এডিটর’স মাইন্ড

শেখ হাসিনার প্রতিপক্ষ কে

প্রকাশ: ১২:০০ এএম, ১৩ নভেম্বর, ২০২১


Thumbnail

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেদিন লন্ডনে। বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য সেখানে রোড শো উদ্বোধন করলেন। যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত প্রবাসী বাঙালি ও ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা দিলেন। প্রধানমন্ত্রী বললেন, ‘বাংলাদেশে চমৎকার বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ রয়েছে।’ দেশকে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর যখন এই চমৎকার উদ্যোগ, সেদিন বাংলাদেশে ঘটল অন্যরকম এক ঘটনা। হঠাৎ করেই ডিজেল ও কেরোসিনের দাম বাড়ানো হলো। বলা হলো, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়াতেই নাকি এমনটা করা হয়েছে। ভালো কথা। তাহলে, প্রধানমন্ত্রীর যুক্তরাজ্য সফরের আগে কেন দামটা বাড়ানো হলো না? কিংবা প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরলে এ মূল্যবৃদ্ধি করলে কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হতো? এ প্রশ্ন করলাম এজন্য যে এ ঘটনা কি কাকতালীয় না স্যাবোটাজ, এ নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। বাংলাদেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য প্রধানমন্ত্রী যখন রোডশো করছেন, সে সময় বাংলাদেশ অচল! গণপরিবহন বন্ধ। চট্টগ্রাম বন্দর বন্ধ। পণ্য পরিবহন বন্ধ। লঞ্চ বন্ধ। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে উৎসাহিত হয়ে যারা বাংলাদেশমুখী হবেন, তারা তাৎক্ষণিকভাবে কী বার্তা পাবেন? তারা জানলেন, এখানে কথায় কথায় ধর্মঘট করা যায়। চট্টগ্রাম বন্দরে মাল আটকে থাকে। বিপিসি জানাল, এ মূল্যবৃদ্ধি ছয় মাস পরও করা যেত। তাহলে এ তাড়াহুড়ো কেন? কেন এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব পাঠানো হলো না? কেন গণশুনানি ছাড়াই মূল্যবৃদ্ধি? প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফরের সময় কেন? এটা কি তাঁর আহ্বানকে ব্যর্থ করার জন্য?

প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে ডিজেল ও কেরোসিনের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে যে তেলেসমাতি কাণ্ড হলো, তাতে আমার মনে হয় সরকারের ভেতরে একটি শক্তিশালী অংশ প্রধানমন্ত্রীর প্রতিপক্ষ হয়ে কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য প্রাণান্ত চেষ্টা করছেন। তাঁর শত্রুরাও এ কথা স্বীকার করে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। এই তো সেদিন জলবায়ু সম্মেলন কপ-২৬-এ প্রধানমন্ত্রী বিশ্বের অন্যতম প্রেরণাদায়ী প্রভাবশালী নেতা হিসেবে বিবেচিত হলেন। বাংলাদেশ যে এখন ক্ষুধা-দারিদ্র্য মুক্ত, এটা শেখ হাসিনার অবদান। কিন্তু শেখ হাসিনার অর্জন, তাঁর স্বপ্নগুলোকে বিনষ্ট করতে যেন একটি মহল তৎপর। আর সে মহলটি অন্য রাজনৈতিক দল নয়, খোদ সরকারের ভিতরই দৃশ্যমান। শেখ হাসিনার রাজনৈতিক দর্শন এবং উন্নয়ন কৌশল খুব স্পষ্ট, স্বচ্ছ। তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বুকে ধারণ করেন, লালন করেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নগুলো বাস্তবায়ন করতে চান। এটাই তাঁর রাজনীতি। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নও খুব সহজ এবং সোজাসাপটা। দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই জাতির পিতার সারা জীবনের স্বপ্ন। এজন্য তিনি বছরের পর বছর জেল খেটেছেন। জুলুম, নির্যাতন সহ্য করেছেন। বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির মূল কথা ছিল জনগণকে কষ্ট দেওয়া যাবে না। সারা জীবন তিনি ছিলেন জনগণের পক্ষে। শেখ হাসিনাও তাই। জনকল্যাণ এবং জনগণের ক্ষমতায়ই তাঁর রাজনীতির মূল সুর। কিন্তু ডিজেল ও কেরোসিনের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে সরকারের একটি অংশ যা করল তা রীতিমতো নিষ্পেষণ। জনগণের সঙ্গে প্রতারণা। যারা এটা করেছে তারা একটি সিন্ডিকেট। এ সিন্ডিকেটের সঙ্গে সরকারের প্রভাবশালীদের প্রকাশ্য ও গোপন প্রেম-প্রণয় রয়েছে। এরাই বঙ্গবন্ধু এবং শেখ হাসিনার প্রতিপক্ষ। বাংলাদেশে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে যা হলো তা ভয়ঙ্কর। প্রথমে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী জানালেন আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কথা। এরপর এক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী যা বললেন তা পিলে চমকানোর মতো। তাঁর মতে আমাদের দেশে ডিজেলের মূল্য কম হওয়ায় ডিজেল ভারতে পাচার হয়। তাহলে আমাদের সীমান্তরক্ষীরা ব্যর্থ? আইন প্রয়োগকারী সংস্থা পাচার রোধে অক্ষম? সরকারের কাজ পাচার বন্ধ করা। পাচার রোধে মূল্যবৃদ্ধি যেন অনেকটা চোরের ভয়ে গহনা বেঁচে দেওয়ার মতো। আমাদের মন্ত্রীরাই পারেন এ রকম দায়িত্বহীন মন্তব্য করতে। কাল কি ওই মন্ত্রী বলবেন- রাস্তায় দুর্ঘটনা ঘটে এজন্য গাড়ি চালাবেন না? কদিন পর এ রকম যুক্তিও কি দেওয়া হবে- রাস্তায় ছিনতাই হয় তাই ঘর থেকে বেরোবেন না? ঘটনা এখানেই শেষ নয়, ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির ঘটনা যে শেখ হাসিনার সঙ্গে ষড়যন্ত্র তা স্পষ্ট হলো এর পরের ঘটনাপ্রবাহে। মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই পরিবহন মালিক, কাভার্ড ভ্যান মালিক ইত্যাদি নানা মালিকের সমিতি একযোগে ধর্মঘটের ঘোষণা দিল। মন্ত্রীরা নির্বিকার! জনগণকে জিম্মি করা হলো। আমরা সবাই জানি এসব মালিক সমিতির নেতা কারা। এসব মালিক সমিতি সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট সংগঠন। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, তখন এসব সমিতি সে দলের আজ্ঞাবহ হয়ে কাজ করে। আওয়ামী লীগের এক প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং এমপি পরিবহন খাতের গডফাদার। তাঁর ইশারায় মালিক-শ্রমিকরা এক ঘাটে পানি খান। অর্থাৎ সরকারের একটি অংশ জনগণকে জিম্মি করল। ৫ নভেম্বর শুক্রবার। সারা দেশে একযোগে ১৭টি ভর্তি ও নিয়োগ পরীক্ষা। এর মধ্যে গণপরিবহন বন্ধ। কিছু মন্ত্রীর কাজ হলো শুধু কথা বলা। এঁদের কথা এতই কর্কশ ও বিরক্তিকর যে আওয়ামী লীগের কর্মীরাও আজকাল এদের কথায় কানে তুলা দেন। ব্যস, বকাউল্লা বকে গেলেন। পাতানো খেলার মতো বলতে থাকলেন ‘হুঁশিয়ার, সাবধান!’ মালিক সমিতির নেতারা মুচকি হাসলেন। তাঁরা জানেন এসব স্রেফ কথার কথা। যথারীতি মালিকপক্ষের দাবি মেনে নেওয়া হলো। সরকার কার প্রতিনিধি- জনগণের না মালিক পক্ষের? কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস আছে যার দাম বাড়লে বাজারে চেইন রিঅ্যাকশন হয়। ডিজেলের দাম বৃদ্ধির ফলে গণপরিবহনের ভাড়া বাড়ল। সে ঢেউ আছড়ে পড়ল কাঁচাবাজারে। এমনিতেই দ্রব্যমূল্য নিয়ে যেন এক হরিলুটের খেলা চলছে। শাকসবজি, পিঁয়াজ-কাঁচা মরিচ থেকে চালের দাম নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বেড়ে চলেছে। বাজার দেখার কেউ নেই। ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি সে আগুনকে আরও ভয়াবহ করল। করোনার সময় থেকেই মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন আয়ের মানুষের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। এ সময় ডিজেলের দাম বাড়িয়ে জন অসন্তোষ সৃষ্টির জন্যই কি এ তৎপরতা? জনগণকে জিম্মি করতে দেওয়ার সুযোগ কেন মালিকদের দেওয়া হচ্ছে? টানা তিন মেয়াদে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। সব সময় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে বলা হচ্ছে সরকার শক্তিশালী। বিপুল জনসমর্থন আছে সরকারের। ঘরে বাইরে সরকারের ক্ষমতা দৃশ্যমান বটে। কিন্তু এত বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে তৃতীয় মেয়াদে থাকা একটি সরকার কিছু সিন্ডিকেটের কাছে এত অসহায় কেন? শুধু ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি নয়, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন বিষয়ে লক্ষ্য করি যে প্রধানমন্ত্রী যা বলেন এবং নির্দেশ দেন তার উল্টো কাজ করাটা যেন আওয়ামী লীগ ও সরকারের একটা অংশের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এরা যেন শেখ হাসিনার প্রধান প্রতিপক্ষ। সাম্প্রদায়িক সহিংসতার কথাই ধরা যাক। দুর্গোৎসবে যা ঘটেছে তা অগ্রহণযোগ্য। প্রধানমন্ত্রী সব সময় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথা বলেন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের জন্য শেখ হাসিনা যা করেছেন, অন্য কোনো সরকারপ্রধান তা করেননি। কিন্তু শেখ হাসিনার এ অর্জন ম্লান করতে যেন মরিয়া সরকারের প্রশাসন। প্রতি বছর দুর্গোৎসবে পূজামণ্ডপে তিন স্তরে নিরাপত্তার ব্যবস্থা রাখা হয়। এবার রাখা হয়নি কেন? কুমিল্লার ঘটনার পর সরকারের ঘুম ভাঙল অনেক দেরিতে, কেন? সর্বত্র প্রশাসন এত নির্লিপ্ত, উদাসীন কেন? গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কী করল? জাতির পিতা সারা জীবন অসাম্প্রদায়িক চেতনা লালন করে গেছেন। শেখ হাসিনাও তা করেন। কিন্তু তাঁর সরকারের মন্ত্রী, আমলা, প্রশাসনের কজন এ চেতনা ধারণ করেন? প্রশাসনে এখন বকধার্মিকের আধিক্য চোখে পড়ে। এদের কারণেই সাম্প্রদায়িক শক্তি মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে। সাম্প্রদায়িক সহিংসতা নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী যা বলেছেন তা কি আওয়ামী লীগের নীতি-আদর্শের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ? এই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে ৫০ বছরে বাংলাদেশ নতুন বন্ধু পেয়েছে, তার নাম পাকিস্তান। সরকারের ভিতর প্রভাবশালী একটি অংশ যেন পাকিস্তানের সঙ্গে রোমান্সের জন্য ব্যাকুল। পাকিস্তানের কাছে পাওনা টাকার হিসাবে নেই। বাংলাদেশে পাকিস্তানের ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে নজরদারি নেই। পাকিস্তানের জন্য পুরনো প্রেম যেন উথলে উঠেছে। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে সরকারের ভিতর যারা মরিয়া তারাই শেখ হাসিনার প্রতিপক্ষ।

