ইনসাইড আর্টিকেল

জিয়ার ষড়যন্ত্র এবং বিশ্বাসঘাতকতা (পর্ব-৪)

প্রকাশ: ০৮:০০ এএম, ১০ নভেম্বর, ২০২৩


Thumbnail

১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে স্বপরিবারে হত্যার নেপথ্যে ছিলেন জিয়া। ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট থেকে ৭ নভেম্বরের ঘটনা প্রবাহে দেখা যায় জিয়া ছিলেন একজন নিষ্ঠুর স্বৈরাচার এবং ঠান্ডা মাথার খুনী। তার অপকর্মের কিছু চিহ্ন পাওয়া যায় ‘মহিউদ্দিন আহমদের’ লেখা ‘জাসদের উত্থান পতন: অস্থির সময়ের রাজনীতি’ শিরোনামে গ্রন্তটি থেকে। পাঠকের আগ্রহের কথা বিবেচনা করে গবেষণাধর্মী গ্রন্থটির কিছু অংশ ধারাবাহিক প্রকাশ করা হলো:

তাহেরের সঙ্গে জিয়ার যোগাযোগ ক্ষীণ হয়ে আসে এবং ১২ নভেম্বর থেকে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। ১৫ নভেম্বর 'দেশবাসীর প্রতি মেজর জলিল ও আ স ম রবের আহ্বান' শিরোনামে জাসদ একটি প্রচারপত্র বিলি করে। বক্তব্যে বলা হয়:

এ মাসের (নভেম্বর) প্রথম দিকে, বিশেষ করে ৩ তারিখে, বিশ্বাসঘাতক ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে ভারত, রাশিয়া ও আমেরিকার প্ররোচনায় তারা দেশ ও জাতি হিসেবে আমাদের অস্তিত্বকে চিরতরে বিলুপ্ত করার চরম আঘাত হানার প্রস্তুতি নিয়েছিল। এ ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের পূর্বমুহূর্তেই বাংলার বিপ্লবী সিপাহিরা, বিপ্লবী গণবাহিনী ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র, যুবক, মধ্যবিত্ত, বুদ্ধিজীবীসহ সব দেশপ্রেমিক নাগরিকের সমর্থন ও সক্রিয় সহায়তায় আঘাত হানল শত্রুর দূর্গে। মুক্ত করল মৃত্যুর কবল থেকে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে, মুক্ত করল আমাদেরকে । ... কিন্তু ভুললে চলবে না যে, আমাদের এ বিজয় অত্যন্ত সাময়িক।... আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, দেশীয় শোষক ও সাম্রাজ্যবাদ-আধিপত্যবাদের দালালেরা তাদের প্রভুদের ইঙ্গিতে নতুন পোশাক পরে আবার জনগণের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। এদের সমূলে উৎখাত না করা পর্যন্ত আমাদের সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে ।....

জলিল ও রব বাকশালকে বাদ দিয়ে সকল প্রকাশ্য ও গোপন রাজনৈতিক দল নিয়ে একটি 'অন্তর্বর্তীকালীন গণতান্ত্রিক জাতীয় সরকার' গঠন এবং অবিলম্বে সামরিক আইন বাতিলের দাবি জানান। অন্যান্য দাবির মধ্যে ছিল সাধারণ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার দূতাবাস সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া, জাতিসংঘের কাছে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার বিরুদ্ধে নালিশ জানানো, সকল রাজনৈতিক বন্দীর মুক্তি ও সকল প্রকার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা প্রত্যাহার করা ইত্যাদি।

জাসদের নেতাদের একটা গোপন সভা ১৫ নভেম্বর রায়েরবাজারে একটা কাঠের আড়তে অনুষ্ঠিত হয়। সভায় তাঁরা বলেন, জিয়া বিট্রে করেছে। জলিল বলেন, ভয়ের কোনো কারণ নাই। বঙ্গভবনের সামনে যেসব ট্যাংক আছে, ওরা আমার সঙ্গে কথা বলে গেছে।

নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডে শাজাহান সিরাজের বাড়িতে জলিলের অনুরোধে তাঁর সঙ্গে সাংবাদিক আমানউল্লাহ দেখা করতে যান। আমানউল্লাহর বর্ণনামতে:

জলিলকে খুব অস্থির মনে হচ্ছিল। জিয়া সম্পর্কে ক্ষোভের সঙ্গে বলল, ‘দ্যাট বা বাস্টার্ড হ্যাজ বিট্রেইড (বেজন্মাটা বেইমানি করেছে) ।

ইতিমধ্যে সৈনিকেরা বেশির ভাগই সেনানিবাসে ফিরে গেছেন। তাহের বিভিন্ন সেনানিবাসে তাঁর অনুগত লোকদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছেন। ২৩ নভেম্বর এলিফ্যান্ট রোডে শাজাহান সিরাজের বাড়ি থেকে রবকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। একই দিন জলিল, আবু ইউসুফ ও ইনু গ্রেপ্তার হন। ২৪ নভেম্বর বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার কয়েকজনকে নিয়ে তাহের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ হলের আবাসিক শিক্ষক ও পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের লেকচারার মোস্তফা সরোয়ার বাদলের বাসায় সভা করার সময় নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনী তাঁদের ঘিরে ফেলে। তাহের কয়েকজন সহযোগীসহ গ্রেপ্তার হন। মোস্তফা সরোয়ার বাদলও গ্রেপ্তার হন। গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাহেরের উপলব্ধি হয়, তিনি ৭ নভেম্বর যাদের ক্ষমতায় এনেছেন, তাঁরা তাঁর সঙ্গে বেইমানি করেছে।

ঢাকা নগর গণবাহিনীর কমান্ডার আনোয়ার হোসেন একটি পরিকল্পনা আঁটেন, যা এ দেশে এর আগে কখনো ঘটেনি। ছয়জনের একটা দল তৈরি হয়সুইসাইড স্কোয়াড। দলের সদস্যরা হলেন সাখাওয়াত হোসেন বাহার, ওয়ারেসাত হোসেন বেলাল, মীর নজরুল ইসলাম বাচ্চু, মাসুদুর রহমান, হারুনুর রশীদ ও সৈয়দ বাহারুল হাসান সবুজ।

প্রথমে মতিঝিলে আদমজী কোর্টে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস 'রেকি' করা হয়। পরে সিদ্ধান্ত বদল করে ধানমণ্ডির ২ নম্বর সড়কে ভারতীয় হাইকমিশন 'রেকি' করা হয়। ঠিক হয়, গণবাহিনীর একটি দল হাইকমিশনে গিয়ে হাইকমিশনারকে জিম্মি করে তাহেরের মুক্তি এবং আরও কিছু দাবিদাওয়া উপস্থাপন করবে। তারা খোঁজ নিয়ে জেনেছে, হাইকমিশনার সমর সেন সকাল সাড়ে নয়টায় অফিসে আসেন।

