এডিটর’স মাইন্ড

যুক্তরাষ্ট্রের ‘ওলটপালট’ ক্ষমতা এবং মাহাথির থেকে শেখ হাসিনা

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ১৬ এপ্রিল, ২০২৩


Thumbnail

মাহাথির মোহাম্মদ। আধুনিক মালয়েশিয়ার স্থপতি। ১৯৮১ সাল থেকে টানা ২২ বছর মালয়েশিয়ার সরকারপ্রধান ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে মালয়েশিয়া বদলে গেছে। ঈর্ষণীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য মাহাথিরের নেতৃত্ব এক উদাহরণ। মাহাথির মোহাম্মদ যখন তাঁর দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন ঠিক তখনই যুক্তরাষ্ট্রের নজর পড়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নে ধাবমান মালয়েশিয়ার প্রতি।  এর কারণ ছিল মালয়েশিয়ার গন্ডি পেরিয়ে বিশ্ব নেতা হিসেবে মাহাথির মোহাম্মদের উত্থান। তিনি মুসলিম নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি আগ্রাসনের তীব্র নিন্দা জানাতেন। ২০০১ সালের সেপ্টেম্বরে টুইন টাওয়ার হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। মাহাথির মার্কিন এ নীতির তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। ইরাক আগ্রাসনের পর জাতিসংঘে দাঁড়িয়ে মাহাথির মোহাম্মদ যুক্তরাষ্ট্রকে আগ্রাসনবাদী এবং যুদ্ধবাজ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। মাহাথিরের বক্তব্য সাড়া বিশ্বে তোলপাড় ফেলেছিল। পাল্টা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র মালয়েশিয়ায় কর্তৃত্ববাদী শাসন, বিরোধী মত দমন, মত প্রকাশের স্বাধীনতা না থাকা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের নানা ইস্যু সামনে এনেছিল। মাহাথিরকে চাপে রাখতে সেখানে উগ্র মৌলবাদীদের উসকে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। মাহাথিরকে থামাতে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে গোপনে নানা সহায়তা দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। যাতে তারা মাহাথিরের বিরুদ্ধে শক্ত আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে। মালয়েশিয়ায় মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং বিরোধী মত দমন নিয়ে সোচ্চার হয়েছিল। কিন্তু মার্কিন প্রশাসন মালয়েশিয়ার সরকার পরিবর্তন করতে পারেনি। মাহাথির ২০০৩ সালে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। যুক্তরাষ্ট্র মালয়েশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যেও অর্থনৈতিক সম্পর্ক নষ্ট করেনি। দুই দেশের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বেড়েই গেছে। কারণ, অর্থনৈতিক কারণে মালয়েশিয়া ছিল যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আবার ক্রমবর্ধমান অগ্রগতিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য মালয়েশিয়ারও যুক্তরাষ্ট্রকে প্রয়োজন ছিল। দুই দেশের বিশ্ব রাজনীতি নিয়ে ভিন্ন অবস্থানের পর কূটনৈতিক সম্পর্ক অটুট ছিল। এ সময় মাহাথির মোহাম্মদ এক সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যদি শত্রু হয় তাহলে বিপজ্জনক আর যদি বন্ধু হয় তাহলে তা মারাত্মক।’ তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পেশাদারিত্বের এক সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। বন্ধু বা শত্রু হননি। যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করতে এতটুকু ভয় পাননি। আবার তাদের ভালো কাজের প্রশংসাও করেছেন।

ঠিক কুড়ি বছর পর মাহাথিরের মতো একজন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ বিশ্বনেতা দেখল বিশ্ব। সেই নেতার নাম শেখ হাসিনা।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি বড় গুণ হলো- স্পষ্টবাদিতা। তিনি যা বিশ্বাস করেন তা সরাসরি বলেন। কোনো রাখঢাক ছাড়াই। অপ্রিয় সত্য বলতে তিনি পিছপা হন না। সত্য সরাসরি স্পষ্ট করে বলার বিপদ জেনেই তিনি অপ্রিয় সত্য উচ্চারণ করেন। রাজনীতিতে এ জন্য যেমন তাঁকে অনেক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে, তেমনি জনগণের বিশ্বাস ও আস্থা তিনি এ জন্য অর্জন করেছেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ‘সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালোবাসিলাম, সে কখনো করে না বঞ্চনা।’ এ কবিতার পঙ্ক্তি যেন শেখ হাসিনার পথচলার দিশারী। তিনি জানেন, অনেকে অসন্তুষ্ট হবে, বিব্রত হবে তবুও তিনি ৭৫ নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতাদের ভূমিকার সমালোচনা করে বলেছেন, ‘এত নেতা, এত বড় দল তারা কোথায় ছিল।’ ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে কীভাবে হারানো হয়েছে তার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন অকপটে। বলেছেন, ‘গ্যাস বিক্রি করতে রাজি না হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ২০০১-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আসতে দেয়নি।’ ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপিকে জেতাতে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এর ভূমিকা নিয়েও আওয়ামী লীগ সভাপতি একাধিক বক্তৃতায় স্পষ্ট, খোলামেলা কথাবার্তা বলেছেন। এসব বক্তব্যের পার্শ¦প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে, কোনো প্রভাবশালী দেশ অসন্তুষ্ট হবে কি না ইত্যাদি ভাবনা তাঁকে সত্য উচ্চারণে পিছপা করেনি। একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে জনগণকে পর্দার আড়ালের ষড়যন্ত্রের কথা খোলামেলাভাবে জানিয়ে দিয়েছেন। লাভ-ক্ষতির নিক্তিতে সত্যকে মাপেননি। এটাই শেখ হাসিনা। সাহসী উচ্চারণই শেখ হাসিনার শক্তি। এ কথাটি আজ সবাই জানে। তবে ১০ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় সংসদে দেওয়া বক্তব্য অতীতের সব বক্তব্যকে ছাপিয়ে গেছে। জাতীয় সংসদের বিশেষ অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে তিনি ছিলেন আত্মপ্রত্যয়ী, স্পষ্টভাষী, আক্রমণাত্মক এবং সাহসী। প্রধানমন্ত্রীর যে কোনো রাজনৈতিক বক্তব্যে একটি দার্শনিক মর্মার্থ থাকে। শেখ হাসিনার বক্তব্যের তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। শুধু দেশের প্রেক্ষাপটে নয়, বিশ্ব প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনার বক্তৃতা গভীর তাৎপর্যময়। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এ বক্তৃতায় তিনি গণতন্ত্রের সব শত্রুকে একসঙ্গে চিহ্নিত করেছেন, সমালোচনা করেছেন। পাশাপাশি তাঁর বক্তৃতায় মুসলিম বিশ্বের সংকটও উঠে এসেছে। এ বক্তৃতায় তিনি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করেছেন আবার যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার কথাও স্মরণ করেছেন। আমি মনে করি তিনটি কারণে প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্য আলাদা গুরুত্ব রাখে। প্রথমত. সময়। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সময়টি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে যখন নানামুখী মেরুকরণ ঠিক তখন সংসদ নেতার এ বক্তব্য। প্রধানমন্ত্রী যখন এ বক্তব্য রাখছিলেন তখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে এম আবদুল মোমেন ওয়াশিংটনে অবস্থান করেছিলেন। জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের কয়েক ঘণ্টা পরই ড. মোমেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্থনি ব্লিঙ্কেনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেন। নানা কারণে বিশেষ করে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে মোমেন-ব্লিঙ্কেন বৈঠক ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ বৈঠকের আগে সংসদ নেতা কি ইচ্ছাকৃতভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করলেন? পররাষ্ট্রমন্ত্রী যে কথাগুলো মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলতে সাহস পান না সেই কথাগুলো বলে প্রধানমন্ত্রী কি বাংলাদেশের বার্তাটি পৌঁছে দিলেন। বৈঠকের আগে নিশ্চয়ই মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে মি. ব্লিঙ্কেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য জেনেছেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠকে হয়তো এর দৃশ্যমান প্রভাব চোখে পড়বে না। কিন্তু মার্কিন নীতিনির্ধারকরা নিশ্চয়ই প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর তাদের কৌশল পুনর্বিন্যাস করবে। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সময়টি গুরুত্বপূর্ণ। যখন চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব-ইরান বৈরিতার ইতি ঘটতে শুরু করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে একটি বলয় তৈরি হয়েছে। তখন ‘মুসলিম দেশগুলো কঠিন অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে’ বলে শেখ হাসিনা মূলত প্রগতিশীল, উদার মুসলিমপ্রধান দেশগুলোর নেতা হিসেবে আবির্ভূত হলেন। যেমনটি হয়েছিলেন মাহাথির।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের দ্বিতীয় তাৎপর্য হলো সব ষড়যন্ত্রের মুখোশ উন্মোচন। প্রধানমন্ত্রী তাঁর জাতীয় সংসদের ভাষণে গণতন্ত্রের পাঁচ প্রতিপক্ষকে একসঙ্গে চিহ্নিত করেছেন। শেখ হাসিনা সংসদের ভাষণে যাদের সমালোচনা করেছেন তারা হলেন বিএনপি এবং তাদের নেতৃবৃন্দ। প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টার গোষ্ঠী। সুশীল সমাজ ও বুদ্ধিজীবী। ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং সর্বশেষ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন বানচালে ষড়যন্ত্র করছে এ পঞ্চভূত। বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকার না হলে নির্বাচনে যাবে না- এ দাবিতে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। এ রাজনৈতিক অস্থিরতায় বাতাস দিচ্ছে সুশীলরা। সুশীলদের এ তৎপরতাকে ছড়িয়ে দিচ্ছে প্রথম আলো গোষ্ঠী। সুশীলরা এবং প্রথম আলো মিলে দেশে আবারও এক-এগারোর মতো একটি অনির্বাচিত সরকার আনতে চায়। এ জন্যই তারা বিএনপির আন্দোলনে মদদ দিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী সুশীল নিয়ন্ত্রিত প্রথম আলো এক-এগারোর সময় কী ভূমিকা পালন করেছিল তা-ও উল্লেখ করেন। প্রধানমন্ত্রী বক্তব্যে স্পষ্ট করেই বলেছেন যে, এ পুরো গণতন্ত্রবিনাশী তৎপরতায় পৃষ্ঠপোষকতা করছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের এ আগ্রাসী ভূমিকার কারণ তাদের স্বার্থ এবং ড. ইউনূসের তৎপরতা। প্রধানমন্ত্রী কোনো রাজনৈতিক সভামঞ্চে বা সরকারি কোনো অনুষ্ঠানে এ ষড়যন্ত্রের মুখোশ উন্মোচন না করে কেন সংসদে করলেন? এ প্রশ্নের উত্তরে আমার মনে হয় তিনি ইচ্ছা করেই এ বক্তব্যটি জাতীয় সংসদে রেকর্ড করে রাখলেন। জাতীয় সংসদে সংসদ নেতা হিসেবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে একটি বার্তা দিলেন। যাদের সঙ্গে মিলে যুক্তরাষ্ট্র ক্ষমতার ‘ওলটপালট’ করতে চাইছে তাদের দোষত্রুটি তুলে ধরে শেখ হাসিনা বুঝিয়ে দিলেন ষড়যন্ত্রকারীরা অযোগ্য। ভালো বিকল্প নয়। সংসদ নেতার ভাষণের তৃতীয় তাৎপর্য হলো- ক্ষমতাকে তুচ্ছজ্ঞান করা। আমার বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ কথা ছিল এরকম- “হ্যাঁ তারা (যুক্তরাষ্ট্র) যে কোনো দেশে ক্ষমতা উল্টাতে পারে, পাল্টাতে পারে। বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলোতে আরও কঠিন অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।” প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রের ‘ক্ষমতা’ সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল। তারপরও তিনি সত্য উচ্চারণে দ্বিধাহীন। এখান থেকেই বোঝা যায় শেখ হাসিনা এখনো ক্ষমতার মোহে দিকভ্রান্ত হননি। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ক্ষমতালোভীরা কত কিছু করে। যুক্তরাষ্ট্রের মর্জি মতো চলার সব চেষ্টা করে। মার্কিন ভয়ে স্বাধীন ও স্বকীয় সত্তা বিসর্জন দেয়। কিন্তু শেখ হাসিনা দেশের ও জনগণের স্বার্থের বাইরে কিছুই করেন না। এমনকি ক্ষমতা হারানোর ভয়েও তিনি আদর্শ বিচ্যুত হন না। ক্ষমতার লোভে যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কারও অন্যায্য প্রস্তাব যে শেখ হাসিনা মানবেন না, এ বক্তব্য তাঁর এক দলিল।

