পনা চলছে। তবে ঠিক কখন মন্ত্রিসভার সম্প্রসারণের ঘোষণা আসবে সে সম্পর্কে কেউই কোনো কিছু বলতে পারেননি। তবে মন্ত্রিসভা বিভাগের একটি সূত্র বলছে যে, তারা মন্ত্রিসভার সম্প্রসারণের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করছেন এবং এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর সবুজ সংকেতের অপেক্ষায় রয়েছেন। যে কোন সময় এই বিষয়টি প্রকাশ হতে পারে এবং আগামীকাল বা শনিবার মন্ত্রিসভার নতুন সদস্যরা পশথ গ্রহণ করতে পারেন বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। 

মন্ত্রিসভায় রদবদলের ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। প্রথমত, নারী সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে মন্ত্রী, দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যারা প্রথমবারের মতো মন্ত্রিসভার অন্তর্ভুক্ত হননি, তাদের মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তি। তৃতীয়ত, টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী।

অনেকেই মনে করছেন যে, ১০ থেকে ১০ জন মন্ত্রিসভায় নতুন মুখ আসতে পারেন। এছাড়াও একাধিক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী দেওয়া হতে পারে। এমনকি দু একজন মন্ত্রীর দপ্তর বদলের কথাও আলোচিত হচ্ছে বিভিন্ন মহলে। 

বিভিন্ন সূত্র গুলো বলছে যে, মন্ত্রিসভায় রাজনৈতিক মুখ কয়েকজন আসতে পারে এবং এবং সরকারের একটি রাজনৈতিক চেহারা দেওয়ার জন্য বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। 

এবার মন্ত্রিসভায় বেশি রাজনীতিবিদদের জায়গা হয়েছে গতবারের তুলনায়। আর এই বাস্তবতায় আরও কয়েকজন রাজনীতিবিদ মন্ত্রিসভায় আসতে পারেন বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা এবং গুঞ্জন রয়েছে। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বাহাউদ্দিন নাছিম, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম এবং এস এম কামালের নাম ব্যাপকভাবে আলোচনায় আছে। অন্যদিকে সংরক্ষিত কোটায় যারা মন্ত্রী হয়েছেন, তাদের মধ্যে অন্তত চার জন মন্ত্রী হতে পারেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। এদের মধ্যে শাম্মী আহমেদ, ডা. রোকেয়া সুলতানা, তারানা হালিম এবং চট্টগ্রাম থেকে নির্বাচিত ওয়াসিকা আয়শা খানের নামও রয়েছে। 

টেকনোক্র্যাট কোটায়ও মন্ত্রী হওয়ার জন্য কয়েক জনের নাম শোনা যাচ্ছে। এদের মধ্যে যারা আলোচনায় রয়েছেন তারা হলেন ড. আহমদ কায়কাউস এবং কবির বিন আনোয়ার। এর বাহিরেরও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে সাইদ খোকনের নাম কোন কোন পর্যায় আলোচনা হচ্ছে বলেও জানা গেছে। তাছাড়া আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এবং সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ সভাপতি নেতা এলামুল হক শামীমের নামও বিভিন্ন মহলে গুঞ্জন রয়েছে। আলোচনায় আছেন আওয়ামী লীগের আরও কয়েকজন রাজনীতিবিদ। তবে সংবিধান অনুযায়ী মন্ত্রিসভার সদস্য নিয়োগের একক ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর। আর এ বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী নিজেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। কাজেই মন্ত্রিসভায় যাদের নাম নিয়ে আলোচনা হচ্ছে তা কেবলই অনুমান, কল্পনা এবং গুজব। তবে এ নিয়ে টেনশনের শেষ নেই কারও।

মন্ত্রিসভা   আওয়ামী লীগ   প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

নেতাদের মুক্তি, বিএনপির মুক্তি কবে

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ২৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪


Thumbnail

একে একে কারাগার থেকে মুক্তি পাচ্ছেন বিএনপির শীর্ষ নেতারা। ২৮ অক্টোবর বিএনপির সমাবেশে যে তাণ্ডব হয়, তার পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপির বহু নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হন। দলের মহাসচিবসহ স্থায়ী কমিটির গুরুত্বপূর্ণ একাধিক নেতার বিরুদ্ধে সন্ত্রাস এবং নাশকতার অভিযোগে মামলা হয়েছিল। এসব গ্রেপ্তারে বিএনপির আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ে। আন্দোলন পথ হারায়। ৭ জানুয়ারি নির্বাচন প্রতিহত করার ডাক দিয়েছিল ১৭ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটি। কিন্তু তাদের নির্বাচন বর্জন আন্দোলন সফল হয়নি। অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়ে বিএনপি তার অক্ষমতা ও দুর্বলতা প্রকাশ করে। বিএনপি এবং তার মিত্রদের নামমাত্র আন্দোলন নির্বাচনে বাধা সৃষ্টি করতে পারেনি। ৭ জানুয়ারির নির্বাচনের পর ১১ জানুয়ারি নতুন সরকার শপথ নেয়। টানা চতুর্থবারের মতো দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ। নির্বাচনের পর বিএনপি নেতারা আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন। বিএনপির কালো পতাকা বা লিফলেট বিতরণ কর্মসূচি পানসে। এসব কর্মসূচিতে জনসম্পৃক্ততা নেই। বিএনপির নেতাকর্মীরাও স্বীকার করেন আন্দোলন পথহারা। মুখে তারা যাই বলেন না কেন, তাদের হতাশার দীর্ঘশ্বাস এখন সর্বত্র শোনা যায়। বিএনপির নেতারা যখন হতাশ, ক্লান্ত, বিধ্বস্ত; ঠিক তখনই বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ আটক নেতারা মুক্ত হচ্ছেন। নেতারা স্বীকার করেছেন, তাদের মুক্তি আন্দোলনকে বেগবান করবে। মির্জা ফখরুল, মির্জা আব্বাস, আমীর খসরুর মুক্তিতে বিএনপি কর্মীদের মধ্যে একধরনের উচ্ছ্বাস লক্ষ করা যাচ্ছে। বিএনপি নেতাদের মুক্তির পর আমার মনে যে প্রশ্নটি ঘুরপাক খাচ্ছে তা হলো—নেতাদের তো মুক্তি হলো, কিন্তু রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি কি মুক্ত?

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একটি রাজনৈতিক দল একটি স্বাধীন সত্তা। রাজনৈতিক সংগঠন যদি নিজ ইচ্ছায় গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তখন সেই দল বা সংগঠনকে মুক্ত বা স্বাধীন বলা যায়। অন্যদিকে একটি রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্ত যদি বাইরের কোনো রাষ্ট্র, ব্যক্তি বা দল নির্ধারণ করে, দলটির সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া যদি গণতান্ত্রিক না হয় এবং দলের অভ্যন্তরে যদি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা না থাকে, তাহলে সেই দলটি মুক্ত থাকে না। মুক্ত গণতন্ত্রের জন্য মুক্ত রাজনৈতিক সংগঠন জরুরি। মুক্ত গণতন্ত্র ও মুক্ত রাজনৈতিক সংগঠনের ধারণাটি এসেছে মূলত কমিউনিস্ট পার্টির উত্থানের পর থেকে। উদার ও মুক্ত গণতন্ত্রে বিশ্বাসী রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা দেশে দেশে কমিউনিস্ট পার্টিগুলোকে রাজনৈতিক দলের স্বীকৃত দিতে অস্বীকৃতি জানায়। এ ক্ষেত্রে তাদের প্রধান যুক্তি ছিল বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কমিউনিস্ট পার্টিগুলো সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত। এসব দলের নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা নেই। দলের ভেতর মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নেই এবং গণতান্ত্রিক চর্চা নেই। জার্মানিতে নাৎসি পার্টির উত্থানের পর দলের ভেতর গণতন্ত্রের চর্চা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একটি দলে যদি গণতন্ত্র না থাকে তাহলে রাজনৈতিক দলটি ফ্যাসিস্ট দলে পরিণত হতে পারে। নাৎসিবাদের উত্থান ও বিপর্যয় নিয়ে বিশ্বে যত গবেষণা হয়েছে, তাতে একক সিদ্ধান্ত, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র চর্চার বিষয়টি সামনে এসেছে। গ্লাসনস্ত ও পেরেস্ত্রোইকা তত্ত্বের মাধ্যমে বিশ্বে কমিউনিস্ট আন্দোলন বিপর্যয়ে পড়ে। এ সময় গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত হিসেবে রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের চর্চার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একটি দলের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার বিষয়টিও সামনে আসে। এভাবে গণতন্ত্রের সংজ্ঞা এবং তার পরিধি বিস্তৃত হয়। একটি দেশে গণতন্ত্র মানে শুধু নির্বাচন নয়; রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরে গণতন্ত্র চর্চার বিষয়টি স্বীকৃত পায়। এ তত্ত্বকে সামনে রেখে আমরা প্রশ্ন করতেই পারি, বিএনপি কি স্বাধীন, মুক্ত?