২৬ নভেম্বর সময়মতো ছয়জন অকুস্থলে হাজির হলেন। দলের নেতা বাহার। তিনজন অবস্থান নিলেন রাস্তার দক্ষিণ পাশে জার্মান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রর চত্বরে। তিনজন অপেক্ষা করতে থাকলেন ভারতীয় ভিসা অফিসের সামনে। সবাই সশস্ত্র। এমন সময় হাইকমিশনার এসে গাড়ি থেকে নামলেন। সঙ্গে সঙ্গে বাহারদের দলের দুজন তার দুই হাত ধরে বললেন, 'আপনি এখন আমাদের হাতে জিম্মি। আপনার ঘরে চলুন। আপনার সঙ্গে আমাদের কিছু কথা আছে।' সিঁড়ি দিয়ে একতলা থেকে দোতলায় যাওয়ার পথে ওপরে অপেক্ষমাণ নিরাপত্তারক্ষীরা ব্রাশফায়ার করলে ঘটনাস্থলেই বাহার, বাচ্চু, মাসুদ ও হারুন নিহত হন। বেলাল ও সবুজ আহত হন। হাইকমিশনারের কাঁধে গুলি লেগেছিল। চোখের পলকে ঘটনা ঘটে গেল। রেকি করার সময় কজন নিরাপত্তারক্ষী ঠিক কোন কোন জায়গায় ডিউটি করেন, তা তাঁরা জেনে গিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁরা জানতেন না, একদল ভারতীয় নিরাপত্তারক্ষী দোতলায় পাহারায় থাকেন ।

তিতুমীর কলেজ ছাত্রসংসদের সহসভাপতি কামালউদ্দিন আহমেদ এই অভিযানে অংশগ্রহণকারী ছয়জনের জন্য মগবাজারের নয়াটোলায় একটা শেল্টারের ব্যবস্থা করেছিলেন। ছাত্রসংসদের সহসম্পাদক ফোরকান শাহর বাড়িটি শেন্টার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। সেখান থেকেই এই স্কোয়াড়ের ছয়জন ২৬ নভেম্বর সকালে রওনা হয়েছিলেন। ঘটনার পর ফোরকানের বাবা ইসরাফিল সাহেবকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে।

সংবাদ পেয়ে সেনাবাহিনীর নবনিযুক্ত চিফ অব জেনারেল স্টাফ ব্রিগেডিয়ার আবুল মঞ্জুর এলেন। তিনি আহত বেলাল ও সবুজকে তাঁর গাড়িতে উঠিয়ে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নিয়ে গেলেন । ৪১

মাসুদ ও হারুনের মৃতদেহ পুলিশের জিম্মায় দেওয়া হয়। ভারতীয় দূতাবাসের পেছনে ৩ নম্বর সড়কে থানার পোর্টিকোর নিচে একটা ভ্যানে মৃতদেহগুলো রাখা ছিল। কামাল ও তাঁর বন্ধু ওয়াহিদুল ইসলাম ওটুল থানায় যান মৃতদেহগুলো দেখতে। শুটুলের বাবা শফিকুল ইসলাম ছিলেন পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর। তিনি তাঁদের দ্রুত সরে যেতে বলেন। 

ভারতীয় হাইকমিশনে এই অভিযানের ব্যাপক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। প্রায় সব রাজনৈতিক দলের নেতারা এক সুরে এর সমালোচনা করতে শুরু করলেন, ডান-বাম কোনো ভেদাভেদ থাকল না। তাঁরা কয়েকজন মিলে একটা যৌথ বিবৃত্তি দিলেন। বিবৃতিটা ছিল এরকম :

আমরা একদল লোকের এহেন কাপুরুষোচিত ও জঘন্য অপচেষ্টার তীব্র নিন্দা করিতেছি। ঘটনাটি দৃশ্যতই রাজনৈতিক দুরভিসন্ধিমূলক এবং বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে ফাটল সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই ইহা করা হইয়াছে। ভারতীয় হাইকমিশনারের উপর পরিচালিত আক্রমণ প্রতিহত করিবার ক্ষেত্রে কর্তব্যরত বাংলাদেশ পুলিশ ও রক্ষীদের উপযুক্ত এবং কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আমরা প্রশংসা করি।

বিবৃতিতে স্বাক্ষর দিয়েছিলেন আতাউর রহমান খান, তোফাজ্জল আলী, আলীম আল রাজী, মশিয়ুর রহমান, শাহ আজিজুর রহমান, অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ, আসাদুজ্জামান খান, কাজী জাফর আহমদ, অলি আহাদ ও রাশেদ খান মেনন।

 

(সূত্র: জাসদের উত্থান পতন: অস্থির সময়ের রাজনীতি ।। পৃষ্টা: ২০৬-২১০)


জিয়া   ষড়যন্ত্র   বিশ্বাসঘাতকতা  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড আর্টিকেল

মাতৃভাষায় কেন পিছিয়ে পড়ছে তরুণরা?

প্রকাশ: ০৭:৫১ এএম, ২২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪


Thumbnail

অন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সাহিত্যে ইংরেজি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষা। এই ভাষা বিশ্ব বাণিজ্যে মূল্যবান ভাষা হিসেবে পূর্ণভাবে স্থাপিত হলেও বাংলাদেশের প্রজন্মকালে এই ইংরেজি ভাষার ব্যবহার ক্রমাগতভাবে বাড়ছে। এতে বুঝা যায়, বাংলাদেশ উন্নত বিশ্বের সাথে প্রতিযোগিতা করে এগিয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু বর্তমান প্রজন্মে কাছে এই ইংরেজি ভাষার ফলে তাদের নিজস্ব বাংলা ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে নিমিষেই।  কারণ বিশ্ববাণিজ্যে, সামাজিক মাধ্যমে, বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ইংরেজি ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা দেশের নিজস্ব বাংলা ভাষাকে ক্রমাগতভাবে ভুলে যাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারন হয়ে দাঁড়াবে।

এই ইংরেজি ভাষা প্রচলনটি বর্তমান তরুণ তরুণীদের চলমান জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখছে। কিন্তু বিদেশী এই ভাষা সারা বছর দেশে প্রচলন থাকলেও ২১ ফেব্রুয়ারি কিংবা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এই দিনটি আসলে বাংলা প্রচলন টা এক রকম বেড়ে যায়। কেননা স্মার্ট বাংলাদেশে শিক্ষিত তরুন তরুণনিদের মাতৃভাষার এই দিনটি পালন করা হয় হাঁসি আনন্দে ফুলে সুভাষিত করে।

আবার তাদের কিছু মানুষের কাছে স্মার্ট বাংলাভাষায় কথা বলতে হলে ইংরেজি শব্দ মিস্রিত করে তাদের মতামত প্রকাশ করে। কথার মাঝেই কথার ছলে ইংরেজি শব্দকে মিস্রিত করে ফেলে। তাদের ভাষায় ইংরেজি মিস্রিত বাংলা ভাষায় কথা বলা হলে বুঝা যায় যে হয়ত তারা স্মার্ট নয়ত অধিক জ্ঞানের অধিকারি।