প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যি বাংলাদেশের ক্ষমতার ওলটপালট করতে চায়? এ জন্যই কি নির্বাচন ইস্যুকে তারা সামনে এনেছে। একথা ঠিক বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ এখন রীতিমতো বাড়াবাড়ি পর্যায়ে পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্র বলেই দিয়েছে আগামী নির্বাচন হতে হবে অংশগ্রহণমূলক অর্থাৎ বিএনপির মতো প্রধান রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ এ নির্বাচনে নিশ্চিত করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, নির্বাচন হতে হবে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ। এর কোনো ব্যত্যয় হলে তারা যে সেই নির্বাচন মানবে না। এখন বিএনপি বুঝে গেছে তাদের ছাড়া নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। তাই তারা আরও গো ধরে বসে আছে। এর ফলে গণতন্ত্র সংকটে পড়ার শঙ্কায়। যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যি বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে আগ্রহী হতো তাহলে দুটি কাজ করত। প্রথমত. তারা নির্বাচন কীভাবে হচ্ছে তা দেখত। কারা অংশগ্রহণ করছে না করছে তা তাদের দেখার বিষয় নয়। কারণ একটি দেশে অনেক রাজনৈতিক দল থাকে। সব দল সব নির্বাচনে অংশ নেয় না। ব্যক্তিগত কারণে, দলগত কারণে অথবা কৌশলগত কারণে কোনো নির্বাচন থেকে একটি রাজনৈতিক দল দূরে সরে যেতেই পারে। সুষ্ঠু নির্বাচন মানে বিদ্যমান দলগুলোর মধ্যে যে নির্বাচন হচ্ছে তা পরিপূর্ণ নিরপেক্ষ এবং অবাধ হচ্ছে কি না সেটি নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত. যুক্তরাষ্ট্র সত্যি আন্তরিকভাবেই বিশ্বাস করে বিএনপির অংশগ্রহণ ছাড়া নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। তাহলে তারা বিএনপিকে নির্বাচনে আনার উদ্যোগ নিত। একটি রাজনৈতিক সমঝোতার চেষ্টা করত। যুক্তরাষ্ট্রের এখনকার অবস্থান দেখে মনে হতেই পারে তারা রাজনৈতিক সমঝোতা নয় বরং বর্তমান সরকারকে চাপে ফেলতে চায়। অর্থাৎ নির্বাচন একটি উপলক্ষ মাত্র। বাংলাদেশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বহুমাত্রিক আগ্রহ আছে। বিশ্ব রাজনীতিতে চীনের বাড়াবাড়ি রকমের উত্থান যুক্তরাষ্ট্রের এ আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ভারত যুক্তরাষ্ট্রের অনুগত নয়। নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ভারত চুটিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে ব্যবসা করছে। ভারতের মতো বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশকে চাপ দেওয়ার অবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের নেই। তাই চীনবিরোধী অবস্থানের পরও বিশ্ব মেরুকরণে ভারত যুক্তরাষ্ট্রের নিঃশর্ত অনুগত নয়। পাকিস্তান ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের হাতছাড়া হয়ে গেছে। অর্থনৈতিক সংকটে ডুবতে থাকা পাকিস্তান এখন খরকুটোর মতো চীনকে আঁকড়ে ধরে বাঁচার শেষ চেষ্টায় ব্যস্ত। আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্র পালিয়েছে। এক সময় বিশ্ব রাজনীতি এবং সামরিক কৌশলে এ উপমহাদেশ ছিল মার্কিন করতলগত। কিন্তু সেখানে এখন পতাকা উড়িয়েছে চীন। চীন এখন যুক্তরাষ্ট্রের ‘গিনিপিগ’ হিসেবে পরিচিত মধ্যপ্রাচ্যে হাত বাড়িয়েছে। আরব বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র যখন যা ইচ্ছা তাই করতে পারত। কিন্তু সেখানে মার্কিন সূর্য এখন অস্তমিত প্রায়। নয়া অর্থনৈতিক আধিপত্যবাদে বিচলিত রাজনৈতিক সাম্রাজ্যবাদ। এ উপমহাদেশে বাংলাদেশই একমাত্র স্বাতন্ত্র্য কূটনৈতিক অবস্থান নিয়ে টিকে আছে। ‘কারও প্রতি বৈরিতা নয়, সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব’- এ অবস্থানের জন্যই বাংলাদেশ যেমন চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাড়িয়েছে, তেমনি ভারতের সঙ্গে বিশ্বস্ত বন্ধুত্বকে নিয়ে গেছে নতুন উচ্চতায়। ’৭১ এর আরেক পরীক্ষিত বন্ধু রাশিয়ার সঙ্গেও সম্পর্ক অটুট রেখেছে বাংলাদেশ। গত ১৪ বছরে অর্থনীতিতে অভূতপূর্ব উন্নয়নে বাংলাদেশ এখন পরাশক্তিদের জন্য অত্যন্ত লোভনীয় এক ভূখ। অর্থনৈতিক উন্নয়নের ফলে এটি একটি আকর্ষণীয় বাজার। আর বঙ্গোপসাগরের কারণে বাংলাদেশ কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সামরিক উত্তেজনার কারণে ‘বাংলাদেশে’ এখন যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি। আর এ কারণেই ইদানীং এ ছোট্ট ভূখন্ডের গণতন্ত্রের জন্য মার্কিন নীতিনির্ধারকদের নিদ্রাহীন রাত। তারা এখানে একান্ত অনুগত কাউকে বসিয়ে নিশ্চিত থাকতে চায়। তাদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বেড়েছে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের কিছু সিদ্ধান্তে। যেমন ৪ এপ্রিল জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে ইরানের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে একটি প্রস্তাব পাস হয়। ইউরোপের কয়েকটি দেশ এ প্রস্তাব আনে। বাংলাদেশ এ প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেয়। যুক্তরাষ্ট্র কেন বাংলাদেশেই অনেকে এ সিদ্ধান্তে হতবাক হয়েছে। বাংলাদেশ ছাড়া এ প্রস্তাবের বিপক্ষে যারা ভোট দেয় তারা হলো- চীন, বলিভিয়া, কিউবা, পাকিস্তান ইত্যাদি। তাহলে কি বাংলাদেশ তার বহুল প্রশংসিত পররাষ্ট্রনীতি থেকে সরে এসেছে? বাংলাদেশ কি নতুন বিশ্ব মেরুকরণে চীন-রাশিয়ামুখী? চার বছর ধরে সেগুনবাগিচার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এরকম অনেক সিদ্ধান্ত নিয়েছে যা বাংলাদেশ সহজেই এড়িয়ে যেতে পারত। এসব সিদ্ধান্ত পশ্চিমা বিশ্বকে অস্বস্তিতে ফেলেছে। চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে অতিরিক্ত আবেগময় করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কারও কারও আগ্রহ সন্দেহজনক। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং চীনের আগ্রাসী অর্থনৈতিক কূটনীতির ফলে কোণঠাসা যুক্তরাষ্ট্র। বিভিন্ন কারণে আওয়ামী লীগ সরকারকে যুক্তরাষ্ট্র বন্ধু ভাবতে পারছে না। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান কারণ হলো- যুদ্ধাপরাধী ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির অব্যাহত লবিং এবং প্রচারণা। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন মহলে এরা সরকারের বিরুদ্ধে ক্রমাগত মিথ্যাচার করছে। এর ফলে মার্কিন নীতিনির্ধারকরা ভালোই বিভ্রান্ত হয়েছেন। আবার সরকারের ভিতরের কিছু ব্যক্তির দায়িত্বহীন কর্মকান্ড দুই দেশের সম্পর্কে দূরত্ব সৃষ্টি করেছে। এরকম বাস্তবতায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী কৌশলগত এক সাহসী সিদ্ধান্ত নিলেন তাঁর জাতীয় সংসদের ভাষণে। তিনি বুঝিয়ে দিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তিনি মর্যাদার সম্পর্ক চান। নতজানু হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আজ্ঞাবহ হতে চান না। তিনি এটাও বুঝালেন অযোগ্য অনুগতের চেয়ে যোগ্য সমালোচক ভালো।