আমার বিবেচনায় বিএনপি পরাধীন, শৃঙ্খলিত এক রাজনৈতিক দল। একটি মুক্ত স্বাধীন রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে জবাবদিহিতা থাকাটা জরুরি। নেতারা যদি নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হন তাহলে তাদের সরে দাঁড়াতে হয়। দেশে দেশে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এই চর্চা প্রচলিত। বেশি দূরে যাওয়ার দরকার নেই, ভারতের ন্যাশনাল কংগ্রেসের কথাই ধরা যাক। ঐতিহাসিকভাবে এই দলটি নেহরু পরিবার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ২০১৪ সালের নির্বাচনের শোচনীয় পরাজয়ের পর সোনিয়া গান্ধী দলের নেতৃত্বে থেকে সরে দাঁড়ান। রাহুল গান্ধীকে করা হয় ঐতিহ্যবাহী দলটির সভাপতি। ২০১৯ সালের নির্বাচনেও কংগ্রেস বিজেপির কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। এবার সভাপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ান রাহুল গান্ধীও। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে কংগ্রেস নতুন সভাপতি নির্বাচন করে। মল্লির্কাজুন খড়গে এখন কংগ্রেসের সভাপতি। কংগ্রেসে রাহুল গান্ধীর জনপ্রিয়তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। তরুণরা তাকেই সভাপতি হিসেবে রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে রাহুল তার পদত্যাগের সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন। বিএনপি ২০০৮-এর নির্বাচনে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। পরাজয়ের পরও খালেদা জিয়া দলের নেতৃত্বে থেকে সরে দাঁড়াননি। ২০১৪ সালে বিএনপির আন্দোলনের কৌশল ব্যর্থ হয়। পাঁচটি সিটি নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পরও বিএনপি কেন সংসদ নির্বাচন বর্জন করল—সেই প্রশ্নের উত্তর নেই। নেই জবাবদিহি। একইভাবে ২০১৫ সালের আন্দোলনেও বিএনপি শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হলো। এ নিয়েও দলে কোনো সমালোচনা নেই। নেই নেতৃত্বের পরিবর্তন। ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগেই দুটি দুর্নীতির মামলার দণ্ডিত হন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। যে কোনো গণতান্ত্রিক দলের নিয়ম হলো দুর্নীতির দায়ে কেউ দণ্ডিত হলে তিনি তার দলীয় পদে থাকার অধিকার হারান। বিএনপির গঠনতন্ত্রেও এমন বিধান ছিল। কিন্তু খালেদা জিয়া কারান্তরীণ হওয়ার আগেই কোনোরকম কাউন্সিল ছাড়াই তড়িঘড়ি করে গঠনতন্ত্রের বিধানটি বাতিল করা হয়। বিএনপির শীর্ষ দুই নেতাই দণ্ডিত। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির শোচনীয় বিপর্যয়ে পড়ে। এরপর দলের ভেতর কিছু আত্মসমালোচনা লক্ষ করা যায়। নেতৃত্ব পরিবর্তনের দাবি তোলেন অনেক নেতা। ‘জাতীয় ঐক্য ফ্রন্টে’ যোগদান, ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে নির্বাচন ইত্যাদি ‘ভুল’ সিদ্ধান্ত নিয়ে কথাবার্তা হয়। কিন্তু এত ভুলের পর একজন নেতাও পদত্যাগ করেননি। একজনও পদ হারাননি। এবারও বিএনপির আন্দোলন এবং নির্বাচন বর্জনের কৌশল ভুল প্রমাণিত হয়েছে। লন্ডন থেকে যে আন্দোলনের কর্মসূচি দেওয়া হয়েছিল, তা ছিল বাস্তবতা-বিবর্জিত। আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ নেতারা কি পদত্যাগ করবেন? তারা যদি পদত্যাগ করে নতুন নেতৃত্ব সামনে আনেন তাহলে বিএনপি মুক্ত হবে।