বাংলাদেশে এখন লাজলজ্জাহীন তৈল মর্দন প্রতিযোগিতা চলছে। শেখ হাসিনাকে এমন কোনো উপাধি নেই যা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়নি। তাঁর প্রশংসা, স্তুতিতে মন্ত্রী, আমলারা মুখে ফেনা তোলেন। কিন্তু বাস্তবে কাজ করেন তাঁর নীতি ও আদর্শের পরিপন্থী। শেখ হাসিনা বলেছেন, জনগণকে কষ্ট দেওয়া যাবে না। সরকারের একটি অংশের একমাত্র কাজ জনগণকে যে কোনো প্রকারে কষ্ট দেওয়া। করোনাকালে তার ভূরি ভূরি নজির আছে। গার্মেন্টস চলবে, গণপরিবহন বন্ধ কিংবা অর্ধেক গাড়ি চলবে- এর মতো উদ্ভট সিদ্ধান্ত শুধু জনগণকে কষ্ট দেওয়ার জন্যই। শেখ হাসিনা বলেছেন, দুর্নীতি করা যাবে না। বাস্তবে দুর্নীতির এক নীরব প্রতিযোগিতা চলছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ১৭ ফাইল গায়েব হলো। দু-এক দিন তোড়জোড় দেখলাম, এখন তা বন্ধ। ফাইল রক্ষার দায়িত্ব আমলাদের, অথচ পিয়ন-দারোয়ানদের নিয়ে টানাহেঁচড়া করে লোক দেখানো নাটক হলো। শেখ হাসিনা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব চেয়েছেন তা-ও তিন মাস হলো। এটা ধামাচাপা দিতে আমলারা এখন চাটুকারিতায় আরও বেশি মনোযোগী হয়েছেন। অনেকেই বিভিন্ন সময়ে বলার চেষ্টা করেন, শেখ হাসিনা যা চান তা-ই হয়। কথাটা সঠিক নয়। শেখ হাসিনার অনেক আকাঙ্খার উল্টো কাজ করছে সরকারের একটি অংশ এবং প্রশাসন। শেখ হাসিনার আকাঙ্খাগুলোকে যদি প্রশাসন বুঝত তাহলে এভাবে ডিজেলের দাম বাড়াত না, এভাবে পূজামণ্ডপে হামলা হতো না। এভাবে ফাইল চুরির ঘটনা ধামাচাপা দেওয়া হতো না। শেখ হাসিনার একমাত্র শক্তি হলো জনগণ। শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তাকে প্রতিপক্ষ ভয় পায়। সরকারের ভিতর একটি অংশ এখন শেখ হাসিনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে। তাঁর জনপ্রিয়তা নষ্টের চক্রান্ত চলছে। এজন্য বাজারে ছড়ানো হয়- শেখ হাসিনার সিদ্ধান্ত ছাড়া কিছুই হয় না। মন্ত্রীরা ঘুষ খান শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তে? আমলারা বেগমপাড়ায় বাড়ি বানান প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়ে? নীরবে পর্দার আড়ালে চলছে এক সর্বনাশা খেলা। এ খেলায় শেখ হাসিনার দুঃসময়ের আপনজনদের সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। প্রশাসনে সৎ, যোগ্য, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসীদের আড়াল করা হচ্ছে। শেখ হাসিনাকে বায়ু বাবলের মতো চাটুকার বলয় ঘিরে ফেলেছে। শুধু সরকার কেন, আওয়ামী লীগের একটি অংশও যেন শেখ হাসিনার বিপরীত স্রোতে চলছে। আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশ বন্ধে গত পাঁচ বছরে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী না হলেও ৫০ বার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু দলের নেতারা সে নির্দেশ কি মানছেন? শেখ হাসিনা বলেছেন, বিদ্রোহী প্রার্থী দেওয়া যাবে না। মন্ত্রী-এমপিরাই এ বক্তব্যের পর দ্বিগুণ উৎসাহে বিদ্রোহী প্রার্থী দিচ্ছেন। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ এখন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহীরা। এরা মারামারি করছেন। খুনোখুনি করছেন। আওয়ামী লীগের বাইরের শত্রুর দরকার নেই। আওয়ামী লীগের প্রধান শত্রু এখন আওয়ামী লীগ। শেখ হাসিনা বলেছেন, রাজনীতি ত্যাগের, ভোগের নয়। তিনি যা বলেন তা করেন। ৪০ বছর দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। প্রায় ১৮ বছর প্রধানমন্ত্রিত্ব করছেন। একটি কলঙ্কের দাগ তাঁর গায়ে লাগেনি। তাঁর চরম শত্রুও শেখ হাসিনার সততা নিয়ে প্রশ্ন করতে পারবে না। কিন্তু শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগে ওয়ার্ড নেতার বাসায় টাঁকশাল থাকে! গত ১৩ বছরে আওয়ামী লীগে যারা অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়েছেন তারা কি শেখ হাসিনার অনুসারী? যখনই শেখ হাসিনা দলে শুদ্ধি অভিযান শুরু করেন, তখন বিএনপি-জামায়াত জুজুর ভয় দেখানো হয়। আওয়ামী লীগের নেতারা ভাঙা রেকর্ডের মতো বিএনপিকে গালাগালি করেন। বিএনপি ষড়যন্ত্র করছে বলেও খিস্তি করেন। বিএনপি নামের এক ছায়ার সঙ্গে যুদ্ধ দেখিয়ে নিজেদের অপকর্ম আড়ালের চেষ্টা করছেন আওয়ামী লীগের কিছু নেতা। এরাই শেখ হাসিনার প্রতিপক্ষ।