যুক্তরাষ্ট্র কি বাংলাদেশের সঙ্গে কিউবা, ভেনেজুয়েলা কিংবা সিরিয়ার মতো আচরণ করবে? নাকি মালয়েশিয়া, তুরস্কের মতো আচরণ করবে? ৭১-এ যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল। সে সময় বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ভিন্ন ছিল। দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র আর সোভিয়েত ইউনিয়নে বিভক্ত ছিল বিশ্ব। এখন সেই যুক্তরাষ্ট্রও নেই, বাংলাদেশও সে রকম পরনির্ভর অবস্থানে নেই। বাংলাদেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশ একে অপরের ওপর নানাভাবে নির্ভরশীল। তাই বাংলাদেশ চট করেই মার্কিনবিরোধী অবস্থানে যাবে না। এটা যাওয়াও অনুচিত হবে। আবার যুক্তরাষ্ট্রকেও বুঝতে হবে ধমক দিয়ে, ভয় দেখিয়ে বাংলাদেশকে ‘গৃহপালিত’ রাখা এখন আর সম্ভব নয়। সেই বার্তাটি প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে দিয়েছেন। বিশ্ব নেতা হিসেবে শেখ হাসিনা বুঝিয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশ অংশীদার হতে পারে, ক্রীতদাস নয়। কিন্তু সমস্যা হলো প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর আওয়ামী লীগ এবং সরকারের কিছু চাটুকার ফিদেল ক্যাস্ত্রোর চেয়েও বড় মার্কিনবিরোধী হয়ে গেছেন। তারা এমন সব বেসামাল কথাবার্তা বলছেন যা দুই দেশের সম্পর্কে বহুমাত্রিক অবনতি ঘটাতে পারে। প্রধানমন্ত্রীকে খুশি করতে এ ধরনের উন্মাদনা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।

মনে রাখতে হবে যুক্তরাষ্ট্রের যেমন বাংলাদেশকে দরকার, তার চেয়ে বেশি বাংলাদেশের দরকার যুক্তরাষ্ট্রকে। আমাদের রপ্তানি বাণিজ্য টিকিয়ে রাখার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘে শান্তি মিশনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সম্পর্কের জন্য যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনীয়। প্রধানমন্ত্রী মার্কিন চাপের বিপরীতে পাল্টা চাপ দিলেন। বিশ্বে ¯œায়ুযুদ্ধের পর নতুন মেরুকরণ হচ্ছে আবার।  এ অবস্থায় বাংলাদেশও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কে দর কষাকষি করতে পারে। চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারে। কিন্তু সম্পর্ক শেষ করতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৈরিতা নয়, মর্যাদার সম্পর্ক দরকার। মালয়েশিয়ার মাহাথির পেরেছিলেন। শেখ হাসিনাও পারবেন নিশ্চয়ই।



মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার এবং দুঃসময়ের যোদ্ধারা

প্রকাশ: ১১:০০ এএম, ১৬ জুলাই, ২০২৪


Thumbnail

১৬ জুলাই আওয়ামী লীগের জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি দিন। ২০০৭ সালের এই দিনে মিথ্যা-ভিত্তিহীন মামলায় শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল ধানমন্ডির ‘সুধা সদন’ থেকে। বাংলাদেশে বিরাজনীতিকরণ বাস্তবায়নের জন্য এবং গণতন্ত্রকে চিরস্থায়ীভাবে বিদায় দেয়ার জন্যই শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিলো। ড. ফখরুদ্দীন আহমেদ এবং মইন-উ আহমেদের নেতৃত্বে সেনা সমর্থিত তত্বাবধায়ক সরকার বাংলাদেশকে ঘিরে একটি নতুন নীল নক্সা প্রণয়ন করেছিলেন। গণতন্ত্রহীন করে রাখতে চেয়েছিলেন বাংলাদেশকে। আর সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করা হয়। 

তবে শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তারের আগে পরিকল্পিত আওয়ামী লীগের ভেতরে সৃষ্টি করা হয়েছিলো অন্তঃকলহ এবং বিভক্তি। আওয়ামী লীগের ভেতর সংস্কারপন্থী নামে একটি নতুন গোষ্ঠী সৃষ্টি করা হয়। যারা শেখ হাসিনাকে মাইনাস করার জন্য প্রথম ভূমিকা পালন করেছিলেন। আওয়ামী লীগের কিছু নেতা শেখ হাসিনার নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। তারা বুঝে হোক, না বুঝে হোক অগণতান্ত্রিক এবং সুশীলদের খপ্পরে পরেছিলেন। আর একারণেই এক এগারোর সময়ে তারা একের পর এক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিলেন শেখ হাসিনার প্রতিটি কাজে। আওয়ামী লীগের এই বিভক্তির সুযোগেই শেখ হাসিনাকে মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছিলো তৎকালীন সরকারের পক্ষে। আওয়ামী লীগ সব সময়ই ক্ষতিগ্রস্থ হয় ঘরের শত্রুদের কারণে। ৭৫ এর ১৫ আগস্ট যেমন আওয়ামী লীগের আসল ক্ষতি করেছিল মোশতাক চক্র, ঠিক তেমনি ২০০৭ সালে আওয়ামী লীগের সর্বনাশের চেষ্টা করে সংস্কারবাদীরা। বাইরের শত্রু নয় ঘরের শত্রুরাই আওয়ামী লীগের জন্য সবচেয়ে ভয়ংকর। ১৬ জুলাই তার আরেকটি প্রমাণ। 

২০০৭ সালের ১৬ জুলাইয়ের আগে অনেক নাটকীয়তা হয়েছিলো। বিশেষ করে ১১ জানুয়ারি তীব্র রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে যখন ড. ফখরুদ্দিনের নেতৃত্বে তত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয় তখন তারা দ্রুত একটি অবাধ, সুষ্টু, নিরপেক্ষ নির্বাচন দেয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন। তৎকালীন সংবিধানে তত্বাবধায়ক সরকারের কাজের পরিধি ছিলো খুবই সীমিত। তাদের একমাত্র দায়িত্ব ছিলো একটি অবাধ, সুষ্টু, নিরপেক্ষ নির্বাচন করা। কিন্তু ফখরুদ্দিন আহমেদের তত্বাবধায়ক সরকার এসে রুটিন দায়িত্বের বাইরে রাষ্ট্র কাঠামোর মৌলিক বিষয়ের ওপর হস্তক্ষেপ শুরু করেন। দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে তারা শুরু করেন দুর্নীতি বিরোধী শুদ্ধি অভিযান, যৌথ অভিযানের মতো চটকদার কর্মসূচী। আর এসব অভিযানের নামে তারা রাজনীতিবিদদের চরিত্র হরণের খেলায় মেতে ওঠেন। আর তাদের এই কার্যক্রমের প্রধান লক্ষ্য ছিলো দীর্ঘস্থায়ীভাবে বাংলাদেশে একটি অনির্বাচিত, অগণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা। এটি বাস্তবায়ন করতে গিয়েই শেখ হাসিনাকে সেই সময় গ্রেপ্তার করা হয়েছিলো। শুধু শেখ হাসিনাই নয় পরবর্তীতে বেগম খালেদা জিয়াকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছিলো। কিন্তু শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার ছিলো বিরাজনীতিকরণের টার্নিং পয়েন্ট। 

আজ ১৭ বছর পরে এসে আমরা যদি পিছনে ফিরে তাকাই তাহলে দেখব, ১৬ জুলাই ছিলো আওয়ামী লীগের জন্য আরেকটি কঠিন দিন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার মধ্য দিয়ে যেমনভাবে আওয়ামী লীগকে নিঃশেষ করে দেয়ার চেষ্টা হয়েছিলো। ঠিক তেমনি ১৬ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করে আওয়ামী লীগকে পঙ্গু করার চেষ্টা হয়। 

১৫ আগস্টের সঙ্গে ১৬ জুলাইয়ের মৌলিক পার্থক্য হলো, ১৫ আগস্টে জাতির পিতাকে স্বপরিবারে হত্যা করা হয়েছিলো আর ১৬ জুলাই শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিলো রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেবার জন্য। কিন্তু দু’টি ঘটনার মধ্যে অদ্ভুত মিল। দুই ট্রাজেডিতে বিশ্বাসঘাতকতা হয়েছিলো আওয়ামী লীগের ভেতর থেকেই। আরও মিল হলো যারা সুসময়ে চাটুকার ছিলেন, যারা সুসময়ে আওয়ামী লীগ প্রধানের চারপাশে ঘুরঘুর করতেন, মধু খেয়েছেন তারাই দুঃসময়ে বিশ্বাসঘাতকে পরিণত হয়েছিলেন। এটা আওয়ামী লীগের রাজনীতির একটি বড় শিক্ষা। 

১৫ আগস্টে খুনী মোশতাক যেমন বঙ্গবন্ধুর রক্তের ওপর দিয়ে ক্ষমতা দখল করেছিলো তেমনি ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই সংস্কারপন্থিরা শেখ হাসিনার গ্রেপ্তারের পর নির্লিপ্ত ছিলো। সুসময়ের সুবিধাভোগী চাটুকাররা দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ায়নি। দুঃসময়ে যারা পাশে দাঁড়িয়েছিলো তারাই হলো আওয়ামী লীগের সত্যিকারের কাণ্ডারি। প্রয়াত জিল্লুর রহমান, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, বেগম মতিয়া চৌধুরী, এডভোকেট সাহারা খাতুন এবং তৃণমূলের নিবেদিত প্রাণ নেতা-কর্মীরাই দুঃসময়ের কাণ্ডারি হয়েছিলেন। 