একটি মুক্ত রাজনৈতিক দলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো দলের ভেতর গণতন্ত্র চর্চা। দলের ভেতর কতটুকু গণতন্ত্র আছে তা বোঝা যায়, সাংগঠনিক বিন্যাসে, নিয়মিত সম্মেলনে। আট বছর ধরে বিএনপির কেন্দ্রীয় কাউন্সিল হয় না। দলের স্থায়ী কমিটিতে শূন্য পদ পূরণের কোনো উদ্যোগ নেই। প্রায় অর্ধেক জেলায় কমিটি নেই। অঙ্গ সহযোগী সংগঠনগুলো এখনো জেলায় জেলায় পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করতে পারেনি। এরকম অবস্থায় একটি দল কীভাবে চলছে, সেটাই এক বড় প্রশ্ন। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বিএনপির নীতিনির্ধারণী সংস্থা হলো স্থায়ী কমিটি। কিন্তু বিএনপির স্থায়ী কমিটি এখন অকার্যকর, অসম্পূর্ণ। একে তো স্থায়ী কমিটির পাঁচটি পদ খালি, অন্যদিকে যারা আছেন তাদের কয়েকজন অসুস্থ। দলীয় কাজকর্মে অংশগ্রহণের মতো অবস্থা তাদের নেই। স্থায়ী কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় না। সিদ্ধান্ত আসে লন্ডন থেকে। গত দুই বছর বিএনপির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এক ব্যক্তির ইচ্ছায় সবকিছু হচ্ছে। লন্ডন থেকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান যা নির্দেশ দিচ্ছেন, নেতারা বিনা প্রশ্নে তা প্রতিপালন করছেন। একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক, আলোচনা, সমালোচনার সুযোগ নেই বিএনপিতে। বিএনপির অনেক প্রবীণ নেতাই ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় স্বীকার করেন, বেগম জিয়া যখন দলের চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন করতেন তখন যে কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে তর্ক-বিতর্ক হতো। বেগম জিয়া কথা বলতেন কম, শুনতেন বেশি। এখন বিএনপিতে ঠিক উল্টো ধারা চলছে। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানই শুধু কথা বলেন, বাকিরা শোনেন এবং নির্দেশ প্রতিপালন করেন। যে কোনো রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব দিতে হয় সামনে থেকে। বাংলাদেশের বাস্তবতা, জনগণের মনোভাব ইত্যাদি অনুধাবন করার জন্য প্রয়োজন সার্বক্ষণিক নেতৃত্ব। বিএনপি এখন চলছে খণ্ডকালীন নেতৃত্বে। দূর থেকে পরিস্থিতি বিবেচনা না করেই দেওয়া হচ্ছে কর্মসূচি। এসব কর্মসূচি বুমেরাং হচ্ছে দলটির জন্য। বিএনপির ভেতরই গণতন্ত্রকে বন্দি করে রাখা হয়েছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নেই দলের ভেতর। ভিন্নমতকে দমন করা হচ্ছে কঠোরভাবে। বিএনপি কি এক ব্যক্তির ইচ্ছার কারাগার থেকে মুক্তি পাবে? বিএনপিতে অনেক পোড়খাওয়া ত্যাগী নেতা রয়েছেন। তাদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা প্রমাণিত, বাংলাদেশে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে যারা রাজনীতি করেছেন, জেল-জুলুম সহ্য করেছেন। এরকম কাউকে দলের নেতৃত্ব দিলে সমস্যা কোথায়? কেন দূর থেকে রিমোর্ট কন্ট্রোলে দল চালাতে হবে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে বিএনপিকেই।