মাঝেমধ্যে ’৭৫-এর আগের দৃশ্যপট চোখের সামনে ভেসে ওঠে। জাসদকে সামনের প্রতিপক্ষ দেখিয়ে খুনি মোশতাকরা দলে এবং সরকারে সিঁধ কাটছিল। কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি, পাটের গুদামে আগুন, সন্ত্রাসী তৎপরতার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষ সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়েছিল। এসব ঘটিয়ে যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে জাতির পিতার অসামান্য অবদানকে জনদৃষ্টির আড়াল করা হয়েছিল। শূন্য থেকে বঙ্গবন্ধু কীভাবে দেশকে গড়ে তুলছিলেন সে কথা জনগণকে বুঝতে দেওয়া হয়নি। জাসদকে মাঠে নামানো হয়েছিল আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ হিসেবে। বড় করে দেখানো হয়েছিল নানা বিশৃঙ্খলা। এ রকম একটি পরিস্থিতিতেই ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট ঘটানো হয়েছিল। তাজউদ্দীন আহমদরা ছিটকে পড়েছিলেন ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে। ষড়যন্ত্রকারীরা ঘিরে ফেলেছিল বঙ্গবন্ধুকে। দলে এবং সরকারে। আমরা কি সে রকম একটা পরিস্থিতির সামনে দাঁড়িয়ে? পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেলের মতো বড় পরিসরের উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ চলছে বাংলাদেশে। এসবের সুফল পাবে এ দেশের জনগণ। বদলে যাবে বাংলাদেশ। তার আগে দেশে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হচ্ছে, যেখানে পদ্মা সেতুর নির্মাণে মানুষের আবেগকে হত্যা করা হচ্ছে বরং পিঁয়াজের দাম বাড়ায় জনগণ ক্ষুব্ধ। মেট্রোরেলের সুবিধার চেয়ে ডিজেলের দাম বৃদ্ধি নিয়ে মানুষ বিরক্ত। প্রধানমন্ত্রীর বন্দনা করতে করতে প্রশাসনে ঘাপটি মেরে থাকা অপশক্তি কি ষড়যন্ত্রে লিপ্ত?

আমার এ উদ্বেগের কারণ একটাই। বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা আর শেখ হাসিনা এখন সমার্থক। শেখ হাসিনা ছাড়া এই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ভরা। তাই শেখ হাসিনার আসল প্রতিপক্ষ কারা, তা এখনই চিহ্নিত করতে হবে। কারণ বাইরের শত্রুর চেয়ে ঘরের শত্রু ভয়ংকর!

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত।



মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

খালেদার সাবেক সহকারী প্রেস সচিবও মিথ্যাবাদী বললেন ফখরুলকে

প্রকাশ: ০২:০০ পিএম, ২৬ Jun, ২০২২


Thumbnail খালেদার সাবেক সহকারী প্রেস সচিবও মিথ্যাবাদী বললেন ফখরুলকে

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দাবি করেছিলেন যে পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। তার এই দাবির সমর্থনে বিএনপির কোনো নেতাই এখন পর্যন্ত এগিয়ে আসেনি। উল্টো বেগম খালেদা জিয়া যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তখনকার তার সহকারী প্রেস সচিব মহিউদ্দিন খান মোহন এক নিবন্ধে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে মিথ্যাবাদী বলেছেন। 