এটা শুধু আওয়ামী লীগ নয়, সব রাজনৈতিক দলের জন্যই  একটি বড় শিক্ষা। ১৬ জুলাই আমাদের যে শিক্ষাটি দেয় তা হলো সুসময়ে যারা চারপাশে থাকে তাদের মধ্যে একটি বড় অংশই চাটুকার, মতলববাজ। দুঃসময়ে এদের খুঁজে পাওয়া যায় না। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিলো। এসময় যাদের দুর্দন্ত প্রভার ছিলো, তারা ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই শেখ হাসিনার জন্য রাজপথে নামেনি। তারা অনেকেই আত্মতুষ্টিতে ভুগেছিলেন। অনেকেই নেতৃত্ব দখলের খোয়াব দেখেছেন। অনেকে বাঁচতে পালিয়েছেন। যাদের কোন চাওয়া পাওয়া নেই। যারা চিরকাল শুধুমাত্র বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে লালন করেছে, ত্যাগ স্বীকার করেছে, তারাই সেদিন শেখ হাসিনার মুক্তির জন্য আন্দোলন করেছে।

আওয়ামী লীগের সব সংকটেই এই তৃণমূল এবং আদর্শবানরাই সামনে এসেছে, রুখে দাঁড়িয়েছে, দলকে রক্ষা করেছে। তবে একটি বিষয় এখন উদ্বেগের, আতংকের। আওয়ামী লীগের তৃণমূলকেই এখন রক্তশূণ্য করা হচ্ছে। আদর্শবান নেতাদের দূরে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। তৃণমূলের মধ্যেও ঢুকে পরছে হাইব্রিড, অনুপ্রবেশকারী। তৃণমূলেও কমিটিগুলোতে বাণিজ্য হচ্ছে কোটি টাকার। আর এই বাণিজ্যের কারণে সত্যিকারের ত্যাগী, আদর্শবাদীরা নিষ্ক্রিয়, নির্লিপ্ত হয়ে যাচ্ছে। আবার একটি দুঃসময় এলে আওয়ামী লীগকে রক্ষা করবে কে? সেটি এখন বড় প্রশ্ন। 

সৈয়দ বোরহান কবীর, নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত

ই-মেইল: poriprekkhit@yahoo.com


আওয়ামী লীগ   শেখ হাসিনা   গ্রেপ্তার   যোদ্ধা  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

কেরানি হওয়ার আন্দোলনে তরুণরা

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ১৫ জুলাই, ২০২৪


Thumbnail

বাংলাদেশের তরুণ সমাজ এখন আন্দোলনে। গত ১ জুলাই থেকে এ আন্দোলন শুরু হয়েছে। আন্দোলন এখন ঢাকা থেকে সারা দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রধান দাবি সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার। কোটা সংস্কার করা উচিত কি না বা কোটা নিয়ে বর্তমানে যে সংকট, তার সমাধান কে করবে, তা নিয়ে বিভিন্ন জনের বিভিন্ন মত। বর্তমান কোটাব্যবস্থা ভালো না মন্দ, তা নিয়েও বিতর্ক আছে। কোটা বিতর্কে বুঁদ হয়ে আছে দেশ। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, দুর্নীতি, অর্থ পাচার, বন্যাদুর্গত মানুষের আহাজারি—সবকিছু ছাপিয়ে কোটা সংস্কার এখন জাতির সামনে সবচেয়ে বড় ইস্যু।

প্রচলিত যে কোটা পদ্ধতি আছে, তার বিজ্ঞানসম্মত এবং যুক্তিসংগত পরিবর্তনের পক্ষে সবাই। হাইকোর্ট কোটাসংক্রান্ত মামলায় যে আংশিক রায় প্রকাশ করেছেন, তাতেও সরকার চাইলে কোটা সংস্কার করতে পারবে বলে অভিমত ব্যক্ত করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ‘বিড়ালের গলায় ঘণ্টা পরাবে কে’। আদালত, সংসদ নাকি রাজপথ? এ নিয়েও চলছে এক ধরনের বাহাস। এখন সরকারি চাকরিতে যেভাবে কোটা বিন্যাস আছে, তার পরিবর্তন প্রয়োজন। আবার একেবারে কোটা বাতিল অগ্রহণযোগ্য। কিন্তু সব ছাপিয়ে আমার কাছে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বড় হয়ে এসেছে, তা হলো আমাদের তরুণ প্রজন্ম কি শুধু একটি সরকারি চাকরি পাওয়ার স্বপ্ন দেখে? আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য কি শুধু একটি সরকারি চাকরি? তারুণ্যের স্বপ্নের সীমানা কি এত সংকীর্ণ? এই প্রশ্নগুলো আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। আমরা আজকে সম্মান দিয়ে যাকে বলি আমলাতন্ত্র, আদতে তা ‘কেরানিতন্ত্র’। সরকারি চাকরি যারা করেন, তারা আসলে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী। জনগণের সেবক বা চাকর। কেরানি হওয়ার জন্য আমাদের তরুণরা এখন যে যুদ্ধ করছে, এটি আমার কাছে অবিশ্বাস্য, গ্লানিকর এবং ঘোরতর শঙ্কার।

বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস নতুন নয়।’৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং ’৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন কিংবা ২০০৭ সালে অনির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র আন্দোলন। সব আন্দোলনেই নেতৃত্ব দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এ কারণেই বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আলাদা মহিমায় মহিমান্বিত। আন্দোলন, সংগ্রাম এবং মুক্ত ভাবনার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আলাদা মর্যাদা রয়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গড়ে উঠেছে আগামীর নেতৃত্ব। যে কোনো সংকটে পথ দেখিয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্রের সূতিকাগার হিসেবে বিবেচিত। আর তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যখন আন্দোলন করেন, তখন আমরা সেদিকে গভীরভাবে তাকিয়ে থাকি। এ আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণের চেষ্টা করি। এই আন্দোলন জাতিকে পথ দেখাবে—এমনটা প্রত্যাশা করি।

এবারে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনটি কী ধরনের? এ আন্দোলন কি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কল্যাণের আন্দোলন? এ আন্দোলন কি শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন? এ আন্দোলন কি বাংলাদেশে লুণ্ঠন, অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে তারুণ্যের প্রতিবাদ? এ আন্দোলন কি দুর্নীতির বিরুদ্ধে তারুণ্যের দ্রোহ? এ আন্দোলন কি শিক্ষার বৈষম্য বিলোপের লড়াই? এসব কিছুই নয়। এটি একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর স্বার্থ উদ্ধারের চেষ্টা। গোটা দেশের শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে ফায়দা লোটার এক আত্মঘাতী কৌশল।

আমরা সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছাত্র আন্দোলন দেখছি। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক আন্দোলন সারা বিশ্বের বিবেকবান মানুষের হৃদয় স্পর্শ করেছে। পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ করেছেন গাজায় ইসরায়েলি বর্বর হত্যাকাণ্ড এবং যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধনীতির বিরুদ্ধে। সেই আন্দোলনের ঢেউ বাংলাদেশে লাগেনি। গাজার গণহত্যার প্রতিবাদে যখন বিশ্বের তাবৎ দেশের মেধাবী তরুণরা সোচ্চার, তখন আমাদের তরুণরা বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার কসরতে ব্যস্ত। বিসিএস গাইড বুকে বুঁদ হয়েছিলেন তারা। তাদের এই আত্মকেন্দ্রিকতা এবং সমাজবিমুখতা হতাশার। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এখন পথ দেখান না, সমাজ বদলান না, কেরানি হতে চান। সরকারি চাকরি চান। এ আন্দোলনকে একটি সামগ্রিক সমাজ পরিবর্তন, দেশ, রাষ্ট্র বা জাতির কল্যাণের জন্য নিবেদিতপ্রাণ আন্দোলন হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। এই আন্দোলন হতশ্রী, মেধাহীন সৃজনশীলতা বিবর্জিত তারুণ্যের প্রতিরূপ। দৈন্য তারুণ্যের মনোজগতের দারিদ্র্যের চিত্র এ আন্দোলন।

বিশ্বের অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সাম্প্রতিক সময়ে যে প্রতিবাদ করেছে, তার অগ্রভাগে আছে জেন. জি (জেনারেশন জুমাস) খ্যাত তরুণরা। তাদের চেতনা ও স্বতঃস্ফূর্ত নীতি আমাদের অতীত ছাত্র আন্দোলনের কথা মনে করিয়ে দেয়। আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম, তখন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে আমাদের শিক্ষাজীবনকে উৎসর্গ করেছি। আমাদের ছাত্র-তরুণরা বুকের রক্ত দিয়েছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য, শিক্ষার অধিকারের জন্য। জয়নাল, জাফর, কাঞ্চন, দীপালি, রাউফুন বাসুনিয়া, সেলিম, দেলোয়ার শহীদ হয়েছেন দেশের জন্য, শিক্ষার জন্য, গণতন্ত্রের জন্য। কিন্তু এবার আন্দোলন কার জন্য? একটি সরকারি চাকরির জন্য। গত কয়েক বছরে সামগ্রিকভাবে এমন একটি পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে যাতে মনে হচ্ছে, শিক্ষাজীবনের একমাত্র লক্ষ্য হলো সরকারি একটি চাকরি পাওয়া। সরকারি চাকরিই যেন সবকিছু। এবার শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দেখে সেই কথাটি আরও বেশি করে মনে পড়ছে। সত্যিই আমি লজ্জিত।