এই ইংরেজি ভাষা ব্যবহারে তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষিত হয় বলে ইংরেজি ব্যবহারেই তারা বেশি উৎসাহবোধ করে। এতে করে চলমান জীবনে বাংলাভাষা সংস্কৃতি যেমন বিঘ্নিত হচ্ছে, তেমনি পরবর্তী প্রজন্মের কাছে বাংলাভাষা অনেকটাই বিব্রত হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়।

দি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম এর তথ্য অনুসারে বিশ্বজুড়ে আনুমানিক ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন মানুষ ইংরেজি ভাষায় কথা বলে। তবে ৪০ কোটিরও কম মানুষের ফার্স্ট ল্যাঙ্গুয়েজ এই ভাষা’। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই ভাষা শিক্ষিত তরুন তরুণীদের মুখে সবচেয়ে বেসি শুনা যায়। তাহলে কি ইংরেজি ভাষা বলার ফলে বাংলাভাষাকে বিব্রত করা হচ্ছে, নাকি ইংরেজি চর্চায় পরবর্তী প্রজন্মের কাছে মাতৃভাষাকে হারিয়ে ফেলা হচ্ছে?

বাংলাদেশে প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনার শিক্ষার ক্ষেত্রে ভাষা হল ইংরেজি। তাই প্রযুক্তিবিদ-ব্যবস্থাপকরা কার্যক্ষেত্রেও ইংরেজি প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু দেশপ্রেমের স্থান থেকে প্রযুক্তি খাতে এই ইংরেজি প্রয়োগ করলেও অনেক সময় বাংলা প্রয়োগে তারা ব্যর্থ হয়।

তবে দেশের স্বার্থে, প্রযুক্তির কল্যাণে, পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশকে একটি উন্নত দেশ হিসেবে উপস্থাপন করতে হলে এই ইংরেজি ভাষা বলা বা ইংরেজি ভাষায় নিজেকে নিয়োজিত রাখাটা এক প্রকার গুরুত্বপূর্ণ। তার মানে এই নয় যে, বাংলা ভাষাকে বিব্রত করে, গুরুত্বহীন মনে করে সেখানে ইংরেজি ভাষা গুরুত্ব দিতে হবে।

এছাড়াও বাস্তবতায় দেখা যায়, বিভিন্ন শিক্ষা এবং পেশাদার ক্ষেত্রে, ইংরেজি ভাষা একটি প্রধান আবশ্যকতা হিসেবে মনোনিবেশ করছে। যার কারনে অনেকাংশে এটি আমাদের নিজস্ব ভাষা ব্যবহার করতে কষ্টকর বা অসম্ভাব্য হতে পড়ছে।

যদিও বর্তমান প্রজন্মের তরুন তরুণীদের কাছে ইংরেজি ভাষা বেসি প্রচলনের অন্যতম কারন হতে পারে ইন্টারনেট এবং সোশ্যাল মিডিয়া। যা কিনা এই ইংরেজি ভাষা ইন্টারনেটে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে, যার কারনে তরুন তরুনীরা এই ইংরেজি ভাষা সম্পর্কে বেশি ধারণা পায়। এবং এই ধারণার ফলে তাদের নিজস্ব ভাষাকে ভুলে যাচ্ছে অনায়েসে।

এছাড়াও সারা বিশ্বের বৃহত্তম এক দিক হল বিজ্ঞান। রয়েছে প্রযুক্তি এবং শিক্ষা, এসবের ক্ষেত্রে ইংরেজি একটি প্রধান ভাষা হয়ে আছে। কেননা এসব ক্ষেত্রে কাজ করতে হলে এবং দেশকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে হলে ইংরেজি ভাষা জানা গুরুত্বপূর্ণ।

যদিও ব্যক্তিগত এবং ব্যবসায়িক যোগাযোগের জন্য হলেও ইংরেজি একটি প্রভাবশালী সরঞ্জাম কিন্তু পরবর্তী প্রজন্মের তাগিদে দেশের সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বাংলা ভাষা চর্চা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশি ভাষা লালন বন্ধ করতে হবে এবং বিদেশি সংস্কৃতি এসব ভাষা মোকাবেলায় দেশীয় সংস্কৃতিকে উপযোগী করতে হবে।


মাতৃভাষা   তরুণ   অন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড আর্টিকেল

আপেক্ষিক বিষয়কে কমান্ড করছে ব্রেইন, সৃষ্টি হয় ভালোবাসা ও বিশ্বাস

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ১০ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪


Thumbnail

দীর্ঘদিন সংসার করার পর বিচ্ছেদ ঘটিয়ে নতুন করে শুরু করছেন অনেকেই। বিশ্বাসে টানাপোড়েন তাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। বিচ্ছিন্ন এমন কিছু ঘটনা ঘটলেও বাঙালি পরিবার ভালোবাসার বন্ধনেই গড়ে উঠেছে। চলছে ভালোবাসা আর বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করেই।

ধর্মীয় ও সামাজিক বন্ধন গড়ে উঠা পরিবার-সমাজে বিশ্বাস-ভালোবাসার উপস্থিতি দৃশ্যমান। মানুষের কষ্টে কেঁদে উঠে মানুষের মন আবার আনন্দে হাসেন।

সমাজ বিশ্লেষকরা বলছেন, সমাজের অনেকেই অনেকের সাথে দুঃখ ভাগাভাগি করছেন। এতিম-অসহায় দুস্থদের কল্যাণে কাজ করছেন অনেকে। কিছু মানুষ লোক দেখানো বা সমাজসেবার মুখোশে থাকলেও অনেকে ভালোবেসেই করছেন।

তবে অনেকাংশে মানবপ্রেম মুখ থুবড়ে পড়ছে। আত্মকেন্দ্রিক ভালোবাসার প্রেক্ষাপট বর্তমান সমাজে চলমান। এটিও এক ধরনের ভালোবাসা। পরিবারকেন্দ্রিক ভালোবাসায় পারিবারিক বিশ্বাসের ভিত্তি অনেকটাই মজবুত। 

গবেষণায় দেখা যায়, ভালোবাসা, বিশ্বাস- এসব আপেক্ষিক বিষয়কে কমান্ড করছে ব্রেন। আবেগঘন ব্রেনের কমান্ডের ফলে সৃষ্টি হয় ভালোবাসা বা বিশ্বাস।

ভালোবাসার পাশাপাশি দায়িত্বও নিতে হয়। মানুষ যখন ভালোবেসে দায়িত্ব নেয় তখন মানুষের মস্তিষ্কে ডোপামিন নামে একটি রাসায়নিক উপাদান অনেক বেশি পরিমাণে উৎপন্ন হতে থাকে। বিজ্ঞানীরা এই উপাদানটিকে আনন্দ এবং পুরস্কারের একটি রাসায়নিক উপাদান মনে করেন। এটি যত বেশি বের হয়, ততই ব্রেইনে উচ্ছ্বাস এবং সুখের অনুভব বেশি মাত্রায় অনুভব করতে পারে। আবার এটি সুখের উল্লাস দিতে গিয়ে যে মুক্তির পথ তৈরি করে, এক সময়ে সেটি আসক্তিরও জন্ম দিতে পারে।