তিনি তার নিবন্ধে লিখেছেন, 'অত্যন্ত দুঃখজনক হলো, পদ্মা সেতু উদ্বোধনের আগ মুহূর্তে বিরোধী দল বিএনপির পক্ষ থেকে একটি অহেতুক বিতর্কের অবতারণা করেছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সম্প্রতি তিনি বলেছেন, পদ্মা সেতুর প্রথম ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। বলে নেওয়া দরকার মির্জা আলমগীর সাহেব যে সময়ের কথা বলেছেন, তখন আমি প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সহকারী প্রেস সচিব ছিলাম। ওই মেয়াদে বেগম খালেদা জিয়া চারবার মুন্সীগঞ্জ জেলায় গিয়েছিলেন। একবার মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার মোল্লাকান্দি ইউনিয়নে ‘রজতরেখা’ নামে একটি গুচ্ছগ্রাম উদ্বোধন করতে, দ্বিতীয়বার মুক্তারপুরে, তৃতীয়বার লৌহজংয়ে নতুন উপজেলা ভবন উদ্বোধন করতে এবং চতুর্থবার গজারিয়ায় ইঞ্জিনিয়ারিং স্টাফ কলেজের ভিত্তি স্থাপন করতে। এর কোনোবারই তিনি মাওয়া পয়েন্টে পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেননি। সবচেয়ে বড় কথা হলো, তার সহকারী প্রেস সচিব হওয়ায় তিনি মুন্সীগঞ্জ সফরে গেলে আমি তাঁর সফরসঙ্গী হতাম। বেগম খালেদা জিয়া পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন এমন কোনো ঘটনা আমার জানা নেই। বিষয়টি নিয়ে আমি কথা বলেছি তাঁর তৎকালীন সহকারী একান্ত সচিব মো. আবদুল মতিনের সঙ্গে। তিনি ওই সময়ে প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুত উন্নয়ন প্রকল্পগুলো দেখভাল করতেন। মতিন সাহেবও তেমন কোনো ঘটনার কথা স্মরণ করতে পারলেন না।' 

তার এই নিবন্ধে তিনি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে প্রশ্ন করেছেন যে, তিনি এমন একটি ভিত্তিহীন তথ্য কোথায় পেলেন? মহিউদ্দিন খান মোহনের এই লেখা থেকে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দাবি মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন। এখন পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর খালেদা জিয়া স্থাপন করেছেন এরকম বক্তব্যের দাবিদার মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পাশে কেউ নেই। আর সত্য কথা বলতে মিথ্যার সঙ্গে কেউ থাকেও না। বর্তমানে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের অবস্থা তারই প্রমাণ। 

পদ্মা সেতু   বিএনপি   মির্জা ফখরুল  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

পদ্মা সেতু: ক্যারিয়ার বদলে দিলো এক আমলার

প্রকাশ: ০৬:০০ পিএম, ২৫ Jun, ২০২২


Thumbnail

আজ আনুষ্ঠানিকভাবে পদ্মা সেতুর উদ্বোধন হলো। পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান পরিচালনা করেছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম। খন্দকার আনোয়ার পদ্মা সেতুর কারণেই তার ক্যারিয়ারের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছেছেন বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। পদ্মা সেতু নিয়ে ঘটনাপ্রবাহের আগে তিনি অনেকটাই আলোচিত এবং উপেক্ষিত ছিলেন। ১৯৮৩ সালের ব্যাচের কর্মকর্তা খন্দকার আনোয়ার। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর এই ব্যাচের সবচেয়ে আলোচিত আমলা ছিলেন নজরুল ইসলাম খান। তিনি প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন, যখন শেখ হাসিনা বিরোধী দলের নেতা। এ কারণে নজরুল ইসলাম খান অনেক বিপদসংকুল পরিস্থিতির মধ্যে ছিলেন, অনেক কঠিন সময় পার করেছেন। এমনকি তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত সরকার তাকে তার প্রাপ্য গাড়িটিও দেননি। এরকম কষ্ট, নির্যাতন এবং পদোন্নতি বঞ্চিত থাকা অবস্থায় ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে এন আই খান প্রথমে প্রধানমন্ত্রীর একান্ত একান্ত সচিব, পরবর্তী প্রধানমন্ত্রীর সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

এই ব্যাচের সম্পর্কে একটি কথা প্রচলিত ছিল যে, এই ব্যাচকে বলা হতো টিকচিহ্ন ব্যাচ। হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ যখন প্রথম উপজেলা ব্যবস্থা চালু করেন তখন উপজেলায় ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের জন্য তড়িঘড়ি করে একটি বিসিএস পরীক্ষার আয়োজন করা, যে বিসিএস ব্যাচটি টিকমার্ক দিয়ে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। তখন কথা ছিলো যে, শুধুমাত্র তারা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। কিন্তু পরবর্তীতে এই ব্যাচের পক্ষ থেকে হাইকোর্টে রিট করা হয় এবং এই রিটে তারা বিজয়ী হয়ে প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে যুক্ত হয় ৮৩ এর এই ব্যাচটি। এই ব্যাচের অনেক মেধাবী কর্মকর্তা ছিলেন এবং আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে অনেকেই এই ব্যাচ থেকে নানাভাবে আলোচিত হন। আবার এই ব্যাচ থেকেই মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেট জালিয়াতি বা বিভিন্ন অভিযোগে একাধিক ব্যক্তি স্বেচ্ছায় অবসরেও গিয়েছিলেন। এসব আলোচনা-সমালোচনা বিতর্কের উর্ধ্বে ছিলেন খন্দকার আনোয়ার। তিনি নিভৃতে কাজ করতেন। কিন্তু যখন পদ্মা সেতু নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপিত হয় এবং তৎকালীন যোগাযোগ সচিব মোশারফ হোসেন ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপন করা হয়, তাকে গ্রেপ্তার করা হয়, ঠিক সেই সময়ে খন্দকার আনোয়ারকে দেওয়া হয় সেতু বিভাগের দায়িত্বে।

খন্দকার আনোয়ার একজন সৎ, পরিশ্রমী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। অনেকেই তাকে কোনো ঘরোনার নয়, কর্ম পাগল একজন ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করতো। কিন্তু সেতু মন্ত্রণালয়ের পান তিনি পদ্মা সেতু নিয়ে সংকটাপন্ন অবস্থায় মধ্যে। এরকম পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নিয়ে তিনি তার ক্যারিয়ারের সেরা সময়টি পার করেন। মূলত তার বিচক্ষণতা, কর্ম তৎপরতা এবং সততার কারণে পদ্মা সেতু নিয়ে নতুন কোনো বিতর্ক হয়নি বলে অনেকে মনে করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার ওপর যে আস্থা রেখেছিলেন সেই আস্থার প্রতিদান তিনি খুব ভালমতোই দেন। আর এই এটিই তার ক্যারিয়ার বদলে দেয়। পদ্মা সেতুর সাফল্যের কারণেই সেতু বিভাগ থেকে তিনি মন্ত্রিপরিষদ সচিব হন, যদিও আমলাতান্ত্রিক হিসাব-নিকাশে তার মন্ত্রিপরিষদ সচিব হওয়ার কথা ছিল না। মন্ত্রিপরিষদ সচিব হওয়ার পর তিনি প্রধানমন্ত্রীর আরও আস্থাভাজন হন। এজন্য তিনি দুদফা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন। একজন সৎ, পরিশ্রমী কর্মকর্তা হিসেবে তিনি পরিচিত। তার সততা, যোগ্যতাই তাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। যেটি সম্ভব হয়েছে পদ্মা সেতুর কারণে।

পদ্মা সেতু   মন্ত্রিপরিষদ সচিব   খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