এই সরকারি চাকরিকে কেরানিগিরি বলা যায়। এই কেরানিগিরির বিরুদ্ধে সৃজনশীল, উদ্ভাবনী মানুষের এক ধরনের অনীহা এবং ক্ষোভ ছিল সবসময়। বিশেষ করে মেধাবী তরুণরা ছকে বন্দি এই আনুগত্যের জীবনে আগ্রহী ছিলেন না কখনোই। আমরা বাংলা সাহিত্যেও এর প্রচুর উদাহরণ পাই। দুর্গাচরণ রায়ের ব্যঙ্গাত্মক ভ্রমণ কাহিনি ‘দেবগণের মর্ত্যে আগমন’ গ্রন্থে দেবতাদের বয়ানে সরকারি চাকরি বা কেরানিবৃত্তির অনবদ্য সমালোচনা করা হয়েছে। এই বইটিতে ব্রহ্মাদেব কলকাতা শহরে এসে বিস্মিত হন। বলেন, ‘কী আশ্চর্য! যাহাকেই দেখি, যাহার সঙ্গেই আলাপ করি, সেই কেরানি। দোকানদার, মহাজন, অধ্যাপক, চিকিৎসক, চামার, কুম্ভকার, কর্মকার আর চক্ষে দেখিতে পাওয়া যায় না। সকলেই কেরানি।’ ব্রহ্মার বিস্ময়ের জবাবে তার সফরসঙ্গী বরুণ দেব বলেন, ‘চাকরি করা বাঙালি জাতির সংক্রামক রোগ হইয়া দাঁড়াইয়াছে। নচেৎ যে অধ্যাপকের জগৎজুড়ে মানসম্ভ্রম, যাহার গৃহে বিদায়ের ঘটি, বাটি, থালা, ঘড়া রাখিবার স্থান হয় না। তিনি নিজ ব্যবসাকে ধিক্কার দিয়ে পুত্রকে ১৫ টাকার কেরানি প্রস্তুত করিতেছেন। যে কবিরাজ ধন্বন্তরি নামে পরিচিত হইয়া অর্জিত ধন বহন করিয়া আনিতে পারিতেন না, তিনিও নিজ ব্যবসা পরিত্যাগ করিয়া পুত্রকে ইংরেজি শিখাইয়া কেরানি প্রস্তুত করিতেছে। যে কুম্ভকার উত্তম উত্তম ছবি ও পট আঁকিয়া স্বাধীনভাবে চল্লিশ টাকা উপার্জন করেন, সেও কাদা-ছানা অতি জঘন্য ব্যবসা বলিয়া পুত্রকে ইংরেজি শিখাইয়া কেরানি প্রস্তুত করিতেছেন। এরূপে ধোপা, নাপিত, মেথর, মুদ্দফরাস সকলেই কেরানি হইবার জন্য হাত ধুইয়া বসিয়া আছে।’ ১৮৮০ সালের দিকে দুর্গাচরণ এই গ্রন্থটি লিখেছিলেন। কিন্তু আজ বিভিন্ন সড়কে যে আন্দোলন হচ্ছে, সেই আন্দোলন দেখে আমার মনে হচ্ছে, দুর্গাচরণের লেখাটি আজকের বাস্তবতায় একেবারেই সত্যি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যেন কেরানি হওয়ার মনোবাসনায় এখন জীবন দিতেও প্রস্তুত! সব দেখে-শুনে পণ্ডিত বিনয় কুমার সরকারের মতো আমারও বলতে হচ্ছে করে, ‘কেরানির স্বরাজ প্রতিষ্ঠা হোক’। তরুণ সমাজের মধ্যে আমলা বা কেরানি অথবা সরকারি চাকরি করার আগ্রহ কেন এত তীব্র হলো? নতুন একটা সিনেমা, একটা উপন্যাস, একটা নতুন গানের চেয়ে ‘বিসিএস গাইড বই’ কেন তাদের এত প্রিয় হলো। কেন তারা পাঠ্যবই সেলফে রেখে বাংলা ব্লকেড করে। আমলাতন্ত্রে কি মধু আছে?

বাংলাদেশে আমলাতন্ত্র বা কেরানিতন্ত্রের আবির্ভাব বা বিকাশ অনেক পুরোনো। ড. আকবর আলি খান ‘অবাক বাংলাদেশ, বিচিত্র ছলনাজালের রাজনীতি’ গ্রন্থে ‘আমলাতন্ত্র: গ্রেশাম বিধির মতো ব্যামো’ শীর্ষক নিবন্ধে বলেছেন, ‘আমলাতন্ত্র নিয়ে বিতর্কের শুরু কমপক্ষে আড়াই হাজার বছর আগে। এ বিতর্ক শুরু হয়েছিল চীনে। খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে চীনা দার্শনিক কনফুসিয়াস আমলাতন্ত্রকে ধ্রুব তারার সঙ্গে তুলনা করেছেন এবং বলেছেন, এ তারকা স্থির এবং সব তারকাই এর নির্দেশে চলে।... বাংলাদেশে আমলাতন্ত্র আদৌ নতুন নয়। ২০০০ বছরের বেশি আগে মৌর্য সাম্রাজ্যে আমলাতন্ত্র ছিল। ‘কৌটিল্যের অর্থ শাস্ত্রে’ আমলাতন্ত্রের বিশদ বিবরণ ড. খান তার অন্য এক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ‘পরার্থপরতার অর্থনীতি’ গ্রন্থে তিনি চাণক্যের উদ্ধৃতি দেন এভাবে—‘চাণক্য লিখেছেন, সরকারি কর্মচারীরা দুইভাবে বড়লোক হয়, হয় তারা সরকারকে প্রতারণা করে, অন্যথায় প্রজাদের অত্যাচার করে। চাণক্যের অর্থ শাস্ত্রে সরকারি কর্মচারীদের চল্লিশ ধরনের তছরুপের ও দুর্নীতির পন্থা চিহ্নিত করা হয়েছে। দুর্নীতির কুফল সম্পর্কে সজাগ থাকা সত্ত্বেও চাণক্য রাজস্ব বিভাগে দুর্নীতি অনিবার্য মনে করতেন। অর্থ শাস্ত্রে বলা হয়েছে: ‘জিহ্বার ডগায় বিষ বা মধু থাকলে তা না চেটে থাকা যেমন অবাস্তব, তেমনি অসম্ভব হলো সরকারের তহবিল নিয়ে লেনদেন করে একটুকুও সরকারের সম্পদ চেখে না দেখা। জলে বিচরণরত মাছ কখন জল পান করে, তা জানা যেমন অসম্ভব, তেমনি নির্ণয় সম্ভব নয় কখন দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীরা তহবিল তছরুপ করে।’ কৌটিল্যের ‘অর্থ শাস্ত্র’ যেন বর্তমান সময়ের আমলাতন্ত্রের আয়না! আমলামুখী তারুণ্যের স্রোত সেই মধুর আশায় এটা বুঝতে পণ্ডিত হওয়ার প্রয়োজন নেই।

সরকারি চাকরির প্রতি আগ্রহের মহামারির কারণ হলো, সরকারি চাকরিতে চাকচিক্য এবং উপরি আয়ের অবারিত সুযোগ। কেউ দেশপ্রেম বা দেশকে বদলে দেওয়ার জন্য সরকারি চাকরি করছেন, এমনটি বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ও পাকিস্তানিদের পদলেহন করেছেন অনেক আমলা। এরপর আবার বাংলাদেশের অনুগত হয়ে মধু খেয়েছেন। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে খোলস পাল্টানো আমলাদের বড় বৈশিষ্ট্য। তারা যখন যার এখন তার। বর্তমান সরকার টানা ১৫ বছরের বেশি সময় ক্ষমতায় থেকে আমলাতন্ত্রের দ্বারা বশীভূত হয়েছে। পে স্কেল, আমলাদের জন্য নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা, দুর্নীতি ও লুণ্ঠনের ফ্রি লাইসেন্স, আইন করে দায়মুক্তি তাদের ‘চাকর’ থেকে ‘প্রভু’ বানিয়েছে। যে কারণে এখন সরকারি চাকরি একটি ঝুঁকিহীন আকর্ষণীয় পেশা। সরকারি চাকরি হওয়া মানেই একটি নিশ্চিন্ত জীবন, দ্রুত প্রমোশন। সঙ্গে উপরি আয় তো আছেই।

সরকারি চাকরি করলে দুর্নীতি করা যায় অবাধে। তার বিচার হয় না। যৌন নিপীড়ন করলে শাস্তি হয় না। সাংবাদিক পেটালেও দম্ভ মওকুফ হয়। এ রকম বেহেশতি সুবিধা আর কোথায় আছে? সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি চাকরিতে যে দুর্নীতির বাক্স খুলে গেছে, তাতে বুঝতে কষ্ট হওয়ার কথা নয় যে, কিছু শিক্ষার্থী কেন কেরানি হতে মরিয়া।

কিন্তু সব তরুণ কি সরকারি চাকরি চায়? না, অনেক তরুণই সরকারি চাকরিতে আগ্রহী নয়। আমি এমন অনেক তরুণকে চিনি, যাদের কেউ কেউ সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে এখন গরুর খামার করছেন। কেউ নতুন করে শিল্পপ্রতিষ্ঠান করার জন্য এখন সংগ্রাম করছেন। কেউবা ক্ষুদ্র কুটির শিল্প করছেন। ফ্রিল্যান্সিং করছেন, কেউ তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে একজন মেধাবী উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। বিজ্ঞানী হয়ে আলোকিত হয়েছেন অনেক মেধাবী মুখ। কেউ আবার গবেষণা করছেন, খেলাধুলায় উজ্জ্বল তারকা হয়ে ওঠা তারুণ্যের সংখ্যাও কম নয়। সংগীত, শিল্পকলার নানা শাখায় আমাদের তারুণ্যের বিচরণ আছে। এ বহুমাত্রিকতাই আমাদের তারুণ্যের আসল রূপ। আমাদের তরুণরা সব ক্ষেত্রে নতুন কিছু করবে, তবেই না দেশ এগোবে। আমাদের তরুণরা ব্যবসায়ী হবে, উদ্যোক্তা হবে, শিল্পী হবে, সাহিত্যিক হবে, চলচ্চিত্র নির্মাতা হবে। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত আমাদের এই বাংলাদেশে সব বন্ধ দুয়ার খুলে একটি মুক্ত প্রবাহের সূচনা করবে তরুণরা। কিন্তু তা না করে কিছু তরুণ সব সড়ক বন্ধ করে রাজপথে বসে আছে একটি সরকারি চাকরির প্রত্যাশায়। কী আশ্চর্য।