মানুষ যখন দায়িত্বশীল হয়, ভালোবাসার মানুষগুলোর প্রতি যখন আকাঙ্ক্ষা থাকে তখন ডোপামিনের পাশাপাশি মস্তিষ্কে অক্সিটোসিন নামক আরেকটি রাসায়নিক উপাদান বের হয়।

বিজ্ঞানীদের মতে, এই রাসায়নিক উপাদানটি আমাদের বিশ্বাস এবং কারও সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হওয়ার যে অনুভূতি সেটিকে প্রভাবিত করার একটি রাসায়নিক উপাদান হিসেবে কাজ করে। সামাজিকভাবে পরস্পরের সঙ্গে ভালো বন্ধন তৈরি করতে অক্সিটোসিনের ভূমিকা আছে।

অনেক ক্ষেত্রে ব্রেনের সক্ষমতা কম থাকলেও এসব উপাদান মাথাচাড়া দিয়ে থাকে। মানুষের মধ্যে এডিকশন (নেশা) আকারে বিরাজ করে।

মেয়েদেরকে নিয়ে এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মেয়েদের ব্রেন এরূপ কমান্ডে আবদ্ধ থাকে বেশি। পুরুষরা নানা কাজের মাঝে থাকায় এ ধরনের বিষয়ে লেগে থাকা তাদের ঠিক হয়ে উঠে না।

নারী-পুরুষ প্রেমের ক্ষেত্রে যা দৃশ্যমান হয়ে ফুটে উঠে, মেয়েরা যাকে ভালোবাসে তাদের মঙ্গল কামনায় ব্রত রাখতে শুরু করে তাও সন্দেহের তীরে যা ভালোবাসার দাম্পত্য জীবন হুমকির মুখে পড়ে যায়। এতে বাড়তে পারে বিবাহ বিচ্ছেদের সংখ্যা। 

পরিশেষে বলা যায়, মানুষের ভালোবাসা, সম্পর্ক, বৈবাহিক, কিংবা দাম্পত্য জীবনের পথচলার আপেক্ষিক বিষয়গুলোকে কমান্ড করছে একমাত্র ব্রেইন আর সে জন্য ভালোবাসার সম্পর্কগুলোতে স্কেল কথাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মগ্রন্থ, আইন বা সমাজ নির্ধারিত একটি নির্দিষ্ট স্কেলেই পরিচালিত হয় এসব সম্পর্ক। তাই আমাদের সম্পর্কে বিশ্বাস রাখা জরুরি। তাছাড়া অর্জন কথাটা সম্পর্ক, বিশ্বাস বা ভালোবাসার ক্ষেত্রে অনস্বীকার্য। সম্পর্কে বিশ্বাস ও ভালোবাসা প্রতিটি মানুষের নিজস্ব অর্জন।


ভালোবাসা   দিবস  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড আর্টিকেল

যুবসমাজের অবক্ষয়ে অন্ধকারে সমাজ

প্রকাশ: ০৯:০৪ এএম, ২৪ ডিসেম্বর, ২০২৩


Thumbnail

রাতের অন্ধকার দূর করে প্রভাতের সূর্যকে স্বাগতম জানায় যুবসমাজ, পাহাড় সমান বাধা অতিক্রম করে বিজয় ছিনিয়ে আনা আজকের এই যুবসমাজই আগামী দিনের দেশ ও জাতির কর্ণধার। শত বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে যুবসমাজই পারে দেশকে স্বপ্নের দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে। একটি দেশের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে যুবসমাজ যখন খারাপ পথে ধাবিত হয় তখন দেশ ও সমাজের মধ্যে নানা সমস্যা দেখা যায়। যুবসমাজের অবক্ষয়ের কারণে সামাজিক ও জাতীয় জীবনে নেমে আসতে পারে চরম দুঃখ-দুর্দশা, বিপর্যয় ও হতাশা। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় পাঁচ কোটি মানুষই যুবসমাজের মূল্যবান কার্যকরী অংশ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক বক্তব্যে বলেছিলেন, ২০৪১ সালের মধ্যে যুবসমাজকে নিয়ে বাংলাদেশকে একটি উন্নত দেশ হিসেবে পরিণত করবেন। তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ সরকার ক্রমাগতভাবে তরুণদের কর্মমুখী করার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। ইতোমধ্যে সরকার যুবসমাজে তরুণদের উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। যেমন- যুব দিবস পালন, যুব মেলার আয়োজন ইত্যাদি। এ লক্ষ্যে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং যুব উন্নয়ন অধিদফতর নিয়ে থাকে ব্যাপক কর্মসূচি। 

নৈতিকতা, মাদক, শিক্ষা,এবং পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয় একটি ভয়াবহ ব্যধি বলা যায়। বর্তমানে এই ব্যাধিগুলো যুব সমাজকে গ্রাস করে ফেলছে বলে মনে করেন সমাজবিজ্ঞানীরা। এই অবস্থা চলতে থাকলে জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকার ধাবিত হবে। এই অবক্ষয়ব্যাধি যুবপ্রজন্মকে বাঁচানোর জন্য দরকার সুস্থ রাজনীতি, সমাজে স্থিতিশীলতা এবং নৈতিক শিক্ষা।

আমাদের দেশের যুবসমাজ আজ নানা ধরনের নৈতিক ও মূল্যবোধের অবক্ষয়ের শিকার হচ্ছে। সচেতন সমাজের মানুষ মনে করেন, তরুণদের এই নৈতিকতার অবক্ষয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। যার ফলে দেশে অপসংস্কৃতির বৃদ্ধি হয়ে দেশ ও সমাজকে প্রলোভিত করছে। বেকারত্ব ও মাদকাসক্তির প্রভাবে আমাদের যুব সমাজ অসংখ্য সংকট ও সমস্যায় জর্জরিত হচ্ছে। 

কিছু মনোনিবেশ পদক্ষেপ গ্রহনের মাধ্যমে আজকের যুবসমাজকে অবক্ষয়ের হাত থেকে রক্ষা করা যেতে পারে। যা কিনা তরুণদের জীবনে সুধারণ এবং আগামীতে তাদের প্রয়োজনীয় সহায় প্রদান করে একটি সন্দর সমাজ গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে। তার মধ্যে

পেশাদান শিক্ষা: যুবসমাজের অবক্ষয়রোধ করে গড়ার জন্য উচ্চ মানসম্মত শিক্ষা প্রয়োজন। শিক্ষা একজন ব্যক্তির জীবন এবং সমাজের উন্নতির মাধ্যম। তরুণদেরকে পেশাদান শিক্ষা এবং ক্যারিয়ার পরিকল্পনা সাহায্য করতে একটি প্রাধিকৃত প্রোগ্রাম চালানো হতে পারে।