সব হারিয়ে সব পাওয়ার গল্প

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ২৫ Jun, ২০২২


Thumbnail সব হারিয়ে সব পাওয়ার গল্প

আজ বাংলাদেশের গৌরবের দিন। অহংকারের দিন। বাংলাদেশ যত দিন বেঁচে থাকবে তত দিন ২৫ জুনকে স্মরণ করবে। আত্মমর্যাদা ও সাহসের উন্মোচনের দিন হিসেবে উদ্যাপন করবে। পদ্মা সেতু যতটা না সামষ্টিক অর্জন, তার চেয়ে বেশি শেখ হাসিনার নেতৃত্বের স্বীকৃতি। তাঁর দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মনোবল, জনগণের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতীক পদ্মা সেতু। একজন নেতা কী অসাধ্য সাধন করতে পারেন তার বড় বিজ্ঞাপন পদ্মা সেতু। প্রশ্ন উঠতেই পারে, পদ্মা সেতু কি শেখ হাসিনার সেরা অর্জন? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের একটু পেছনে ফিরে যেতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জীবন-দর্শন ও রাজনীতি খানিকটা হলেও বিশ্লেষণ করতে হবে।

দীর্ঘ ৪১ বছর ধরে আওয়ামী লীগের মতো জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলের প্রধান নেতা শেখ হাসিনা। ২৩ জুন আওয়ামী লীগ ৭৩ বছরে পা রাখল। শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ও শক্তিশালী রাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের ৭৩ বছরের আয়ুষ্কালে শেখ হাসিনাই দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ৪১ বছর। আওয়ামী লীগের মতো একটি সংগঠনের শুধু প্রধান নেতা হিসেবে নয়, সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তি হিসেবেও শেখ হাসিনা প্রতিষ্ঠিত। আওয়ামী লীগে তাঁর কোনো বিকল্প নেই। এটি যে কোনো রাজনীতিবিদের জন্য অনন্য অর্জন। টানা ৪১ বছর দলের নেতা-কর্মীদের কাছে জনপ্রিয় থাকা কঠিন কাজ। সে কঠিন কাজটিই তিনি করেছেন অবলীলায়। এজন্যও শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে অমরত্ব পাবেন।

তবে আওয়ামী লীগ বা দেশের রাজনীতিতে তাঁর অপরিহার্য হয়ে ওঠার গল্পটা খুব সোজাসাপটা ছিল না। দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়েছে। ১৯৮১ সালের ১৭ মে শেখ হাসিনা দেশে ফিরেছিলেন এক প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে। সামরিক শাসনের শৃঙ্খলে গণতন্ত্র বন্দি। বুটের তলায় পিষ্ট মানুষের অধিকার। আওয়ামী লীগ বিভক্ত, ক্ষতবিক্ষত। দেশে ফিরেই শেখ হাসিনা গণতন্ত্রের ডাক দিলেন। মানুষের মুক্তির কথা বললেন। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গড়ে তুললেন গণজাগরণ। শেখ হাসিনা যদি বাংলাদেশে না আসতেন তাহলে বাংলাদেশ হয়তো আরেকটি পাকিস্তান হতো। অথবা ব্যর্থ, পরাজিত এক রাষ্ট্র হিসেবে ধুঁকতে থাকত। দেশে সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন করে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা শেখ হাসিনার আরেকটি বড় অর্জন। অং সান সু চি পারেননি। ব্যর্থ হয়েছেন বেনজির ভুট্টো। মিয়ানমারে সু চি সামরিক জান্তার সঙ্গে সমঝোতা করে শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রকেই বলি দিয়েছেন। কিন্তু শেখ হাসিনা সামরিক জান্তাদের বিরুদ্ধে গণজাগরণ সৃষ্টি করেছেন। শেষ পর্যন্ত উর্দিতন্ত্রের কবর দিয়েছেন চিরতরে। একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের প্রধান নেতা হিসেবেও শেখ হাসিনা অবলীলায় ইতিহাসে অমরত্ব পাবেন।

গণতন্ত্রের জন্য একটি শক্তিশালী বিরোধী দল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমতাসীন দলকে জবাবদিহিতার মধ্যে রাখার জন্য একটি কার্যকর শক্তিশালী বিরোধী দল জরুরি। ১৯৮৬ ও ’৯১ সালের সংসদে আওয়ামী লীগ ছিল বিরোধী দল। শেখ হাসিনা ছিলেন বিরোধী দলের নেতা। আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে ছিল এজন্যই গণতন্ত্রের পথ সুগম হয়েছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ কেবল সরকারের সমালোচনা করেনি। বিকল্প পথ দেখিয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে সফল বিরোধী দল আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ দেখিয়েছে বিরোধী দলের কাজ কী। বিরোধী দলকে কীভাবে রাজনীতি করতে হয়। এজন্য এ দেশের রাজনীতির ইতিহাসে চিরকাল বেঁচে থাকবেন শেখ হাসিনা। দলে-বাইরে নানা প্রতিকূলতা পার হয়ে ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ দীর্ঘ ২১ বছর পর দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পায়। এ সময় তিনি রাষ্ট্র পরিচালনায়ও এমন কিছু পদক্ষেপ নেন, যার যে কোনো একটির জন্যই তিনি অমরত্ব পেতে পারেন। গঙ্গার পানিচুক্তি ছিল ১৯৯৬-২০০১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সাফল্যের প্রথম পালক। পার্বত্য শান্তির মতো একটি উদ্যোগ অন্য কোনো দেশের সরকারপ্রধান গ্রহণ করলে সেজন্য নিশ্চিত নোবেল শান্তি পুরস্কার পেতেন। কিন্তু পাহাড়ে শান্তি ফিরিয়েও শেখ হাসিনা ওই অঞ্চলের মানুষের ভালোবাসা ছাড়া কিছুই পাননি। তবে পার্বত্য শান্তিচুক্তির জন্যও শেখ হাসিনা অমরত্ব পাবেন। ’৯৬ সালে রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে কল্যাণকামী রাষ্ট্রের অবয়ব দিতে শুরু করেন। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, কমিউনিটি ক্লিনিক, একটি বাড়ি একটি খামার, আশ্রয়ণ ইত্যাদি প্রতিটি উদ্যোগ মানবিক বাংলাদেশ গঠনের একটি করে স্তম্ভ। এ উদ্যোগগুলোর জন্য শেখ হাসিনা চিরকাল বেঁচে থাকবেন। দরিদ্র প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আপন মানুষ হয়ে উঠেছিলেন তিনি এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে। শেখ হাসিনার মতো বাংলাদেশে আর কেউ কি এত দরিদ্রবান্ধব কর্মসূচি নিয়েছিল? এ অর্জনগুলো খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এ সবই হলো আর্থসামাজিক উন্নয়ন। অনেক সময় আর্থসামাজিক উন্নয়ন অবকাঠামো উন্নয়নের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ২০০১ সালে বাংলাদেশে প্রথম শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন শেখ হাসিনা। সে বছর বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসে। শুরু হয় সংখ্যালঘু ও বিরুদ্ধমতের ওপর তান্ডব। ১ অক্টোবর থেকে সারা দেশে জ্বালাও-পোড়াও, হত্যা-সন্ত্রাসের এক ভয়ংকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এ সময় বাংলাদেশ প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সাহসী এক লড়াকু যোদ্ধাকে দেখে। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত যেভাবে নিপীড়ন-নির্যাতনের মধ্যে শেখ হাসিনা অটল, দৃঢ়চিত্তে দলের হাল ধরেছেন, নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন সেটিও তাঁর বড় এক অর্জন। ২০০১-এর মাস্টারপ্ল্যান ছিল আওয়ামী লীগকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা। আর এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চূড়ান্ত রূপ ছিল ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা। অলৌকিকভাবে সেদিন বেঁচে যান আওয়ামী লীগ সভানেত্রী। এ ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েও হাল ছাড়েননি শেখ হাসিনা। বরং জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আরও সোচ্চার হয়েছেন। এ সাহস আর অকুতোভয় চরিত্রের কারণেই শেখ হাসিনা অমরত্ব পাবেন। সেদিন যদি তিনি ভয় পেয়ে গুটিয়ে যেতেন তাহলে আজকের বাংলাদেশ আমরা পেতাম না। দানবের বিরুদ্ধে লড়াই করার সাহস খুব কম মানুষের থাকে। তার চেয়েও কম মানুষ এ লড়াইয়ে জয়ী হয়। শেখ হাসিনা সে রকমই এক বিরল বিজয়ী যোদ্ধা। ওয়ান-ইলেভেনের সময়টা ছিল বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের জন্য এক অগ্নিপরীক্ষা। সে পরীক্ষায় জয়ী হয়েছেন মাত্র একজন রাজনীতিবিদ। তাঁর নাম শেখ হাসিনা। এক-এগারো ছিল বাংলাদেশে বিরাজনীতিকরণের সবচেয়ে পরিকল্পিত দীর্ঘমেয়াদি নীলনকশা। সেনাবাহিনীর ঘাড়ে সওয়ার হয়ে সুশীল রাজত্ব কায়েম হয়েছিল বাংলাদেশে। বাংলাদেশের রাজনীতির দৈন্যের করুণ চেহারাটা সে সময় উন্মোচিত হলো। কেউ পালিয়ে গেলেন, কেউ আপস করলেন, কেউ দিগ্ভ্রান্ত, হতবিহ্বল। রুখে দাঁড়ালেন একজন। শেখ হাসিনা। সেদিন যদি নির্বাচনের দাবিতে, দ্রুত জনগণের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য তিনি সোচ্চার না হতেন, তাহলে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হতো অধিকারহীন এক করপোরেট দাসতন্ত্র। এ সময় শেখ হাসিনার ওপর নেমে এসেছিল অত্যাচারের স্টিম রোলার। একের পর এক বানোয়াট মামলা, নির্যাতনে এতটুকু টলাতে পারেনি সাহসী এই রাষ্ট্রনায়ককে। এ সময় দেশের মানুষ দেখেছে ক্লান্তিহীন লড়াকু এক নেতাকে। একাই যুদ্ধ করে হারিয়েছেন ক্ষমতালিপ্সুদের। ফিরিয়ে এনেছেন গণতন্ত্র।