আমাদের তারুণ্যের ইতিহাস বর্ণাঢ্য সংগ্রামের ইতিহাস। আমাদের তারুণ্যের ইতিহাস গৌরবের ইতিহাস। এ তরুণরা দেশকে বদলে দিয়েছে, এগিয়ে নিয়েছে। কিন্তু কেউ কেউ এখন একটি চাকরির কুঠিরে বন্দি হওয়ার জন্য উদগ্রীব। বাংলাদেশের তরুণ সমাজ কি তাহলে বিভ্রান্ত? পথহারা? না, এটি তরুণদের খণ্ডিত রূপ। অধিকাংশ, বিশেষ করে মেধাবী তরুণরা এর সঙ্গে সংশ্রবহীন। আমাদের তরুণদের একাংশের মধ্যে গত কয়েক বছরে যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা উদ্বেগজনক। দেশের সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীদের কেউ এখন দেশে থাকছে না। উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে গিয়ে সেখানেই ঠিকানা করছে। ভালো চাকরি, নিরাপদ জীবন থেকে তারা দেশে আসতে চাইছে না। বাকিরা বিসিএস যুদ্ধে জীবন উৎসর্গ করছে। সরকারি চাকরি না পেয়ে নিজেকে ব্যর্থ মনে করে বেসরকারি চাকরিতে মেধাহীন শ্রম দিচ্ছে। তরুণদের একটি অংশ এখনো সৃষ্টিশীল, উদ্ভাবনী চিন্তার মশাল জ্বালিয়ে রেখেছে। এই তরুণদের সামনে আসতে হবে। এটাই আমাদের তারুণ্যের আসল পরিচয়। চাকরির জন্য ‘বাংলা ব্লকেড’ করা তরুণরা আমাদের তারুণ্যের প্রতিনিধি নয়।

লেখক: নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত

ইমেইল: poriprekkhit@yahoo.com


কোটা আন্দোলন   কেরানি   আমলাতন্ত্র  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

সরকারের প্রথম ছয় মাস: স্বস্তির চেয়ে শঙ্কা বেশি

প্রকাশ: ১০:৩০ পিএম, ১২ জুলাই, ২০২৪


Thumbnail

টানা চতুর্থ মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম ৬ মাস অতিবাহিত হলো। ৭ জানুয়ারি নির্বাচনের পর ১১ জানুয়ারি নতুন মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। টানা চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন শেখ  হাসিনা। গঠন করেন নতুন মন্ত্রিসভা। সেই চতুর্থ মেয়াদের সরকারের ৬ মাস পূর্তি হয়েছে। যদিও ৬ মাস একটি সরকারের মূল্যায়নের জন্য যথেষ্ট সময় নয়। বরং এটি সূচনা মাত্র। তবে আওয়ামী লীগ সরকার টানা চতুর্থ বারের মতো দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। তাই একটি নতুন সরকার বলতে যা বোঝায় সেইরকম কোন অবস্থা আওয়ামী লীগের জন্য প্রযোজ্য নয়। টানা ক্ষমতায় থাকার কারণে চতুর্থ মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকারকে নতুন সরকার বলা যায় না। এটি ধারাবাহিকতা। সে কারণে এই সরকারের জন্য অপেক্ষাকালীন সময় নেই। সরকারকে জনগণ পর্যবেক্ষণ করছে না, বরং কাজ চাইছে। প্রতিটি নতুন সরকারের যে ‘মধু চন্দ্রিমা’ সময় থাকে, সেটি উপভোগ করতে পারছে না আওয়ামী লীগ। মূলত এক কঠিন প্রতিকূল বাস্তবতার মধ্য দিয়েই নির্বাচন করে এবার আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। নির্বাচন কতটুকু গ্রহণযোগ্য হবে, আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে এর প্রতিক্রিয়া কি হবে ইত্যাদি বিষয় ছিলো অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। বিশেষ করে নির্বাচনের আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর মনোভাবের কারণে নির্বাচন নিয়েই একধরনের শঙ্কা এবং অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিলো। 

বিএনপিসহ বেশ কিছু রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি। নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক করার জন্য আওয়ামী লীগ ভিন্ন এবং অভিনব একটি কৌশল গ্রহণ করে । দলের নেতা-কর্মীদের জন্য প্রার্থিতা উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছিলো। যারা নৌকা প্রতীক পাননি, তাদেরকে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দিয়েছিলো আওয়ামী লীগ। যেকারণে নির্বাচন মোটামুটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়েছে। ভোটার উপস্থিতি ৪০ শতাংশের উপরে গেছে  মূলত আওয়ামী লীগের এই নির্বাচনী কৌশলের কারণে। নির্বাচনের পরে অবশ্য আওয়ামী লীগ বৈরী আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি দ্রুত সামাল দিতে সক্ষম হয়। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো নির্বাচনকে ত্রুটিপূর্ণ বললেও শেষ পর্যন্ত মন্দের ভালো হিসেবে মেনে নিয়েছে। নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার করেছে বিশ্বের সব গুরুত্বপূর্ণ দেশ। 

নির্বাচনের পর বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো কি করে তা নিয়েও একধরনের শঙ্কা ও উৎকণ্ঠা ছিলো। কিন্তু নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ নতুন সরকার গঠন করলে বিএনপি হতাশায় ভেঙ্গে পরে। রাজনৈতিক আন্দোলন থেকে নিজেরাই স্বেচ্ছা নির্বাসন নেয়। ফলে নির্বাচনের পরে আন্তর্জাতিক চাপ যেমন আওয়ামী লীগ সামাল দিতে পেরেছে, ঠিক তেমনি দেশে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারেনি। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কৌশলের কারণেই নির্বাচন নিয়ে যে অনিশ্চয়তা ছিলো তা দূর হয়ে যায়। তাছাড়া এই নির্বাচন ২০১৪ সালের নির্বাচনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীনও হয়নি। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা নির্বাচনকে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ জায়গায় নিয়ে যেতে সক্ষম হন। কাজেই নির্বাচনের পর বাংলাদেশের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে কিনা, বাংলাদেশ একঘরে হবে কিনা ইত্যাদি শঙ্কা ১১ জানুয়ারির পর আস্তে আস্তে কেটে যেতে থাকে। অন্যদিকে বিরোধী দলের রাজনৈতিক আন্দোলনও মুখ থুবড়ে পরে। ফলে নতুন সরকারের সূচনা হয় স্বস্তির মধ্যে দিয়ে। 

কিন্তু নির্বাচনের বৈতরণী পার হওয়ার পরও গত ৬ মাসে আওয়ামী লীগ স্বস্তিতে নেই। আওয়ামী লীগের জন্য রাজনৈতিক আন্দোলনের চাপ নেই। বিরোধী দল নিষ্প্রভ। আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকেও আওয়ামী লীগের জন্য কোন রকম বড় ধরনের চাপ নেই। কিন্তু তারপরও সরকার অস্বস্তিতে, চাপে। নানা কারণে সরকারের মধ্যে শঙ্কা বাড়ছে। অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো নয়। অর্থমন্ত্রী তা নিজেই স্বীকার করেছেন। অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে গত জুনে নতুন সরকার প্রথম বাজেট দিয়েছে। কিন্তু এই বাজেটের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধার কতটুকু হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। অর্থনীতির চেহারা বিবর্ণ থেকে উজ্জ্বল হবার কোন সম্ভাবনা এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান নয়। অর্থনৈতিক সংকটের সবচেয়ে খারাপ দিকগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্যাংকিং খাতে অস্থিরতা এবং অনিয়ম। ব্যাংক খাতে রীতিমতো লুণ্ঠন হয়েছে, যে লুণ্ঠনের ক্ষতগুলো এখন দগদগে ঘায়ের মতো উন্মোচিত। ব্যাংকিং সেক্টরে খেলাপী ঋণের পরিমাণ নতুন রেকর্ড গড়েছে। অর্থপাচারের ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতির গতিময়তা নষ্ট হয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে সামনের দিনগুলোতে যদি অর্থনীতিকে সামাল দিতে না পারে তাহলে সরকারের জন্য বড় সংকট অপেক্ষা করছে বলেই আমি মনে করি। 

অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গে যোগসূত্র রয়েছে দ্রব্যমূল্যের। দ্রব্যমূল্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করাই বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান নির্বাচনী এজেন্ডা ছিলো। কিন্তু গত ৬ মাসে এনিয়ে সরকারের উল্লেখযোগ্য কোন সাফল্য নেই। দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। নিম্ন আয়ের মানুষ ও মধ্যবিত্তরা বাজারে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন। যেকোন সময় এই দ্রব্যমূল্য পরিস্থিতি মানুষের ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। দ্রব্যমূল্য নিয়ে সরকারের যে উদ্যোগগুলো এখন পর্যন্ত নেয়া হচ্ছে তার কোনটারই সুফল সাধারণ মানুষ পায়নি। বরং দ্রব্যমূল্যে সিন্ডিকেট, মুনাফা লোভী, মজুতদারদের দাপট বেড়েই চলেছে। প্রচন্ড ক্ষমতাবান সরকার বাজারের সিন্ডিকেটের কাছে অসহায়।