কৌশল উন্নত করা: তরুণদেরকে একটি বিশেষ ক্ষেত্রে পড়াশোনা এবং কৌশল উন্নত করতে উৎসাহিত করা যেতে পারে এবং তা ক্রমাগত বৃদ্ধি প্রদান করে সরকারিভাবে মনিটরিং করতে হবে যা কিনা কৌশলের দিক থেকে উন্নত করতে সাহায্য করবে, এই কৌশলগুলো তাদের কাজের পারদে এবং ব্যক্তিগত উন্নতির মাধ্যমে সাফল্য অর্জন করতে পারে এবং দেশ ও জাতির জন্য কল্যাণকর বয়ে আনতে পারে।

সোশ্যাল সাপোর্ট মেন্টরিং: তরুণদের জন্য সোশ্যাল সাপোর্ট এবং মেন্টরিং প্রদান করা যেতে পারে। এতে করে আজকের যুব সমাজ একটি প্রক্রিয়ায় দেশকে এগিয়ে নিবে, যেখানে একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তি বা একজন নবীন ব্যক্তিকে তার শিক্ষানবিশকালে দলবদ্ধভাবে সহায়তা করবে। 

বিশেষ প্রকল্প: একটি বিশেষ প্রকল্প সূচনা করলে, সেখানে তাদের শখ এবং ক্যারিয়ার পছন্দ নির্ধারণ এবং যুবসমাজের নিজ নিজ ক্যারিয়ার পরিকল্পনায় একটি নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে। যা তাদের ভবিষ্যতে সাফল্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে সঠিক পথের জীবন পরিচালিত ও উৎসাহিত করতে সাহায্য করবে। 

সময় প্রবন্ধন: কাজের ক্ষেত্রে, শিক্ষার ক্ষেত্রে, এবং সামাজিক জীবনের ক্ষেত্রে সময় প্রবন্ধন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সময় পরিবর্তনে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলা আজকের যুব সমাজের একটা ফ্যাশন। কেননা, পৃথিবী প্রবর্তনের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত সময়ের সাথে সাথে পাল্টেছে সমাজের জীবন যাত্রা। তাই সময়কে গুরুত্ব দিয়ে যুবসমাজকে সময়পযোগী করা প্রয়োজন।

যুবসমাজ সচেতন হলে দেশ ও জাতি উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাবে, বাড়বে সুশীল সমাজ ও সমাজের মূল্যবোধ। একটি সঠিক সমৃদ্ধ, সমর্থ, এবং সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমেই বাস্তবায়ন করা যেতে পারে ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি অর্জন এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা।



মন্তব্য করুন


ইনসাইড আর্টিকেল

জিয়ার ষড়যন্ত্র এবং বিশ্বাসঘাতকতা (পর্ব-৮)

প্রকাশ: ০৮:০০ এএম, ১৬ নভেম্বর, ২০২৩


Thumbnail

১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে স্বপরিবারে হত্যার নেপথ্যে ছিলেন জিয়া। ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট থেকে ৭ নভেম্বরের ঘটনা প্রবাহে দেখা যায় জিয়া ছিলেন একজন নিষ্ঠুর স্বৈরাচার এবং ঠান্ডা মাথার খুনী। তার অপকর্মের কিছু চিহ্ন পাওয়া যায় ‘মহিউদ্দিন আহমদের’ লেখা ‘জাসদের উত্থান পতন: অস্থির সময়ের রাজনীতি’ শিরোনামে গ্রন্তটি থেকে। পাঠকের আগ্রহের কথা বিবেচনা করে গবেষণাধর্মী গ্রন্থটির কিছু অংশ ধারাবাহিক প্রকাশ করা হলো:

৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের 'ব্যর্থতার' কারণ নিয়ে পরে অনেক আলোচনা ও বিতর্ক হয়েছে। আনোয়ার হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, অভ্যুত্থানের সামরিক প্রস্তুতি যথেষ্ট থাকলেও রাজনৈতিক প্রস্তুতি ছিল না। প্রকারান্তরে তিনি জাসদ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ আনেন।

৬ নভেম্বর কর্নেল তাহের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থাকে নিয়ে যখন অভ্যুত্থানের সামরিক প্রস্তুতি চূড়ান্ত করে ফেলেছেন, তখনো জাসদ নেতৃবৃন্দ ছাত্রলীগ, শ্রমিক লীগ ও গণবাহিনীকে রাস্তায় নামানোর প্রাথমিক প্রস্তুতিও নেননি। ঢাকা শহর গণবাহিনীর অধিনায়ক আমি। সরাসরি হাসানুল হক ইনুর অধীনে। তার কাছ থেকেই দলীয় নির্দেশ পেতাম। সে সময় ঢাকায় আমার নেতৃত্বে গণবাহিনীর প্রায় ছয়শত নিয়মিত সদস্য। হাসানুল হক ইনুর কাছ থেকে নির্দেশ চাচ্ছিলাম গণবাহিনীকে সক্রিয় করার। তিনি জানালেন, আপাতত তাদের অভ্যুত্থান সম্পর্কে কিছু বলার প্রয়োজন নেই। শুধু আঞ্চলিক কমান্ডারদের সতর্ক থাকতে বললেন। তার এ সিদ্ধান্তের কারণে শহর গণবাহিনীর আঞ্চলিক কমান্ডারদের পর্যন্ত অভ্যুত্থান সম্পর্কে কিছুই জানানো গেল না।....তাহেরকে বলা হয়েছিল ছাত্রলীগ, শ্রমিক লীগ ও গণবাহিনী পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি সহকারে ময়দানে থাকবে। সৈন্যরা ব্যারাক থেকে বেরিয়ে এসে গণবাহিনীর সদস্যদের সশস্ত্র করবে। ছাত্ররা থাকবে প্রচারের দায়িত্বে এবং শ্রমিকেরা নিয়ন্ত্রণ করবে রাজপথ। এসব আমি জেনেছি পরে। গোপন বিচার চলাকালে। নেতৃত্ব চাইলে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মতো শক্তি তখন জাসদের ছিল। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে নেতৃত্ব কিছুই করলেন না। কিংবা এমনও হতে পারে যে, তারা শুধু পরিকল্পনার সামরিক অংশটুকু বাস্তবায়নকেই যথেষ্ট মনে করেছেন।

জিয়াকে নিয়ে তাহের যে জুয়া খেলেছিলেন, তার মূল্য যে শুধু তিনি দিয়েছেন, তা নয়। মূল্য দিতে হয়েছে পুরো দলকে, জাসদের হাজার হাজার কর্মীকে। অনেককে পলাতক জীবন বেছে নিতে হয়। কিছু কিছু ষড়যন্ত্রও হয়। চক্রান্ত করে সিরাজুল আলম খানকে পুলিশের হাতে ধরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল ঢাকা নগর জাসদের কোষাধ্যক্ষ জয়নাল আবেদীনের বিরুদ্ধে। ঢাকা নগর গণবাহিনীর হাইকমান্ড তাঁর মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করে। ছিয়াত্তরের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি ঢাকেশ্বরী মন্দিরের পাশ দিয়ে রিকশায় চড়ে যাওয়ার সময় তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয় ।