বাংলাদেশে শেখ হাসিনার বর্তমান টানা ১৩ বছরের শাসনামল নিয়েই চর্চা বেশি হয়। অতীতে তাঁর সংগ্রাম, অসম্ভবের বিরুদ্ধে একাকী যুদ্ধ অনেকটাই আড়ালে থেকে যায়। কিন্তু ১৯৮১ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ শেখ হাসিনাকে করেছে অনন্য, অসাধারণ, তুলনাহীন। সোনা যেমন পুড়েই খাঁটি হয়, শেখ হাসিনাও ঘাত-প্রতিঘাতেই আজকে রাষ্ট্রনায়ক থেকে বিশ্বনেতা হয়েছেন। এ ১৩ বছরে ১০০ কারণে শেখ হাসিনা অমরত্ব পাবেন। ১০০ কারণে আগামী ১০০ বছরেও বাংলাদেশ শেখ হাসিনার মতো একজন নেতা পাবে না। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার সম্পন্ন করে রায় কার্যকর। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে জাতির কলঙ্ক মোচন। বিডিআর বিদ্রোহ দমন। কোন অর্জনকে খাটো করবেন? সমুদ্রে বাংলাদেশের অধিকার প্রতিষ্ঠা। ভারতের সঙ্গে স্থলসীমান্ত বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান। ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে মানবিক বিবেচনায় আশ্রয় দান। স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের উত্তরণ। প্রায় সব সূচকে ভারত-পাকিস্তানকে পেছনে ফেলা। টানা প্রবৃদ্ধি। কোন অর্থনৈতিক অর্জনকে আপনি উপেক্ষা করবেন?

পদ্মা সেতু নিঃসন্দেহে অনন্য, অসাধারণ এক অর্জন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল কিংবা রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প, একটিও কম? কবে বাংলাদেশ একসঙ্গে এতগুলো স্বপ্ন পূরণের পথে হেঁটেছে।

পদ্মা সেতু ব্যতিক্রম এবং আলাদা মর্যাদায় অন্য কারণে। কেবল একটি নান্দনিক আধুনিক অবকাঠামোর জন্য নয়, পদ্মা সেতু বাংলাদেশকে অপমানের প্রতিশোধ। আমাদের সম্মান ও মর্যাদার প্রতীক। পদ্মা সেতু সব সময় আমার আরেকটি মুক্তিযুদ্ধ মনে হয়। বাংলাদেশের দামাল ছেলেরা যেমন প্রায় নিরস্ত্র অবস্থায় যুদ্ধ করে একটা দেশ স্বাধীন করেছে; তেমনি দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রামরত একটা দেশ বিশ্বের অন্যতম চিত্তাকর্ষ এক সেতু বানিয়ে ফেলল নিজের টাকায়। এর পেছনে শক্তিটা কী? শক্তিটা হলো সাহস। এ সাহস তাকে দিয়েছে অফুরন্ত প্রাণশক্তি, সবকিছু জয়ের অদম্য স্পৃহা।

শেখ হাসিনার জীবনের গল্পটা সিনেমার চিত্রনাট্যের চেয়েও রোমাঞ্চকর। মাঝেমধ্যে তা রূপকথার চেয়েও বিস্ময়কর। একজন মানুষ যদি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়, লক্ষ্য অবিচল থাকে, চিন্তা পরিচ্ছন্ন হয় তাহলে যে তিনি বিজয়ী হবেন শেখ হাসিনাই তার প্রমাণ। ’৭৫-এ মানুষটি সব হারিয়েছেন। বাবা, মা, ভাই সবাইকে। এ রকম একজন মানুষের তো উন্মাদ হয়ে যাওয়ার কথা। অথবা হতাশার গহিন অরণ্যে হারিয়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু শেখ হাসিনা দেখালেন সব হারিয়েও সব পাওয়া যায়। মনোবল, সততা ও নিষ্ঠা দিয়ে কাজ করলে অসম্ভব শব্দটাকে সহজেই পরাজিত করা যায়। শেখ হাসিনা বাংলাদেশে জাতির পিতাকে পুনর্বার প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এ দেশে আর কেউ কোনো দিন বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলতে পারবে না।