দ্রব্যমূল্যের পাশাপাশি নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের সবচেয়ে বেশী যে বিষয়টি আলোচনায় তাহলো দুর্নীতি। দুর্নীতিবাজদের স্বরূপ উন্মোচিত হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদকে সরাসরি দুর্নীতিবাজ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। দুর্নীতির কারণে আজিজ আহমেদের মার্কিন ভিসা বাতিল হয়েছে। সাবেক পুলিশ প্রধান বেনজীর আহমেদের বিপুল বিত্ত-বৈভবের খবর পুরো জাতিকে চমকে দিয়েছে। বেনজীর আহমেদের দুর্নীতির কেচ্ছা কাহিনী প্রকাশিত হতেই একে একে দুর্নীতিবাজদের চেহারা উন্মোচিত হচ্ছে জাতির সামনে। দুর্নীতিবাজদের অপকর্মের ফিরিস্তি এখন গণমাধ্যমের প্রধান খাদ্য। প্রতিদিন গণমাধ্যমে কোন না কোন দুর্নীতিবাজের রত্নভান্ডারের খবর প্রকাশিত হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তি থেকে শুরু করে ড্রাইভার পর্যন্ত শতকোটি টাকার মালিক হয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে খোবলা করে দিয়েছে। বর্তমান সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাঁর শক্ত অবস্থানের কথা ঘোষণা করেছে নির্বাচনী ইশতেহারে। কিন্তু দুর্নীতিবাজদের বিচার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং আন্তরিকতা নিয়ে মানুষের মধ্যে প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে এনবিআরের সাবেক সদস্য মতিউর রহমানের বিপুল বিত্তের খবর প্রকাশ হওয়ার পরও তার আইনের আওতায় না আসা, তিনি দেশে আছেন না বিদেশে পালিয়ে গেছেন তা নিয়ে রীতিমতো চলছে লুকোচুরি। ছোট-মাঝারিসহ সব সরকারি কর্মকর্তাদের বিভৎস দুর্নীতির খবরে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যেন, ‘সর্ব অঙ্গে ব্যাথা, মলম দিবো কোথায়’। এ পরিস্থিতিতে সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে কতটুকু আন্তরিক, এই যুদ্ধে সরকার শেষ পর্যন্ত কিভাবে জয়ী হবে সেটি একটি বড় প্রশ্ন। সামনের দিনগুলোতে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে যদি সরকার নির্মোহ, শক্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করতে পারে তাহলে সরকারের জন্য সেটি হবে একটি বড় ধরনের সংকট। এই সংকটে মোকাবেলা করা সরকারের জন্য কঠিন হয়ে যেতে পারে। সাধারণ মানুষ দুর্নীতিবাজদের শাস্তি দেখতে চায়, সাধারণ মানুষ চায় দুর্নীতিবাজরা আইনের আওতায় আসুক। কিন্তু সেটি যদি সরকার করতে না পারে তাহলে সাধারণ মানুষ আস্থা হারাবে। সরকারকে বিশ্বাস করবে না জনগণ। 

সাম্প্রতিক সময়ে, কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন সরকারকে হঠাৎ করেই চাপে ফেলেছে। যদিও এবিষয়ে সরকারের কিছু করণীয় নেই। এটা স্পষ্ট যে, এর পিছনে রাজনৈতিক ইন্ধন রয়েছে। এর আগেও ২০১৮ সালে কোটা নিয়ে আন্দোলন করেছিলো শিক্ষার্থীরা। কোটার সেই আন্দোলনের ফলে সরকার প্রথম এবং দ্বিতীয় শ্রেণীর চাকরিতে সব ধরনের কোটা বাতিল করে দিয়েছিলো। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের উত্তরাধিকাররা আদালতে রিট পিটিশন করে এবং এর মাধ্যমে হাইকোর্ট রায় দিয়েছিলেন, মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিল অবৈধ। ফলে ঐ পরিপত্রটি অকার্যকর হয়ে যায়। এরপর এখন শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কারের দাবিতে নতুন করে আন্দোলন করছে। তাদের বক্তব্য আংশিক যৌক্তিক, কিছুটা অযৌক্তিক। তাদের বক্তব্যের যৌক্তিক অংশটুকু হলো কোটা সংস্কার করা উচিত। বাংলাদেশে এখন এমন কিছু কোটা রয়েছে যেগুলো শুধু অযৌক্তিক নয়, অনভিপ্রেতও বটে। আবার এমন কিছু কোটা আছে যেগুলো থাকা আমাদের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। যেমন, নারী কোটা, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের জন্য কোটা। এই কোটাগুলো বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজনীয়। একটি সাম্যের বাংলাদেশ বিনির্মাণের যে অঙ্গীকার আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অংশ তা পূরণের জন্যই কিছু কিছু কোটা রাখা অবশ্যই উচিত। তবে কিছু কোটা রয়েছে, যেগুলো থাকার যৌক্তিকতা নিয়ে, প্রশ্ন উঠতেই পারে। তবে কোটা সংস্কারের আন্দোলনের খারাপ দিকগুলো হলো, আন্দোলনকারীরা বেশি মনোযোগী হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে। এই কোটা সংস্কার আন্দোলনে একটি পক্ষ পরিকল্পিতভাবে মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কিত করা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। 

কোটা আন্দোলনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলেও দেখা যায়, ২০১৮ সালে যখন কোটা আন্দোলনের সূচনা হয়েছিলো তখন এই আন্দোলনের নীল নকশা প্রণয়ন করেছিলো যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ন্ত্রিত সন্ত্রাসী সংগঠন ছাত্র শিবির। এবারও কোটা আন্দোলনের নেটওয়ার্কের সঙ্গে ছাত্র শিবিরের সম্পৃক্ততার খবর পাওয়া যাচ্ছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো, প্রতিবছরই তিন থেকে পাঁচ হাজার চাকরিপ্রত্যাশিদের জন্য সরকারি চাকরিতে সুযোগ সৃষ্টি হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে প্রতি বছর চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ হাজার শিক্ষার্থী শিক্ষাজীবন শেষ করেন। সরকারি চাকরির জন্য সবাইকে কেন আগ্রহী হতে হবে? বিসিএস কি একজন শিক্ষার্থীর একমাত্র লক্ষ্য? একজন শিক্ষার্থী শিক্ষাজীবন শেষ করে বিজ্ঞানী হবেন, চিকিৎসক হবেন, গবেষক হবেন, সাংবাদিক হবেন কিংবা অন্যকোন সৃজনশীল পেশা বেছে নেবেন। তিনি উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখবেন, বাংলাদেশকে বিনির্মাণের জন্য নতুন নতুন পথ আবিষ্কার করবেন। কিন্তু এসব না করে সবাই এখন সরকারি চাকরিতে আগ্রহী হচ্ছেন এটি বাংলাদেশের জন্য উৎকণ্ঠার বিষয় বলে আমি মনে করি। কিন্তু কোটা আন্দোলনের রাজনৈতিক কূটকৌশলে সরকার রীতিমতো কোণঠাসা হয়ে পরেছে। ছাত্র শিবির করুক বা বিএনপিই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকুক না কেন কোটা আন্দোলনের ডাল পালা মেলছে। শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন অত্যন্ত স্পর্শকাতর। এরকম আন্দোলন থেকে যেকোন ধরনের বড় বিপর্যয় ঘটতে পারে। আর তাই কোটা সংস্কার আন্দোলনকে মোকাবেলা করতে হবে পরিকল্পিত রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে। এখানে দায় এড়ানোর কোন সুযোগ নেই।

কোটা আন্দোলনের পাশাপাশি শিক্ষকদের নিয়েও এক ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষকরা প্রচলিত পেনশন স্কিমের বদলে ‘প্রত্যয়’ পেনশন স্কিমের আওতায় এসেছেন। জাতীয় পেনশন স্কিম সরকার প্রবর্তন করেছিলো। সরকার আশা করেছিলো, এই পেনশন স্কিম অত্যন্ত সফল হবে। কিন্তু বেসরকারি চাকরিজীবী বা ব্যক্তিরা এই উদ্যোগের ক্ষেত্রে তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছে না। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ বিভিন্ন সেক্টর, কর্পোরেশন এবং আধা স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে ১ জুলাই থেকে ‘প্রত্যয়’ পেনশন স্কিম চালু করা হয়েছে। এটি নিয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে শিক্ষকদের মধ্যে। আমলারা অন্য সব পেশার মানুষকে যেন রীতিমতো খেপিয়ে তোলার প্রকল্প নিয়েছে এই পেনশন স্কিমের মাধ্যমে। অদুর ভবিষ্যতে এই পেনশন স্কিম সরকারকে ভোগাবে। 

আওয়ামী লীগের চতুর্থ মেয়াদে দেখা যাচ্ছে সব ক্ষেত্রে চাটুকার মতলববাজ সুবিধাবাদীদের একটি চক্র বা সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে। মুষ্টিমেয় কিছু গোষ্ঠী ক্ষমতার সব মধু খেয়ে নিচ্ছে। প্রশাসনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ তার একটি উদহারণ। চিকিৎসকদের সিন্ডিকেট, প্রকৌশলী, কৃষিবিদ শিক্ষকদের সিন্ডিকেট যোগ্যতা ও মেধাকে গিলে খাচ্ছে ক্রমশ:। এই ৬ মাসে সরকারের জন্য স্বস্তির খবর খুবই কম। সামনের দিনগুলো সরকারকে কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলার বার্তা দিচ্ছে। সরকার আগামী দিনগুলোতে কিভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করবে সেটি এখন দেখার বিষয়। তবে আমি মনে করি, সরকারকে সমস্যার সংকটগুলোর গভীরে যেতে হবে, সংকট সমাধানের জন্য দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। সবকিছুকে উপেক্ষা করা এবং অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস সর্বনাশ ডেকে আনে। অতীত ইতিহাস সেকথাই বলে।


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

কোটা আন্দোলনে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা নীরব কেন?