পার্টির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক কমিটির (সিওসি) এক বর্ধিত সভা ছিয়াত্তরের ২৬-৩১ অক্টোবর ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বিগত দিনগুলোর কার্যক্রম এবং এর সাফল্য-ব্যর্থতা, ত্রুটি-বিচ্যুতি ও ভুল-ভ্রান্তি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। আলোচনায় যে বিষয়গুলো বেরিয়ে আসে, তা বিশেষ বিভ্রান্তি' শিরোনামে সদস্যদের মধ্যে প্রচার করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়:

আমাদের পার্টির সংগঠন ও গণসংগঠনের মধ্যে মারাত্মক ধরনের স্থবিরতা ও অস্থিরতা বিরাজ করছে। স্থবিরতার অর্থই হলো গতিহীনতা। গতিহীনতা সৃষ্টির মূল কারণ হলো সংগঠনের ভেতরে দ্বন্দ্ব সমন্বয়ের অভাব ।... মনে রাখতে হবে, অন্ধবিশ্বাস প্রবণতা যেমন মার্ক্সবাদ নয়, ঠিক তেমনি শুধু প্রয়োগও মার্ক্সবাদ নয়।...

গণসংগঠন সমূহে স্থবিরতা নেমে আসার মূল কারণ হিসেবে আমরা লক্ষ করেছি গণসংগঠন সমূহের নিজ নিজ স্বাধীন অস্তিত্বের ক্রমবিলুপ্তি এবং ক্রমবর্ধমান হারে পার্টি সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রতি মাত্রাতিরিক নির্ভরশীলতা, পরস্পরের মধ্যকার দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের অভাব, কর্মীদের মধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অপারগতা, গণসংগঠনসমূহের বাস্তব, স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিত ভূমিকার অনুপস্থিতি ইত্যাদি।

নেতৃত্বে বর্তমান কাঠামো (সর্বস্তরের) যথোপযুক্ত ও পর্যাপ্ত নয়। তাই এই বৈঠক আগামী কাউন্সিল সভার অনুমোদন সাপেক্ষে কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক কমিটি, স্ট্যান্ডিং কমিটি ও জরুরি স্ট্যান্ডিং কমিটিকে বাতিল ঘোষণা করে। সকল পর্যায়ের ফোরামসমূহও বাতিল ঘোষণা করা হয়। বিভিন্ন ফ্রন্টসমূহের সমন্বয় সাধনের জন্য বিভিন্ন ফ্রন্ট থেকে প্রতিনিধি নিয়ে সর্বস্তরে কেবলমাত্র একটি করে সমন্বয় কমিটি' গঠন করার সুপারিশ করা হয়। এই পার্টিকে বর্তমান স্থবিরতা ও অস্থিরতার হাত থেকে রক্ষা করে গতিশীল ও শক্তিশালী করে গড়ে তোলার জন্য বর্তমান উপলব্ধির ভিত্তিতে সংগঠনের একজন সদস্যের ওপর দায়িত্ব ন্যস্ত করে। তিনি এ ব্যাপারে যেকোনো সদস্যের সহযোগিতা নিতে পারবেন এবং যেকোনো দায়িত্ব যেকোনো সদস্যের ওপর অর্পণ করতে পারবেন।...

৩১ তারিখে যে বর্ধিত সভায় 'একজন সদস্যের ওপর দায়িত্ব ন্যস্ত’ সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়, তিনি ওই দিন সভায় উপস্থিত থাকতে পারেননি। পরে তাঁর সভাপতিত্বে ২৩ সদস্যবিশিষ্ট এক সভায় তিনি 'একজন সদস্যের ওপর দায়িত্ব ন্যস্ত' বিষয়কে তাত্ত্বিক দিক থেকে অপর্যাপ্ত ও ভিত্তিহীন মনে করেন। তাই প্রশ্নটিকে সংগঠনের সর্বস্তরে মতামতের জন্য খসড়া প্রস্তাব হিসেবে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বর্তমান পরিস্থিতিতে 'পরিচালনা পরিষদ' গঠন না করে সব ফ্রন্ট থেকে প্রতিনিধি নিয়ে একটি 'কেন্দ্রীয় সমন্বয় কমিটি' গঠন করা হবে উপরিউক্ত ব্যবস্থাসমূহ তিন মাসের জন্য কার্যকর থাকবে। এই সময়ের মধ্যে বা অনুরূপ কোনো সময়ের মধ্যে সত্যিকার প্রতিনিধিত্বমূলক কাউন্সিল আহ্বান করা হবে এবং সামগ্রিক অবস্থার পূর্ণ পর্যালোচনা করে সমস্ত বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।

এই সিদ্ধান্তগুলোর ওপর লিখিত মতামত আগামী ৩০ নভেম্বরের মাধ্য কেন্দ্রের কাছে পাঠাতে হবে। এই সভার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে 'বিপ্লবী পার্টি' গঠনের প্রক্রিয়ায়। ছেন টানা হলো। সঙ্গে সঙ্গে সমাপ্ত হলো একটা ঘটনাবহুল, ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ, রক্তক্ষয়ী পর্বের। একটা বিপ্লবী পার্টির নিজেকে নিজেই বিলুপ্ত করার উদাহরণ খুব বেশি নেই। জাসদের নেতৃত্ব বুঝতে পেরেছিলেন, এই প্রক্রিয়া আর বয়ে বেড়ানোর কোনো মানে হয় না। অনেক শ্রম, ঘাম ও রক্তের বিনিময়ে এই উপলব্ধি অর্জন করতে হলো।

ছিয়াত্তরের ২৬ নভেম্বর সিরাজুল আলম খান ঢাকার মোহাম্মদপুরে হুমায়ুন রোডের একটা বাসা থেকে গ্রেপ্তার হন। আনসার আহমদ, খোলা চৌধুরী এবং ডা. সেলিম এই বাসার একতলায় ভাড়া থাকতেন। আনসার খোদা বখশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় জাসদ ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সিরাজুল আলম খান মাঝেমধ্যে এই বাসাটি শেল্টার হিসেবে ব্যবহৃত করতেন। সারা দিন ও পরদিন কোনো গণমাধ্যমে এই গ্রেপ্তারের সংবাদ প্রচার করা হয়নি। দলের মধ্যে অনেকেই আশঙ্কা করছিলেন, তাঁকে মেরে ফেলা হতে পারে। ২৭ নভেম্বর আফতাব উদ্দিন আহমদ ও মহিউদ্দিন আহমদ সারা দিন বিভিন্ন পত্রিকা ও সংবাদ সংস্থার অফিসে ধরনা দেন, যাতে সিরাজুল আলম খানের গ্রেপ্তারের খবরটি ছাপানো হয়। ২৮ নভেম্বর একমাত্র ইত্তেফাক-এর ভেতরের পাতায় এক প্যারাগ্রাফের ছোট্ট একটা সংবাদ ছাপা হয়েছিল। শিরোনাম ছিল, ‘সিরাজুল আলম খান গ্রেপ্তার'।