’৭৫-এর পর কজন ভেবেছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু আবার তাঁর মর্যাদার আসনে বসবেন। কেউ কি ভেবেছিল বাংলাদেশ আবার বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের পথে হাঁটবে? ’৮১ সালে যখন শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরলেন অসহায়, রিক্ত, সিক্ত অবস্থায় তখন কজন ভেবেছিল তিনি হয়ে উঠবেন বাঙালির কান্ডারি। তার হাত ধরেই বাংলাদেশ বিশ্বদরবারে পাবে মর্যাদার আসন। ’৯১ সালের নির্বাচনে যখন আওয়ামী লীগ হেরে গেল, তখন শেখ হাসিনার রাজনীতির যবনিকা দেখেছিলেন বেশির ভাগ পন্ডিত। ২০০১-এ আওয়ামী লীগের পরাজয়ের পর আওয়ামী লীগের নেতারাই ঘুরে দাঁড়ানো অসম্ভব ভেবেছিলেন। ২০০৭ সালে তো নৌকা থেকে ঝাঁপ দিয়ে নিরাপদ দূরত্বে থাকতে চেয়েছিলেন হেভিওয়েট নেতারা। কিন্তু শেখ হাসিনা হাল ছাড়েননি। লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হননি এতটুকু। তিনি আস্থা রেখেছিলেন আওয়ামী লীগের তৃণমূলের ওপর, কোটি মানুষের ওপর। তাদের নিয়ে লড়াই করে গেছেন সব হারানো মানুষটি। লড়াই করেছেন অসত্যের বিরুদ্ধে, অপশাসনের বিরুদ্ধে, দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে। বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথেই তিনি হেঁটেছেন। নতুন পথ বানাতে চাননি। জাতির পিতার ছায়ায় থেকেই নিজেকে বিস্তৃত করেছেন। শেখ হাসিনার গল্পটা তাই সব হারিয়ে সব পাওয়ার গল্প। শুধু শেখ হাসিনার গল্প নয়, বাংলাদেশ পদ্মা সেতুর গল্পটাও যেন একই চিত্রনাট্যের অনুপম বাস্তবায়ন। এক অসম যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে বাংলাদেশ পায় এক স্বাধীন রাষ্ট্র। জাতির পিতার স্বপ্ন ছিল এক স্বনির্ভর, আত্মমর্যাদার দেশ। কিন্তু ’৭৫-এ জাতির পিতাকে হারিয়ে বাংলাদেশ যেন সব হারায়। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন স্বাধীনতা, চেয়েছিলেন অর্থনৈতিক মুক্তি। নিজ অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ যেন অর্থনৈতিক মুক্তির পতাকা ওড়াল। ’৭৫-এ সব হারানো বাংলাদেশ ২০২২-এ এসে সব পেল। পদ্মা সেতুর গল্পটাও একই রকম। বিপুল আড়ম্বরে এ সেতু নির্মাণের যাত্রা হয়েছিল। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের কথিত দুর্নীতির অভিযোগ সব স্বপ্ন লন্ডভন্ড করে দেয়। সব হারায় পদ্মা সেতু প্রকল্প। কিন্তু শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পদ্মা সেতু এখন বাংলাদেশের উন্নয়নের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন।

পদ্মা সেতু নিঃসন্দেহে শেখ হাসিনার সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর একটি। কিন্তু শেখ হাসিনার আসল অর্জন হলো তাঁর রাজনীতি, সাহস ও সততা। এ কারণেই লক্ষ্য অর্জনে পাহাড়সম বাধা তিনি পার হয়ে যান অবলীলায়। সব হারিয়ে তিনি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছেন। এটাই তাঁর সব পাওয়া। রাজনীতির এ দৃঢ় আদর্শের জন্য শেখ হাসিনা অমরত্ব পাবেন। বেঁচে থাকবেন হাজার বছর।

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত।
Email : poriprekkhit@yahoo.com
সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন।

পদ্মা সেতু উদ্বোধন   পদ্মা সেতু   উদ্বোধন   শেখ হাসিনা  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

ফখরুল ৫০০, রিজভী ২০০ টাকা

প্রকাশ: ০৫:০০ পিএম, ২৩ Jun, ২০২২


Thumbnail

বন্যা নিয়ে বিএনপি'র আহাজারির কমতি নেই। প্রতিদিন বিএনপি সরকারের সমালোচনায় মুখর। সরকার ত্রাণ তৎপরতা ঠিকমতো করতে পারছে না, বন্যার চেয়ে পদ্মা সেতুর উদ্বোধন নিয়ে সরকার ব্যস্ত এমন সমালোচনা বিএনপির পক্ষ থেকে প্রতিনিয়তই করা হচ্ছে। কিন্তু দেশের অন্যতম প্রধান বিরোধী দল হিসেবে বন্যাদুর্গতদের সাহায্যের জন্য বিএনপি কি করছে? সম্প্রতি বিএনপির নেতারা নিজস্ব উদ্যোগে দূর্গত মানুষকে সহায়তার জন্য অর্থ আহরণ করা শুরু করেছে। দলের নেতাকর্মীদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, দলীয় প্রধান কার্যালয়ে যে যেটুকু পারে সেটুকু টাকা যেন জমা দেয়। আর টাকা জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত গত তিনদিনে বিএনপি'র কেন্দ্রীয় ত্রাণ তহবিলে টাকা উঠেছে ৩৬ হাজার ৭৫০ টাকা মাত্র। আর এই ত্রাণ তহবিলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দিয়েছেন ৫০০ টাকা আর বিএনপি'র সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দিয়েছেন ২০০ টাকা। স্থায়ী কমিটির অধিকাংশ সদস্যই কোনো টাকা জমা দেননি। সবচেয়ে বেশি ৩০০০ টাকা জমা দিয়েছেন একজন ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতা। বিএনপির নেতারা বলছেন যে, তারা আরও অপেক্ষা করবেন এবং আগামী দুইদিন পর এই টাকা দিয়ে ত্রাণ তৎপরতা শুরু করবেন। 

তবে বিএনপির এই ৩৬ হাজার ৭৫০ টাকা দিয়ে দুর্গত মানুষের জন্য কি ত্রাণ সহায়তা করা হবে, সে নিয়ে বিএনপির মধ্যেই নানারকম কৌতুক শুরু হয়েছে। বিএনপির একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, এ টাকা দিয়ে সবার জন্য ১ বোতল করে পানিও দেওয়া সম্ভব না। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সরকারের কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন যে, সরকার অপ্রতুল ত্রাণ সহায়তা দিচ্ছে এবং দুর্গত মানুষদের জন্য তেমন ত্রাণ দিচ্ছে না। কিন্তু এখন পর্যন্ত বিএনপি'র পক্ষ থেকে তেমন কোনো ত্রাণ তৎপরতা চোখে পড়েনি। স্থানীয় পর্যায়ে সিলেটের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী নিজের ব্যক্তিগত উদ্যোগে কিছু ত্রাণ সহায়তা দিয়েছেন। আরিফুল হক চৌধুরী বিএনপি নেতাদেরকে ত্রাণ সহায়তায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানালেও সেই আহ্বানে এখনও সাড়া দেয়নি বিএনপি নেতারা।

বিএনপিতে ধর্নাঢ্য-বিত্তবান ব্যক্তির সংখ্যা কম নয়। বিএনপি নেতাদের মধ্যে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী একজন ধর্নাঢ্য শিল্পপতি। আব্দুল আউয়াল মিন্টুও বিত্তশালী একজন ব্যক্তি। এছাড়াও বিএনপিতে বহু ব্যবসায়ী এবং ধনী লোক আছেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য মির্জা আব্বাসও একটি ব্যাংকের মালিক এবং পরিবহন ব্যবসায় রয়েছেন। অথচ এত ধনী ব্যক্তি থাকার পরও বিএনপি নিজস্ব উদ্যোগে তহবিল গঠন করতে পারছে না কেন, এটি বিএনপি'র জন্য একটি বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। বিএনপি'র একজন কর্মী বলেছেন যে, দলের মহাসচিব যদি ৫০০ টাকা দেন তাহলে অন্য কর্মীরা কি করবেন? আর এর প্রেক্ষিতেই নতুন করে বিএনপি'র মধ্যে সমালোচনা শুরু হয়েছে। বন্যা শুরুর এক সপ্তাহ হলেও এখন পর্যন্ত বিএনপি'র স্থায়ী কমিটির কোনো গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে ত্রাণ তৎপড়তার জন্য সিলেট অঞ্চলে যেতে দেখা যায়নি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে যে, বন্যা নিয়ে কি বিএনপি রাজনীতি করতে চায় নাকি দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াতে চায়? 