প্রকাশ: ০৭:০০ পিএম, ১২ জুলাই, ২০২৪


Thumbnail

কোটা আন্দোলন নিয়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের এক ধরনের নীরবতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই কথা বলেছেন। বিশেষ করে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। প্রতিদিনই তিনি কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে যে সমস্ত কথাবার্তা বলছেন তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং দায়িত্বশীল। এবং সরকারের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এছাড়াও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে কথা বলতে দেখা গেছে। কথা বলেছেন আইনমন্ত্রী। তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে চমৎকার ভাবে সার্বিক বিষয়টি বিশ্লেষণ করেছেন। জনপ্রশাসনমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন ও কোটা আন্দোলন নিয়ে কথা বলেছেন। কথা বলেছেন শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। কিন্তু কোটা আন্দোলনের বিষয়টি শুধু সরকারের বিষয় নয়, এটি একটি রাজনৈতিক বিষয়। এতে একটি রাজনীতিকরণ ঘটেছে। এবং এই রাজনীতিকরণের ফলে এর একটি রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। 

কোটা সংস্কার নিয়ে এখনও পর্যন্ত আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদেরকে নীরব দেখা যাচ্ছে। হেভিওয়েট নেতারা কোটা আন্দোলন নিয়ে তেমন কোনও কথা বলছেন না। 

আওয়ামী লীগের জাতীয় পর্যায়ের নেতাদের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হলেন আমির হোসেন আমু। আমির হোসেন আমু এখন পর্যন্ত কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে মুখ খোলেননি। তাকে কোনও কথাও বলতে দেখা যায়নি। অথচ একটা সময় ছাত্রলীগের মধ্যে তার বিপুল প্রভাব ছিল। জাতীয় পর্যায়ে তার একটা পরিচিতি এবং জনপ্রিয়তা রয়েছে। কোটা আন্দোলন নিয়ে মুখ খুলতে দেখা যায়নি আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং আরেক হেভিওয়েট নেতা বেগম মতিয়া চৌধুরীকেও। মতিয়া চৌধুরী বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেন কিন্তু কোটা আন্দোলন নিয়ে তার মধ্যে এক ধরনের নীরবতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। 

আওয়ামী লীগের আরেক প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিমকেও এখন পর্যন্ত কোটা আন্দোলন নিয়ে কোনও কথা বলতে দেখা যায়নি। কথা বলেননি আওয়ামী লীগের আরেক নেতা তোফায়েল আহমেদও। তবে তোফায়েল আহমেদের পারিবারিক সূত্র বলছে, তিনি অত্যন্ত অসুস্থ। এমনি নিজেকে রাজনীতি থেকে গুটিয়ে নিয়েছেন। তাই তার বিষয়টি হয়তো সহানুভূতির সঙ্গে দেখা যায়। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্যদের মধ্যে যারা মন্ত্রী হয়েছেন, তাদেরকেও কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে কথা বলতে দেখা যাচ্ছে না। 

আওয়ামী লীগের মন্ত্রী ছাড়াও প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. আব্দুর রাজ্জাক কোটা সংস্কার নিয়ে এখন পর্যন্ত মুখ খোলেননি। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, যিনি বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন। তিনি কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে এখন পর্যন্ত কথা বলেননি। অথচ শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন সংকট সৃষ্টি হয়েছে, সেই সংকট সমাধানের ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। 

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকদের মধ্যে সমাজ কল্যাণ মন্ত্রী ডা. দীপু মনিকে কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে কোনও রকম কথা বলতে দেখা যাচ্ছেনা। কথা বলছেন না আওয়ামী লীগের আরেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ ও। তবে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকদের মধ্যে বাহাউদ্দিন নাছিম কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে সরব রয়েছেন। বিভিন্ন ফোরামে তিনি কথা বলছেন।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন যে, ছাত্রলীগ যেমন অত্যন্ত দায়িত্বশীল ভাবে কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন তেমনি যুবলীগ সহ অন্যান্য সংগঠনগুলোরও কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে কথা বলা উচিত। কোটা নিয়ে যারা বিভ্রান্তি তৈরি করছে সেই বিভ্রান্ত দূর করার জন্য জনপ্রিয় নেতাদের কথা বলা উচিত। বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা যাদেরকে পছন্দ করেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা পরিচিত তাদের এ নিয়ে প্রকৃত তথ্য শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরার দায়িত্ব রয়েছে। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনে এখন পর্যন্ত আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যে।


কোটা আন্দোলন   আওয়ামী লীগ  


মন্তব্য করুন


এডিটর’স মাইন্ড

সরকারের প্রথম ছয় মাসে আলোচিত ৬ মন্ত্রী

প্রকাশ: ০৫:০২ পিএম, ১০ জুলাই, ২০২৪


Thumbnail

টানা চতুর্থবারের মতো আওয়ামী লীগ সরকার তার ৬ মাস পূর্ণ করেছে আজ। এই ৬ মাসে সরকারকে নানা প্রতিকূলতা মোকাবেলা করতে হয়েছে অনেকগুলো সাফল্য অর্জন করেছে আওয়ামী লীগ সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ১১ জানুয়ারী নতুন মন্ত্রীসভা গঠন করেন। পরবর্তীতে তিনি আরও ৭ জন প্রতিমন্ত্রীকে নিয়ে মন্ত্রীসভা সম্প্রসারণ করেন। কিন্তু এই ৬ মাসে সব মন্ত্রী একই সুরে এগোতে পারেননি। সব মন্ত্রীর সাফল্য ইতিবাচক নয়। যদিও ৬ মাস সময় একজন মন্ত্রী বা সরকারকে মূল্যায়নের জন্য যথেষ্ট নয়। কিন্তু সকালের সূর্য সারা দিনের আভাস দেয়। সেই বিবেচনায় ৬ মাসে যে সমস্ত মন্ত্রীরা স্ব-প্রতিভ, আলোচিত এবং উজ্জ্বল ছিলেন তাদেরকে নিয়েই এই প্রতিবেদন। 

এই ৬ মাসে আলোচিত এবং দৃশ্যমান মন্ত্রীদের মধ্যে রয়েছেন-

১. ওবায়দুল কাদের: 

ওবায়দুল কাদের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক, পরিবহন ও সেতু মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন দীর্ঘদিন ধরেই। তার নেতৃত্বেই পদ্মা সেতু হয়েছে, মেট্রোরেল হয়েছে, কর্ণফুলী টানেল হয়েছে। এটি তার অসাধারণ সাফল্য। তবে বর্তমান ৬ মাস মেয়াদে সেতুমন্ত্রীর নেতৃত্বে পদ্মা সেতু প্রকল্পের পরিসমাপ্তি হয়েছে। পরিসমাপ্তি অনুষ্ঠান হয়েছে সফলভাবে। ওবায়দুল কাদের মন্ত্রী হিসেবে বাংলাদেশে সড়ক-যোগাযোগ ব্যবস্থায় একটি নীরব বিপ্লবের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এসময় তিনি রাজনৈতিক অঙ্গনেও সরব ছিলেন। এই ৬ মাসে সবচেয়ে সরব মন্ত্রী হিসেবে উজ্জ্বল উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের। 

২. ড. হাসান মাহমুদ: 

ড. হাসান মাহমুদ তথ্যমন্ত্রী থেকে এ মেয়াদে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি বাংলাদেশে ভারসাম্যের কূটনীতির ধারা অব্যাহত রেখেছেন। নির্বাচনের পর আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং স্বীকৃতি অর্জনের ক্ষেত্রে তার ভূমিকা সমাদৃত হয়েছে। তাছাড়া দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রীর সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয় কূটনীতির সফল বাস্তবায়ন করছেন হাসান মাহমুদ। ভারতের নির্বাচনে পর প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর সম্পন্ন হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী চীন সফর করছেন। এসমস্ত অর্জনের ক্ষেত্রে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। এক্ষেত্রে ড. হাসান মাহমুদকে অত্যন্ত স্ব-প্রতিভ এবং উজ্জ্বল দেখা গেছে। 

৩. ডা. সামন্ত লাল সেন

১১ জানুয়ারীর মন্ত্রীসভায় সবচেয়ে বড় চমক ছিলেন স্বাস্থ্য মন্ত্রী হিসেবে ডা. সামন্ত লাল সেন। তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রী হিসেবে কেমন দায়িত্ব পালন করবেন  তা নিয়ে অনেকের মধ্যেই নানা রকম কৌতূহল ছিলো। তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রী হিসেবে প্রথম ৬ মাসে উজ্জ্বল ছিলেন সামন্ত লাল। তার সততা, নিষ্ঠার প্রভাব পড়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাজে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে দুর্নীতির কলঙ্ক থেকে মুক্ত করার জন্য তার নিরলস প্রচেষ্টা সর্বমহলে আলোচিত হচ্ছে। বিভিন্ন অনিয়ম এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছেন তিনি। তার সঙ্গে সহযোগিতা করছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী রোকেয়া সুলতানা। সবকিছু মিলিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের খোল-নলচে পাল্টে গেছে প্রথম ৬ মাসে। 

৪. আব্দুর রহমান

আব্দুর রহমান আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য। প্রথমবারের মতো তিনি মন্ত্রীত্ব পেয়েছেন। এবার মৎস্য এবং প্রাণীসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তাকে। এ দায়িত্ব গ্রহণ করে মন্ত্রণালয়কে গতিশীল করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। তার নেতৃত্বেই বাংলাদেশ সাধু পানির মাছ উৎপাদনে বিশ্বের দ্বিতীয় অবস্থান গ্রহণ করেছে। রমজানের সময় ন্যায্য মূল্যে মাংস, দুধ, ডিম বিতরণ করার ক্ষেত্রে তার অবদান প্রশংসিত হয়েছে। এবার কোরবানি ঈদে দেশিয় প্রাণী দিয়ে কোরবানির উদ্যোগে কোনরকম বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়নি। সবকিছু মিলিয়ে আব্দুর রহমান প্রমাণ করেছেন একজন দক্ষ রাজনীতিবিদ মন্ত্রীত্বেও দক্ষতা দেখাতে সক্ষম। 

৫. জাহাঙ্গীর কবির নানক 

জাহাঙ্গীর কবির নানক এবার দ্বিতীয় বারের মতো মন্ত্রী হয়েছেন। বস্ত্র এবং পাট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তাকে। যদিও এই মন্ত্রণালয়টিকে অনেকে অগুরুত্বপূর্ণ মনে করছে। তবুও এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি তার মেধা এবং দক্ষতা দিয়ে এ মন্ত্রণালয়কে ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ করছেন। বিশেষ করে পাটের সোনালী যুগ ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে তিনি বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। টাঙ্গাইলের শাড়ি মেধাসত্ব অর্জনের ক্ষেত্রে তার তড়িৎ পদক্ষেপ সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে। পাটের বহুমুখী বাণিজ্যিকীকরণের ক্ষেত্র সর্ব মহলে প্রশংসিত হয়েছে। 

৬. মহিবুল হাসান চৌধুরী

মহিবুল হাসান চৌধুরী শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপ-মন্ত্রী থেকে এবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রী দায়িত্ব পালন করছেন। তার নেতৃত্বে পাবলিক পরীক্ষাগুলো এখন পর্যন্ত নির্বিঘ্নে হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রী হিসেবে পাঠ্য বইসহ বিভিন্ন বিষয়ে তার মেধা দীপ্ত উদ্যোগ সর্ব মহলে প্রশংসিত হয়েছে।  


সরকারের ৬ মাস   মন্ত্রী  


মন্তব্য করুন


বিজ্ঞাপন