বিএনপি যে আন্দোলনের কর্মসূচি পালন করছে, নির্বাচনে যাওয়ার বা বর্জনের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তা কি স্বাধীন চিন্তার ফসল নাকি কারও আশ্বাসে বিএনপি এসব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। দলটি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কতটা স্বাধীন, মুক্ত? ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত বিএনপি নিয়েছিল কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের পরামর্শে। বিএনপির অন্তত দুজন প্রয়াত নেতা একাধিক সাক্ষাৎকারে এরকম অভিযোগ করেছেন। তারা বলেছেন, বিএনপিকে নির্বাচন থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছিল কোনো বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা। বিএনপি নির্বাচন না করলেই ১৯৯৬ বা ২০০৭ সালের মতো ঘটনা ঘটবে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটবে—এমন নিশ্চিত আশ্বাস ছিল তাদের পক্ষ থেকে। আবার ২০১৮ সালে বিএনপিকে নির্বাচনে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল বিদেশি রাষ্ট্র। তাদের বুদ্ধিতেই ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে জোট করে বিএনপি। বিএনপির অনেক নেতাই এ সিদ্ধান্তে বিস্মিত ও হতবাক হয়েছিলেন। অনেকেই এ সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেননি। গত দুই বছর বিএনপি আন্দোলন করেছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের পরিস্থিতি দেখে। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে যেভাবে সরব হয়েছিল, তাতেই বিএনপি আশাবাদী হয়ে উঠেছিল। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মনোভাব দেখেই বিএনপির আন্দোলনের কর্মসূচি বেগবান হচ্ছিল। নিজেদের ইচ্ছা, লাভ-ক্ষতি হিসাব, প্রতিপক্ষের শক্তি কিংবা বিশ্ব মেরূকরণ ইত্যাদি কোনো কিছুই মাথায় নেয়নি দলটি। অনেক সময় মনে হয়েছে, বিএনপি বোধহয় পশ্চিমাদের ইচ্ছে পূরণের হাতিয়ার কিন্তু স্বাধীনভাবে দলের কৌশল নির্ধারণ না করলে যে শেষতক হতাশার সাগরে হাবুডুবু খেতে হয়, বিএনপির এবারের আন্দোলন তার প্রমাণ।

এখন বিএনপি নতুন করে হিসাব কষছে। অনেকে মনে করেন, দলের সিনিয়র নেতারা মুক্ত হয়েছেন, নিশ্চয়ই তারা নতুন করে আন্দোলন শুরু করবেন। আমার কিন্তু তা মনে হয় না। আমি মনে করি, বিএনপিকে আগে মুক্ত হতে হবে। দলে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। ব্যর্থদের সরে দাঁড়াতে হবে। নতুন নেতৃত্ব সামনে আনতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, বিএনপিতে মতপ্রকাশের, চিন্তার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা দিতে হবে। না হলে দল হিসেবে বন্দি বিএনপির মৃত্যু হবে নিজেদের তৈরি কারাগারেই। নেতারা মুক্ত হলো, বিএনপি কি মুক্ত হবে।


লেখক: নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত

ইমেইল: poriprekkhit@yahoo.com



মন্তব্য করুন


বিজ্ঞাপন