ফখরুল   রিজভী   বিএনপি   বন্যা   ত্রাণ  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

ভিলেনরা কি যাবেন পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে?

প্রকাশ: ০৫:০০ পিএম, ২২ Jun, ২০২২


Thumbnail ভিলেনরা কি যাবেন পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে?

পদ্মা সেতুর উদ্বোধন হচ্ছে আগামী ২৫ জুন। ওই দিন সকাল ১০টায় আনুষ্ঠানিকভাবে এই সেতুর উদ্বোধন করবেন এই সেতুর স্বপ্নদ্রষ্টা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আজ প্রধানমন্ত্রী গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলন করেছেন। এই সংবাদ সম্মেলনে দেশের বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়, তবে বাকি সময়টা ছিল পদ্মা সেতু নিয়ে নানারকম আলোচনা। প্রধানমন্ত্রী খোলামেলাভাবে সব প্রশ্নের উত্তর দেন। প্রধানমন্ত্রী এই সময় পদ্মা সেতু নিয়ে বিভিন্ন মহলের বিরোধিতার প্রসঙ্গটি উত্থাপন করেন। বিশ্বব্যাংক যখন পদ্মা সেতুতে অর্থায়নে অস্বীকৃতি জানিয়ে সরে আসে, তখন বিভিন্ন বিশিষ্টজনেরা যেসব মন্তব্য করেছিল, সেই সমস্ত মন্তব্যগুলো প্রধানমন্ত্রী তুলে ধরেন সংবাদ সম্মেলনে। তিনি কয়েকজন সুনির্দিষ্ট ব্যক্তির বিরোধীতার কথাও উল্লেখ করেন তার সংবাদ সম্মেলনে। এই সমস্ত ব্যক্তিদেরকে আমন্ত্রণ জানানো হবে বলেও প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন। এখন প্রশ্ন হলো যে, যারা সেই সময় পদ্মা সেতুর বিরোধিতা করেছিলেন এবং পদ্মা সেতু হবে না বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন তারা কি আগামী ২৫ জুন পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যাবেন? 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যাদের কথা উল্লেখ করেছেন, তাদের মধ্যে প্রথমে নাম ছিল বেগম খালেদা জিয়ার। বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন যে, এই সরকার পদ্মা সেতু কাজ শুরু করছে, কিন্তু এই সরকার তা শেষ করতে পারবে না। বেগম খালেদা জিয়া পদ্মা সেতুর নির্মাণের ক্রটির কথাও উল্লেখ করেছিলেন। বেগম খালেদা জিয়া এখন শারীরিকভাবে অসুস্থ। তাই তার পক্ষে পদ্মা সেতুর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে যাওয়া সম্ভব না বলে তার পারিবারিক সূত্র বলেছে। যদিও পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, বেগম খালেদা জিয়া এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক দাওয়াত পান নাই। যদিও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন যে, বেগম খালেদা জিয়াকে দাওয়াত করার ক্ষেত্রে যদি আইনি কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকে, তাহলে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হবে। তবে বেগম খালেদা জিয়া যে পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যাচ্ছেন না এটা মোটামুটি নিশ্চিত।

ড. মুহাম্মদ ইউনূস: প্রধানমন্ত্রী সবচেয়ে বেশি পদ্মা সেতুর বিরোধিতাকারী হিসেবে যাকে চিহ্নিত করেছেন তিনি হলেন শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ড. মুহাম্মদ ইউনূস পদ্মা সেতুর বিরোধিতা করার ক্ষেত্রে কি কি করেছিলেন তার বিবরণও তুলে ধরেন শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী বলেন যে, একজন ব্যক্তির একটি পদ আঁকড়ে রাখার জন্য দেশের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দেওয়ার ঘটনা নজিরবিহীন। গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে থাকার জন্যই তিনি পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাধা দিয়েছিলেন বলে প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন। ড. মুহাম্মদ ইউনূস পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যাবেন কিনা এ সম্পর্কে যোগাযোগ করা হলে ইউনূস সেন্টারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্য কর্মসূচিতে ব্যস্ত থাকার কারণে তিনি যাবেন না। তবে এ ব্যাপারে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। 

ড. আকবর আলি খান: পদ্মা সেতু নিজ অর্থে করার সমালোচক হিসেবে ড. আকবর আলী খানের একটি বক্তব্য প্রধানমন্ত্রী আজ সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেছেন। ড. আকবর আলি খানের পারিবারিক সূত্র বলছে, তিনি অসুস্থ এবং পদ্মা সেতু পর্যন্ত যাওয়ার মতো শারীরিক সক্ষমতা তার নেই। এজন্য তিনি পদ্মা সেতুতে যাবেন না। যদিও তার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, তিনি পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণপত্র পেয়েছেন।

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য: সিপিডির সম্মানিত ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বিশ্বব্যাংকের সরে যাওয়া এবং নিজ অর্থায়নে পদ্মা সেতু করার কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এটির ফলে অর্থনৈতিক বিপর্যযয়ের কথাও বলেছিলেন। তবে জানা গেছে যে, ড. দেবপ্রিয় পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যাচ্ছেন না। সেতু বিভাগ সূত্র জানা গেছে যে, তাকে ইতোমধ্যে আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয়েছে। 

শাহদীন মালিক: শাহদীন মালিকও পদ্মা সেতুর সমালোচনা করেছিলেন। সেখানে তিনি সুশাসনের অভাবের কথা বলেছিলেন এবং বিশ্বব্যাংককে সরে যাওয়াটাকে দুর্ভাগ্যজনক বলেছিলেন। শাহদীন মালিকেও পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের দাওয়াত দেওয়া হয়েছে। কিন্তু শাহদীন মালিকের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছেন তিনি পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যাবেন না। 

অর্থাৎ যারা যারা পদ্মা সেতু হবে না, নিজে অর্থায়নে পদ্মা সেতু করা সম্ভব নয় বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন, তারা কেউই আসলে পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যাচ্ছেন না। তবে এটি কি লজ্জায়, না হতাশায় সেটি অবশ্য জানা যায়নি।

ভিলেন   পদ্মা সেতু   উদ্বোধন   প্রধানমন্ত্রী   শেখ হাসিনা  


মন্তব্য করুন


বিজ্ঞাপন