করপোরাল আলতাফ হোসেনকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তিনি পলাতক জীবন বেছে নিয়েছিলেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। ১৯৭৮ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইল জেলার নাগরপুর থানার এক গ্রামে টাঙ্গাইল জেলা গণবাহিনীর একসময়ের কমান্ডার খন্দকার আবদুল বাতেনসহ একদল কৃষকের সঙ্গে আলোচনা করছিলেন আলতাফ। এ সময় পুলিশ বাড়িটি ঘিরে ফেলে এবং গুলি করতে থাকে। সবাই নিরাপদে সরে যেতে পারলেও আলতাফ পারেননি। গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি মারা যান। তাঁর লাশ পুলিশ গুম করে ফেলেছিল । আলতাফ ছিলেন বরগুনা জেলার হরিদ্রাবাড়িয়া গ্রামের এক দরিদ্র কৃষক পরিবারের সন্তান। একাত্তরে তিনি নবম সেক্টরে মেজর জলিলের সহযোদ্ধা ছিলেন। মা, স্ত্রী ও দুটি শিশুসন্তান রেখে তিনি 'বিপ্লবের' আগুনে আত্মাহুতি দিয়েছিলেন। এই সর্বোচ্চ ত্যাগের জন্য তিনি কোনো তারকাখ্যাতি পাননি। নিচু পর্যায়ের সৈনিকদের নিয়ে এ দেশে কেউ মহাকাব্য লেখেন না।

করপোরাল আলতাফকে নিয়ে মেজর জলিল একটি কবিতা লিখেছিলেন।

কবিতার প্রথম কয়েকটি লাইন ছিল :

আর দেবতা নয়, নয় শান্তির দূত

নহে কাবা, নহে কবিতা। এসো বিদ্যুৎ,

এসো বিপ্লব, এসো ঝঞ্ঝা, এসো আগুন,

এসো সংগ্রামী সাথী রক্তঝরা ফাগুন।

 

(সূত্র: জাসদের উত্থান পতন: অস্থির সময়ের রাজনীতি ।। পৃষ্টা: ২২২-২২৬)


জিয়ার ষড়যন্ত্র   বিশ্বাসঘাতকতা  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড আর্টিকেল

জিয়ার ষড়যন্ত্র এবং বিশ্বাসঘাতকতা (পর্ব-৭)

প্রকাশ: ০৮:০০ এএম, ১৫ নভেম্বর, ২০২৩


Thumbnail

১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে স্বপরিবারে হত্যার নেপথ্যে ছিলেন জিয়া। ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট থেকে ৭ নভেম্বরের ঘটনা প্রবাহে দেখা যায় জিয়া ছিলেন একজন নিষ্ঠুর স্বৈরাচার এবং ঠান্ডা মাথার খুনী। তার অপকর্মের কিছু চিহ্ন পাওয়া যায় ‘মহিউদ্দিন আহমদের’ লেখা ‘জাসদের উত্থান পতন: অস্থির সময়ের রাজনীতি’ শিরোনামে গ্রন্তটি থেকে। পাঠকের আগ্রহের কথা বিবেচনা করে গবেষণাধর্মী গ্রন্থটির কিছু অংশ ধারাবাহিক প্রকাশ করা হলো:

১৬ জুলাই বিকেলে তাহের করপোরাল মজিদকে তাঁর সেলে ডেকে নিলেন। বললেন, 'আমাদের অনেক ভুলভ্রান্তি হয়েছে। নেক্সট টাইম আমরা আরও কেয়ারফুল হব । এয়ারফোর্সকে রি-বিল্ড করতে হবে। ছিয়াত্তরের ১৫ জুলাই রায় ঘোষণার কথা ছিল। রায় দেওয়া হলো ১৭ জুলাই। রায় ঘোষণার সময় অভিযুক্তরা সবাই হইচই, চিৎকার করছিলেন এ রায়ে তাহের, জলিল ও আবু ইউসুফের ফাঁসির আদেশ হয়। পরে রায় সংশোধন করে জলিল ও ইউসুফকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন মেজর জিয়াউদ্দিন (১২ বছর), আ স ম আবদুর রব, হাসানুল হক ইনু ও আনোয়ার হোসেন (প্রত্যেকের ১০ বছর), সিরাজুল আলম খান, করপোরাল আলতাফ হোসেন ও করপোরাল শামসুল হক (প্রত্যেকের সাত বছর), নায়েব সুবেদার মোহাম্মদ জালালউদ্দিন, হাবিলদার এম এ বারেক, রবিউল আলম, সালেহা বেগম ও নায়েক সিদ্দিকুর রহমান (প্রত্যেকের পাঁচ বছর) এবং হাবিলদার আবদুল হাই মজুমদার ও করপোরাল আবদুল মজিদ (প্রত্যেকের এক বছর)। কারাদণ্ডের সঙ্গে তাঁদের প্রত্যেককে বিভিন্ন অঙ্কের জরিমানা এবং অনাদায়ে তিন মাস থেকে দুই বছর পর্যন্ত অতিরিক্ত কারাবাসের আদেশ দেওয়া হয়। যাঁরা 'বেকসুর খালাস' পান, তাঁদের মধ্যে ছিলেন আখলাকুর রহমান, আনোয়ার সিদ্দিক, মহিউদ্দিন, নায়েব সুবেদার বজলুর রহমান, মাহমুদুর রহমান মান্না, ওয়ারেসাত হোসেন বেলাল, মো. শাজাহান, কে বি এম মাহমুদ, আম্বিয়া, হাবিলদার সুলতান হামিদ, নায়েক আবদুল বারী, সার্জেন্ট কাজী আবদুল কাদের, কাজী রোকনউদ্দিন, নায়েব সুবেদার আবদুল লতিফ আখন্দ, নায়েক শামসুদ্দিন ও সার্জেন্ট সৈয়দ রফিকুল ইসলাম। আদালতের শুনানির ওপর কোনো রকমের তথ্য বাইরে প্রকাশ করার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। ২১ জুলাই ভোর চারটায় তাহেরের ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

তাহের ছিলেন অত্যন্ত সাহসী, প্রাণবন্ত ও আশাবাদী। রায় ঘোষণার পর থেকে তাকে কখনো মন করতে দেখা যায়নি। তিনি যখন ফাঁসির মঞ্চের দিকে হেঁটে যান, তখনো তিনি ছিলেন দৃপ্ত, অবিচল।

'ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা মামলার রায় মানি না'- এই স্লোগান ব্যবহার করে জাসদ ৩১ জুলাই হরতাল আহ্বান করে। হরতাল সফল করার জন্য ঢাকা নগর গণবাহিনীর কয়েকটি ইউনিটের সদস্যরা প্রস্তুতি নেন। কামরাঙ্গীরচরে হুসেনের ঘরে বাদল, মুশতাক, ইদ্রিস, ইয়াকুব এবং আরও কয়েকজন ৩০- ৪০টি 'নিখিল' বানিয়েছিলেন। একটাও ফাটেনি। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তপন কুমার সাহা জুরাইনের একটি বাড়িতে বোমা বানাতে গিয়ে বিস্ফোরণে নিহত হন। ঘটনাটি ছিল খুবই মর্মান্তিক ।

৩১ জুলাই কোথাও হরতাল হয়নি। জাসদ সমাজ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অনেক জায়গায় কর্মীরা কোনো শেল্টার পাচ্ছেন না। কোথাও কোথাও জনতা তাঁদের ধরে পুলিশে সোপর্দ করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গণবাহিনীর সদস্য আবু আলম শহীদ খান গুলিস্তান ভবনে চলচ্চিত্র নির্মাতা কাজী জহিরের অফিসে চাঁদা আনতে গেলে অফিসের কর্মচারীরা তাঁকে ধরে পুলিশের হাতে তুলে দেন। জাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির তথ্য ও গণসংযোগ সম্পাদক শাহ আলম মগবাজারে চীনা দূতাবাসের একটি অফিসে প্রচারপত্র দিতে গেলে দূতাবাসের কর্মচারীরা তাঁকে ধাওয়া করেন । তিনি দেয়াল টপকে কোনোমতে পালাতে সক্ষম হন।  সময়টা বৈরী। চারদিকে পরাজয় ও হতাশা। সবকিছু কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেছে। যে তারুণ্যের শক্তি নিয়ে জাসদ একদিন মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল, চার বছরের মাথায় তা প্রায় নিঃশেষিত।

 

 

তাহেরের ফাঁসি নিয়ে বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দল বা বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় মাথা ঘামায়নি। দলের তরুণদের কাছে এটা ছিল একটা ভীষণ দুঃখজনক ঘটনা। রায়হান ফেরদৌস মধুর উদ্যোগে একটা কবিতা সংকলন বের করা হলো। তাহেরকে নিয়ে লিখলেন অনেকেই। তাঁদের মধ্যে ছিলেন মাশুক চৌধুরী, অসীম সাহা, আবু করিম, মোহন রায়হান প্রমুখ। অসীম সাহার একটা কবিতার কয়েকটা লাইন ছিল এরকম :

তাহের তাহের বলে ডাক দিই

ফিরে আসে মৃত্যুহীন লাশ

কার কণ্ঠে বলে ওঠে আকাশ বাতাস

বিপ্লব বেঁচে থাক তাহের সাবাশ।

 

এই মামলায় যাঁরা খালাস পেয়েছিলেন, তাঁদের অনেককেই দীর্ঘদিন জেলে বন্দী রাখা হয়েছিল বিশেষ ক্ষমতা আইনের মাধ্যমে। এঁদের একজন ছিলেন সার্জেন্ট সৈয়দ রফিকুল ইসলাম। তাঁকে কখনো এক মাস, কখনো ১৫ দিন, কখনো বা এক সপ্তাহের আটকাদেশ দিয়ে আটকে রাখা হতো। ষোলো মাস পর সাতাত্তর সালের নভেম্বরে তিনি জেল থেকে ছাড়া পান।

৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থান, জাসদ-গণবাহিনীর হঠাৎ জড়িয়ে পড়া, জিয়ার সঙ্গে তাহেরের সখ্য এবং পরিণামে প্রতারণার শিকার হওয়া এসব দলের মধ্যে অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়। এ ছাড়া তাহেরের আগবাড়িয়ে জিয়াকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক, এমনকি রাষ্ট্রপতি হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া নিয়েও বিতর্ক হয় । জাসদের মতো একটা গণমুখী রাজনৈতিক গণসংগঠনের এরকম 'সামরিকীকরণ' কতটুকু কাঙ্ক্ষিত ছিল, এ নিয়ে মতপার্থক্য দেখা দেয়। এসব বিষয়ে দলের পক্ষ থেকে একটা ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা হয়। পঁচাত্তরের ডিসেম্বরে দলের এক মূল্যায়নে বলা হয়:

৭ নভেম্বর মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে কোনো প্রকার সরকারি আদেশ ব্যতীতই বিপ্লবী সিপাহি ও বিপ্লবী গণবাহিনী কর্তৃক বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর অধিনায়ক হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠার পেছনে একটিমাত্র যুক্তি ছিল তা হলো, নিদেনপক্ষে জিয়াউর রহমান হয়তো বা এত তাড়াতাড়ি কোনো বিদেশি শক্তির কাছে মাথা নত করবেন না, আত্মমর্যাদা বিকিয়ে নেবেন না- বিপ্লবী সিপাহিসহ সাধারণ জনতার ওপর এত শিগগির অত্যাচারের স্কিম রোলার চালাবেন না, অন্তর্বর্তীকালীন গণতান্ত্রিক জাতীয় সরকার গঠন করবেন এবং অতীতের ভুলভ্রান্তি থেকে কিছুটা হলেও শিক্ষা গ্রহণ করবেন। কিন্তু ক্ষমতায় আসীন হওয়ার কয়েক ঘন্টা পরই জিয়াউর রহমান ও তাঁর সঙ্গীরা বেমালুম ভুলে গেলেন তাঁদের চার দিনের বন্দিজীবনের কথা।

জিয়া ও তাহেরের সম্পর্কের বিষয়ে ধোঁয়াশা রয়েই গেছে। এ নিয়ে তাহেরের মনোভাব সামরিক আদালতে দেওয়া তাঁর জবানবন্দিতে কিছুটা উঠে এসেছে সত্য, কিন্তু এটা ছিল অনেক পরে বিচার চলার সময়ের মন্তব্য। নভেম্বরের ওই মুহূর্তে তাহেরের মনে কী ছিল, তা জানার তেমন কোনো উপায় নেই। এ বিষয়ে তাহের সংসদের প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি অধ্যাপক আহমদ শরীফের প্রশ্ন ছিল :

কর্নেল তাহের সম্বন্ধে আমার একটা জিজ্ঞাসা রয়েই গেল। তা এই, কর্নেল তাহের সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান বলে প্রচার করলেও মূলত এ অবসেনানী কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের সৈন্যদের প্রভাবিত করে তাদের দিয়েই ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট দখল করান। সিপাহি জনতার জাসদী (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল) নেতা কেন পাকিস্তান ও ইসলাম পছন্দ' জিয়াউর রহমানের উপর আস্থা রাখলেন, আর কেনই বা সিআইএ এজেন্ট খন্দকার মোশতাক আহমদকেযিনি ট্রেইটর সর্বার্থে ও সর্বাত্মকভাবে, তাঁকে বা-ইজ্জত স্বরে নিরাপদে বাস করার সুযোগ দিলেন, হত্যা না করে, হাজতে না পাঠিয়ে বিচারের ব্যবস্থা না করে।

 

 

(সূত্র: জাসদের উত্থান পতন: অস্থির সময়ের রাজনীতি ।। পৃষ্টা: ২১৯-২২২)


জিয়া   ষড়যন্ত্র   বিশ্বাসঘাতকতা  


মন্তব্য করুন


বিজ্ঞাপন